#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব: ১৯
চোখ-মুখ শক্ত করে বসে রইল হৃদ। পাশেই জাবিদ দাড়িয়ে। বিধ্বস্ত অবস্থা তার। নিজের পরিবার না হলেও এতো দিনের সম্পর্ক ছিল তাদের সাথে; সেই মানুষ গুলোর এমন অবস্থা মেনে নিতে পারছেন না জাবিদ। একটু পরে কিছু ভেবে উঠে দাড়ালো হৃদ।
জাবিদ ব্যস্ত কন্ঠে বললো-"স্যার আপনি কোথাও যাচ্ছেন?"
গম্ভীর ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে হৃদ। ভিতরে তার কি চলছে বোঝা বড় দায়।টি- শার্ট টা র'ক্তে র'ক্তে সয়লাভ। শরীরের ঘাম শুকিয়ে গেছে মাত্র। হাত পা মলিন বর্ণ ধারণ করছে প্রায়। মুখের গম্ভীরতা ভিতরের অবস্থা ছাপিয়ে যাচ্ছে।
কন্ঠে স্বাভাবিকতা রেখে হৃদ বললো-" হিসেব মিটাতে যাচ্ছি জাবিদ। অনেক দিনের ফেলে রাখা কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে।"
-" স্যার। আমিও যাচ্ছি।আপনি একা কেন?"
জাবিদের দিকে ঘুরে তাকালো হৃদ। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে হৃদের। হৃদের চোখের দিকে তাকিয়েই একটু ভয় পেল জাবিদ। ছেলেটা নেহাতই নরম মনের। সাহস যতটুকু পায় সব হৃদের জন্য।
হৃদ জাবিদের কাঁধে হাত দিয়ে বললো-' তোমার এখানে থাকা বেশি জরুরি জাবিদ। ছোট আব্বু একা সব সামলাতে পারবে না। ফুপির অবস্থাও ভালো না। তুমি প্লিজ একটু নীতির দাফনের ব্যবস্থাটা করে ফেল। আব্বুর আসতে দেরি হবে। যদিও জরুরি ফ্লাইটে আসার চেষ্টা করছে। এমন অবস্থায় আমি চলে যাচ্ছি তুমিও যদি চলে যাও। এসব সামলানোর জন্য কেউ থাকবে না তুমিও আমার সাথে গেলে।"
নীতির দাফনের কথা বলতেই অশ্রুতে চোখ ভরে গেল জাবিদের। বাচ্ছা মেয়েটা কালও চৌধুরী বাড়িতে হেসে-খেলে বেরিয়েছে। আজ সে না ফেরার দেশে। অনিয়ম করে মানুষের চলে যাওয়া। হায়! বিধাতা কী নিধারুন খেলা তোমার। সত্যিই বোঝা বড় দায়।
গলা ধরা কন্ঠে জাবিদ বললো-" স্যার। দাফনে ব্যবস্থা আমি করে নিব। নীতি আমারও ছোট বোনের মত ছিল। কিন্তু আপনার আদরের ছোট বোন টার শেষ দাফনেও কী আপনি থামবেন না।"
জাবিদের কথা শেষ হতেই উল্টো দিকে ঘুরে দাড়ালো হৃদ। হয়তো তার চোখেও বর্ষণ ধরা দিয়েছে। আর জাবিদের সামনে তা দেখাতে নারাজ সে।
কন্ঠে কাঠিন ভাব এনে হৃদ বললো-" আমাকে এখন যেতে হবে জাবিদ। তুমি তো জানো আমাদের কাজটা এমনই। নিজের জীবন বাজি রেখে চলতে হয় আমাদের। ভাবনার একটু এদিক সেদিক হলে সব তছনছ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের কাজটা যে কোনো সম্পর্কের বাধা নিষেধ মানে না।"
-" স্যার। তবুও আপনি একা যাবেন না। ফোর্স নিয়ে যান।"
-" রিশাদ চৌধুরী হৃদ একা চলতে জানে জাবিদ। সে একাই সব রেসকিউ করতে পারে। এনিওয়ে তুমি এক কাজ করো রিধির ফোনের লোকেশনটা আমাকে পাঠাও। বাই।"
-" স্যার রিধির ফোন যে এখনো অন আছে আপনি সিউর।"
হৃদ লুকানো হাসি দিয়ে বললো-" কিছু কিছু জিনিস এমনিতে জানা যায় জাবিদ। সেটা আমার অনেক দিনের এক্সপেরিয়েন্স বলতে পারো কিংবা আইকিউ সেন্স।'
-স্যার। এসিপি স্যার আপনাকে খুজলে কি বললো?"
--" বলবে আমি কোথায় গেছি তুমি জানো না।
-" মিথ্যে বলবো
-" কিছু ভালোর জন্য কিছু মিথ্যে বলা উচিত। আমি যেমন কিছু ভালোর জন্য কিছু আপরাধী কে জেলে না পাঠিয়ে উপরে পাঠিয়ে দেই ঠিক তেমন। আর আজও তেমন কিছুই করতে যাচ্ছি। এসিপি স্যার জানলে আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে।"
-কিন্তু স্যার.....?
-" কোন কিন্তু না জাবিদ।সৎ ইন্সপেক্টর রিশাদ চৌধুরীর হৃদকে দেখেছে ওর এতো দিন। কিন্তু আজ তার অন্য রূপ দেখবে ওরা। গুন্ডা ইন্সপেক্টর হলে অপরাধী দের অবস্থা কি হয় জানো তো।
ব্যস্ত পায়ে বড় বড় পদক্ষেপে হৃদ নিজের স্থান ত্যাগ করলো। সত্যিই পরিস্থিতির কাছে মানুষ মাঝে মাঝে অসহায় হয়ে যায়। নিজের ভিতরের আবেগ প্রকাশের সময় মাত্র দেয় না।
_____________
ঝরের গতিতে এগিয়ে চলেছে হৃদের সাদা কারটা। ব্যস্ত রাস্তায় নিজের গাড়িটাকে নিমেষ মাত্র হাফ ছাড়তে দিচ্ছে না হৃদ। গায়ে ব্ল্যাক টি-শার্ট,তার উপর ব্ল্যাক জ্যাকেট। পায়ে ব্ল্যাক ফরমাল শু; ব্ল্যাক প্যান্টের একপাশে রিভালবার গোজা। ফরমাল গেটআপে আছে হৃদ। এ যেন অন্যরকম সাজ। ভয়ানক কোনো পরিস্থিতির পর্ব প্রস্তুতি। কোথায় কোন অস্ত্র লুকানো তা বোঝা বড় মুসকিল। ব্যস্ত হাতে গাড়ি চালাতে চালাতে একসময় কানের ব্লুটুথ এ হাত দিলো হৃদ।
সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে হৃদ বললো-" হ্যাঁ, শিশির। লোকেশন টা আমাকে পাঠাও। আর টাইম টু টাইমের আপডেট দিতে থাকবে। আমি ওন দা ওয়ে।"
-" স্যার। ওরা খুব ডেন্জারাস। আপনি একা যাচ্ছেন। যদি কিছু হয়ে যায়। "
-" জীবনের পরোয়া আমি করি না শিশির। আপাতত রিধিকে বাঁচাতে হবে।"
-" ওকে স্যার। আমি রিধির ফোনের লোকেশন আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।"
প্রায় পয়ত্রিশ মিনিট পর একটা গোডাউনে এসে থামলো হৃদের গাড়ি। চারিদিকে অস্ত্রধারী লোক জন দেখে বোঝাই যাচ্ছে কেউ তার আসার অপেক্ষাই করছিল। সে নিশ্চয়ই জানতো হৃদ আসবে। গাড়ি থেকে নেমেই একটু এগিয়ে গেল হৃদ।দূর থেকে হৃদকে দেখে বাঁকা হাসলো লোকটা। মনে যেন ভয়ানক আনন্দ পাচ্ছে সে।
হৃদ যত সামনের দিকে যাচ্ছে তত স্পষ্ট হচ্ছে লোকটার চেহারা। আর কয়েক পদক্ষেপ ফেললেই লোকটা হাসতে হাসতে বললো-" আমি জানতাম হৃদ। তুই একাই আসবি। তোর সেই আগের মতো জেদ আর সাহস এতকিছুর পরেও আছে দেখে একটু অবাক হলাম বৈকি। যাই হোক জানের পরোয়াও তুই এখনো করিছ না জানি। কিন্তু পরিবারের এমন অবস্থাও তুই এভাবে দাড়িয়ে সত্যিই তোর কলিজা আছে বলতে হবে।'
নিশ্চুপ ভঙ্গীতে দাড়িয়ে আছে হৃদ। লোকটার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো জবাব দিলো না।
লোকটি আবাব বলতে শুরু করলো-" তবে কলিজা থাকলেই তো হয় না। জানের মায়া যদি করিস তাহলে আমার পায়ে ধরে মাফ চেনে নে। আর নিজের বউকে নিয়ে যা। তোকে লাস্ট একটা সুযোগ না হয় দিয়ে দেব আমি। যতোই হোক একটা সময়তো আমরা ফ্রেন্ড ছিলাম তাইনা।"
হালকা পায়ে লোকটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে হৃদ। ধীর, স্থীর সে। লোকটির হাসতে হাসতে বললো-" হেই। কেউ আসিস। সামনের দোকান থেকে কিছু চুরি নিয়ে আয়। আমি নিজ হাতে আজ চুরি পরিয়ে দেব সি আই ডি ইন্সপেক্টর রিশাদ চৌধুরী হৃদকে।"
ব্যঙ্গ করে বললো লোকটি। তার পাশের কিছু লোকও হেসে দিল। তাদের মাঝে একজন বললো-""বস। আমি তো রিশাদ চৌধুরী হৃদ কে গবীর জলের মাছ ভাবতাম। এতো তো দেখছি নিতান্তই চুনো পুটি। এক ধাক্কায়ই মাফ চাইতে রাজি হয়ে গেল। চুরি গুলো এর হাতে কিন্তু আমি পরাবো এই ইচ্ছে আমার পূরণ করে দিবে প্লিজ।"
লোকাটা চোখ দিয়ে ইশারা করলো যার অর্থাৎ চুরি গুলো তাকে পরাতে দেবে।
হৃদ একটু একটু করে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে বসে পরলো মাটিতে। লোকটি ব্যঙ্গাত্বক হাসিতে মেতে উঠলো। লোকটি যখন হাসিতে মেতে উঠেছে হৃদ লোকটির পা ধরে টেনে ফেলে দিলো। উঠে দাড়ালো হৃদ। পকেট থেকে শিকল জাতীয় কিছু বের করে মারতে লাগলো আশেপাশের লোকগুলোকে। হিংস্র হয়ে আছে হৃদ। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে দিল লোকগুলো কে।
গর্জন ছেড়ে বললো
-" কি বলছিলি? তুই আমার জন্য চুরি কিনে আনবি। আমাকে চুরি পরাবি।"
-" লোকটি তার লিডারের দিকে তাকিয়ে বললো আমি আগেই বলেছিল রিশাদ চৌধুরীকে সহজ ভাবে নেবেন না। কিন্তু আপনি শুনলেন না।"
হৃদ লোকটার হাতে মেরে বললো-" হা'রা'মি। ওর হিসেব তো পরে নিচ্ছি। তো বল চুরি কোথায়? চুরি বের কর বলছি.,বের কর।"
লোকটি কাকুতি-মিনতি করতে করতে বললো-" ভাই। ভাই। মাফ করে দেন। ভুলে বলে ফেলছি। আজ তো চুরির দোকান বন্ধ। আনতে পারি নি। মাফ করে দিন।"
হৃদ বাঁকা হেসে বললো-" আজকের দিনের জন্য মাফ তুলে নিয়েছি। আমার পরিবারের উপর হাত তোলার আগে এসব ভাবা উচিত ছিল। এখন কাকুতি- মিনতি করেও লাভ হবে না। সরি টু সে রিশাদ চৌধুরীকে রাগানোর ফল তো পেতেই হবে।"
কথাটা বলেই উপস্থিত লোকগুলোকে মেরে র'ক্তাক্ত করে ফেললো হৃদ। সকলেই বারবার ছেড়ে দিতে বললছে। সরে গেল হৃদ। হাতের শিকল ফেলে দিলো দূরে। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে এগিয়ে গেল গোডাউনের পিছনের দিকে।
তীক্ষ্ণ কন্ঠে শব্দ করে বললো-" তো মিস্টার আরিয়ান তৌসিফ। সত্যিই বলে সকলে কুত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না। তুই হচ্ছিস সেই নেড়ি কুত্তার লেজের মতো। সোজা হওয়া তো দূর আরও বাঁকা হয়ে গেছিস। ফ্রেন্ড বলে একবার সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু তুই তো তুই। তুই কি করলি প্রতিশোধ নিতে আমার পরিবারের উপর হামলা করলি। আবার সাহস করে আমার একমাত্র বউ তাকেও তুলে আনলি। মানতে হবে ভাই তোর সাহস আছে। কিন্তু এতো সাহস দেখানোর আগে তো তোর ভাবা উচিত ছিল এসবের জন্য হয়তো তোর জীবনটাই থাকবে না।"
কথাটা বলেই পাশ থেকে একটা হকি দিয়ে আরিয়ান কে মারতে লাগলো হৃদ। হাত-পায়ে অজস্র আঘাত করছে হৃদ।
আরিয়ান হৃদকে বাধা দিতে দিতে বললো-" হাহাহা......। এই তো শুরু আমি আর কি কি করি শুধু তুই দ্যাখ। তোর জন্য আমার মান-সম্মান প্রতিপত্তি সব শেষ। সব নষ্ট করে দিয়েছিস তুই। তোর জন্য আমি ফেরারি আসামি। শুধ তোর জন্য একজন সম্মানিত পুলিশ অফিসার থেকে পলাতক আসামির মতো আছি।"
হৃদ ঝাঝালো গলায় বললো-" সম্মানিত পুলিশ অফিসার নয়। বল মুখোশধারী। তোর ভিতরে এক রূপ আর বাইরে আরেক রূপ। ডিপার্টমেন্টের সামনে সৎ পুলিশের নাটক আর বাইরে নারী প্রচার কারীদের সাহায্যকারী।আমি তো তোর আসল মুখোশ খুলেছি মাত্র। তোর তো ভাগ্য ভালো। তুই শুধু আমার বন্ধু ছিলি বলে তোকে জানে মারিনি। না হলে আমার লাইফে আর কাউকে আমি জীবন নিয়ে বাঁচতে দেই নি। কিন্তু তুই কি করলি ভালো হওয়ার বদলে উল্টো আমার পরিবারের উপর হামলা করলি।"
কথাটা বলেই আরিয়ান কে সোজা করে দাড় করালো হৃদ। সোজা হয়ে দাড়াতে পারছে না আরিয়ান। মেরে মেরে প্রায় আধ মরা করে ফেলেছে হৃদ তাকে। গাল বরাবর থাপ্পড় মেরে হৃদ আবার বললো-"আসলে কী বলতো। শত্রুর শেষ রাখতে নেই। আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে তোকে আমি ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছি আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু ভুল তো মানুষ বারবার করে না। সেই ভুল এখন শুধরে নেব। "
কথাটা বলেই হৃদ কোমর থেকে একটা রিভালবার বের করে আরিয়ানের মাথায় পয়েন্ট করে বললো-" বল রিধি কোথায়? হিংস্র বাঘ দেখেছিস। আমি হলাম সেই হিংস্র বাঘ। বাঘ কিভাবে শিকার করে জানিস তো। শান্তভাবে। শিকার টেরও পায় না কখন সে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌছে যায়। কিন্তু তুই তো সেই বাঘের খাচায় ই হাত দিয়েছিস বল রিধি কোথায়?"
এমন সময় পিছন থেকে কেউ বললো-" থেমে যা বলছি। না হলে তোর বউ শেষ।"
হৃদ চমকে পেছনে তাকাতেই.........?
#চলবে