#পারমিতা_২
#পর্ব_৩১
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ(সেহরিশ)
বারকোড ক্যাফে, খুলশি।
ক্যাফেতে বসে আছে মিতা। সকালে আফরিন ফোন করেছিল, দেখা করতে চায় জানায়, তাই বিকেলে দেখা করবে বলে ঠিক করে মিতা। ক্লাস শেষ করে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে অবশেষে বিকেলে বের হয়েছে সে।
মিতা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আফরিনের কয়েক মিনিট আগেই চলে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখনো আসেনি। বাইরের দিকে মনোযোগ দেয় মিতা। রাস্তাটায় প্রচুর জ্যাম। ফুটপাত ধরে অনেকেই সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ফিরে যাচ্ছে, ছুটি হয়েছে অনেকের। সকলের পরনে ড্রেস। ক্ষণিকের জন্য মিতার মনেও আশা জাগে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, পূরণ করবে তার নিজের স্বপ্নগুলো।
“মিতা?” নাম শুনতেই মিতা দরজার দিকে তাকায়। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সিয়াম ও একটা মেয়ে। মেয়েটা সিয়ামেরই বয়সী। মেয়েটাকে কিছু বলতেই সে অন্যদিকে হেঁটে গিয়ে চেয়ারে বসে। সিয়াম সোজা মিতার দিকে এগিয়ে আসল।
“কিরে, তুই এখানে?” হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে মিতা। সিয়াম পাশের চেয়ার টেনে তাতে বসে। মেয়েটা অন্য টেবিলে বসলেও তার দৃষ্টি মিতার দিকে।
“গার্লফ্রেন্ড” ফিসফিসে জবাব দেয় সিয়াম। মিতার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে।
“তুই কার জন্য অপেক্ষা করছিস? বয়ফ্রেন্ড?”
“ধুর। আমার আপুর জন্য। চলে আসবে যে-কোনো মুহূর্তে” হাসতে হাসতে জবাব দেয় মিতা।
“তাই নাকি?” সিয়ামের কথায় মনে হচ্ছে সে মিতাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। দুজনের মুখেই দুষ্টুমির হাসি।
“যা যা, তোর গার্লফ্রেন্ড আবার কষ্ট পাবে” এক প্রকার ধাক্কা মেরে সরানোর চেষ্টা করে মিতা। সিয়াম উঠে যায়। হাসতে হাসতে নিজেদের টেবিলের দিকে এগোয়।
মিতার চোখ আবারও রাস্তার দিকে যায়। রাস্তাটা এখন একটু জ্যামমুক্ত। কফিতে চুমুক দেয় সে, অপেক্ষা করতে থাকে আফরিনের জন্য।
মুখোমুখি বসে আছে আফরিন আর মিতা। আফরিন কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে একটু পরপর, মনে হচ্ছে সে খুব বেশি নার্ভাস। মিতার হাতে একটা ছোট ব্যাগ। আফরিন নিয়ে এসেছে মিতার জন্য। তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ খুলে মিতা, যেন সে কোনো অষ্টাদশী মেয়ে নয়, একজন তিন-চার বছর বয়সী মেয়ে। চোখে-মুখে তার উজ্জ্বলতা, ঠোঁটে বিশাল হাসি। তার বোন তার জন্য গিফট এনেছে, তাতে খুশি না হয়ে কী করবে মিতা?
ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে আসে সুন্দর একটা বেগুনি রঙের টেডিবিয়ার। সাইজে খুব ছোট। অবাক হয় মিতা। যতটা না সুন্দর এই টেডিটা, তার থেকেও বেশি কিউট।
“ওমা, কী সুন্দর!” একা একাই বলে উঠে মিতা। আফরিন হাসে। মেয়েটা অল্পতেই কতটা খুশি হয়ে যায়, তা ভাবে।
“থ্যাংক ইউ আপু, টেডিটা খুব সুন্দর। খুব বেশি” বড় করে শ্বাস ছাড়ে আফরিন। কফির কাপটা টেবিলের উপর রেখে ঢোক গিলে কয়েকবার।
“মিতা..” আফরিনের দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকায় মিতা। গম্ভীরমুখে আফরিন তার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কী হলো, তা বুঝতে পারছে না সে।
“কী হয়েছে আপু?” চিন্তিত শোনাল মিতার কণ্ঠস্বর।
“আমি... আমি কখনো ভ... ভুল করলে তুই কী আমাকে ক্ষমা করতে পারবি?” মিতার কপালের ভাঁজ স্পষ্ট হল। হঠাৎ করে আফরিন এমন কথা কেন বলছে, তা বুঝতে পারছে না মিতা। ভুল তাও আবার আফরিন? আফরিন তো ভুল করার মানুষ নয়।
“কী হয়েছে আপু? তুমি কী কিছু নিয়ে বেশি চিন্তিত?” আফরিন মাথা নাড়াল।
“তাহলে?”
“মিতা, আমি... আমি..” আফরিন কথা শেষ করতে পারছে না। মিতার মুখে যে দুশ্চিন্তা প্রকাশ পাচ্ছে, তা দেখে তার বুকের মধ্যে আসলেই কেমন যেন করছে। সে কেন তখন মিতার কথা ভাবল না? কেন অরিয়নের সাথে বিয়েটা হতে আটকাল না? নাকি মায়া চৌধুরী ঠিকই ভাবছেন? আফরিন স্বার্থপরের মতো কাজ করেছে।
“আপু বলো না, কী হয়েছে? আমার কিন্তু টেনশন লাগছে খুব” আফরিনের হাত ধরে মিতা।
“আমি একজনকে ভালোবাসি, মিতা” এক নিশ্বাসে বলে ফেলে আফরিন। তাকিয়ে থাকে মিতার দিকে। অপেক্ষা করে মিতার হাত সরিয়ে নেওয়ার, অভিযোগ আর দোষারোপের। কিন্তু আফরিনকে অবাক করে মিতার ঠোঁটে হাসি ফুটে।
“ভালোবাসা বুঝি খারাপ? বাসলে সমস্যা কী?”
“তোর বিয়েটার মাত্র এক মাস হলো আর...”
“তাতে কী? ভালোবাসা তো যে-কোনো মুহূর্তেই হয়ে যেতে পারে। ভালোবাসতে সময় লাগে নাকি?” আফরিন বুঝতে পারল, মিতা তার কথা ধরতে পারেনি। মিতা ভেবেছে হয়তো এই এক মাসের মধ্যেই তাদের ভালোবাসা হয়েছে।
“তেমনটা না” মাথা নিচু করে বলে আফরিন।
“তাহলে?”
“আরও আগে থেকেই। অরিয়নের সাথে এনগেজমেন্ট চলাকালীন।”
“কী!” হতবাক হয় মিতা।
“তুমি চিট করে...”
“না না, মিতা তেমন কিছু নয়। তুই বিশ্বাস কর। আমি অরিয়নের সাথে চিট করিনি” মিতাকে কথা শেষ করতে দিল না আফরিন। তৎক্ষণাৎ খামচে ধরে মিতার হাত, অনুরোধের সুরে আওড়াতে থাকে সব।
“অরিয়ন আর আমার মধ্যে তেমন কিছু কখনোই ছিল না” মিতা অবাক হল কথাটা শুনে। কিছু ছিল না?
“অরিয়ন সুদর্শন, মেধাবী, ভদ্র, সফল, ধরতে গেলে আমার ক্রাশও ছিল। তাই তো বাবা যখন বিয়ের কথা বলল, আমি খুশি খুশি হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম” আফরিনের কণ্ঠে অনুশোচনা।
“এনগেজমেন্টের পর সব বদলে গেল, মিতা। ও আমার দিকে কখনো সেভাবে তাকিয়ে দেখেও নি। যেন আমি ওর হবু বউ নয়, যেন আমার কোনো অস্তিত্ব নেই ওর জীবনে। ডিনারগুলোতে আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম, আর ও নিজের মতো খাওয়াদাওয়া শেষ করে চলে যেত। যেন ওকে আমার সাথে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে” আফরিনের মুখটা মলিন। কথাগুলো বলতে তার কষ্ট হচ্ছে, তা মিতা বুঝতে পারল।
“এরপর ক্লাসে ইমরানের সাথে পরিচয় হল আমার। বন্ধুত্ব হল, এরপর ধীরে ধীরে তা ভালো লাগায় পরিণত হল। ইমরান আমাকে সেরকম ফিল করায়, যেমনটা আমি আমার হবু স্বামী থেকে প্রত্যাশা করতাম। আমি বাসায় সব বলতেই চেয়েছিলাম, এর মধ্যেই... এই মধ্যেই...”
“এই মধ্যেই আমি ভেজাল লাগিয়ে দিলাম” মিতার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি।
“না না, তুই কেন ভেজাল লাগাবি? এখানে তোর কোনো দোষ নেই।”
“আচ্ছা বাদ দাও। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন সমস্যা কী?”
“মা... মা ইমরানের সাথে এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। তোকে কষ্ট দিতে চায় না।”
“এই কথা? তুমি একদমও চিন্তা করো না। আমি মার সাথে কথা বলব।” হাসি ফুটে আফরিনের মুখে।
“সত্যি? তুই মাকে রাজি করাবি?” কৌতূহলী আফরিনের গলা।
“হ্যাঁ। আমার কথায় যদি তোমার ভালোবাসা পূর্ণতা পায়, তাহলে আমি কথাটা বলব না? কারো ভালোবাসা যেন অপূর্ণ না থাকে” কথাটা আটকে আসল মিতার গলায়। তার সাথে যা হয়েছে, সে তা আর কারো সাথে হতে দেবে না। ভালোবাসায় বিচ্ছেদ কতটা যন্ত্রণার, তা তার ভালোই জানা আছে। এই যন্ত্রণায় সে তার বোনকে পুড়তে দেবে না।
-------------
চৌধুরী মেনশনের সামনে গাড়ি থামতেই মিতা বেরিয়ে আসে। হাতে ঝুলছে আফরিনের দেওয়া ব্যাগটা। আকাশ অন্ধকার। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। মোবাইলে সময় দেখে মিতা, ৯টা বাজে কারেক্ট। আফরিনের সাথে গল্প করতে করতে কখন মাগরিব পার হয়ে গেছে, তা বুঝতে পারেনি দুজনে। অবশেষে ডিনার শেষ করেই আসে সে।
ড্রয়িংরুমে বসে চা পান করছেন হাবিব চৌধুরী। টিভি চলছে ফুল সাউন্ডে, তাও তার নজর মোবাইলের দিকে। মোবাইলই যখন দেখবে, তাহলে টিভি চালিয়ে রাখার কী প্রয়োজন, তা বুঝতে পারছে না মিতা। পাশেই বসা আনিকা চৌধুরী। হাতে তার আপেল। কেটে কেটে প্লেটে রাখছে।
“খাবার খাবে না?” মিতাকে দেখতেই বলে ওঠেন আনিকা চৌধুরী।
“খেয়ে এসেছি, আন্টি” সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে জবাব দেয় মিতা।
হাঁটতে হাঁটতে রুমের সামনে আসে মিতা। দরজা ধাক্কা দিতেই তা খুলে যায়। অন্ধকার ছেয়ে আছে রুমে।
❝কেউ কী সন্ধ্যার বাতিটাও ধরায়নি?❞ মনে মনে ভাবল সে। অন্ধকারেই হাত দিয়ে সুইচবোর্ড খুঁজতে শুরু করে।
“আ....” লাইটের আলোতে ঘর আলোকিত হতেই চিৎকার দিয়ে ওঠে মিতা। হাতে থাকা ব্যাগটা মেঝেতে পড়ে যায়।
সামনেই বিছানায় বসে আছে অরিয়ন। দুই হাত হাঁটুর উপর, দৃষ্টি নত, পরণের পোশাক এখনো খোলেনি।
“আজব, অন্ধকারে এভাবে বসে থাকার মানে কী?” দরজা বন্ধ করতে করতে আওড়ায় মিতা। মনে হচ্ছে সে হাঁপাচ্ছে। অরিয়ন তার দিকে তাকায়।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অরিয়নের। গম্ভীর তার অবয়ব। এভাবে কেন তার দিকে তাকিয়ে আছে, তা বুঝতে পারছে না মিতা। ভ্রু কুঁচকায় সে।
অরিয়ন উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে আসে মিতার দিকে। হঠাৎ করেই অস্বস্তি লাগছে মিতার। নিজেকে খুব ছোট লাগছে। লোকটার উচ্চতা কত? ৭/৮ ফুট নাকি? এত বড় দেখাচ্ছে কেন আজকে?
মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায় অরিয়ন। মিতা মৃদু হাসার চেষ্টা করল। মনে মনে সে ভয় পাচ্ছে, তা বুঝতে দিতে চায় না। এতটা গম্ভীর কেন লাগছে অরিয়নকে। ব্যবসায় কী লস খেল? নাহ, কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছে না মিতার।
কিছু বুঝার আগেই অরিয়ন ঝুঁকে বসে। মেঝেতে পড়ে থাকা ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পরক্ষণেই বের করে আনে পুতুলটি। দাঁতে দাঁত চাপে অরিয়ন। মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় পুতুলটি।
“আপনি এটাকে এমন কর....”
“ঠাস.......” মিতা কথা শেষ করতে পারেনি। উলটো হাতে কষিয়ে থাপ্পড় মারে অরিয়ন, ছিটকে গিয়ে দরজার সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে মিতা।
চলবে....
গতকাল থেকে কারেন্ট ছিলো না। তাই রাতে পোস্ট করতে পারিনি।
আজকের পর্বে ২০০ কমেন্ট আসলে আজকে রাতেই পেয়ে যাবেন আরেকটা পর্ব।