রূপার কথা শোনার পর নিতুর পৃথিবী অর্ধেক হয়ে গেল। বকুল ফুলের গন্ধ। মৃত্যুর গন্ধ।
সারাদিন সে অয়নের দরজার সামনে ঘুরঘুর করে। দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। দুপুরে ভাত দিতে গিয়ে দেখে আগের বেলার ভাত পড়ে আছে। অয়ন খায়নি।
নিতুর বুকের ভেতর কে যেন পাথর বেঁধে দিয়েছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
বিকেলে রাবেয়া খালা এলেন। হাতে তাবিজ। “এইটা বালিশের নিচে রাখ। রাতে ঘুমাবি।”
“খালা,” নিতু ফিসফিস করে। “বকুল ফুলের গন্ধ পেলে কী হয়?”
খালা নিতুর মুখের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ। তারপর নাক টানলেন। “তোর গা থিকা এখন শুধু পোড়া চিনির গন্ধ আসে না মা। সাথে লবণের গন্ধ। তুই কাঁদছস। কার জন্য?”
নিতু উত্তর দেয় না।
“ওই পোলার জন্য?” খালা নিজেই বলেন। “আমি কইছিলাম না? কবরের মাটির গন্ধ যার গায়ে, তার আয়ু কম।”
“ও মরবে না খালা,” নিতু প্রায় চিৎকার করে ওঠে। “আমি মরতে দেব না।”
খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। “মরণ কেউ ঠেকাইতে পারে না মা। তবে একটা কাম করতে পারস। আইজ রাইত এগারোটায় ছাদে যাইস। তোর সেলিম ভাইয়ের লগে কথা ক। উনি জানে কীভাবে মরা গন্ধ তাড়াইতে হয়।”
নিতু অবাক হয়। “সেলিম চাচা? উনি কী জানেন?”
“উনি দশ বছর ধইরা মরা বউয়ের লগে সংসার করে। মরা মানুষরে বাঁচায় রাখার মন্ত্র উনি ছাড়া আর কে জানবে?”
---
রাত এগারোটা।
নিতু ছাদে ওঠে। আকাশে চাঁদ নেই। মেঘ করেছে। গোরস্থানের দিক থেকে শিমুল গাছের পাতার শরশর শব্দ আসছে।
ছাদের এক কোণায় বেতের চেয়ারে সেলিম সাহেব বসে আছেন। সামনে একটা ছোট টুল। টুলের উপর দুটো কাপ। ধোঁয়া উঠছে। চা।
নিতুকে দেখে তিনি চমকান না। যেন জানতেন নিতু আসবে।
“বসো মা,” তিনি বলেন। পাশের চেয়ার দেখান।
নিতু বসে। “চাচা, আপনি রোজ কার সাথে চা খান?”
সেলিম সাহেব হাসেন। “আমার বউ, মালেকার সাথে। ও কাঁঠালিচাঁপা ফুল খুব পছন্দ করত। আমি রোজ রাতে ছাদে দুই কাপ চা বানাই। এক কাপ ওর। ও আসে। গন্ধ শুঁকে চলে যায়।”
নিতুর গা কাঁটা দেয়। “আপনি গন্ধ পান?”
“দশ বছর ধরে পাচ্ছি। যেদিন মালেকা মারা গেল, সেদিন থেকে। ডাক্তার বলল হ্যালুসিনেশন। আমি বলি ভালোবাসা। যে সত্যি ভালোবাসে, সে গন্ধ ভোলে না।”
নিতু কেঁদে ফেলে। “চাচা, অয়নের গা থেকে বকুল ফুলের গন্ধ আসছে। রূপা স্বপ্ন দেখেছে। ও কি... ও কি মরে যাবে?”
সেলিম সাহেব চায়ে চুমুক দেন। “বকুল ফুলের গন্ধ মানে সে মরতে চায়। কিন্তু চাওয়া আর হওয়া এক না মা। মানুষ অনেক কিছুই চায়।”
“আমি কী করব চাচা?”
সেলিম সাহেব আকাশের দিকে তাকান। “মালেকা যেদিন মরল, সেদিনও ওর গা থেকে বকুল ফুলের গন্ধ আসছিল। আমি টের পেয়েছিলাম। কিন্তু বুঝিনি। ও হাসপাতালে শুয়ে আমাকে বলেছিল, ‘আমার গায়ের গন্ধটা মনে রাইখো।’ আমি রাখিনি। আমি ভেবেছিলাম ও বাঁচবে। ও বাঁচেনি।”
তিনি নিতুর দিকে ফেরেন। “তুমি ভুল করো না মা। ওকে বলো, ওর গন্ধটা তোমার লাগবে। বেঁচে থাকলে যে গন্ধটা আসে, ওইটা। দারুচিনির গন্ধ। ভালোবাসার গন্ধ। বলো, ওই গন্ধটা না পেলে তুমি মরে যাবে।”
নিতুর বুকের পাথরটা একটু নড়ে।
হঠাৎ নিচ থেকে চিৎকার ভেসে আসে। রূপার গলা। “নিতু আপা! নিতু আপা! শিগগির আসো!”
নিতু আর সেলিম সাহেব দৌড়ে নামেন।
নিচে বারান্দায় রূপা দাঁড়িয়ে। হাত কাঁপছে। আঙুল তুলে অয়নের ঘরের দিকে দেখাচ্ছে।
দরজা খোলা। ভেতরে অয়ন মেঝেতে পড়ে আছে। মুখ দিয়ে গাঁজলা বের হচ্ছে। হাতের মুঠোয় একটা শিশি। খালি। আর টিনের স্যুটকেসটা উল্টে পড়ে আছে। সব ডায়েরি ছড়ানো।
নিতু চিৎকার করে ওঠে। “অয়ন ভাই!”
সে দৌড়ে গিয়ে অয়নের মাথা কোলে তুলে নেয়। অয়নের শরীর বরফের মতো ঠান্ডা। ঠোঁট নীল। কিন্তু... কিন্তু নিতু স্পষ্ট গন্ধ পায়। বকুল ফুলের গন্ধ না।
কাঠগোলাপের গন্ধ। তীব্র, ভেজা, সাদা।
সেলিম সাহেব পালস দেখেন। “শ্বাস চলছে। হাসপাতালে নিতে হবে। এখনই।”
রাবেয়া খালা দৌড়ে আসেন। “আমি অ্যাম্বুলেন্স ফোন করছি। তোরা ধর ওরে।”
অ্যাম্বুলেন্স আসে। অয়নকে তোলে। নিতু সাথে যায়। সারা রাস্তা অয়নের হাত ধরে থাকে। হাতটা আস্তে আস্তে গরম হচ্ছে।
হাসপাতালে ডাক্তার বলেন, “ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। বেশি না। বেঁচে যাবে। কিন্তু আরও দুই ঘণ্টা দেরি হলে...”
নিতু কেবিনের বাইরে বসে থাকে। ভোর হয়।
সকালে অয়নের জ্ঞান ফেরে। চোখ মেলে নিতুকে দেখে। হাসে। দুর্বল হাসি।
“আমি মরিনি,” অয়ন ফিসফিস করে।
“কেন করলেন এমন?” নিতুর গলা বুজে আসে। “বকুল ফুলের গন্ধ... আমি ভেবেছি...”
অয়ন মাথা নাড়ে। “আমার গা থেকে বকুল ফুলের গন্ধ আসেনি নিতু। রূপা ভুল দেখেছে। আমি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম। কারণ আমি আর গন্ধ পাচ্ছিলাম না। তিন দিন ধরে কোনো গন্ধ পাচ্ছিলাম না। আমার নাক মরে যাচ্ছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, গন্ধ ছাড়া আমি বাঁচব কী নিয়ে? তাই...”
“তাই মরতে চেয়েছিলেন?”
“না,” অয়ন নিতুর হাত ধরে। “তাই দেখতে চেয়েছিলাম, মৃত্যুর গন্ধটা কেমন। ওটা জমাতে চেয়েছিলাম। শেষ গন্ধ। কিন্তু খাওয়ার পর বুঝলাম, মৃত্যুর কোনো গন্ধ নেই নিতু। মৃত্যু গন্ধহীন। শুধু জীবনের গন্ধ আছে।”
নিতু কাঁদে। শব্দ করে কাঁদে।
“আপনি জানেন আমি কী গন্ধ পেয়েছি মরার আগে?” অয়ন জিজ্ঞেস করে।
“কী?”
“কাঠগোলাপের গন্ধ। আপনার গন্ধ। ওটা আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।”
নিতু অয়নের কপালে হাত রাখে। জ্বর নেই। কিন্তু একটা নতুন গন্ধ পায়। দারুচিনির গন্ধ। ভালোবাসার গন্ধ।
তিন দিন পর অয়নকে রিলিজ দেয়। নিরালা বাড়িতে ফেরে।
সেদিন রাতে নিতু বারান্দায় দুই কাপ চা নিয়ে বসে। এক কাপ নিজের, এক কাপ অয়নের।
অয়ন আসে। পাশে বসে। চায়ে চুমুক দেয়।
“এখন কী গন্ধ পাচ্ছেন?” নিতু জিজ্ঞেস করে।
অয়ন চোখ বন্ধ করে। লম্বা শ্বাস নেয়। তারপর হাসে। “দারুচিনি। সাথে কাঠগোলাপ। আর... আর একটু ভবিষ্যতের গন্ধ।”
“ভবিষ্যতের গন্ধ কেমন?”
“বাচ্চার গায়ের গন্ধের মতো,” অয়ন বলে। “ট্যালকম পাউডার আর দুধের গন্ধ।”
নিতুর কান লাল হয়ে যায়।
নিচ থেকে রাবেয়া খালার গলা ভেসে আসে। “ওই মা! তোর বারান্দা থিকা আজ নতুন গন্ধ আসে। বিয়ের গন্ধ। শিগগির বিয়া কর। আমি বুড়া বয়সে নাতি কোলে নিতে চাই।”
সেলিম সাহেব ছাদ থেকে হাসেন। “মালেকা, শুনছ? আমাদের নিরালা বাড়িতে আবার বিয়ের সানাই বাজবে।”
রূপা দৌড়ে আসে। “নিতু আপা! ভূতভাই! আমি স্বপ্ন দেখছি, তোমাদের ছাদের কাঠগোলাপ গাছে দোলনা বাঁধা। তাতে একটা বাচ্চা দোল খাচ্ছে।”
অয়ন নিতুর দিকে তাকায়। নিতু অয়নের দিকে।
কাঠগোলাপ গাছ থেকে টুপ করে একটা ফুল ঝরে পড়ে। দুজনের মাঝখানে।
গন্ধে সারা বারান্দা ভরে যায়।
মৃত্যুর গন্ধ না। জীবনের গন্ধ।
চলবে...