ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

৩৪তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

৩৪.

পরের সময়গুলো কাটল উল্কার গতিতে। শ্রুতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক মাস পার হয়ে গেল ইতোমধ্যে। মাঝে ঘটে গেল বিশাল বড় বড় ঘটনা।

শ্রুতি তার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাওয়ায় যারা খুশি কিংবা চিন্তামুক্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে বিভা অন্যতম। বোনের চিন্তায় ছিল পাগলপ্রায়। ঠিক করেই ফেলেছিল নিজে গিয়ে শ্রুতিকে নিয়ে আসবে। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়ে তাকে যেতে হয়নি। তার আগেই পার্থিব এবং আসাদুজ্জামান নিয়ে গেল শ্রুতিকে। শান্তি পেল বিভা।

এর দুই-তিন পরেই হামিম অসুস্থ হলো। বিভা হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানাল, অপারেশন যতো দ্রুত হওয়া যায় ততোই ভালো। বাসায় এসে সব বলার পরপরই মাহাথির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল অপারেশন হবে এক সপ্তাহ পরেই। সে নিয়ে পরদিন মাহাথির সন্ধ্যার পর নিজেই গেল ডাক্তারের সাথে কথা বলতে। ডাক্তার জানাল সমস্যা হবেনা। যতোদ্রুত কথা যায় ততো ভালো। হামিমের অভিভাবক বলতে দুই বোন এবং দুই বোনের স্বামীই। তাই মাহাথির ভাবল পার্থিবকে জানানো দরকার। পার্থিব এতোদিন খোঁজখবর নিলেও তাকে এবং শ্রুতিকে অসুস্থতার ব্যাপারে জানানো হয়নি বিভার বারণে। তবে এখন জানা তার অধিকার।

সব শুনে পার্থিবও সম্মতি দিল।

পরের সপ্তাহেই হামিমের অপারেশন হয়ে গেল। বলা বাহুল্য টাকা দিল পার্থিব এবং মাহাথির। মাহাথির তার ব্যাংক থেকে জমানো টাকা তুলে ফেলল। পার্থিবের টাকা নিতে না চাইলে পার্থিবের অনুরোধে নিতে বাধ্য হলো। মাঝে অবশ্য টাকা দেওয়া নিয়ে বিভার সাথে হলো এক শান্ত যুদ্ধ । বিভা এক লাখ সত্তর হাজার টাকা এনে দিল মাহাথিরের কাছে। মাহাথির তা দেখে শান্ত মুখে বিভাকে বলল, ‘ তোমার টাকা বেশি হলে প্লেন বানিয়ে উড়িয়ে দিতে পারো, নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসাতে পারো কিংবা জানালা দিয়ে ফেলে দিতে পারো, আমাকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’ বলেই উঠে চলে গেল। বিভার উত্তরের সুযোগ রাখল না। বিভা মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল নিজের স্বামীর এমন উত্তরে।

অপারেশনে লাগল প্রায় ছয় লাখের মতো টাকা। হামিমের বেশ কিছু সমস্যা ছিল। হার্টে ছিদ্র, রক্তনালি অচল, বুকের বাল্ব নষ্ট, পায়ে সমস্যা। সব মিলিয়ে টাকা গেল পাঁচ/ছয়ের মতো। সবচেয়ে স্বস্তি এবং শান্তি ব্যাপার হলো - হামিমের অপারেশন সম্পূর্ণ হলো ভালোভাবে। এরপর আইসি.ইউ তে রইল এক সপ্তাহের মতো। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী, বাসায় ফিরে ভালোভাবে পায়ের ব্যায়াম করলে সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবে। এছাড়া বুকের সমস্যার কারণে সকল প্রকার খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতে হবে। নয়তো বুকের কৃত্রিম বাল্ব যেকোনো সময় আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। আইসিইউ থেকে হামিমকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার পরই যেন কেটে গেল বিভীষিকাময় মূহুর্ত। সবার বুক থেকে নেমে গেল এক বিশাল বড় পাথর। বিশেষ করে বিভা আর শ্রুতি।

হামিম এখন বিভার বাড়িতে আছে। সম্পূর্ণ বেডরেস্টে। নড়চড় করা তার স্বভাব। তবুও সবার অনুরোধে চুপচাপ শুয়ে থাকতে হয়।

