ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

১১তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_১১

ফোনটা এখনো ফারিবা হাতে নিয়ে বসে আছে। স্ক্রিনের আলো অনেক আগেই নিভে গেছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা এখনো থামেনি।

হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। সে বুঝতে পারছে না কেনো একটা নিঃশব্দ ফোনকল তাকে এভাবে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ধীরে ফোনটা টেবিলে রাখল সে। আবার কাজে মন দিতে শুরু করে।ফারিবা চেষ্টা করছে কাজে মন দিতে, কিন্তু বারবার ভুল করছে।

একটা ফাইল দুইবার চেক করার পরও কোথাও না কোথাও ভুল থেকেই যাচ্ছে। বারবার ল্যাপটপে একই টাইপিং করে ফারিবা নিজেও বিরক্ত। পাশে বসে থাকা মেয়েটাও বারবার বিরক্তির চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে, সে ভাবছে যেই মেয়ে রোজ নিখুঁত এবং মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করে, তার আজ হলোটা কি।

শেষমেশ পাশের মেয়েটা বিরক্ত নিয়ে বলেই দিল,

“মিস ফারিবা, আপনি কি ঠিক আছেন? আজকে আপনাকে খুব আনমনা লাগছে, খুব অন্যমনস্ক হয়ে আছেন কেনো।”

ফারিবা ছোট করে সরি বলে আবার কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু সত্যি বলতে তার মন এখন আর কাজের মধ্যে নেই। কিছুতেই আজ নিজের কাজ ঠিক মতো করতে পারছে না। বারবার সেই নিঃশব্দ ফোনকলটার কথা মনে পড়ছে।

এদিকে....

কেবিনের ভেতরে বসে আদিল নিজের ফোনটা ধীরে টেবিলের উপর রেখে দিল। তার চোখে মুখে কোনো ভয় নেই, কোনো তাড়াহুড়োও নেই, বরং অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব।

মানুষ কোনো কাজে জয় লাভ করলে যেমন পৈশাচিক শান্তির অনুভূতি হয় তার এখন এমনটাই অনুভব হচ্ছে।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে থেকে সে আবার কাজে মন দিল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ক্ষীণ হাসিটা আজ অন্য কিছু বলছিল।

অন্যদিকে...

তন্ময় নিজের ডেস্কে বসেও বারবার ফারিবার কথা চিন্তা করছে। আজ মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে তার কাছে। কেমন যেনো ক্লান্ত, আর কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাওয়া। আর এইসব কিছু তন্ময়ের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করছে।

ঠিক তখনই মেহজাবিন এসে তন্ময়ের ডেস্কে একটা ফাইল রাখল।

“এই রিপোর্টটা স্যার আজকের মধ্যেই চেয়েছেন।”

তন্ময় ফাইলটা হাতে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,

“আপনার স্যার কি মানুষকে একটু শান্তিতে নিশ্বাসও নিতে দিবে না?”

মেহজাবিন চোখ ছোট করে তাকাল,

“আপনি আবার শুরু করেছেন?”

“আরে আমি সত্যিই বলছি। মানুষটা সবসময় এত সিরিয়াস কেন, একটা মানুষ সারাদিন এত সিরিয়াস হয়ে কিভাবে থাকতে পারে?”

মেহজাবিন তার চোখের চশমা ঠিক করে হালকা হেসে বলল,

“সব মানুষ তো আর আপনার মতো না।”

তন্ময় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আমার মতো না মানে।”

“এই যে আপনার মতো কাজ বাদ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় না বা আপনার মতো এত কথাও কেও বলে না তন্ময় সাহেব।”

“আর আপনার বস তো কথাই বলে না।”

“তবুও পুরো অফিসের প্রতিটা ব্যক্তি ওনাকে ভয় পায়।”

তন্ময় মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“হুম... তবে ভয় পাওয়ার মতো ভাইব তো আছেই।”

মেহজাবিন এবার কিছু না বলে হাসতে হাসতে চলে গেল। হঠাৎ আদিলের কেবিনের দিকে তাকিতেই হাসি চলে গেল, অনেকটা সময় নিয়ে সেই কেবিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার নিজের কাছেও কেন জানি আজকাল আদিলকে একটু অন্যরকম লাগছে। মেয়েটা আদিল এর জন্য চিন্তিত হয়ে গেল।

হঠাৎ মনে পরলো প্রায় তিন/ সারে তিন বছর আগেও আদিল একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। এরপর তো সব স্বাভাবিক হয়েছিল কিন্তু এখন আবার কি হয়ে গেল তার। মেহজাবিন চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের কাজে ফিরে গেলো।

লাঞ্চ ব্রেকের পর ফারিবার নিজেকে একটু সুস্থ, স্বাভাবিক বলে মনে হলো, এইবার একটু মন দিয়ে নিজের কাজ গুলো করলো। আজকে যথেষ্ট ফাঁকিবাজি হয়ে গেছে, এমন আর হলে চলবে না।

ফারিবা নিজের পেন্ডিং কাজ গুলো করার আগে যেই ফাইলটা তাকে চেক করতে বলা হয়েছিল সেইটাকে আবার চেক করতে থাকে। জ্বর টা একটু কমলেও মাথা ব্যথাটা আগের মতই আছে। সেই জন্য ল্যাপটপের স্ক্রিন টা একটু আবছা দেখছে। কয়েকবার চোখ কোচলে আবার কাজ শুধু করল।

ঠিক তখনই পাশ থেকে তন্ময় একটা চেয়ার টেনে ফারিবার পাশে বসতে বসতে বলল,

“কি ব্যাপার, এত চুপচাপ কেন?”

ফারিবা কপালে হাত দিয়ে বলল,

“কি পেয়েছেন বলুন তো মশাই, আমি তো বরাবরই চুপচাপই থাকি।”

ফারিবার কথা শুনে তন্ময় একটা বোকা হাসি দিল, মেয়েটা তন্ময় এর এমন কান্ড দেখে না হেসে পারে না। লোকটা সবসময় এমন কিছু করে যার ফলে সে হাসতে বাধ্য হয়।

ফারিবা কিছু বলল না নিজের হাসিকে তন্ময় এর থেকে আড়াল করে গেলো। তন্ময় কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর, সে নিজের প্যান্টর পকেট থেকে ছোট একটা চকলেট বের করে ফারিবার দিকে এগিয়ে দিল।

“নিন।”

ফারিবা অবাক হয়ে তাকাল।

“এটা কেন?”

তন্ময় হালকা হেসে বলল,

“আমার আম্মু বলে মন খারাপ থাকলে মিষ্টি কিছু খেতে হয়।”

“কিন্তু আমার তো মন খারাপ না।”

“আচ্ছা না থাক তবুও নিন, যদি খারাপ হয় তাহলে সেটা তখনি ভালো হয়ে যাবে।”

ফারিবার চোখে হালকা বিস্ময় ফুটে উঠল। অনেকদিন পর কেউ এত স্বাভাবিকভাবে তার মন ভালো করার চেষ্টা করল। ফারিবার হঠাৎ কিছু পুরোনো স্মৃতি চোখে ভেসে ওঠে, সে পরোয়া না করে ধীরে চকলেটটা হাতে নিল।

“থ্যাংক ইউ।”

তন্ময় মুচকি হেসে বলল,

“ওয়েলকাম।”

ঠিক তখনই দূর থেকে মেহজাবিন পুরো দৃশ্যটা দেখে ফেলল।

সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো, হঠাৎ করে তার কেমন যেনো অনুভূতি হতে শুরু করে। তবে এই অনুভূতি টা কেমন সেটা তার জানা নেই।

মন খারাপ করে আদিলের কেবিনের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে সেখানে চলে গেল। কেবিনে ঢুকতেই আদিল ল্যাপটপে চোখ রেখেই বলল,

“কিছু বলবি?”

মেহজাবিন ঠোঁট চেপে বলল,

“হ্যা বলবো।”

“তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো বসে বল?”

মেহজাবিন এবার একটু বিরক্তির সুরে বলে,

“কি গো আদিল ভাই না মানে স্যার, আজকে আপনার একটা মিটিং আছে আউটডোরে আপনি কি ভুলে গেছেন। ”

আদিল মেহজাবিন এর কথায় নিজের কাজ বন্ধ করে মেয়েটার দিকে তাকায় কিছু বলার জন্য কিন্তু বলল না, এরপর নিজের ফোন থেকে কিছু একটা দেখে কপালে হাত দিয়ে বসে রইলো,

“ধ্যাত কি করে ভুলে গেলাম আজকে ইন্টারন্যাশনাল কিছু ক্লাইন্ড আসবে, কি ইম্পোর্টেন্ট একটা দিন আর আমি এইভাবে ভুলে গেলাম। ”

কিছুক্ষন থেমে আবার মেহজাবিন এর দিকে তাকিয়ে বলে,

“মেহু তুই না থাকলে যে আমার কি হত।”

“কি আর হতো ঘোড়ার ডিম হতো।”

আদিল সিরিয়াস মোমেন্টে এমন কথা শুনে আরো রেগে যায়, এমনিতেও মানুষটা হাসে কম রাগে বেশি।

আদিল কিছু বলার আগেই মেহজাবিন বলল,

“আমি জানি আপনি কি বলবেন, আজকের মিটিং এর ফাইল একদম রেডি আমি আর মিসেস. শান্তা অনেকবার করে রিচেক দিয়েছি। এমন কি আমার প্রেজেন্টেশন ও রেডি, আর মোস্ট ইম্পর্টেন্ট রেস্টুরেন্ট এর রিজার্ভেশন আমি কালকেই দিয়ে রেখেছি, এখন আপনার কাজ হল আফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠা, এরপর গড়িতে বসে ফাইল চেক করা তারপর রেস্টুরেন্টে গিয়ে মিটিং অ্যাটেন্ড করা, আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়া আই থিংক উই বেটার আন্ডারস্ট্যান্ড।”

এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলল মেহজাবিন, আদিল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন এরপর মুখে হাসি ফুটিয়ে হাত তালি দিয়ে মেয়েটার প্রশংসা করলো।

বের হওয়ার আগে এইচ-আর কে ফোনে সব বলে দেয় কি করতে হবে। আর সে যেহেতু এখন আউটডোর মিটিং এ যাচ্ছে, তাই মিটিং শেষে আর অফিসে আসবে না, উনি যেন সব দিক টা নজরে রাখে।

আর মিসেস. শান্তা কে জানিয়ে দিতে বলে যেন ফারিবার দিকে একটু খেয়াল রাখে, যদি মেয়েটার শরীর বেশি খারাপ হয় তাহলে কাজের চাপ না দিয়ে বাড়ি চলে যেতে। সব বলার পর ফোন রেখে যখন মেহজাবিন এর দিকে তাকায় তখন দেখতে পায় মেয়েটা কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে।

“কিরে কিছু বলবি।”

“না কিছু বলবো না তবে একটা জিনিস ভাবছিলাম।”

“কি ভাবছিস। ”

“ভাবছি আপনি ফারিবা আপুকে নিয়ে একটু বেশি ভাবেন, মানে একটু বেশি খেয়াল রাখছেন।”

আদিল মেয়েটার কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড নীরবে বসে থাকে, এরপর সে ধীরে চোখ তুলে তাকায় মেয়েটার দিকে। তার দৃষ্টি আগের মতোই শান্ত।

“তোর হঠাৎ এমনটা কেন মনে হলো?”

মেহজাবিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কারণ আমি আপনাকে অনেক বছর ধরে চিনি। আপনি কখনো কারও ছোটখাটো বিষয় গুলো এভাবে খেয়াল করেন না, হ্যা তবে আমাকে ছাড়া।”

“তোর বুঝি হিংসে হচ্ছে।”

“আহা আদিল ভাই ধুর না মানে স্যার হিংসে হবে কোনো, আমার আপনার জন্য চিন্তা হয় তাই বললাম।”

আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“সব মানুষ একরকম না, মেহু। তুই বুদ্ধিমতী মেয়ে আই থিংক তোকে সব ভেঙে বুঝতে হবে না।”

এই উত্তর শুনেও মেহজাবিনের মন পুরোপুরি শান্ত হলো না মনের মধ্যে একটা চিন্তা রয়েই গেল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে শেখ আদিল আয়মান কখনো কোনো কিছু কারণ ছাড়া করে না।

তবে তার ভয় অন্য জায়গায় যদি আদিল ফারিবাকে সত্যিই পছন্দ করতে শুরু করে থাকে, আর ওইদিকে তন্ময় যেভাবে ফারিবার পিছে থাকে এইটা যদি জানে, যদি তন্ময় এর কিছু হয় তখন কি হবে।

না এইসব আর সে ভাবতে পারছে না, আদিল এর দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে সব ফাইল নিয়ে মিটিং এর উদ্দেশ্য বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পথে তারা দুজনই ফারিবার দিকে একবার তাকিয়ে বের হয়।

এদিকে ফারিবা তখনও নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছে। আজ যতো যাই হয়ে যাক কাজ মনে হয় ফারিবার হাতে আসবে না। তন্ময় ফারিবাকে অন্যমনস্ক দেখে, এইচ-আর এর থেকে অনুমতি নিয়ে ফারিবার পাশের ডেস্কে বসে। যেনো মেয়েটা কে স্বাভাবিক করতে পারে

তন্ময় পাশেই বসে টুকটাক কথা বলে যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝেই ফারিবার দিকে তাকাচ্ছে।

“আচ্ছা একটা কথা বলবো যদি কিছু মনে না করেন?”

ফারিবা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বলল,

“বলুন।”

“আপনাকে হাসলে কিন্তু বেশ ভালো লাগে।”

হঠাৎ এমন কথা শুনে ফারিবার আঙুল থেমে গেল কীবোর্ডের উপর।

সে ধীরে তন্ময়ের দিকে তাকাল।

তন্ময় এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল,

“মানে সারাদিন এত গম্ভীর থাকেন তো, তাই বললাম।”

ফারিবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার কাজে মন দিল।

তবে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠেছিল কিন্তু আড়ালে সেই হাসি কারো নজরে পরলো না। কিন্তু তন্ময় এর কাছে মনে হল ফারিয়া আসতে আসতে স্বাভাবিক হচ্ছে।

অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও মেয়েটাকে স্বাভাবিক লাগছে।

ঠিক তখনই পাশের ডেস্ক থেকে একজন কলিগ এসে বলল,

“তন্ময় ভাই, এই রিপোর্টটার একটা ফাইল খুঁজে পাচ্ছি না, একটু দেখবেন?”

“কি বলো, দাড়াও আসছি।”

তন্ময় উঠে যাওয়ার আগে আবার ফারিবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“বেশি প্রেসার নিবেন না কিন্তু।”

ফারিবা ছোট করে মাথা নাড়ল।

অন্যদিকে.....

অফিস বিল্ডিংয়ের নিচে এসে গাড়ির সামনে দাঁড়ালো আদিল। ড্রাইভার দরজা খুলে দিতেই সে ভেতরে গিয়ে বসল।

মেহজাবিনও পাশের সিটে বসে ফাইলগুলো আবার চেক করতে শুরু করল।

কিন্তু আদিলের মন যেন অন্য কোথাও। সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ অফিস বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি স্থির, বারবার মনে হচ্ছে দরকারি কিছু রেখে এসেছে। মেহজাবিন বিষয়টা লক্ষ্য করে ধীরে বলল,

“স্যার?”

আদিল চোখ না সরিয়েই বলল,

“হুম?”

“আপনি কি কিছু নিয়ে টেনশনে আছেন?”

আদিল এবার ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

“আমি টেনশন করি না মেহু।”

“তাহলে?”

আদিল ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

“কিছু জিনিস শুধু নজরে রাখছি।”

মেহজাবিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে এই মানুষটা যখন এভাবে কথা বলে, তখন তার মাথার ভেতর অনেক কিছু চলে।

এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোতে শুরু করেছে। অফিসের ব্যস্ততাও আগের তুলনায় একটু কমে এসেছে। অনেকে কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাচ্ছে।

ফারিবা শেষবারের মতো একটা ফাইল সেভ করে ক্লান্তভাবে চেয়ারটায় হেলান দিল।

মাথাটা আবারও ভারী লাগছে।

ঠিক তখনই এইচ-আর খবর পাঠায়,

“মিস ফারিবা, স্যার বলে গেছেন আপনাকে আজ অফিস আওয়ারের পরই চলে যেতে, ওভার টাইম আজ করতে হবে না এমনিও আপনি অসুস্থ আর স্যার ও মিটিং এর জন্য বাহিরে, আজ আর আসবে না। তাই আপনি বাসায় যান গিয়ে রেস্ট করুন।”

ফারিবা অবাক হয়ে গেল।

কারণ আদিল এত ব্যস্ততার মাঝেও তার কথা মনে রেখেছে। তার ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হল।

পাশ থেকে তন্ময় বলল,

“দেখলেন? আমি একা না, আপনার বসও বলছে বাসায় যেতে।”

ফারিবা এবার হালকা হেসে ফেলল।

“আপনারা সবাই আজ আমার পেছনেই লেগেছেন মনে হচ্ছে।”

তন্ময় মুচকি হেসে বলল,

“কারণ আপনি নিজেকে নিয়ে একদম ভাবেন না।”

কথাটা শুনে ফারিবা কিছুটা থেমে গেল। হয়তো সত্যিই সে নিজেকে নিয়ে ভাবা ভুলে গেছে অনেক আগেই। এরপর ফারিবা সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয়ে দেখে তন্ময় আজও তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ফারিবা লিফটের সামনে আসতেই সে লিফলেট বাটন চাপ দেয়।

লিফটে ওঠার পর ফারিবা কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আজকে আপনার কাজের কোনো চাপ নেই তাই আজকে আপানার কোনো কথা শুনব না, আজ আমি আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবো।”

ফারিবা না করতে যাবে তখন সে আবার বলে ওঠে,

“আজ আর না করলেও শুনছি না, এমনিতে আজ আপনি অসুস্থ তাই আমার দায়িত্ব আপনাকে পৌঁছে দেয়া।”

ফারিবা আর কিছু বলল না, সে ভালো করেই জানে বলে কোনো লাভ হবে না তাই রাজি হয়ে গেলো। লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে থামতেই তন্ময় ফারিবাকে বাহিরে অপেক্ষা করতে বলে গ্যারেজ এর দিকে চলে যায়। কিছুক্ষন পর তন্ময় একটা বাইকের উপর বসে ফারিবার সামনে এসে দাঁড়ায়।

ফারিবা বাইক দেখে অবাক হয়ে যায় আর ওর চোখের সামনে ভেসে আসে কিছু স্মৃতি।

....Flash back....

ফারিবা অনেকক্ষন হলো দাঁড়িয়ে আছে, বারবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। এত গরম আর তীব্র রোগের কারনে মেয়ে টা ঘেমে একাকার তার মধ্যে এই অপেক্ষা জিনিস টা যেনো খুবই বিক্তিকর। বেশকিছুক্ষন একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর তার সামনে বাইক নিয়ে সুদর্শন একজন পুরুষ এসে দাঁড়ায়, এরপর চোখের থেকে সানগ্লাস খুলে নিজের শার্টের মাঝে ঝুলিয়ে রেখে বলে,

“কি কন্যা কোথাও যাবে নাকি, লিফট চাই।”

ফারিবা লোকটার সামনে এসে পিঠে গুনে গুনে কয়টা কি*ল-ঘু*সি দিয়ে বলে,

“সবসময় মজা কিন্তু ভালো লাগে না ফারদিন।”

ছেলেটা জোরে জোরে হেসে ফাবিরার থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“তুমি জানো না কন্যা তোমার সাথে মজা না করলে আমার চলে না।”

ফারিবা মুচকি হাসে, ফারদিন এর সাথে সে রাগ করে থাকতেই পারে না। হঠাৎ ফারদিন এর নজর ফারিবার লম্বা ঘন কেশের দিকে যায় সে একটু রাগি সুরে বলে,

“কি গো কন্যা তোমায় কতবার বলতে হবে আমার সবচাইতে পছন্দের জিনিস কে এইভাবে অবহেলা করবে না, চুল বাঁধো কন্যা চুল বাঁধো। না হয় হাওয়াতে সব নষ্ট হবে এরপর আর কথা বলবো না কিন্তু।”

ফারিবা ফারদিন এর কথায় আবারো হেসে দেয়, মেয়েটার এমন হাসি দেখে সেও সব ভুলে হেসে দেয়।

....Flash Back End....

ফারিবাকে অন্যমনস্ক দেখে তন্ময় বারবার তার নাম ধরে ডাকতে থাকে, ফারিবার হঠাৎ হুশ ফিরতেই আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করতে থাকে, এরপর পেছনে ফিরে নিজের চোখের অবাদ্ধ নোনা জল মুছে নেয়। সামনে ফিরে তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“বাইকে করে যেতে হবে।”

তন্ময় কিছুক্ষন বাইকের দিকে তাকিয়ে ভাবে হয়তো মেয়েটার অস্তিত্ব লাগছে একটা ছেলের সাথে এইভাবে যেতে। এরপর সে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,

“আপনার যদি বাইকে বসে অভ্যাস না থাকে তাহলে আমরা রিক্সা অথবা গাড়ি বুক করে নিয়ে যেতে পারি।”

ফারিবা পরিবেশ টাকে স্বাভাবিক করার জন্য বলে,

“ওহ আচ্ছা তাহলে আপনার বাইকটার কি হবে।”

“অফিস গ্যারেজে পরে থাক কাল এসে নিয়ে নেব।”

“আমার জন্য আপনাকে এতো কষ্ট করতে হবে না, আমি একাই চলে যেতে পারবো।”

তন্ময় মন খারাপ করে বলে,

“প্লিজ ফারিবা আমি রিকোয়েস্ট করছি, আমার নিজের কাছে খারাপ লাগবে আপনাকে পৌঁছে না দিতে পারলে।”

ফারিবা কি বলবে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না, অনেক ভেবে ছেলেটার মন রাখতে সে বাইকে করে যেতেই রাজি হয়ে যায়। তন্ময় খুশি হয় ফারিবাকে জিজ্ঞেস করে বসতে পারবে কি না মেয়েটা সম্মতি জানায়।

ফারিবা বসতেই তন্ময় বাইক স্টার্ট দেয়। তার আজ অনেক ভালো লাগছে অবশেষে সে তার অপ্সরী কে নিয়ে এই রাতে চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের নিয়োন আলোতে রাস্তা পারি দিচ্ছে। আজ আকাশ দেখে মনে হচ্ছে জোছনা নেমেছে, তার খুব আনন্দ হচ্ছে। তার হৃদস্পন্দন বারবার বেরে যাচ্ছে। মনের ভেতর অনেক আজানা সুর ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সে বাইক চালানের পাশাপাশি ফারিবার সাথে অনেক কথা বলতে থাকে। ফারিবা তাকে রাস্তার দিকে মন দিতে বলে। এইভাবে পথ পারি দিতে দিতেই ফারিবার বাড়ির সামনে পৌঁছে যায়। ফারিবা থামাতে বললেই তন্ময় বাইক টা পাশে রাখে। বাইক থেকে নেমে ফারিবা তন্ময় কে ধন্যাবাদ আর বিদায় দিয়ে চলে যেতে নেয়।

তখন তন্ময় ফারিবাকে পিছু ডেকে বলে,

“ভেতরে আসতে বলবেন না, এক কাপ চা অন্তত অফার করতেই পারেন।”

ফারিবা কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,

“আমার বাড়ির লোক হয়তো ভালো চোখে নিবে না বিষয় টা, তবে আপনাকে অনেক ধন্যাবাদ আমার কথা চিন্তা করে আমাকে পৌঁছে দাওয়ার জন্য। একদিন অবশ্যই আপনাকে ভেতরে নিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াব।”

ফারিবার এমন স্বাভাবিক কথা তন্ময় এর কাছে কখনো স্বাভাবিক মনে হয় না, সে কথা ঘুরিয়ে বলে,

“আরে আমি তো মজা করে বলছিলাম, আপনি বললেও আমি যেতে পারতাম না কারন বাড়িতে আম্মু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আচ্ছা তাহলে ভালো থাকবেন নিজের যত্ন নিবেন কাল আবার দেখা হব।”

ফারিবা মাথা নাড়ায় আর কিছু বলে না এরপর তন্ময় কে বিদায় দিয়ে নিজে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। ফারিবা ঘরে ডুকে মা-এর সাথে দেখা করে এরপর ফ্রেশ হতে চলে যায়। এরপর বাবার কাছে গিয়ে কিছুক্ষন বসে, আবার মা-এর সাথে কাজে সাহায্য করে পুরো দিন অফিসে কি হল বলে। কিন্তু মা ফারিবার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে মেয়েটা ঠিক নেই, তাই জোর করে কিছু খাইয়ে মেডিসিন দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকতে বলে।

ফারিবাও বাধ্য হয়ে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পরে কিন্তু ঘুম তার চোখ কে ভুলেও স্পর্শ করে না।

এদিকে...

আদিল মিটিং শেষ করে বাড়ি ফিরেছে অনেকক্ষন, আজ তার মনটা খুব ভালো, সে যেই প্রজেক্টের আশায় ছিল এতগুলো দিন সে প্রজেক্ট আজ সাকসেসফুলি হেন্ডওভার হয়েছে তাদের কম্পানিতে। শান্তিতে নিজের দু’চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিল। কিন্তু সময় মনে হয় খুব নিষ্ঠুর তাকে শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না।

হঠাৎ করেই আদিলের ফোনটা বেজে ওঠে, সে বিরক্তি ভাব নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর ফোনের দিকে তাকিয়ে নাম্বার টা দেখে মুচকি হেসে ফোনটা রিসিভ করে বলে,

“ফারিবা ঠিকমতো পৌঁছে গেছে।”

ওপাশ থেকে কাঁপা কন্ঠে বলল,

“স্যার উনাকে আজ তন্ময় সাহেবে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে তাও বাইকে করে।”

আদিল রাগে গর্জে উঠে নিজের হাতের ফোনটা সজোরে ছুরে মারে ফলে ফোন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। নিজে রাগে ফেটে পরে বারবার চিৎকার করে ওঠে, নিজের চুল ধরে নিজেই টানতে থাকে। রাগে চোখ দুটো রক্তিম বর্ন ধারন করে,

“কোনো ফারিবা কোনো, কোনো তোমাকে সবার থেকে দূরে রাখার পরও তুমি সবার সাথে মিশে যাও। আমি কতদিন ধরে আটকিয়ে আসছি আর আজ ওই তন্ময় সুযোগ খুজে বের করল।”

আদিল রাগে কয়েক দফা নিজের হাত দেয়ালের সাথে ঘুসি দিতে থাকে কিন্তু তার রাগ দমন হয় না। রাগ দমানের জন্য একটার পর একটা নিকোটিনের ধোয়া টানতে থাকে তারপরেও কোনো কাজ হয় না।

এরপর সে তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চাবি বের করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সেই তালাবদ্ধ ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

তারপর ধীরে তালা খুলে অন্ধকার ঘরটার ভেতরে ঢুকে যায়।

মুহূর্তের মধ্যেই তার অবয়ব মিশে গেল ঘন অন্ধকারে...

চলবে....

[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্প টা কেমন লাগলো সুন্দর মতামত দিবেন আশাকরি, একটা সুন্দর মতামত আমার লিখার অগ্রহ বৃদ্ধি ধরে। তাই আপনাদের মতামত আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, ধন্যাবাদ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন