#শেষ_বসন্ত
#পর্ব_৩
#লেখিকা_দিশা_মনি
সুজা নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে নিলো। এই বিষাক্ত পরিবেশ তার একদম সহ্য হচ্ছিল না৷ সুজা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
"নাহ, এসব নিয়ে আমি আর ভাববো না। আমাকে স্বাভাবিক হতে হবে।"
সুজা ভাবলো আজ সে ভার্সিটি যাবে। তাহলে হয়তো একটু শান্তি পাবে মনে। এই বাড়ি থেকে দূরে গেলে হয়তো একটু ভুলে থাকতে পারবে এসব ঘটনা। তাই সে আয়নার সামনে বসে ভালো ভাবে তৈরি হতে লাগল৷ আয়নায় দাঁড়িয়ে ওড়না ঠিক করতে করতে সে ভাবলো,
"হয়তো ভার্সিটি গিয়ে ক্লাস করলে আর বন্ধুদের সাথে সময় কাটালে একটু মাইন্ড রিফ্রেশ করতে পারব।"
অত:পর সে বইখাতা গুছিয়ে নিয়ে বের হয়। বাড়ির বাইরে আসতেই সুজার বুক কেপে ওঠে। বাইরে সাব্বির শেখের গাড়ি দাড় করানো। সুজার বুক কেপে ওঠে। আগে প্রতিদিন সাব্বির শেখ শত ব্যস্ততার মাঝে সুজাকে গাড়িতে করে ভার্সিটির গেটে নামিয়ে দিয়ে তারপর কাজে যেত। সুজার মনে পড়ে কিভাবে ছোট থেকে তার বাবা রাজকন্যার মতো তার যত্ন। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি কোথাও তাকে একা ছাড়েনি। অথচ আজ..আজ তো তিনি অন্য কাউকে নিয়ে ব্যস্ত। তার কি সময় আছে সুজাকে ভার্সিটি নিয়ে যাবার৷ এই কথাটা মাথায় আসতেই সে নিজেই বলে উঠল,
"ঐ লোকটার থেকে এমন কিছু আশাও কিভাবে করছি আমি!"
সুজার ভাবনার মাঝেই সাব্বির শেখ ও অনন্তা হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। দুজনে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে ছিল। তাদের দিকে নজর যেতেই সুজার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে৷ অনেক কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে সে।
অনন্তা সাব্বির শেখকে বলছিল,
"আমার খুব ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, আপনি কারো পরোয়া না করে নিজের গাড়িতে করে আমায় ভার্সিটি পৌঁছে দেবেন।"
"নিজের আপন মানুষদের কিভাবে যত্ন নিতে হয় সেটা সাব্বির শেখ খুব ভালো ভাবেই জানে।"
অনন্তা মৃদু হাসে। সুজা তাদের দেখে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে নেয় এমন সময় অনন্তা বলে ওঠে,
"এই সুজা দাঁড়া! তুইও তো ভার্সিটি যাচ্ছিস তাই না? চল আমরা একসাথে যাই।"
সুজা বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে মুখটা না ঘুরিয়েই বলে,
"যার তার সাথে আমি গাড়ির সিট শেয়ার করি না। ধনী লোক পটিয়ে বিয়ে করেই তোর লেভেল এতটা উন্নত হয়নি যে তোর সাথে আমি এক গাড়িতে যাব। তোর সাথে এক গাড়িতে গিয়ে আমি নিজের লেভেল নামাতে চাই নি।"
অনন্তা বলে,
"এভাবে কেন বলছিস সুজা..আমি তো.."
তার দুচোখ গড়িয়ে সামান্য জল পড়ে। সাব্বির শেখ রাগী স্বরে বলেন,
"সুজা! এত অহংকারী হয়ে গেছ তুমি!"
সুজা এবার কিছুটা থেমে গিয়ে বলে,
"যদি অহংকারী হতাম তাহলে নিজের থেকে নিচু লেভেলের এই অনন্তার সাথে কোনদিন বন্ধুত্ব করতাম না, নাতো ওকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসতাম আর নাতো আজ তোমাদের এই রঙ্গনীলা দেখতে হতো।"
বলেই সে নিজের মতো করে চলে যায় আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করেই। সাব্বির শেখ বলেন,
"সুজা সব লিমিট ক্রস করে ফেলছে।"
অনন্তা চোখের জল মুছে বলে,
"বাদ দিন এখন, ওকে সময় দিন। আমরা যাই চলুন।"
সাব্বির শেখ অনন্তা কপালে চুমু খেয়ে বলেন,
"তুমি একদম মন খারাপ করো না। চলো আজ প্রথমে তোমায় কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাব তারপর ভার্সিটি পৌঁছে দেব।"
★★
সুজা ভার্সিটিতে এসে তার দুজন বান্ধবী ফারহানা ও জান্নাতের সাথে বসে গল্প করছিল। কথায় কথায় ফারহানা সুজাকে জিজ্ঞেস করে,
"আজ তুই একা যে? সবসময় তো অনন্তাকে দেখতাম তোর সাথে৷ আজ ও কোথায়? "
সুজার মুখে আধার নেমে আসে অনন্তার নাম শুনে। জান্নাতও ফারহানার কথায় তাল মিলিয়ে বলে,
"হ্যাঁ, তাই তো। অনন্তা কোথায় আজকে?"
সুজা কিছু বলতে যাবে এমন সময় হঠাৎ করে সাব্বির শেখের গাড়ি এসে থামে একটু দূরে। ফারহানা সেটা খেয়াল করে বলে,
"এই সুজা..এটা তোর আব্বুর গাড়ি না। তোর আব্বু এসেছে।"
জান্নাত বলে,
"কিন্তু প্রতিদিন তো সুজাকে আঙ্কেল এসে পৌঁছে দেন। তাহলে আজ কি হলো?"
সুজা বুঝতে পারে এক্ষুনি সে অনেক অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতিতে পড়তে চলেছে। তাই সে উঠে দাঁড়ায়। এমন সময় গাড়ি থেকে নামে সাব্বির শেখ ও অনন্তা। দুজনকেই বড্ড হাসিখুশি লাগছিল।
সাব্বির শেখ অনন্তার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
"সাবধানে থেকো। ছুটির সময় আমি আবার তোমাকে নিতে আসব।"
"আপনাকে এত কষ্ট করতে হবে না। আমি একা.."
"হুশ,,,নিজের স্ত্রীর জন্য আবার কিসের কষ্ট.."
এদিকে ফারহানা বলে ওঠে,
"এই সুজা..অনন্তা আঙ্কেলের গাড়িতে কি করছে রে!"
সুজা কিছু না বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। জান্নাত তাকে যেতে দেখে ফারহানাকে বলে,
"নিশ্চয়ই এখানে কোন ব্যাপার তো আছেই। জানতে হবে সবটা।"
★★
সুজা ক্লাসে এসে চুপচাপ বসে ছিল। তার পাশের সিটটা একদম ফাকা ছিল। একটু পরেই অনন্তা ক্লাসে আসে। সে এসে একদম ঠিক সুজার পাশের সিটটাতেই বসে। সুজা দ্রুত সিট থেকে উঠে নিজের ব্যাগ তুলে বেশ রাগী স্বরে অনন্তাকে বলে,
"আমার থেকে দূরে থাকি। বিষাক্ত লাগে তোকে নিজের চারপাশে দেখলে!"
অনন্তা কাদো কাদো স্বরে বলে,
"আমার সাথে এমন কেন করছিস সুজা! আমরা তো বন্ধু।"
"তোর যোগ্যতা নেই আমার বন্ধু হবার।"
বলেই সুজা অন্য একটা সিটে এসে বসে। ফারহানা ও জান্নাত এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে দুর থেকে। দুজনেই এগিয়ে আসে। জান্নাত অনন্তাকে বলে,
"কি রে অনন্তা! সুজার সাথে তোর কি কোন বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছে।"
ফারহানা মাঝখানে ফোড়ন কেটে বলে,
"কিন্তু যদি ঝামেলা হতো তাহলে অনন্তা কেন সুজার বাবার গাড়িতে করে আসত।"
জান্নাত বলে,
"হ্যাঁ, তাই তো। এই অনন্তা তুই সুজার বাবার গাড়িতে করে কলেজ এলি কেন। আর আজ হঠাৎ শাড়ি পড়েছিস, এভাবে ঘোমটা দিয়েছিস। তোকে তো একদম নতুন বউয়ের মতো লাগছে।"
অনন্তা কিছুটা লাজুক স্বরে বলে,
"হ্যাঁ.. মানে..আমি.. আমি সুজার বাবাকে বিয়ে করেছি।"
কথাটা শুনেই ফারহানা ও জান্নাত হতবাক হয়ে যায়।
"কি?"
"হুম.."
"কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব?"
"অসম্ভব কিভাবে? দুটো মানুষ যদি একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করে সেখানে অসুবিধার কি আছে।"
"কিন্তু তোদের বয়সের ব্যবধানটা..আর তাছাড়া উনি তো সুজার বাবা.."
"বয়স শুধুই একটা সংখ্যা। আর আমার কাছে উনি একজন মানুষ, যাকে আমি ভালোবেসেছি।"
জান্নাত একটু পেট পাতলা টাইপের। খবরটা শুনেই সে মনে মনে বলে,
"বাহ,,,সকাল সকাল তো দারুণ একটা টপিক পেলাম গসিপ করার। খবরটা সবার সাথে শেয়ার না করলে হচ্ছে না।"
এদিকে ফারহানা অনন্তার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
"কিছু তো লজ্জা কর বোন! নিজের থেকে দ্বিগুণ বয়সী একটা লোক..যে তোর বান্ধবীর বাবা তাকে বিয়ে করেছিস আবার নির্লজ্জের মতো দাঁত কেলাচ্ছিস! এজন্যই সকাল থেকে সুজাকে দেখে অন্যরকম লাগছিল।"
অনন্তা ফারহানায় কথায় বেশি পাত্তা না দিয়ে বললো,
"সত্য স্বীকার করতে আমার কোন লজ্জা নেই। আমি ভালোবেসেই ওনাকে নিজের স্বামী হিসেবে স্বীকার করেছি। তোর এতো জ্বলছে কেন?"
ফারহানা বলে ওঠে,
"বেহায়া মেয়ে কোথাকার!"
বলেই সে সুজার কাছে গিয়ে বসে। সুজার চোখে তখন জল। ফারহানা সুজার কাধে হাত দেয়। সুজা তার দিকে তাকায়। তার চোখ জলে ছলছল করছে। ফারহানা তার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকায়। অত:পর তার কাধে হাতটা শক্ত করে রেখে বুঝিয়ে দেয়,
"আমি তোর পাশে আছি।"
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