ফন্ট সাইজ:
থিম:
মৃগতৃষ্ণা

১৯তম পর্ব

লেখক: মেহরুমা নূর

#মৃগতৃষ্ণা----১৯ (কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ 🚫)

#লেখিকা-মেহরুমা নূর

★সুখের সময়কাল এতো ক্ষনিকের জন্য কেন হয়? কেন সুখ মায়া ধরিয়ে আবার হারিয়ে যায়? এইতো একটু আগেও জীবনের সবচেয়ে সুখী ব্যাক্তি মনে হচ্ছিল নিজেকে। কিন্তু ভাগ্য আবারও পঙ্খির সাথে এ কেমন পরিহাস করলো? যখনই মনে হচ্ছিল জীবনের এতো দুঃখ,কষ্ট, গ্লানি সব ঘুচিয়ে এবার বোধহয় সুখেরা ওর সাথী হয়েছে, তখনই আবার অতীতের কালো ছায়া এসে ওকে ঘিরে ধরলো।ইন্ধনের সাথে নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাজাতে সাজাতেই হঠাৎ করে তার মৃত ভাবা স্বামী নাঈম মজুমদার কোথাথেকে চলে এলো? এ কেমন অপ্রীতকর পরিস্থিতি? এই পরিস্থিতিতে কেমন মনোভাব হওয়া উচিত তাও জানা নেই পঙ্খির।স্তব্ধ, অলংকারবাহুল হয়ে আছে সে। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। সামনেই নাঈম মজুমদার সোফায় বসে আছে। জাহানারা ছেলেকে চোখের সামনে জীবিত সহিসালামত দেখে কেঁদে কেঁদে ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। মৃত মনে করা ছেলেকে ফিরে পেয়ে তিনি খুশিতে কাঁদছেন। বাকিরাও হতবাক হয়ে দেখছে নাইম কে।

পঙ্খির এক হাত ইন্ধনের হাতের মুঠোয় ছিল। হঠাৎ সেই হাতে প্রচন্ড চাপ অনুভব করলো পঙ্খি। চমকে উঠে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো ইন্ধন ওর হাত সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরেছে।যেন এই হাত ছাড়লে হারিয়ে যাবে পঙ্খি। ইন্ধনের হাতের রগগুলোও ফুলে চামড়ার উপর দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। পঙ্খি ভীতু চোখে তাকালো ইন্ধনের মুখের দিকে। এতটুকু সময়ের ব্যবধানেই চোখ দুটো লাল আভায় ছেয়ে গেছে। ইন্ধনের মনের অবস্থা বুঝতে পারছে পঙ্খি। কিন্তু তাঁকে কি বলে শান্ত করবে তা পঙ্খির নিজেরও জানা নেই। আচমকা ইন্ধন পঙ্খির হাত ধরে টান দিয়ে ওকে নিয়ে আবার বাইরের দিকে চলে যেতে লাগলো। পঙ্খি চকিত কন্ঠে বললো।

--কোথায় যাচ্ছেন এখন?

ইন্ধন কেমন অস্বাভাবিক সুরে বললো।

--জানিনা। কিন্তু এখান থেকে দূর। বহুদূর। যেখানে কেউ খুঁজে পাবেনা আমাদের।

--কি বলছেন এসব? দেখুন একটু শান্ত হন। আমার কথা টা শুনু...

বাকি কথা শেষ করার আগেই পেছন থেকে ডাক পড়লো। জুবায়েদ ওদের কে ডাক দিয়ে বললো।

--কিরে তোরা এসে গেছিস? আরে দেখনা কে এসেছে? কি বিস্ময়কর ব্যাপার হয়েছে। আমাদের নাঈম যাকে আমরা মৃত ভাবছিলাম সে কিনা বেঁচে আছে। আজ ফিরে এসেছে আমাদের কাছে। দেখনা আয়।

কথাটা বলে জুবায়েদ একপ্রকার জোর দিয়েই ওদের বাড়ির ভেতর নিয়ে এলো। ইন্ধন চেয়েও আর বাইরে যেতে পারলোনা। জুবায়েদের সামনে মুখে জোরপূর্বক হাসির রেখা আনার চেষ্টা করে বাসার ভেতর ঢুকলো। জুবায়েদ মন মনে সয়তানি হাসছে।"এখন ইন্ধন বুঝবে নিজের জিনিসে অন্য কেউ ভাগ বসালে কেমন লাগে"। পঙ্খি ইন্ধনের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।সবার সামনে এভাবে হাত ধরে থাকা বেমানান দেখায়। কিন্তু ইন্ধন কিছুতেই ওর হাত ছাড়ছে না। পঙ্খি চোখের ইশারায় মিনতি করলো ইন্ধনের কাছে। তবুও হাত ছাড়লো না ইন্ধন। যা কিছু হয়ে যাক। আজ যেন কিছুতেই হাত ছাড়বেনা সে। বসার ঘরে আসতেই সবাই এবার ওদের দিকে তাকালো। এই পরিস্থিতিতে কি বলা উচিত তা কেউই বুঝতে পারছেনা। তখনই জাহানারা পঙ্খির কাছে এসে বললো।

--দেখনা পঙ্খি আমার ছেলে আমার মানিক ফিরে এসেছে। আমার নাঈম বেঁচে আছে। এসো এসো তুমিও দেখ।

কথাটা বলে জাহানারা পঙ্খির অন্য হাতটা ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। এদিকে ইন্ধন আরেক হাত ধরে আছে। পঙ্খি করুন অসহায় দৃষ্টিতে ইন্ধনকে চোখের ইশারায় হাত ছাড়ার ইশারা করলো। এবারে ইন্ধনের হাত ঢিলা হয়ে এলো। ধীরে ধীরে ইন্ধনের হাতের মাঝ থেকে পঙ্খির হাত ছুটে গেল। দুজনের চোখেই হারানোর ভয় প্রতীয়মান হচ্ছে। জাহানারা পঙ্খিকে নিয়ে নাঈমের পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো।

--দেখ সত্যি সত্যিই এটা আমার নাঈম। ও বেঁচে আছে।

নাঈম কেমন চুপচাপ বসে আছে। তেমন কারোর সাথে কোন কথা বলছে না।পঙ্খি যেন দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। এরচেয়ে বড়ো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতি বুঝি আর একটাও নেই। কি বলবে সে? কি বলা যায় এমত অবস্থায়? কোন কিছুই মাথায় আসছেনা ওর। আরচোখে শুধু ইন্ধনের দিকে তাকাচ্ছে। ইন্ধনের ওই কঠিন মুখমণ্ডল আর ভয়ংকর চোখের চাহুনি দেখে ভয়ে কলিজা কলিজা চিপে আসছে তাঁর। ইন্ধনের ওই চাহুনি যেন সব কিছু ভস্ম করে দিতে প্রস্তুত বসে আছে। তখনই খোদেজা তার মুখ খুললো। পঙ্খির উদ্দেশ্যে বললো।

--কি লো ছেড়ি এহন কি হরবি? দুই নাওয়ে পাও দিয়া কেবো হইরা চলবু? তোরই কপাল। মানুষ একটো পায়না। তুই তো দুই দুইডা পাইয়া গেলু।

ইন্ধন আর দাঁড়াতে পারলোনা ওখানে। ধুপধাপ পা ফেলে বাইরে চলে গেল।ইন্ধন যেতেই সামছুল মজুমদার তাঁর মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।

--আহ মা, তুমি কি দিনদিন ছোট হচ্ছো? কোন পরিস্থিতিতে আছ সেটাতো একটু বোঝার চেষ্টা করো। ছেলেটা এতদিন বাদে বেঁচে ফিরল আমাদের মাঝে। কোথায় কিভাবে ছিল এতদিন সেটা না দেখে তুমি কিসব কথা নিয়ে পড়ে আছ।জাহানারা নাঈমকে ওর ঘরে নিয়ে যাও। ভালো করে গোসল করিয়ে ওকে কিছু খাইয়ে দাও। ওকে দেখে কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছে।

জাহানারা মাথা নেড়ে নাঈমকে নিয়ে ওর ঘরে গেল। নাঈম চুপচাপ শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু খুঁজছে সে।

এদিকে পঙ্খির মাঝে আতঙ্ক ঘর করলো। নাজানি ইন্ধন রাগের বশে কি করে বসে। ওর রাজপুত্রকে পেতে না পেতেই আবার হারিয়ে না ফেলে ও। এ কেমন মাঝ দরিয়ায় পড়ে গেল ও?

__

সারাদিন আতঙ্কের মাঝেই কাটলো পঙ্খির। ইন্ধন সেই যে গেছে এখন রাত হয়ে গেছে তবুও ফেরেনি। চিন্তায় জান যাচ্ছে পঙ্খির। কতোবার ফোন করলো ফোনও ধরেনি সে। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে ইন্ধন আশায়। তখনই জাহানারা পঙ্খির কাছে এসে বসলো। পঙ্খির হাত ধরে নরম সুরে বললো।

--দেখ আমি জানি তুমি খুব বড়ো একটা দোটানায় পড়ে গেছ।তবে ভয় পেয় না। তুমি বর্তমানে ইন্ধনের বউ। আর সেটাই থাকবে তুমি। কিন্তু তোমার কাছে শুধু একটা অনুরোধ করবো রাখবে তুমি?

--এভাবে কেন বলছেন? বলুন না কি বলবেন?

--আসলে নাঈমের কাছে শুনলাম ও নাকি এতদিন জ্ঞানহীন অবস্থায় কোন এক গ্রামের জেলেদের বাড়িতে ছিল।ওই জেলেরাই নাকি ওকে পানিতে পেয়েছিল। তারাই ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। গত পরশু নাকি ওর জ্ঞান ফেরে। আর ওর বাড়ির কথা মনে হয়। আর ও ফিরে আসে। দেখ ওর জ্ঞান ফিরলেও মানুষিক আর শারীরিক ভাবে এখনও ও অনেক দূর্বল। তাই এখন যদি এই মুহুর্তে ওকে বলি যে ওর বউ মানে তোমার আরেকজনের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে তাহলে এই খবর শুনে ওর শারীরিক অবস্থার আরও ক্ষতি হতে পারে। তাই তোমাকে বলছি শুধু কয়টাদিন তুমি ওর বউ হয়েই থাকবে ওর কাছে? একবার ও সুস্থ হয়ে গেলেই ওকে সব খুলে বলে দেবো। জানি এটা অন্যায় দাবি করছি আমি। কিন্তু এক স্বার্থপর মায়ের জন্য এখন তার সন্তানের ভালো হওয়াটা জরুরি। তাই আমি তোমাকে হাত জোর করে অনুরোধ করছি। দয়া করে তুমি কয়টা দিন আমার কথা মেনে নাও।

পঙ্খি হতবিহ্বল হয়ে গেল। এখন কি করবে ও? ওর একপাশে কুয়া তো আরেকপাশে আগুন। এখন কোনদিকে যাবে ও? ওর জীবনে ইন্ধন ছাড়া আর কোন পুরুষের জায়গা নেই। বিন্দুমাত্রও না। কিন্তু এক মায়ের আকুতি কিভাবে অবজ্ঞা করবে ও? এতোটা তো পাষাণ হতে পারে না ও। জাহানারা পঙ্খির সামনে হাত জোর করে অনুরোধ করতে নিলেই পঙ্খি জাহানারার হাত ধরে বললো।

--কি করছেন আম্মা?আপনারা গুরুজন। গুরুজনেরা ছোটদের সামনে কখনো হাত জোর করে না। ঠিক আছে আপনি বলবেন তাই হবে।

জাহানারা খুশি হয়ে বললো।

--বেঁচে থাক মা। তুমি আমার কথা রাখছ আল্লাহ তোমার ভালো করবে।

--কিন্তু আম্মা আমারও শর্ত আছে। আমি রাতে উনার কাছে থাকতে পারবোনা। আমি এখন ইন্ধনের বউ। তাই আমি এখন অন্য কারো ঘরে রাত্রিযাপন করতে পারিনা।

--ঠিক আছে। নাঈম ঘুমিয়ে পড়লে তুমি তোমার ঘরে চলে যেও। তাহলে আর সমস্যা হবে না। আর ইন্ধনের চিন্তা করোনা নাঈমের বাবা ওকে সব বুঝিয়ে বলবে।

--ঠিক আছে।

জাহানারার কথা রাখতে পঙ্খি রাজিতো হয়ে গেল। তবে মনে চলছে তার বিশাল ঝড়। ইন্ধন এমনিতেই রেগে আছে। আর এই কথা শুনলে তো নাজানি কি করবে।

__

পানির জগ হাতে রুমে ঢুকলো পঙ্খি। নাঈম উল্টো দিকে হয়ে শুয়ে আছে। পঙ্খির ইচ্ছে হচ্ছে এখুনি দৌড়ে চলে যেতে এখান থেকে।ইন্ধন ব্যাতিত অন্য কেউ এখন যে ওর কাছে শুধুই পরপুরুষ। কিন্তু জাহানারার ওই আকুল অনুরোধের সামনে সে বাঁধা পড়ে আছে। না চাইতেও হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আসতে হলো ওকে। কোনরকমে শুধু লোকটা ঘুমানো পর্যন্তই থাকবে এখানে। তারপরই ও ওর ইন্ধনের কাছে চলে যাবে। পঙ্খি অস্বস্তির পাহাড় নিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। টেবিলের ওপর পানির জগ টা রাখলো। জগ রাখার শব্দে পঙ্খির দিকে তাকালো নাঈম। পঙ্খিকে দেখে কেমন যেন রেগে গেল সে। উঠে দাঁড়িয়ে রাগী কন্ঠে বললো।

--এই তুমি এখানে কি করছ? যাও এখান থেকে।

নাঈমের এমন প্রতিক্রিয়ায় পঙ্খি থতমত খেয়ে গেল। লোকটা কি তাকে চিনছে না? নাকি চিনেই এমন করছে? নাকি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পঙ্খির ভাবনার মাঝেই নাঈম আবারও ধমকে উঠে বললো।

--কি ব্যাপার এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও এখান থেকে। তোমার চেহারা দেখলেও রাগ লাগে আমার।

পঙ্খির এবার আত্মসম্মানে লাগলো। এখানে তো ওকে বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। নাহলে তো এই লোকের ধারে কাছেও আসতো না সে। অথচ এই লোক উল্টো ওকেই রাগ দেখাচ্ছে! জাহান্নামে যাক। পঙ্খি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ওখানে। দ্রুত গতিতে বেড়িয়ে এলো ও। যাক ভালোই হয়েছে। এখন আর ওই লোকটার সামনে থাকতে হবে না ওকে। এইটুকু সময়েই যেন ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল।জাহানারার কথা রাখার চেষ্টা করেছি আমি।কিন্তু ওই লোকই যখন চায়না সেখানে আমি আর কি করতে পারি? বাচ আর না। আমি আর কারোও কথা শুনবো না।এখন শুধু আমি আমার ইন্ধনের কাছে থাকবো। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পঙ্খি নিজের রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আৎকে উঠলো। ইন্ধন বেডের পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কি পরিমাণ রেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে আছে সে। ভয়ে গলা শুঁকিয়ে আসছে পঙ্খির। আতঙ্কিত ভাবে মৃদু পায়ে ইন্ধনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কিছু একটা বলতে নিলেই হঠাৎ ইন্ধন বলে উঠলো।

--কেন এসেছিস?

পঙ্খির কন্ঠনালী আঁটকে এলো। ইন্ধনের কথায় আড়ষ্ট হয়ে এলো তার হৃদয়। ইন্ধন লাল হয়ে ওঠা অগ্নি চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো পঙ্খির পানে। চোখ মুখের ভাব প্রচন্ড কঠিন হয়ে আছে তার। উঠে দাঁড়িয়ে পঙ্খির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে চোয়াল শক্ত করে বললো।

--কেন এসেছিস বল? স্বামীর সোহাগ নেওয়া এতো তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেল তোর?

আরেক হাতে পঙ্খির চোয়াল চেপে ধরলো ইন্ধন। অতিরিক্ত ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাচ্ছে ইন্ধনের। সে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো।

--বলনা? কেমন সোহাগ দিলো? কোথায় কোথায় সোহাগ করলো বলনা? এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে শেষ হলো? স্বামীর সোহাগ ছেড়ে এখানে কেন এলি? আমার উপর দয়া দেখাতে এসেছিস? লাগবেনা তোর দয়া দীক্ষা। যা, তুই ওর কাছেই যা। আমার কাছে আসা লাগবেনা তোর। যা বেড়িয়ে যা এখান থেকে।

ইন্ধন পঙ্খির হাত ধরে ওকে দরজার দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। পঙ্খি অশ্রুসিক্ত চোখে করুন সুরে বললো।

--এমন করবেন না।আমাকে ভুল বুঝছেন আপনি। দয়া করে আমার কথাটা একটু শুনুন।

ইন্ধন থামলো না। পঙ্খিকে টেনে নিয়ে দরজার বাইরে বের করে দিয়ে ঠাস করে দরজা আঁটকে দিলো। পঙ্খি দরজা চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো।

--এমন করেন না আমার সাথে। দরজাটা খুলুন। আমাকে একবার বলার সুযোগ টা দিন। এভাবে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না। আমি সইতে পারবো না। আমার জীবনে শুধু আপনি ছাড়া আর কারোর জায়গা নেই। আপনিই আমার সব। আমার প্রেমিক পুরুষ, আমার স্বামী সব একমাত্র আপনিই। আপনি ছাড়া আমার জীবনে না কেউ ছিলো আর না কেউ আসবে। দয়া করে একবার দরজা খুলুন।

কাঁদতে কাঁদতে দরজা ঘেঁষে নিচে বসে পড়লো পঙ্খি। একটু পর দরজা খুলে গেল। পঙ্খি পড়িমরি করে উঠে দ্রুত ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে এসে দেখলো রুমের সব জিনিস ভেঙে তছনছ হয়ে আছে পড়ে আছে। ইন্ধন রুমে নেই। বারান্দায় এসে দেখলো গ্রিলের সামনে বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ইন্ধন।ইন্ধনের হাতের দিকে নজর যেতেই আৎকে উঠলো পঙ্খি। ইন্ধনের হাত থেকে টপটপ করে র,ক্ত পড়ছে। পঙ্খি ছুটে গিয়ে ইন্ধনের হাত ধরে ভয়ার্ত কন্ঠে বললো।

--এ এসব কি করেছেন আপনি? হাত কেন কেটেছেন?

পঙ্খি দৌড়ে রুমের ভেতরে গিয়ে দ্রুত স্যাভলন আর পরিস্কার একটা সুতির কাপড় নিয়ে এলো।ইন্ধনের হাত ধরে স্যাভলন লাগাতে নিলে ইন্ধন হাত সরিয়ে নিতে লাগলো। কিন্তু পঙ্খি ছাড়লো না। জোর করে ধরেই স্যাভলন লাগিয়ে কাপড় বেঁধে দিতে দিতে বলে উঠলো।

--আজ একটা কথা বলতে চাই আপনাকে। জানি না বিশ্বাস করবেন কিনা,তবে নাঈম মজুমদারের সাথে আমার বিয়ে কখনো হয়ইনি।

ইন্ধন বিস্মিত চোখে পঙ্খির পানে চাইলো। পঙ্খি শান্ত সুরে বলতে লাগলো।

--হ্যাঁ এটাই সত্যি। আমার ধ্যানে জ্ঞানে সর্বদাই আপনার বসবাস। তাহলে অন্য কাউকে কিভাবে আমার জীবনে আসতে দিতাম।বিয়েটা ঠেকানো আমার হাতে ছিলোনা।তবে কবুল বলাটা তো আমার হাতেই ছিলো।তাই সেদিন যখন আমাকে কবুল বলতে বলা হয়েছিল আমি বলিনি। অনেকক্ষণ ধরে আমাকে সবাই কবুল বলার জন্য জোর দিচ্ছিল। আমি মূর্তির মতো শক্ত হয়ে বসে ছিলাম। কিছুতেই বলবো না এই পণ করে বসেছিলাম। তখনই আমার পেছন থেকে আমার জায়গায় কে যেন কবুল বলে দেয়।হয়তো আমার ভাবিই হবে। তাঁরা চালাকি করেই এমনটা করে। ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে থাকায় অন্যরা ভাবলো আমিই কবুল বলেছি। ব্যাস এভাবেই সবাই ভাবলো আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁরা আমাকে বউ ভেবে নিয়ে আসলো। আমিতো ভেবেই নিয়েছিলাম অন্য লোক আমার কাছে আসার আগে হয় পালিয়ে যাবো নাহয় নিজেকেই কিছু করে বসবো। কিন্তু ভাগ্যের লিখন তো অন্য কিছুই ছিলো। যার সাথে কখনো বিয়েই হয়নি শেষমেশ কিনা তারই বিধবা হয়ে থাকতে হলো এবাড়িতে। এখন তো বুঝলেন আমার জীবনে আপনি ছাড়া আর কেউ নেই? কখনো ছিলো না। তারপরও আমার ওপর বিশ্বাস না হয় তাহলে ঠিক আছে আমি চলে যাব এখান থেকে। আপনাকে আর দেখাবো না আমার চেহারা।

কথাগুলো বলে পঙ্খি ভারাক্রান্ত মনে ওখান থেকে চলে যেতে লাগলো। কিন্তু যেতে সক্ষম হলো না সে। পেছন থেকে হাত টেনে ধরলো ইন্ধন। এক টানে নিজের বুকে টেনে নিলো তাঁর রাজকন্যাকে। সর্বশক্তি দিয়ে বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো তাঁকে। আবেগপ্রবন কন্ঠে বললো।

--ভয় হয় আমার পঙ্খি। তোমাকে হারানোর ভয়। তীব্র ভয়। যে ভয় আমাকে শান্তি দেইনা এক মুহূর্তের জন্যেও। সবাই কেন তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়? কেন?

--শান্ত হন। আমাকে কেউ কেঁড়ে নিবে না। আমি আপনার ছিলাম আপনারই থাকবো।

ইন্ধন দুই হাতে পঙ্খির মুখটা আগলে ধরে কপালে চুমু দিয়ে নাকে নাক ঠেকিয়ে বললো।

--তোমাকে আরও নিবিড় ভাবে কাছে চাই পঙ্খি। যতোটা কাছে আসলে দুজন মিলে এক অস্তিত্ব হয়ে যায়। যাতোটা কাছে আসলে দ্বিতীয় কারও আমাদের মাঝে আসার কোন জায়গাই না থাকে। বলো পঙ্খি দেবে কি সেই অনুমতি আমাকে?

পঙ্খি লজ্জায় মিইয়ে গেল। চোখ বুজে মাথা নিচু করে লাজুক হাসলো সে। ইন্ধন তাঁর জবাব পেয়ে গেল। পঙ্খির সাথে অধর যুগল মিলিয়ে নিলো সে। পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ঘরের মাঝে এগুলো সে। ভালোবাসার পূর্ণতায় পরিপূর্ণ হলো দুজন।

__

গগনবিদারী চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো মজুমদার বাড়ি।ঘুম থেকে চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো পঙ্খি। ধড়ফড়িয়ে উঠতে নিলেই বাঁধা পেল। ইন্ধন যে ওকে পেঁচিয়ে ধরে বুকের ওপর মাথা রেখে পরম আরামে ঘুমিয়ে আছে। লজ্জায় আবারও লাল হয়ে গেল সে। কিন্তু তাঁর লজ্জার ভাব মুহূর্তেই কেটে গেল বাইরের চিৎকার চেচামেচি শুনে। এই ভোরবেলা এতো চিৎকার কোথাথেকে আসছে বুঝতে পারলো না সে। উপায় না পেয়ে ইন্ধন কে ডাকলো পঙ্খি। কয়েকবার ঠেলার পর চোখ কপাল কুঁচকে নড়েচড়ে উঠলো ইন্ধন। মাথা তুলে পঙ্খির দিকে তাকিয়ে ঘুম জড়ানো গলায় বললো।

--কি হয়েছে? ঘুমুতে দিচ্ছোনা কেন?

পঙ্খি লজ্জায় ইন্ধনের দিকে তাকাতে পারছেনা। এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতাআমতা করে বললো।

--আসলে বাইরে কি যেন হয়েছে। চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

পঙ্খির কথা শুনে ইন্ধন খেয়াল করলো আসলেই বাইরে থেকে চিৎকার চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। ইন্ধনেরও এবার চিন্তা হলো। সে পঙ্খির দিকে তাকিয়ে বললো।

--আচ্ছা আমি গিয়ে দেখছি।তুমি কাপড় পড়ে আসো।

পঙ্খি মাথা নেড়ে সায় জানালো। ইন্ধন নিজের জামাকাপড় ঠিক করে বাইরে গেল। পঙ্খিও উঠে দ্রুত জামা কাপড় পড়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো। কিন্তু বাইরে এসে যা দেখলো তা সে কল্পনাও করেনি। বাইরে বাড়ির বাগানে নাঈমের লা,শ পড়ে আছে। আর সবাই সেটা দেখেই চিৎকার আর আহাজারি করছে। পঙ্খি হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কি থেকে কি হয়ে গেল? আর কিভাবে এসব হলো? কে মারলো লোকটাকে এভাবে?

চলবে.....

(অনেকেই হয়তো বুঝতে পারেননি। আসলে এতদিন অতীত চলছিল। মানে নাঈম মজুমদারের দ্বিতীয় বার মরার আগের সব ঘটনা চলছিল। আজ থেকে অতীত শেষ হলো।কাল থেকে বর্তমান শুরু হবে।

সবার বোঝার সুবিধার্থে প্রথম পর্ব পড়লে বুঝতে পারবেন আর হ্যা গল্পটা বই আকারে বের হওয়ায় ২০ এর পরবর্তী পর্ব ডিলেট করে দিছে লেখিকা,গল্প ২১ পর্ব থেকে পাবেন )

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন