#মন_দিয়েছে_ধরা
#পর্ব_২০
লেখনীতে....#পুষ্পিতা_প্রিমা
মাসছয়েক পরের কথা।
কার্তিক মাস শেষ হতে চলেছে। শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। সন্ধ্যে নামতে নামতে কুয়াশাজড়ানো ধরনীর বুকে কাঁপুনি ধরে। তন্মধ্যে নীরা জ্ঞাত হয়েছে তার গর্ভে নতুন প্রাণসঞ্চারণের কথা। এম এ পরীক্ষার শেষ দিন। ইশা সে আর অর্পি তিনজনই রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফুচকা খেয়ে বাড়ি ফিরলো। সন্ধ্যা থেকেই শরীরটা খারাপ লাগায় সে শুয়ে থেকেছে বিছানায়। রিপ ফোন করে জানালো তার আজ বাড়ি ফিরতে রাত হবে এবং সে রাতে খেয়ে আসবে। নীরা যেন খেয়ে শুয়ে পড়ে।
মুনা তার নড়াচড়া টের না পেয়ে দেখতে এল। নীরা তখন চোখ বুঁজে শুয়ে আছে।
কিরে পরীক্ষা কি ভালো হয়নি?
নীরা উঠে বসলো। বলল, ভালো হয়েছে।
মুনা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল
শরীরে কি খারাপ লাগছে? কি হয়েছে? জ্বরটরও তো নেই।
নীরা শীর্ণমুখে বলল
তোমার ভাইকে বলবে না। আসলে আমি ফুচকা খেয়ে খেয়েছি ইশু আর অর্পির সাথে। তখন থেকেই খারাপ লাগা শুরু হয়েছে। সার্জেলও খেয়েছি। তারপরও কেমন ক্ষুধামান্দ্য লাগছে।গলায় এসে কি যেন আটকে রয়েছে।
বসার ঘরে চল। ওখানে বসে চা খাই। তোর বড়দা নেই। চল।
নীরা যেতে চাইলো না। মুনা জোর করে নিয়ে গেল। চা খাওয়ার পর নীরার শরীর আরও খারাপ লাগলো। সে সোফায় মাথা এলিয়ে দিতেই তালহা বেগম এসে কপালে হাত রেখে বললেন
তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে বউ?
নীরা চোখমেলে রাখার চেষ্টা করে বলল
নাহ নাহ তেমন কিছু না।
দ্রুতবেগে ঘরের দিকে ছুটলো সে। পরপর টানা তিনবার বমি হওয়ার পর পেটে অবশিষ্ট কিছু যখন থাকলো না তখন ক্লান্তি আর দুর্বলতায় বিছানায় ঢলে পড়লো সে। গায়ে তরতরিয়ে ঘাম ছুটলো। অচৈতন্য বরণ করে নিল তারপরেই।
যখন চেতন ফিরলো তখন দেখলো তালহা বেগম আর মুনা চিন্তিত বদনে বসে আছে। তাকে চোখ মেলতে দেখে মুনা মাথার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
এই কি হয়েছে তোর? কত চিন্তায় ফেলে দিয়েছিস। তোর বর তো ফোনই তুলতে পারছে না।
উনাকে কিছু বলো না আপা। ফুচকা খেয়েছি ওজন্য বকবে।
বলিনি।
তালহা বেগম নীরার মাথায় হাত বুলিয়ে তারপর মুনার দিকে তাকালেন। বললেন
বৌমা যেটা জিজ্ঞেস করতে বলছি ওটা করো। আমি চুলার কাছে যাই।
তালহা বেগম চলে যেতেই মুনা মৃদু হেসে ফিসফিস করে জানতে চাইলো
এই নীরু কোনো সুসংবাদ কি শুনবো?
নীরা আগামাথা না বুঝে বলল
কিসের সুসংবাদ।
মুনা নাকফুলিয়ে বলল
গা*ধী তোর পিরিয়ড কি নর্মাল?
নীরা ঠোঁট উল্টালো।
এবনরমাল। সবসময় এমন হয়। আমার তো একমাস হয় তারপরের দুইমাস হয় না। মা মাঝেমাঝে বলতো তোর বাচ্চাকাচ্চা হবে না। আপা সত্যি কি বাচ্চাকাচ্চা হবে না? আমার তো অনেক বাচ্চার শখ। অন্নেকক।
ধুরর পাগল। এসময়ও তোর মজা করা লাগে?
আরেহ মজা করব কেন?
মুনা শাড়ির আঁচলের নীচ থেকে একটা জিনিস বের করলো। নীরার হাতে দিয়ে বলল
আমার তো ওই সৌভাগ্য কখনো হয়নি। ধর এটা একবার টেস্ট করে দেখিস তো। যদিও কাল তোকে তোর বরের সাথে ডাক্তারের কাছে পাঠাবো আমি।
নীরা কীটটা দেখে লজ্জার গুমরে মরে বলল
এটাহ?
চুপ থাক। নে এখন। আমাকে কিন্তু জানাবি। আমি গেলাম। আর এত লজ্জা পাওয়ার কি আছে? বড় বোনের কাছে কেউ কিছু লুকোয়? মা এসে এসব বললে ভালো হতো?
নীরা ঘাড় নাড়ালো।
তাহলে আমার কথা শোন।
মুনা যেতেই নীরা দুরুদুরু বুকে কীটটা হাতে চেপে ধরে বসে থাকলো।
মুনার আদেশ অনুসারে কাজটা সম্পাদন করার পর দুরুদুরু বুকে কীটটার দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল নীরা। যেন ওই ত্রিরাঙা জিনিসটি তাকে জাগতিক সব আনন্দ এনে দিয়েছে এক মুহূর্তেই। কথায আছে না অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। নীরার অবস্থাও ঠিক তেমনি। কয়েকফোঁটা তপ্ত জল তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নিজের অজান্তে। তারপরের সময়গুলো যেন এগুতে চাইলো না। এডভোকেট সাহেব কখন যে আসবে!
কারো সামনে যেতে ইচ্ছে হলো না নীরার। লজ্জায়, খুশি, আনন্দ সুখে ভাসা ভাসা মুখটা যে কেউ দেখলেই চট করে বুঝে ফেলতে পারে। কিন্তু তারপরও মুনার মুখোমুখি হতে হলো। মুনাকে কিচ্ছু বললো সে। মুনা যখন জানতে চাইলো তখন সে বললো, কাল আবার টেস্ট করব আপা। মুনা হতাশ হয়ে চলে গেল।
নীরা বলেনি কারণ সুসংবাদটা সে আগে তার মানুষকে দিতে চায়। রিপ কেমন প্রতিক্রিয়া তা ভেবেই নীরা লজ্জায় রাঙা হতে লাগলো। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতে তাকাতে কখন যে বিছানায় ঢলে পড়লো নিজেরই খেয়াল ছিল না। যখন ঘুমঘোর কাটলো তখন রিপ চলে এসেছে। সে চোখ মেলার সাথে সাথেই রিপও তার দিকে তাকালো। অফিসের পোশাক নেই গায়ে। মেরুন সাদা একটা টিশার্ট। নীরার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
পরীক্ষা কেমন হলো?
নীরা বুকের উপর বালিশ টেনে নিয়ে বলল
খুব ভালো।
সত্যি?
হুমম।
আচ্ছা আমি কোনো চাকরিবাকরি করব না?
সেটা তোমার ইচ্ছে।
আমি চাকরি করতে চাইলে করতে দেবেন?
কেন দেব না? তুমি তোমার মা বাবার একটামাত্র মেয়ে। তাদের ভরণপোষণ নেয়া তোমার দায়িত্ব।
নীরা ওর দিকে চেয়েই রইলো। রিপ টেবিলের উপরে রাখা তার ব্যাগ থেকে যাবতীয় ফাইল আর সরঞ্জামপাতি বের করে গুছিয়ে রাখছিল। নীরা গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ লাগিয়ে রেখে বলল
আমি আপনাকে এজন্যই ভালোবাসি।
মানুষ কারণেই ভালোবাসে।
অপ্রিয় সত্য।
এভাবে ধরে রাখলে আমার কাজ হবে?
এতরাতে ফিরে আবারও কাজ।
কই কাজ না। এসব গুছিয়েই শুয়ে পড়বো। তুমি উঠলে কেন?
নীরা ওরপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। টেবিলে কোমর ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রিপের মুখের দিকে তাকালো। সারাদিনের ক্লান্তি চোখেমুখে স্পষ্ট। রিপ একবার চোখ তুলে তার দিকে তাকালো। পুনরায় কাজে মন দিয়ে বলল,
কি দেখছ?
আর কাকেই বা দেখব? আপনাকেই দেখছি।
রোজই তো দেখছ।
রোজই নতুন কিছু দেখি।
আজ নতুন কি দেখছ?
আজ দেখছি একজন নবাগত বাবাকে।
রিপ সাদা পেপারগুলো ফাইলের ভেতর রাখতে রাখতে থমকে গিয়ে চোখ ফেরালো। ওই চোখদুটোতে নীরা স্থির হয়ে তাকাতে পারলো না। হাত পা অসার হয়ে এসেছে। রিপ সবগুলো ফাইল নিয়ে আলমিরার কাছে গিয়ে রাখতে রাখতে বলল
মাঝেমধ্যে তুমি কি বলে ফেলো তুমি নিজেও জানো না।
নীরা ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। রিপ কাজ শেষে তার কাছে এগিয়ে এল। কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল
এখন শরীর কেমন?
ভালো না।
রিপ এটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
সত্যি খুব খারাপ লাগছে তোমার? আরেকটু আগে ফিরলে তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারতাম ।
নীরা ওর দু-হাত নিয়ে এসে ওর গালের দু'পাশে চেপে ধরলো। কম্পিতগলায় বলল
কেমন কেমন লাগছে। ওটাকে খারাপ বলে না।
কেমন লাগছে?
নীরা আমতাআমতা করলো। ওর ঠোঁট কাঁপছে। শরীর কাঁপছে। রিপ ওকে জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা বুকে আলতো চেপে ধরে তাতে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল
আজ রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে দাও। কাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
নীরা ওর বুকের সাথে লেপ্টে রইলো। অনেকটা চেপে গিয়ে বলল,
আপনি শুয়ে পড়ুন। আজ অনেক দখল গেল।
তুমি যাও। আমি দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে আসি।
নীরা বিছানায় গিয়ে পিঠে বালিশ ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসলো। মাঝখানে কোলবালিশ। রিপ ডিমলাইট জ্বালাতেই মাঝখানে কোলবালিশ দেখে কপাল ভাঁজ করলো। কম্বল টেনে গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল
এটাকেও কম্বল জড়িয়ে দেব?
নীরা মৃদু হাসলো।
দিন।
রিপ নীরার গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিল। তারপর ভারমুখে বলল
আমি কোনো দোষের কিছু করেছি?
নীরা দু'পাশে মাথা নাড়ালো।
তাহলে কোলবালিশ রেখেছ কেন?
নীরা হাসলো। রিপ উত্তর না পেয়ে গাঢ় অভিমানে বলল
ঠিক আছে। পিঠের নীচ থেকে বালিশ নামাও। শুয়ে পড়ো।
নীরা শুয়ে পড়লো। কোলবালিশকে জড়িয়ে ধরে রিপের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল
এইইই এডভোকেট সাহেব রাগ করেছেন?
নাহ।
আপনি খুব হিংসুটে বাবা।
রিপ চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে নীরার দিকে তাকালো।
নীরা মৃদু হাসলো। রিপ কোলবালিশটা সরিয়ে ওর কাছে এল। কাছে টেনে এনে বলল
ঘুম পাচ্ছে খুব। তোমার রহস্যময় কথাগুলো মাথায় ঢুকছে না। আপাতত ঘুমাই। হ্যা?
নীরা হাসলো। বলল
আজ কত তারিখ যেন?
সাত।
সাত। হুমম এই সাত তারিখটা আমার জীবনে খুব আনন্দের দিন।
এত আনন্দ কিসের?
আজকেই তো জানলাম ও আসছে।
রিপ এবার ঘুমজড়ানো গলায় বলল
কে আসছে? কার কথা বলছো?
নীরা মিটিমিটি হাসলো। বলল
হাতটা যেখানে রেখেছেন ওখানেই রাখুন আর ভাবুন। অনুভব করুন।
রিপ নিজের হাতের অবস্থান খেয়াল করে নীরার দিকে তাকিয়ে রইলো নির্বাক। তার কৌতূহলী চোখদুটো ধীরেধীরে অতি বিস্ময়কর দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হলো। নীরা ফিক করে হেসে উঠে তার হাতটা রিপের হাতের উপর চাপ দিয়ে বলল
এবার বুঝেছেন?
রিপ ওর উপর ঝুঁকে এল। খুবই নিকটে। নিঃশ্বাস আঁছড়ে পড়ছে নীরার মুখে। ওকে বাকহীন চেয়ে থাকতে দেখে নীরা ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
এবার থেকে দেরী করে আসুন কিংবা তাড়াতাড়ি। আমার আর ভয় নেই। আমার একজন জুনিয়র এডভোকেট আছে। সে একসময় মাঝখানে থাকবে কোলবালিশের মতো জায়গাজুড়ে। তখনও রাগ করবেন?
এটা সত্যি? এটা কিন্তু মজা করার বিষয় নয় নীরা।
নীরা আবারও হাসলো। জড়িয়ে ধরে গালটা রিপের গালের সাথে চেপে ধরে বলল
আপনার আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন এটা। আমি মিথ্যে বলব?
কি এক অপূর্ব সুখোবেদনায় চকচক করে উঠলো রিপের চোখজোড়া। নীরার শরীরটা দু'হাতে আগলে ধরে নিজের সাথে চেপে ধরে অনুভব করলো এমন সুখী নিজেকে কখনো মনে হয়নি এর আগে। নিজেকে এতটা আনন্দ হতে দেখেনি কখনো। দু দুটো পৃথিবী এখন তার আছে। তাকে ঘিরে বাঁচে।
নীরা ওর বুকের হৃৎস্পন্দন অনুভব করলো চুপটি করে। আর মনে হলো আজ তাদের দুজনের মতো সুখী আর কেউ নেই।
চলমান......
🙈🙈