ফন্ট সাইজ:
থিম:
মৃগতৃষ্ণা

২৯তম পর্ব

লেখক: মেহরুমা নূর

#মৃগতৃষ্ণা---৩২ (কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ 🚫)

#লেখিকা-মেহরুমা নূর

★মজুমদার বাড়ি যেন এক মৃ,ত্যু,পুরীতে পরিণত হয়েছে। একের একের পর এক মৃ,ত্যুর মিছিলে ভৌতিক এক আতঙ্কিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। কালো ছায়ায় যেন ঘিরে ফেলেছে পুরো বাড়ি। এখন তো বাইরের লোকজনও এবাড়িতে আসতে ভয় পায়। সবার মাঝে আতঙ্কের পীড়ন। ভেবে পাচ্ছে না কেন ঘটছে এসব ঘটনা।আর কেই বা করছে এই খু,ন গুলো।নাঈম,তুশি,জুবায়েদ এখন আবার রাবেয়া। নাজানি এরপর কার পালা আসবে সেই ভয়ও হানা দিচ্ছে মনে। রহস্যের আধারে ডুবে যাচ্ছে সবাই।

রাবেয়ার লা,শ পোস্ট মরটামের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকিদের মতো তাঁকেও চা,কু দিয়ে খুবই নির্মম ভাবে হ,ত্যা করা হয়েছে। তাঁর লা,শ দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠে সবাই। এবার কান্না করতেও ভুলে গেছে যেন সবাই। পঙ্খি কেমন মনোভাব প্রকাশ করবে তা বুঝে উঠতে পারছেনা। এবাড়িতে আসার পর থেকে সে রাবেয়াকেই প্রথম আপন মানুষ ভেবেছিল। সে ভাবতো রাবেয়াই এবাড়ির সবচেয়ে ভালো মনের মানুষ। কিন্তু কাল রাতে তাঁর সেই ধারণা ভুল প্রমাণ হয়। সে জানতে পারে রাবেয়াই সেই ব্যাক্তি যে কিনা তাঁর সর্বোচ্চ কেঁড়ে নিতে চায়। তাঁর ইন্ধনের জান নিতে চায়। সেই ব্যাক্তির এমন অনাঙ্ক্ষিত মৃ,ত্যুতে কি মনোভাব প্রকাশ করা উচিত তা ভেবে পাচ্ছেনা সে। শত্রু মারা যাওয়ায় খুশি প্রকাশ করবে? নাকি পরিবারের একজন সদস্যের এমন নির্মম মৃ,ত্যু,তে শোক প্রকাশ করবে? তবে আপাতত ওর চিন্তার বিষয় শুধুই ইন্ধন। যখন থেকে রাবেয়ার লা,শ দেখেছে তখন থেকেই একেবারে নিশ্চুপ পাথরের মতো হয়ে গেছে সে। কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। ইন্ধনের এই অবস্থা দেখে বেশি ভয় পাচ্ছে পঙ্খি। নাজানি ইন্ধনের ভেতরে কি চলছে? ইন্ধনের কাছে তাঁর মা-ই সবকিছু ছিলো। হঠাৎ তাঁর এমন মৃ,ত্যু ইন্ধনকে থমকিয়ে দিয়েছে।তার জন্য এটা কতটা শোকার্ত তা বুঝতে পারছে পঙ্খি। ইন্ধন যেন নিজেকে সামলে নিতে পারে সেই দোয়াই করছে পঙ্খি।

বাড়ির উঠোনে এককোনায় বসে অপেক্ষা করছে পঙ্খি। বাড়ির ছেলেরা মর্গে গিয়েছে রাবেয়ার লা,শ নিতে। ওখান থেকে বের করে কবর দিয়েই বাড়ি ফিরবে তাঁরা। মেইন গেটের দিকে নজর গেড়ে বসে আছে পঙ্খি। হঠাৎ কিছু একটা দেখে ভ্রু কুঁচকে আসলো তাঁর। কালো চাদরে মুড়ে কেউ একজন গেটের বাইরে উঁকি দিচ্ছে ভেতরে। পঙ্খির সন্দেহজনক লাগলো বিষয় টা। সে ভালো করে খেয়াল করতেই বুঝতে পারলো এটা সেই বয়স্ক মহিলাটাই, যে সেদিন ওঁকে বলেছিল ইন্ধনের ওপর কালো ছায়া আছে। কেউ তাঁর জান নিতে চায়। মহিলাটিকে চিনতে পেরে চমকে গেল পঙ্খি। সে দ্রুত উঠে এগিয়ে গেল সেদিকে। মহিলাটির কাছে ছুটে এসে মহিলাটির হাত ধরে তাঁকে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনের এককোনায়। পঙ্খির এহেন কাজে মহিলাটি ভীষণ ঘাবড়ে গেল। ভীতু গলায় বললো।

--কি হইলো? আমাক এহেনে আইনছেন ক্যা? ছাড়েন আমাক।

পঙ্খি বলে উঠলো।

--ছাড়া পাবেন। তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আমাকে বলুন আপনি সেদিন ওসব কি বলছিলেন? আর আপনি এসব জানেনবা কি করে? সত্যি করে বলুন আপনি কে? আর মজুমদারের পরিবারের ব্যাপারে আপনি কিভাবে জানেন?

--কি কইতাছেন এইসব? আমি আবার কবে কি কইলাম? আমিতো চিনিই না আপনেক। ছাড়েন আমাক। যাইবার দেন।

পঙ্খি শক্ত গলায় বললো।

--দেখুন আমার সামনে নাটক করে লাভ হবেনা। আমি জানি আপনার সব মনে আছে। তাই এসব পাগল সেজে লাভ হবে না। ভালোই ভালোই বলুন কে আপনি? আর কি চান? মজুমদার পরিবারকে কিভাবে জানেন? আপনিই তো মারেন নি জহির মজুমদারের স্ত্রীকে? সত্যি করে বলুন নাহলে এক্ষুনি পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিবো আপনাকে। বলুন দিবো?

মহিলাটি ভয়ে মিনুতির সুরে বললো।

--না না এব্যা হরবেন না। আমাক পুলিশে দিয়েন না। আমি কিচ্ছু হরিনাই। হত্যি কইত্যাছি। আমিতো খালি ওক দেইখপ্যার আছিলাম।

পঙ্খি ভ্রু কুঁচকে বললো।

--ওক? ওক মানে কাকে দেখতে এসেছেন আপনি? কার কথা বলছেন আপনি? সত্যি করে বলুন সবকিছু।নাহলে কিন্তু এখুনি পুলিশকে ডাকবো আমি। বলুন কি লুকাচ্ছেন আপনি?

--না না পুলিশেক ডাইকেন না। আমি কইত্যাছি সব।

--ঠিক আছে বলুন সব। আপনি কাকে দেখতে এসেছেন এখানে?

--আমি ইন্ধন মজুমদার কে দেইখপ্যার আছি।

পঙ্খি চকিত কন্ঠে বললো।

--কেন? ইন্ধন কে কেন দেখতে এসেছেন আপনি? ওকে কি করে চিনেন আপনি?

--ও ও আমার ছেলে।

মহিলাটির কথায় বড়সড় একটা ধাক্কা খেল পঙ্খি। বিস্মিত কন্ঠে বললো।

--কিহ?? সত্যি বলছেন আপনি?

--হ হত্যি কইত্যাছি। ইন্ধন আমার পেট থেকেই জন্ম নিছে। আমার নাম জাবেদা। টেহার বদলে জহির মজুমদার আমার পেটে তাঁর বাচ্চা দিছিলো। আমি মেলা গরিব মানুষ। মাইনষের বাড়ি কাম হইরা খাইতাম। তাই মেলা টেহা পাইয়া আমিও রাজি হইয়া গেছিলাম। বাচ্চা হওয়ার পর নিয়া নেয় তাঁরা। আমারে কইয়া দেয় আমি যেন এই কথা কোনোদিন কাউরে না কই। আর তাগারে হামনেও যেন কোনোদিন না আসি। আমিও হেই কথা রাখছি। কোনোদিন কাউরে কইনাই। তাগারে হামনেও কোনোদিন আসিনাই। যে টেহা পাইছিলাম তাই দিয়া আমি অন্য জায়গায় গিয়া বিয়া বসি। কিন্তু বিয়ার পর আমার আর কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নাই। গতবছর আমার জামাইও মইরা যায়। তাই আমি আবার এই গ্রামে আসি। তহন হঠাৎ ইন্ধনরে দেহি। জানতে পারি ও আমার হেই ছওয়াল। ওরে দেইহা আমার খুব মায়া হয়। তাই মাঝে মইধ্যে চুরি কইরা একটু দেখতে আসি ওরে। তাছাড়া আর কিছু না। হত্যি কইতাছি।

--আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম আপনি সত্যি বলছেন। কিন্তু সেদিন আমাকে ওসব কেন বললেন যে, "ইন্ধনের ওপর কালো ছায়া পড়ে আছে। চারিদিকে তাঁর শত্রু। কেউ তাকে মারতে চায়।" কেন বলেছিলেন এসব। বলুন?

--মাঝে মধ্যে আমি চুরি কইরা ইন্ধন রে দেখতাম। হঠাৎ একদিন রাবেয়া আমাক দেখে ফালায়। সে আামকে চিনে ফালায়। আমাক দেইখা হে মেলা রাইগা যায়। আমাক হুমকি দিয়া কয় তোর পেটের ওই নাজায়েজ ছওয়াল বেশিদিন বাঁচব না। যত দেখা লাগে দেইখা নে। তাঁর কথা হুইনা আমি ভয় পাইয়া যাই। ভাইবা পাইনা কি হরমু। আমি কাউরে কইলে এই কথা কেউ বিশ্বাস কইরবোনা। তাই হেদিন যহন জানলাম তুমি ইন্ধনের বউ। তাই তোমারেই কইছিলাম। রাবেয়ার নাম কইনাই কারণ তুমি বিশ্বাস কইরতা না। তাই খালি শত্রুর কথা কইছলাম । যাতে তুমি একটু সতর্ক হয়ে যাও। আর নিজের স্বামীরে বাঁচাইতে পারো। কিন্তু আজকে যহন রাবেয়ার মরার কথা হুনি তহন চমকে যাই। তাই দেইখপার আসিলাম যে ইন্ধন ঠিক আছে নাকি? ব্যাস এইডাই। আর কোনোকিছু না।

সব শুনে পঙ্খি আস্বস্ত হলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো।

--ইন্ধনের কিছু হয়নি। কে বা কারা যেন রাবেয়াকে কাল রাতে খু,ন করে রেখে গেছে। এখন সবাই মর্গ থেকে ম,র,দে,হ আনতে গেছে। ইন্ধনও ওখানেই আছে।

--ও আচ্ছা তাইলে আমি এহন যাই। আর দয়া করে আমার কথা কাউরে কইও না। নাইলে মুসিবতে পইরা যাইব্যা।

মহিলাটি চলে যেতে নিলে পঙ্খি তাঁর হাত ধরে বলে উঠলো।

--দাঁড়ান,আসলে আপনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই আমি। আপনি আমাকে সতর্ক না করলে আমি আমার স্বামীকে রক্ষা করতে পারতাম না। আর হয়তো কখনো সত্যিটাও জানতে পারতাম না। আপনি অনেক বড়ো উপকার করেছেন আমার। আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আপনার।

--এইগুলা কি কন, ইন্ধন আমার পেটের সন্তান। টেহার বদলে জন্ম দিলেও হেতো আমারই রক্ত। তাক হয়তো ছওয়ালের মতো মানুষ করিনাই। কিন্তু তাঁর প্রতি আমার মনে মমতা ঠিকই আছে। তার ক্ষতি হওয়া দেইহা আমি কেবো হইরা চুপ কইরা থাকমু।

--আপনি দেখতে চান আপনার ছেলে কে?

--হ দেইখপ্যার তো চাই। এল্লা দেহার জুন্যিই মাঝে মাঝেই আসি। কোনোদিন দূর থেহে দেহা পাই, কোনোদিন আবার পাইনা।

--আমি যদি আপনার ছেলেকে সামনে থেকে দেখাতে পারি তাহলে দেখবেন আপনি?

জাবেদা চকিত নজরে তাকিয়ে বললো।

--কি কও? হত্যি দেহাইবা আমাক?

--হ্যাঁ দেখাবো। তবে আজ না। আজ আপনি চলে যান। তিন-চর দিন পর আসেন। আমি কোনো ব্যবস্থা করে আপনাকে আপনার ছেলের সামনে নিয়ে যাবো। ঠিক আছে?

জাবেদা ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো।

--তোমাক কি কয়া যে ধন্যবাদ দিমু। তুমি হত্যি আমাক অনেক বড়ো একটা উপহার দিলা।

--ধন্যবাদ বলতে হবে না। সত্যি টা ইন্ধন কে বলতে পারবোনা। কারণ আমার ইন্ধন সইতে পারবেনা। কিন্তু এক মাকে তাঁর ছেলেকে ভালো করে দেখার সুযোগ তো করেই দিতে পারি।

--আচ্ছা, তাইলে আমি এহন যাই।

--ঠিক আছে যান।

জাবেদা আবার নিজেকে আড়াল করে চলে গেল ওখান থেকে। পঙ্খিও বাড়ির উঠোনে এলো। একটু পরেই ইন্ধনসহ বাকিরা ফিরে এলো। মাটি দেওয়ার কাজ হয়তো সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। পঙ্খির দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু শুধুই ওর ইন্ধন। ইন্ধনের শোকার্ত মুখখানা আর র,ক্ত,লাল চোখ জোরা দেখে পঙ্খির বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো। হাজার মন ওজনের হাতুড়ির আঘাতের ন্যায় পীড়া হলো তার হৃদপিণ্ডে। পঙ্খি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ইন্ধনের নিকট। কিন্তু ইন্ধন পঙ্খির দিকে একবারের জন্যও তাকালো না। না কোনো কথা বললো। পঙ্খিকে পাশ কাটিয়ে সে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইলো পঙ্খি। লোকটা যে নিজেকে আর নিজের কষ্টকে ওর কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে তা ভালোই টের পাচ্ছে পঙ্খি। কিন্তু কেন করছে এমন? আমি কি উনার পর? তাহলে আমার সামনে কেন নিজেকে আড়াল করছেন উনি? কিন্তু আমি উনাকে আড়াল হতে দিবোনা। কিছুতেই না।

পঙ্খি ছুটে এলো নিজের রুমে। রুমে এসে দেখলো ইন্ধন বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। চোখ মুখের মনোভাব যেন কঠিন পাথরের মতো হয়ে আছে। ইন্ধনকে এভাবে দেখে ভয় লাগছে পঙ্খির। ভেতরের মনোভাব বাহির না করলে দম বন্ধ হয়ে যাবে উনার। পঙ্খি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইন্ধনের কাছে। ইন্ধনের পাশে বসে তাঁর এক হাত জড়িয়ে নিলো। ইন্ধননের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে একইভাবে বসে রইলো। পঙ্খি নিজের এক হাত ইন্ধনের গালে রেখে ইন্ধনকে নিজের দিকে ঘুরালো। ইন্ধন কেন যেন তাকাতে পারলোনা পঙ্খির চোখের দিকে। সে পঙ্খির হাত সরিয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে নিলো। কিন্তু পঙ্খি দিলোনা তাঁকে যেতে। পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো।

--এমন করবেন না প্লিজ। সইতে পারছিনা আমি। আমার কাছ থেকে নিজেকে কেন আড়াল করছেন আপনি? আমাদের মাঝে এই দ্বিধা, আড়াল কবে থেকে আসলো? আমরা তো একজনের আরেকজনের পরিপূরক। একজন আরেকজনের মনের আয়না। তাহলে কেন লুকাচ্ছেন নিজেকে আমার কাছ থেকে? প্লিজ নিজের মনে কষ্ট চেপে রেখেন না। ভেতরের সব ভাপ বের করে দিন। নাহলে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন না আপনি। তাই নিজের ভেতরের সব মনোভাব বের করে দিন। অশ্রুর সাথে ভাসিয়ে দিন তাদের।

পঙ্খি এবার ইন্ধনের হাত ধরে বিছানার উপর নিয়ে এসে বসালো। তারপর নিজে বিছানার ওপর উঠে বিছানার মাঝামাঝি গিয়ে পা দুটো একসাথে জোরা করে সামনের দিকে টান করে দিয়ে বসলো। এরপর দুই হাত বাড়িয়ে ইন্ধনকে আহ্বান জানালো তাঁর কোলে মাথা রাখতে। ইন্ধন বিনা বাক্য ব্যায় করে বাধ্য ছেলের মতো পঙ্খির কোলে তাঁর মাথা এলিয়ে দিলো। পঙ্খি বরাবরের মতোই পরম যত্নে ইন্ধনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ইন্ধনের শক্ত হয়ে থাকা মুখমন্ডল যেন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। ইন্ধন পঙ্খির দিকে কাত হয়ে শুয়ে দুই হাতে পঙ্খিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। পঙ্খি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কান্না জড়ানো গলায় বললো।

--নিজেকে আর ধরে রেখেন না প্লিজ। ভেতরের সব বের হয়ে আসতে দিন। সব কষ্ট অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসতে দিন।

এবার আর ইন্ধন নিজেকে আঁটকে রাখতে পারলোনা।হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে পঙ্খির পেটে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলো সে। কান্নার শব্দ তেমন না হলেও ইন্ধনের শরীরের কাঁপুনি বলে দিচ্ছে কতটা শোকাহত সে। পঙ্খির হৃদয় টা ভেঙে আসছে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সেও ইন্ধনের সাথে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। এভাবে কতক্ষণ থাকলো ওরা জানা নেই। জানতেও চায়না পঙ্খি। ইন্ধনের জন্য দরকার হলে সে সারাজীবন এভাবে বসে থাকতে পারবে। বাচ ওর ইন্ধন যেন ঠিক থাকে আর কিছু চাইনা ওর।

__

সময়েরও একটা গুণ আছে। বহমান সময় যাওয়ার সময় মানুষের কিছু মনোভাবও সাথে করে নিয়ে যায় । তাইতো সময়ের সাথে সাময়িক কষ্টের ছাপটাও অনেক টা ধুয়ে নিয়ে যায়। তবে কিছু অক্ষত দাগ থেকেই যায়। যা হয়তো মনের গহীনে আটকা পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে তা উঁকি দিয়ে নিজের উপস্থিতির জানানা দেয়। মানুষ সেই ক্ষত নিয়েই বাঁচতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। রাবেয়ার মৃ,ত্যু,র আজ দুই সপ্তাহ গত হলো। অন্যগুলোর মতো এটারও কোনো প্রমাণাদি এখনো পেলনা পুলিশ। তবে ইনভেস্টিগেশন জারি আছে। পরিবারের সবাই কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আগের মতো পুরোপুরি ভাবে কেউই স্বাভাবিক হতে পারছে না।সবার মাঝেই এক অজানা ভীতি কাজ করছে। একের এক খু,ন দেখে সবাই এক আতঙ্কের মাঝে আছে। তবে পঙ্খির চিন্তা শুধু ইন্ধন কে নিয়ে। ইন্ধন নিজেকে সামলে নিলেও কেমন যেন হয়ে গেছে সে। ঠিকমতো কথা বলে না, কেমন রুষ্ট হয়ে থাকে সবসময়। পঙ্খি ভাবে হয়তো মায়ের মৃ,ত্যু,র শোক এখানো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাই এমন করছে। এটা ভেবে সে নিজেকে শান্তনা দেয়। তবে তাঁর মাঝে মাঝে কেন যেন মনে হয় ইন্ধনের মাঝে অন্য কিছু চলছে। যেন শুধু মায়ের মৃ,ত্যু,ই ওর এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ না। তবে এসব ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়না পঙ্খি। নিজের মনের ভুল ধারণা ভেবে উড়িয়ে দেয়।

খাবার টেবিলে সকালের নাস্তা পরিবেশন করছে পঙ্খি। একে একে সবাই এলো খেতে। ইন্ধনও এলো। হাতে মোবাইল টিপতে টিপতে সে বাইরের দিকে যেতে লাগলো। সেটা দেখে পঙ্খি ভ্রু কুঁচকে বললো।

--কি ব্যাপার কোথায় যাচ্ছেন আপনি?

ইন্ধন দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো।

--আমার কাজ আছে বাইরে যাচ্ছি।

--হ্যাঁ তো নাস্তা করে যান। না খেয়ে কেন যাচ্ছেন?

--আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছেনা। পরে বাইরে কিছু খেয়ে নিবো।

--দেখুন যাই বলুন। না খেয়ে যেতে দিবোনা আপনাকে। আগে নাস্তা করবেন তারপর যেখানে খুশি যান।

ইন্ধন আবার কিছু বলতে নিলে তার আগেই জহির মজুমদার বলে উঠলেন।

--ঠিকই তো বলছে বৌমা। নাস্তা করে তারপর বের হও। না খেয়ে কাজে যাওয়া ঠিক না।

ইন্ধন আর কিছু বললো না। বাধ্য ছেলের মতো চুপচাপ এসে চেয়ার টেনে বসলো। এই দৃশ্য দেখে পঙ্খি একটু অবাকই হলো। এই প্রথম জহির মজুমদারের কথা বিনাবাক্যে মেনে নিলো ইন্ধন। অন্যসময় তো জহির মজুমদারের কথা সে কখনো গ্রাহ্যই করেনা। পঙ্খি আর এই নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে সবাইকে খাবার বেড়ে দিলো। খাওয়া শেষে জহির মজুমদার উঠে দাঁড়াতেই কেমন মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগলো সে। পড়ে যাওয়ার আগেই ইন্ধন ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে ধরে ফেললো। জহির মজুমদারকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে চিন্তিত সুরে বললেন।

--ঠিক আছেন বাবা? কি হয়েছে আপনার?

ছেলের মুখে এতবছর পর বাবা ডাক শুনে ছলছল চোখে তাকালেন জহির মজুমদার। তাঁর যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। বাকিরাও অনেক অবাক হলো ইন্ধনের এই হঠাৎ পরিবর্তনে। পঙ্খি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। ইন্ধনের হঠাৎ তাঁর বাবার প্রতি এমন পরিবর্তন দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গেল সে। আবার ভাবলো হয়তো মায়ের মৃ,ত্যু,র কারণে তাঁর মনোভাব পরিবর্তন হয়েছে। ইন্ধন আবারও ওর বাবার উদ্দেশ্যে বললো।

--কি হলো বলুন কি হয়েছে?

জহির মজুমদার নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললো।

--ও কিছু না। ওই প্রেশার টা বুঝি আবার লো হয়েছে। একারণে এমন হয়েছে।

--আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি এখানে সোফায় এসে বসুন। আমি ডাক্তার কাকাকে ফোন করে আসতে বলছি।

ইন্ধন ওর বাবাকে সোফায় এনে বসিয়ে দিলো। তারপর পঙ্খিকে বললো একটা স্যালাইন গুলিয়ে আনতে। ডাক্তারকেও ফোন দিয়ে আসতে বললো। একটু পরে ডাক্তার এসে জহির মজুমদার কে চেকআপ করে ঔষধ দিয়ে গেল।ইন্ধন ওর বাবকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলো ঔষধ গুলো যেন ঠিকমতো খায়। জহির মজুমদার নিজের জন্য ছেলের এমন উদ্বেগ দেখে তাঁর অসুখ যেন এমনিতেই সেরে গেল। এতদিন পর তাঁর ছেলের এমন যত্নে সে খুশিতে ভরে উঠেছে।

একটু পরে জহির মজুমদার কে তাঁর কক্ষে আরাম করতে দিয়ে এলো ইন্ধন। বসার ঘরে এসে সোফায় বসে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছিলো। তখনই পঙ্খি জাবেদাকে নিয়ে এলো সাথে। জাবেদা ওড়না দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে রেখেছে। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। পঙ্খি জাবেদাকে নিয়ে এসে অন্য সোফায় বসিয়ে দিলো। পঙ্খির সাথে অপরিচিত কাউকে দেখে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালো ইন্ধন। পঙ্খি তখন বললো।

--উনি আমার খালা হন। অনেকদিন পর আমাকে দেখতে এসেছেন।

ইন্ধন "ওহ" বলে ভদ্রতাসূচক সালাম দিলো জাবেদাকে। তারপর আবার ফোনে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। আর জাবেদা মন ভরে দেখলো ইন্ধন কে। পঙ্খিরও মনে একটু শান্তি লাগছে। বাচ এখন শুধু একটাই দোয়া। ওদের জীবনে যেন আর কোনো বিপদ নেমে না আসে।সব যেন ঠিক থাকে।

চলবে.....

(উপন্যাস টা প্রায় অন্তিম ধাপে চলে এসেছে। আর কয়েকটা পর্ব হয়তো হবে। এটা একটা থ্রিলার উপন্যাস। তাই অপ্রয়োজনীয় টেনে লম্বা করবোনা। এখন থেকে প্রত্যেক পর্বে একটা করে রহস্য উন্মোচন হবে। সর্বোশেষ রহস্য উদঘাটন হলে উপন্যাসটাও শেষ হয়ে যাবে।)

গল্পের লেটেস্ট আপডেট পেতে আর গল্প নিয়ে যেকোনো আলোচনা আড্ডা দিতে আমার গ্রুপে জয়েন হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। নিচে গ্রুপ লিংক দেওয়া হলো। জয়েন হতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন। 👇

গ্রুপ

https://facebook.com/groups/170529085281953/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন