ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাকে ভাবিনি কখনও

৮ম পর্ব

লেখক: মায়িশা নুরাইন

#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও

#পর্ব_৮

#মায়িশা_নুরাইন

নীলার হুশ ফিরে আসতেই সে কিয়ানের উপর থেকে উঠে পরতে নেয়। তবে তখনও তার কোমড় কিয়ানের শক্ত হাতের বাঁধনে আবদ্ধ আছে। কিয়ানের বুকে হাত দিয়ে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে বাধা পেয়ে সে পুনরায় পরে যায়। কিয়ান যেন একটা ঘোরের মধ্যে পরে গেছে। সে এক হাত উঁচিয়ে নীলার মুখের উপর পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেয়। নীলা তো হতভম্ব হয়ে কিয়ানের ভাবসাব বুঝার চেষ্টা করে। কিয়ান যখনই নিজের মুখ তার দিকে এগিয়ে আনে, তখনই নীলা চিৎকার করে জোরে ধাক্কা দিয়ে কিয়ানের উপর থেকে উঠে পরে। নীলার চিৎকারে কিয়ানের হুশ ফিরে। সে কি করতে যাচ্ছিলো! নীলা মুহুর্তেই দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আর কিয়ান শুয়ে থেকেই ঘনঘন শ্বাস ফেলতে থাকে। তার মতো প্রাপ্তবয়স্ক এক পুরুষের এতটা নিকটে একটা মেয়ে আসলে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা বড্ড কঠিন হয়ে পরে। কিয়ানও একটু সময়ের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছিলো। এই মুহুর্তে তার বড্ড অনুশোচনা হচ্ছে। সে শুয়ে থেকেই নিজের দ্রুত বিট করা হার্টটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

অপরদিকে নীলা দৌড়ে এসে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। তারপর দরজায় হেলান দিয়ে সেভাবেই বসে পরে। তার পায়ের ব্যাথা যেন তার বোধগম্যই হচ্ছে নাহ। ভয়ে আতঙ্কে সে ঘেমে নেয়ে একাকার। এখনই এটা কি হতে যাচ্ছিলো! সে যে এভাবে কিয়ানের এতটা নিকটে গিয়ে পরবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি। নীলা বিরবিরিয়ে বলতে থাকে,

" ওহ নো! এটা কি হতে যাচ্ছিলো! আল্লাহ! আমি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছি নাহ। তাও কিনা ক-কিয়ান স্যারের সাথে। নোওও..."

নীলার গলু-মনু তার রুম জুড়ে লাফালাফি করছিলো। নীলাকে আসতে দেখে তারা নীলার কাছে এসেছে গুরগুর করছে। নীলা তাদের দেখে আরও রেগে যায়৷ একটা বাচ্চাকে দু'হাতে তুলে বকতে বকতে বলে,

" বদমাশ ছেলেপেলে, তোদের সব দোষ। মাকে একা ফেলে চলে এসেছিস বেয়াদব। লোকটা যদি তোদের মাকে কিছু করতো, তখন কি করতি? "

বিড়াল দুটো ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নীলার বকুনির পরিপ্রেক্ষিতে মিয়াঁও, মিয়াঁও করতে থাকে। যেন তারা বলতে চাচ্ছে,

" আমাদের কি দোষ! আমরা তো শুধু খেলছিলাম। তুমিই তো উড়ে গিয়ে আমাদের না হওয়া পাপার উপর পরে গেলে। আমরা তো তোমাদের স্পেস দিয়ে আসলাম। আর তুমি এসে আমাদের বকছো! "

হটাৎ নীলা বাহিরে গাড়ির আওয়াজ পায়। দ্রুত বাড়ান্দায় গিয়ে দেখতে পায় কিয়ান হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ নীলা অবাক হয় এত রাতে কিয়ানকে চলে যেতে দেখে। সেসময় তার রুমের দরজায় শব্দ হলে দরজা খোলে দেখে তার বাবা এসেছে৷

" কি হয়েছে বাবা? ঘুমাও নি এখনও? "

" ঘুমাতেই যাচ্ছিলাম। হটাৎই কিয়ান বাবা এসে জানালো সে চলে যাচ্ছে। "

নীলা প্রশ্ন করে,

" কেন চলে গেলো? "

" কিছুই জানালো নাহ। বললো জরুরি কাজ পরেছে নাকি। যাই হোক, তুই এখনও ঘুমাস নি কেন? এখনও বিড়াল নিয়ে বসে আছিস? দূরে রাখ এগুলোকে। কালকে এগুলোকে ভ্যাকসিন দিয়ে আনবো। তারপর কোলে নিয়ে ঘুরিস। "

" আচ্ছা বাবা, তুমি গিয়ে শুয়ে পরো। আমিও ঘুমাবো এখনই। "

রফিকুল সাহেব চলে যেতেই নীলা লাইট নিভিয়ে এসে শুয়ে পরে। তার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ভয় করে বলে সে বেডসাইট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখে। আর এই আলোতে তার কিয়ানের সাথের মুহুর্তের কথা মনে পরে যায়৷ কতটা নিকটে ছিলো তারা! তার সঠিক সময়ে হুশ না ফিরলে আজকে কিছু একটা হয়ে যেতো। তবে কিয়ান কেন চলে গেলো! সত্যিই কি দরকারি কাজ পরেছে, নাকি একটু আগের ঘটনার জন্যই চলে গেলো! নীলার ভাবনা থেকে কিয়ান যেন সরতেই চাচ্ছে নাহ। নীলার চোখে কিয়ানের অবয়ব দৃশ্যমান হয়ে উঠে৷ ইসস! কি এক মারাত্মক অবস্হা হয়েছিলো।

********

গাড়ির স্টিয়ারিং-এ কিয়ানের হাত শক্ত হয়ে আছে। প্রতিবারই চোখের সামনে নীলার সেই এলোমেলো চুলে ঢাকা শান্ত মুখটা ভেসে উঠছে। সে একসময় বিরক্ত হয়ে স্টিয়ারিংয়ে চাপড় মারে।

" ড্যাম ইট। আমি কিভাবে পারলাম এভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে। বারবার মেয়েটার চোখ সামনে ভেসে উঠছে কেন? "

গাড়িটা রাস্তার একপাশে সে থামিয়ে দিয়ে দু'হাতে মুখ ঢেকে নেয়। পরক্ষণেই কঠিন সুরে নিজেকেই নিজে শাসাতে থাকে,

" সে আমার স্টুডেন্ট হয়। শুধুই স্টুডেন্ট। এর বাহিরে আর কিছুই নয়। আজকের মুহূর্তটা একটা এক্সিডেন্ট ছিলো। আই সুড ফরগেট ইট। কিন্তু নীলা...ড্যাম। "

গভীর শ্বাস নিয়ে কিয়ান আবারও গাড়ি স্টার্ট করে। আপাতত গন্তব্য এয়ারপোর্টের দিকে। নীলার বাড়ি থেকে এমন দ্রুত বেরিয়ে আসার পেছনে এটাও একটা বড় কারণ।

********

সকাল সকাল ঘিয়ে ভাজা পরোটার ঘ্রানে নীলার ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙতেই দেখতে পায় তার গলু-মনু তার মাথার কাছে একে অপরের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে। সে হেসে দুটোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়৷ তারপর ফ্রেস হয়ে নীচে যেতেই দেখে তার বাবা নাস্তা সাজিয়ে রেখেছে।

" ঘুম কেমন হলো আমার মায়ের? "

" ভালো বাবা। "

" পায়ে ব্যাথা করছে এখনও? "

" একটু একটু।

" খেয়েদেয়ে তৈরি হো। তোকে নিয়ে আবার ডাক্তার দেখিয়ে আসি আজকে। আর তোর বিড়ালের বাচ্চাগুলোকেও ভেটের সাথে সাক্ষাৎ করাতে হবে তো।"

নীলা মাথা নাড়িয়ে খেতে বসে৷ তার ফোন বাজতেই দেখে নাবিহা কল করেছে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভাঙা কন্ঠে নাবিহা বলে উঠে,

" দোস্ত, কেমন আছিস? "

" আমি তো ভালোই। কিন্তু তুই বোধহয় ঠিক নেই৷ "

" হ্যাঁ রে। জ্বর বাধিয়ে বসেছি। বাচ্চাগুলোর কি খবর? "

" তারা তো বেশ আছে। কালকে রাতে আমাকে জ্বালিয়ে মেরেছে। জানিস কালকে রাতে কি হয়েছে? "

নীলা বলতেই যায়, তখনই সামনে বাবাকে বসে থাকতে দেখে চুপ করে যায়। ফোনে ফিসফিসিয়ে বলে,

" ভার্সিটি গিয়ে জানাবো। অনেক কিছুই হয়ে গেছে। "

" এহেম, ঘটনা কি আমাদের স্যারকে নিয়ে? "

" হু। "

" কিহ! সত্যি? এটা আবার বলিস নাহ রাতে স্যার তোদের বাসায় ছিলো। "

" হু। "

" আল্লাহ! তার মানে স্যারের সাথে.... "

" চুপ থাক বেয়াদব। বললাম তো ভার্সিটি গিয়ে জানাবো। "

ওপাশ থেকে নাবিহা খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে।

" দোস্ত, তুইও দিন দিন স্যারের মতো হয়ে যাচ্ছিস। কথায় কথায় বেয়াদব ডাকা শুরু করছিস। "

নীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সত্যিই তার মাঝে কিয়ানের প্রভাব পরা শুরু হচ্ছে।

বিকালে নীলা বাবার সাথে তার বিড়াল দুটোকে নিয়ে বাহিরে যায়। প্রথমে বিড়াল ক্যারি করার জন্য বাকেট কিনে। তারপর তার ভেটের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেরে আসে। তারা ভেটের কাছ থেকে বের হতেই তার বাবার ফোনে কল আসে। বাবাকে অফিস থেকে ফোন করেছে। একটা জরুরি দরকারে সাজিদুল আঙ্কেল যেতে বলেছে। তিনি মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছে বলে এখন মেয়েকে একাকী পাঠাতে চান না। তাই মেয়েকে সাথে নিয়েই নিজের অফিসে চলে যান। নীলা তার বাবার সাথে বেরুলে আশেপাশে কোথাও খেয়াল রাখতে হয় নাহ। তাই সে তার হেডফোন সাথে নিয়ে বেরিয়েছে।

বাবা অফিসে গিয়ে তাকে একটা জায়গায় বসতে বলে নিজের কাজ করতে চলে যান। নীলা সেখানে চুপচাপ বসে ছিলো। কানে থাকা হেডফোনে তার পছন্দের কিছু গান বাজছে। হাতের বাকেটে বিড়ালছানা দুটো গুটিশুটি মেরে বসে আছে৷ নীলা আঙুল দিয়ে তাদের সাথে খেলছিলো। হঠাৎ অনুভব করে কেউ একজন তার পাশের খালি জায়গায় এসে বসেছে। নীলা পাশ ফিরে দেখে একটি ছেলে তার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। ইশারায় তাকে বলছে হেডফোন খুলতে। নীলা ভ্রু কুঁচকে হেডফোন খুলতেই ছেলেটি হাত বাড়িয়ে রেখে বলে,

" হাই, আমি শান্ত। "

নীলা হাত না মিলিয়েই বলে,

" তো? "

ছেলেটির মুখ ভোঁতা হয়ে যায়। সে হাত নামিয়ে বলে,

" আপনার পরিচয়? "

" জেনে কি কাজ? "

" এমনি৷ পরিচিত হলে ভালো লাগবে। "

" আমার ভালো লাগবে নাহ। আমি আননোন কারও সাথে কথা বলতে আগ্রহী নই৷ "

নীলা পুনরায় হ্যাডফোন পরে নিয়ে নিজের মতো বসে থাকে। তবে তার পাশে বসা ছেলেটি তার দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করতে থাকে। তার দৃষ্টিতে কোন নমনীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে নাহ। বরং গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যেন নীলাকে চোখ দিয়েই

গিলে ফেলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

নীলার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিলো। ছেলেটির গভীর দৃষ্টি সে নিজেও অনুভব করতে পারছে। তাই সে বিরক্ত হয়ে উঠে যায়। হাতের বাকেট নিয়ে সামনের দিকে আগাতে নিলে গতরাতের মতো পরে যেতে নেয়। তখনই ছেলেটি এসে থেকে পেছন থেকে আটকে নেয়৷ তবে ছেলেটির হাতের ছোঁয়ায় নীলার গা গিনগিন করে উঠে৷ গত রাতে কিয়ানও তো তাকে পরে যাওয়া থেকে আটকেছিলো। তার তো তখন কোন খারাপ লাগলো নাহ। সে ছোঁয়ায় তার শরীর কেঁপে উঠে নি। এই ছেলেটার ছোঁয়া এত ঘৃণ্য লাগছে কেন! সে ঘুরে গিয়ে সজোরে ছেলেটির গালে থাপ্পড় বসায়। কড়া কন্ঠে বলে,

" অনেকক্ষণ ধরেই সহ্য করছি৷ কিছু বলছিলাম নাহ মানে এই নাহ যে বলবোও নাহ। আমাকে সাধারণ মেয়ে ভাববি নাহ। আমার কিন্তু মুখের সাথে হাতটাও ভালোই চলে। চোখ দুটোকে সামলাতে না পারলে সার্জারি করে উঠিয়ে ফেল৷ তবুও এই নষ্ট চোখের দৃষ্টি দিয়ে কোন মেয়ের দিকে তাকাবি নাহ৷ বেয়াদব..."

নীলা রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে যায়। ছেলেটি তখনও গালে হাত দিয়ে লাল চোখে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। নীলাকে যেতে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে মুখে আওরায়,

" ইন্টারেস্টিং, মিস অ্যাটিটিউড। শুধু তো একটু কথাই বলতে চেয়েছিলাম৷ আর এখন তোমার নরম হাতের ছোঁয়ায় তোমাকে কাছে পাওয়ার নেশা জেগেছে। একবার তোমায় হাতের মুঠোয় পাই। তারপর বুঝাবো এই শান্ত চৌধুরি কি জিনিস। "

সামনের একজন গার্ডকে ডেকে নীলার পরিচয় জিজ্ঞাসা করতেই বলে,

" ওনি তো রফিকুল স্যারের মেয়ে। মাঝে মাঝে এখানে আসে বাবার সাথে। "

নীলাকে থমথমে মুখে আসতে দেখে তার বাবা বলে,

" কোথায় গিয়েছিলি তুই? "

" এমনি বাবা, বাহিরে হাঁটছিলাম। "

" পায়ের উপর চাপ দিতে না করি নি? "

" ঠিক আছি তো আমি। "

তখনই সাজিদুল শিকদার তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওনাকে দেখে নীলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পরে। মনে পরে সেদিন পরিবার সহ তাদের বাড়িতে যাওয়ার পরও নীলা যেভাবে অপমান করলো, তারপর ওনার সামনে মুখ দেখানো লজ্জার। নীলা একটু আড়ালে যেতে নিলে তিনি মুচকি হেসে বলেন,

" কেমন আছো মা? "

নীলা মাথা নামিয়ে বলে,

" আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন আঙ্কেল? "

" আমিও ভালো আছি মা। শুনলাম তুমি ব্যাথা পেয়েছো? সাবধানে গাড়ি চালাবে তো। সোহান তো তোমার কথা শুনে দেখার জন্য লাফাচ্ছিলো। "

সোহানের কথা শুনেই নীলার মুখ চকচক করে উঠে। নীলা অল্প হাসে। কিছুই বলতে আর পারছে নাহ সে। নীলার অস্বস্তি লক্ষ্য করে সাজিদুল সাহেব নীলাকে আর কিছুই বলেন নাহ। তিনি রফিকুল সাহেবকে বলেন,

" শোন রফিক, একটা কথা তোকে জানানোর ছিলো। বিষয়টা বলবো বলবো করে বলা হচ্ছিলো নাহ। "

" খারাপ কোন সংবাদ নাকি? "

" কিভাবে যে বলি! কিছুদিন ধরে শুনছিলাম অফিসের কয়েকজনকে ট্রান্সফার করা হবে। সম্ভবত সেখানে আমাদের নামও আছে। "

নীলা তা শুনে অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায়। তিনিও নীলার দিকে তাকাতেই নীলার ছলছল চোখ দেখতে পায়। মেয়েটা যে কেন এত ইমোশনাল! তিনি নীলাকে উপেক্ষা করে বন্ধুকে বলেন,

" চেন্জ করা যায় নাহ? এত বছর ধরে এখানে কাজ করছি। আবেদন দিয়ে দেখি না হয়। "

" দিতে পারিস। তবে কাজ হবে নাকি বলতে পারছি নাহ। আমার তো নাহয় সম্পূর্ণ পরিবার এখানে একসাথে থাকে।

কিন্তু তোর তো...."

নীলা মন খারাপ করে একাকী এগিয়ে যায়। রফিকুল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে চলে আসেন। বছর খানিক ধরেই ট্রান্সফারের কথা হচ্ছিলো ওনার। তবে তিনি তা বারবার নাকচ করছিলেন। কিন্তু এবার বোধহয় আর তা সম্ভব হবে নাহ। নীলা গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। বাবা আসতেই সে ফোপাঁতে থাকে। তিনি মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বলে,

" বোকা মেয়ে, এখনও তো সিদ্ধান্ত হয় নি। বাচ্চাদের মতো কান্না জুড়ে দিয়েছে। সবাই কি বলবে! "

নীলা ফুঁপিয়ে বলে,

" আমি কিন্তু তোমার সাথেই যাবো। তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেখানেই থাকবো। আমাকে একা রেখে যেতে পারবে নাহ তুমি। "

তিনি হেসে বলেন,

" ঠিক আছে। আগে সময় হোক, পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এখন বাসায় চল। "

***********

" কিয়ারা, কোথায় তুই? "

" কিয়ান ভাইয়া, তুমি এসেছো? তোমার অপেক্ষায় কালকে থেকে বসে আছি। কালকে আসলে নাহ কেন? "

কালকের কথা বলতেই কিয়ানের রাতের কথা মনে পরে। সে নিজেকে সামলে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

" ওই তো, এটা কাজে আটকা পরেছিলাম। আয়ান কোথায়?"

" ও একটু আগেই বেরুলো। বললো কি একটা কাজ আছে। "

" তোরা তো কালই বিদেশ থেকে ফিরলি। আজই এখানে তার কি কাজ পরে গেলো? "

" জানি নাহ তো। আমাকে বলে নি। শুধু বললো কি একটা কাজ পরেছে। "

কিয়ান একটু চুপ করে থাকে। কিয়ারা তার খালাতো বোন হয়। বয়সে প্রায় কাছাকাছি বয়সের বলে দুজনের মধ্যে বন্ডিং অনেক ভালো। বছর খানিক হলো আয়ানের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। সেই সময় কিয়ান বিদেশে ছিলো। তাই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারে নি। কিয়ারার বিয়ের পর আজ প্রথম তার সাথে আয়ানের সরাসরি দেখা হবে। এর আগে ফোনে কথা হলেও দেখা হয় নি তাদের।

" ভাইয়া, তুমি রেস্ট করো। আমি খাবারের ব্যবস্হা করছি। "

কিয়ান পাশের রুমে গিয়ে শুয়ে পরে। ফোন বের করে কাউকে বলে আয়ানের ব্যাপারে একটু খবর নিতে। কারণ আয়ানের সম্পর্কে তার তেমন কিছুই জানা নেই। তাই শুরুতেই সব জেনে রাখা ভালো হবে। আয়ান বিদেশের মাটিতে কিসের যেন কাজ করতো। সেসব বিষয়ে তার সঠিক জানা নেই। তবে ছেলেটি যেন বয়সের তুলনায় একটু বেশিই প্রতিষ্ঠিত। এটাই তার ভাবনার বিষয়। তার এত ইনকামের উৎস কি!

***********

" পরি, তুমি কেমন আছো? "

" আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো হ্যান্ডসাম বয়? "

সোহান বায়না ধরায় নীলার সাথে ভিডিও কলেই কথা বলার সুযোগ দেয়। নীলাকে দেখেই সোহানের মুখে হাসি ফুটে উঠে।

" আমিও ভালো। জানো, আমি নাহ তোমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু চাচ্চু না করে দিয়েছে। বলেছে আমি নাকি তোমাকে ডিস্টার্ব করবো। আমি কি তোমাকে ডিস্টার্ব করি পরি? "

" মোটেও নাহ পাখি। তোমার চাচ্চু পঁচা, তাই মিথ্যে বলেছে। "

" চাচ্চু মিথ্যুক। "

" কিরে, কার কাছে আমার বদনাম করছিস? "

কিয়ানকে দেখে সোহান সোজা গলায় বলে,

" পরির কাছে। পরি বলেছে তুমি মিথ্যুক। আমি পরিকে মোটেও ডিস্টার্ব করি নাহ। তুমি জিজ্ঞাসা করে দেখো। "

ফোনটা সোহানের হাত থেকে ঘুরে কিয়ানের হাতে আসতেই সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। স্ক্রীনের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে নীলার বুকের ভেতরটা অকারণেই ধক করে উঠল। সদ্য গোসল করে আসা কিয়ানের ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটাপ জল গড়িয়ে কপাল ছুঁয়ে নেমে আসছে। পরনে শুধু কালো ট্রাউজার, দু'হাত পকেটে গুঁজে রাখা। তার সেই অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব যেন পুরো ফ্রেমটাকে নিজের করে নিয়েছে।

নীলা কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল। গত রাতের সেই মুহূর্তটা আবারও বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল তার মনে। অন্ধকার ঘরের সেই মুহুর্তগুলো যেন তার সামনে বারবার ভেসে আসছে। তার গাল দুটো অজান্তেই রাঙা হয়ে উঠল।

" ধ্যাত.. আমি আবার কীসব ভাবছি! "

তবু যতবার সে চোখ সরাতে চাইল, ততবারই যেন দৃষ্টি ফিরে গেল সেই পরিচিত গভীর চোখজোড়ার দিকে। তবে এই দৃষ্টিতে কোন নোংরামি ছিলো নাহ। বরং মনে হচ্ছে কিয়ান যেন এই মুহুর্তে খুবই মনোমুগ্ধকর কিছু পরখ করছে।

অন্যদিকে কিয়ান শান্ত হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনের ওপাশে বসে থাকা মেয়েটাকে আজ যেন অন্যরকম লাগছে। খোলা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, কোলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে গলু আর মনু। তাদের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে নীলা। সেই দৃশ্যটা অদ্ভুত কোমলতায় ছুঁয়ে গেল কিয়ানের মনকে। একটা মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

দুজনেই কিছু বলছে না। কথাগুলো যেন চোখেই আটকে আছে। নীরবতারও যে নিজস্ব ভাষা আছে, তা হয়তো এই কয়েকটি সেকেন্ডেই তারা দুজন বুঝে ফেলল।

চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন