ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাকে ভাবিনি কখনও

৩৩তম পর্ব

লেখক: মায়িশা নুরাইন

#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও (৩২)

#মায়িশা_নুরাইন

" নীলা উঠো। বাসায় চলে এসেছি আমরা। "

নীলা চোখ পিটপিট করে তাকায়। নিজেকে কিয়ানের কোলে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। ধরফরিয়ে উঠে বলে,

" আপনি এখানে আসলেন কখন? আপনি না গাড়ি চালাচ্ছিলেন? "

" বউকে বেশীক্ষণ দূরে রাখতে নেই। তাই তো চলে এসেছি। "

" সরুন। আপনার সাথে না আমার ব্রেকআপ চলছে। দূরে যান। "

কিয়ান সরে যাওয়ার বদলে উল্টো নীলাকে টেনে আরও নিজের কাছে নিয়ে আসে। বউকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে বলে,

" এত রাগ করতে নেই বউ। "

" বউ বউ করা বন্ধ করুন। আমার অসহ্য লাগছে। "

" হটাৎ তোমার কি এমন হলো, যে এমন চিংড়ি মাছের মতো লাফাচ্ছো? আমার জানামতে আমি তো কোন ভুলই করি নি। শুধু শুধু রাগ দেখিয়ে ব্যাকসীটে বসে আছো। "

" এমনি রাগ হচ্ছে আমার। ছাড়ুন আমায়৷ "

কিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরে এসে নীলা পেট চেপে ধরে বসে পরে। চোখ মুখ তার ব্যাথায় কুঁচকে গিয়েছে। কিয়ান ভ্রু কুঁচকে কাহিনী বুঝার চেষ্টা করছে। গতরাত থেকেই এমন করছে মেয়েটা। কাছেও ঘেষতে দিচ্ছে না। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে শুধু। নীলাকে সুস্হ মনে হচ্ছে নাহ। কিয়ান একটু এগিয়ে নরম সুরে বলে,

" খারাপ লাগছে নীলা? পেট ব্যাথা করছে? "

নীলা ছলছল চোখে মৃদু মাথা দোলায়। কিয়ান অস্হির হয়ে বলে,

" ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো? অনেক ব্যাথা? "

" লাগবে নাহ। এমনি ঠিক হয়ে যাবে। আপনি শুধু দূরে থাকুন। আমার কিছুই ভালো লাগছে নাহ। "

এতক্ষণে কিয়ান নীলার কাহিনীর মানে বুঝতে পারে। তাই সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। নীলা ছলছল চোখে কিয়ানের যাওয়ার পথে তাকায়। চলে যেতে বললেই এভাবে চলে যেতে হবে! নীলা কুঁজো হয়ে সীটেই শুয়ে পরে। প্রতিবারই এসব সহ্য করা লাগে। তার তো মা নেই। কার সাথে শেয়ার করবে। বাবাকে কি এসব বলা যায়! মাঝে মাঝে নিজে থেকেই গরম পানি করতে গেলে বাবা কিভাবে যেন টের পেয়ে যেতো৷ মেয়েকে বসিয়ে নিজেই গরম পানি করে দিতেন। মুখে কিছুই বলতেন নাহ। কথা ছাড়াই যতটুকু সম্ভব সেবা করতেন। এই সময় নীলার মনে হতো তার মা থাকলে তাকে এতটা কষ্ট পেতে হতো নাহ। কত রাত সে একা ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। বাবাকে বলতে না পারার কষ্টটা আরও অসহনীয়। তার তো বাবা ছাড়া আর কেউ নেই।

নীলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। বাবার পর যেই লোকটা তার ভরসার জায়গা, সে-ও উঠে চলে গেলো। বউয়ের কষ্ট দেখতে না পারলে এত বউ বউ করার কি আছে! অসহ্যকর লোক একটা। নীলা কাঁদতে থাকে। তার কিছুই ভালো লাগছে নাহ। ঠিক তখনই গাড়ির ডোর খুলে কিয়ান ভেতরে বসে। নীলাকে কাঁদতে দেখে অস্হির হয়ে বলে,

" নীলা, খুব খারাপ লাগছে? আ'ম সরি নীলা। আমি তো এগুলো কিনতে গিয়েছিলাম। কখন কি লাগে আমার তো জানা নেই। "

নীলা ঠোঁট উল্টে কিয়ানকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। কিয়ান তার মাথা হাত বুলিয়ে দেয়। ফিসফিসিয়ে বলে,

" আ'ম সরি নীলা। আমি মোটেও বুঝতে পারি নি তোমার শরীর ভালো নাহ। এরই মাঝে এই জার্নিটা ঠিক হয় নি। "

নীলা কিয়ানের গলা জড়িয়ে চুপচাপ বসে থাকে। মুখে কিছুই বলে নাহ। আপাতত কথা বলার ইচ্ছেও নেই। কিয়ানও আর কথা বাড়ায় নাহ। তাদের বাড়ি ফিরতে আরও ঘন্টাখানিক লাগবে। নীলাকে এতটা সময় ব্যাকসীটে চুপচাপ বসে থাকতে

দেখে খবর নিতে এসেছিলো। কিছুক্ষণ পরে নীলা ওভাবেই ঘুমিয়ে যায়। কিয়ান সাবধানে তাকে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভিং সীটে এসে আসে। এখন বাসায় যাওয়াটাই বেটার হবে।

বাসায় ফিরে নীলাকে ডেকে তুললে নীলা কোনরকমে উঠে রুমে চলে যায়। পেছনে কিয়ান ব্যাগপত্র নিয়ে আসে। সে বাড়িতে ঢুকতেই ফুফুকে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। এই মহিলা আবার কবে আসলো! সে কিছু না বলে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে ফুফু আটকায়।

" মেয়েটা ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলে গেলো। আর তার ব্যাগপত্র তোকে নিয়ে যেতে হচ্ছে কেন? "

কিয়ান থামে। পিছু ঘুরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,

" একজন পুরুষ মানুষ হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। ওর জায়গায় তোমরা থাকলেও একই কাজ করতাম আমি। "

" ওই মেয়ে আর আমরা কি এক হলাম? আমরা বাড়ির মানুষ। আর ওই মেয়ে তো আমাদের বাড়ির কেউ নয়। "

" ভুল বললে। তোমরা যেমন আমাদের বাড়ির গেস্ট। নীলাও তেমনই আমাদের বাড়ির গেস্ট হয়। কোন পার্থক্য নেই। আমি খুব ক্লান্ত। সো এক্সকিউজ মী..."

কিয়ান নীলার রুমের দিকে অগ্রসর হয়। কিয়ানের সুক্ষ্ম অপমানে রোজা বেগম রাগে ফোঁস ফোঁস করে উঠেন৷ মীমু এসে জানায়,

" দেখলে মা কেমন করে বললো? তুমি ফুফু হও, তোমাকে একরত্তি সম্মানও দিলো নাহ। উল্টো ওই মেয়েটার জন্য কতগুলো কথা শুনিয়ে দিলো। "

" দাঁড়া না, ওই মেয়ের ব্যবস্হা করছি আমি। কিয়ানের সাথে তোরই বিয়ে হবে। আগে মেয়েটাকে বিদায় করে নিই। "

মীমু খুশি হয়ে যায়। সেদিনই সে মা'কে ফোন করে আসতে বলে দিয়েছে। এবার যা করার মা'ই করবে। মনে মনে সে বলে উঠে,

" নীলা, তোমার দিন ফুরিয়েছে। অনেক তো বড় বড় কথা বলেছো। এবার সব কথার জবাব পেয়ে যাবে। তোমার প্রিয় জিনিস এবার আমারই হবে। "

***************

" নীলা, নাও এটা। একটু গরম ভাপ নাও। ভালো লাগবে। "

" ভাবী, তুমি? "

" অসুস্হ থাকলে তোমার জানানো উচিত ছিলো নাহ? কিয়ারাও বাসায় নেই, সোহানের বাবা ওকে ডাক্তারের কাছে চেকাপে নিয়ে গিয়েছে। আর তুমি একা রুমে কষ্ট পাচ্ছো। "

" আ-আমি ঠিক আছি। "

" কতটা ঠিক আছো বুঝতেই পারছি। একটু উঠে বসো তো। "

নীলা মুখ মলিন হয়ে যায়। রুমে ফেরার পর কিয়ান তার ব্যাগপত্র রেখেই চলে গিয়েছিলো। তার কিছুক্ষণের মাঝেই তানহা এসে হাজির৷ তবে কি ওনিই সব জানিয়েছে! নীলা বেশ সংকোচ লাগতে থাকে। তানহা প্লেটে করে খাবার নিয়ে এসেছে। লোকমা করতে করতে বলে,

" সংকোচ করার কিছুই নেই। একটা মেয়ের জীবনে তার বাবা মায়ের পরে একমাত্র স্বামীর স্হান। স্বামীকে যদি নিজের ভালোমন্দের কথা শেয়ার না করো সে বুঝবে কিভাবে? ওরা পুরুষ মানুষ। নিজেদের সবটুকু তাদের থেকে আদায় করে নিতে হবে। আমি তো দেখো চাকরি করি। চাকরি, সংসার, সন্তান একসাথে সামলানো মুখের কথা নয়। অনেক কাজই আমি ওনাকে বলে বলে করাই। এরা শুধু পালাই পালাই করে। ওদের তো বুঝতে হবে আমরা মেয়েরা কম কষ্ট করি নাহ। বুঝাতে হবে আমাদের। ওদেরও ফীল করতে হবে আমাদের কষ্টটুকু। নিজের যতটুকু প্রয়োজন আদায় করে নিতে হবে। "

কথা বলতে বলতে তানহা নীলাকে খাইয়ে দিতে থাকে। নীলা চোখে পানি নিয়ে খেতে থাকে। এখানে এসেছে মাসখানিক পেরোলো বোধহয়। অথচ এই কয়েকটা দিনেই এরা তাকে কতটা আপন করে নিয়েছে। নীলার ভাবতেই কষ্ট হয়, এমন একটা পরিবারের অংশ হওয়ার পথটা সে নিজের হাতে কাঁটাময় করে তুলেছে। প্রতিটি পদে পদে সেই যন্ত্রনা তাকে সহ্য করতে হচ্ছে। পারছে নাহ শ্বাশুড়ির কাছে যেতে। পারছে নাহ বিয়ের পরও সংসার করতে। পারছে নাহ স্বামীর রুমে নিজের জায়গা করে নিতে। সবটা তো নিজের দোষেই হলো।

তানহা খাইয়ে দিতে দিতে রুমে সোহান দৌড়ে চলে আসে। এক দৌড়ে নীলার বুকে পরে কান্না করে দেয়।

" পরি, তুমি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে কেন? আমি খুব কান্না করেছি। তুমি পঁচা পরি। "

" সোহান, পরি অসুস্হ। এমন দুষ্টুমি করতে নেই। পরি ব্যাথা পাবে। "

মায়ের কথায় সোহান চোখে পানি নিয়ে নীলার দিকে তাকায়৷ নীলার চোখে পানির রেশ দেখে নিজের ছোট্ট ছোট্ট হাতে মুছিয়ে দেয়। বাচ্চা কন্ঠে বলে,

" কেঁদো না পরি। আমি আর তোমাকে ব্যাথা দিবো নাহ। "

নীলা সোহানকে কোলে তুলে নেয়। সোহানের চোখের পানি মুছিয়ে দেয়।

" পরি তোমাকে না বলে গিয়ে নিজেও কষ্ট পেয়েছে৷ আর এমন করবো না সোনা। সোহান বাবুকে দেখে পরি একদম সুস্হ হয়ে গেছে। "

সোহানকে কোলে তুলে তার শরীর গরম বুঝে তানহাকে বলে,

" ওর তো গা গরম হয়ে আছে। "

" দুদিন ধরে জ্বর এসেছে। বিছানা থেকে নামেই নি। তোমাদের আসার খবর পেয়ে বেঁধে রাখা গেলো নাহ। "

সোহান নীলার গায়ে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। একটু আগেই তানহা ওকে খাইয়ে রুমে রেখে এসেছিলো৷ এখন উঠে চলে এসেছে। নীলার খাবার শেষে তানহা তাকে রেস্ট করতে বলে। সোহানকে নিতে চাইলেও সোহান নীলাকে ছাড়ে নাহ।

" থাকুক ভাবী, আমার সাথেই থাকুক এখানে। বাচ্চা মানুষ.."

তানহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ছেলেটার অসুখ হলেই তাকে কাজ থেকে লীভ নিতে হয়। এই সময় দাদুমনির কাছেও থাকতে রাজি নয় সে। সারাক্ষণ মা'কে কাছে চায়৷ তানহা তার কাজের জন্য সবসময় ছেলেকে সময় দিতে পারে নাহ। এমনি তার ছেলে কান্নাকটি না করলেও এই অসুখের সময়টায় মাকেই লাগে তার। আজ একটা ইমার্জেন্সি পেশেন্ট আছে তার। অসুস্হ ছেলেকে রেখে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিলো নাহ। এখন নীলা আসায় একফাঁকে রোগী দেখে চলে আসবে। নীলা আসার পর থেকে তার ছেলের জন্য ভালোই হয়েছে। নীলার হাতে ছেলেটা মাছ খাওয়াও শিখে গেছে।

সোহানকে বুকে জড়িয়ে নীলা শুয়ে পরে। সোহান আবদার জুড়েছে তাকে গল্প শুনাতে। নীলা গল্প বলতে থাকলে সোহান খুশি হয়ে যায়। তানহা সেসব দেখে মুচকি হেসে চলে যায়।

**************

কিয়ান রুমে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিলো। ঘুমে তার চোখটা লেগেই আসছিলো, হটাৎ একটা বিড়াল ছানা তার গায়ের উপর লাফিয়ে পরে। কিয়ান ধরফরিয়ে উঠ বসে। তাকিয়ে দেখে তার পায়ের কাছে দুটো ছানাই বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এ কয়দিনে বিড়াল দুটোও বড় হয়েছে, হৃষ্টপুষ্টও হয়ে উঠেছে।

" এই বেয়াদব, মালকিন রেখে আমার কাছে কি? যা এখান থেকে। "

গলু এক পা এগিয়ে আসে। তারা তৈরি কিয়ানের সাথে খেলার জন্য। তারা তো আর জানে নাহ কিয়ান তাদের ভয় পায়। একটা বিড়াল ছানা লাফিয়ে আসতে নিলে কিয়ান ভুল করে লাথি দিয়ে বসে। সাথে সাথেই ছানাটি দূরে ছিটকে পরে করুণ স্বরে ডেকে উঠে। কিয়ান চমকে উঠে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ছানাটিকে কোলে তুলে নেয়। হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। এই পর্যায়ে সে ভুলেই গেছে তার ভীতির কথা।

তানহা রুমে এসে এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়।

" কিয়ান, তোমার কোলে বিড়াল? "

" ভাবী, ভুলে ব্যাথা দিয়ে ফেলেছি। এগুলো আমার রুমে কি করছে? এখন কি সারা বাড়িতেই লাফালাফি করে নাকি? "

" নীলা যাওয়ার পর সোহান তার রুমে রেখেছিলো। সে-ই বোধহয় তোমার রুমে রেখে গেছে। "

" তোমার ছেলে বড্ড ফাজিল হয়েছে। যখন থেকে আমার বিড়ালে ভীতির কথা জানতে পেরেছে, তখন থেকেই এইভাবে শাস্তি দেয় আমায়। "

তানহা হেসে ফেলে। আসল কথা মনে পরতেই বলে,

" মা ডাকছেন তোমায়। সেটাই বলতে এসেছিলাম৷ "

" আচ্ছা আসছি। "

তানহা বেরিয়ে যেতেই কিয়ান দু'হাতে বিড়াল দুটোর ঘাড়ে চেপে তুলে নিয়ে নীলার রুমে আসে। নীলা সোহানকে জড়িয়ে ধরে আরামে ঘুমাচ্ছে দেখে স্বস্তি পায়। বিড়াল দুটোকে নামিয়ে নীলার দিকে এগিয়ে যায়। মুখ নামিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। তারপর চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

মায়ের রুমে আসতেই সেখানে ফুফুকেও বসে থাকতে দেখে।

সাথে সামিন ভাইও আছে। কিয়ান ভাইয়ের দিকে তাকালে সে ইশারায় কিছুই জানে না বলে জানায়। মা গম্ভীর গলায় জানান,

" রোজা একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। সেই বিষয়েই আলোচনা করতে ডেকেছি। "

" সেটা তো পরে বললেও পারতে। একটু আগেই বাসায় ফিরলাম। রেস্টও করতে পারলাম নাহ। "

" আগে কথাটা শুনে নে। পরে যা করার কর। "

" আচ্ছা বলো। "

মমতাজ বেগম বড় করে একটা শ্বাস ফেলে বলেন,

" রোজা মীমুর সাথে তোর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। রোজা সামনের বছর ভার্সিটি উঠবে। আর তোর বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। এতদিন যে মেয়েই বলেছি, রিজেক্ট করেছিস। এখন নিশ্চয়ই মানা করবি নাহ। "

" করবো, মানা করবো। এবারও রিজেক্ট করবো। আমি এই বিয়েতে রাজি নই। "

কোন ভাবনা ছাড়াই কিয়ানের এমন উত্তরে মমতাজ বেগম অবাক হন। রোজা বেগম তেতে উঠে বলে,

" আমার মেয়ে কম কিসে? কি সমস্যা তোর ওকে বিয়ে করতে? আমার মেয়েটা তোকে ভালোবাসে। দেখতেও সুন্দরী,

কাজকর্মও শিখে যাবে। "

" সমস্যা আমার ইচ্ছেতে। আমার ইচ্ছে নেই ওকে বিয়ে করার। "

" এসব কোন ধরণের কথা কিয়ান? "

" এসব সোজা কথা মা। দয়া করে আমাকে আর বিয়ে নিয়ে প্রেশার দিও না। আমি তো বলেছিলাম সময় হলে জানাবো তোমায়। "

রোজা বেগম প্রচন্ড রেগে যান। তিনি চিৎকার করে অভিযোগ করেন,

" আমি আগেউ বলেছিলাম ওই মেয়েটাকে বাড়িতে না রাখতে। দেখলে তো ভদবী, মেয়েটা তেমার ছেলেকে বশ করে নিয়েছে। দুদিন পরে যখন ছেলে হাতছাড়া হয়ে যাবে, তখন বসে বসে কেঁদো। কেউ তোমাকে স্বান্তনা দিতে আসবে নাহ। "

এতক্ষণে সামিন মুখ খুলে। শান্ত ভঙিতে বলে,

" আমাদের মা'কে দেখার জন্য বাহিরের কাউকে প্রয়োজন নেই ফুপু। আমরা নিজেরাই যথেষ্ট মায়ের জন্য। কিয়ানকে কে বশ করলো, ও হাতছাড়া হলো নাকি সেসব পরের ব্যাপার। বর্তমানে এই বিয়েরা ব্যাপারটা এখানেই বন্ধ করা হোক। ভালোবাসা না থাকলে সেই বিয়ে টিকে নাহ। নিশ্চয়ই তুমি তোমার মেয়ের খারাপ চাইবে নাহ। তাাি এসব বন্ধ করো৷"

রোজা বেগম রেগে রুম থেকে বেরিয়ে যান। মমতাজ বেগম পিছু ডাকলেও শুনেন নাহ। তিনি এবার রেগে ছেলেকে বকাবকি শুরু করেন।

" এসব কোন ধরণের ব্যাবহার কিয়ান? রোজা তোর ফুফু হয়। তাছাড়া মীমুকে নিয়ে সমস্যা কিসের? ভালোই তো! "

দুই ছেলেই একত্রে মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বমস্বরে বলে,

" ভালো! "

তিনি আমতা আমতা করে উত্তর করেন,

" খারাপ কোথায়? বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান বলে একটু জেদী টাইপের। আজকালকের মেয়েরা একটু আধটু এমনই হয়। "

" মা, নীলাও তো আজকালকের মেয়েই। তবে ওর ব্যাবহারে কেন তুমি রাগ দেখাও। ওর তো মা নেই। শুধু বাবার আদরে বড় হয়েছে। জেদ দেখানো কি তাকে শোভা পায় নাহ? "

মমতাজ বেগম ছেলের দিকে তাকান। তবে কোন উত্তর না দিয়ে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে যান। সামিন ভাইয়ের পিঠ চাপড়ে স্বান্তনা দেয়। কিয়ান তার বিজনেসের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে জানায়,

" পরিস্হিতি এখনও আমার অনুকূলেই আছে৷ পরশু মিটিং আছে। আশা করি সব ভালোই হবে। "

কিয়ানও মাথা নাড়ায়। ভাইয়ের পেছনে সেও যে সবটা প্রোটেক্ট করার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে তার বন্ধুদের সহযোগিতায় সেদিনের সেই আক্রমণকারীদের খবর নেওয়া হয়েছে। তাদের শরীয় বিয়ের দিন রিপন ছাড়া যেই বন্ধু দুজন এসেছিলো, তারাই সামিনের কোম্পানিতে চাকরি করে৷ সেদিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে। এই দুইদিন কোন গন্ডগোল না হলে পরবর্তী মিটিংটা ভালেভাবেই সম্পন্ন হবে ইনশাআল্লাহ।

********************

" দোস্ত, কেথায় তুই? আমি ভার্সিটি চলে এসেছি। দ্রুত আয়, তোকে ছাড়া ভালো লাগছে নাহ। "

" আসছি, ওনার সাথে আসবো। ওনার সকাল থেকে খবর নেই। ওনি ফিরলেই একসাথে আসবো। "

নীলার ওনি ওনি শুনে নাবিহা ফিক করে হেসে দেয়৷ এতে নীলা লজ্জা পেয়ে উল্টো নাবিহাকেই বকতে থাকে। তাদের কথার মাঝে কিয়ান ঝড়ের বেগে হাজির হয়। হাতে কয়েক প্রকারের শুকনো খাবার আছে। এগুলো নীলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবারও ঝড়ের বেগে চলে যায়। নীলা অবাক হয়ে হাতের খাবারগুলোর দিকে তাকায়। সকাল সকাল এসব কোথা থেকে আনলো!

নীলা তৈরি হয়ে ড্রয়িংয়ে দাঁড়িয়ে কিয়ানের অপেক্ষা করছে। মমতাজ বেগম এসে তাকে দেখে বলেন,

" তোমার বাবা এখানে থাকেন নাহ। তাই ঘুরতে গিয়ে লাফালাফি করে নিজের সাথে আমাদেরও বিপদ বাড়াবে নাহ। কিছু হলে তো আমাদেরই দোষ হবে। "

" জ্বি না আন্টি। আমার দোষে অন্য কেউ দোষী হয় না। তাছাড়া আমি তো ভদ্র মেয়ে হয়ে গেছি, তাই নাহ। আপনিই বলুন, দেখছেন তো আমায়। "

মমতাজ বেগম ভ্রু কুচকে নীলার হাসিমুখ দেখে। তৎক্ষনাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে মৃদু স্বরে বলেন,

" এখন ভালো হলে কি হবে। যখন ভালোর দরকার ছিলো তখন ছিলে নাহ তো। "

নীলা সবটাই শুনতে পায়। তাই সে স্বাভাবিকভাবেই বলে,

" সময় তো পেরিয়ে যায় নি তাই নাহ। এখনও স্যার অবিবাহিতই আছেন। "

" আমার ছেলেকে আর তোমার সাথে বিয়ে দিবো নাহ। "

" আমিও আপনার ওই বদ ছেলেকে বিয়ে করবো নাহ। আপনার ছেলে আপনার একদম কথা শুনে নাহ। বলুন তো, এসব মায়ের অবাধ্য ছেলেরা কখনও ভালো হয় নাকি? "

নীলার কথায় প্রভাবিত হয়ে তিনি বলে উঠেন,

" ছেলেটা আমার আগে ভালোই ছিলো। দিন দিন অবাধ্য হচ্ছে এখন। "

" এসব ছেলেকে অনেক টাইটে রাখতে হয়। তিনি বড় হয়েছেন তো কি হয়েছে, আপনি তো মা। মায়েরা সবসময়ই সন্তানকে শাসন করতে পারে। কথা না শুনলে ধরে পিট্টি দিবেন। "

" এটা অবশ্য ঠিক বলেছো। সন্তানকে শাসনে না রাখলে বিগড়ে যায়। "

নীলা খুশি হয়ে বলে,

" দেখলেন আন্টি, আপনার আর আমার মনমানসিকতায় কত মিল। আমরা চাইলে যোগ্য শ্বাশুড়ি-বউমা হতে পারতাম, তাই না? "

" হ্যা ঠিক..... আব, এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন? কোথায় না যাবে? "

মমতাজ বেগমের কথা ঘুরানো দেখে নীলা হেসে ফেলে।

" স্যারের জন্য অপেক্ষা করছি। ওনি আসছেনই নাহ। আমি কি একাই চলে যাবো আন্টি? "

" না দাঁড়াও। ডাকছি আমি কিয়ানকে। আর শুনো মেয়ে, সেখানে গিয়ে কিয়ানের কাছাকাছি থাকবে। ভুলেও হারিয়ে-টারিয়ে যেও নাহ। "

" আপনার কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। স্যারের সাথে একদম চিপকে থাকবো। নিজেও হারাবো না, স্যারকেও হারাতে দিবো নাহ। ওনাকে দেখে দেখে রাখবো একদম। "

" নিজেকে দেখে রেখো, তবেই হবে। আমার ছেলে তোমার মতো বাচ্চা নাহ। "

নীলা হুট করে এগিয়ে গিয়ে মমতাজ বেগমকে জড়িয়ে ধরে তার গালে চুমু দিয়ে বসে। মমতাজ বেগম তো থ হয়ে যান৷ অবাক কন্ঠে বলেন,

" এটা কি হলো? "

" বাচ্চাদের কাজ এটা। বাচ্চারা তো মায়েদের সাথে এমনই করে না? আমি তো বাচ্চাই। "

নীলা হেসে বেড়িয়ে যায়। মমতাজ বেগম এখনও থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিয়ান এসে মা'কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় চুমু দিয়ে বলে,

" বাচ্চা মানুষ, এত ভেবো নাহ। আসছি, দোয়া করো৷ যাতে না হারিয়ে বাচ্চাটাকে দেখে রাখতে পারি। "

মমতাজ বেগম ছেলের পিঠে আলতো করে মার লাগান। কিয়ান হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। মা তখনও নীলার ব্যবহারে একটু চমকে আছেন। এটা সত্যি নীলার বয়স হয়েছে। অথচ সে মনের দিক থেকে এখনও বাচ্চা বসে আছে৷

মনের অজান্তেই তিনি হেসে ফেলেন। তিনি রুমে চলে যেতেই রোজা বেগম বেরিয়ে আসেন। এতক্ষণ সবটাই তিনি দেখলেন। মীমুর থেকে সব শুনে বুঝতে পেরেছেন কিয়ান আর নীলা কিছু তো লুকাচ্ছে। সবটা উদ্ধার করে তিনি কিয়ানকে শাস্তি দিয়েই ছাড়বেন। এমনিই ভাবীর উপর বেশ ক্ষোভ ছিলো তার। সবকিছুর ঝাঁঝ এইদিক দিয়েই মিটিয়ে ছাড়বেন তিনি।

চলবে.........

(মমতাজ বেগমের মনে কুটনামি ঢুকিয়ে দেই? হু?

রিচেক দেওয়া হয়নি। পরে সময় করে রিচেক দিবো।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন