ফন্ট সাইজ:
থিম:
রোদ্দুরের রেশ

৩য় পর্ব

লেখক: আরশিয়া নূর

#রোদ্দুরের_রেশ [৩ ]

#আরশিয়া_নূর

[অনুমতি ব্যতিত কপিকরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

সকাল ঠিক আটটা।

কাব্যকুঞ্জের বিশাল বাড়িটা তখন দিনের ব্যস্ততায় ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। পূর্ব দিকের বড় কাচের জানালা দিয়ে সকালের নরম রোদ এসে ঘরের মেঝেতে লম্বা আলোর রেখা এঁকে দিয়েছে। নিচে কিচেন থেকে ভেসে আসছে গরম পরোটার গন্ধ, কোথাও আবার কাপ-পিরিচের মৃদু শব্দ। এতকিছুর মাঝেও বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটার মালিক তখনও গভীর ঘুমে।

কাব্য।

ভোরের দিকে বাড়ি ফিরেছে সে। রাতটা প্রায় পুরোটাই কেটে গেছে রোদসী নামের মেয়েটার বিষয় নিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে। শহরের হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ইফতি নিজে দায়িত্ব নিয়েছিল মেয়েটার চিকিৎসার। একের পর এক পরীক্ষা, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা—সবকিছু ইফতি সামলে নেওয়ায় কাব্য আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় নি। সেই শেষরাত পর্যন্ত বাহাদুরগড়ে ছিলো সে। এরপর ভোরের দিকে এসেছে বাসায়।

শরীরটা ক্লান্ত ছিল ভীষণ। তাই বাড়ি ফিরেই কারও সঙ্গে তেমন কথা না বলে শুধু গোসল করে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। মাথায় তখনও ঘুরছিল গত রাতের ঘটনাগুলো। রেললাইনের অন্ধকার। ছুটে আসা ট্রেন। রোদসীর নিথর শরীর। আর সবশেষে রোদের মায়ের কাঁদতে কাঁদতে কাব্যের সামনে বলা সেই বিয়ের কথাগুলো। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না ।

হঠাৎ কর্কশ মিউজিকের শব্দে সাধের ঘুমটা একেবারে নড়েবড়ে হয়ে গেল কাব্যের। চোখে ঘুম জড়ানো অবস্থায় কপাল কুঁচকে পাশ ফিরে বালিশটা টেনে কানের ওপর চাপা দিল সে। এরপর চোখ বন্ধ করে

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার চেষ্টা করল কিন্তু কোনো কাজ হলো না।

বরং শব্দটা যেন আগের চেয়েও কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

ধুমধুমধুম শব্দ আর তার সঙ্গে তীব্র বিট।

কাব্য বিরক্তিতে চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। ঘুমভাঙা চোখে বিরক্তির ছাপ আরও গাঢ় হলো।

আজও!

তার মানে আজকেও ওই দেড় ব্যাটারি মিউজিক ছেড়েছে। বিছানায় উঠে বসে দুহাত দিয়ে মুখ ঘষল সে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে। গত রাতের ক্লান্তি এখনো মুখে স্পষ্ট। চোখের নিচে হালকা কালি। অথচ ঘুমটা যদি আর আধঘণ্টা চলত, হয়তো শরীরটা একটু স্বস্তি পেত। কিন্তু এই বাড়িতে শান্তিতে ঘুমানোর ভাগ্য তার কবে ছিল?

বিরক্ত মুখে বিছানা থেকে নামল সে। গায়ে আগেই পরা ছিল স্লিভলেস সাদা টি-শার্ট আর ধূসর ট্র্যাক প্যান্ট। সেই অবস্থায় কোনমতে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল।

করিডোরে পা রাখতেই শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে কানে এলো। কাব্য দাঁত চেপে ধরল।

-----“দেড় ব্যাটারি শালা, আজকে যদি ওকে পাই”

নিজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে এসে বিটের শব্দে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। গলা উঁচিয়ে ডাকল—

------“আম্মু! আম্মু! অ্যাঁই আম্মু কই তুমি?

রান্নাঘরের পাশে ডাইনিং স্পেসে তখন কবিতা চৌধুরী ছেলের জন্য ব্রেকফাস্টের আয়োজন দেখছিলেন। কাজের মেয়েটা টেবিলে একে একে পরোটা, ডিম ভাজি, ফল আর চা সাজিয়ে রাখছে। কবিতা চৌধুরী নিজে পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কি না দেখছিলেন। এমন সময় ছেলের চিৎকার শুনে বিরক্ত মুখে এগিয়ে এলেন তিনি। কাব্যের দিকে তাকিয়েই বললেন—

------“কী হয়েছে? সকাল সকাল এমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন? বাড়িতে কি ডাকাত পড়েছে?

কাব্যের ভ্রু কুঁচকে গেল।

-----“আমি ষাঁড়ের মতো চেঁচাই?

------“তা না তো কী? চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিস!

-------“ওহ আমার এটুকু ডাকে আমাকে ষাঁড়ের মতো মনে হলো। অথচ আর একজন যে সকাল আটটার আগেই বক্স বাজিয়ে পুরো বাড়িটাকে ডিস্কো বানিয়ে ফেলেছে, সেদিকে কারো খেয়াল নেই। বাহ সেই আম্মু সেই, বাহবা দিতে মন চাইছে তোমাকে।

কাব্যের বিরক্তিতে বলা কথাগুলো শুনে অসহায় চোখে তাকালেন কবিতা চৌধুরী। কি করবেন তিনি? ছেলেটা ভোরে ফিরেছে জানেন কিন্তু মেয়েটাও যে আগামীকাল প্রোগ্রাম আছে। কিভাবেই বা মানা করবেন? তাই কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে একদম অসহায় গলায় বললেন—

------“কিভাবে খেয়াল রাখবো বাবা, বল? আগামীকাল ওর ডান্স প্রোগ্রাম। সেখানে পার্টিসিপেট করছে মেয়েটা। একটু রিহার্সাল করবে না?

-----“আমি কখন বললাম রিহার্সাল করতে পারবে না?

কিন্তু রিহার্সাল আর বাড়ির ছাদ উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে, আম্মু! এত জোরে গান বাজানোর কী দরকার? একটু আস্তে করা যায় না?

কবিতা চৌধুরী ঠোঁট বাঁকিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

------“তোরা দুইটা সারাক্ষণ একে অপরের পিছনে লাগবি, ওখানেই মারামারি করবি আবার একটু পরে মিলে যাবি অথচ মাঝখানে কিছু বলতে গিয়ে শত্রু হবো আমি। পারবো না, তোর বোন তুই সামলা গিয়ে।

কাব্য এবার একটু থমকাল। মায়ের কথাটা যুক্তিযুক্ত।

তাই সে আর কিছু বলল না। কবিতা চৌধুরীও কিচেনের দিকে এগিয়ে যেতে নিয়ে আবার কাব্যের দিকে ফিরে বললেন—

------“এখন ওর ঘরে যাবি জানি। কিন্তু মারামারি করিস না আবার। আর তোর বাবা বলল আজ নাকি তুই আবার ওই মেয়েটাকে দেখতে যাবি?

কাব্য মাথা নাড়ল।

------“ওকে তো আমিই নিয়ে এসেছি, তাহলে যেতে হবে না আবার?

------“আমি যেতে বারণ করছি না বাবা কিন্তু যাওয়ার আগে ব্রেকফাস্ট করে যাস, সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি আমি।

“ওকে ?”

আর কিছু না বলে সোজা ড্রয়িংরুমের পাশের ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল কাব্য। শব্দটা এখন আরও পরিষ্কার।

দরজার ওপাশ থেকে জোরে মিউজিক বাজছে। তার সঙ্গে কারও পায়ের তাল মেলানোর শব্দও শোনা যাচ্ছে।

কাব্য দরজার সামনে গিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।

গত রাতের ক্লান্তি, রোদসীকে নিয়ে অস্থিরতা, হাসপাতালের করিডোর—সবকিছুর মাঝখানে এই পরিচিত কোলাহলটা অদ্ভুতভাবে তার বাড়ির স্বাভাবিক জীবনের কথা মনে করিয়ে দিল। একটা স্বাভাবিক সকাল।

একটা পরিবার। মায়ের বকুনি। বোনের সঙ্গে ঝগড়া।

এই সাধারণ জিনিসগুলোই যেন গত রাতের ভয়াবহতার পর হঠাৎ খুব আপন মনে হলো। কাব্য ধীরে দরজার হাতলে হাত রাখল তারপর শব্দ না করেই দরজাটা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ বড় হয়ে গেল।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েটা নাচছে। চারপাশে আয়না। সামনে বড় স্পিকারে তুমুল শব্দে গান চলছে। চুলগুলো উঁচু করে বাঁধা, পরনে আরামদায়ক টি-শার্ট আর ট্র্যাক প্যান্ট। নিজের পৃথিবীতে সে এতটাই ডুবে আছে যে কাব্য দরজায় দাঁড়িয়ে আছে—সেটা পর্যন্ত টের পায়নি।

কাব্য কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তারপর ধীরে ধীরে ভ্রু তুলল।

“বাহ দেড় ব্যাটারি দেখি ভালোই নাচে!”

মেয়েটার নাচ থেমে গেল। সে আয়নায় নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্যকে দেখে জমে গেল। কাব্য দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ভয়ংকর শান্ত একটা হাসি।

-----“চালিয়ে যা, তুই পারবি নাচনেওয়ালী সিনেমার আসল নায়িকা হতে।

মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলল। কাব্য এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে এলো।

-----“কিরে থামলি কেন? নাচ, জোকারের ডান্স তো ভালোই লাগছিল। আর আমি তো দেখতে এসেছি, কোন মহারানির নাচের জন্য সকাল সকাল আমার ঘুমের বারোটা বাজছে।

মেয়েটা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—

-----“ভাইয়া! তুমি কিন্তু রীতিমতো অপমান করছো আমাকে। আমি জোকার?

------“তা নয়তো কি? ভালো হলে কি আর সকাল হতে না হতেই এমন বাড়ি ডিস্কো বানাস? আমার মতে ভালো মেয়েটা তো এত জোরে মিউজিক বাজিয়ে নাচ করে না।

মেয়েটা এবার স্পিকারের ভলিউম একটু কমিয়ে দিল।

----“কাল আমার প্রোগ্রাম। শেষ রিহার্সাল। আজকে একটু প্রাকটিস না করলে সব গুলিয়ে ফেলবো।

কাব্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল—

----“প্রোগ্রাম আছে, সেটা আমি জানি। কিন্তু তাই বলে আমার কানের পর্দা বিসর্জন দিতে হবে?

মেয়েটা মুচকি হাসল।

-----“সরি। আমি বুঝতে পারিনি। গতকাল অনেক রাত পর্যন্ত তোমার ঘরে ছিলাম। ভাবছিলাম তুমি ফিরলে তোমাকে শুভেচ্ছা জানাবো মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তুমি তো ফিরলে না। তাই ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ওখানেই বিজি কিন্তু তুমি যে সকালে এসেছো সেটা বুঝতে পারিনি।

কাব্য চোখ কুঁচকে তাকাল।

-----“আচ্ছা। জানিস না তুই, তাহলে এখন কিভাবে জানলি তুই আমি সকালে এসেছি? আমি তো বলিনি একবারও।

মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে জিহ্বায় কামড় দিলো। মিথ্যা বলতে গিয়ে এভাবে ধরা খাবে বুঝতে পারেনি। পরক্ষণেই কাব্য কিছু বলার আগেই দুহাতে কান ধরে এক পা তুলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো ।

কাব্য মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল।

তারপর হাতদুটো সামনে বাড়িয়ে কণ্ঠটা নরম করে মুচকি হেসে ডাক দিলো —

-----“এদিকে আয়।

মাথা তুলে কাব্যের দিকে তাকাতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেল মেয়েটি। একটু ভুল করলেই তো কাব্য কান ধরায়, তাহলে আজ মিথ্যা বলার পরেও এভাবে ডাকছে! কিন্তু সে কিছু বলল না, ছুটে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো।

-------"তুমি ঠিক আছো তো ভাইয়া? আজকে তোমাকে কেন যেন স্বাভাবিক লাগছে না।

কাব্য কতক্ষণ চুপ থেকে বলল-

------"কিছু হয়নি ঠিক আছি আমি।

একটু থেমে বলল -

------"মিথ্যা বলা ভালো নয় ইরা। জীবনে যত বড় বিপদেই পড় না কেন, সবসময় সত্যি কথা বলবি। দেখবি বিপদ হলেও, আল্লাহ ঠিক বাঁচিয়ে দেবে। আর একটা কথা - রিহার্সাল করবি কর, মানা করছি না । কিন্তু এত জোরে ভলিউম দিয়ে নয়, মনে রাখিস এই বাড়িতে তুই ছাড়াও আরও অনেক মানুষ থাকে।

ইরা এবার মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা।”

কাব্য আর কিছু বলল না, ইরার কপালে চুমু দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে আবার ফিরে তাকাল।

-----“আর শোন। কাল কিন্তু ভালো করে নাচিস। আমি আসবো।

ইরার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।

------“সত্যি? সত্যি তুমি আসবে ভাইয়া?

কাব্য এক মুহূর্ত থেমে গেল। তারপর বলল—

-----“উমমমম, চেষ্টা করব।

-----“চেষ্টা না। আসতেই হবে।

কাব্যের ঠোঁটের কোণে আবারও সামান্য হাসি ফুটল।

------“ঠিক আছে। আসব।

কথাটা বলে বেরিয়ে এলো সে। করিডোরে এসে দাঁড়াতেই দূর থেকে আবার মিউজিকের শব্দ ভেসে এলো। তবে এবার অনেকটা কম। কাব্য অজান্তেই হেসে ফেলল। এই বাড়ির মানুষগুলোকে নিয়ে তার কত অভিযোগ!

কেউ তাকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না, কেউ সময়মতো খেতে বসায়, কেউ সারাক্ষণ বকবক করে, কেউ আবার তার সঙ্গে ঝগড়া না করলে দিনের শুরুই করতে পারে না। তবুও— এই কোলাহলটাই তো তার বাড়ি। এরাই

তার আপন মানুষ।

_________________________________________

হাসপাতালের সাদা বিছানায় নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে রোদসী। বেলা কত হয়েছে, তা জানে না সে।

সময় যেন তার কাছে থেমে গেছে। চোখের পাতার ওপর ভারী একটা বোঝা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন নিজের ওজনেই ডুবে আছে। হাত-পা নাড়াতে গেলেই মনে হচ্ছে কেউ অদৃশ্যভাবে তাকে নিচে চেপে ধরে রেখেছে। নাকে-মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। মাথার একপাশে স্যালাইনের স্ট্যান্ড। হাতের শিরায় ক্যানুলা ঢোকানো।

চোখের সামনে অচেনা কয়েকটা মেশিন। কোনোটা নিয়মিত বিরতিতে টুং করে শব্দ করছে, কোনোটা আবার একটানা ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে রেখে বিপ-বিপ শব্দ করছে। শব্দগুলো অচেনা, আর এই মুহূর্তে ভীষণ ভয়ংকর লাগছে। রোদসী ধীরে ধীরে চোখ মেলল।

প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না।

চারপাশে শুধু সাদা। সাদা চাদর, সাদা দেয়াল, মাথার ওপর তীব্র সাদা আলো। চোখ দুটো কুঁচকে গেল তার।

এত আলো কেন?

