ফন্ট সাইজ:
থিম:
রোদ্দুরের রেশ

৪র্থ পর্ব

লেখক: আরশিয়া নূর

#রোদ্দুরের_রেশ [৪]

#আরশিয়া_নূর

[অনুমতি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে।

রোদকে দেখে কাব্য বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই নিজের চেম্বারে এসেছে ইফতি। রোদের পাশে নার্স আছে আর ওর মাকে কিছুক্ষণ আগে কবির এসে নিয়ে গেছে। চেম্বারের টেবিলজুড়ে জমে থাকা কয়েকজন রোগীর ফাইল একে একে খুলে দেখছিল সে। কারও রিপোর্ট, কারও আল্ট্রাসনোগ্রাফির ফলাফল, আবার কারও পুরোনো প্রেসক্রিপশন—সবকিছু মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল।

এমন সময় দরজায় হালকা টোকা পড়তেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো সে, তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল-

-----“কে বাহিরে? ভেতরে আসুন।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন কবিতা চৌধুরী। তার পেছনে ইরা। দুজনের হাতেই কয়েকটা ছোট খাবারের বক্স আর ব্যাগ। মাকে আর বোনকে এই সময় হাসপাতালে দেখে অবাক হলো সে।

-----“আম্মু , তোমরা এই সময় এখানে?

কবিতা চৌধুরী ব্যাগগুলো টেবিলের ওপর রেখে বললেন—

-----“হ্যাঁ। তোর বাবার মুখে শুনলাম রোদসী মেয়েটা নাকি এখানে একা আছে । তার উপর গ্রাম থেকে এসেছে ওর মা, কি খেল না খেলো তা তো আর জানিনা। তাই ওদের জন্য বাসা থেকে একটু খাবার বানিয়ে নিয়ে এসেছি। হাসপাতালের খাবার তো সবসময় খেতে ইচ্ছা করবে না। নিজের হাতে বানানো কিছু খেলে হয়তো মেয়েটার ভালো লাগবে।

ইফতি খাবারের বক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

-----“তুমি এত মায়া কোথায় পাও আম্মু? চেনোনা জানো না, হুট করে একজনের জন্য খাবার বানিয়ে নিয়ে এলে বাহ!

--------" কে বলেছে চিনি না? বকুলতলা গ্রামের বৌমা আমি। আর তোর আব্বুর মুখে শুনলাম ওরা নাকি বাহাদুরগড়ের। পাশাপাশি দুটো গ্রাম একই এলাকার মানুষ আমরা, তাহলে অচেনা হলাম কি করে? তাছাড়া শুনলাম মেয়েটা এখনও পর্যন্ত কাব্যের দায়িত্বে আছে। তাহলে এটুকু তো দেখা করতেই পারি আমি, তাই না?

আর কিছু বলল না ইফতি। ও বেশ ভালো করেই বুঝে গেছে, মায়ের সাথে আর কথায় পারবে না। উনি ঠিক করো না কোন যুক্তিতে ওকে থামিয়ে দেবে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হাতের রিপোর্ট গুলো দেখে নিল সে, তারপর সেগুলো এক পাশে সরিয়ে রেখে একটু গম্ভীর হয়ে বলল-

------“এসেছো ভালো হয়েছে। মেয়েটার মা পাশে নেই, কাব্য নিয়ে গেছে কবির কে পাঠিয়ে। মেয়েটার মনটা খুব খারাপ আম্মু।

কবিতা চৌধুরীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

----“এত ছোট একটা মেয়ে। এই বয়সে এতকিছু হয়ে গেছে ওর জীবনে। মন ভালো থাকবে কী করে?

ইফতি ধীরে ধীরে বলল—

-----“ঠিক সেটাই। শারীরিকভাবে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। কিন্তু মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে। বারবার নিজের বাবার কথা বলছে, নিজের বাড়ির কথা বলছে। আবার বাচ্চাটাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে। তার ওপর রিফাতের মৃত্যুর খবরটাও ওর জন্য অনেক বড় ধাক্কা। যদিও কাব্য বারণ করেছে তাই রিফাতের মৃত্যুর খবর ওকে জানাইনি, তোমারাও জানিও না। পরে কাব্য নিজের সময় সুযোগ মতো ওকে বলে দেবে।

ইরা চুপ করে গেল। ইফতি এবার দুজনের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—

-----“আমার পেশেন্ট আছে আমি একটু বিজি থাকব, তোমরা দুজনে চলে যাও। গিয়ে ওর সাথে কথা বলো, দেখো যদি মনটা ভালো করতে পারো। খুব ভারী কোনো কথা বলার দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে। ওর সঙ্গে গল্প করবে, হাসাবে। যেন কিছুক্ষণের জন্য হলেও ও বুঝতে পারে, হাসপাতালের ওই বিছানাটাই ওর পুরো পৃথিবী না।

কবিতা চৌধুরী ধীরে মাথা নাড়লেন।

-----“বুঝেছি মা।

ইফতি আবার বলল—

-----“আর একটা ব্যাপার। ওকে কোনোভাবেই এমন কোনো প্রশ্ন করবে না যাতে ওর পুরোনো কষ্টগুলো আবার মনে পড়ে যায়। ও নিজে থেকে কিছু বললে শুনবে। জোর করে কিছু জানতে চাইবে না।

-----“আচ্ছা।

-----“আর খাবারগুলো নিয়ে যাও। কিছুক্ষণ আগে স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে, এখন খেতে পারবে।

-----“আচ্ছা চল। যাই।

ইফতি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

-----“চলো। আমি তোমাদের নিয়ে যাই। ওর কেবিন তোমাদের দেখিয়ে দিয়ে তারপর আমি আমার অন্য পেশেন্টদের ওখানে যাব।

কথা শেষ করে তিনজন ধীরে ধীরে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। রোদের কেবিনের সামনে এসে দরজায় নক করলেন কবিতা চৌধুরী। রোদসী তখন চুপচাপ শুয়ে ছিল। চোখের পাতা ভারী, শরীর এখনো দুর্বল। এক হাত পেটের ওপর রাখা। কাব্য যাওয়ার আগে বলে গেছে—কান্না করা যাবে না, বেশি কথা বলা যাবে না। কথাগুলো অদ্ভুতভাবে মনে গেঁথে আছে তার।

এসব ভাবনার মাঝেই দরজায় নক করার শব্দ হতেই একটু চমকে তাকালো দরজার দিকে। তাকাতেই দেখল ভেতরে একজন ঢুকছে একজন মধ্যবয়সী মহিলা। পরনে পরিপাটি শাড়ি, মুখে মায়ামাখা হাসি। তার পেছনে উঁকি দিয়ে ঢুকল এক তরুণী মেয়ে। হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। মেয়েটার চোখেমুখে কৌতূহল, তবে মুখে দুষ্টুমি লেগেই আছে।

রোদসী অপরিচিত মানুষ দেখে সঙ্গে সঙ্গে একটু সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

কবিতা চৌধুরী ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

-----“কেমন আছো মা?

রোদসী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়ল।

-----“জ্বী, ভালো আছি।

মহিলার মুখে সঙ্গে সঙ্গে কোমল হাসি ফুটে উঠল।

-----“ভালো আছো, এটা শুনেই তো মনটা ভালো হয়ে গেল। আমরা তোমাকে দেখতে এসেছি। ভয় পেয়ো না। কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যাব।

পেছন থেকে মেয়েটা এগিয়ে এসে বিছানার অন্য পাশে দাঁড়াল।

-----“আমি ইরাবতী। অবশ্য তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তোমাকে চিনি। পুরোপুরি না তবে কাব্য ভাইয়ার মুখে তোমার কথা শুনেছি।

রোদসীর চোখে একটু ভয় ফিরে এলো এবার। ভাইয়া?

কাব্য? তাহলে এরা কি মন্ত্রী মশাইয়ের পরিবারের মানুষ?ওর মুখ দেখে কিছুটা বুঝতে পেরে ইরা হেসে বলল,

-----“হ্যাঁ, তুমি ঠিক ধরেছো। আমি ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরীর ছোট বোন। আর উনি আমার মা।

রোদসী তাড়াতাড়ি একটু নড়েচড়ে বসতে গেল।

----“আপনে, মন্ত্রী মশাইয়ের মা?

কবিতা চৌধুরী দ্রুত তার কাঁধে হাত রাখলেন।

-----“আরে আরে, উঠতে হবে না মা। শুয়ে থাকো। তোমার শরীর এখনো দুর্বল।

রোদসী আবার বালিশে মাথা রাখল। মুখে তখনও অস্বস্তির ছাপ। কবিতা চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মেয়েটা শ্যামলা। চেহারায় প্রচলিত অর্থে তেমন কোনো সাজসজ্জার সৌন্দর্য নেই। অথচ এই মুখটার দিকে তাকালে চোখে অদ্ভুত এক মায়া আটকে যায়। ঠোঁটের ঠিক নিচে থাকা ছোট্ট তিলটাও যেন মায়াবী মুখটার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গ্রামের মানুষজন এমনিতেই সারাক্ষণ রোদে-রোদে ঘুরে বেড়ায়। নিজেদের শরীরেরও ঠিকঠাক যত্ন নেয় না। রোদও ঠিক তেমনই। এই মেয়েটা যদি নিজের শরীরের একটু যত্ন নিত, তাহলে কি কোনো অংশে তাকে একজন পূর্ণ মায়াবতী বলে মনে হতো না?

কবিতা চৌধুরীর চোখ এবার আটকে গেল রোদসীর চুলে। কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা ঘন, কালো, লম্বা চুলগুলো বালিশের ওপর ছড়িয়ে আছে। অযত্নে এলোমেলো হয়ে থাকা সেই চুলের মাঝেও যেন মেয়েটার নিজস্ব এক সরল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

তিনি মুগ্ধ চোখে চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন,

----“মা, তোমার চুলগুলো কি সুন্দর!

রোদসী অবাক হয়ে নিজের চুলের দিকে তাকাল।

----“আমার?

----“হ্যাঁ, তোমারই। এত লম্বা চুল আমি অনেকদিন পরে দেখলাম।

ইরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

-----“আম্মু, তুমি আবার শুরু করেছ! তুমি যাকে দেখো তার চুল, চোখ, নাক—সবকিছুর প্রশংসা শুরু করে দাও।

কবিতা চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

তারপর আবার রোদসীর দিকে তাকালেন।

------“তোরা আমাকে কি ভাবিস তা তো আমি জানিনা, কিন্তু যেটা সত্যি সেটাই বলছি আমি। আল্লাহ প্রত্যেকটা মানুষকে কোনো না কোনো দিক দিয়ে সুন্দর করে দেন। কাউকে চেহারা দিয়ে, কাউকে কণ্ঠ দিয়ে, কাউকে বুদ্ধি দিয়ে, কাউকে মায়া দিয়ে। আল্লাহ তার কোন বান্দাকেই অপূর্ণ রাখে না। এই যে রোদ—শ্যামলা, খুব সাধারণ দেখতে একটা মেয়ে। কিন্তু ওর মুখটার দিকে তাকালে কেমন যেন মায়া লাগে। চোখ দুটোতেও মায়া আছে। তার ওপর এত সুন্দর লম্বা চুল। সব মিলিয়ে আমার চোখে সে - গুলবাহার।

একটু থামলেন তিনি। তারপর আবার বললেন,

-------"গুলবাহার মানে জানো তুমি? গুল মানে ফুল, আর বাহার মানে বসন্ত। অর্থাৎ যে ফুলে বসন্তের মতো সৌন্দর্য আর মায়া মিশে থাকে, তাকে গুলবাহার বলা যায়। তাই আমার চোখে রোদও গুলবাহার—খুব সাধারণ হয়েও যার মধ্যে আলাদা একটা মায়া আছে।

রোদসী কিছু বলল না। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কবিতা চৌধুরীর দিকে। জীবনে কেউ তাকে এভাবে সুন্দর করে কিছু বলেছে কি না, মনে করতে পারল না। গ্রামের মানুষের মুখে তার চেহারা নিয়ে কত কথা সে শুনেছে। কখনো কালী, কখনো বলেছে ওকে দেখলে দিন খারাপ যায়, কখনো বলেছে পাতিলের তলা—কিন্তু আজ প্রথম কেউ তাকে এভাবে দেখল।

ইরা মুচকি হেসে বলল,

-----“তুমি জানো রোদ? আম্মুর কাছে কেউ কখনো খারাপ দেখতে হয় না। তুমি যদি খুব সুন্দর নাও হও, যদি দুনিয়ার খুব কুৎসিত মানুষও হও, তবুও আম্মু তোমাকে কোনো না কোনোভাবে সুন্দর বানিয়ে দেবেই।

ইরার কথায় রোদসীর ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটে উঠল। কবিতা চৌধুরী সেটা দেখে যেন স্বস্তি পেলেন। ইরা চেয়ার টেনে আরও একটু সামনে এগিয়ে এসে বসতে বসতে বলল,

-----“তোমার বয়স কত?”

রোদসী একটু থেমে বলল, —“পনেরো।

ইরার চোখ বড় হয়ে গেল।

------“মাত্র পনেরো!

রোদসী মাথা নাড়ল। ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুব নরম গলায় বলল,

-----“তাহলে তো তুমি আমার থেকেও অনেক ছোট। আমার বয়স একুশ বছর অথচ তোমাকে দেখে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি অনেক বড় হয়ে গেছো। অবশ্য প্রেগন্যান্ট মানুষদের একটু বেশিই বয়স্ক লাগে, বয়স কম হলেও।

ইরা একটু চুপ থেকে বলল -

------“একটা কথার উত্তর দাও তো? তুমি কি ভাইয়াকে ভয় পাও?

রোদসী একটু থমকে গেল। বুঝতে পারলো না ঠিক কি উত্তর দেবে, তা দেখে হেসে ফেলল।

-----“আরে চিল মামা, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভাইয়া দেখতে যতটা রাগী, আসলে ততটা না। তবে আমি তোমার থেকে বড় হলেও, ভাইয়ার কাছে আমি দেড় ব্যাটারি। ইবলিশ সবসময় ছোট করে আমায়, আমি কখনো বড় হবো না ওর কাছে।

দেড় ব্যাটারি শব্দটা শুনে ফিক করে হেসে ফেললো রোদসী। মেয়েটা কি বকবক করে। অচেনা একজনের সাথে কিভাবে মন খুলে কথা বলছে, তাহলে চেনা মানুষগুলোর সাথে কি করে সেটাই ভাবতে লাগলো সে। তবে মেয়েটা যে মিশুক, তা বেশ বুঝতে পারলো রোদ।

কবিতা চৌধুরী কতক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

-----“কাব্য তোমার সঙ্গে কী কী কথা বলেছে মা?

রোদসী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

------“বলেছে, আমি যেন ভয় না পাই। উনি আমার বাবা আর স্বামীকে সঙ্গে ককরে নিয়ে আসবেন আমার কাছে।

রিফাতের কথা মাথায় আসতেই মনটা খারাপ হলো কবিতা চৌধুরীর। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই ইরার, সে বিষ্মিত ভঙ্গিতে বলল-

------“তুমি আমাদের মতো করে কথা বলতে পারো?

------“হুম পারি। ক্লাস নাইনে পড়ি আমি, স্কুলে ভালো করেই তো কথা বলে সবাই। আমিও বলি কিন্তু জানিনা কেন গ্রামের ভাষায় কথা বলতে ভালো লাগে।

------“বুঝেছি।

কবিতা চৌধুরী আর দেরি করলেন না। অনেক গল্প হয়েছে, এবার মেয়েটার কিছু খাওয়া দরকার। বাসা থেকে নিজের হাতে রান্না করে নিয়ে আসা খাবারের বক্সগুলো খুলে একে একে সামনে রাখলেন তিনি। তারপর খুব যত্ন করে খাবার তুলে রোদসীকে খাওয়াতে শুরু করলেন।

রোদসী প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও কিছু বলল না। চুপচাপ মুখে খাবার তুলে নিতে লাগল। কিন্তু কয়েক লোকমা যেতেই তার চোখ দুটো অকারণেই ভিজে উঠল। মায়ের পর এই প্রথম কোনো অচেনা মানুষ তাকে এভাবে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। শুধু খাওয়ানো নয়, তার ঝাল লাগছে কিনা, খাবারটা ভালো লাগছে কি না—সবকিছুর দিকেই কী ভীষণ মায়া নিয়ে খেয়াল রাখছেন তিনি।

এই পাচটা মাস ঠিকমতো কোন খাবার খেতে পারতো না সে। যাই খেতো বমি হয়ে যেত। ভালোমন্দ কিছু খেতে চাইলেও সাহস হতো না কাউকে কিছু বলার। বাবার শিক্ষকতা করে ওইটুকু টাকা দিয়ে, পাঁচ জন মানুষের সংসার, দাদির ওষুধ সবমিলিয়ে অনেক কষ্টে কোটেছে দিন। একটু খাবারের জন্য হাহাকার করেছে কতবেলায়। তাই আজ এই সামান্য যত্নটুকুও তার কাছে যেন অনেক বড় কিছু।

আর পারল না রোদসী। খাবার মুখে নিয়েই নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল। কবিতা চৌধুরী থেমে গিয়ে মমতায় তার মাথায় হাত রাখলেন।

------“কী হলো মা? কাঁদছো কেন? ঝাল লেগেছে? কিন্তু আমি তো ঝাল দেইনি, হালকা খাবার করেছি।

রোদসী চোখের পানি মুছে মাথা নাড়ল। কিছু বলতে পারল না। শুধু আবার মুখ বাড়িয়ে দিল খাবারের দিকে। কবিতা চৌধুরীও আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বুঝলেন, মেয়েটার কান্নার কারণ জানতে চাওয়ার চেয়ে এই মুহূর্তে তাকে একটু আদর করে খাইয়ে দেওয়াটাই বেশি জরুরি।

কাঁদতে কাঁদতে চুপচাপ খেতে লাগল রোদসী।

মনে মনে অদ্ভুত একটা কথাই বারবার আসছিল তার—

বড়লোকেরাও এত ভালো হয়? কই রিফাতেরা তো এমন নয় তাহলে এনারা এত ভালো কেন?

এবার বুঝলো সে মন্ত্রী মশাই এত ভালো মানুষ কী করে হয়েছে। যার মা এতটা মায়াবতী, যার বোনও এত সহজে আপন করে নিতে পারে একজন অচেনা মানুষকে, এমন একটা পরিবারে বড় হওয়া মানুষটা ভালো না হয়ে কী পারে?

________________________________________

ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুম।

বাইরের ব্যস্ত করিডোরের শব্দটা ভারী কাঠের দরজা পেরিয়ে ভেতরে এসে খুব ক্ষীণ হয়ে গেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও তরুণ প্রতিভা অন্বেষণ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটা এইমাত্র শেষ করেছে কাব্য। মিটিং শেষে উপস্থিত কর্মকর্তারা একে একে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কাব্য নিজেই শফিক মাস্টার এবং রোদসীর মাকে ভেতরে নিয়ে এসে বসিয়েছে। বিশাল টেবিলের চারপাশে এখন মাত্র চারজন মানুষ বসে আছে।

টেবিলের একপাশে কাব্য ও জাহাঙ্গীর আলম। অপর পাশে শফিক মাস্টার ও রোদসীর মা। কিছুক্ষণ আগেও যে ঘরে দেশের ক্রীড়া উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত আলোচনা চলছিল, সেই ঘরেই এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিষয় নিয়ে কথা বলার প্রস্তুতি চলছে।

কাব্য কিছুক্ষণ চুপচাপ শফিক মাস্টারের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটার দিকে তাকাতেই, গতকাল রাতের সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোদের জীর্ণ চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।

কাব্য ধীরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—

-----“ভালো আছেন মাস্টার সাহেব?

------"হুম ভালো আছি।

কাব্য কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলো। কিভাবে কথা শুরু করবে এটাই বুঝতে পারছে না। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরেছে যেন। জাহাঙ্গীর আলম বোধহয় ছেলের অবস্থা বুঝলেন। তাই টেবিলের নিচ দিয়ে কাব্যের হাত মুঠোয় নিয়ে শান্ত হতে বললেন। শান্ত মস্তিষ্কে কথা বলতে বললেন, সাথে এটাও বোঝালেন উনি কাব্যের পাশে আছেন।

মুচকি হাসলো কাব্য। এরপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাকাল সফিক সাহেবের দিকে।

-----"দেখুন মাস্টারমশাই, আমি এত ভনিতা করে কথা বলতে পছন্দ করিনা। তাই যা বলার সরাসরি বলছি।

শফিক মাস্টার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

-----“কন, কি কইবা চান।

-----“গতকাল আপনার মেয়েকে, আপনি যে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন, এটা কি ঠিক করেছেন? তার গর্ভে তো কোন জারজ সন্তান ছিলো না যে সমাজে লোকজন আপনার দিকে আঙুল তুলবে। তাহলে ওই অবস্থায় একটা বাচ্চা মেয়েকে কিভাবে আপনি বিষ এনে দিয়েছিলেন? কিভাবে বলেছিলেন তোর মতো মেয়ের বাঁচার অধিকার নেই?

প্রশ্নটা শুনেই রোদসীর মা মাথা নিচু করে ফেললেন।

শফিক মাস্টার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর গলার স্বরটা ভারী করে বললেন—

-------“যে মাইয়া বাপ মায়ের কথা মানে না, তাগো সম্মানের কথা ভাবে না - হেই রকম মাইয়ার বাঁইচা থাকনের কোন অধিকার নাই।

রোদসীর মা সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠলেন।

-----“ওরে এভাবে কইয়েন না। শালুক আপনের মাইয়া, নিজ হাতে কষ্ট কইরা পাইলাপুইষা বড় করছেন মাইয়ারে, এমনে কইয়েন না। তাতে যে মাইয়ার অমঙ্গল হয়।

শফিক মাস্টার স্ত্রীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।

------“তুমি চুপ করো। তোমার জন্যই ওয় এত মাথায় উঠবার পারছে। কোন কথা কইবানা তুমি, চুপ কইরা থাকবা।

কাব্য হাত তুলে খুব শান্তভাবে বলল—

------“আপনি ওনাকে কথা বলতে দিন। থামাচ্ছেন কেন? আমরা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে বসেছি। কারও কথা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য না।

জাহাঙ্গীর আলম এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনিও ধীর গলায় বললেন—

------“কাব্য ঠিক বলেছে। মেয়েটার ব্যাপার। উনি তো রোদের মা, ওনারও মেয়ের বিষয় কথা বলার অধিকার আছে।

শফিক মাস্টার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললেন—

------“অধিকার? আপনে কিসের অধিকারের কইতাছেন এমপি-সাব? হেয় তো আরও বড় নিমকহারাম আমার সংসারে। মাইয়া পেট বাধাইছে আর হেয় কিনা আগলায়া রাখছে। হের কাছে কি সেদিন মনে হয়নাই এইডা পাপ? সেদিন বিষ দিয়ে ক্যান মারলো না? খালি মাইয়ার দিকে এত দরদ কিন্তু সংসারের সম্মান রক্ষা করার বেলায় কোন দায়িত্ব নাই।

একটু থামলেন তিনি তারপর বললেন -

------" আমি একজন শিক্ষক। একটা গ্রামে এত বছর ধইরা পড়াইতাছি। মানুষ আমারে ম্যালা সম্মান করে। আমার পরিবারের হগল মানুষরে সম্মান করে। সেই পরিবারের মাইয়াই যদি বিয়ার আগে…......”

তিনি কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন। রোদসীর মা চোখ মুছে বললেন—

------“তুমি জানো না তাই কইতাছ কিন্তু এইডা সত্যি না। সত্যি কি হেইডা আমি জানি। আমি নিজে গিয়া ওই মোল্লার লগে কতা কইছি। মাদবরের পোলাও আমারে কইছে হেয় বিয়া করছে আমার মাইয়ারে। কিন্তু অহন অস্বীকার করতাছে।

------“চুপ কর নষ্টা মহিলা!

শফিক মাস্টারের কণ্ঠে এবার রাগ।

-----“বিয়ার গল্প আমারে শোনাতে হইবো না। মানলাম বিয়া হইছে কিন্তু তার পর্মান কই?গ্রামের মানুষ কি এইডা বিশ্বাস করবো? তাছাড়া তুমি জানো আইজ রিফাতের লাশ পাওয়া গ্যাছে। যেই জায়গায় তোমার মাইয়া মরার জন্য গেছিল, তোমার মাইয়ার রক্ত ঝরছে ঠিক ওই জায়গাতেই লাশ পাওয়া গ্যাছে। ট্রেনের তলে পইড়া মরছে রিফাত, চারদিকে অর গায়ের মাংস, ভুড়ি সব ছিটাইয়া পইড়া আছিল। নিজের চক্ষে দেখছি আমি।

জাহাঙ্গীর আলম, রোদসীর মা বিষ্ফোরিত নয়নে তাকালো শফিক মাস্টারের দিকে। কাব্যও তাকিয়ে আছে কিন্তু সে অবাক হয়েছে কিনা তা বোঝা গেল না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো সবাই, এরপর কাব্য শান্ত গলায় বলল-

------“দেখুন মাস্টারমশাই রিফাত যে মারা গেছে এটা আমি সকালেই জেনেছি। আপনি যতই শিক্ষক হোন না কেন, আপনার মাঝে ওই গ্রামের ছায়া রয়ে গেছে, হয়তো যতদিন বাঁচবেন এটা আপনার সঙ্গী হয়ে থেকে যাবে। কিন্তু আমরা তো আধুনিক যুগের ছেলেপেলে, তাই আমাদের কোন খবরের জন্য বাহিরে যেতে হয়না। সব খবর ঘরেই এসে জানান দেয় যে আজ এটা ঘটে গেছে।

একটু থামলো কাব্য, জাহাঙ্গীর আলম ছেলের দিকে তাকালেন। এতবড় একটা ঘটনা, কই কাব্য তো তাকে কিছু বলেনি। ছেলের এমন ভাবগতি দেখে অবাক হলেন তিনি। কাব্য আবার বলা শুরু করলো -

------“এখন আমি এতকিছু শুনতে চাইনা। কে মরলো, কে বাঁচলো তা দিয়ে কিছু যায় আসেনা আমার। আমি শুধু জানতে চাই রোদসীকে কি করতে চান আপনি? ওকে বাড়িতে নেবেন কবে?

শফিক মাস্টার রেগে টেবিলের ওপর হাত রাখলেন।

------“দেহো বাবা, তুমি আমার পোলার মতো তাই তুমি কইরাই কইতাছি। আমি শালুকরে বাড়িতে নিমু না। সমাজের কাচে আমার একটা সম্মান আছে। যতই অরা বিয়া করুক না ক্যান, কুনোদিন হেইডা পর্মান করা যাইবো না। যেই মোল্লা বিয়া পড়াইছে হেই তো মইরা গেছে, যার লগে বিয়া হইছিল হেই পোলাও মরছে তাইলে পর্মাণ করবা ক্যামনে? একটা সমাজে চলতে গেলে সমাজের মানুষ কী কইনো, হেইডাই গোটা একটা পরিবারের অবস্থান ঠিক করে। আমি সারাজীবন মাথা উঁচু কইরা চলাফেরা করছি । কিন্তু অহন আমার মাইয়ার এই কান্ডের পর আমি ক্যামনে মানুষের সামনে খাঁড়ামু? অরে লইয়া গেলে মানুষ আমার মুখে চুনকালি লাগাইবো, গাঁয়ের মানুষ আমারে একঘরে কইরা দিবো। এমনডা আমার দরকার নাই।

রোদসীর মা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।

------“আপনে ক্যামন বাপ কন তো? খালি মানুষ কি কইবো, কি করবো হেইডি ভাবেন। নিজের মাইয়াডার কথা একবারও ভাবেন না? পনেরো বছরের মাইয়া, এতটুকু বয়স ওর। আমরা পাশে না খাড়াইলে, আমগো বাড়িত না নিলে কই যাইবো আমার শালুক?

------"আপনি শান্ত হন, উনি বাড়িতে তুলবে শালুককে। আর শালুক যে বিবাহিত তার প্রমাণও অলরেডি দিয়েছি গ্রামে। যারা রিফাত আর রোদের বিয়েতে সাক্ষী ছিলো তারা নিজে থেকে এসে আমাকে বলেছে ওরা বিবাহিত, রোদের সন্তান কোন অবৈধ নয়। তারা গ্রামেও বলে দিয়েছে এতক্ষণে। তাই ভয় নেই শালুক ফিরবে ওর বাসায়।

কাব্যের কথাটা শেষ হতে না হতেই শফিক মাস্টার মাথা নাড়লেন।

-------“না। এইডা সম্ভব না। শালুকরে আমি বাড়িতে নিবার পারুম না।

জাহাঙ্গীর আলম ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

-----“না মানে? কেন নেবেন না মেয়েটাকে? কেন ফিরবে না শালুক, ওর বাড়ি? এখন তো বিষয়টা পরিষ্কার। আপনার মেয়ের যে বিয় হয়েছিল, সেই বিয়ের সাক্ষীও তো আছে। গ্রামের মানুষ অলরেডি জানে ওরা বিয়ে করেছিল। রিফাত মারা গেছে—এটা সত্যি, কিন্তু তার মানে এই না যে রোদসীকে আপনার বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে।

শফিক মাস্টার ঠোঁট শক্ত করে বললেন—

-----“আপনে শহরের মানুষ। আমগো গাঁয়ের সমাজের হিসাব আপনে বুঝবেন না। আর আমার সংসারের বিষয় আমি বুঝুম, আপনেরা নিজেগো কাম করেন। আমার পরিবার নিয়ে আপনে গো ভাবার দরকার নাই।

------“হয়তো সত্যিই বুঝি না আপনাদের গ্রামের হিসাব

কিন্তু একটা জিনিস খুব ভালো বুঝি—সকল কিছুর আগে মানুষের জীবন।

কথা বলে উঠলো কাব্য। কয়েক সেকেন্ড থেমে সে আবার বলল—

-----“আর আপনার মেয়েটা এখনো বেঁচে আছে। আল্লাহ তাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিয়েছেন। আপনি জানেন, গতকাল রেললাইনের ওপর ওকে যখন পেয়েছিলাম তখন ওর শরীরের অবস্থা কী ছিল? আপনি বাসায় ওকে একবার বিষ দিয়েছেন, সেটা আপনার ছোট মেয়ে ভেঙে দিয়েছে, তখন আপনি ওকে বলেছেন ট্রেনের নিচে মাথা দিতে? ও তো সেটাই করেছে, আপনাকে মুক্তি দিতেই চেয়েছে কিন্তু কই মৃত্যু তো হলো না। আল্লাহ গতকাল এত মানুষের ভিড়ে ঠিক আমাকে পৌঁছে দিলেন ওকে বাঁচানোর জন্য। তাহলে যেখানে আল্লাহ তার বান্দাকে সুযোগ দেন, সেখানে আপনি এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন? আপনি কি সৃষ্টিকর্তার থেকেও বড় ?

কাব্যের কথাগুলো শুনে শফিক মাস্টার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। কাব্য বুঝল, কথাগুলো তার ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগছে। কিন্তু তবুও লোকটা নিজের জেদ ছাড়লো না।

সে একবার চারপাশে তাকিয়ে বলল-

------“আপনে আমারে যাই বোঝান না ক্যান, আমি অরে নিবার পারুম না। কারণ আমার আরেকটা মাইয়াও আছে।

কাব্য চুপ করে রইল। শফিক মাস্টার বলতে শুরু করলেন—

------“শালুক একা না। ওর ছোট বইন শানুও আছে। ওরও বিয়া দিতে হইবো। আমি যদি শালুকরে বাড়িত লইয়া যাই, তাইলে এই সমাজে আমার আরেক মাইয়ার ঘর আইবো কেমনে? মানুষ কি আর চুপ থাকবো? সবাই কইবো—এই বাড়ির বড় মাইয়া বিয়ার আগে পেট বাঁধাইছে। এই বাড়িতে সম্বন্ধ কইরা মাইয়া আনমু ক্যান?

রোদসীর মা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন—

-----“কিন্তু শালুক তো বিয়া করছে! হেইডা তো হগ্গলেই জানে তাইলে?

------"খালি জানলেই তো হইবো না। সমাজের হেইডা মানতেও হইবো। সমাজ এতকিছু খোঁজে না, একটা ছুতা পাইলে হেইডাই সারাজীবন অগোর কাছে পর্মান হইয়া যায়। তাই আপনেরা আমারে যাই কন, আমি অরে বাড়িত নিবার পারুম না।

কাব্যের চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল।

------“আপনি আপনার ছোট মেয়ের জন্য বড় মেয়েকে অথই সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছেন? সামান্য সমাজের জন্য একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে দোষী করছেন? অথচ আমি জানতাম, বাবারা স্বাধীন মানুষ হয়। তাদের কাছে তাদের মেয়েরা নাকি কলিজার টুকরো হয় - যার জন্য সেই বাবা পুরো দুনিয়ার সাথে লড়ে। কিন্তু আজ এ কোন বাবা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি? আপনি না একজন শিক্ষক? ছাত্রদের সারাজীবন ন্যায় শিখিয়ে নিজে আজ এত বড় অন্যায় মেনে নিচ্ছেন কি করে?

এতক্ষণ শান্ত গলায় কথা বললেও এবার গর্জে উঠলেন

শফিক মাস্টার মাথা।

-------“হেই থামো, আর লেকচার দিও না। এমন লেকচার দিয়া মানুষরে ভোলান যায় কিন্তু জীবন চলে না। তুমি কি বুঝবা মিয়া আমার বিষয়? আমি সারাজীবন এই গাঁয়ের মাঝে শিক্ষকতা করছি। মানুষ আমারে সম্মান করে। আমার একটা অবস্থান আছে। আমার আরেক মাইয়ার বিয়া, আমার পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবকিছু আছে। আমি একটা ওই বেয়াদব মাইয়ার লাইগা সব শেষ করবার পারুম না।

রোদসীর মা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।

-----“একটা মাইয়া? শালুক আপনার একটা মাইয়া না? ও তো আপনারই রক্ত! নিজের হাতে বড় করছেন। অসুখে রাত জাইগা বসছেন। ওরে কোলে নিয়া কত জায়গায় ঘুরছেন। আজ ও বিপদে পড়ছে বইলা ও একটা মাইয়া হইয়া গেল?

শফিক মাস্টার মুখ ফিরিয়ে নিলেন। জাহাঙ্গীর আলম এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিষয়টা স্বাভাবিক নেই আর। তাই তিনি শফিক মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল—

-------“আচ্ছা বাদ দিন। আপনাকে আমার ছেলের লেকচার শুনতে হবে না, আপনার মেয়েকে বাড়িতে নেবেন কিনা সে আপনার বিষয় কিন্তু একটা কথা বলুন তো—রোদসী যদি আপনার বাড়িতে না ফেরে, তাহলে মেয়েটা যাবে কোথায়?

-----“হেইডা আমি ক্যামনে কমু? হের যেনে মন চায় যাক কিন্তু আমার বাড়িতে অরে আমি নিমু না হেইডা জানি। অয় বাড়ি আইলে আমার শানুর জিবনডা নষ্ট হইয়া যাইবো।

-----“আর যদি বলি শানুকে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিবো। তবুও যেমন তেমন ছেলে নয়, বেশ ভালো পরিবারের, উচ্চশিক্ষিত, সুন্দর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবো—তবুও কি আপত্তি করবেন?

খুব শান্ত স্বরে কথাটা বলল কাব্য।

জাহাঙ্গীর আলম ভয় পেলেন। তার ছেলেকে তিনি চেনেন। ছেলেটা এমন যে হাসতে হাসতেও মানুষ খুন করতে পারবে। এমনও বিষয় আছে, যেখানে কিছু মানুষ না চাইতেও রেগে যায়, আর সেখানে কাব্য মুচকি হেসে ডিল করে। কিন্তু তিনি জানেন সেই হাসির আড়ালে, ভেতরে ভেতরে তার ছেলেটা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

কাব্যের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।

-----“আপনার মেয়েটা এখন হাসপাতালে। শরীর দুর্বল। পেটে আপনার নাতি। স্বামী মারা গেছে। আর আপনি বলছেন—যেখানে ইচ্ছা যাক? মেয়ের বিয়ের জন্যই তো নিচ্ছেন না ওকে। যান, আপনার ছোট মেয়ের দায়িত্ব আমি নেবো, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিবো ওকে। যত খরচ লাগবে সব আমার বাবা দেবে। তবুও কি বলবেন ওকে নিবেন না?

শফিক মাস্টার চুপ হয়ে গেলেন। তিনি হয়তো কল্পনাও করেনি কাব্য এমন একটা কথা বলতে পারে। তার মনে যে কি চলছে তা বাহিরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। কাব্য, জাহাঙ্গীর আলম, রোদসীর মা সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছেন শফিক মাস্টারের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে,

তারপর মাথা নাড়লেন।

------“তবুও না। তবুও শালুকরে আমি নিমু না। কারণ বিষয়ডা শুধু বিয়া না, সমাজের।

এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না কাব্য। রেগে গিয়ে শফিক মাস্টারের পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরলো সে। জাহাঙ্গীর আলম হতভম্ব হয়ে গেল। কিন্তু সেদিকে তাকালো না কাব্য, গর্জে উঠে বলল-

------"অনেকক্ষণ ধরে সম্মানের সাথে কথা বলছি আপনার সাথে, শান্ত ভাবে বোঝাচ্ছি কিন্তু আপনি তো দেখছি শান্ত কথার মানুষ নন। আপনার শরীরে গন্ডারের চামড়া। আরে কোন ধাতু দিয়ে গড়া আপনি, আপনার সকল সমস্যা তো সলভ করলাম, তবুও কিসের দায়ে এসব করছেন? রোদের মুখটা দেখেছিলেন এক্সিডেন্ট হওয়ার পর, গিয়েছিলেন একবারও ওর সামনে? যাননি। গেলে বুঝতে পারতেন ও কতটা খুঁজছে আপনাকে।

শফিক মাস্টারও দমলেন না। ঝাড়া দিয়ে কলার ছাড়িয়ে নিলেন তিনি। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে হঠাৎ তিক্ত গলায় বললেন—

------“আমার মাইয়ারে লইয়া আমার তো কোন চিন্তা নাই কিন্তু তুমি পরের বাড়ির পোলা হইয়া, দরদ উথলায়া পড়তাছে তাই না? তা তোমার যদি এতই চিন্তা থাকে শালুকের লাইগা , তাইলে তুমি নিজেই ওরে বিয়া কইরা নাও না?

হঠাৎ এমন একটা কথা যেন বিষ্ফোরণ ঘটালো কনফারেন্স রুমে। শুনে কাব্য থমকে গেল। জাহাঙ্গীর আলমও বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। রোদসীর মা যেন মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেলেন।

কিন্তু শফিক মাস্টার থামলেন না।

------“অহন তো রিফাতও নাই। আমিও অরে ঘরে তুলমু না, তাইলে শালুক তো একলা। এতই যখন দরদ, এতই হগ্গলের দায়িত্ব নিবার পারো —তাইলে শালুকরে তুমিই বিয়াকইরা নিজের কইরা নাও। তাইলে অরে নিয়া আলাদা কইরা তোমার আর চিন্তা করন লাগবো না। তোমারও চিন্তা শেষ, আমারও চিন্তা শেষ।

কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না শফিক মাস্টার। দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন তিনি, ভারী দরজাটা তার পেছনে বন্ধ হয়ে গেল। কনফারেন্স রুমে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা। রোদসীর মা চেয়ারে বসে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন। জাহাঙ্গীর আলমও ছেলের দিকে অবাক নয়নে চেয়ে আছে। কিন্তু

কাব্যের কোনদিকে ধ্যান নেই। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মাথায় শুধু একটাই কথা ঘুরছে— তুমি নিজেই ওরে বিয়া কইরা নাও।

.

চলবে,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন