#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ০৮
সাদিফ তার গাড়ি ইউনিভার্সিটির ভেতরে বিল্ডিং এর সামনে দাড় করায়। সায়মা গাড়ি থেকে নেমে দেখতে পায় নুর ইউনিভার্সিটির মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করছে। প্রথম দিনেই তাদের মধ্যে অনেক ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। সায়মা নুরকে দেখা মাত্র জোড়ে নুর কে ডাক দেয় ওর নাম ধরে। নুর সায়মার আওয়াজ পেয়ে মুচকি হাসি দিয়ে ওর কাছে এগিয়ে যায়। সাদিফ গাড়ির ভিতর বসে ছিলো। সায়মা বের হলে সে গাড়ি পার্ক করবে। যখন সায়মা বের হলো তখন সাদিফ গাড়ি স্টার্ট দেয় ঘুরানোর জন্য কিন্তু সায়মার জোড়ে চিল্লানো শুনে গাড়ির সাইড মিরোরের দিকে তাকায়। নুরকে সায়মার কাছে আসতে দেখে সে অবাক হয়ে যায়।
সাদিফ মনে মনে বলে,
সায়মা কি ওকে চিনে? আর ওর নাম নুর?
সাদিফ গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ি থেকে বের হয়। আর ওদের দুইজনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
সায়মা নূরের সামনে গিয়ে বলে ,
- হাই নুর।
নুর সালাম দেয়,
আসসালামু আলাইকুম সায়মা।
সায়মা উত্তর নেয়,
ওয়ালাইকুম আসসালাম।
নুর সায়মাকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে বলে,
আমাদের সব সময় সালাম দিয়ে কথা শুরু করা উচিত। হাই বলা আমাদের মুসলিমদের কালচার না।
সায়মা উত্তর দেয় ,
সরি সরি। আসলে এখানে সবাই হাই হেলো বলে তো আমারও সেটাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে সালাম দিয়ে কথা শুরু করবো।
- ইন শা আল্লাহ। নিজেকে পরিবর্তন করো শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।
- ইন শা আল্লাহ আমি চেষ্টা করবো। আমার জন্য দোয়া করিয়ো।
- ফি আমানিল্লাহ।
সাদিফ এতক্ষন ধরে ওদের কথা শুনছিলো। হঠাৎ সায়মার চোখ যায় সাদিফের দিকে। সায়মা তখনই নুর কে সাদিফের সামনে নিয়ে যায়।
- নুর ইনি হচ্ছেন আমার বড় ভাই সাদিফ। আর সাদিফ ভাইয়া ও হচ্ছে নুর আমার নিউ ফ্রেন্ড। আমরা বর্তমানে একই ক্লাসে আছি ইভেন আমাদের সিট ও একসাথে।
সাদিফ সব কথা শুনে নুরের দিকে নিজের হাত বারিয়ে দেয় হ্যান্ডশেক করার জন্য আর বলে,
- হাই মাই নেইম ইজ রায়ান ইসলাম সাদিফ। নাইস টু মিট ইউ।
নুর তো প্রথমেই সাদিফকে দেখে অবাক হয়েছে। ও চিনতে পেরেছে এটাই কালকের সেই ছেলেটা যে মারা'মারি করেছিলো। নুর ভীষন অবাক হচ্ছে সায়মার মতো এত শান্ত মেয়ের এমন পাজি আর বদমেজাজি ভাই হলো কিভাবে?
নুর সাদিফের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
নূর মাথা নিচু করে সালাম দেয়,
আসসালামু আলাইকুম।
সাদিফ ব্রু কুচকে নুরের দিকে তাকায়। মেয়েটা কি দেখতে পারছে না ও যে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে রেখেছে?
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি যে হাত বাড়িয়ে রেখেছি আপনি কি দেখছেন না?
- পর পুরুষের হাত স্পর্শ করা হারাম। আমি আপনার সাথে হ্যান্ডশেক করতে পারবো না।
সাদিফ এখন বিরক্ত হচ্ছে। সব মেয়েরা তার এক ঝলক দেখা পাওয়া তার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে আর এই মেয়ের এত নখরা সে মেনে নিতে পারছে না। এই মেয়েকে পটাতে তার অনেক কষ্ট করতে হবে সে বুঝতে পারছে। এখন মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে হবে। তাই সাদিফ নিজের রাগকে কন্ট্রোল করে মুখে একটা ছোট হাসি দেয়।
- আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি দুঃখিত আমার জন্য আপনাকে সমস্যায় পড়তে হলো।
নুর চুপ করে থাকে মাথা নিচু করে কিছু বলছে না।
সাদিফ প্রশ্ন করে,
আচ্ছা আপনার নাম টা যেনো কি বললেন?
- আমার নাম মেহেরিমা সিকদার নুর।
- বাহ বেশ সুন্দর নাম তো আপনার। নুর নামের অর্থ কি?
- আলো। নুর নামের অর্থ হলো আলো।
- ওয়াও। খুব ভালো।
নূর সায়মা দিকে এগিয়ে বলে,
সায়মা চলো আমাদের কে ক্লাসে যেতে হবে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এই কথা বলে নুর আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ায় না দ্রুত হেটে ক্লাসে চলে যায়। সায়মাও নুরের পিছন পিছন যায়।
............................
সাদিফ আর ওর বন্ধুরা সবাই বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
নিক সাদিফকে জিজ্ঞেস করে,
এখন তোর মাথায় কি প্ল্যান চলছে সাদিফ??
- আপাতত কোন প্ল্যান নেই। আমি বুঝে পাচ্ছি না কি করবো৷ এই মেয়ের জন্য কি আমার হেরে যেতে হবে??? সাদিফ কোনো দিনও কারো কাছে হারে নি। আমি হারতে পারি না। কারণ আমি হারতে শিখি নি। এই মেয়ের মনে যায়গা করার উপায় আমাকে খুজে বের করতেই হবে।
- আমার মনে হয় তোর এই বাজি টার কথা ভুলে যাওয়া উচিত। মেয়েটাকে দেখেছিস? দেখেই বুঝা যায় অনেক শান্ত আর ভদ্র। কি মায়াবী চেহারা।
- ধুর কি যা তা বলছিস? কিসের মায়াবী। কোন দিক দিয়ে সুন্দর লাগলো ওকে তোর? গায়ের রঙ শ্যামলা হাইট ও তো বেশি না বড় জোড় ৫" ২ হবে। কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আমার পিছে ঘুরে আর আমার কি কপাল তাদের রেখে এর পিছনে ছুটতে হচ্ছে ধুর।
- ফর্সা গায়ের রঙ আর উচ্চতাই কি সুন্দর্য? ব্যবহার মায়া কি ম্যাটার করে না?
- না। আর ওর মধ্যে আমি কোন মায়াও খুজে পাই না। এসব কথা বাদ দে ভালো লাগছে না আমার।
যোহরের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। মাত্র নুরদের ক্লাস শেষ হলো। যেহেতু এখানে মসজিদ নেই তাই আজানও শোনা যায় না। যার জন্য নুরের অ্যাপে ওয়াক্ত দেখে নামাজ পড়তে হয়। নুর সায়মা কে বললো,
সায়মা শোনো আমার নামাজ পড়তে হবে। কোথায় পড়া যায় বলোতো?
- সামনের বিল্ডিং এ কয়েকটা খালি রুম আছে ওখানে পড়তে পারো।
- আচ্ছা চলো।
নুর প্রথমে ওযু করে নেয় তারপর ওর ব্যাগ থেকে জায়নামাজ বের করে৷ মোবাইলে অ্যাপের মাধ্যমে কিবলা কোন দিক সেটা নির্নয় করে।
- তুমি নামাজ পড়বে না সায়মা?
- আসলে আমি তো নামাজ পড়ি না। মাঝে মাঝে আম্মুর সাথে পড়ি।
নুর ভীষণ অবাক হয়ে সায়মার দিকে তাকায় ।
- তুমি এটা কী বলছো সায়মা? নামাজ পড়ো না মানে?
মুসলমানদের জন্য নামাজ সুনির্দিষ্ট ফরজ ইবাদত এবং ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। ঈমান আনার পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নামাজ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, ইশারায় যে অবস্থায় সম্ভব নামাজ ছাড়া যাবে না। একজন মুমিন ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, দেশে-বিদেশে যেখানেই অবস্থান করুক না কেনো তাকে নামাজ পড়তেই হবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘ নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মুমিনদের জন্য অবশ্যকর্তব্য।’ (সুরা নিসা: ১০৩)
পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে" তোমাদের কোন জিনিস সাকারে (জাহান্নাম) নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবে,' আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।’ (সুরা মুদ্দাসসির: ৪২-৪৩)
সালাত পরিত্যাগকারী ‘কাফিরদের দলভুক্ত’ বলে গণ্য হবে। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম সালাতেরই হিসাব গ্রহণ করা হবে।
- ইন শা আল্লাহ কাল থেকে পড়বো।
- আজ এখন থেকেই পড়ো । এখন কি সমস্যা?
- আসলে আমার নখ কাটতে হবে, নেইলপলিশ উঠাতে হবে। আজকে বাসায় গিয়ে সব করবো।
- সত্যি তো?
- হ্যাঁ
- নিজেকে পরিবর্তন করবে একমাত্র আল্লাহর জন্য ।
- ইন শা আল্লাহ।
- সায়মা আমার একটা সাহায্য করবে? আমি যতক্ষণ নামাজ পড়ছি তুমি একটু গেইটের কাছে বসবে যেনো কেউ না আসতে পারে?
- হ্যাঁ অবশ্যই। তুমি নামাজ পড়ো।
নুর নামাজ শুরু করে। সায়মা বসে থাকে। হঠাৎ সায়মার ফোন বেজে উঠে। নুরের নামাজে যেনো ডিস্টার্ব না হয় তাই সে বাহিরে একটু দূরে গিয়ে কল টা ধরে কথা বলে।
সাদিফের এই বিল্ডিং এর ৪র্থ তলায় ক্লাস। তাই সে সেদিকে যাচ্ছিলো। হঠাৎ তার চোখ যায় একটা ক্লাসে। সে সেই রুমের দিকে এগিয়ে যায়। নুর নামাজ শেষে মুনাজাত নিয়েছিলো । সাদিফ নুরের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই সময় নুরকে যেনো অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
চলবে
লেখায় ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করবেন।