#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
পর্ব ১১.
সারারাত বৃষ্টি শেষে ভোর রাতের দিকে বৃষ্টি থেমেছে। বৃষ্টির পর সারা শহরের ধুলোবালি সব সরে গিয়ে শহরময় ঝক ঝক করছে। তবে শহরের কিছু আধাপাকা রাস্তা গুলোতে পানি জমে আছে যার দরুন মানুষের চলাচল কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। মাহিন সকাল সকাল ডিউটিতে জয়েন করা মাত্রই কল আসে। কল রিসিভ করে মাহিন এর মসৃণ কপাল কুঁচকে যায়। তাড়াহুড়ো করে তিন চারজন নিয়ে শহরের প্রান্তে লাউঞ্জের পাশে ঝোপঝাড় এলাকায় গিয়ে চার টা লা**শ উদ্ধার করেছে।
তখন মাহিন কে ওই এলাকার একটা অফিসার কল করেছিল। মাহিন প্রায় সব এলাকার অফিসারদের বলেছিল এমন কোনো কেস হাতে আসলে ওকে ইনফর্ম করতে। মাহিন প্রায় ছ'বছর বছর আগে এরকম কেস দেখেছিল ওর চাকরি জীবনের শুরুতে। তারপর বিগত পাঁচ মাস যাবত অহরহ এমন লা**শ পাচ্ছে, এই কেস নিয়ে মাহিনের মনে এক প্রকার সন্দেহ ঢুকেছিল তাই উপর মহল থেকে বিশেষ পারমিশন নিয়ে মাহিন এই কেসটা নিজের আন্ডারে নিয়েছিল। অথচ বিগত পাচ মাসের মধ্যে এতগুলো খু**ন হয়েছে তাও একই পদ্ধতিতে যে হয়তো এই কেসটা শুধু মাহিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না তা মাহিন বেশ বুঝতে পারছে।
এই লা*শ গুলো দেখেই বুঝা যায় এই সব গুলো খু**ন হয়তো একজন করেছে নয়তো একজনের আন্ডারে থাকা লোকেরা করেছে বসের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে। প্রতিটি খুন একই ভাবে করেছে কাজটা একদম ঠান্ডা মাথায় করেছে খুনি একটা চিহ্নও রাখেনি। কি বি*ভ*ৎ*স ভাবে লোকগুলো কে মে*রে*ছে। দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে উঠে। মানুষের প্রতি মানুষের কতো ক্ষো*ভ থাকলে এভাবে মা*রা যায় মাহিন আহমেদ এর জানা নেই। তবে মাহিন এতটুকু বুঝতে পারছে যে খু*নি*র হয়তো মানসিক রোগ আছে নয়তো এভাবে খু**ন করা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের দ্বারা সম্ভব না।
প্রতিটি লা*শে*র চোখ গুলো একদম গভীর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, এখন চোখগুলোর জায়গায় এমন গর্ত হয়ে আছে যে তাতে যে কারো হাতের তিনটা আঙুল ঢুকানো যাবে। বুকের বা পাশের মাংসল তুলে হাড় ক*পি*য়ে হৃদ**পিন্ডকে টেনে বের করেছে। বের করেই থামেনি শুধু ওই র*ক্তে গড়া হৃদয়পিন্ডকে কয়েকটি টুকরায় পরিনত করেছে।আর প্রত্যেকটা লা*শে*র অ*ন্ড*কো*ষ কে**টে সেটাকে তিন ভাগে বিভক্ত করে সেগুলো কে লাশের পায়ের কাছে রেখেছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এগুলো করতে ধারালো কোনো অস্ত্র ব্যবহার করেছে। মাহিন চোখ ফিরিয়ে নেয় এমন বি*ভ*ৎ*স দৃশ্য থেকে।
তবে মাহিন যেটা বুঝলো সেটা হলো, এই চারটা লা*শের কাহিনী ভিন্ন, বাকিগুলোর থেকে। এই চারটা লা*শের গায়ে অজস্র মা*রে*র চিহ্ন রয়েছে অথচ বিগত লা*শ*গুলো তে কোনো মা*রে*র চিহ্ন ছিল না শুধু বিশেষ কিছু অঙ্গ নষ্ট করে দিত, এমনকি লাশগুলোর সাথে ধস্তাধস্তির একটা চিহ্ন ও থাকতো না, সম্ভবত বেহুঁশ করে কাজগুলো করতো।
মাহিন ওর এক বিশ্বস্ত কনস্টেবল কে আড়ালে নিয়ে বলে,
— কামিল খোজ নাও এই লোকগুলোর লাস্ট লোকেশন কি ছিল, আর আমাদের ইনফর্মার দের কাছে প্রতিটা লাশের ছবি পাঠিয়ে লোকগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে তথ্য বের করতে বলো "
কামিল নামের কনস্টেবল মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালে। মাহিন একপেশে হেসে বলে,
— ততক্ষণে আমি মোস্ট পাওয়ারফুল ওম্যান এর খবর নিয়ে আসি "
________________________________________
খান বাড়িজুড়ে যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাড়ির সবচেয়ে প্রাণবন্ত, চঞ্চল ছেলেটা সকাল থেকেই প্রচণ্ড জ্বরে কাবু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। সেই দৃশ্য যেন কেউই মেনে নিতে পারছে না।
রুবিনা খান ছেলের কপালে বারবার ভেজা কাপড় চেপে দিচ্ছেন, আর অঝোরে চোখের পানি ফেলছেন। যেন ভুলেই গেছেন তাঁর ছোট ছেলে এখন চব্বিশ বছরের একজন পরিণত যুবক। মায়ের চোখে সে আজও সেই ছোট্ট নীল, যে সামান্য জ্বরেই তাঁর বুক কেঁপে উঠত।
কিয়ারাও ছলছল চোখে ছোট ভাইয়ের শিয়রের পাশে বসে আছে। এক হাতে নীলের হাত ডলে দিচ্ছে, অন্য হাতে বারবার কপালের চুল সরিয়ে দিচ্ছে। ঘরভর্তি উৎকণ্ঠা আর নীরব কান্নার মাঝেও নীল কষ্ট করে আধখোলা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে দুর্বল স্বরে ধমক দিয়ে যাচ্ছে,
— "এমন মরা কান্না জুড়ো না তো... ভালো লাগছে না।"
এই অবস্থাতেও ছেলেটার আত্মসম্মান আর রসবোধটুকু যেন এক বিন্দুও কমেনি।
সাজিদ খান আর আদি পুরো ঘরময় অস্থির পায়চারি করছেন। সকাল থেকে সবাই একটানা নীলকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বুঝিয়ে চলেছে। নীল রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাড়িতেই ডাক্তার ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও একদফা প্রচণ্ড চিৎকার করে সবাইকে থামিয়ে দিয়েছে সে।
কারও মাথায় ঢুকছে না— এমন অকারণ জেদ করছে কেন? প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি ছেলেটার এমন ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে সাজিদ খান বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাড়ির সবাই ভেবেছে বৃষ্টিতে ভেজার কারণেই জ্বর এসেছে। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে তাঁর মন অন্য কথাই বলছে। এ শুধু শরীরের জ্বর নয়...কোনো গভীর অভিমান, কোনো অদৃশ্য কষ্ট, কোনো না বলা যন্ত্রণা ছেলের মনকে এতটাই পুড়িয়েছে যে সেই আগুনই শরীরে জ্বর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এক সময় তিনিও তো এমন ছিলেন। মনের ক্ষত শরীরকে অসুস্থ করে দিতে পারে— সেই অনুভূতি তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
তবু বুঝে উঠতে পারছেন না, সারাক্ষণ হাসিমুখে ঘুরে বেড়ানো তাঁর ছেলের মনে এমন কী ঝড় বয়ে গেছে?
জেদ দেখে তিনিও ধমকেছেন, কিন্তু এই ছেলেকে জোর করে কিছু করানো প্রায় অসম্ভব। নীল এমনিতেই সবার মন রেখে চলে, কিন্তু একবার কোনো বিষয়ে জেদ ধরলে তাকে সেখান থেকে ফেরানো দুঃসাধ্য হয়ে যায়।
নিজের যৌবনের কথা মনে পড়ে যায় সাজিদ খানের। তিনিও ছিলেন ভীষণ একরোখা। তবে এক নীলাম্বরীর ভালোবাসা তাঁকে বদলে দিয়েছিল। আজও মনে মনে তিনি প্রার্থনা করেন— তাঁর ছেলেদের জীবনেও যেন এমন একজন মানুষ আসে, যার কাছে তারা নিজের সমস্ত জেদ, অহংকার আর অস্থিরতা স্বেচ্ছায় হার মেনে দেবে।
গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— "নীল, বাচ্চাদের মতো জেদ করছো কেন?"
নীল ধীরে ধীরে চোখ মেলে বাবার দিকে তাকাল। জ্বরে চোখদুটো লালচে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। অস্পষ্ট, ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলল,
— "আমি... বাচ্চা নই... কিছুদিন পর আমার চব্বিশ বছর হবে... আমি সব সামলাতে পারি... সব... আমি বাচ্চা নই..."
জ্বরের ঘোরে কথাগুলো ঠিকমতো উচ্চারণই করতে পারছিল না। তাই কারও কানে স্পষ্ট পৌঁছাল না। কিন্তু সেই অস্ফুট শব্দেও নিজের শক্ত থাকার মরিয়া চেষ্টা স্পষ্ট ছিল।
নীলের জ্বরের খবর শুনেই শান ছুটে এসেছে। বন্ধুর অবস্থা দেখে সেও অনেকক্ষণ ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নীল কষ্ট করে চোখ খুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলে উঠল,
— "শাট আপ! আমি কোনো ডাক্তারের কাছে যাব না। আর একটা কথাও কেউ বলবে না... বললে সবাইকে ঘর থেকে বের করে দেব।"
প্রচণ্ড জ্বরেও কণ্ঠের সেই দৃঢ়তা একটুও ম্লান হয়নি।আদি আর শান একসময় ওর বাধা উপেক্ষা করে জোর করেই তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু পারেনি। দু'জনের জিম করা শরীরও নিয়মিত কঠোর অনুশীলনে গড়া নীলের শক্তির কাছে হার মেনেছে। আশ্চর্যজনকভাবে জ্বর তার শক্তি কেড়ে নিতে পারেনি, শুধু শরীরটাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
তার ওপর আদি নিজেও সারারাত এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করেনি। ক্লান্ত শরীরে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। এদিকে আরমান চৌধুরী ফোন করে নীলের খবর নিয়েছেন। শান সব খুলে বলেছে— সময়ের সঙ্গে জ্বর বাড়ছেই, অথচ নীল কারও কথা শুনছে না। রুবিনা খানও এবার নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম।সবকিছু দেখে শান কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরক্তি আর অসহায়তায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"এই ছেলেটার মতো ঘাড়ত্যাড়া মানুষ হয় নাকি! কারও কথা শুনবে না, কাউকে মানবে না... উফ!"
হঠাৎই যেন মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরে... একজন তো আছে! একমাত্র একজন, যার সামনে নীলের সব দাপট, সব একরোখামি, সব ত্যাড়ামি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়।
আপুনি...যদিও রাহা নীলকে যতই অপছন্দ করুক, নীলের অসুস্থতার খবর শুনে নিশ্চয়ই মুখ ফিরিয়ে থাকবে না।একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক। ভাবনাটা মাথায় আসতেই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না শান। তড়িঘড়ি রাহার নম্বরে কল দিল। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। রাহা তখন গভীর ঘুমে অচেতন। আগের রাতে দুটো স্লিপিং পিল খেয়েছিল। এত সকালে জেগে ওঠার প্রশ্নই আসে না। উপায় না দেখে শান এবার নিশাকে ফোন করল। বেচারি নিশাও তখন গভীর ঘুমে। রাতে পার্টি থেকে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল।
শানের ফোন পেয়েই আধঘুম চোখে তাড়াহুড়ো করে রাহার ঘরের দিকে ছুটল সে। কিন্তু তাড়াহুড়োয় সামনে থাকা বিশাল স্তম্ভটা খেয়ালই করল না। ধপাস! সজোরে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে বসে পড়তেই ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল। কপাল চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড়িয়ে উঠল,
— "কোন খাম্বা শা*লা রে!"
ঠিক তখনই সামিন ফোনে কথা বলতে বলতে বাইরে যাচ্ছিল। শব্দ শুনে থেমে নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, ছোটখাটো এক মেয়ে কুঁচকানো টি-শার্ট আর ঢোলা প্লাজো পরে মেঝেতে বসে গালি দিচ্ছে। গালিটা কানে যেতেই সামিন ভ্রু কুঁচকে রেগে বলল,
— "হেই ইউ! খাম্বা কাকে বললে?"
নিশা বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়াল। তারপর একবার সামিনের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে ফেলল,
— "এই যে... খাম্বা! এখানে কী করছেন?"
সামিন দাঁত চেপে একেকটা শব্দ উচ্চারণ করল,
— "এই বাড়ির জামাই।"
এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। রাগ চেপে সোজা হেঁটে চলে গেল। আর নিশা হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,
— "আজব পাবলিক!"
বলেই দ্রুত রাহার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
চলবে...