কয়েক মুহূর্ত পর বুঝতে পারল, মাথার ওপর একটা উজ্জ্বল বাতি জ্বলছে। চোখে যেন আলোটা বিঁধছে। কষ্ট করে মুখটা একটু ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে গেল।

চারপাশে হাসপাতালের নানা সরঞ্জাম। লোহার স্ট্যান্ড, স্বচ্ছ তরলের বোতল, চিকচিকে কিছু তার, আর পাশে রাখা একটা মনিটর। মনিটরের পর্দায় সবুজ রঙের একটা রেখা উঠছে-নামছে। নির্দিষ্ট বিরতিতে শব্দও হচ্ছে। রোদসী চমকে উঠল। মনিটর।

শব্দটা তার মনে পড়ল। বিজ্ঞান বইয়ের একটা অধ্যায়ে মানুষের হৃদস্পন্দন মাপার যন্ত্রের ছবি হিসেবে দেখেছিল সে। এই যে হাতের সঙ্গে লাগানো চিকন নলটা, পাশে ঝুলছে স্বচ্ছ একটা বোতল। এটা তো

স্যালাইন।

একবার মা অসুস্থ হওয়ায় লোকমান ডাক্তার দিয়েছিল কিন্তু আজ এসব ওর শরীরে কেন? বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। আমি হাসপাতালে? প্রশ্নটা মনে আসতেই পরের প্রশ্নটা আরও দ্রুত মাথায় এল—

কিন্তু কীভাবে?

সে তো রেললাইনের পাশে ছিল। গ্রামের মাটিতে বড় হওয়া রোদসী অসুখ বলতে জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথাই বেশি দেখেছে। খুব বেশি অসুস্থ হলে শফিক মাস্টার বাহাদুরগড়ের হাটে গিয়ে ওষুধ এনে দিতেন। মাঝেমধ্যে লোকমান ডাক্তার বাড়িতে এসে রোগী দেখে যেতেন।

কিন্তু হাসপাতাল সম্পর্কে তার ধারণা একেবারে শূন্য ছিল না। বইয়ে পড়েছে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে শুনেছে, বাবার কাছ থেকেও শুনেছে। শুধু নিজের জীবনে কখনো এত বড় হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে আসতে হয়নি।

আর আজ—

সে নিজেই একটা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।

হঠাৎ নাকে-মুখে লাগানো মাস্কের ভেতর দিয়ে দ্রুত শ্বাস নিতে গিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ বেরিয়ে এল।

“হুঁ”

রোদসী থেমে গেল। নিজের শ্বাসের শব্দটাও যেন এই মুহূর্তে অপরিচিত লাগছে। তারপরই হঠাৎ মনে পড়ে গেল— রেললাইন। অন্ধকার। দূর থেকে এগিয়ে আসা ট্রেনের আলো। কানে ভেসে আসা বিকট শব্দ।

তারপর—কেউ একজন দৌড়ে আসছিল। চিৎকার করে সরতে বলছিল কিন্তু সে সরেনি। পরে একটা শক্ত হাত তাকে টেনে ধরেছিল তারপর প্রচণ্ড একটা ধাক্কা।

কপাল কুঁচকে গেল মেয়েটার। কে ছিল সে?

কেন যেন মুখটা মনে পড়ছে না। শুধু মনে আছে—শক্ত দুটো হাত তাকে টেনে নিয়েছিল। তারপর সব অন্ধকার।

রোদসী ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল— সে কি বেঁচে আছে?

উত্তরটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ডই লাগল। বেঁচে না থাকলে তো এত কিছু অনুভব করতে পারত না। মেশিনের শব্দ শুনতে পারত না। নিজের বুকের ওঠানামা টের পেত না।

তবু অজানা জায়গাটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।

সে কোথায়? কে তাকে এখানে এনেছে? আর যে মানুষটা তাকে রেললাইনের ওপর থেকে টেনে সরিয়ে নিয়েছিল—সে কোথায়? বুকের ভেতরটায় অকারণে ধুকপুক শুরু হলো। কী হচ্ছে নিজের সাথে বুঝতে না পেরে আচমকাই উঠে বসার চেষ্টা করল সে। কিন্তু পরক্ষণেই তীব্র ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল।

পেটের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল।

ব্যথায় কুঁকড়ে নিজের পেটের দিকে তাকাল সে।

ঢিলেঢালা হাসপাতালের পোশাকের নিচেও পেটটা আগের মতোই উঁচু। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই রোদসীর চোখে মুহূর্তেই ভয় নেমে এলো। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল।

-----“আমার বাচ্চা!”

এক মুহূর্তও আর স্থির থাকতে পারল না সে।

নাকে-মুখে লাগানো অক্সিজেন মাস্কটা হঠাৎ অসহ্য লাগছে, কাঁপা হাতে এক ঝটকায় মাস্কটা মুখ থেকে সরিয়ে ফেলল সে। একে একে বাড়ির সবার কথা মনে পড়তে লাগল।

আম্মা, আব্বা, রিফাত? ওরা কি জানে সে এখানে?

আর তার বাচ্চা? আনমনে পেটে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।

------"আমার ময়না! আমার ময়নারে মাইরা ফালাইছে সবাই। আমার প্যাডে কিছু নাই আর, আমার বাচ্চারে মাইরা দিলো।

ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে একজন নার্স দ্রুত ছুটে এলেন। রোদসীকে মাস্ক খুলে এভাবে কাঁদতে দেখে নার্সের মুখ মুহূর্তেই আতঙ্কে বদলে গেল।

------“তুমি মাস্ক খুলেছ কেন? তোমার যে শ্বাসের সমস্যা হবে। কি করছিলে!

কথাটা বলেই নার্স দ্রুত এগিয়ে এসে মাস্কটা মুখে পড়াতে নিলেই নার্সের হাত সরিয়ে দিল সে। এরপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল,

-----“আপনে ক্যাডা? আমার আম্মা কই আর এইডা কোন জায়গা? কই লইয়া আইছেন আমারে?

নার্স থমকে গেলেন। মেয়েটা যেভাবে উত্তেজিত হচ্ছে এতে প্রবলেম আরও বাড়বে। কি করবে বুঝতে পারলো না, তবুও ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল-

------“তোমার মা বাইরে আছে।

রোদসীর চোখে সঙ্গে সঙ্গে পানি জমে উঠল।

-----“মায় আইছে?

------“হ্যাঁ। তোমার মা এসেছে।

-----“তাইলে আমার কাছে নাই ক্যান? আমার মায় তো আমারে কুনোদিন একলা ছাড়ে নাই, তাইলে অহন আমার পাশে নাই ক্যান?

নার্স নরম গলায় বললেন—

-----“তোমার মা তোমার পাশেই ছিলো কিন্তু তুমি তো গতকাল থেকে অজ্ঞান ছিলে। এখন কখন জ্ঞান ফিরবে তা তো কেউ জানেনা। উনি ওয়াশরুমে গেছে। এক্ষুনি ফিরে আসবে, তুমি শান্ত হও। অক্সিজেন মাস্কটা পড়িয়ে দেই। শান্ত হও প্লিজ।

রোদসী নার্সের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের পেটের দিকে তাকাল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—

-----“আমার বাচ্চা?

নার্স এক মুহূর্ত থেমে গেলেন। চোখে পেশাদার শান্তভাব রাখার চেষ্টা করলেও রোদসীর প্রশ্নে তার মুখের কোমলতা বেড়ে গেল।

-----“ডাক্তার আসছে। আগে তুমি শান্ত হও।

-----“না। আগে কন আমার বাচ্চা ঠিক আছে? আমার বাচ্চাডার কিছু হয় নাই তো?

------"কিছু হয়নি তোমার বাচ্চার। সে ঠিক আছে।

হঠাৎ করেই দরজার দিক থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। রোদসীর ভ্রু কুঁচকে গেল। কণ্ঠটা কোথায় যেন শুনেছে সে। খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে করতে পারলো না।

ওর এই ভাবনার মাঝেই ভেতরে ঢুকল ইফতি। তার পেছনে কাব্য।

রোদসীর জ্ঞান ফিরেছে দেখে ইফতির মুখে সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। প্রায় আঠারো-উনিশ ঘণ্টা পর মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে। ইফতি দ্রুত বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

-----“কেমন লাগছে এখন?

রোদসী কিছু বুঝতে না পেরে চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইফতি একটু ঝুঁকে ওর চোখের দিকে তাকালো। তারপর কপালে হাত রেখে শরীরের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল। কয়েক সেকেন্ড পর নার্সের দিকে তাকিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু জিজ্ঞেস করল। সবকিছু ঠিকঠাক আছে বুঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

-----“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুমি অনেকক্ষণ অচেতন ছিলে। এখন জ্ঞান ফিরেছে, সেটাই সবচেয়ে ভালো খবর। হয়তো এখন একটু দুর্বল লাগছে কিন্তু স্যালাইনটা শেষ হলেই হালকা কিছু খাইয়ে দিবো তোমাকে। তখন দেখো সব ভালো লাগবে।

রোদসী ধীরে ধীরে নিজের পেটের দিকে তাকাল।

-----“আমার বাচ্চা?

ইফতি মৃদু হেসে বলল—

-----“বাচ্চা ঠিক আছে। একটু পেটে আঘাত পেয়েছিলে কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ কোন সমস্যা হয়নি। রক্তক্ষরণের বিষয়টাও আমরা সামলে নিয়েছি।

রোদসীর চোখে পানি জমে উঠল। ইফতি এবার কাব্যের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। যেন বোঝালো, এখন কথা বলা যেতে পারে, তবে খুব বেশি নয়।

আজ কাব্যকে অন্যরকম লাগছে। গত রাতের সেই পাঞ্জাবি নেই। পরনে সাধারণ কালো শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। রাতভর ঘুম না হলেও চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কাব্য কয়েক সেকেন্ড রোদসীর দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটা জেগে আছে। চোখ খোলা। এটাই আপাতত তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কাব্য ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। রোদসীর চোখও তার ওপর স্থির। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল—রেললাইনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি । অন্ধকারের মধ্যে ছুটে আসা একজন মানুষ। তারপর সেই শক্ত হাত। রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

-----“আপনে”

কাব্য থেমে গেল।

----“চিনতে পেরেছেন আমাকে, আমি গতকাল আপনাকে যে বাঁচালাম? মনে পড়ছে কিছু?

রোদসী খুব আস্তে মাথা নাড়ল। চোখের কোণে আবার পানি জমে উঠল। তারপর আচমকাই বলল-

-----“আমি, আমি তো মরি নাই তাই না? বাজান অহন আমারে আবার মাইরা ফালাইবো। রিফাত ভাই তো কুনোদিন আমারে স্বীকার করবো না, আমার বাচ্চাডাও হের বাপরে পাইবো না। আপনে হুদাই আমগোরে বাঁচাইছেন।

কাব্যের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল।

----“কেউ মারবে না আপনাকে। আর আপনি যার সন্তান গর্ভে নিয়েছেন সেও ঠিকই আপনাকে মেনে নেবে। আপনার সন্তানও তার বাবাকে পাবে বুঝেছেন?

রোদসী কাঁপা গলায় বলল—

------“মিছা কথা কইয়া কি লাভ পাইতাছেন কন তো? আমি ছোট মানুষ হইলেও বুঝি, কেউ নেই আমার লগে। সব বুঝি আমি।

কাব্য এক মুহূর্তের জন্য ইফতির দিকে তাকাল। ইফতি চোখের ইশারায় বোঝাল—এখনই তাকে বেশি উত্তেজিত করা যাবে না। মেয়েটা যেহেতু অক্সিজেন ছাড়া ভালো করে শ্বাস নিতে পারছে তো এটা ভালো খবর আমাদের জন্য কিন্তু সে এখনো স্টেবল নয়।

কাব্য আবার রোদসীর দিকে তাকাল।

------“আপনি বলছেন আমি মিথ্যা কথা বলছি তাইতো? কিন্তু আমি যদি ম্যাজিক করে সবকিছু ঠিক করে দিতে পারি, তাহলে বিশ্বাস করবেন আমাকে?

রোদসী নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কাব্যের দিকে। যেন বুঝতে চাইছে লোকটা সব সত্যি বলছে কিনা। ওর তাকানো দেখে মুচকি হাসলো, তারপর রোদের ডানহাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় নিয়ে শান্তস্বরে বলল-

------“আমি তো অপরিচিত মানুষ আপনার। জানি আমাকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে কিন্তু তবুও বলছি শেষবারের মতো আমাকে একটু বিশ্বাস করুন। আমি সেই মানুষ যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাকে বাঁচালাম, তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখুন না, আমাকে কি সত্যিই একটু বিশ্বাস করা যায় কিনা ?

নার্স, ইফতি,কাব্য সবাই মিলে দম বন্ধ করে তাকিয়ে আছে রোদ কি বলবে তার জন্য। কয়েক সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পর মৃদু হাসলো রোদ-

-------" যদি বিশ্বাস করি তাইলে কি করবেন আপনে?

হাফ ছেড়ে বাচলো যেন সবাই। যাক অবশেষে মেয়েটা একটু হলেও শান্ত হয়েছে। কাব্য রোদের হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরলো তারপর বলল-

-----"কতটা কি করতে পারবো জানিনা। তবে নিজের সাধ্যমতো সবকিছু গুছিয়ে আনার চেষ্টা করবো। আপনার বাবা আপনাকে আর কোনোদিন ছুঁতেও পারবে না। আমি নিজে আপনার বাবাকে আপনার সামনে নিয়ে আসব।

রোদসীর চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। কাব্য থামল না।

-----“আর রিফাত? যাকে আপনি বিয়ে করেছিলেন, তাকেও আমি খুঁজে নিয়ে আসবো । সে যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক—তাকে আপনার সামনে এনে দাঁড় করাব। আপনার সন্তানের বাবা আপনার সন্তানের পাশে থাকবে কি না, সেটা আমি তার মুখ থেকে শুনব।

রোদসীর ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

-------“কিন্তু হেরা কেউ আমারে চাইবো না।

-------“কে বলেছে?

------“সবাই তো ছাইড়া দিছে আমারে।

------“কিন্তু আমি তো ছাড়িনি।

কথাটা খুব সহজভাবে বলল কাব্য। রোদসী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কাব্যর গলার স্বর আরও নরম হলো।

------“আপনি এখন একা নন, রোদসী। আপনার বাবার ভয়, রিফাতের ভয়, আপনার বাচ্চার ভবিষ্যৎ—সবকিছুর দায়িত্ব আমি নিলাম।

রোদসীর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

------“আপনে ক্যান করবেন এত কিছু?

কাব্য কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

-----“কারণ গতকাল যদি আমি আপনাকে না টানতাম, আজ তাহলে আপনি এখানে থাকতেন না। আর একটা জীবনকে মাঝপথে বাঁচিয়ে এনে তাকে আবার একা ফেলে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর আমি নই। তাই আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো।

রোদসী কিছু বলতে পারল না। কাব্য এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

------“তবে বিনিময়ে আপনাকেও আমাকে একটা কথা দিতে হবে। এই মুহূর্তে কোনো উত্তেজনা নয়। কান্না করে নিজেকে অসুস্থ করবেন না। আর নিজের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টাও করবেন না।

------"আমি বাঁইচা কি করুম? আমি তো আমার বাপের কলংক। তাইলে এত কিছু দিয়া কি হইবো?

কথাটা বলেই মাথা নিচু করল রোদসী। ফ্যাকাশে চোখে তাকালো কাব্য। বুঝতে পারল, ওর মনের ভয় এখনো কাটেনি। তাই ধীরে বলল,

-----“মরেও তো কিছু হবে না। উল্টো একটা নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাবে আপনার সাথে। লাভের লাভ কিছুই হবে না, তাই কোনো সুইসাইড অ্যাটেম্পট নয়। কোনোভাবেই না। আপনি শুধু নিজের জন্য না, আপনার পেটের ভেতর যে ছোট্ট মানুষটা আছে, তার জন্যও বাঁচবেন।

রোদসী পেটের ওপর হাত রাখল। কাব্য আবার বলল,

-----“আমি এখন চলে যাব। কিন্তু আপনাকে একা ফেলে যাচ্ছি না। আবার আসব। তবে এবার একা আসব না। আপনার বাবাকেও নিয়ে আসব আর রিফাতকেও খুঁজে বের করে নিয়ে আসব।

রোদসীর চোখে যেন ক্ষীণ একটা আশার আলো জ্বলে উঠল।

-----“সত্যি কইতাছেন? বাজান আইবো? রিফাত ভাই আইবো আমারে নিতে?

কাব্য শেষবারের মতো বলল,

-----“হ্যাঁ আসবে। সবকিছু আমি ঠিক করব। আপনার জীবনে যারা ঝড় এনেছে, তাদের সামনে দাঁড় করাব। আর আপনি যদি আমাকে সুযোগ দেন।

সে কয়েক সেকেন্ড থামল কাব্য।

-----“আমি আপনার জীবনটা নতুন করে সাজানোর মানুষ হয়ে ফিরে আসব।

রোদসী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

কাব্য উঠে দাঁড়াল।

------“তাই এখন শুধু একটা কাজ করবেন।

রোদসী খুব আস্তে বলল, “কী?

------“বাঁচবেন। নিজের মতো করে বাঁচবেন। আপনার সন্তান আসছে তো, তাকে নিয়ে মহানন্দে দিন পাড় করবেন। আপনার বয়স তো কম, এই বয়সে মানুষেরা কত কি করে, কত আনন্দ আরও কত কি। আপনিও সেসব করবেন। মুক্ত পাখির মতো আকাশে ডানা মেলে উড়বেন। সব খুশি আপনার আর বাকি সবকিছুর দায়িত্ব আমার। পারবেন এসব করতে?

রোদসী কতক্ষণ পর্যন্ত চুপ থেকে হালকা মাথা নাড়লো। সে পারবে, সবকিছু সে করতে পারবে। সব। সবটা জেনে মুচকি হাসলো কাব্য, এরপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

রোদসীর দিকে আরেকবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, মেয়েটা শান্ত হয়েছে। তারপর ইফতির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে বুঝিয়ে দিল—এখন আর কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।

এরপর আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালো না সে, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

________________________________________________

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার ছায়া ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। রাজধানীর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ব্যস্ততা অবশ্য তাতে একটুও কমেনি। দপ্তরের করিডোরজুড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনাগোনা। কোথাও ফাইল নিয়ে ছুটছে কেউ, কোথাও কোনো প্রকল্পের হিসাব নিয়ে আলোচনা চলছে। মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষের ভেতরেও তখন বেশ জমজমাট পরিবেশ।

টেবিলের একপাশে বসে আছেন ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী। সামনে ছড়িয়ে রাখা কয়েকটি ফাইল, ল্যাপটপ আর কিছু নকশা। তার ঠিক ডান পাশে বসে আছেন সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম। ছেলের সঙ্গে আজকের বৈঠকে তিনিও উপস্থিত হয়েছেন।

টেবিলের অপর পাশে মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একজন প্রতিনিধি, ক্রীড়া অবকাঠামো বিভাগের পরিচালক এবং যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তা বসে আছেন। সামনে বড় স্ক্রিনে ভেসে আছে একটি স্টেডিয়ামের নকশা।

কাব্য কলমটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

-----“আমরা যদি শুধু একটা স্টেডিয়াম বানানোর চিন্তা করি, তাহলে কাজটা খুব সহজ। কিন্তু আমি চাই, এই প্রকল্পটা শুধু একটা মাঠ বা গ্যালারি নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক।

কেউ কোনো কথা বলল না। কাব্য এবার সামনে রাখা একটা ফাইল খুলল।

------“আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই। সমস্যা হচ্ছে সুযোগের অভাব। ঢাকার বাইরে কত ছেলে-মেয়ে আছে যারা ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিকস কিংবা সাঁতারে অসাধারণ ভালো করতে পারে—কিন্তু একটা ভালো মাঠ নেই, কোচ নেই, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।

ক্রীড়া অবকাঠামো বিভাগের পরিচালক মাথা নেড়ে বললেন,

------“স্যার, আপনি যে তিনটা জেলা নিয়ে পাইলট প্রকল্পের কথা বলেছেন, সেগুলোর প্রাথমিক জরিপ শেষ হয়েছে। রংপুর, রাজশাহী আর বরিশাল—এই তিন জায়গায় জমি ও অবকাঠামোগত সম্ভাবনা সবচেয়ে ভালো পাওয়া গেছে।

কাব্য সঙ্গে সঙ্গে বলল,

-----“শুধু সম্ভাবনা দেখলে তো হবে না। স্থানীয় ছেলেমেয়েরা সেখানে আদৌ সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হবে।

একজন কর্মকর্তা নোট নিতে নিতে বললেন,

------“স্যার, আমরা প্রতিটি একাডেমিতে বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালুর প্রস্তাব করছি। অনূর্ধ্ব-১২, অনূর্ধ্ব-১৬ এবং অনূর্ধ্ব-১৮—এই তিনটা গ্রুপে ভাগ করা যেতে পারে।

কাব্য মাথা নেড়ে বলল,

------“ভালো। তবে মেয়েদের জন্য আলাদা সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ছেলেদের নিয়ে একাডেমি করলে হবে না। মেয়েদের ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস—সবকিছুর জন্যই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চাই।

জাহাঙ্গীর আলম এতক্ষণ চুপচাপ ছেলের কথা শুনছিলেন। এবার মৃদু হেসে বললেন,

------“তুই বরাবরই অবকাঠামোর চেয়ে সুযোগের ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব দিস।

কাব্য বাবার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

------“শুধু মাঠ বানিয়ে তালা মেরে রাখার কোনো মানে হয় না, আব্বু। মাঠে খেলোয়াড় না নামলে ওই মাঠের কী মূল্য? ওখানে কি তুমি পুকুর খনন করে মাছ ছাড়বে?

জাহাঙ্গীর আলম হকচকিয়ে গেলেন কিন্তু বাকিরা কাব্যের কথার ধরণে হেসে উঠলেন। কাব্যও মৃদু হাসল, তবে পরক্ষণেই আবার গম্ভীর হয়ে গেল।

------“আর একটা বিষয়। আমরা শুধু জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির চিন্তা করছি না। স্কুল পর্যায় থেকেই প্রতিভা খুঁজে বের করতে হবে। একটা ছেলে হয়তো আজ স্কুলের মাঠে খালি পায়ে ফুটবল খেলছে। তার মধ্যে যদি প্রতিভা থাকে, শুধু টাকা নেই বলে সে যেন হারিয়ে না যায়।

একজন কর্মকর্তা বললেন,

------“স্যার, সেক্ষেত্রে কিন্তু জেলা পর্যায়ে স্কাউটিং টিম করা যেতে পারে।

—“তাহলে তাই করুন।”

কাব্যের উত্তর একদম দ্রুত।

-----“প্রতিটি জেলার স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিভা বাছাই হবে। শুধু পরিচিত কারও সুপারিশে নয়। পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বাছাই করিও।

জাহাঙ্গীর আলম এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে গর্বিত চোখে হাসলেন। এই মানুষটাকে তিনি ছোটবেলা থেকে নিজ হাতে মানুষ করেছেন। খেলা নিয়ে কাব্যের আগ্রহটা নতুন নয়। ছোটবেলায়ও কোনো খেলোয়াড়ের ম্যাচ থাকলে ছেলেটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকত। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহই এখন দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।

কাব্য ফাইলের শেষ পাতাটা উল্টে বলল,

-----“ঠিক আছে। তাহলে এই অংশটা সংশোধন করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে আবার নিয়ে আসবেন। বাজেটের বিষয়টা আলাদাভাবে দেখব। আর প্রকল্পের একটা অংশ দরিদ্র পরিবারের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য স্কলারশিপ হিসেবে রাখতে হবে।

উপস্থিত সকলেই সব কথাই ভালো করে বুঝে নোট করে নিলো। ঠিক তখনই সম্মেলনকক্ষের দরজায় হালকা টোকা পড়ল। কাব্য মুখ তুলে তাকাল।

দরজা খুলে একজন নিরাপত্তাকর্মী ভেতরে ঢুকল। তার মুখে পেশাগত গাম্ভীর্য। কাব্যের কাছে এসে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

------“স্যার রোদসীর বাবা এসেছেন।

কাব্যের হাতে থাকা কলমটা থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সম্মেলনকক্ষের সব আলোচনা যেন তার কানে থেমে গেল। রোদসীর বাবা। শফিক মাস্টার। যে মানুষটা নিজের মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। যে মেয়েটা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল আর সে মানুষটি একবারও হাসপাতালে আসেনি। কাব্যের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। তবু সে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল,

-----“কোথায় উনি?

------"বাইরে বসিয়ে রেখেছি, স্যার।

কাব্য কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল। মিটিংয়ের শেষ আলোচনাটা এখনো বাকি। সে সবার দিকে একবার তাকালো, ওরা নিজেদের মতো আলোচনায় ব্যস্ত। সেদিকে দেখে

সে শান্ত গলায় বলল,

------“আর দশ মিনিট অপেক্ষা করতে বলো। হাতের কাজটা শেষ করেই আমি আসছি, তার সাথে অনেক আলোচনা বাকি।

লোকটি মাথা নেড়ে যেতে নিলে কাব্য আবার বলল,

-----“আর হ্যাঁ, উনাকে সম্মানের সঙ্গে বসতে দাও। চা কফি দাও। আর খেয়াল রেখো, কেউ যেন অযথা প্রশ্ন না করে।

------“জি স্যার।

লোকটি বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাব্য কিছুক্ষণ নীরব রইল। জাহাঙ্গীর আলম ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।

তিনি বুঝতে পারছেন—মাত্র কয়েকটা শব্দ কাব্যের ভেতরের কোনো একটা জায়গাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

তবু তিনি কিছু বললেন না। কাব্য ধীরে ধীরে সামনে রাখা ফাইলটার দিকে তাকাল।

একজন কর্মকর্তা আবার কথা শুরু করলেন। কিন্তু এবার কাব্যের মন পুরোপুরি মিটিংয়ে নেই। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে হাসপাতালের সেই সাদা বিছানা। অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা রোদসীর মুখ। তারপর কাঁপা গলায় করা সেই প্রশ্ন—

------“যদি বিশ্বাস করি তাইলে কি করবেন আপনে ?

কাব্য খুব আস্তে আঙুলের মধ্যে কলমটা ঘুরাতে লাগল।

তারপর নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,

“তোমার বাবা এসেছে, রোদ। তোমার সেই সমাজের চোখে সম্মানিত বাবা এসেছে। ”

চলবে,

[ রংপুর, রাজশাহী আর বরিশালের পাঠকরা সাড়া দাও। তোমাদের তরুণ মন্ত্রীকে পাঠাচ্ছি তোমাদের এলাকায় 😁।

আর বলো তো কি হতে চলেছে আগামী পর্বে? কি কথা হবে মন্ত্রীমশাই আর মাস্টারমশাই এর মধ্যে? কাব্য কি পারবে রোদের সবকিছু ঠিক করে দিতে? বলিও কিন্তু 🫠]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন