ফন্ট সাইজ:
থিম:
পদ্মপাতা

১২তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#পদ্মপাতা~ 🪷

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ১২

🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

🪷🪷🪷

পদ্ম বেশ মোটা মোটা কিছু দড়ি দিয়ে বসার জন্য গদি বানাচ্ছে। ওদের তো সবকিছুই পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। ওর হাতে এখনো শামসু জোমাদ্দারের পড়িয়ে দেওয়া সেই স্বন্যের বালা টা রয়েছে।

ওর মা ঘরে এসেছে থেকেই এইটা খুলতে বলছে কিন্তু পদ্ম মায়ের কথা শুনতে রাজি নয়। ও আর কোনো ঝামেলা চায়না। যথেষ্ট হয়েছে, ওর জন্য আর কারো কোনো বিপদ ও চায়না।

“পদ্ম তুই আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছিস না?!.. কখন থেকে বলছি এটা খুলে ফেলতে?!.. এটা অলংকার নয় পদ্ম, তোর জন্য এটা শিকলের সমতুল্য। তুই এক্ষুনি এটা খুলে ফেলবি।..”

রেশমি বেগম মেয়েকে বলে চলেছে। কিন্তু পদ্ম উনার কথা কানেই নিচ্ছে না।

“শোন, আমার কথাটা শোন পদ্ম। আমি দরকার হলে জেলে যাবো , কিন্তু তাও তুই এই বিয়েটা করবি না। আমি তোর এমন পরিনতি দেখতে পারবো না পদ্ম। আমার কথাটা শোন মা।..”

এবারো পদ্ম কোনো জবাব দিলো না। ওরা মা এবার হাত টেনে নিয়ে বালা টা খুলে ফেললো।

“কি করছো মা?!.. আবার কেনো বিপদ টেনে আনতে চাইছো?...”

“সেই ভুল টা ঠিক করতে চাইছি। যেটা আমাদের জন্য তোর সাথে হতে যাচ্ছে।..”

“না মা এবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সবকিছু ঠিক করার দায়িত্ব আমার। আমি সবকিছু ঠিক করে দেবো। আমরা একই সুতোয় বাঁধা আছি মা। একজন ব্যাথা পেলে অন্যজন সেটা অনুভব করতে পারি। আর তুমি তো আমার মা!.. আর তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে শামসু জোমাদ্দার কে বিয়ে করে আমি কাঁদবো না। একদম কষ্ট পাবো না, আমি খুশি খুশি থাকবো। যাতে তুমি খুশি থাকো।…”

তারপর পদ্ম নিজের হাত দুটো মায়ের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল…

“এই দেখ মা, এই হাত কতটা নোংরা হয়ে গেছে। এখন থেকে আর এমন হবে না, এই হাতের উপর মেহেন্দির রং লাগবে। এখন আমাদের আর দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য চিন্তা করতে হবে না। আর কোনো অভাব অনটন থাকবে না মা। শামসু জোমাদ্দার আমাদের জমি আমাদের সবকিছু ফিরিয়ে দেবে। আর আমার বাবাকে দেওয়া কথাও রাখা হবে। এরপর আর কি চাই মা ?!.. চলো এবার আমাকে আমার কাজগুলো করতে দাও।..”

এই বলে পদ্ম মাকে ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু বেরিয়ে এসেই শব্দহীন নিশ্চুপ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। মাকে তো কোনো রকম বুঝ দিয়ে এসেছে। কিন্তু নিজেকে?!. নিজেকে কিভাবে মানাবে এই বিয়ের জন্য। এটা ভাবতেই যে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে।

এরমধ্যেই পেছনে থেকে ওর মা এসে দাঁড়ালো। পদ্ম তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ালো।

“পদ্ম!..”

“হ্যাঁ মা আমি ঠিক আছি। তুমি যাও না!. আমাকে আমার কাজ করতে দাও।…”

এই বলে পদ্ম মাকে ঠেলে সরিয়ে সামনের দিকে ঘুরে গেল। ওর মা পদ্মর হাত টেনে নিয়ে আবার নিজের দিকে ফেরায়। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল…

“আমি তোর মা হই পদ্ম। তাই তোর ভেতরে এখন কি চলছে সেটা বোঝানোর জন্য আমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি তোর মুখ দেখেই সবকিছু বুঝতে পারি পদ্ম।..”

“মা তুমি শুধু শুধু এমন উল্টো পাল্টা চিন্তা করছো। আমি তোমার কাছ থেকে কিছু কেন লুকাবো?!..”

ওদের মা মেয়ের কথাবার্তার মধ্যেই পদ্মর দাদী জোহরা ভানু সেখানে আসেন।

“পদ্ম...”

দাদী কে দেখে পদ্ম মাকে ছেড়ে দাঁড়ালো। দাদীর হাতে কিসের যেন একটা প্যাকেট দেখা যাচ্ছে।

“আজ তোর জন্য আমরা এতো বড় একটা খুশির খবর পেলাম। আজ প্রথম বার মনে হচ্ছে তুই সত্যি পদ্ম ফুল। একবারে পদ্ম ফুলের মতোই সুন্দর। তুই একবার হ্যাঁ বলাতে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। এই নাও মিষ্টি খাও…”

এই বলে জোহরা ভানু রেশমী বেগমের দিকে উনার হাতে থাকা প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো। কিন্তু পদ্মর মা রেশমী বেগম মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন। এটা দেখে পদ্মর দাদী পদ্মর দিকে এগিয়ে বলল..

“আচ্ছা আচ্ছা কোনো ব্যাপার না। এই নে তুই মিষ্টি খা।..”

পদ্ম ভেজা চোখে একবার দাদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ওর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া মিষ্টি টা খেতে গেল। পদ্ম কান্না চেপে দাদির হাত থেকে অল্প একটু মিষ্টি মুখে নিল। আর দাদি পুরোটা নিতে বলায় পদ্ম মাথা নাড়িয়ে না করে দিল।

“ঠিক আছে আমি আসে পাশের বাড়িতে মিষ্টি বিলিয়ে আসছি।..”

এই বলে পদ্মর দাদী মিষ্টির প্যাকেট টা নিয়ে ওখান থেকে চলে গেল।

“পদ্ম মা আমার কথাটা শোন। এখনো দেরি হয়ে যায়নি।…”

“মা তুমি যাওনা। আমি কাজ টা শেষ করি।..”

“পদ্ম দয়া করে তুই এমন পাগলামী করিস না। আমার কথাটা শোন মা।..”

“ও মা আমার ভীষণ মাথা ব্যাথা করছে। তুমি বরং আমাকে একটু চা করে দাও।..”

পদ্মর মা মেয়েকে নিজের মত থেকে সরাতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে ওখান থেকে চলে গেল।‌ পদ্ম নিজেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।

— — —

এদিকে সৈয়দ ম্যানশনের মধ্যে আরমান ওর ফুফু আম্মার সাথে কথা বলছে।

“ফুফু আম্মা দেখো, আমি এই পর্যন্ত তোমার সব কথা শুনেছি। কিন্তু এটা মানতে পারছি না। তাতে তুমি যতো যাই বলো না কেন।…”

“রাজি তো তোকে হতেই হবে। আমি যখন বলেছি তোর বিয়ে এর সঙ্গেই হবে, তবে তাই হবে।..”

“কিন্তু ফুফু আম্মা!..”

নায়লা সৈয়দ আরমান কে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন…

“বলবি না শুধু আমার কথা শুনবি। আমি যখন বলেছি তোর বিয়ে এর সাথে হবে তারমানে এইটাই ফাইনাল সিদ্ধান্ত।…”

“এবার নিজের হবু বউয়ের মুখটা দেখে নে।..”

এই বলে নায়লা সৈয়দ ফোনটা আরিনার দিকে বাড়িয়ে দিল। আর তারপর ওর মাথার ঘোমটা টেনে উপরে তুলে দিল। আরমান আরিনা কে দেখে প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তারপর কিছু একটা ভেবেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল।

“আরিনা তুমি এখানে?!.. আর এসব কি হচ্ছে?!...”

“এটা আল্লাহর ইচ্ছে রে আরমান। আরমান তুই আমার শিক্ষায় বড় হয়েছিস। আমি তোকে আদব কায়দা শিখিয়েছি। এই জন্য তোর আর আমার পছন্দ মিলে গিয়েছে।..”

“সেটা তো সময় আসলেই বোঝা যাবে ফুফু আম্মা।..”

আরমান বাঁকা হেঁসে মনে মনে বলে উঠলো।

“আচ্ছা ফুফু আম্মা আমি এখন রাখছি। এখানে পেশেন্ট দেখতে হবে এখন।..”

এই বলে আরমান ফোনটা কেটে দিলো। আর তারপর কিছু একটা ভেবে ক্লিনিকের ভিতরে চলে গেল। সবকিছু ওর পরিকল্পনা মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে, এবার শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।

— — —

পদ্ম ধানের নাড়া গুলো নিয়ে উঠোনে মেলে দিতে লাগলো। আর তখনই সেখানে একটা কালো প্রাইভেট কার এসে দাঁড়ালো। প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে সবগুলো কুটো উড়ে সেই গাড়ির সামনে গিয়ে পড়লো। যার ফলে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল।

আর তারপর গাড়ির দরজা খুলে বের হলো আরমান।‌ এদিকে পদ্ম এগিয়ে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে গাড়ির চাকার নিচে পড়া কুটো গুলো ধরে টানছে। আরমান বেরিয়ে এসে পদ্ম কে গাড়ির চাকার কাছে দেখেই ওকে চিনে ফেলেছে।

“তুমি!.. এই মেয়ে তুমি প্রত্যেক বার আমার গাড়ির কাছে কি করতে আসো। আরে কি করছো তুমি?!.. এগুলো ধরে টানাটানি করছো কেন?!.. আর রাস্তায় এতো গাড়ি যাতায়াত করে, তাদের পেছনে কেন লাগছো না। যখন তখন উড়ে এসে জুড়ে বসার জন্য আমার গাড়িটাই পাও??!..”

পদ্ম আরমানের কথার কোনো উত্তর দিল না। এবার আরমানের বেশ রাগ হতে লাগলো। একে তো মেয়েটা প্রত্যেক বার ওর সাথে, ওর গাড়ির সামনে এসে একটা না একটা ঝামেলা করেই যাচ্ছে। আর তারপর আবার ওর কথার উত্তরও দিচ্ছে না। ও পদ্মর হাতের বাহু ধরে টেনে নিজের দিকে ফেরায়।

“তোমার সাথে কথা বলছি আমি।..”

আরমান দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো। কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে যখন

দেখলো যে পদ্ম কাঁদছে। তখন ও বেশ চমকে উঠলো।

“এই মেয়ে তুমি কি ঠিক আছো?.. কিছু হয়েছে?!.. এভাবে কাঁদছো কেন?!. তোমাকে কেউ কিছু বলেছে?!..”

পদ্ম কিছুক্ষণ আরমানের দিকে কান্না ভেজা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আর তারপর হুট করেই ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। এদিকে ওর হঠাৎ করেই জড়িয়ে ধরাতে আরমান বেশ চমকে উঠলো।

ও গম্ভীর মুখে নিজের বুকের দিকে তাকালো। যেখানে পদ্ম নিজের মুখ লুকিয়ে কান্না করছে‌। আরমান ধীরে ধীরে হাত উঠিয়ে পদ্মর কাঁধে রাখলো। এমনটা কেন করলো ও নিজেও জানে না। সাধারণত ও মেয়েদের কে নিজের থেকে মিনিমাম দুহাত দূরে রাখে। হয়তোবা মেয়েটা এভাবে কাঁদছে দেখে ওর একটুখানি মায়া লেগেছে।

এদিকে হঠাৎ করেই আরমান ওর কাঁধে হাত রাখতেই পদ্মর হুস ফিরল। ও কি করছিল এটা?!.. পদ্ম তড়িঘড়ি করে আরমান কে ছেড়ে দিল। আর তারপর চোখ তুলে ধীর গতিতে আরমানের দিকে তাকালো। আরমান তো আগে থেকেই ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। যার ফলে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। পদ্ম মাথাটা নিচু করে বলল…

“আমাকে ক্ষমা করে দিন ডাক্তার সাহেব।..”

এই বলে পদ্ম উঠে ধানের নাড়া গুলো নিয়ে ওখান থেকে ঘরের দিকে চলে গেল। আর পেছনে আরমান ভ্রু কুঁচকে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

পদ্ম ধানের নাড়া গুলো দিয়ে ওদের পুড়ে যাওয়া ঘরের চাল গুলো ঠিক করছে। ও একটা বাঁশের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে চালের উপর ধানের নাড়া গুলো মেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পদ্ম খেয়াল করলো ওর পাশেই আরও একজন চালে নাড়া গুলো দিয়ে ওকে সাহায্য করছে। পদ্ম ভাবলো মা হয়তো ওকে সাহায্য করতে এসেছে।

“মা তুমি কেন এখানে এ…?!...”

কিন্তু পাশ ফিরে মায়ের জায়গায় আরমান কে দেখে পদ্ম ভুত দেখার মত চমকে উঠলো।

“ডাক্তার সাহেব আপনি?!..”

“আরে আম.. আমি তো তোমাকে সাহায্য করতে এলাম। তুমি একা করতে পারছো না দেখেই তো এলাম।…”

পদ্ম আরমানের এমন কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার ওর দিকে তাকালো। তারপর সিঁড়ি থেকে চালের উপরে উঠে গেল। আরমান ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা তো সোজা চালেই উঠে গেল। ও উঠলে যদি চাল ভেঙে পড়ে যায়?!.. এই চিন্তায় আরমান আর উঠলো না, ও বাঁশের তৈরি করা সিঁড়ি বা চঙ্গাতেই দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর কিছুক্ষণ ভেবে পদ্মর দিকে হাত‌ বাড়িয়ে দিল। যার মানে ও নিজেও চালে উঠতে চাইছে। কিন্তু পড়ে যাওয়ার ভয়ে একা একা উঠতে পারছে না। পদ্ম হাতের নাড়া গুলো রেখে উঠে এলো। তারপর পদ্ম আরমানের সামনে এসে দাঁড়ালো, আরমান ইশারায় ওকেও চালে উঠাতে বললো।

পদ্ম আরমানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে ওকে টেনে তুললো। আরমান তো চালের উপর উঠে একবার পদ্মর দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার নীচে উঠোনে তাকাচ্ছে। পদ্ম কে আবার ইশারায় বললো এখানে থেকে পড়ে যাবে না তো। পদ্ম মাথা নাড়িয়ে বলল পড়বে না। আরমানের এমন ছেলেমানুষি দেখে পদ্মর এবার বেশ হাসি পাচ্ছে।

তারপর দুজনে মিলে ঘরের চাল ঠিক করতে লাগলো। এদিকে পদ্মর মা মেয়ের জন্য চা করে নিয়ে বাহিরে এসে চালের দিকে তাকালো। আর গ্ৰামে আসা শহুরে ডাক্তার কে পদ্মর সাথে চালে দেখে তিনি হা করে তাকিয়ে রইলেন‌।

এদিকে ততক্ষণে ওদের চাল ঠিক করা হয়ে গিয়েছে।‌ আরমান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পদ্মর দিকে তাকালো। তারপর ঘরের চাল ঠিক করতে পেরে পদ্ম ও আরমান দুজনেই হাসি হাসি মুখ করে একে অপরের দিকে তাকালো।‌ আরমান পদ্মর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

কিন্তু পদ্ম কিছুই বুঝতে পারলো না। তারপর আরমান ওকে হ্যান্ডশেক করতে দেখিয়ে দিল। তারপর দুজনে শক্ত করে হ্যান্ডশেক করলো। এদিকে পদ্মর মা নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগুলো দেখছেন।

“আমি এখন আসছি।..”

এই বলে আরমান নিচে নেমে আসলো। আর তারপর দেখলো ওর ফোন বাজছে। আরমান গাড়ি থেকে ফোন টা নিয়ে দেখলো আরিমাকে ভিডিও কল করেছে। ও ফোনটা রিসিভ করে নিজের সামনে ধরলো।

“আরমান, তুমি দুপুরে লাঞ্চ করেছো?!..”

“হ্যাঁ এখন ক্লিনিকের দিকে যাচ্ছি।..”

“ওও আচ্ছা, একজন তোমাকে উইশ করতে চায়। নাও কথা বলো।..”

এই বলে আরিনা ফোনটা কারো দিকে বাড়িয়ে দিল। তিনি হচ্ছেন আরিনার বাড়ির সেই বয়স্ক কেয়ারটেকার করিম চাচা।

“কেমন আছেন করিম কাকা?!.”

“খুব ভালো আছি বাবা। আমি তোমার আর আরিনা মায়ের বিয়ের খবর শুনে খুব খুশি হয়েছি। আমার মনে হচ্ছে যে আমারই মেয়ের বিয়ের কথা হচ্ছে।..”

আরমান করিম কাকার সঙ্গে কথা বলছে। আর তখনই সেখানে পদ্মর মা রেশমী বেগম এসে দাঁড়ালো।

“ভালো আছেন ডাক্তার মশাই?!..”

আরমান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রেশমী বেগমের দিকে তাকালো। আর এদিকে কলে থাকা করিম কাকা রেশমী বেগমের কন্ঠস্বর শুনে ভীষণ চমকে উঠলো।

“আমার মেয়েকে সাহায্য করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এই যে আপনার গাড়ির চাবিটা, রাস্তায় পড়ে গেছিল।..”

এদিকে করিম কাকা যতোই রেশমী বেগমের কন্ঠস্বর শুনছেন, ততোই যেন তার চোখেমুখের এক্সপ্রেশন পাল্টে যাচ্ছে।

“থ্যাংক ইয়ু আন্টি।..”

এই বলে আরমান উনার হাত থেকে চাবির রিং টা নিতে গেল । আর তখনই ওর হাতে থাকা ফোনটা মাটিতে পড়ে গেল।

“আমি তুলে দিচ্ছি, ইস..!..”

এই বলে রেশমী বেগম একটুখানি ঝুঁকে ফোনটা মাটি থেকে তুলতে গেলেন। এদিকে কলে থাকা করিম কাকা তখন ভীষণ চেষ্টা করছেন ভীষণ পরিচিত সেই কন্ঠস্বরের মালিককে একটুখানি দেখার জন্য। কিন্তু তিনি দেখতে পারলেন না, রেশমী বেগম ফোনের ক্যামেরায় হাত দিয়ে তুলেছেন বলে দেখা গেল না। ফোনটা আরমানের হাতে দিলেন।

“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমার মেয়েকে সাহায্য করার জন্য ডাক্তার মশাই।…”

পদ্মর মা রেশমী বেগম আবারও ভীষণ কৃতজ্ঞতা নিয়ে বলে উঠল। তারপর রেশমী বেগম ওখান থেকে চলে গেল। আর আরমান চোখ ঘুরিয়ে ফোনের দিকে তাকালো।

“বাবা আরমান, আমি আবার পরে কথা বলবো। এই নাও কথা বলো।..”

এই বলে করিম কাকা ফোনটা আরিনার দিকে এগিয়ে দিল।

“হ্যাঁ আরমান বলো এখন…”

আরিনা আরমানের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে করিম কাকার দিকে ইরিনা যদি একটু খেয়াল করতো, তাহলেই ও বুঝতে পারতো যে তার মনে কি হচ্ছে। কিছু তো একটা চলছে। কিন্তু আরিনা সেদিকে কোনো খেয়াল না দিয়ে আরমানের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

“আরমান এ মহিলা কে ছিল?!.. যার

কথা শোনা যাচ্ছিল।..”

আরিনা আরমানের কাছে জিজ্ঞেস করল। আরমান তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বলল…

“তেমন কেউ না। এই গ্ৰামের একজন ছিল।..”

“উফ্ আমিও না বারবার ভুলে যাই। এই তুমি কোন গ্ৰামে যেন গেছো?!..”

আরিনা আবারও আরমান কে জিজ্ঞেস করলো। আর করিম কাকা তখন ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো মাত্র।

“আরে তোমাকে বললাম না, আমি কুসুমপুর গ্ৰামে এসেছি।…”

আরমানের এই কথাটা করিম কাকার কানে যেতেই তিনি যেন একটা হোঁচট খেলেন। কুসুমপুর গ্ৰামে?!..”

তিনি তখন অতীতের কিছু দৃশ্য দেখতে পান। যেখানে ক্ষেতের মধ্যে তিনি ন’বছরের একটা মেয়ের সাথে মিলে কাকতাড়ুয়া বানাচ্ছিলেন।

“এই দেখ মা হয়ে গেছে।…”

“বাবা আমার খুব ভয় করছে।…”

“কেন মা ভয় কিসের?!. এটা তো আমাদের ফসল রক্ষা করবার জন্য রে। এতে আবার কিসের ভয় ?!. আচ্ছা একটা কথা বল তোকে সুরক্ষা কে দেয় ?!...”

মেয়েটা হাঁসি মুখে উত্তর দিল।

“বাবা..”

“এইতো একদম ঠিক। যদি আমি তোকে রক্ষা করি। তাহলে এই ক্ষেত টাকে কে রক্ষা করবে?!..”

“ওদের তাহলে রক্ষা করবে এই কাকতাড়ুয়া বাবা।..”

“হ্যাঁ, আমার বুদ্ধিমতী মেয়ে এইতো বুঝতে পেরেছিস।..”

“কিন্তু এটা যদি তোমার মতন আর একটা বাবা হয় । তাহলে তো তোমার মতো দেখতে হওয়া উচিত।..”

এই বলে সেই ছোট্ট মেয়েটি বাবার গলা থেকে গামছা খুলে নিয়ে সেই কাকতাড়ুয়ার গলায় পেঁচিয়ে দিল।

“হুমমম এবার এই নকল বাবা কে আমার বাবার মতন দেখাচ্ছে।..”

“ওরে আমার বুদ্ধিমতী প্রান টা.!..”

এই বলে তিনি মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। করিম কাকা অতীত থেকে বাস্তবে ফিরে আসেন। আর তখন তার চেহারা আপন কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনায় নীল হয়ে ছিল। তিনি দরজা টা ধরে দাঁড়ালেন। যেন এক্ষুনি মাথা ঘুরে নীচে পড়ে যাবেন। আরিনা এটা খেয়াল করলো।

“কাকা কাকা তোমার কি হলো?!.. আরমান আমি তোমাকে পরে ফোন দিবো।..”

এই বলে কলটা কেটে আরিনা তাড়াতাড়ি করিম কাকার দিকে এগিয়ে গেল।

“কাকা তুমি ঠিক আছো তো?.. কি হয়েছে তোমার?!..”

“না না কিছু না। ঐ গ্ৰামটার নাম শুনে মনে হলো আমার পুরোনো ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মনে হলো আমার পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে গেছি।..”

“কাকা..,কাকা আমি তোমার জন্য পানি নিয়ে আসছি। তুমি এখানেই দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি।..”

এই বলে আরিনা পানি আনতে চলে গেল। আর করিম কাকা দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে রইল।

আর এদিকে কুসুমপুর গ্ৰামে পদ্ম সবে মাত্র ক্ষেতের সেই কাকতাড়ুয়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তারপর ভঙ্গুর গলায় বলল….

“আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছে বাবা। তুমি বলেছিলে এই নকল‌ কাকতাড়ুয়া বাবা আমাদের জমির ফসল রক্ষা করবে। কিন্তু না আমি আর এই কাকতাড়ুয়া জমিটাই তো বাঁচাতে পারলাম না। আমি যে হেরে গেলাম বাবা , আমি খুব করে হেরে গেলাম।…”

তারপর পদ্ম নিজের হাতের তালুতে তাকিয়ে থেকে বলল..

“আমি যে আমার এই ভাগ্যের রেখার কাছে হেরে গেছি বাবা। বাবা তুমি যদি আজকে এখানে থাকতে, তাহলে আমাদের সাথে এসব কিছুতেই হতে দিতে না। জানো বাবা আমার একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না, একটুও আফসোস হচ্ছে না যে আমি ঐ শামসু জোমাদ্দার কে বিয়ে করতে সম্মতি দিয়েছি। আমার কাছে আর কোন উপায় ছিল না, মাকে জেলে যাওয়ার থেকে বাঁচাতে আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কিন্তু আজ যদি তুমি আমার কাছে থাকতে বাবা, তুমি আমাকে আর মাকে ওর হাত থেকে ঠিক বাঁচিয়ে নিতে‌।..”

এই বলে পদ্ম ঐ কাকতাড়ুয়া টাকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। এদিকে পদ্মর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে রেশমী বেগম ও কাদের উস্তাদ সবকিছু দেখছেন। রেশমী বেগম মেয়ের এমন কান্না দেখে নিজেও কেঁদে যাচ্ছেন।

তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে কাদেরের দিকে তাকালেন। আর তারপর বললেন…

“কাদের উস্তাদ, আমি চাই তুমি পদ্ম আর শহুরে ডাক্তার মশাইয়ের জোর করে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কর।..”

এদিকে কাদের উস্তাদ হঠাৎ করেই রেশমী বেগমের এমন কথা শুনে বেশ চমকে উঠলো। চাচী তো সেদিনও ওকে নিষেধ করলো। তবে আজ একথা কেনো বলছে?!..

“তুমি তোমার সিদ্ধান্ত পাল্টে নিয়েছো চাচী?!.. তুমিই তো সেদিন আমাকে বললে যে এমন করলে পদ্ম তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।..”

“হ্যাঁ আমি জানি যে পদ্ম এটার জন্য আমাকে কক্ষনো ক্ষমা করবে না। কিন্তু আমি যদি ঐ রাক্ষুসে শামসু জোমাদ্দারের সাথে আমার ফুলের মত পদ্ম কে বিয়ে দিই। তাহলে যে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। আর সেজন্যই আমি ভেবেছি পদ্ম আর ঐ শহুরে ডাক্তারের বিয়ে হবে। দরকার হলে জোর করেই এই বিয়ে হবে।…”

পদ্মর মা রেশমী বেগম চোখমুখ শক্ত করে দূরে কাকতাড়ুয়ার কাছে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কাদের উস্তাদ কে বলে উঠলো।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন