ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

১৭তম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

১৭

(যে কোনো ভুল পেলে আমাকে জানাবেন)

—০—

কদিন হলো রুশদী HSCপরিক্ষা টা শেষ হয়েছে। এ কদিন পড়ালেখার খুব প্যারা গিয়েছে তার উপর দিয়ে। এখন একটু রিলাক্স।রুশদী ও শের বিছানায় বসে পাজেল গেম খেলছে।রুশদীকে দেখে বোঝা যাচ্ছে ওর মন পাজেল গেমের ভিতর নেই।ফারাজের আজকেও ট্রিপ ছিলো।সন্ধ্যা রাতে সে ট্রিপ শেষ করে বাসায় এসেছে, এর পর আবার অফিসে গিয়েছিল।এই মাত্র বাসায় আসল সে। রুমে ডুকেই দেখল রুশদী ও শের গেম খেলছে। সে পকেট থেকে পার্স, ফোন রেখে বাছানায় গিয়ে বসল।বলল,

"তোমার এক্সাম তো শেষ, চলো এবার কোথাও থেকে ঘুরে আসি।"

​ "চট্টগ্রাম চলুন!"

​

ফারাজ একটু থমকাল। পাশেই বসে ছোট্ট ছেলে শের। ফারাজ শেরকে বলল, "শের, কানে হাত দাও তো পাপা!বড়দের কথা একদম শুনবে না।"

​"ওকে!" বাবার বাধ্য ছেলের মতো শের দুই কানে হাত চাপা দিল।

​শের কান বন্ধ করেছে নিশ্চিত হয়ে ফারাজ এবার গলার স্বর আরও কিছুটা নামিয়ে নিল। রুশদীর দিকে ঝুঁকে মৃদু অনুযোগের সুরে বলল, "হানিমুনে তুমি চট্টগ্রাম যেতে চাইছ? কক্সবাজারের কথা বললেও তাও একটা কথা ছিল, মানা যেত। আমি ভাবছিলাম কোনো ফরেন কান্ট্রিতে যাব। সুন্দর একটা রোমান্টিক ট্রিপ হবে আমাদের।"

রুশদী স্বাভাবিক স্বরে বলল, "চট্টগ্রামে আমার নানু বাড়ি। আমি নানু বাড়ি যাব।"

​"আহা, নানু বাড়ি পরে যেও। আগে চলো আমাদের হানিমুনটা সেরে আসি। বিয়ে তো হলো, অথচ মাত্র তো একটা চুমু খেয়েছি... এখনও তো বাকি সব..."

​ফারাজ তার বাক্যটা শেষ করার সুযোগ পেল না। এর মাঝেই পুংটা শের চট করে কান থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল, "তুমি মমকে চুমু খেয়েছ?!"

​ছেলের আকস্মিক প্রশ্নে ফারাজ একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তার চেহারা দেখে মনে হলো যেন একদম হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। সে আমতা আমতা করতে লাগল। অন্যদিকে রুশদী বিরক্ত আর লজ্জায় লাল হয়ে ফারাজের দিকে তাকাল।সেই চোখে তীব্র চড়ুই পাখির মতো রাগ। সে ফিসফিসিয়ে ধমকের সুরে বলল, "বাচ্চার সামনে কী কথা বলতে হয়, তাও কি আপনি জানেন না?"

​ফারাজ নিজেকে সামলে নিয়ে শেরের দিকে কড়া চোখে তাকাল, "শের! তোমাকে না বড়দের কথা শুনতে বারণ করেছিলাম?"

​শের অবশ্য বাবার এই নকল রাগকে একটুও পাত্তা দিল না। সে উল্টো অভিমানের সুরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, "তুমি মমকে চুমু খেয়েছ,লাস্ট তিন দিনে আমাকে একবারও চুমু দেওনি।!"

​ছেলের এমন কথায়সে হোহো করে হেসে উঠে শেরকে টেনে বুকের কাছে নিয়ে এলো। গালে চটাচট কয়েকটা চুমু খেয়ে বলল, "এই নাও, অনেকগুলো দিলাম। এবার হয়েছে তো?"

​"হুম!" শেরের মুখে এবার চওড়া হাসি ফুটল। সে পরম শান্তিতে বাবার কোলে মিশে গেল।

​তাদের এই খুনসুটির মাঝেই রুশদী আবার বলল,

"আমরা চট্টগ্রাম কবে যাচ্ছি?"

​

ফারাজ রুশদীর দিকে তাকিয়ে তার মনের ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করল। নরম সুরে শুধাল, "তুমি কবে যেতে চাইছ?"

​

"আজকেই!"

​"আজকেই? আমার তো আগামীকাল একটু কাজ আছে। "

​"তাহলে আমি একাই চলে যাই!"

​

"জরুরি কিছু ঘটেছে সেখানে?"

​

রুশদী কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলতো করে মাথা নাড়ল, "হুম।"

"আচ্ছা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি দেখছি কী ব্যবস্থা করা যায়।"

—০—

ব্যাগ গোছানোর ধুম পড়েছে—রুশদী, শের আর ফারাজ যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।রাইমা খানের কাছে আগেভাগেই বিদায়ের অনুমতি নিয়ে রেখেছে ওরা, ঘড়ির কাঁটা বলছে এখনই রওনা দেওয়ার সময়।

ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সদর দরজায় হাজির শান আর সিফাত।টানো কয়েকদিন ট্রেনিং নিতে নিতে বোর হয়ে উঠেছিল, তাই ক্লাব থেকে কদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে।।এইমাত্রই ফিরল।সিফাতের ইচ্ছে ছিল নিজের বাড়ি যাওয়ার, কিন্তু শানের জোর করে খান বাড়ি নিয়ে এলো।

ড্রয়িংরুমের সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই যেন একটা জীবন্ত ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ল তাদের ওপর। কোত্থেকে এক দৌড়ে এসে শানের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শের। পুঁচকে হাত দুটো দিয়ে শানের গলা জড়িয়ে ধরে চিল চিৎকার করে উঠল সে— "আ... ঝিংকু......চাচু! তুমি কখন আসলে?"

শান আলতো করে জড়িয়ে ধরল শেরকে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে গেল তার।কতদিন এই 'পুংটা'টার সঙ্গে দেখা নেই! শান বলল, "এই তো এলাম। তোর কী খবর রে?"

শেরের উচ্ছ্বাস থামার নাম নেই। শানকে ছাড়িয়ে পাশের সোফায় বসা সিফাতকে দেখেই বলে উঠল,

"ই... অনেক ভালো! সিফু, তুমিও এসেছ?"

সিফাত অমনি চোখ রাঙাল,

"এই শেরের বাচ্চা, 'সিফু' কিরে? আমার নাম সিফাত, সিফাত সিকদার। বুঝেছিস?"

"নো! তোমার নাম সিফু!"

"শেরের বাচ্চা তোর কিন্তু খবর আছে...!"

"উফ সিফু!আই এম নট 'শেরের বাচ্চা' আমি শারফারাজ খানের বাচ্চা।এটাও বুঝে স্টুপিড পিপল!"

"শের!'

"সিফু ডিলার!"

"চেংটা বাদর,আমার নামের খিস্তি ওড়ালে কিন্তু খবর আছে! ভুলেও আমাকে আর সিফু ডাকবি না।"

শের আরও পেয়ে বসল,

"সিফু সিফু সিফু... বলো এখন কী করবা?"

"তোকে কিন্তু আমি জ্যান্ত চিবিয়ে খাব!"

শের হেসেই কুটিপাটি, "উফ... সিফু ডিলার, তুমি কি রাক্ষস? যে আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে? আমি কি তোমাকে ভয় পাই? শের কাউকে ভয় পায় না।"

সিফাত এবার শেরকে নিজের কোলে টেনে নিল। ওর ছোট্ট দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করে বলল, "এবার বল, কী বলছিলি? আমাকে ভয় পাস না? দেব নাকি একটা আছাড়?"

শের বিপদে পড়ে শানের দিকে তাকাল, "চাচু, সিফুকে কিছু বলো! নাহলে আমি সিফুকে কামড় দেব কিন্তু!"

এমন সময় সেখানে ফারাজের প্রবেশ। ওদের দেখে অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করল, "আরে তোরা কখন আসলি?"

শান উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, "মাত্রই আসলাম! কিন্তু তুমি এই রাতের বেলা লটবহর নিয়ে কোথায় যাওয়ার জন্য তৈরি?"

তন্মধ্যে রুশদীও সেখানে এসে হাজির হলো। শানের প্রশ্নের জবাবে বলল, "আমরা তো চট্টগ্রাম যাচ্ছি!"

শানের চোখ কপালে উঠল, "চট্টগ্রাম! হুট করে চট্টগ্রাম কেন?"

"এমনিই, একটু ঘুরতে যাচ্ছি। "

শানের মুখটা মুহূর্তেই আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। সে অনুযোগের সুরে বলল, "কী বলো তোমরা! সবাই মিলে চলে যাচ্ছো আর আমরা কি এখানে একা একা বসে আঙুল চুষব?"

ফারাজ নির্লিপ্ত গলায় বলল, "তোদের ইচ্ছা তোরা কী করবি।"

"ই... আমরাও যাব ভাইয়া! তোমরা গেলে আমরা কোনোভাবেই একা থাকতে পারব না।"

ফারাজ এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "কেন? আমরা কি অক্সিজেন? যে আমাদের ছাড়া তোরা থাকতে পারবি না?"

শান নাছোড়বান্দা। সে প্রায় কাকুতি-মিনতি করে বলল, "হ্যাঁ ভাইয়া, তুমিই আমাদের অক্সিজেন! তোমরা চট্টগ্রাম চলে গেলে আমরা এই খাঁ খাঁ ঢাকা শহরে দম আটকে মরে যাব। প্লিজ ভাইয়া, আমাদের সাথে নিয়ে চলো! প্লিজ, প্লিজ!"

ফারাজ শক্ত গলায় জবাব দিল, "না, যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।"

"প্লিজ ভাইয়া!" শান এবার করুণ দৃষ্টিতে তাকাল

রুশদী পাশ থেকে একটু নরম সুরে সায় দিল", নিয়ে চলেন না। গেলে সমস্যা কী?"

ফারাজ এবারও অনড়, "আমি একবার বলেছি তো, যেতে হবে না।"

"চট্টগ্রামে আমার নানুবাড়ি যাচ্ছি! সো আমার কথাই শেষ কথা। আমার ভাইয়ারা যাচ্ছে, ব্যস!"

—০—

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে কালো রঙের মাইক্রোবাসটা আপন গতিতে ছুটে চলেছে।ভোরের আলো ফুটতে তখনও কিছুটা বাকি।গাড়ির ভেতরে দুপদাপ গান বাজছে।সামনের ড্রাইভার এর পাশের সিটে গম্ভীর মুখে বসে আছে ফারাজ।প্রথম সিটে শান, সিফাত।সেকেন্ড সিটে রুশদী আর শের। গাড়ির পেছনে পাহারায় আসছে কয়েকটা মোটরসাইকেল, যাতে বডিগার্ডরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।

আকাশের কোণে যখন সূর্যের প্রথম আভা দেখা দিল, ততক্ষণে গাড়ি সীতাকুণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই এলাকাতেই রুশদীর নানাবাড়ি—‘শেখ নিবাস’। রুশদীর দাদাবাড়িও এই চট্টগ্রামে, কিন্তু ছোটবেলার পর সেখানে আর থাকা হয়নি।সেই সূত্রে ফারাজ এখন চট্টগ্রামের জামাই।

রুশদীর নানা ছিলেন এই অঞ্চলের নামকরা বিত্তবান মানুষ। বিশাল জমিদারী ধাঁচের বাড়ি, যেখানে এখনো সব মামা-মামি আর কাজিনরা মিলেমিশে একান্নবর্তী পরিবারে থাকে।

গাড়িটা যখন শেখ নিবাসের কারুকাজ করা ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল, পুরো পরিবার যেন উৎসবে মেতে উঠল। বড় মামা এগিয়ে এসে ফারাজের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "আরে আমাদের চট্টগ্রামের জামাই যে!কেমন আছো? আগে চিনতে পারছো?হা হা! না চেনারই কথা আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ, সম্পর্কে আমি তোমার মামা। রাস্তাঘাটে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?"

মামি পাশ থেকে রুশদীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "আমার লক্ষ্মী মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে!শয়তান কল দিলে কল ধরিস না কেন? কথা বলিস না কেন আমাদের সাথে? বেশি পেকে গেছিস?"

রুশদী হাসিমুখে সবাইকে সালাম করল এবং একে একে ফারাজ, ও বাকিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। নানা-নানি তো নাতনি আর নাত-জামাইকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত।

সকালের রাজকীয় নাস্তা সেরে সবাই যার যার ঘরে বিশ্রাম নিতে গেল। শান আর সিফাতকে আলাদা একটা বড় ঘর দেওয়া হয়েছে, ওরা ঢুকেই সটান ঘুম। রুশদী নিজে গিয়ে ফারাজ আর শেরকে ওদের ঘরে রেখে এল। দীর্ঘ জার্নি শেষে ফারাজও বোধহয় একটু চোখ বুজেছে।

--

"দুলাভাই....!"

হুট করেই কোনো জানান না দিয়ে একঝাঁক পঙ্গপালের মতো হুড়মুড় করে ফারাজের ঘরে ঢুকে পড়ল একদল বাচ্চা-কাচ্চা। হঠাৎ চোখের সামনে এতগুলো ল্যাদাপ্যাদা দেখে ফারাজের চোখ তো চড়কগাছ! মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এলাকার কোনো স্কুলের পুরো ছাত্রছাত্রীকে বোধহয় ভুল করে তার ঘরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আসলে এরা অন্য কেউ নয়, এরা ফারাজের সদ্য জোটা একঝাঁক শালা-শালির দল।

ফারাজ এতক্ষণ বিছানায় আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তার কোল ঘেঁষে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল পুচকে শের। ঠিক তখনই কোনো সংকেত ছাড়াই এই পঙ্গপাল বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ!

ফারাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "তো.... তোমরা কারা?"

এই তুমুল হট্টগোল আর চিল-চিৎকারে শেরের সাধের ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। চোখ মেলেই ঘরের ভেতরের এমন ভয়ঙ্কর আর যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি দেখে বেচারা ভয় পাবে নাকি অবাক হবে, বুঝতে পারছে না।

এক এক করে ছোট ছোট হাতগুলো ওপরের দিকে উঠতে লাগল। আর ঘরের দেয়াল কাঁপিয়ে সমস্বরে আওয়াজ এল—

"আমি আপনার শালা!"

"আমি শালি!"

"আমিও শালি!"

"আমি শালা!"

"শালা!"

"শালি!"

ওদের মুখে কএতবার 'শালা-শালি' ডাক শুনে ফারাজের মনে হলো সে বোধহয় ভুল করে কোনো আন্তর্জাতিক গালির অনুষ্ঠানের এসে পড়েছে!

এদের মধ্যে সবার বড় মিতু; বয়সে সে রুশদীর চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট হবে। মিতু একটু মুচকি হেসে এগিয়ে এল এবং ফারাজের দিকে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই!"

ফারাজ কোনোমতে সালামের উত্তর দিল, "ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

মিতু নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, "আমি মিতু, আপনার শালী।"

বলেই সে একটু সলজ্জ হেসে একপাশে সরে দাঁড়াল। কিন্তু মুশকিল হলো, মিতুর এই ভদ্রতা দেখে বাকিদের মধ্যেও দুলাভাইয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার ধুম পড়ে গেল! একজনের দেখাদেখি বাকি সবাই এক এক করে এগিয়ে আসতে লাগল এবং অত্যন্ত হাস্যকর ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে ফারাজের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে নিজেদের নাম আর পরিচয় দিতে থাকল। এই কাণ্ড দেখে ফারাজের এখন রীতিমতো মাথা ঘুরছে।

ঠিক তখনই মানুষের সেই ভিড় ঠেলে দরজার পর্দা সরিয়ে কেউ একজন রুমে ঢুকল। ফারাজ ত্রাতার ভূমিকায় তাকিয়ে দেখল—রুশদী এসেছে। রুশদীকে স্বস্তি ফিরে এল।

রুশদী নিজের শোবার ঘরের ভেতর কাজিনদের এমন মেলা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল, "কী রে তোরা? তোরা সব একসাথে এখানে কী করছিস?"

আপুকে দেখামাত্রই পুরো বাহিনী এবার দুলাভাইকে ছেড়ে একযোগে রুশদীর ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক দিন পর তাদের প্রিয় বোনকে কাছে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে সবাই তাকে একসাথে জড়িয়ে ধরল। আচমকা এত জনের ভালোবাসার সম্মিলিত চাপ আর তাল সামলাতে পারল না রুশদী। সে দম আটকে যাওয়ার ভঙ্গিতে সবাইকে নিজের গা থেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, "এই ছাড়! ছাড় বলছি তোদের! আমি কি মরে গিয়ে ভূত হয়ে ফিরে এসেছি নাকি যে এত জড়াজড়ি করার কী আছে এই ভ্যাপসা গরমের ভেতরে? যাহ্, দূরে যা সব!এই, বের হ তো সব এখান থেকে!শান্তিতে থাকতে দে।"

বড় বোনের এমন কড়া নির্দেশ শুনে অবাধ্য দলবলও লক্ষ্মী ছেলের মতো এক এক করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুমটা ফাঁকা হতেই ফারাজ বলল, "রুশদী, এরা কারা? কোত্থেকে আমদানি হলো এত মানুষ!"

"এরা সব আমার কাজিন! সম্পর্কে আপনার শালা-শালি!"

"কিন্তু এত কেন? সংখ্যায় এত বেশি কেন?

"শেখ বাড়ির দুই কর্তা—মানে আমার স্বনামধন্য দুই নানা। ওনাদের দুজনেই দুটি করে বিয়ে করেছিলেন। তো সেই সূত্রে ওনাদের বাচ্চাকাচ্চা এবং সেই বাচ্চাকাচ্চার ঘরের বাচ্চাকাচ্চাদের সম্মিলিত প্রোডাকশনই হলো এই বিশাল বাহিনী...!"

"উফ!এই বাড়িতে শালা-শালীর প্রোডাকশন এত বেশি কেন? এই জন্যই বোধহয় সরকার বলে—দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়। আমার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে, একটাও না হলেই সবচেয়ে ভালো হতো!" ফারাজ কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল।

"কিছু বললেন কি?"

"নাহ্, কিছু না!"

ঠিক তখনই এতক্ষণের নীরব দর্শক পুচকে শেরের মুখে বুলি ফুটল। সে এতক্ষণ বিছানার কোণে বসে বড়দের সব কাণ্ডকারখানা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। শের হঠাৎ বেশ গম্ভীর মুখে মম & পাপার দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমরা গালি দিচ্ছ কেন?"

শেরের এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে রুশদী ও ফারাজ দুজনেই আকাশ থেকে পড়ল। তারা কখন কাকে গালি দিল? ফারাজ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কে কাকে গালি দিচ্ছে?"

"এই তো, মম-ও বলল, তুমিও বললে, আর ওই পচা পচা বাচ্চাগুলোও একটু আগে বলে গেল!"

রুশদী আর ফারাজ একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। রুশদী শেরের গাল দুটো হালকা টেনে দিয়ে বলল, "আমি তো কোনো গালি দিইনি সোনা! তুমি কোন গালির কথা বলছ?"

"শের পচা না! শের গালি দেয় না।"

"তাহলে তুমি কি আমাকে পচা বলতে চাচ্ছ, অ্যাংরি বার্ড? হুম?"

"না মম, তোমাকে তো বলিনি। কিন্তু তুমিও তো গালি দিলে...।"

"আরে বাবা, আমি কোন গালিটা দিলাম, না বললে বুঝব কীভাবে? তুমিই বলো আমাকে!"

শের এবার চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে বেশ নিচু গলায় বলল, "ওই যে... 'শা' দিয়ে এবং 'লী' দিয়ে যে গালিটা আছে, ওইটা দিলে।"

রুশদী হেসে উঠে বলল, "আরে ধুর বোকা! এটা তো গালি না!"

"কিন্তু পাপা তো বলেছিল এটা গালি!" শের বড় বড় চোখ করে পাপার দিকে তাকাল।

ফারাজ একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, "হ্যাঁ... মানে গালিও আবার গালি না!"

শের এবার পুরোপুরি বিভ্রান্ত। সে ফারাজের দিকে ঘুরে বলল, "তুমি মাত্রই তো বললে গালি না, আবার বলছ গালি!"

"এটা কখনো কখনো গালি, আবার কখনো কখনো গালি না।"

"কখন গালি আর কখন গালি না?" শেরের কৌতুহলী প্রশ্নের যেন শেষ নেই।

"তুমি এখনো অনেক ছোট মানুষ বাবা, এসব এখন বুঝবে না। আরও বড় হও, তখন নিজে নিজেই সব বুঝবে!"

শেরের ইগোতে যেন একটু লাগল। সে মুখটা ফুলিয়ে বলল, "হুম... আমি ছোট না, আমি বড়!"

রুশদী শেরের ছোট্ট তুলতুলে গড়নটার দিকে তাকিয়ে হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল, "তুমি এইটুকুনি মানুষ, নিজেকে বড় বলো কীভাবে? আগে আমাদের মতো লম্বা আর বড় হও, তখন জানবে!"

কিন্তু রুশদীর এই কথায় শেরের মুখের দুষ্টুমি আর চঞ্চলতা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। তার কচি মুখটায় এক অদ্ভুত বিষাদের ছায়া নেমে এল। সে অত্যন্ত আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলল, "শের কখনো বড় হতে চায় না!"

রুশদী শেরের এই আকস্মিক এ রূপ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "শের বড় হতে চায় না কেন?"

শের তখন ফারাজের দিকে তাকিয়ে, আবার রুশদীর দিকে তাকালে।অসহায় গলায় বলল,"পাপা বলেছে, আমি বড় হয়ে গেলে নাকি পাপার সঙ্গে এখন যেভাবে থাকি, সেভাবে আর থাকতে পারব না। তখন নাকি আমার পাপার থেকে আলাদা থাকতে হবে।তাই আমি কখনো বড় হতে চাই না।"

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন