#চলো_নিরালায়
#তেজরিন_উম্মীদ
৪
🚫কোন প্রকার কপি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ🚫
মাঝে কেটে গেল কিছু দিন। সেই বিশ্রী দিনটার পর রুশম আর মেহনাজের পথ আটকে দাঁড়ায়নি। রাস্তার মোড়ে কোনো ভবঘুরে বখাটের মতো তাকে মেহনাজের অপেক্ষায় থাকতেও দেখা যায়নি। জীবনের এই ছন্দহীনতায় রুশমের হঠাৎ অনুপস্থিতি এই ‘পৃথিবী’ নামক নরকে মেহনাজকে এক চিলতে স্বস্তি এনে দিয়েছে। মনে হচ্ছে, চলার পথের বিশাল এক পাথর যেন নিজ থেকেই সরে গেল। প্রতিদিনকার সেই বিরক্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না ভেবে মেহনাজ মনে মনে বেশ খুশিই হলো।
তবে স্বস্তি থাকলেও শান্তি নেই। মেহনাজের বর্তমান পরিস্থিতি দিন দিন করুণ হয়ে উঠছে। হাতে গোনা কয়েকটা টাকা—তা দিয়েই দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হচ্ছে তাকে। রান্নার ব্যবস্থা নেই বলে বাইরের শুকনো খাবারই এখন ভরসা। কখনও রুটি-কলা, কখনও বা পাউরুটি-জেলি খেয়ে দিন পার হচ্ছে।
ছোট্ট উমাইজা এখন আর মায়ের বুকের দুধ খায় না। মেয়েটা এখন ফিডারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় মেহনাজের একদিকে যেমন সুবিধে হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে দুশ্চিন্তা। ঘরে গ্যাস নেই, তাই রান্না করার উপায় নেই। মেহনাজের সম্বল বলতে একটা ইলেকট্রিক জগ। ওটা মূলত পানি গরম করার জন্য হলেও এখন ওটাতেই উমাইজার দুধ জ্বাল দিতে হয়। এই যন্ত্রটুকু না থাকলে মেয়েটার খাবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হতো মেহনাজকে।
কিন্তু নতুন আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুধের খরচ। দিনে প্রায় এক কেজির মতো দুধ লাগছে উমাইজার জন্য, যার দাম নব্বই টাকা। অথচ মেহনাজের পুঁজি বলতে গেলে শেষের পথে। আগে উমাইজাকে খিচুড়ি বা ভাত খাওয়ানো যেত বলে দুধের খরচটা অত গায়ে লাগত না, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
'মেহনাজ মর্তুজা' নামের মেয়েটার জীবনে ‘সুখ’ শব্দটা বড্ড দামী, বড্ড দুর্লভ। অনেক আগেই সেই সুখ তাকে বিদায় জানিয়ে অজানায় পাড়ি জমিয়েছে। এখন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন উমাইজা আমাল—তার কলিজার টুকরো মেয়ে। এই একটি প্রাণ ছাড়া তার আপন বলার মতো আর কেউ নেই।
মেহনাজের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অভাবের সুক্ষ্ণ হিসাবে। আগামীর অন্ন জুটবে কি না, কিংবা মেয়ের ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে—এসব ভাবতে ভাবতে তার দু চোখের পাতা এক হয় না। ওর বয়সী মেয়েরা যখন বাবা-মায়ের আদরে আবদার করে টাকা ওড়ায়, মেহনাজ তখন হন্যে হয়ে আগামীর এক মুঠো খাবারের সংস্থান খুঁজতে ব্যস্ত। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!
--
চৈত্র মাসের আকাশ যেন আজ আগুনের কুণ্ডলী। সকাল আটটা বাজতেই সূর্য তার সমস্ত প্রতাপ নিয়ে পূর্বাকাশে জেঁকে বসেছে। চারপাশ খাঁ খাঁ করছে এক অসহ্য গুমোট গরমে; মনে হচ্ছে তপ্ত পিচঢালা পথগুলো এখনই গলতে শুরু করবে। এই বৈরী আবহাওয়াকে সঙ্গী করেই ঘুমন্ত উমাইজাকে ঘরে রেখে মেহনাজ বেরিয়ে পড়ল তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে।
বাসা থেকে ল্যাবরেটরি স্কুলে পৌঁছাতে বড়জোর পাচ-দশ মিনিটের পথ। মাঝপথে পড়ে সেই পরিচিত গলি আর হলদেটে রঙের ‘স্মরণিকা' ভবন। আজ সেই ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেহনাজের বুক চিরে এক চিলতে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। গত কয়েকদিন ধরে সেই উটকো বখাটে যুবকটা আর পথ আগলে দাঁড়ায়নি। মনে মনে প্রার্থনা করল, অশুভ সেই ছায়াটা যেন আর কোনোদিন তার সামনে না আসে।
ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে ধর্মতত্ত্ব পড়ায় মেহনাজ। কিন্তু সিনিয়র সেকশনের ধর্ম শিক্ষিকা চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় ইদানীং তাকে এসএসসি ব্যাচসহ বড়দের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এই বাড়তি দায়িত্বটুকু তাকেই বইতে হবে। টানা তিনটি ক্লাস শেষ করে যখন সে স্টাফ রুমে এসে ঢুকল, তখন শরীরটা অবসাদে ভেঙে পড়ছে।
পেটটা একদম খালি। গত ক'দিন ধরে দানাপানি কিছু পেটে পড়েনি, কেবল নামমাত্র শুকনো খাবার খেয়ে কোনোমতে প্রাণটা টিকিয়ে রেখেছে। এই ভ্যাপসা গরমে ক্ষুধার্ত পেটে একনাগাড়ে এতগুলো ছাত্রছাত্রীকে পড়াতে গিয়ে সে ভীষণ ক্লান্ত। তৃষ্ণায় গলাটা শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে আছে। স্টাফ রুমে আর্টস টিচার রুনা ম্যাম ছাড়া আর কেউ নেই; তিনি নিবিষ্ট মনে বাচ্চাদের টেস্ট পেপার দেখছেন।
মেহনাজ টলমল পায়ে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল। খালি পেটে অত কথা বলায় মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে, চারপাশটা ঝাপসা ঠেকছে তার কাছে। ঘরে অন্য কোনো পুরুষ নেই দেখে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে নেকাবটা একটু আলগা করল সে। কয়েক ঢোক পানি পেটে পড়তেই নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি আসতে চাইল। অসহ্য এক শারীরিক যন্ত্রণাকে সামলে নিয়ে সে স্থির হয়ে বসার চেষ্টা করল। তার ফ্যাকাশে চোখে-মুখে জমে থাকা ক্লান্তির ছাপগুলো লুকানোর আর কোনো জায়গা নেই।
আবারও নেকাবে মুখ ঢেকে ব্যাগটা ডেস্কের ওপর রেখে তার ওপর মাথাটা এলিয়ে দিল মেহনাজ। হাতে মাত্র ত্রিশ মিনিটের বিরতি। এরপর আবার ক্লাসের সেই চেনা যান্ত্রিকতা শুরু হবে। এই স্বল্প সময়ে ক্লান্ত মেহনাজ একটুখানি বিশ্রামের মাঝে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।হঠাৎ নীরবতা ভেঙে রুনা ম্যাম খাতা দেখতে দেখতেই বলে উঠলেন, "মেহনাজ, শুনেছো? আমাদের স্কুলে কিন্তু নতুন টিচার এসেছেন।"
মেহনাজের শরীরে বিন্দুমাত্র কথা বলার শক্তি অবশিষ্ট নেই। তবুও উত্তর না দেওয়াটা অভদ্রতা, বিশেষ করে রুনা ম্যাম তার চেয়ে অন্তত পনেরো বছরের বড়। চোখ বন্ধ রেখেই কোনোমতে অস্ফুট স্বরে মেহনাজ বলল, "না ম্যাম, জানতাম না।"
এরপর কেটে গেল প্রায় পঁচিশটি মিনিট। মেহনাজের শ্রান্ত দু’চোখে তন্দ্রা নেমে এসেছে। ঠিক তখনই রুনা ম্যাম আবারও বলে উঠলেন, "এই যে দেখো, ইনিই আমাদের নতুন টিচার..."
মেহনাজের খুব আলসেমি লাগছিল, তবুও সৌজন্যের খাতিরে সে চোখ মেলে তাকালো না। শুধু অনুভব করল, সামনের ডেস্কে চেয়ার টেনে কেউ একজন বসলেন। পরক্ষণেই একটা গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে এল, "হ্যালো ম্যাম!"
রুনা ম্যাম সহাস্যে উত্তর দিলেন, "হ্যালো! কেমন কাটল প্রথম ক্লাস? আপনার তো এটাই প্রথম টিচিং প্রফেশন না, তাই না?"
নতুন শিক্ষক বিনয়ের সাথে বললেন, "জি ম্যাম, শিক্ষকতা পেশায় আজই আমার প্রথম দিন।"
কণ্ঠস্বরটা কেন যেন মেহনাজের বুকের ভেতর একটা চেনা অস্বস্তি জাগিয়ে তুলল। সে তড়িঘড়ি মাথা তুলে তাকালো। কিন্তু সামনে যা দেখল, তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ে মেহনাজের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম!
সামনে বসা এই যুবককে আর কোনোভাবেই সেই রাস্তার বখাটে ছেলেটার মতো লাগছে না। পরনে মার্জিত সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট; আর গলায় ঝুলছে ল্যাবরেটরি স্কুলের টিচারদের অফিশিয়াল আইডি কার্ড। রুশম! সে এখানে কী করছে? সে কি সত্যিই এখানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে?
মেহনাজের মনের তোলপাড় থামিয়ে দিয়ে রুনা ম্যামই পরিচয় করিয়ে দিলেন, "মেহনাজ, ইনি রুশম। আমাদের স্কুলের ইকোনমিক্স আর ইংলিশের নতুন টিচার। আজই জয়েন করেছেন।"
রুনা ম্যামের এই সাধারণ তথ্যটুকু মেহনাজকে আরও বড় ধাক্কা দিল। রুশমের মতো বিত্তবান পরিবারের একটা ছেলে মাত্র দশ হাজার টাকা বেতনের এই সাধারণ স্কুলে কেন চাকরি নিতে আসবে? মেহনাজ যতটুকু জানে, এলাকায় রুশমদের পরিবারের ব্যাপক নামডাক। এমন এক রাজকীয় পরিবারের ছেলে এখানে এই সামান্য বেতনে কেন পড়ে আছে—তা তার মাথায় খেলছে না।
"আচ্ছা আপনারা পরিচিত হন, আমার ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে," বলে রুনা ম্যাম ফাইল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পুরো স্টাফ রুমে এখন শুধু মেহনাজ আর রুশম। রুশম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেহনাজের দিকে। মেহনাজও কিছুক্ষণ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে নজর সরিয়ে নিল। ডেস্কে রাখা স্টুডেন্টদের ক্লাস টেস্টের খাতা দেখার ভান করে সে নিজেকে ব্যস্ত করে তুলল।
রুশম এখানে কেন এসেছে, কেন সে তার আভিজাত্য ছেড়ে এই সাধারণ শিক্ষকতার পথ বেছে নিল—এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইল না মেহনাজ। তার জীবন সে যা খুশি করুক, মেহনাজের তাতে কী? কিন্তু অবাধ্য মনটা বারবার কু ডাকছে—এই আসাটা কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
স্টাফ রুমে মেহনাজ রুশমকে এমনভাবে এড়িয়ে গেল, যেন তারা দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত। রুশমের অস্তিত্বকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে মেহনাজকে এতটা নিস্পৃহ আর শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে রুশম নিজে থেকেই নীরবতা ভাঙল।
“আমাকে এখানে দেখে খুব বেশি অবাক হচ্ছেন বুঝি?” রুশমের কণ্ঠে হালকা কৌতুকের সুর।
খানিক বাদে নিরাসক্ত উত্তর এল মেহনাজের তরফ থেকে, “আপনাকে আমি চিনিই না, তো অবাক হওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন?”
“এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?” রুশম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
মেহনাজ আজ বড় বেশি শান্ত। গত দিনের মতো তার চোখে-মুখে সেই চিরচেনা তেজের লেশমাত্র নেই। সে বাচ্চাদের খাতা দেখতে দেখতেই ধীরস্বরে বলল, “যার আমার জীবনে মনে রাখার মতো কোনো ভূমিকাই নেই, তাকে ভুলে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক।”
রুশম এবার একটু ঝুঁকে এল, “তা আমার ভূমিকাটা আপনার জীবনে কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?”
মেহনাজ খাতা থেকে চোখ না তুলেই কঠিন গলায় বলল, “ফালতু কথা কম বলবেন। এখানে আমরা কেবলই সহকর্মী। আপনার সাথে রসালো গল্প করার মতো সময় বা রুচি আমার নেই।”
“কেন, সহকর্মীরা কি এখানে কথা বলতে পারে না?”
“এই প্রতিষ্ঠানে আমি আপনার সিনিয়র টিচার। তাই ভালো হয় যদি আমাকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়ে কথা বলেন।”
রুশম মৃদু হাসল, “হিসাব করলে আপনি আমার চেয়ে অন্তত তিন-চার বছরের ছোটই হবেন। তো ছোটদের সম্মান দিয়ে কথা বলাটা কি একটু বেশি ফর্মালিটি হয়ে যায় না?”
মেহনাজ এবার বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল,তবুও আজ সে শান্ত,
“বলেছিলাম না ফালতু কথা কম বলতে?”
“কম বলতে বলেছেন, বলতে তো মনে করেননি! ” রুশমের কণ্ঠে একরোখা জেদ।
মেহনাজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “সত্যি করে বলুন তো, এখানে চাকরি নেওয়ার আপনার আসল উদ্দেশ্যটা কী?”
রুশম রহস্যময় হাসল, “সত্যিটা বললে তো আপনি আবার নীতিবাক্য আর হাদিস খুলে বসবেন, লাইফ নিয়ে বয়ান শুরু করবেন। তাই ওটা না হয় গোপনই থাক।”
মেহনাজের বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস দলা পাকিয়ে এল। ভেবেছিল উপদ্রবটা বুঝি বিদায় হয়েছে, অথচ এখন রাস্তার সেই বিরক্তি স্কুলের চার দেয়ালের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তার জীবনের বিষাক্ত বাধাগুলো কেন তাকে কোনোভাবেই মুক্তি দিচ্ছে না?
মেহনাজ বিদ্রুপের সুরে বলল, “রাস্তার বখাটেপনা এখন স্কুলে করতে এসেছেন, তাই তো?”
“একদম ঠিক ধরেছেন! বলতে পারেন আপনার সাথে একটু আধটু টাংকি মারতেই আসা। আমার কাজের মাধ্যমে যদি নিজেকে আপনার কাছে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারি, তবেই আমি সার্থক।”
রাগে মেহনাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে শান্ত রইল। সে ঠিক করল, এই লোকের কোনো কথায় সে আর প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। মেহনাজ চুপ করে গেলে এই লোক হয়তো নিজ থেকেই পিছু ছাড়বে।
বিরতির ঘণ্টা বাজতেই পরবর্তী পিরিয়ড শুরু হলো। মেহনাজ আর কোনো উত্তর না দিয়ে খাতাগুলো গুছিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। রুশমও দমবার পাত্র নয়, সে-ও পিছন পিছন করিডোরে বেরিয়ে এল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে সেই চেনা বাঁকা হাসি। করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া মেহনাজকে সে পেছন থেকে ডাক দিল,
“এই যে মেহনাজ, শুনুন! দাঁড়ান তো একটু।”
মেহনাজ থামল না। তার উদাসীনতা দেখে রুশম আবারও গলা চড়িয়ে ডাকল, “এই যে মেহনাজ!”
মেহনাজ তবুও নিজের গতি কমাল না।বরং নিজের গতি বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে হাটা শুরু করে দেয়। রুশম ভালো করেই জানে, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। সে এবার একটু বাঁকা পথ ধরল,রুশম খুব মধুর স্বরে টেনে টেনে ধাকল,
“ও মেহনাজ মাস্টারনি, একটু দাঁড়ান না”
এবার মেহনাজ রাগে চোখ গরম করে করিডোরেই থেমে গেল। রুশম দ্রুত হেঁটে এসে তার সামনে দাঁড়াতেই সে ফেটে পড়ল। মেহনাজ দাঁড়াত না, কিন্তু রুশমের ডাকের ধরন ছিল বড়ই অদ্ভুত। সে জানত, এখন না দাঁড়ালে লোকটা সবার সামনে আরও আজেবাজে নামে ডাকাডাকি শুরু করবে। এটি স্কুল; চারদিকে উৎসুক চোখ। বর্তমানের ছেলেমেয়েরা এমনিতেই খুব চতুর, দুই শিক্ষককে একসাথে কথা বলতে দেখলেই হয়তো রসালো কোনো গুজব রটিয়ে দেবে।
বাধ্য হয়ে দাঁড়াতে হলেও মেহনাজের কণ্ঠে ছিল চরম বিরক্তি, “কী হয়েছে আপনার? কমনসেন্স বলতে কি কিছু নেই? ভুলে গেছেন এটা একটা স্কুল?”
রুশমের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ঝুলে রইল। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত রাগছেন কেন?”
সেই হাসিটা মেহনাজকে আরও জ্বালিয়ে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সমস্যাটা কী আপনার?”
“আমার আবার কী সমস্যা?” রুশম যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“তবে এভাবে ডাকছেন কেন?”
“এমনি! আপনাকে এভাবে ডাকতে আমার ভালো লাগে, তাই।”
মেহনাজ এবার খানিকটা রুদ্রমূর্তিতে বলল, “আপনাকে না বলেছিলাম আমার সামনে আর কোনোদিন না আসতে?”
রুশম এবার একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করল, “আপনিই তো বলেছিলেন, জীবনে কিছু একটা করতে পারলে যেন আপনার সামনে আসি।”
“তা কী করছেন আপনি?” মেহনাজের স্বরে বিদ্রুপ।
“দেখতেই তো পাচ্ছেন, চাকরি করছি।”
“আপনার এই কথা আমি বিশ্বাস করব?”
“অবিশ্বাসের কী আছে?”
মেহনাজ উপহাসের সুরে বলল, “যার বাবার পেট্রোল পাম্পের ব্যবসা, সে মাসে মাত্র দশ হাজার টাকার জন্য এখানে খাটবে? হাস্যকর! এটা আপনার নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চার, তাই না? বড়লোকের ছেলে কোনোদিন কষ্ট করেননি, তাই এখন চাকরি-চাকরি খেলা খেলতে নেমেছেন। তা আপনার এই অ্যাডভেঞ্চার আপনিই করুন, দয়া করে আমাকে আমার কাজটা শান্তিতে করতে দিন!”
আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করল না মেহনাজ। কিন্তু সে পা বাড়াতেই পেছন থেকে আবারও সেই ডাক, “ও মেহনাজ, একটু শুনুন তো!”
মেহনাজ এক ঝটকায় পেছনে ঘুরল। চোখ রাঙিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “কী?”
মেহনাজের এই রুদ্ররূপ দেখে রুশমের হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আলতো স্বরে বলল, “কিছু না! রাগলে আপনাকে আসলে দারুণ সুন্দর লাগে...!”
“ফালতু লোক একটা!” বিরবির করে গজগজ করতে করতে হনহনিয়ে চলে গেল মেহনাজ।
মেহনাজ চোখের আড়াল হতেই রুশমের হঠাৎ মনে পড়ল, এখন তো তারও ক্লাস। মনে হতেই বিরক্তির একটা কালো ছায়া তার কপালে দলা পাকিয়ে উঠল। জীবনে কোনোদিন শিক্ষকতা করেনি সে। বিত্তবান পরিবারের সন্তান হওয়ায় ভার্সিটি জীবনে কখনও টাকার জন্য টিউশনিও করতে হয়নি, যদিও শখের বশে কয়েকজনকে বিনামূল্যে পড়াত। এই লেদা বাচ্চাদের সামলানো যে কতটা ঝক্কির কাজ, তা ভেবেই তার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। তবে এতসব বিরক্তি আর ঝামেলার মাঝেও রুশমের মনে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এই স্কুলের চার দেয়ালে তার বন্দি হওয়ার উদ্দেশ্য মাত্র একটাই—যাতে প্রতিদিন এই জেদি আর তেজি মেয়েটার দেখা পাওয়া যায়।মেহনাজের ক্লাসের দিকে চেয়ে এক চিলতে হাসি নিয়ে রুশমও পা বাড়াল তার নিজের ক্লাসরুমের দিকে।
দশম শ্রেণির ইংরেজি পিরিয়ড চলছে। ক্লাসে কোনো শিক্ষক না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা যেন আড্ডার আসর বসিয়েছে; পুরো রুমটাকে প্রায় মাছের বাজার বানিয়ে ফেলেছে তারা। ঠিক সেই মুহূর্তে গম্ভীর পদক্ষেপে ক্লাসে প্রবেশ করলেন নতুন ইংরেজি শিক্ষক—ইমতিয়াজ রুশম। ধবধবে সাদা শার্ট আর মার্জিত চেহারার রুশমকে দেখে মুহূর্তেই হট্টগোল থেমে গেল। ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে নিজের পরিচয় শেষ করে সে সরাসরি মূল পাঠে চলে গেল।
রুশম আজ দেখতে চায় এই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের ভিত্তিমূল কতটা মজবুত। তাই সে সবাইকে 'পার্টস অফ স্পিচ'-এর আটটি প্রকারভেদের সংজ্ঞা লিখতে দিল। পুরো ক্লাস যখন খাতায় কলম চালাতে ব্যস্ত, তখন একটি মেয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে আছে। তার নাম তন্মনা।
তন্মনার বান্ধবী শিখা তাকে কনুই দিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এই দেখ, নতুন স্যার কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম, তাই না?"
তন্মনা কোনো সাড়া দিল না। শিখা নাছোড়বান্দা, সে আবারও ধাক্কা দিয়ে বলল, "আরে দেখ না একবার!"
বিরক্তিতে মুখ দিয়ে একটা 'চ' সূচক শব্দ উচ্চারণ করে তন্মনা সামনে তাকালো। কিন্তু সামনের ডেস্কে দাঁড়ানো সাদা শার্ট পরা মানুষটিকে দেখামাত্রই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চড়কগাছ হওয়ার দশা! এ কী দেখছে সে? তার ভাইয়া এখানে কী করছে?
ঘটনার আকস্মিকতা সামলাতে না পেরে তন্মনা ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্লাসের সবার উৎসুক দৃষ্টির পরোয়া না করেই সে রুশমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, "ভাইয়া! তুই এখানে?"
পুরো ক্লাসে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল। শিখা ভয়ে তন্মনার জামা টেনে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, "এই পাগল হয়েছিস? স্যারকে 'তুই' করে বলছিস কেন?"
তন্মনা এবার যেন আরও নিশ্চিত হয়ে উঁচু গলায় বলল, "আরে এটা তো আমার নিজের ভাই! ভাইয়া, তুই এখানে কী করছিস? তুই কি সত্যিই এই স্কুলে চাকরি নিয়েছিস?"
রুশম কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে এমন এক নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তন্মনার দিকে তাকালো, যেন সে এই মেয়েটিকে এর আগে কোনোদিন দেখেইনি। গম্ভীর গলায় সে উত্তর দিল, "এই যে মেয়ে, একজন শিক্ষকের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই নুন্যতম কমনসেন্স কি তোমার নেই? সরাসরি 'তুই' করে কথা বলছো! কে তোমার ভাইয়া?"
তন্মনা নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছিল না। রুশম এক মুহূর্ত না থেমে কঠোর স্বরে আরও যোগ করল, "আমি এখানে এখন শুধুই তোমার টিচার। ক্লাসে টিচারকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখো। বসো এখন!"
রুশমের এই অভাবনীয় আচরণে তন্মনা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তন্মনার ফর্সা মুখটা অপমানে মুহূর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। নিজের আপন ভাইয়ের এমন ব্যবহারে তার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে; অথচ ক্লাসের সবাই এখন তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করছে। অপমানের তীব্রতায় শরীরটা ঘেমে নেয়ে উঠল তার। দাঁতে দাঁত চেপে সেই গ্লানিটুকু গিলে নিয়ে সে ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়ল।
রুশম যতক্ষণ ক্লাস নিল, তন্মনা এক মুহূর্তের জন্যও তার দিক থেকে চোখ সরাল না—দৃষ্টিতে রাজ্যের বিষ আর রাগ। ওদিকে রুশম মনে মনে হিহি করে হাসছে। ভাই-বোনের সম্পর্কটা তাদের বরাবরই এমনই—সুযোগ পেলেই একে অপরকে ল্যাং মারতে ওস্তাদ, যেন জন্মজন্মান্তরের জাত শত্রু! কিন্তু রাগের মাঝেই তন্মনার মাথায় একটা খটকা ঘুরপাক খাচ্ছে। যে ভাইয়াকে বাবা-মা হাজার বুঝিয়েও কোনো চাকরিতে ঢোকাতে পারল না, যার চাকরির নাম শুনলেই অ্যালার্জি হতো, সে আজ মাত্র দশ হাজার টাকা বেতনের এই স্কুলে পড়ে আছে? অবিশ্বাস্য! চিন্তার সাগরে ডুব দিল তন্মনা, সবকিছু যেন তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ রুশমের কর্কশ কণ্ঠস্বর তার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে দিল, “এই যে মেয়ে, দাঁড়াও! বলো তো, Interjection কাকে বলে?”
তন্মনার দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্নটা করায় সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক পুরো শূন্য। এত সহজ একটা প্রশ্নের উত্তরও তার মাথায় আসছে না। সে বলদের মতো হা করে দাঁড়িয়ে রইল।
তন্মনাকে নিরুত্তর দেখে রুশম এবার আরও কঠোর হয়ে উঠল, “এসএসসি ক্যান্ডিডেট হয়ে এই সামান্য প্রশ্নের উত্তর পারো না? বের হও ক্লাস থেকে! যাও, গেটের সামনে গিয়ে দুই কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। এক্ষুণি যাও!”
তন্মনা নড়ছে না দেখে রুশম আবারও ধমকে উঠল, “কথা কানে যাচ্ছে না? জলদি বের হও!”
উপায়ান্তর না দেখে চরম অপমানে তন্মনা ক্লাসের বাইরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়াল। মনে মনে সে তার ভাইকে অন্তত শ’খানেক গালি দিয়ে ফেলল। সে ভালো করেই জানে, রুশম পুরোনো কোনো ঝাল মেটানোর জন্য আজ এই সুযোগটা নিয়েছে। দাঁত কিড়মিড় করে তন্মনা বিড়বিড় করল, ‘কুত্তার বাচ্চা! শুধু একবার বাড়ি চল, তারপর তোর বারোটা বাজাচ্ছি। আমাকে সবার সামনে অপমান করার মজা তোকে হাড়াহাড়িতে বুঝিয়ে দেবো!’
চলবে...