হামিমের অপারেশনের পর প্রায় প্রতিদিনই শ্রুতি-পার্থিব বিভার বাড়িতে এসেছে। দেখে গেছে। পার্থিব না পারলেও শ্রুতি একাই চলে আসতো, রাতে পার্থিব এসে হামিমকে দেখে শ্রুতিকে নিয়ে যেত।

আজও তাই হলো। সারাদিন হামিমের সাথে কাটিয়ে শ্রুতিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পার্থিব। গাড়িতে আছে তারা। শ্রুতি বাহিরে তাকিয়ে দেখছে রাতের শহর। একবার চোখ ফিরিয়ে চাইল পার্থিবের দিকে। শান্ত মুখে বসে আছে পার্থিব বাহিরের দিকে মুখ করে। আজ সে ড্রাইভ করছে না। ড্রাইভার আছে। অগত্যা দু'জনে পেছনে বসে আছে। শ্রুতি চোখ ফিরিয়ে নিল। গত একমাস এতো তাড়াহুড়োয় পার হলো যে নিজেদের সম্পর্কের দিকে তাকানোর সময় পাওয়া গেল না। তবে শ্রুতি পার্থিবকে অনেক সূক্ষ্মভাবে অবজার্ভ করছে। আর করে যা পেল তা হলো — পার্থিব আগের মতো তার সাথে কথা বলেনা। কেন বলেনা? রাগ থেকে? নাকি কষ্ট থেকে? শ্রুতি উত্তর খুঁজেও পেল না। এই এক মাসে কথা বলার মতো বলেছিল শুধু হামিমের অপারেশনের দিনে। কতো খারাপ লোক! খারাপ সময়ে স্ত্রীকে একা ছাড়ে না, অথচ অন্যসময় ঠিকই ভাব দেখায়। অসভ্য লোক! শ্রুতির ভীষণ অসহ্য এবং অস্থির লাগল। পার্থিবের দিকে তাকিয়ে নিজে থেকেই ডাক দিল,

‘ শুনুন?’

পার্থিব চোখ ফিরিয়ে বলল, ‘ হুম, বলুন।’

‘ আপনি কী আমার উপর রাগ? অনেক রাগ?’

‘ একটুও রাগ নই। কেন?’ পার্থিবের হেসেই উত্তর দিল।

শ্রুতি নাক ফুলিয়ে উত্তর দিল, ‘ না, কিছুনা। এমনিতেই।’

বলেই ঘুরে আবারো বাহিরে চোখ নিল। শ্রুতি ঠিক জানে পার্থিব তার উপর রাগ। অনেক রাগ। কতো ধুরন্ধর লোক! রাগ করেও হাসে যাতে শ্রুতি ধরতে না পারে। শ্রুতি কী এতোই বোকা?

রাগের মাঝে শ্রুতির মন খারাপ হয়ে গেল। পার্থিব কেন রাগ করেছে? সে যখন পার্থিবের দিকে আগাতে চাইল তখনই পার্থিব মুখ ফিরিয়ে নিল। কেন? কেন? কেন? আর ভালোবাসে না বুঝি? শ্রুতিকে অসুন্দর লাগে তাই? আর ভালোবাসবে না কখনো?

.

মাহাথির অফিসে বসে পার করছে অলস সময়। আনাস আসছেনা কিছুদিন যাবত। হয়তো ছুটি নিয়েছে বউ এর প্রেগন্যান্সি উপলক্ষে।

বিগত দিনগুলো চলে গেল চোখের নিমিষে। তবে হালকা লাগছে। বাচ্চাটাকে ওইভাবে অসুস্থ হয়ে কতোদিন আর পরে থাকত? শেষমেশ অপারেশন হলো — এই শান্তি।

তবে এখন বিভার কথা ভাবতে গেলেই চোখে ভাসে কেবল বিভার করুণ, অসহায় মুখ। ভাইয়ের অপারেশনে কী অসহায়ত্ব তার! মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছিল। দু'টো দিন বিভা ঠিকমতো খেল না। অবশ্য তাদের কারোরই সেভাবে খাওয়া-দাওয়া হয়নি ভালোভাবে। দৌড়ঝাঁপে অবস্থা খারাপ। তবুও পার্থিব ছিল, দু'জন মিলে শামলে নিয়েছিল পরিস্থিতি।

মাহাথির এতোদিনে খুব ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছে সে বিভার প্রতি দুর্বল, মারাত্মক পরিমাণ দুর্বল। তবে এই দুর্বলতাকে সে ভালোবাসার নাম দিতে নারাজ।

জেদ দুইপ্রকার হয়। ভালো জেদ আর খারাপ জেদ। মাহাথিরের মধ্যে দুই জেদের মিশ্রণই দেখা যায়। তবে বর্তমানে তার খারাপ জেদ থেকে সে নিজেকে মানাতে চেষ্টা করল - সে কাউকে ভালোবাসতে পারে না। সে বিভাকে ভালো বাসেনা। এখন থেকে যথাসম্ভব সে বিভার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে। এতে যদি সমস্যার সমাধান হয়, এতে যদি মাথার মধ্যে পোকার মতো ঝিঁ ঝিঁ করতে থাকা বিভার চিন্তা দূর হয়। ভালোবাসলেও ঠিক ছিল যদি চিন্তা না হতো। এই চিন্তাটাকেই মেনে নেওয়া যাচ্ছেনা। এতো চিন্তা, ভাবনা কেন হবে? হোয়াই?

বাসায় ফিরে মাহাথির ভালোভাবে শরীর ধুয়ে নিল। হামিমের ঘরে যেতে হবে। শরীরে জীবাণু থাকা যাবেনা। এতে করে তাজা ক্ষততে ইনফেকশন হওয়ার চান্স থাকে। মাহাথির ঘরে গেল হামিমের। তাদের মধ্যে বেশ ভালো ভাব হয়েছে। ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেল হামিম শুয়ে আছে, তাকে দেখেই মুখ যতোটুকু প্রসারিত করা যায়, করে ফেলল। বুকে বালিশ চাপ দেওয়া। এটা ডাক্তারের নির্দেশ ছিল। মাহাথির পাশে বসে হামিমের চুলে হাত বুলিয়ে দিল,

‘ কেমন আছেন, লিটল ব্রাদার?’

‘ ভালো নেই।’

‘ সেকি! কেন?’

‘ আমাকে ভালো খাবার দেওয়া হয় না। আমার স্যুপ, সবজি ভালো লাগেনা।’

‘ তুমি কী খেতে চাও আমাকে বলো, ভাইয়া নিয়ে আসব।’

‘ আমি মরতুজ খাব।’

মাহাথির তাকিয়ে রইল হামিমের দিকে। ছেলেটার কথা আটকে আটকে পড়ে সবসময়। অনেক কষ্টে সে প্রতিটা বাক্য শেষ করে। প্রথমে অসুবিধা হলেও এখন সে বুঝতে পারে। তবে এখন বুঝতে পারল না। মরতুজ কী জিনিস? মরতুজ…..মরতুজ….তরমুজ? মাহাথির বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি নিয়ে শুধালো,

‘ তুমি কী তরমুজের কথা বললে?’

‘ না। আমি মরতুজ খাব।’

মাহাথির কিছুক্ষণ নিজের কপাল চুলকালো। এরপর হেসে বলল,

‘ আর কোনো সমস্যা আছে?’

‘ আছে আরেকটা বড় সমস্যা। আমি আপোর ফোন খুঁজেছি। কিন্তু আপোর ফোন থেকে কয়েন খেতে পারিনা। ওই বাচ্চাটাকে খুঁজে পাইনা কয়েন খাওয়ার জন্য।’

মাহাথির হেসে ফেলল হামিমের কথায়। বুঝল হামিম গেমস খেলতে চাইছে। আগে যেমন খেলতো। মাহাথির নিজের ফোন বের করে হামিমকে দিল। বলল, ‘ এই নাও। কয়েন খাও। তবে বেশিক্ষণ কিন্তু খেলা যাবেনা। বেশি খেললে মাথা ব্যথা করবে।’

হামিম মাহাথিরের কথাকে গুরুত্ব দিল না অগ্রাহ্য করল বুঝা গেল না। সে নিজের মতো খেলতেই থাকল।

রাতে শুনা গেল আরেক কথা। বিভা আজ রান্না করতে গিয়ে দা চালিয়ে দিয়েছে নিজের হাতের ওপর। তাই বিভার হাত সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। কথাটা মাহাথির শুনলে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল বিভার দিকে। মনে চাইল সামনে দাঁড়ানো বিভাকে এক আছাড় মেরে গিলে ফেলতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। তাই নিজের ইচ্ছেকে চাপা দিয়ে মাহাথির চুপচাপ বসে রইল। মনে পড়ল সে পণ করেছে বিভার থেকে দূরে থাকার। এটা নিজের উপর একটা পরীক্ষা করা হয়ে যাবে। অতএব, মাহাথির নাতো বিভাকে কিছু বলল না বিভা সম্পর্কিত কোনো কথায় উত্তর দিল। তবে দেখে শান্তি পেল যে বিভা খাচ্ছে। তার আম্মা বিভাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মাহাথিরের চোখ বিভার হাতের দিকে যেতেই ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল!

.

সারা ঘর কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে মাহাথির। দেখতেও বিরক্ত লাগছে, আবার গুছিয়ে রাখতেও মন চাইল না।

নিজের সাথে যুদ্ধ করে একটা একটা কাগজ ভীষণ অযত্নের সাথে তুলে নিল। টেবিলের ওপর ধাপ করে রেখে দিয়ে তৈরি করে ফেলল কাগজের স্তূপ। এসে অন করল নিজের ল্যাপটপ। এমন ফালতু কাজ সে করে কীভাবে? ভেবেই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গেল।

আজ সে অফিসে স্যারের বকা খেয়েছে। ভয়ানক বকা। অফিসে থাকে সকাল আটটা থেকে বিকেল ছয়টা। দশ ঘন্টা। দশ ঘন্টায় কোনো ভুল হতে পারেনা? দশ ঘন্টা বসে বসে টাইপিং করা সম্ভব? আবার বলে কিনা - তুমি কিন্তু এখন অনেক অমনোযোগী থাকো!

তার মনোযোগ সে কই রাখবে না রাখবে সেটা কী ওই লোক ঠিক করবে? সিসিটিভি দেখে কখনো বোঝা যায় কার মনোযোগ কোথায় থাকে? আশ্চর্য রকমের গাধা একটা লোক!

‘ মাহাথির, আপনার জন্য নাস্তা এনেছি।’

মাহাথির ঘুরে তাকাল। বিভাকে দেখে তার আরোও রাগ হলো; রাগের থেকেও যে বিভার মুখটা দেখে তার অন্তর শান্তি পেল তা সে বুঝল না, মানল না। তার খেয়ালে কেবল এলো মেয়েটার থেকে যতো দূরে যেতে চাচ্ছে, ততো যেন কাছে চলে আসছে। মাহাথির নিজের কাজে মন দিল। ওদিকে তাকানো যাবেনা।

বিভা হাপ ছাড়ল। সে এতোসুন্দর করে শাড়ি পরেছে মানুষটা খেয়াল পর্যন্ত করল না? বিভা এগিয়ে গিয়ে নাস্তা রাখল টেবিলে। ঘুরে আয়নার নিজেকে একবার দেখল ভালো লাগছে কিনা। মাহাথির বিভাকে দেখা দূর, খাবারের দিকেও তাকাল না। বিভা অন্যদিক দিয়ে খাটে উঠে মাহাথিরের পাশে এলো। কাঁধে মাথা রেখে বসল। মাহাথির ভীষণ অবাক হয়ে বিভাকে দেখল। আশ্চর্যের সাথে সাথে নিজের জেদ থেকে বিভাকে দূরে সরানোর তীব্র ইচ্ছে হলো। বিভা মাহাথিরের বাহুতে দুইহাত রেখে ডাকল, ‘ মাহাথির, দেখুন। কেমন লাগছে আমাকে?’

মাহাথির বিভাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালালো, ‘ ভালো লাগছে।’

‘ আপনি না তাকিয়েই কীভাবে বুঝলেন ভালো লাগছে? একটু দেখুন। বেশি না একটু।’

ল্যাপটপ থেকে নজর সরল না মাহাথিরের। বলল, ‘ তোমার মুখ কী চেঞ্জ হয়ে গেছে? আমি তোমাকে গত সাত মাস ধরেই দেখছি বিভা।’

বিভা মাহাথিরের বাহুতে ধরে টানতে লাগল। উদ্দেশ্য ল্যাপটপ থেকে হাত সরানো। মাহাথির নিজের হাতের চলন থামিয়ে দিল। বিভার দিকে চোখ তুলে চেয়ে বলল, ‘ রাগ তুলো না, বিভা। সামনে থেকে যাও।’

‘ কীসের রাগ? রাগ আপনার মাথায় উঠেই থাকে তাই না? অনেক হয়েছে আর না। আপনার রাগের ধার ধারিনা আমি। চলুন। আমরা বাহিরে ঘুরতে যাই।’

‘ বেশি বকছো বিভা। যাও।’

‘ না যাব না। দেখেন, আম্মা আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। আমি নিজেও পরতে পারি তবে সেই পরিয়ে দিল। ভালো লাগছেনা?’

‘ এমন ন্যাকামো তোমার সাথে যাচ্ছে না।’

‘ ভালো হয়েছে। আচ্ছা চলুন বাহিরে যেতে হবেনা। একটু গল্প করি দু’জন?’

মাহাথির নিরব রইল। বিভা অভিমানে গাল ফুলাল, ‘ মাহাথির, আপনি আমাকে ভালো কবে বাসবেন? আপনার উচিত না আমাকে ভালোবাসা? বলুন?’

‘ উচিত।’

‘ আপনি আমার সাথে এমন কেন করছেন, এইভাবে এড়িয়ে কেন যাচ্ছেন? আমাকে কী আপনার মানুষ মনে হয়না?’ ভীষণ কষ্ট, জেদ, অভিমান থেকে হালকা উচ্চআওয়াজে বলল বিভা। মাহাথির বিভার দিকে তাকাল। সে কম কীসে!

সেও দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছি বুঝেও কেন বসে আছো? চলে যেতে পারছো না? আর কী শুনতে চাও তুমি? ভালোবাসি কিনা? ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। হ্যাপী? এইটাই শুনতে চাচ্ছিলা তো সাতমাস ধরে? বলে দিলাম। হ্যাপী? এবার যাও?’ কথা থামিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলল মাহাথির।

মাহাথিরের এমন আচরণে বিভা ধপ করে নিভে গেল। বলার মতো কিছু পেল না। মাহাথিরের এমন কথা যেন বিভাকে নিভিয়ে দিল একেবারের মতো। বিভা মলিন হাসল, ‘ থ্যাংকিউ মাহাথির। মিথ্যা হলেও বলার জন্য।’

মাহাথির তাকিয়ে রইল। বিভা বলল,

‘ আপনার তো অফিস থেকে এলেই ক্ষুধা লাগে তাই বানিয়েছি। ক্ষুধা পেলে খেয়ে নিবেন।’

মাহাথির তাকিয়ে দেখল মেরুন রঙের জামদানি পরিহিতা মেয়ে নিশ্চুপে তার ঘর ত্যাগ করল।

উফ! মাহাথির মাথা ধরে শুয়ে পড়ল। কী হচ্ছে এইসব জীবনে? বিভার থেকে দূরে গিয়েও তো ভালো লাগেনা। বিভা চলে গেল তাও ভালো লাগেনা। নিজের কাছে নিজের হারতেও ইচ্ছে হয়না। পৃথিবী এমন এলোমেলো কেন? সম্পর্ক এতো কঠিন কেন? সম্পর্কে ঠিক কীভাবে করে? মানুষের জীবন সুন্দর কীভাবে হয়? সব জায়গায় অশান্তি হলে শান্তি কোথায়? মাহাথির থম ধরে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। পার হলো কিছুমিনিট। কত মিনিট? পনেরো/ বিশ মিনিট তো ভালোভাবেই হবে।

মাহাথির উঠে বসল। ভালো লাগছেনা। উঠে চলে গেলো বাহিরে। বাহিরে গিয়েই দেখতে পেল বিভা বসা। মাহাথির অবাক হয়ে দেখল কিছুক্ষণ আগের শাড়ি পরে থাকা মিষ্টি, মায়ামুখ মুখের বিভা বসে নেই। মুখ তো মায়াময়, মিষ্টি আছেই। তবে পরনে সালোয়ার-কামিজ পরে থাকা বিভা বসে আছে। সাধারণ মুখে কিছু কাজ করছে।

সামনে পা খেয়াল করে বিভা মুখ তুলে তাকাল। মাহাথির দাঁড়িয়ে। মোটা, রুক্ষ চুলগুলো এলোমেলো। বিভা হাসার চেষ্টা করল, মুখে হাসি ফুটিয়ে স্বাভাবিক স্বরে জানতে চাইল, ‘ কিছু বলবেন? লাগবে কিছু?’

মাহাথির হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। কিছু বলতে পারল না। মাহাথির উত্তর দিল,

‘ না, লাগবে না কিছু।’

বিভা কাজে মন দিল। মাহাথির ধীরে ধীরে বলল, ‘ আমার হয়তো তোমাকে লাগবে বিভা। অথচ এই ‘তোমাকে’ লাগাটা আমি মানতে পারছিনা।’

_______

চলবে~

শব্দসংখ্যা - ১৮৩০

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন