#চলো_নিরালায়
#তেজরিন_উম্মীদ
পর্ব ৫
চৈত্রের তপ্ত দ্বিপ্রহর। মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুনের পিণ্ড হয়ে ঝুলে আছে। স্কুলের জুনিয়র সেকশন ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে, করিডোরগুলো এখন নিঝুম, কেবল তপ্ত বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। ১২টার কাঁটা পেরিয়ে সময়টা যখন খাঁ খাঁ রোদে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখন মেহনাজ প্রিন্সিপালের দরজায় এসে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা তার দুরুদুরু করছে, কপালে জমেছে সূক্ষ্ম ঘাম। বড্ড প্রয়োজন কিছু অগ্রিম টাকার।তা চাইতেই এসেছে।
দরজার ওপাশে তাকাতেই মেহনাজের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রিন্সিপাল সুমা ম্যামের সাথে বেশ আয়েশ করে কথা বলছে ইমতিয়াজ রুশম। মেহনাজ একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ধরল। সে আজীবন বিপদ এড়িয়ে শান্তিতে বাঁচতে চেয়েছে, অথচ নিয়তি বারবার তাকে এমন সব পরিস্থিতির মুখে এনে দাঁড় করায় যেখান থেকে পালানোর কোনো পথ থাকে না। রুশম তার জীবনের সেই মেঘের মতো, যা রোদ হাসতে দিলেও বারবার ছায়া হয়ে পথ আগলে দাঁড়ায়। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে—কেন জানি এই লোকটা তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল মেহনাজ। সুমা ম্যামের সামনের চেয়ারটিতে সে বসল অত্যন্ত কুণ্ঠার সাথে। পাশের চেয়ারে বসা রুশমের তীক্ষ্ণ এবং উৎসুক দৃষ্টি মেহনাজের অস্বস্তিকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিকাবের আড়ালে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইল সে। এমন একজনের সামনে টাকার কথা বলতে নিজের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত লজ্জা এবং জড়তা তাকে গ্রাস করছিল। মেহনাজ কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।
পরক্ষণেই নিজের বাস্তব পরিস্থিতির কথা মনে পড়ল তার। এই মুহূর্তে তার অভাবের কাছে লজ্জা অতি তুচ্ছ। লজ্জা দিয়ে তো আর ক্ষুধার অন্ন বা প্রয়োজন মেটানো যাবে না। লজ্জা বেঁচে কি টাকা পাওয়া যাবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের সব দ্বিধাকে একপাশে সরিয়ে রেখে সে নরম গলায় বলল,"ম্যাম, আমাকে কি আজ কিছু অগ্রিম বেতন দেওয়া সম্ভব? একটু খুব জরুরি দরকার ছিল!"
সুমা ম্যাম ডেস্কের ওপর হাত রেখে কিছুটা চিন্তিত মুখে তাকালেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন,"আজকেই তো দেওয়া পসিবল না মেহনাজ। তুমি যদি আমাকে অন্তত দুই-একদিন আগে জানাতে, তবে হয়তো ব্যবস্থা করা যেত।"
মেহনাজের কণ্ঠে এবার আকুতি ঝরে পড়ল, "ম্যাম, আমার আজকেই বড্ড দরকার ছিল!"
সুমা ম্যাম অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বললেন, "আই অ্যাম সরি মেহনাজ! আজকে অফিসের ক্যাশ ক্লোজ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছো তো?"
"ম্যাম, যদি একটু দেখা যেত..." মেহনাজ আবার অনুরোধ করতে চাইল।
সুমা ম্যাম—"আচ্ছা মেহনাজ আমি দেখছি। আজ হবে না, কিন্তু কালকে ইনশাআল্লাহ।"
মেহনাজ মৃদু হাসল,একটুকু আশা পেয়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের আলোচনার মাঝখানে অনাহূতভাবে নাক গলালো রুশম। সে যেন এই সুযোগটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। মেহনাজের দিকে তাকিয়ে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে বলল, "ম্যাম, যদি খুব দরকার হয়, তবে চাইলে আমার কাছ থেকে নিতে পারেন। পরে সুবিধা মতো ফেরত দিয়ে দিলেই হবে।"
মেহনাজ এক বুক আশা নিয়ে এসেছিল, ভেবেছিল অন্তত আজকের বিপদটা কাটবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।পাশাপাশি রুশমের এই অযাচিত উপকারের প্রস্তাব তাকে অপমানে নীল করে তুলল। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ছলে লোকটা যেন তার আত্মসম্মানে আঘাত করল। নিকাবের আড়ালে মেহনাজের মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক কিন্তু শীতল কণ্ঠে বলল,"তার কোনো প্রয়োজন নেই রুশম সাহেব। লাগবে না।"
তপ্ত চৈত্র বাতাসের মতোই মেহনাজের মনটাও এক লহমায় রুক্ষ হয়ে উঠে।সে অনুভব করল, অভাবের চেয়েও বোধহয় মানুষের অযাচিত দয়া সহ্য করা বেশি কঠিন।রুশমের অযাচিত উপকারের প্রস্তাব মেহনাজের কানে অপমানের তপ্ত শলাকার মতো বিঁধল।রুশম ঘুরে তাকিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, "আরে ইতস্তত হচ্ছেন কেন ম্যাম! আমরা তো কলিগ, আমার কাছ থেকে ধার নিতেই পারেন...!"
মেহনাজ কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতাই ছিল চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। সে সুমা ম্যামের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "প্রয়োজন নেই রুশম সাহেব। আসছি ম্যাম, আসসালামু আলাইকুম।"
দ্রুত পায়ে মেহনাজ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল রুশম। সেই দৃষ্টিতে ছিল অধিকারবোধ আর এক অদ্ভুত তৃপ্তি। হঠাৎ সুমা ম্যামের কণ্ঠস্বর তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।
"এই, এদিকে তাকা তো!"
রুশম ফিরল। দেখল সুমা ম্যাম তার দিকে মিটমিটে চোখে তাকিয়ে আছেন, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। রুশম ধরা পড়ে যাওয়ার মতো এক গাল হেসে বলল, "এভাবে তাকাচ্ছ কেন ফুপি?"
সুমা ম্যামের মুখটা পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তুই কিন্তু কাজটা ঠিক করছিস না রুশম। মেহনাজকে আমি যতটুকু চিনি, মেয়েটা জীবনে অনেক সাফার করেছে। ওর অতীতটা বড় কষ্টের।"
রুশম কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, "তো... আমি কী করছি?"
"এই স্কুলে চাকরি নিয়েছিস কেন? তোর মতো বিত্তবান
ঘরের ছেলের কি এখানে সামান্য শিক্ষকতা করার কথা?" সুমা ম্যামের গলায় সন্দেহের সুর।
রুশম কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, "আহ্ ফুপি! তুমি আবার এসব কথা তুলছ কেন?"
"মেহনাজ মেয়েটা সত্যিই অনেক ভালো," সুমা ম্যাম যেন নিজের মনেই বললেন।
"আমি কি বলেছি ও খারাপ?" রুশমের কণ্ঠে এবার প্রচ্ছন্ন এক টান।
"রুশম, ও সত্যিই খুব সাধারণ আর ভালো একটা মেয়ে..."
রুশম এবার খুব নিচু স্বরে, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, "ভালো দেখেই তো... পিছে পড়ে আছি!" কথাটি এতই আস্তে বলল যে সুমা ম্যামের কানে তা পৌঁছাল না।
সুমা ম্যাম সাবধান করে দিয়ে বললেন, "রুশম, তুই এমন কোনো কাজ করবি না যাতে মেয়েটা কষ্ট পায়। ওর জীবনটা এমনিতেই ওলটপালট হয়ে আছে।"
"আমি কেন ওকে কষ্ট দিতে যাব ফুপি? আমি কি অতটাই খারাপ?"
সুমা ম্যাম হাল ছাড়লেন না, "চাকরিটা কেন নিলি সেটা বললি না তো? ভাই আর ভাবি কি জানে যে তুই এখানে পড়ে আছিস?"
"জানে না, কিন্তু সময় হলে ঠিকই জেনে যাবে।" রুশমের চোখে তখন একরোখা সংকল্প।
"রুশম!" সুমা ম্যামের কণ্ঠে এবার মৃদু ধমক।
"কী ফুপি?"
"তুই কি আসলেই ওকে ভালোবাসিস, নাকি এটা তোর কোনো নতুন জেদ?" সুমা ম্যামের সরাসরি প্রশ্নে রুশম খানিকটা থমকে গেল, তারপর জানালার বাইরের তামাটে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি দিল।
--
চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ মেহনাজের মাথার ওপর যেন আগুনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ল্যাবরেটরি স্কুলের সরু গলিটা দিয়ে সে যখন বাসার দিকে হাঁটছে, পিচঢালা রাস্তা থেকে ওঠা তপ্ত আঁচ তার পায়ে এসে লাগছে।কাধের ব্যাগটা বুকের কাছে জাপটে ধরে সে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মেহনাজের হাত তো সেই কবে থেকেই শূন্য, আজ বড্ড বেশি প্রয়োজন ছিল অগ্রিমের। সুমা ম্যাম যখন না করে দিলেন, তখন মনে হয়েছিল পায়ের তলার মাটি বুঝি সরে যাচ্ছে। তবুও একটা ক্ষীণ আশা—কাল তো পাবেন! এই যে পাওয়ার একটা নিশ্চয়তা মিলল, এটাই এই মুহূর্তে তার কাছে অনেক বড় সান্ত্বনা। সামান্য আশাটুকুও মেহনাজের মতো লড়াকু মেয়েদের টিকে থাকার রসদ যোগায়।
তবে আজকের তপ্ত দুপুরের রোদের চেয়েও বেশি তাকে পুড়িয়েছে রুশমের ওই অদ্ভুত উপস্থিতি। লোকটা কেন হঠাৎ এই সাধারণ ল্যাবরেটরি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকের চাকরি নিল, সেটা কিছুতেই মেহনাজের মস্তিষ্কে ধরা দিচ্ছে না। মাথার ভেতর কত শত নেতিবাচক চিন্তা জট পাকাচ্ছে। যে লোকটা কিছুদিন আগেও রাস্তায় বখাটেপনা করে তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, সে আজ হঠাৎ মার্জিত পোশাক পরে কলিগ সেজে সামনে এসে দাঁড়ালো! এসব বড়লোকের দুলালদের তো টাকার অভাব নেই, তবে এই চাকরির পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। মেহনাজের অভিজ্ঞ মন বলছে, এই নতুন নাটকের শিকার হয়তো সে নিজেই। এসব বখাটেরা কোনো সহজ-সরল মেয়েকে উত্যক্ত করার নতুন নতুন ফন্দি বের করতে ওস্তাদ।
মেহনাজ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মাথাটা ঝাকালো। না, ওই লোকটার কথা ভেবে সে নিজের অমূল্য সময় নষ্ট করবে না। রুশম মরুক কি বাঁচুক, সে কি কারণে এখানে এল কিংবা তার কোটি টাকা আছে কি না—তাতে মেহনাজের কী? সে নিজের জীবনের যুদ্ধে একাই লড়ছে, সেখানে রুশমের মতো আগাছার কোনো স্থান নেই। সে মন থেকে রুশমের স্মৃতিটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল।
হাঁটতে হাঁটতে সে তার সাইড ব্যাগের চেইনটা খুলল। ভেতরে হাতড়ে কয়েকটি কুঁচকানো নোট বের করল সে। রাস্তার মোড়ে প্রতিদিন এক বৃদ্ধ লোক বসে থাকেন, যার কাছ থেকে প্রতিদিন মেহনাজ তার ছোট্ট মেয়ে উমাইজার জন্য টাটকা গরুর দুধ কিনে নিয়ে যায়। লোকটা সকাল থেকে দুপুর অবধি বসেন। কিন্তু আজ নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে মেহনাজ দেখল, সেখানে কেউ নেই। খাঁ খাঁ রোদে জায়গাটা জনশূন্য। হয়তো আজ দুধ বিক্রি হয়ে গেছে বলে আগেভাগে চলে গেছেন, নয়তো শরীর খারাপের কারণে আসতেই পারেননি।
মেহনাজ একটা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাকাটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। আজ আর টাটকা দুধ পাওয়া হলো না, ফেরার পথে কোনো দোকান থেকে প্যাকেট দুধই কিনে নিতে হবে। তার হাতে অবশিষ্ট বলতে ওই কয়েকটা ভাঙতি নোটই পড়ে আছে। তবে মনের কোণে একটা শান্তি আছে—আজকের দিনটা কোনোমতে পার হয়ে যাবে, আর কাল তো টাকা পাওয়ার আশা আছেই। এই নিশ্চিত আশাটুকু বুকে নিয়েই সে তপ্ত বাতাস মাড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াল।জনশূন্য নিঝুম গলিটায় কেবল তার পায়ের শব্দ আর তপ্ত বাতাসের হাহাকার। হঠাত সেই নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে ঝড়ের বেগে ধেয়ে এল একটি পালসার বাইক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চোখের পলকে মেহনাজের সাইড ব্যাগটা ছোঁ মেরে নিয়ে গেল বাইকের পেছনে বসা ছিনতাইকারী। আকস্মিক সেই ঝটকায় ভারসাম্য রাখতে পারল না মেহনাজ; তপ্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ল সে।
শরীরের সমস্ত ভার হাতের তালু আর কনুইয়ের ওপর পড়ায় চামড়া ছিলে গিয়ে কাঁচা রক্ত উঁকি দিল। কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে মেহনাজের বুকের ভেতর এক ভয়ানক আর্তনাদ দানা বেঁধে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রাস্তার ওপর পড়ে রইল। যখন হুশ ফিরল, তখন বুঝল—তার শেষ সম্বলটুকু হাতছাড়া হয়ে গেছে। ব্যাগে খুব বেশি টাকা ছিল না ঠিকই, কিন্তু ওই সামান্য কটি নোটই ছিল আজ তার মেয়ের একমুঠো অন্নের নিশ্চয়তা। উমাইজার রাতের দুধ আর আজকের খাবারের স্বপ্নটা ওই বাইকের ধোঁয়ার সাথে মিলিয়ে গেল।
টাকার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে গেল তার যাপনের এক টুকরো স্বস্তির।ডিউটির সময় বাড়িতে একা থাকা ছোট্ট মেয়েটাকে নজরে রাখার জন্য অনেক কষ্টে চার হাজার টাকা জমিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মার্টফোন কিনেছিল সে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অন্তত নিশ্চিন্ত থাকতে পারত মা জননীটা। সেই আশ্রয়টুকুও আজ ছিনতাই হয়ে গেল। হাত থেকে ছিটকে পড়া পুরোনো বাটন ফোনটার ব্যাক কভার আর ব্যাটারি খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাস্তার একপাশে।
মেহনাজ রাস্তার ধুলোবালির মধ্যেই বসে পড়ল। তার চোখের কোণগুলো নোনা জলে জ্বলে উঠল, কিন্তু সে প্রাণপণে সেই জল আটকে রাখল। নোনা জলগুলো আজ বড় অবাধ্য, বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু এখন কাঁদার সময় নয়, এখন ভাবার সময়—আজ রাতে উমাইজা কী খাবে? শূন্য হাতে কোন মুখে সে বাড়ি ফিরবে? আল্লাহর ওপর তার অগাধ বিশ্বাস, কিন্তু বারবার এমন কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আজ সে বড় ক্লান্ত। মনে মনে প্রশ্ন জাগল—❝হে দয়াময়, আর কত ধৈর্য ধরলে তোমার রহমতের দেখা মিলবে?❞
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল; হয়তো এই পরীক্ষার ওপারেই কোনো মহত্তর প্রতিদান লুকিয়ে আছে।
কাঁপা কাঁপা হাতে মেহনাজ বাটন ফোনটার টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে জোড়া লাগাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে নিজের শরীরের ওপর কোনো এক পুরুষের স্পর্শ অনুভব করল। কেউ একজন তাকে মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। অচেনা পুরুষের সেই স্পর্শ মেহনাজের সর্বাঙ্গে এক হিমশীতল কাঁপুনি তুলে দিল। আতঙ্কে আর আড়ষ্টতায় তার হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল।রুশম তখন মেহনাজের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে পেছনে আসছিল।যখন দেখল বাইকের সেই ঝাপটায় মেহনাজ তাল সামলাতে না পেরে পিচঢালা তপ্ত রাস্তায় ছিটকে পড়েছে, তখন তার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কোনো কিছু না ভেবেই সে দৌড়ে এল। আতঙ্ক আর ব্যাকুলতায় তার মাথায় তখন কেবল একটাই চিন্তা—মেয়েটা কি খুব চোট পেল?
রুশম মেহনাজের বাহু ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে অস্থির গলায় বলে উঠল,"আরে উঠুন! অনেক বেশি ব্যথা পাননি তো আপনি? সব ঠিক আছে? হাত-পা কি ছিলে গেছে খুব? চলুন, আমি আপনাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাচ্ছি!"
কিন্তু মেহনাজের কান অবধি রুশমের এই উদ্বিগ্ন প্রশ্নগুলোর একটিও পৌঁছাল না। তার মস্তিষ্ক তখন কেবল একটা তথ্যে স্থির হয়ে আছে—একজন পর-পুরুষ তাকে স্পর্শ করেছে! অভাবের তাড়না, ছিনতাইয়ের শোক আর হাড়ভাঙা ক্লান্তির ওপর এই অযাচিত স্পর্শ যেন মেহনাজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলল। সে তড়িৎ গতিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। রুশমের ব্যাকুলতাকে এক ঝটকায় ছিন্ন করে দিয়ে সে সজোরে এক ধাক্কা দিল তাকে। রুশম টাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে যেতেই মেহনাজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল তার গালে।
নির্জন নিঝুম দুপুরে সেই চড়টির শব্দ যেন প্রতিধ্বনিত হলো। রুশম গালে হাত দিয়ে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে পাথরের মতো বসে রইল। তার বিস্ময়ের সীমা নেই। কয়েক মুহূর্ত সে স্থানু হয়ে তাকিয়ে রইল মেহনাজের দিকে। সে থাপ্পড় কেন খেল? উপকার করতে আসার প্রতিদান কি এটাই?
মেহনাজ সেখানে এক মুহূর্ত সময় ব্যয় করার প্রয়োজন মনে করল না।রাগে, কষ্টে ফুঁসতে ফুঁসতে সে হনহনিয়ে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তার ভেতরের অভিমান তখন আগুনের মতো জ্বলছে—জীবন তাকে দুহাত ভরে কষ্ট দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে সে কারোর করুণা বা অসম্মান মেনে নেবে না।
এদিকে তপ্ত রাস্তার ওপর গালে হাত দিয়ে বসে থাকা রুশমের ঘোর তখনও কাটছে না। চড়টা বেশ জোরের সাথেই লেগেছে। গালটা লাল হয়ে টিপটিপ করছে। রুশম এক অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করল—"আজকাল দেখছি মানুষের উপকারও করা যাবে না! সাহায্য করতে এসে উল্টো একটা থাপ্পড় খেয়ে বসলাম... বাহ! দুনিয়াটা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? ভালো মানুষের কোনো দামই নেই আজকাল। আসলাম উদ্ধার করতে, আর উপহার পেলাম চড়! বাহ রে আমার কপাল, আর বাহ রে আমার উপকারের প্রতিদান!"
--
তন্মনা বাড়ির ভেতর পা রাখা মাত্রই যেন একটা শান্ত পরিবেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। প্রতিদিনের মতোই এই সময়টাতে লতা রান্নাঘরের তপ্ত উনুনের সামনে ব্যস্ত থাকেন। স্কুল ড্রেস পরা তন্মনার মধ্যে আজ কোনো ক্লান্তি নেই, বরং এক অদ্ভুত উত্তেজনা। ঘরে ঢুকেই হাতের ভারি স্কুল ব্যাগটা সজোরে সোফার ওপর ছুড়ে মারল সে। কোনোদিকে না তাকিয়েই চিৎকার করতে করতে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে।
"আম্মা! ও আম্মা! কই গেলে তুমি? আম্মা...!"
তপ্ত উনুনের আঁচে ঘেমে নেয়ে একাকার লতা তখন খুন্তি নাড়ছিলেন। মেয়ের এমন গগনবিদারী চিৎকার শুনে মেজাজটা তার সপ্তমে চড়ল। রান্নাঘর থেকেই গলা উঁচিয়ে উত্তর দিলেন তিনি—"কী হয়েছেটা কী? অমন ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছিস কেন? এখনও মরে যাইনি, বেঁচে আছি তো!"
তন্মনা ততক্ষণে রান্নাঘরের দরজায় এসে হাজির। দুই কোমরে হাত রেখে একরোখা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল,"আম্মা, ভাইয়া কই? ভাইয়াকে দেখছ কোথাও?"
ছেলের নাম শুনে লতার কপালে ভাঁজ পড়ল। বিরক্তি আর বিতৃষ্ণায় মুখটা কুঁচকে উত্তর দিলেন,"ওই জানোয়ারটা কোথায় আছে আমি কী করে বলব? ওর কি কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে কোনোদিন? সেই কাকভোরে কোনো এক মরণ-যাত্রায় বের হয়েছে, সকাল থেকে একবারও তো চোখের দেখা পেলাম না।"
তন্মনার চোখেমুখে তখন রাজ্যের উত্তেজনা। সে রহস্যময় স্বরে আবার প্রশ্ন করল,"তুমি জানো ভাইয়া আসলে ইদানীং কী করছে?"
লতা এবার হাতের খুন্তিটা কড়াইয়ের একপাশে রেখে জ্বলন্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। ঘাম মুছতে মুছতে ঝাঁঝালো গলায় বললেন,"তোর কি আমাকে সবজান্তা মনে হয়? দুনিয়ার সব খবর কি আমি বগলদাবা করে বসে থাকব? আমার আর কোনো কাজ নেই, তোরা কে কোথায় কার মাথা ভাঙছিস আর কী অপকর্ম করে বেড়াচ্ছিস—এই খবর নিয়ে আমি সারাদিন পড়ে থাকব? অত সময় নেই আমার!"
তন্মনা দমল না। বরং মায়ের বিরক্তি মাখা উত্তর শুনে সে বিড়বিড় করে বলল,"তার মানে তুমি সত্যিই জানো না ভাইয়া কি করে বেড়াচ্ছে?"
লতা বেগমের ধৈর্যের বাঁধ তখন ভাঙো ভাঙো। তপ্ত উনুনের আঁচ আর মেয়ের হেঁয়ালি—দুটো মিলে তার মেজাজকে সপ্তমে চড়িয়ে দিয়েছে। হাতের খুন্তিটা উঁচিয়ে একপ্রকার শাসানোর ভঙ্গিতে তিনি গর্জে উঠলেন, "বেশি প্যাঁচাল পাড়লে এই গরম খুন্তির একটা বাড়ি কপালে বসিয়ে দেব! যা বলার সরাসরি বল, নয়তো চোখের সামনে থেকে ভাগ। এমনিতেই শরীর-মন জ্বলে যাচ্ছে, তার ওপর ফালতু কথা অসহ্য লাগছে!"
"রাগ করছ কেন আম্মা? তুমি জানো, তোমার গুণধর বড় ছেলে আমাদের স্কুলে চাকরি নিয়েছে? আজ থেকে সে আমাদের স্কুলের ইংলিশ টিচার!"
কথাটা শোনামাত্র লতা বেগমের হাতের নড়াচড়া থেমে গেল। মনে হলো যেন রান্নাঘরের নিস্তব্ধতা চিরে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তিনি চোখ জোড়া কপালে তুলে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন। কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা সরল না তার মুখে। তারপর অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, "আমার সাথে ফাইজলামি করবি না তনু! ফালতু রসিকতা করতে আসলে সজোরে একটা থাপ্পড় মারব। যা এখান থেকে, স্কুল ড্রেস পাল্টে নিজের ঘরটা গোছা গে। ঘরের যে দশা করেছিস, দেখে পিত্তি জ্বলে যায়!"
"আরে বিশ্বাস করো আম্মা! আমি কোনো মজা করছি না। ভাইয়া সত্যিই আজ আমাদের স্কুলে জয়েন করেছে। শুধু তাই নয়, আমাদের ক্লাসে ঢুকে সে লেকচারও দিয়েছে। এমনকি আমাকে চেনার পরও কোনো ছাড় দেয়নি, বরং পড়া না পারায় কান ধরিয়ে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল!"
তন্মনার কণ্ঠে এবার অপমানের সাথে সত্যের তেজ ঝরে পড়ল।
লতা বেগম তবুও মানতে নারাজ। তিনি আবারও ঝামটে উঠে বললেন, "আবারও বলছি, তনু, আমার সাথে ফালতু ইয়ার্কি করবি না। ভালো কথা কানে নিস না?"
তন্মনা এবার বিরক্ত হয়ে বলল, "তোমাকে কি আমার জোকার মনে হয় যে গরমে দাঁড়িয়ে জোকারগিরি করব? ভাইয়া সত্যিই ওখানে টিচার হিসেবে ঢুকেছে। বিশ্বাস না হলে ওই তো ভাইয়া আসছে, ওকেই জিজ্ঞেস করো।"
লতা বেগম বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, "তোর বাপে কত কসরত করল বড় কোম্পানিতে ঢোকানোর জন্য, সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। বড় বড় সাহেবদের চাকরি ছেড়ে সে এখন তোদের চুনোপুঁটি স্কুলে মাস্টারি করতে যাবে? ও তো কাজই করতে চায় না, তার ওপর এই ছোটখাটো চাকরি? আমায় রাগানোর জন্য এসব বলছিস? কুত্তার বাচ্চা কোথাকার...!"
ঠিক সেই মুহূর্তে কলিংবেলের তীক্ষ্ণ "টুং টুং" শব্দটা বেজে উঠল।
"ওই তো তোমার আদরের রাজপুত্র এসেছে। এখন নিজের চোখেই দেখে নাও আর তাকেই জিজ্ঞেস করো সে কোথায় কী কীর্তি করে আসছে।"তন্মনার অনুমান এক চুলও নড়চড় হলো না। এই কাঠফাটা রোদে দরজার ওপাড়ে রুশম ছাড়া আর কারোরই উদয় হওয়ার কথা নয়। যেই ভাবা সেই কাজ—দরজা খোলা মাত্রই রুশমকে সামনে পেয়ে তন্মনা যেন এক ক্ষ্যাপা বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকালের সেই ক্লাসের অপমান আর সবার সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার জ্বালা তার ভেতরে তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল। সেই অপমানের শোধ নিতে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রুশমের ওপর চড়াও হলো।
দরজার চৌকাঠেই শুরু হয়ে গেল কুরুক্ষেত্র। দুই ভাই-বোনের রণমূর্তি দেখে মনে হচ্ছিল যেন আজ বাড়িতে কোনো মহাযুদ্ধের এলান হয়েছে। তন্মনা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে রুশমের গায়ে কিল-ঘুষি বসাতে লাগল আর মুখে তুবড়ি ছুটল গালমন্দ—"ওরে কুত্তা, পাজি বান্দর! তুই আমাকে কান ধরিয়ে রাখছিস? নিজের বোনকে সবার সামনে এভাবে অপমান করতে তোর বুক কাঁপল না? আজ তোকে আস্ত রাখব না আমি। তোকে মেরে একদম ভর্তা বানিয়ে ফেলব, কুত্তার বাচ্চা!"
তন্মনা রুশমের শার্টের কলার চেপে ধরে তার পরিপাটি চুলগুলো খামচে ধরে ইচ্ছেমতো টানতে শুরু করল। রুশমও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সেও বোনের বিনুনিটা শক্ত করে ধরে টান মারল, মুহূর্তেই তন্মনার মাথার সাজগোজ সব লন্ডভন্ড হয়ে একাকার হয়ে গেল। দুজনের মধ্যে যেন এক আদিম ইঁদুর-বিড়ালের লড়াই বেঁধে গেল। রুশম হাত পা চালিয়ে নিজের আত্মরক্ষা করার পাশাপাশি তন্মনার পিঠে কয়েকটা ধপধপ করে মোক্ষম ঘা বসিয়ে দিল।
মারপিটের চোটে দুজনেরই দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম, অথচ থামার কোনো লক্ষণ নেই।লতা বেগম রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। দুই ভাই-বোনের রণচণ্ডী মূর্তি আর চিৎকারে পাড়া মাথায় ওঠার জোগাড়। তিনি দরজায় এসে দুই হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন, "এই কুত্তার দল! এখানল দাঁড়িয়ে এসব কী নাটক শুরু করেছিস? লোক হাসাবি তোরা? বাড়ির ভাড়াটিয়ারা তোদেরএভাবে দেখলে কী ভাববে শুনি? আর তনু, তোর আস্পর্ধা তো কম না, বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তুলছিস?"
তন্মনা হাপাতে হাপাতে চুল ঠিক করতে করতে বলল, "তোমার গুণধর ছেলে যে আমাকে মারল, সেটা দেখলে না? আমার পিঠ একদম ভেঙে দিয়েছে!"
রুশমও কম যায় না, শার্টের কলার ঠিক করতে করতে পাল্টা জবাব দিল, "তুই আগে শুরু করলি কেন? মারবি তুই, আর আমি কি সাধু হয়ে বসে থাকব?"
লতা বেগম মাঝখানে দাঁড়িয়ে ধমক দিলেন, "চুপ! একদম চুপ! আগে ঘরের ভেতরে আয় তোরা, তারপর সব দেখছি।"
দুজনেই গজগজ করতে করতে ভেতরে ঢুকল। রুশম বেশ ভদ্র সেজে সোফায় গিয়ে বসল, যেন একটু আগে কিছুই হয়নি। লতা বেগম শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রুশমের পরনের পরিপাটি ফরমাল পোশাক আর ইন করা শার্ট দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "রুশম, এমন সাহেব সেজে কোথায় গিয়েছিলি তুই?"
পাশ থেকে তন্মনা ফোঁস করে উঠল, "হ্যাঁ আম্মা, জিজ্ঞেস করো ওরে! তোমার ছেলের কীর্তি শুনলে নিজের কানকেই বিশ্বাস করবে না।"
লতা বেগম তনুর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন, "তুই থামবি? আমি কথা বলছি না? বেশি ফোড়ন কাটলে একটা থাপ্পড় খাবি।" তনু মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
রুশম এবার খুব শান্ত স্বরে লতার দিকে তাকিয়ে বলল, "একটা চাকরি নিয়েছি আম্মা। এই পেত্নির স্কুলেই জয়েন করেছি আজ।"
কথাটা শুনে লতা বেগম যেন আকাশ থেকে পড়লেন। অবিশ্বাসে কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, "চাকরি মানে? কী বলছিস এসব? তুই তো চাকরি করতে চাইছিলি না, বড় কোম্পানিগুলো কত অফার দিল! এখন আবার এই ছোটখাটো স্কুলে কেন?"
রুশম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, "এমনি।"
"মানে কী? এমনি মানে কি? তুই কোনো কারণ ছাড়া এই আট-দশ হাজার টাকার চাকরিতে সময় নষ্ট করবি? তোর বাবার কত বড় ব্যবসা পড়ে আছে, আর তুই ওই ভাঙাচোরা স্কুলে মাস্টারি করবি? কাল থেকে আর যাবি না ওখানে!"
"না আম্মা, আমি এই চাকরিটাই করব।তুমিই তো বলেছিলে কিছু করতে। "
"রুশম!" লতা বেগমের চিৎকার ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। "তুই আমার কথার ওপর কথা বলছিস? তোকে আমরা কিছু একটা করতে বলেছি বলে কি তুই যা খুশি তাই করবি? যেহেতু তোর কাজ করার শখ হয়েছে, কাল থেকে তোর বাবার সাথে অফিসে যাবি। সব কাজ বুঝে নিবি।"
"না আম্মা, আমি অন্য কোথাও যাব না। আমি আপাতত এই স্কুলেই থাকছি।"
চলবে.....