ক্রাশ কনফেশন
লেখাঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব-৭
গল্প সিনেমায় অজ্ঞান নায়িকারা জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে কোন সুদর্শন যুবকের কোলে কিংবা তুলতুলে বিছানায় আবিস্কার করে। অথচ আমি আমি জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে টয়লেটের কমোডের পাশে ফ্লোরে আবিষ্কার করলাম। চারদিকে চোখ বুলিয়ে যখন বুঝতে পারলাম আমি কোন সুদর্শন যুবকের কোলে কিংবা তুলতুলে বিছানায় নয় মল মূত্র ত্যাগের মাধ্যম কমোডের পাশে শুয়ে আছি তখন লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। সিনেমা আর বাস্তবের চিপায় ভাবনাটা স্যান্ডউইচের মেয়োনিজ হয়ে গেলো।
মাথায় হাত দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
" ছবি নাটকেত্তে যেগান দেয়ায় হেগান বেজ্ঞান মিছা রে! কিচ্ছু হাচা নো। বেক মিছা। এই মিছার হিছে দোই আই হিচা খাইয়ের। "
(নাটক সিনেমায় যেগুলো দেখায়, সেগুলো সব মিথ্যা রে! কিছুই সত্য না। সব মিথ্যা। এই মিথ্যের পিছনে দৌড়ে আমি ঝাড়ু খাচ্ছি)
হুট করেই জ্ঞান হারানোর পূর্বের কথা মনে পড়লো। সেই সাথে সকালের চড় থেকে শুরু করে পাত্রপক্ষের আগমন এবং ফিরতি চড় সেবন সব মনে পড়ে গেলো। আমি কারেন্টের তাঁরের খাম্বার মতো লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে বললাম,
"হায়রে জীবন কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এলো! ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চে খাবার মেনুতে থাকে চড়,আর ভাতঘুমের সময় বিছানা হিসেবে মিলে টয়লেটের ফ্লোর! হিচামারা জীবন আই মিন ঝাড়ুমারা জীবন। আরো কত কী দেখার বাকি আছে কে জানে! "
আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাড়ালাম। টয়লেটের পিচ্ছি জানালায় দিয়ে চোখ গুলো বাইরে ফেলে দেখি বাইরে অন্ধকার ছেঁয়ে আছে। বুঝতে পারলাম রাত হয়ে গেছে। সেই সাথে অনুভব করলাম পেটের ভিতরে কাতারে অনুষ্ঠিত ২২সালের আসন্ন বিশ্বকাপের প্র্যাকটিস ম্যাচ চলছে। ক্ষিধেরা দারুণভাবে হৈচৈ করছে। যেন তাদের প্রিয় খেলোয়াড় গোল করেছে! প্রচুর ক্ষিধে পেয়েছে এখন কিছু না খেলেই নয়। সকাল থেকে না খেয়ে আছি। মা বাবা নামক মানুষ গুলো ভাত না দিয়ে চড় দিয়ে খাবারের ঘাটতি পূরণ করেছেন। এখন খেতে গেলেও না জানি চড় দিয়ে ঘাটতি পূরণ করে! চড় দিলে আরেক ঝামেলা। পানি দিয়ে গিলে খেতে শোকর আদায় করতে হয়। ঝামেলাটা সেখানে নয় ঝামেলা হলো পানিতে। আমার রুমে পানি যা ছিলো তা সকালে মা বাবার চড় দিয়ে গিলে খেয়েছি। এখন পিংকি আর কটকটি নামক বোতল দুটো ও আমার মতো খালি পেটে বসে আছে। পানি না থাকলে আমি চড় খেয়ে শোকর আদায় করবো কিভাবে! শেষে কী আমার হাল ও অদ্ভুত চাখোরের মতো হবে! আমি ও কী বাথরুমের ট্যাপের পানি দিয়ে চড় গুলে খাবো? আমি শ্যামবতাকে দেখলে যেমন সটান দাঁড়িয়ে স্যালুট জানাই, অদ্ভুত চা-খোরের দশা হবে ভেবে আমার গায়ের লোম গুলোও তেমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলো! এরা যেন আমার ভাবনাকে স্যালুট জানাচ্ছে। তবে কী এরাও সায় দিচ্ছে! অদ্ভুত চা খোরের মতো এবার আমি ও ইতিহাস গড়বো? আমার নামে গল্প বের হবে। গল্পের নাম হবে,অদ্ভুত চড়খোর। শুরু হবে একদা এক শহরে এক গৃহপালিত মেয়ে ছিলো। যার প্রিয় খাদ্য ছিলো চড়। লোকে তাকে ভালোবেসে বাঁশ ও উপহার দিতো। তারপর একদিন.....
"তুই কী বেডরুম ছেড়ে টয়লেটে পার্মানেন্টলি শিফট হবি? যদি তেমন হয়, তবে বল আমি রুম থেকে বই খাতা,খাট আর ড্রেসিংটেবিল এনে দিচ্ছি। এখানেই থাক তুই। রুম খালি করে ভাড়া দিয়ে দিবো। এদিকে আবার বাসা ভাড়া অনেক। বেশ লাভ হবে। কয়েকদিন গেলে তোর টয়লেট ঘরে আভানকেও পাঠিয়ে দিবো। তারপর আভানের রুম ও ভাড়া দিয়ে দিবো। লাভ দিগুন হবে। দুজনে টয়লেটেই খাবি, দাবি, কলকলাবি। তুই থাকবি? বল তাড়াতাড়ি। আমার আবার খাট তাট সরানোর মিস্ত্রি ডাকরে হবে।"
আমার চড়খোর গল্পে ব্যাঘাত ঘটিয়ে আমার বাবার একমাত্র স্ত্রী আর আমার একমাত্র মা চোখে মুখে উৎফুল্লতা ফুটিয়ে জঘন্যতম কথাগুলো বলল। তারপর আমার উত্তরের আশায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি হা করে তাকিয়ে আছি মায়ের দিকে। মানুষ মানুষকে আলিশান বাড়ি বা ফ্ল্যাটে থাকার অফার করে আর আমাকে অফার করা হলো টয়লেটে সেটেল্ড হওয়ার জন্য! লাইক সিরিয়াসলি!
আমার কল্পনায় এলো একটা টয়লেট। যেখানে খাট,ড্রেসিংটেবিল, বই খাতা সব আছে। সেখানে থাকে একটা মেয়ে। সে সকালে উঠে ফ্রেশ হওয়ার জন্য টয়লেটে যায় না বরং ফ্রেশ হওয়ার আর কলেজে যাওয়ার জন্য টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর টয়লেটে গিয়ে কমোডের ঢাকনা দিয়ে কমোডকে চেয়ার বানিয়ে বসে ব্রেকফাস্ট করে,পড়তে বসে! ভাবতেই আবারো আমার গায়ের লোভ স্যালুট দিয়ে উঠলো। মনের সাবানা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, "নায়ায়ায়ায়ায়ায়া এ হতে পারে, তুই টয়লেটে সেলেন্ড হতে পারিস নাআয়ায়ায়ায়া। ওগো তুমি বলো না।"
মনের সাথে সায় দিয়ে আমি বলে উঠলাম,
"নায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া এ হতে পারে না। আমি..
আমাকে এক ধমক দিয়ে থামিয়ে মা বলে উঠলেন,
" সাবানার মতো ডায়ালগ দিচ্ছিস কেনো! সোজাসাপ্টা বল যা বলার। আজকাল সিনেমার নায়িকাদের মতো বিহেভ করছিস! ঘটনা কী!"
মা থামল তারপর সচেতন চোখে তাকিয়ে বলল,
" এক মিনিট! মানুষ প্রেমে পড়লে নিজেকে নায়িকা ভাবতে শুরু করে। তারমানে তুই.... ওহ আই সি! তুই প্রেম করছিস। তোর প্রেমিক বাড়ি বয়ে এসে কত কি দিয়ে যাচ্ছে। এই এই তুই এত খারাপ হয়ে গেছিস! সিনেমার মতো প্রেম করা শিখে গেছিস? কার থেকে শিখলি? তোর বংশে তোর মা বাপ বাদে কেউ তো প্রেম করে নি। কার থেকে শিখলি বল? কে সেই আলমগীর? কে বল? আলমগীরের পরিচয় দে।"
বলে মা আমার চুলের মুঠি ধরলেন। আমি ব্যাথায় কুকড়িয়ে কাতরতার সাথে বললাম,
"মা চুল চাই দো আঁই দুকখাইয়ের। চুল ছিঁ যাইবো। আঁই আমলা তেল লাগাই না যে তুঁই চুল টানি টাকের লগে বান্ধি টাক টানি লোই যাইবা আর চুল ছিঁ তো নো আর আঁই দুকখাইতান্নো। ছাই দো না?
আমার কথায় মা কটমট চোখে তাকালেন আমার দিকে। বরাবরের মতোই আমি নিঃশব্দে কথার অনুবাদ করলাম,
"মা চুল ছাড়ো ব্যাথা পাচ্ছি। চুল ছিড়ে যাবে। আমি আমলা তেল ইউজ করি না যে তুমি চুলে টেনে ট্রাকের সাথে বেধে ট্রাক টেনে নিয়ে যাবে আর চুল ছিড়বে না আর আমি ব্যাথাও পাবো না। ছাড়ো না?"
মা চুল ছেড়ে দিলো। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। চুলে হাত দিয়ে দেখলাম কয়েকটা চুল ছিড়ে গেছে। আমার রাগ হলো। রেগেই বললাম,
"মা তুঁই কোনো হাগল ওইছোনি? কিজ্জোরে চুল টানি দোইচ্ছো আই দুককাইছি। ও আল্লাহ রে! অনো কি দুকখানি দুকখাইয়ের।"
আমার কথায় মা হাত উঠালেন আমাকে মারার জন্য। চড় সেবনের আগেই ঝটপট বললাম,
"মা তুমি কী পাগল হয়েছো?কত জোরে চুল টেনে ধরেছো আমি ব্যাথা পেয়েছি। ও আল্লাহ! এখনো কি ব্যথা পাচ্ছি!"
আমার অনুবাদে আম্মু খুশি হতে পারলো না। ফলাফল আবারো চড় সেবন করলাম। আমি চড় হজমের জন্য পানি খুঁজছি। আমার খোঁজাখুঁজিতে ব্যাঘাত ঘটিয়ে মা রেগে বলল,
"আমি আগে ভালো ছিলাম। তারপর তুই এলি। তারপর আমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেতে থাকলো। মাথাটা হয়ে গেলো পাবনার হেমায়েতপুরের পাগলাগারদ। এখন তো আমার মাথায় অনেক গুলো সিট আছে। সেখানে মানুষের চিকিৎসা করা হয়। যার প্রধান মেডিসিন, চড়। এক সিটে আমি তোকে ভর্তি করিয়েছি। তোর ট্রিটমেন্ট ও করছি। দেখছিস না কথায় কথায় চড় দিচ্ছি। এসব কেনো! তোকে সুস্থ করার জন্যই তো।"
বলে আরেক চড় বসালো গালে। আমি লাফিয়ে বললাম,
"পানি পানি?"
"পানি কেনো!"
ভ্রু কুঁচকে বললেন মা। আমি গলা ধরে বললাম,
"হজমে অসুবিধা হচ্ছে। শিক কাবাবের মাংসের মতো জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে।"
মা আমাকে টেনে বের করে রুমে আনলেন। বললেন,
"তোর ঢং রাখ। আলমগীরের পরিচয় দে। আমি তোকে সেলাই মেশিন কেনার টাকা দিবো।"
আমি লাফাতে লাফাতে বললাম,
"সেলাই মেশিন না লটারি কিনে দাও। খানিকেই পয়সাওয়ালা হয়ে যাবো।"
"দিবো। বল এবার।"
"আমি জানি না।"
"বলতে বলছি তোকে!"
"আমি জানিনা।"
মা আমাকে চড় মেরে বললেন,
"তুই জেনে তোর বাপ ও জানবে।"
মায়ের ভুল কথা ধরে দিতে গলা খুকরি দিয়ে বাবা রুমে এলেন। আমি আবারো পানি পানি করে লাফাতে লাগলাম। বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"লাফাচ্ছিস কেনো ব্যাঙের মতো। তুই কি ব্যাঙ নাকি!"
আভান এসে বলল,
"আপিকে দেখতে অনেকটাই ব্যাঙের মতো লাগে। "
আভানের কথা বুঝতে পেরে আমি লাফাতে লাফাতে বললাম,
"ওটা ব্যাঙ না পাগল। ওটা খরগোশ। "
"হোয়াট এভার।" বেশ এটিটিউড নিয়ে বলল আভান। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আপি তুমি খুরবুঝের মতো লাফাচ্ছো কেনো!"
আভান খরগোশকে খুরবুঝ বলছে। আমার হাসি পাচ্ছে। কিন্তু আমি হাসলাম না। এখন হাসলে চলবে না। আমার না হজম হওয়া দু'দুটো চড় রয়েছে। তা হজম করতে হবে। এই ভেবেই বললাম,
"ভাই একটু পানি দে না? গলাটা তান্দুরী চিকেনের মতো হয়ে যাচ্ছে। "
আমার কথায় আভান লাফিয়ে উঠলো। পানি আনার পরিবর্তে মায়ের হাত ধরে বললেন,
"মা আমার বান্দর কিচেন খেতে ইচ্ছে করছে। আমি বান্দর চিকেন খাবো। "
বাবা আভানকে কাছে টেনে বলল,
"বান্দর কিচেন না বাবা। ওটা তান্দুরী চিকেন।"
আভান আবারো এটিটিউডের সাথে বলল,
"হোয়াট এভার। আমি খাবো।"
"পরে খাস এখন বিরক্ত করিস না।" বিরক্ত হয়ে বলল মা। মা মৃদুস্বরে বলল,
"আশু বলছি যে আমারো খেতে ইচ্ছে করছে। বানাবে?"
বাবার আশু ডাকে মা গলে গেলেন। হেসে বললেন,
"আচ্ছা আমি যাচ্ছি । তুমি তোমার মেয়েকে তৈরি করে এনো। মেহেমানরাও বসে আছে। আভান চল। "
বলে মা পা বাড়ালেন। মায়ের সাথে আভান ও যাচ্ছে। রীতিমতো লাফাচ্ছে সে। আর বলছে, ওরে বান্দর কিচেন খাবো,বান্দর কিচেন খাবো। "
মায়েরা যেতেই বাবা বললেন,
"পাঁচ মিনিটের মাঝে রেডি হবি। আর আজ কোন ভুত পেত্নী সাজবিনা। অবশ্য সাজলেও সমস্যা নেই। ভূত প্রেত তারা হাতের মুঠোয় রাখে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে চল। "
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
"রেডি হবো কেনো!"
"কারণ তোকে দেখতে এসেছে। কথা না বাড়িয়ে রেডি হো। "
বাবার কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। ভুত প্রেত হাতে রাখে তারা দেখতে এসেছে মানে? তান্ত্রিক! তবে কি বাবা সত্যিই কোন তান্ত্রিকের সাথে বিয়ে দিবেন! ও আল্লাহ! বাঁচাও। আমি অসহায় গলায় বললাম,
"বাবা প্লিজ আমার সাথে এমন করো না। আমি যাবো না।"
"যেতেই হবে। এমন ভালো পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। কোনভাবেই না। "
বলে বাবা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে টেনে রুম থেকে বেরিয়ে নিয়ে এলেন। বসার ঘরে এসে যাদের দেখলাম তাতে আমার আত্মা কেঁপে উঠলো। আমার আত্মা কাপানো মানুষ গুলো আর কেউ না আমার ওড়না যার ঘড়িতে আটকেছে সে আর তার গুনধর ছেলে প্রদীপ। বেশ সেজেগুজে এসেছে দুজন। তারমানে কি ওই বুড়োর সাথে আমার বিয়ে হবে! এই সেই তান্ত্রিক? অবশেষে আমি প্রদীপের মা হয়ে যাবো? ভেবে মনে মনে দোয়া পড়ছি। প্রদীপ আমাকে দেখে হাসলো। তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে সালাম করার জন্য আমার পায়ের দিকে এগিয়ে এলো। পা ছোঁয়ার আগেই 'ও মা গো' বলে আমি ভৌ-দৌড় দিলাম। আমার সাথে এত খারাপ হতে পারে না। কোনভাবেই না। আমি ক্রাশের বউ হতে গিয়ে মা হতে পারি না। কোনভাবেই না। তারচেয়ে পালানো উত্তম। এর চেয়ে ভালো আমি আবিত্তা টয়লেটে সেলেল্ড হবো। আমি পুরো ঘরে ছুটছি। পিছনের সেই দিনের কুকুরটার মতো দ্রুত গতিতে দৌড়াচ্ছে সবাই।
চলবে.....
আপনাদের রেসপন্স দেখে আমি হতাশ। রেগুলার দিতে ইচ্ছে করে না।