ক্রাশ কনফেশন
লেখকঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব-৬
কথা শেষ করে ফোন রাখতেই ঠাস করে রুমের দরজা খুলে গেলো। পিতা মাতা নামক দুইটা প্রানী তাদের চেহারাটাকে অগ্নি রূপে রাঙিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসলো। আমাকে টেনে বিছানা থেকে নামালো। তারপর পুরো রুম সার্চ করা শুরু করলো। আকস্মিক দায়া-আবিজিতের মতো বাবা মায়ের পাতা লাগানো মোড দেখে আমি ভড়কে গেলাম। সব যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো।পুরো রুম সার্চ করে গত তিনদিনে আমার কাছে আসা তিনটা চিরকুট জব্দ করলো। তিনটা চিরকুট টেবিলের উপর পাশাপাশি সাজিয়ে দিলো। তারপর আসামীদের মতো আমাকে টেবিলের কাছে দাঁড় করালো। মা বাবা দু'জন আমার দু'পাশে দাঁড়ালো। এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে আমি আসামী আর আমার মা বাবা র্যাব। আমার থেকে তারা ইয়াবা গাঁজা জব্দ করেছেন। এখন সাংবাদিক সম্মেলন হচ্ছে। আমাকে স্বীকারোক্তি দিতে হবে। সব ঠিকঠাক আছে মিসিং শুধু সাংবাদিকের। মিনিট খানেক পর সেটাও পূরণ হলো। গলায় আইডি কার্ড, পরনে শার্ট-প্যান্ট পরিহিত একজনের পা পড়লো রুমে। হাতে মাইকের মতো কী একটা ধরানো। সে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালো। তার ভাব দেখে আমার হাসি পেলো খুব। আহারে বেচারা ভাই আমার! খাটো হওয়ায় সেভেন আপের খানি বোতল দিয়ে বানানো হ্যান্ড মাইকটা টেবিলের উপর রাখতে পারছে না শুধু লাফাচ্ছে। বুঝ হওয়ার পর থেকেই তার স্বপ্ন বড় হয়ে সে একজন সাংবাদিক হবে। সবার সাক্ষাৎকার নিবে। ছোটরা সাধারণত কার্টুন দেখলেও আভান দেখেনা সে খবর দেখে। সারাদিন সময় টিভি চ্যানেল অন করে খবর দেখবে। কিভাবে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছে এই সব শিখবে তারপর বোতল হাতে নিয়ে নিজেও সাংবাদিকতা শুরু করবে। তাই তার এসব সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে। আর আমার মনে হয় আজ সে আমার এই জব্দখানায় নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিবে। গলায় ঝুলানো স্কুলের আইডি কার্ডটা ঠিক করে নিলো আভান। তার মাইকটা মুখের কাছে নিয়ে বলল,
" অভিহা বিনতে ফারুকী আপনি জব্দকৃত জিনিস সম্পর্কে কী বলতে চান।"
বলে আভান তার হাতে থাকা মাইকটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আমি নির্দোষ আসামীর ভান করে বললাম,
"এগুলো ভাই এডিট করা যায়। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি নির্দোষ, কোন অন্যায় করিনি।"
আভান এবার মাইকটা মার দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল,
" এই সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?"
মা বাংলা সিনেমার রিনা খানের লুক দিয়ে গর্জে উঠে বললেন,
"এক থাপ্পড় দিলে ও বলে ওর বাপ ও বলবে।"
বাপের কথায় বাবা কেশে উঠলেন। বাবার কাশির শব্দ কানে যেতেই মা নিজের কথার ভুল বুঝতে পারলেন এবং চুপ করে গেলেন। আভান এবার মাইক বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
" আপনার স্ত্রীর কথা অনুযায়ী আপনি ও জানেন। আপনার মেয়ের গালে থাপ্পড় পড়লে আপনারা দুজন মুখ খুলবেন। এটা কী সত্যি? আপনি জানলে বলুন সত্যটা কী!"
আভানের কথায় বাবা দাঁত কিড়মিড় করে আভানের দিকে তাকালেন। এবং বললেন,
"থাপ্পড় মেয়ের গালে পড়বে কিনা জানি না।তবে ছেলের গালে পড়বে এটা নিশ্চিত। "
আভান ভয়ে ঢোক গিলল। সবার দিকে একবার তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসলো। হয়তো বুঝতে পেরেছে এখানে থাকলে ঘূর্ণিঝড় আলেয়া খালা তার উপর ও ভর করবে। তাই মানে মানে কেটে পড়া ভালো। আভান এবার মাইক নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। মাইক হাতে সামনে তাকিয়ে বলল,
" আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন এই মুহূর্তে ফারুকী ভিলাকে ৯নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আমি আবারো বলছি ফারুকী ভিলাকে ৯নম্বর সর্তকতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ফারুকী ভিলার ভিতরে থাকা নিরিহ প্রানীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার এবং ঘূর্ণিঝড় আয়লা খালার আগমনি তান্ডব শান্ত হওয়ার আগ অব্দি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। যে যেখানেই থাকুন সুস্থ থাকুন। আয়লা খালা থেকে পালিয়ে বাচুন। ধন্যবাদ। আভান ইবনে ফারুকী, উজুইল্লা নিউজ,ঢাকা। "
বলে মাইক হাতে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে গেলো রুম থেকে। আমি মনে মনে বললাম, ও ভাইরে ভাই আমারে একলা কইরা চইল্যা গেলি রে ভাই! আমারে ত এখন না ধোয়া হাতে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধোয়ানো হইবো রে ভাই। বোনাস হলে মোগর দিয়া ঠাস ঠুস কিলানো হবে। আমারে না নিয়ে যাইস না বাঁচা।
মনে মনে আর্তনাদে ফেটে পড়লাম আমি। সেই আর্তনাদ কারো কানে গেলো না। আর্তনাদ শেষ আমি সামনে তাকাতেই ভয়ে ঢোক গিললাম। মা বাবা কোমরে হাত দিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে রাগ ঝরে পড়ছে। এখনো অবধি আমি জানি না আমি কী অপরাধ করেছি। কেনো মা বাবা আমার উপর ক্ষেপলেন আর আমার রুমটাকে গরুর শিং দিয়ে বানানো চিরুনী অভিযান চালালো! কিউ! জবাব চাই। আমার মনে একটা মিছিল হচ্ছে। সেই মিছিলে অনেকে ব্যানার হাতে স্লোগান দিচ্ছে,জবাব চাই জবাব চাই। মন মিছিলে ডুবে গিয়ে আমি হাত মুঠো করে উপর নিচ করে বললাম জবাব চাই, জবাব চাই। জবাব পড়লো আমার গালে। শব্দ হলো ঠাসসসস। আমি স্লোগান বন্ধ করে গালে হাত দিয়ে মা বাবার দিকে তাকালাম। মা রেগে বললেন,
"জবাব পেয়েছিস? নাকি আরো জবাব লাগবে? এবার আমাদের জবাব দে।"
আমি অবাক কন্ঠে বললাম,
"সন্তান হয়ে মা বাবার গালে থাপ্পড় দিয়ে আমি জবাব দিবো?নাআয়ায়ায়া এ হতে পারে না। এগুলো পাপ। আমি পাপ করিনা।"
তারপর দুই গালে দুই চড় দিয়ে বললাম,তাওবা। বলতে বলতে আরেকটা চড় আমার গালের বাউন্ডারি ছাড়িয়ে ছক্কা হাকালো। এবার ব্যাটসম্যান হলো বাবা। আমার ধারণা আজ মা বাবা নামক এই অদ্ভুত জুটি আমার গালে চড়ের হ্যাট্রিক করবে। আমার ধারণা জগতের দরজা নক করে আব্বু বললেন,
"বেশি বাড় বেড়েছিস। একে তো অন্যায় করেছিস তারউপর আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস? লজ্জা করে না?"
আমি দৃঢ় গলায় বললাম,
"না করছে না। সত্য বলতে লজ্জা কিসের? আমাকে মেরে ফেললেও আমি সত্য বলতে পিছপা সামনের পা কোন পাই হবো না।"
আমার কথা বলতে দেরি আম্মুর হাত নামক ব্যাটের বাড়িতে বল আমার চোয়াল নামক বাউন্ডারির কাছে দেরি নেই। আবারো ছক্কা! আমার মনে হলো কোথা থেকে ধারাভাষ্যকার জাফরুল্লাহ শরাফাতের কন্ঠ ভেসে আসছে। যেন তিনি তার স্লো-মোশনে বলছেন,আস্লামু আলাইকুম। আমি চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফাত। আজকের খেলায় ধারাভাষ্যকারের দায়িত্বে আছি। হা হা হা। বলতে বলতে বল গড়িয়ে পড়লো অভিহার গালে। অবশেষে হ্যাট্রিক করেই ফেললো মারকুটে।
যাক গে, আমি শারাফত আংকেলের অধ্যায় ক্ষ্যামা মানে বাদ দিয়ে আমি বাস্তবে ফিরে আসলাম। আমার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে বুঝতে পারলাম। আমি অবাক হলাম। এম্যা! আঁই কান্দিয়ের! ওমা কিল্লাই কান্দিয়ের? ও আঁরে মাইচ্ছে যে হিল্লাই কান্দিয়ের। মাইল্লো কিল্লাই! কিয়া কইচ্ছি আঁই! আমার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে মা বললেন,
"সামনের পা, পিছ পা না হলে থাপ্পড় খা।"
আমি ভাবুক মনে প্রশ্ন করলাম,
"আঁরে মারেন কিল্লাই? আঁই কিচ্ছি? "
মা আমাকে চোখ রাঙালেন। বরাবরই নোয়াখালী ভাষায় মায়ের এলার্জি। ইচিং পাউডার দিলে যেমন চুলকায় তেমন টাইপ। তাই ছোটবেলায় আম্মু আমাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতেন না। আমি যদি নোয়াখালী ভাষা শিখে যাই সেইজন্য। কিন্তু নোয়াখালী না গেলেও দাদি ফুফি থেকে শুনে শিখে গেছি। আমার থেকে শিখছে আভান। মাঝে মাঝে বলি। ফলাফল হিসেবে পিঠের উপর ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার পড়ে। তাও বলি। আঞ্চলিকতা মানেই ভালোবাসা। আলাদা টান আছে এতে। যাক গে,মায়ের চোখ রাঙানিতে আমি শিথিল হলাম। ভদ্র মেয়ের মতো নম্র কন্ঠে কথার রিপিট করলাম,
"আমাকে মারছেন কেনো? আমি কী করেছি?"
বাবা আমাকে শাসিয়ে বললেন,
"কী করেছিস বুঝতে পারছিস? এগুলো কী? পড়ালেখা না করে এগুলো করিস?"
টেবিলের উপর রাখা চিরকুট গুলোর দিকে ইশারা করে বললেন। মা বললেন,
"কলেজের নাম করে প্রেম করে বেড়াস? আর তোর প্রেমিকপুরুষ বাড়ি বয়ে এসে উপহার দিয়ে যায়! এত বখে গেছিস! ছিঃ"
মা নাক চিটকালো। এতক্ষণে আমার ঘটনা বুঝে এসেছে। এতক্ষণ ধরে বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকার প্রেমের কথা নায়িকার বাবা মা জানলে যে সিন হয় সেই সিন চলছিলো! ওহ আই সি! ইনারা ভেবেছিলেন আমি প্রেম করি। এই চিরকুটগুলো আমার প্রেমিকের? হায় কপাল আমার! জীবনের ক্রাশ খেয়ে গুয়ের টাংকিতে নাকানিচুবানি খাচ্ছি আর এরা বলে কিনা প্রেম! হায় কপাল! আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে বললাম,
"বিশ্বাস করো তোমরা যা ভাবছো তেমন কিছুই না। আমি প্রেমের 'প' শব্দেও যুক্ত নেই। তোমরা ভুল বুঝতেছো।"
মা চিরকুট তিনটি আমার মুখের ওপর ছুড়ে মেরে বললেন,
"তাহলে এসব কি! এগুলো কী তোর বাবাকে তার প্রেমিকা পাঠিয়েছে?"
মায়ের ভুল কথায় বাবার কাশি শুরু হলো। এর সাথে মা তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং চুপ হয়ে গেলেন। প্রসঙ্গ এড়িয়ে বাবা বললেন,
" কবে থেকে চলছে? কার সাথে? ছেলে কে? চৌদ্দপুরুষের নাম ঠিকানা বল।কুইক। না হয় মার একটাও মাটিতে পড়বে না। "
এখন বাবাকে কিভাবে বুঝাই, এগুলো প্রেম না এগুলো সারে ভরপুর উর্বর ভূমিতে গড়ে উঠা বাঁশ বাগানের বাঁশ। আমি বললাম,
"এসব কে দিয়েছে জানি না আমি। না তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক আছে। প্লিজ বিশ্বাস করো!"
"আমি সত্যিটা শুনতে চাইছি।"
"আমি জানিনা।"
আরো একটা চড় পড়লো। আমি ভ্যা করে কাঁদতে শুরু করলাম। আমার কান্নায় দুজনেই দমলো। যাবার জন্য পা বাড়ালো। যাবার আগে শাসিয়ে গেলো,
"আজ থেকে তোর বাইরে যাওয়া বন্ধ। ঘরেই থাকবি। দুই দিনের মধ্যে তোকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করবো। "
মা বাবা চলে গেলো। বাইরে থেকে দরজা লক করে গেলো। আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে দরজার কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম,
"বন্ধ করে যাও সমস্যা নেই। আমার খাবার পাঠিয়ে দাও। ক্ষিধে লেগেছে। "
বলে আবারো কাঁদতে লাগলাম। কান্না থামিয়ে চেঁচিয়ে বললাম,
"পারলে চিকেন ফ্রাই করে দিও।"
আবারো কান্না শুরু করলাম। ঘরে কাঁদলাম কিছুক্ষণ। বারান্দায় ও কাঁদলাম কিছুক্ষণ। কান্না শেষে রুমে এসে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি কাঁদছি কেনো! কোন কিছু খেয়ে কী কেউ কাঁদে? লাঞ্চ, ডিনার,ব্রেকফাস্ট খেয়ে কখনো কেঁদেছি? টিফিন খেয়ে কেঁদেছি? বিয়ের দাওয়াত খেয়ে কেঁদেছি? ফুটকা খেয়ে কেঁদেছি? আছাড় খেয়ে কেঁদেছি? ধাক্কা খেয়ে কেঁদেছি? কুকুরের তাড়ানি খেয়ে কেঁদেছি? না কাঁদিনি সম্ভবত। তবে চড় খেয়ে হজম না করে কাঁদছি কেনো! নাহ,আমার কান্না করাটা অনুচিত। ছোটবেলায় মা বলতো কোন কিছু খাওয়ার পর পানি খেয়ে শোকর আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয়। আমার ও এখন তাই করা উচিত। পিংকিকে উঠালাম বেড থেকে। পিংকি আমার ওয়াটার বোতলের নাম। পিংক কালার বিধায় নাম রেখেছি পিংকি। ক্যাপ খুলে পানি খেয়ে ঢেকুর তুলে শোকর আলহামদুলিল্লাহ বললাম। যাক চড় হজম হয়ে গেছে।
*
বিকেলে আমার রুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো মা। তার হাতে চিকেন ফ্রাইয়ের ভিতরের হাড্ডির কালারের একটা শাড়ি। আমি তখন খাটের এক কোণে বসে ফেসবুকে একটা গল্প পড়ছিলাম। গল্পের নাম, 'চাঁদনি রাতে বদনা হাতে চলতি পথে পেলাম ভুতের দেখা'। গল্পে জাক্কাস মিয়া বদনা হাতে মেঠোপথের ধারে ভাবঘুরে হয়ে হাটছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, সামনে একটা ভুত দাঁড়িয়ে আছে। জাক্কাস মিয়া ভুত দেখে পালাচ্ছিলেন। তখন ভুত বলে উঠলো,
"জাক্কাস মিয়া তোয়ার বদনা গা দিবা নি? মেলা জোরে ধোইচ্ছে। এক্কানা দেয়ো না?"
এটুকু পড়ে আমি তো অবাক। এম্যা ভুত নোয়াখালীর! এমা মা রে! কিয়া কয় এগান। নিজের বিস্ময়তা দেখে যখন নিজ দেশের ভুতের কথা শুনতে যাবো তখনই মা এলেন। গল্প পড়ায় বিঘ্ন ঘটায় আমার বেশ রাগ হলো। আমি বললাম,
"হেসমে আই হুদাহাদে আঁরে চোবাই চাবাই গেলা। অন আবার কিল্লাই আইছো? অন আবার হিটবা নি কনো? হেচ্চা অইলে মাফ চাই। আর হিডিয়ো না। হেসমে হিসশো যে অনো গালেত্তে দুকখাইয়ের। "
আমার কথায় মা চোখ রাঙালেন। এতে আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম। এবং বরাবরের মতোই কথাটা ভদ্র ভাবে রিপিট করলাম,
"তখন এসে শুধু শুধু আমাকে চড় থাপ্পড় দিয়েছো। এখন আবার কেনো এসেছো? কোথাও এখন আবার মারবে? তেমন হলে ক্ষমা চাই। আর মেরো না। তখন মেরেছো যে এখনো মুখে ব্যাথা পাচ্ছি।"
আমার কথায় মায়ের চোখ শান্ত হলো। খানিক করুণ চোখে তাকালো তারপর বলল,
" উঠ, উঠে ফ্রেশ হয়ে আয়।"
তারপর হাতে থাকা শাড়িটা দিয়ে বললেন,
" ফ্রেশ হয়ে এই শাড়িটা পড়ে রেডি হয়ে বসার রুমে আয়। "
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
"কেনো!"
"পাত্র পক্ষ দেখতে এসেছে তোকে। আমি বাড়তি একটা কথাও শুনতে চাই না। চুপচাপ রেডি হয়ে আয়। "
রাগত স্বরে কথাটা বলে মা চলে গেলো। আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। আমি কল্পনাও করতে পারিনি সামান্য বিষয় নিয়ে মা বাবা বিয়ের মতো একটা ব্যাপার ঘটাবে। আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইনা। মোটেও না। নাহ,এই বিয়ে ভাঙতে হবে। দেখি কোন ব্যাটা দেখতে এলো? তার অবস্থার হাল বেহাল না করলে আমার নাম ও অভিহা নয়। ভাবনা পাক্কা করে আম্মুর দেয়া শাড়ি হাতে নিলাম। কমলার বনবাস ছবিতে শাবনূরের মতো করে শাড়ি পরলাম। নাকে নথ ও একটা পরলাম তেমন। তারপর আয়নার সামনে বসলাম সাজগোজ করতে। প্রথমে ফেয়ার এন্ড লাভলিতে সুরমা মিশিয়ে মুখে লাগালাম। তারপর কাজল নিয়ে ছাতার মাথার মতো ভ্রু আঁকলাম। ঠোঁটের লাগালাম কটকটে টিয়া কালার লিপস্টিক, চোখের উপরে হলুদ,সবুজ,টিয়া,বেগুনি আই শ্যাডো,চোখের নিচে কমলা রঙের কাজল। কপালে টিয়া কালার আর হলুদ কালার দুটো টিপ। ব্যাস সাজ কমপ্লিট। নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিলাম। নাহ খারাপ লাগছেনা। বরং বেশ লাগছে। জাক্কাস মিয়ার বদনা হাতে চলতি পথে দেখা সেই ভূতের মতো জাক্কাস লাগছে। সাজ শেষে মাথার উপর ইয়া বড় একটা ঘোমটা টানিয়ে আয়নার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালাম। দরজায় নক হলো,
"আপি তোমার সাজ শেষ? মা যেতে বলছে। চলো।"
আভানের কথায় আমি ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম,
"হ্যাঁ চল।"
আভানকে নিয়ে বসার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। বসার ঘরে যেতেই মা এসে আমার কাছে দাঁড়ালেন। এবং বললেন,
"এই তো আমার মেয়ে। "
আমি মনে মনে বললাম,
"ওহ আচ্ছা, আমি উনার মেয়ে!"
কাছ থেকে একটা কন্ঠ ভেসে আসলো,
"মাশা আল্লাহ মেয়ে কি ভদ্র! কত ধার্মিক! কত বড় ঘোমটা দিয়েছে। এখনকার যুগে এমন মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। "
মা ভদ্র মহিলার সাথে তাল মিলালেন। এবং আমাকে তাদের পাশে নিয়ে বসালেন। খানিক পরে এক মহিলা আমার কাছে এসে "দেখি মা তোমার চাঁদমাখা মুখটা দেখি?" বলে ঘোমটা উঠালেন। আমি ট্যারা চোখে তাকালাম। মহিলা ভয়ে চিৎকার দিয়ে বেহুশ হয়ে গেলেন। আমি ঘোমটা ফেলে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললাম,
"কিচে ইয়ার? বেয়োশ অইলো কা?"
তারপর উনাকে ধাক্কা দিয়ে বললাম,
" এরে উডেন না? কিছে আন্নের? "
আমার কথা ও কাজে বসার ঘরে শোরগোল পড়ে গেছে আকস্মিক সবাই ভয় পেয়ে গেছে। কয়েকটা বাচ্চা এসেছিলো তারা তো ভয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। আমি বললাম,
"কিছে আন্নেগো? বেজ্ঞুন এইচ্ছা করেন কা? ভুতে হাইছেনি?"
মুরুব্বি গোছের এই লোক বাবাকে বললেন,
"এভাবে ডেকে এনে অপমান করার মানে কি! আমরা আপনার বিরুদ্ধে মানহানীর মামলা করবো।"
আমি বিকট হেসে বললাম,
"মামলা কইল্লে আই হামলা করুম। আঁরে চিনেন নো। ঘাড় মটকাই রক্ত লোই হেগান বেলাড ব্যাংকে বেচি হালামু। "
আমার বিকট হাসিতে তারা ভয় পেয়ে গেলেন। এক মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
"এখানে আর এক মুহুর্তে নয়। চলো এখান থেকে।"
সবাই যাবার জন্য পা বাড়ালো। আমি তাদের সামনে গিয়ে চায়না ভাষায় কিছু মন্ত্র পড়ে ফু দিয়ে বললাম,
"অভিশাপ অভিশাপ! ঘোর অকল্যাণ! মৃত্যু! সাবধান!"
আমার ফুঁ শেষ হতেই সবাই ফুঁ এর মতো হাওয়া। বেহুশ হওয়া মহিলা এখনো পড়ে আছেন। তার জন্য আমার মায়া হলো। আমি বিকট করে হাসলাম। মা বাবা দুজনে রিনা খান আর ডিপজলের রূপ ধরে আসলেন। এসে মা একটা চড় বসালেন গালে। মাকে বাবা টেনে সরিয়ে দিলেন। আমি ভাবলাম যাক আমার জন্য মায়া হয়েছে। কিন্তু নাহ,আমার ভাবনাকে ভুল প্রমানিত করে বাবা এসে ধুরুম ধুরুম করে দুইটা চড় মারলেন। আগুনের উপর ঘি ফেলতে মা এসে আরো দুটো দিলেন। আমি গুনলাম, কয়টা হলো? উমম...১টা,২টা,২টা সমান সমান কত হলো? দুইয়ে একে তিন। আর তিনে দুইয়ে পাঁচ। মন খারাপ হলো? পাঁচটা চড় দেয়ার কি দরকার ছিল? দিলে ছয়টা দিত। জোড় সংখ্যা ভালো লাগে। আমি পানি খেয়ে শোকর আলহামদুলিল্লাহ বলতাম। কিন্তু কি হলো! ধ্যাৎ ভাল্লাগেনা। আমার দোয়া কবুল হয়ে একটা চড় পড়লো আমার গালে। আমি খুশি হলাম। যাক এবার এক গ্লাস পানি হলেই হয়। খেয়ে শোকর আলহামদুলিল্লাহ বলবো। আমার চাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে মা বললেন,
"ভুত নেমেছে? নাহ আরো লাগবে?"
আমি মাথা নাড়িয়ে মেহেমানদের দেয়া নাস্তার ট্রে থেকে এক গ্লাস পানি উঠিয়ে খেয়ে বললাম,
"শোকর আলহামদুলিল্লাহ। "
হঠাৎ মাথাটা ভনভন করে উঠলো। আমার ধারণা খাবার পেটে না গিয়ে মাথায় চলে গেছে। তাই মাথা ভনভন করছে। আমি বুঝতে পারলাম আমি জ্ঞান হারাতে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে আমি নিচে পড়ে গেলাম। নিভু চোখে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমার ভয়ে অজ্ঞান হওয়া মহিলার পাশে পড়ে আছি আমি। তাকে দেখে আমি বললাম, হাই নাইস টু মিট ইউ। অজ্ঞান হওয়া রাজ্যে আমাকে স্বাগত করুন। "মহিলা রেসপন্স করলো না। আর না স্বাগত জানালো। আমি হতাশ হলাম। চোখ বন্ধ করলাম। কানে এলো বাবা মায়ের কথা,
" তোমার কোন পরিচিত তান্ত্রিক আছে?"
"কেনো! তান্ত্রিক দিয়ে কী করবে? ওর ভুত তাড়ানোর জন্য?"
"নাহ, তান্ত্রিকের সাথে ওর বিয়ে দিবো। বিয়ের পর সে ভুত তাড়াক বা পুষুক তার ব্যাপার।"
এই কথা শুনার পর আমি আর জ্ঞান ধরে রাখতে পারলাম না। জ্ঞান হারালাম।
চলবে....