ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

১৮তম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

১৮

(যে কোনো ভুল পেলে আমাকে জানাবেন)

—০—

তিথির সঙ্গে চ্যাটিং চলছে শানের।তাদের এই ভার্চুয়াল আলাপচারিতা বেশ জমে উঠেছে, যদিও তিথির স্বভাবটা শানের কাছে আজও এক বড় রহস্য। মেয়েটা কখনো প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে কথা বলে, আবার কখনো এমনভাবে ইগনোর করে।এই রোদ, এই বৃষ্টির মতো তার মেজাজ পাল্টানো শানকে যেমন বিভ্রান্ত করে।

তিথির সম্মতি পেয়ে শান সাহস করে তাকে কল করল।

শান ফোনের স্পিকারে কান ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "হ্যালো!"

ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না। শান একটু নড়েচড়ে বসে আবার ডাকল, "হ্যালো মিস তিথি! শুনতে পাচ্ছেন?"

তিথি যে ওপাশে আছে এবং সব শুনছে, সেটা শান বেশ বুঝতে পারছে। হয়তো মেয়েটা লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে আছে অথবা স্রেফ দুষ্টুমি করছে। শানের ঠোঁটে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও নিচু গলায় বলল, "আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন তিথি? হ্যালো!"

এবার ওপাশ থেকে এক নমনীয় এবং স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "জ্বি!"

মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু তাতেই যেন শানের হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওই কণ্ঠের মায়াবী রেশ শানকে মুহূর্তেই মাতাল করে দিল। সে অবচেতনেই নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "কথা বলছেন না কেন?"

"কী বলব?" ওপাশের উত্তরটা একদম সংক্ষিপ্ত।

"কিছুই বলার নেই আপনার?"

"নাহ্!"

শান এবার এক বুক সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল, "আই লাভ ইউ!"

পরক্ষণেই ওপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শান কল্পনা করতে পারল, তিথি হয়তো এখন ফোনের ওপাশে মুখ লুকিয়ে মুচকি হাসছে। শান একটু অস্থির হয়ে বলল, "কী হলো, উত্তর দিন! একটু আগেই তো বললেন বলার কিছু নেই, এখন তো আমি বলার মতো একটা টপিক দিলাম, এবার জবাব দিন।"

তিথি তবুও চুপ। শান আবার বলল, "ম্যাডাম, কিছু কি বলবেন?"

"কী বলব?" তিথির সেই একই প্রশ্ন।

"সব কি শিখিয়ে দিতে হবে?"

তিথি এবার একটু দুষ্টুমির সুরে বলল, "শিখিয়ে দিলে কি আপনার খুব অসুবিধা হবে?"

"নাহ্! অসুবিধা হবে না। তবে তাহলে বলুন—আই লাভ

ইউ টু!" শানের কণ্ঠে তখন জয়ের সুর।

"নাহ্!"

"কী নাহ্?" শান অবাক।

"কিছু না।"

"বলবেন না?"

"নাহ্!"

"কেন?"

"কারণ... আমি বাসি না!" তিথির কথায় একটা গোপন হাসি লুকিয়ে ছিল।

শানের মনটা কিঞ্চিৎ দমে গেল। সে একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, "সত্যিই বাসেন না?"

"না!"

"ঠিক আছে!"

তিথি এবার একটু নড়েচড়ে বসল, "কী ঠিক আছে?"

"কিছু না"

--

শান তিথির সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। কাবাব মে হাড্ডি হওয়ার বিন্দুমাত্র শখ নেই সিফাতের। তাই সে ঘর থেকে বেরিয়ে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় সে এসে পৌঁছাল বাড়ির বিশাল ছাদটায়।

​ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতেই পেছনের দিকের দৃশ্যটা সিফাতের চোখে পড়ল। মূল দালানের ঠিক পেছনেই একটা বড়সড় টিনের ঘর। ঘরের সামনে বেশ খানিকটা খালি জায়গা। টিনের চাল ঘেঁষে একপাশে বিশাল এক বাগানবিলাস গাছ তার বেগুনি ফুলের ডালি নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সিফাত লক্ষ্য করল, সেই চত্বরে বেশ কিছু মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের আনাগোনা। চট করেই সে অনুধাবন করল, এটা নিশ্চয়ই কোনো মাদ্রাসা। ধর্মীয় কোনো বিষয়ের প্রতি সিফাতের কখনো তেমন একটা আগ্রহ নেই, কিন্তু বিকেলের এই আলো-ছায়ার দৃশ্যটা দেখতে বেশ লাগছিল।সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল, উদ্দেশ্য—একটা ছবি তোলা।

​"দয়া করে ছবি তুলবেন না! ওটা মহিলা মাদ্রাসা, ওদের পর্দা নষ্ট হবে।"

​হঠাৎ খুব কোমল আর শান্ত একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল পেছন থেকে। সিফাত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল এক তরুণীকে। পিঠময় এলিয়ে থাকা এক বেনুনি, চোখে চশমা, আর গায়ের রঙটা ঈষৎ শ্যামলা। থ্রি-পিস পরা মেয়েটির চেহারার মধ্যে এক অদ্ভুত ধরণের সারল্য আর ভোলাভালা ভাব লেগে আছে। মেয়েটিকে সিফাত চেনে না। আর চেনা বা জানার প্রতি তার কোনো আগ্রহও তৈরি হলো না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রেখে আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

​

মেয়েটি কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, "আপনি রুশদীর আপুর কি হন?"

​সিফাত উদাসীন গলায় জবাব দিল, "ঠিকঠাক সম্পর্কটা জানি না, তবে আমি রুশদীর হাজবেন্ডের ছোট ভাই!"

​"ওহ্, দেবর!"

​সিফাত আর কোনো উত্তর দিল না। নিজের খেয়ালেই মগ্ন রইল সে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে কথা শেষ হলে যে কেউ চলে যায়, কিন্তু মেয়েটি গেল না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সিফাতের সামনে। তার চোখের দৃষ্টিতে একরাশ বিস্ময়। সে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সিফাতের পোশাক-আশাক এবং অবয়ব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। সিফাত অবশ্য এই চাউনিতে অভ্যস্ত, তাই সে বিশেষ পাত্তা দিল না। তার মতো সুদর্শন ছেলের দিকে মেয়েরা একটু অন্যভাবে তাকাবে, ক্রাশ খাবে—এটাই স্বাভাবিক।

​মেয়েটি এবার আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি বিদেশি?"

​সিফাত কিছুটা চমকে উঠে বলল, "হুয়াট?"

​"মানে... আপনাকে দেখতে একদম বিদেশীদের মতো লাগে! পোশাক-আশাকও কেমন যেন অন্যরকম। আপনি কি আসলেই বিদেশি?"

​কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়। সিফাতের চেহারার গড়নে একটা আমেরিকান ধাঁচ আছে, তার ওপর তার পরনের ওয়েস্টার্ন পোশাকের স্টাইল। যে কেউ প্রথম দেখায় তাকে ভিনদেশি বলে ভুল করতেই পারে। সিফাত মৃদু হেসে ধীর গলায় বলল, "নো, আই অ্যাম বেঙ্গলি।"

​

"ওহ্!" মেয়েটির অল্প হাসল সে একটু এগিয়ে এসে বলল, "আমি মিতু। আর আপনার নাম কি?"

​সিফাত অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নিজের ডান হাতটা মিতুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "আমি সিফাত!"

​

কিন্তু হাতটা বাড়িয়ে দিতেই ঘটল এক বিপত্তি। সিফাতের হাত বাড়ানোর ভঙ্গি দেখেই মিতু যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল এবং সে তাড়াহুড়ো করে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর মিতু বুঝতে পারল যে ছেলেটি আসলে তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু মিতু ভীষণ লাজুক আর রক্ষণশীল প্রকৃতির মেয়ে। একজন পরপুরুষের সঙ্গে হাত মেলানো তার কাছে এক প্রকার অসম্ভব এবং ভয়ানক ব্যাপার। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে, কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে বুঝতে না পেরে কেবল জোরে জোরে মাথা নাড়িয়ে 'না' সূচক ইশারা করল। তারপর প্রায় দৌড়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে চলে গেল।

​মিতুর এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে সিফাত নিজে চরম বিস্মিত এবং স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সামান্য একটু হ্যান্ডশেক করতে চাওয়ায় একটা মেয়ে এভাবে পালিয়ে যেতে পারে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। সিফাত মনে মনে ভাবল, হাত বাড়াতেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে সে যদি শহরের আর পাঁচটা বন্ধুর মতো একটা 'ফ্রেন্ডলি হাগ' করতে যেত, তবে মেয়েটি নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করত

—০—

রাত এগারোটার কাছাকাছি কাছি।শেখ পরিবারের সঙ্গে ওরা সবাই খাবার শেষ করল।শান ও সিফাত শের রয়েছে একসঙ্গে।ফারাজ এর সঙ্গে রুশদীর নানা, মামা খালা, খালুরা গুরুতর মিটিং বসিয়েছেন।রুশদী তার নানু বাড়ির বাগানের পাশের পুকুর ঘাটটাতে এসে বসেছে।বাড়িতে লাগানো বড় বড় লাইট গুলোর জন্য পুরো কুকুরটাই দেখা যাচ্ছে।রুশদীর হাত কাপছে, বকুটা দুরুদুরু করছে তার বাবা আনাস হক এর নাম্বারে কল করতে।নাম্বার উঠিয়েছে কিন্তু কল বাটনে ক্লিক করতে পারছেনা।ফোনের স্পিকারটা বাড়িয়ে ক্লিক করল।কয়েকবার রিং হতেই কল ধরলো, রুশদী কেমন কেপে উঠলো,

"হে..হ্যালো..হ্যালো আব্বু!আব্বু! "

"হ্যালো কে!"

বাবার কন্ঠ শুনতেই ভেঙে পড়ল রুশদী, ভেতর থেকে কান্নাটা ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইলো।কতদিন পর বাবার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে সে!এই মানুষটাকে বড্ড ভালোবাসে সে, তাকে ছাড়া কি ভালো আছে তার প্রিয় বাবা?কিন্তু রুশদীর তো প্রতিদিনই মনে পড়ে বাবার কথা।বাবাকে ভুলতে পারে না কিছুতেই।বাবাকে কেন এত সে ভালোবাসে, সে নিজেও জানেনা।

"আ..আব্বু আমি, আমি তোমার রুশদী আব্বু!"

"তুই?ফোন করেছিস কিসের জন্য?"

"আব্বু কালকে তো আম্মু মৃ..মৃত্যু মৃত্যুবার্ষিকী।তুমি আসবে না?"

"নাহ্!ফোন রাখ তুই! "

"আব্বু আব্বু ফোন কেটো না। আব্বু আসো না কালকে একটু, আম্মুর কবরটা জিয়ারত করে যাও না। আমাকে না হয় ভালো না বাসে, আম্মুকে তো তুমি অনেক ভালবাসতে না?তোমার প্রিয় বউটার কবরটা একটু জিয়ারত করে যাও না আব্বু।তুমি আসলে আম্মু অনেক খুশি হবে।তুমি না আমার সব আবদার রাখতো আব্বু?এই আবদারটও রাখো না আব্বু, আম্মুকে একটু খুশি করো। তার কবরটা একটু জিয়ারত করে যাও।তুমি আ...!"

আনাস হকের ফোনটা বোধহয় কেড়ে নিলেন নাহিদা। গলা দাপিয়ে ফোনের ওপার থেকে বললেন,

"তুই ফোন করছিস কেন? হারামজাদি তোর জন্য সব হইছে,আমার ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে চাইছি তোর জন্য পারিনি। তোর জন্য আমাদের ব্যবসা হয় নাই।নিজে তো বিয়ে করে বেঁচে গেলি,আমাদের পথে বসিয়ে। তোকে ছাড়বো না আমি! দেখে নিব তোকে আমি!তোর জীবন নষ্ট করে দিব আমি।তুই মন্ত্রী ছেলেকে বিয়ে করে রাজরানী হয়ে থাকবি আর আমরা দাসত্ব করব! না না তা হবে না তোকে দেখে নিব আমি হা...! "

নাহিদাকে আজ পর্যন্ত রুশদী কোনদিনও কিছু সম্বোধন করে ডাকেনি।আজ ঢেকায় পড়ে তা করল,

"আন্টি, আন্টি আব্বুকে একটু বলেন না আসতে। একটু বলেন না।আম্মুর কবরটা একটু জিয়ারত করে যেতে বলেন না। আপ...আপনার টাকা লাগবে তো? ব্যবস্থা করে দিব! আপনার যত টাকা লাগবে আমি ব্যবস্থা করে দিব প্লিজ বলেন না... আ..!"

ফোন কেটে গেল ওপাশ থেকে। রুশদী পাগলের মত করে উঠলো,

"হ্যালো হ্যালো আব্বু.. হ্যালো! আব্বু কথা বলো না আব্বু!"

রুশদীর আবার আবারো ট্রাই করতে লাগলো নাম্বারে কল রিসিভ হচ্ছে না। শরীর কাঁপতে লাগলো, সে ওভার এক্সাইটেড হয়ে গেল। পাগলের মত করতে লাগলো,

"আব্বু ধরো! প্লিজ ধরো না ফোন! আব্বু...... আব্বু ফোনটা ধরো...ধরো ফোনটা আব্বু!"

বারবার চেষ্টা করার পরও যখন নাহিদাফোনটা ধরল না, রুশদীর বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। রাগে,কষ্টে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে নিজের চুলের মুঠি চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। তার সেই আর্তনাদ বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছাল না ঠিকই, কিন্তু শেখ বাড়ির প্রতিটি কোণায় সেই কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো।

​ছুটে এল সবাই। কিন্তু সবার আগে এসে রুশদীর পাশে এসে বসল ফারাজ। রুশদী ফারাজকে দেখামাত্রই নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না, সে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। বাড়ির অন্য সবাই পরিস্থিতিটা আঁচ করতে পারল; তারা জানত রুশদীর এই কষ্টের উৎস কোথায়। তাই তারা নীরবে জায়গাটি ছেড়ে চলে গেল।

ফারাজ হতভম্ব হয়ে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। একটু আগেও তো রুশদী ঠিক ছিলো, তার হঠাৎ এমন ভেঙে পড়ার কারণ ফারাজ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না।

রুশদীর ​কান্নার বেগ একটু কমলে ফারাজ নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "রুশদী! এই রুশদী! এমন কাঁদছ কেন তুমি? কী হয়েছে বলো আমাকে?"

​রুশদী কান্নারত কন্ঠে বলল, "আমার ভাগ্যটা এত খারাপ কেন?"

​"কী হয়েছে সেটা তো বলবে!"

​"অল্প বয়সে মা-ও মারা গেল, আর বাবাটাও... বাবাটাও আগের মতো ভালোবাসে না।"

​ফারাজ এবার বুঝতে একটু বুঝতে পারল রুশদীর এই কান্নার কারণ কি হতে পারে। সে আলতো করে রুশদীর চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, "দেখো, পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী নয়, সবারই সময় ফুরিয়ে আসে। আমাদেরও তো একদিন এই মায়ার পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে। এসব ভেবে কষ্ট পেও না। আর তোমার বাবার কথা ভেবে কেন কাঁদছ? আমরা তো আছি! এই বাড়িতে এসে দেখলাম তো, সবাই তোমাকে কতটা ভালোবাসে। সবাই তো তোমাকে আগলে রেখেছে, আমরা আছি তো,আমি আছি তো নাকি?"

​

রুশদী আরও জড়িয়ে ধরল ফারাজকে। ভাঙা গলায় বলল, "সবাই আছে, কিন্তু মা তো নেই। সবার ভালোবাসা আছে, কিন্তু বাবার ভালোবাসাটা নেই। আমি সবার ভালোবাসা চাই না, ফারাজ। আমি শুধু আমার আব্বুর একটুখানি ভালোবাসা চাই।সবাই আমাকে ঘৃণা করুক, অন্তত সবার ভালোবাসার বিনিময়ে আমি আমার আব্বুর ভালোবাসা চাই।আম্মুর মৃত্যুবার্ষিকী কালকে... আমি জানি, আব্বু আসবে না! ও আসবে না!"

​ফারাজ থমকে গেল। সে মৃদু স্বরে বলল, "তোমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল?"

​রুশদী মাথা নেড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, "হুম...।"

"আগে বলনি কেন? "

রুশদী পরনের থ্রি পিস এর ওড়না টা মুচড়ে ধরে ধরা গলায় বলল, "আমি এই দিনটা মনে রাখতে চাই না ... একদম চাই না। তবুও দিনটা অভিশপ্ত হয়ে পঞ্জিকার পাতায় ফিরে আসে। নানু বাড়ির মানুষগুলো আমাকে খুব ভালোবাসে, তারা এই দিনটাতে আমার সামনে টু শব্দটি করে না। কেউ আম্মুর কথা তোলে না এই ভয়ে—পাছে আমি কষ্ট পাই। কিন্তু দিনশেষে তো তিনি আমার মা ছিলেন! তাকে কি ভোলা যায়? ভোলা সম্ভব? কেউ যখন করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়, কিংবা আম্মুর কথা জিজ্ঞেস করে, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় আর নিঃস্ব মনে হয়। মনে হয় আমার পায়ের তলার মাটি নেই, মাথার ওপর আকাশ নেই। বুক চিরে এক তীব্র হাহাকার আর চাপা কষ্টগুলো সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। মা নেই—এই এক শব্দে আমার পুরো জীবনটা একটা বিশাল শূন্যস্থান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈশব থেকেই এই শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।"

রুশদীর চোখের নোনা জলে গাল দুটো ভিজে একাকার। ফারাজ এর আগে কখনো রুশদীকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি। যে মেয়েটা আজ মায়ের স্মৃতিতে একদম ছোট বাচ্চার মতো হাপুস নয়নে কাঁদছে। ফারাজ দুই হাতে রুশদীর গাল দুটো ধরে ওর মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। নিজের আঙুল দিয়ে চোখের লোনা জল মুছে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

"বাচ্চাদের মতো কান্না করো না রুশদী, শান্ত হও। এভাবে কান্না করলে কি মানুষটা ফিরে আসবেন? নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। তার চেয়ে বরং জায়নামাজে দাঁড়িয়ে তোমার মায়ের জন্য মন ভরে দোয়া করো, যেন আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। তুমি তো সবসময় নিজেকে খুব শক্ত মানুষ হিসেবে দাবি করো, তাহলে এখন এই অবুঝ বালিকার মতো কান্না কেন? এটা কি কোনো স্ট্রং পার্সনের লক্ষণ?"

রুশদী তখন আবেগের এক অতল সাগরে নিমজ্জিত। সে তার কান্নারত অবস্থাতেই ফারাজের হাতের কবজি দুটো আঁকড়ে ধরল। ছলছল চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মতো প্রশ্ন করল, "আম্মু কি আমাকে সত্যি ভালোবাসত?"

"হুম, বাসত। জগতের সব মা-ই তার সন্তানকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তোমাকেও বাসত, খুব ভালোবাসত।"

"মিথ্যা বলছেন আপনি!" রুশদী হঠাৎ ছটফট করে উঠল।

"আমি সত্যি বলছি রুশদী।"

রুশদী এবার কান্নার তোড়ে ভেঙে পড়ে বলল, "তাহলে আম্মু কেন আমাকে একা রেখে চলে গেল? আমার বয়স তখন কতই বা ছিল, বড়জোর ১১ কি ১২! ওই টুকু বয়সে একজন মেয়ের তো তার মাকে সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয়। ঠিক যখন আমার মাথার ওপর ছায়া দরকার ছিল, তখনই তিনি কেন হারিয়ে গেলেন? আম্মু আমাকে ভালোবাসত না, তাই এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেছে!"

"তুমি ভুল বুঝছো রুশদী। মৃত্যু তো মানুষের হাতে থাকে না। তোমার মায়ের হাতে যদি নিজের প্রাণ রক্ষা করার সামান্যতম উপায় থাকত, তবে তিনি কখনোই তোমাকে এই আগুনের মোহনায় ফেলে একা চলে যেতেন না। বিশ্বাস করো, মালাকুল মউতের সঙ্গে যুদ্ধ করে হলেও তিনি তোমার সঙ্গে থেকে যেতেন।"

এই মুহূর্তে যুক্তি বা উপদেশের চেয়ে রুশদীর জন্য একটা আশ্রয় খুব বেশি প্রয়োজন। যে চলে গেছে সে তো আর ফিরবে না, কিন্তু যে বেঁচে থেকে প্রতিদিন তিলে তিলে মরছে, তাকে তো টেনে তোলা দরকার।

ফারাজ তাকে নিজের প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার অর্ধাঙ্গিনীকে।রুশদী যেন মরুভূমির বুকে এক চিলতে শীতল ছায়া খুঁজে পেল। সে ফারাজকে দুই হাতে খামচে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

ফারাজ এবার আর তাকে থামাল না। বরং রুশদীর অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। আলতো করে তার কপালে একে দিল এক দীর্ঘ ও গাঢ় ভালোবাসার চিহ্ন—একটি চুম্বন। আবারও তাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে পিষে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"কাঁদো রুশদী! যতটা ইচ্ছে কাঁদো, যতক্ষণ মন চায় নিজেকে উজাড় করে দাও। তোমার ভেতরের সবটুকু আক্ষেপ, সবটুকু হাহাকার আর বছরের জমাট বাঁধা বিষাদ আজ এই নোনা জলের সঙ্গে ধুয়ে মুছে যাক। আজ নিজেকে একদম হালকা করো। আমি চাই না কালকের সূর্য ওঠার পর তোমার মনে আর কোনো মেঘ জমে থাকুক।"

ফারাজ রুশদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আরও গভীর স্বরে উচ্চারণ করল, "আজ প্রাণভরে কেঁদে নাও, কারণ আমি দ্বিতীয়বার আমার অর্ধাঙ্গিনীর চোখে পানি সহ্য করতে পারব না—আমার রুমাইসা!"

--

আজ রুশদীর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ফারাজ ভেবেছিল, গতকাল রাতে যেভাবে মেয়েটা ভেঙে পড়েছিল, আজকেও বোধহয় সারাদিন কাঁদবে। কিন্তু তার সব ভাবনা ভুল প্রমাণ করে রুশদী আজ ভীষণ স্বাভাবিক। নিজেকে সে শক্ত করে ধরে রেখেছে। ভেতরের হাহাকার আর আর্তনাদগুলো কাউকে বিন্দুমাত্র টের পেতে দেয়নি। আসলে সে চায় না কেউ তাকে অসহায় নজরে দেখুক, কিংবা বারবার সান্ত্বনা দিতে এসে মায়ের মৃত্যুর ক্ষতটাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিক।

শেখ নিবাসের পেছনের পারিবারিক কবরস্থানেই শায়িত আছেন রুশদীর মা। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাড়িতে বড় কোনো আয়োজন করা হয়নি। লোক ডেকে খাওয়ানো এই পরিবারের পছন্দ নয়। তাই বাড়ির পেছনের মাদ্রাসাসহ এলাকার বেশ কয়েকটি এতিমখানায় বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতিম শিশুদের মন থেকে আসা দোয়াই তো আসল!

নানা ব্যস্ততায় সারাদিনটা কেটে গেল। রুশদী দীর্ঘ সময় মায়ের কবরের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেছে। শুধু সে একাই নয়, ফারাজসহ শেখ পরিবারের প্রায় সবাই পালা করে সেখানে গিয়ে বসেছিল।তবে একে একে সবাই উঠে এলেও রুশদী নড়েনি।রাত অব্দি সে একাই মায়ের কবরের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করে গেছে।

তেলাওয়াত শেষ করে রুশদী পবিত্র কোরআন শরিফটি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মায়ের স্মৃতি হাতড়ে তার চোখ জোড়া টলমল করে উঠল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন বেশ গভীর। হঠাৎ শের পা টিপে টিপে এসে রুশদীর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল। ফারাজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে। রুশদী চমকে পেছন ফিরে তাকাল,

"তুমি!"

রুশদী আলতো করে নাক টানল। প্রিয় মমের চোখে পানি দেখে শের সইতে পারল না। এক হাত দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, "তোমারও মা নেই মম? জানো, তোমার আসার আগে আমারও মা ছিল না। কিন্তু আমি তো কাঁদতাম না!"

"তুমি অনেক স্ট্রং বয়! মম তোমার মতো স্ট্রং নয়, মম খুব দুর্বল।"

"পাপা যেমন আমার জন্য তোমাকে মম এনে দিয়েছে, তোমার পাপা তেমন কাউকে এনে দেয়নি?"

রুশদী বাচ্চাদের মতো বলল, "দিয়েছিল! কিন্তু আমার কপালটাই খারাপ। বাবা এনে দিলেও সেই মা আমাকে ভালোবাসেনি। তোমার পাপা তোমাকে কত ভালোবাসে! কিন্তু জানো শের, আমার বাবা আমাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসে না। মাঝে মাঝে মনেই হয় উনি আমার জন্মদাতা বাবা না।"

"সমস্যা নেই, আজ থেকে আমিই তোমার বাবা! আমি তোমাকে একদম নিজের বাবার মতো ভালোবাসব।"

রুশদী অবাক হয়ে শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে অবুঝ বাচ্চাদের মত জিজ্ঞেস করল, "তুমি আমার বাবা?"

"হুম! পাপা মাঝে মাঝে আমাকে বাবা বলে ডাকে। বলে, ছেলেরা নাকি বড় হয়ে বাবা হয়। এখন আমি ছোট, তাই আমি পাপার ছেলে। কিন্তু আমি যখন বড় হব আর পাপা বুড়ো হয়ে যাবে, তখন পাপা আমার ছেলে হয়ে যাবে! পাপা যেভাবে আমাকে আদর বড় করেছে, পাপা বুড়ো হলে আমিও তাকে ঠিক সেভাবে দেখে রাখব। আমি নিজে টাকা ইনকাম করে এনে পাপাকে খাওয়াব, যেমনটা পাপা এখন আমার জন্য করে। তাহলে হলাম না আমি তোমারও বাবা? তুমি যখন বুড়ো হবে, তোমাকেও তো তখন আমারই দেখে রাখতে হবে,নাকি?"

একটা ছোট্ট নিষ্পাপ শিশু! সে কি আদৌ বোঝে এই সামান্য কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা দায়িত্বের ওজন কতটা ভারী?রুশদী এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে ভাবল, কত বড় একটা ভুল সিদ্ধান্তই না সে নিতে যাচ্ছিল! ফারাজের একটা সন্তান আছে—কেবল এই অজুহাতে সে ফারাজকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিল না। ইস! বিয়েটা না করলে জীবনের কত বড় একটা হীরার টুকরো সে হারিয়ে ফেলত!

এমন একটা ছেলেকে কি ভালো না বেসে থাকা যায়? রুশদী অপলক চোখে শের এর দিকে তাকিয়ে রইল। কী অদ্ভুত মায়াকাড়া চেহারা ওর! দেখলেই বুকের ভেতর কেমন যেন এক পরম আপন অনুভূতির জন্ম নেয়। ছেলেটা যদি তার নিজের গর্ভের সন্তান হতো, তবে বোধহয় মন্দ হতো না। সে যে কতটা ভাগ্যবতী, তা ভাবতে ভাবতেই তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবে এবার চোখের এই নোনা জল মায়ের বিয়োগব্যথার নয়, বরং এক পরম প্রাপ্তির আনন্দের। কান্নার নোনা জলের মাঝেই রুশদীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে জল আর ঠোঁটে হাসি।

রুশদী পরম মমতায় শেরকে এক হাতে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। এরপর কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত মায়ের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলল, 'আম্মু, দেখো, এটা আমার ছেলে। তোমার নাতি! আম্মু, তোমার মেয়েরও এখন একটা নিজস্ব সংসার আছে, একটা সুন্দর ছেলে আছে। শুধু ছেলে কেন, তোমার মেয়ের এই ছোট্ট ছেলেটা তো এখন তোমার মেয়ের বাবাও বনে গেছে! আমার শেষ বয়সে নাকি তোমার এই পাজি মেয়েটাকে ও-ই আগলে রাখবে! দেখছ আম্মু, তোমার মেয়ে আজ কত ভাগ্যবতী!'

দূর থেকে ওদের এই দৃশ্যটা দেখে ফারাজের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। রুশদী মেয়েটা তার ছেলেকে বড্ড ভালোবাসে—একদম নিজের জানের চেয়েও বেশি! মেয়েটা কেন তার সৎ ছেলেকে এতটা ভালোবাসে, ফারাজ তার কোনো কারণ জানে না। অন্য কোনো মেয়ে হলে এই সন্তানকে এভাবে আপন করে মেনে নিত কি না, তাও তার জানা নেই। আসলে এত শত জটিল হিসাব-নিকাশ জানার তার কোনো প্রয়োজনও নেই। তার স্ত্রী তার সন্তানকে ভালোবাসে, আর তার সন্তানও তার নতুন মাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি আপন ভাবে—ফারাজের জন্য এই সত্যটুকুই যথেষ্ট। তারা তিনজন মিলে এখন একটি পরিপূর্ণ ও সুখী পরিবার!

এদিকে শের রুশদীকে আরেকটু অবাক করে দিল। সে বড়দের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে রুশদীর চোখের পানিটুকু আলতো করে মুছে দিল। তারপর আদুরে ধমকের সুরে বলল, "উফ! আমার এই মেয়েটাকে নিয়েও আর পারি না! এত কান্নাকাটি করতে পারে মেয়েটা! চোখ মোছো বলছি, নইলে কিন্তু বাবা খুব রাগ করব, হুম!"

রুশদী এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসেই ফেলল সে। নিজের চোখের কোণের অবশিষ্টাংশ জলটুকু মুছতে মুছতে বলল, "সরি বাবা! আর একদম কাঁদব না, এই লক্ষ্মী মেয়ের প্রমিস!"

—০—

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন