ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমায় দিও একটু খানি ছুয়ে

৩৭তম পর্ব

লেখক: মিমি মুসকান

#আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺

#পর্ব_৩৭
#মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
প্রবাহ সময়ের মতো হৃদয়ের টুকরো টুকরো অনুভূতি গুলো জুড়ে একত্রিত হয়ে উঠল। তুহিন ভাই তখন বলিষ্ঠ যুবক। তার হৃদয়ের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়া একটিমাত্র মেয়ে তখনো অন্তু। অন্তিকা কবীর! যে মেয়ে তার শূন্য হৃদয়ে শূন্যতা পূরণ করিয়ে দেয়। ভালোবাসায় রাঙিয়ে দেয় তার প্রতিটা ধূসর স্বপ্ন। তুহিন শুরু থেকেই মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে যাচ্ছে অন্তুকে। 
অন্যদিকে অন্তু, যার কৈশোর পেরোয়নি এখনি। কিশোরী মনের ছোট্ট হৃদয়জুড়ে তখন বসবাস করছে তার স্বপ্নের মানুষ! একমাত্র পুরুষ মানুষ তুহিন ভাই। ফেইক আইডি দিয়ে সময়ের পর সময় তাদের আলাপ চলে। যত বকবক সব অন্তিকা একাই করে। মাঝে মাঝে সে এটাও ভুলে যায়, তুহিন ভাইয়ের কাছে ও অন্তিকা নয়, অবন্তিকা! তবুও তার মনে স্থিরতা নেই। সেদিন কথায় কথায় লিখে ফেলল, “জানেন আজ কি হয়েছে? আজ রাস্তার মোড়ে একটি ছেলে আমায় গোলাপ দিয়েছে!” 
প্রেমিকারা সচরাচর এসব কথাবার্তা প্রেমিককে জানায় ইচ্ছে করে, যাতে তারা ঈর্ষা করে। তুহিন আর অন্তিকার মধ্যে সম্পর্ক ওতো গড়ায়নি। কতোখানি গড়িয়ে গেছে এটাও তার আন্দাজে নেই। তবু কমিটমেন্ট বলে একটা কথা থাকে। সেটা নেই। তুহিন জানে, তাদের সম্পর্কটা কেমন। এখানে তারা কেউ বাধ্য নয়,‌কেউ কথা দেয়নি। অধিকার ফলানোর প্রশ্নই তো আসে না। ফলাফল এই হলো সে আর অন্তুকে এর জবাব দিলো না। অন্তু বসে রইল। বেশ অনেকক্ষণ। এরপর আবারো মেসেজ করল। না ওপাশ বেশ নিশ্চুপ! কিছুদিন চলল এই ছেলেমানুষী খেলা। ছলনা, অভি*মান, অভি*যোগ! কি বলে অ্যাখায়িত করা যায় একে। অন্তুর মাধ্যমিক ঘনিয়ে আসছে। সামনেই টেস্ট পরীক্ষা। অথচ তার মন ঘরে টিকছে না। দুমরে মুচড়ে সে শে*ষ হয়ে যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে। তুহিন ভাই তার মেসেজের জবাব দেয় না। অনলাইনে এক্টিভ আছে তবুও কথা বলে না। কারণ কি? একদিন রা*গে ভয়ে* দুঃখে ফোন দিয়ে বসল। ফোন কি তুলবে? 
তাকে অবাক করে দিয়ে ওপাশ থেকে তুহিন ফোন তুলে নিল। ভ*য়ে অন্তুর সর্বাঙ্গ জমে হিম। সে নিশ্চুপ। কেবল নিঃশ্বাসের শব্দ। জানে, একটা শব্দ করলেই ওপাশ থেকে তুহিন ভাই বুঝে যাবে। কিন্তু সে কি জানে? তার নিঃশ্বাসের শব্দ ও তুহিনের অপরিচিত নয়! 
তুহিন দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলো, “অন্তু, অনেক হয়েছে। এসব বন্ধ কর এবার। সামনে তোর টেস্ট পরীক্ষা। মন দিয়ে পরীক্ষা দে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আবার আমরা কথা বলব।" 
লজ্জায় অন্তু ফোন কেটে মাথা নিচু করে ঠোঁ"ট কামড়ে বসে রইল। ছিঃ ছিঃ! তুহিন ভাই তাকে চিনে গেল। কখন চিনল? কখন টের পেলো? আগে থেকেই বুঝি চিনে গেছিল। সব জানত ওই লোকটা। তবুও কি অভিনয়! নিখুঁত অভিনয় করে গেলো সে। 
অশ্রুসিক্ত নয়নে অন্তু আবারো তার ফোনের মেসেঞ্জার চেক করল। ব্লক দিয়ে দিল। দুঃখে, কষ্টে মনটা একদম পিষে বলল। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কথা বলবে। মাধ্যমিক পরীক্ষার কতো দেরি! ছাই বলবে! বলবে না আর কথা। ফেইক আইডি পুরো নষ্ট করে ফোন মায়ের আলমারিতে তুলে রাখল। ব্যস, আর ফোনই ধরবে না সে। ফোন ধরলেই তুহিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে মন চাইবে। অথচ ওই লোকটা কি নিষ্ঠু*র। কথা বলবে না। কেন বলবে না? বললে কি হবে? চঞ্চল কিশোরী হৃদয় যে এসব বুঝতে নারাজ! 
অন্তু ভেবেছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে আর তুহিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবে না। সামনে পড়া তো দূরের কথা। সেই ঘটনার পর তুহিন ভাই আর গ্রামের বাড়িতে যায়নি। অন্তু কতোবার গেলো তাকে আর পেলো না। সে কি আর আসে? 
তবে শেষ রক্ষা যে হলো না। মাধ্যমিক পরিক্ষার তখন সবে কয়েকটা দিল। এর মধ্যে বাড়িতে তুমুল ঝ*গড়া হলো মা বাবার মধ্যে। তারা ঝগড়া করার পর দুজনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বাবা ভেবেছিল,‌‌ মা বোধহয় কোনো বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে উঠবে। এরপর ফিরে আসবে। কিন্তু তিনি মনে মনে প্রতীজ্ঞা করলেন তিনি আর বাড়ি ফিরবেন না। চেয়েছিলেন মেয়ের পরিক্ষার সময় যথাসম্ভব একটু শান্তিতে থাকার। কোনো ঝামে”লা চাননি। মেয়েটার পরীক্ষা। ঘরে অ”শান্তি থাকলে মেয়েটার পরীক্ষা কি ভালো হবে? এখন অপরাধ”বোধে ভুগছেন তিনি। ভাবলেন বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবে। মেয়ের পরীক্ষার পরই আসবে একেবারে। যেই ভাবা সেই কাজ। সামনে চট্রগ্রামের এক বাস পেয়ে উঠে বসলেন সেখানে। 
অন্যদিকে শামীমা মির্জা তার বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে নয়, সোজা চলে গেলেন মায়ের বাড়ি। তার স্বামী তাকে বলেছে, তিনি নাকি বাড়িতে থাকলে মেয়েটা ভালো করে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এজন্য বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে এসেছে। মেয়ে আর বাপ মিলে শান্তিতে থাকুক এবার। 
শামীমা মির্জার এক বদভ্যাস ছিলো, সেটা হলো স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর পরই ভাইদের ফোন করে সেটা বলা। এটা তার বলতেই হতো। মেয়ের মাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষার সময় মা কি-না গ্রামে চলে এসেছে! এই কথা শোনার পর পরই জামাল মির্জার মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ তুহিনকে নিয়ে রওনা দিলেন খুলনায়। 
দুপুরের দিকে ঝগড়া করে মা বাবা ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলো। অন্তু ভেবেছিল রাত হতে হতে তারা ফিরে আসবে। কিন্তু কেউ ফিরে এলো না। রাত্রির তখন ৯ টা বাজে। অন্তুর ভীষণ ভ*য় করছে। তার কাছে ফোন নেই। বাসায় একটা ল্যান্ডলাইন আছে। সেটা এখন তুলে জানতে পারল ওটা নষ্ট হয়ে গেছে। সন্ধ্যা অবধি বাড়ির ছাদেই বসে ছিল। রাত হতেই ছাদ থেকে ফিরে ঘরে এসেছে। বাড়ির সবগুলো আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলো সে। দোতলা বাড়ি পুরোটাই জ্বলজ্বল করছে। আজ দাড়োয়ান কাকাও আসেনি। কি বিপ*ত্তি। সে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। খিদে পেট চু চু করছে। ফুলির ও আজই ছুটি নিতে হতো। 
খিদে যখন চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলো ঠিক তখনি দেখল একটা সাদা রঙের গাড়ি বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। ভয় রেখে অন্তু ছুটে বেরিয়ে এলো। বাড়ির সদর দরজা বন্ধ। তাই জামাল সাহেব বাইরেই গাড়ি দাঁড় করালেন। তুহিন ও বেরুলো গাড়ি ছেড়ে। হুট করে শব্দ হতেই তারা দুজন ফিরে তাকাল সামনের দিকে। অন্তু ছুটে এসে হাঁপাতে লাগল। মামাকে এক নজর দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরল সে। নিঃশব্দে কেঁদে উঠল সে। মামা তার ভয়ে*র কারণ বুঝতে পারলেন। সান্ত্বনা দিয়ে হেসে উঠলেন। বললেন, আরে বোকা মেয়ে! কান্না করে না। আমি আছি না, কান্নার কি আছে?” 
অন্তু নাক টেনে বলল, "মা বাবা কেউ বাড়ি ফিরেনি মামা। আমার খুব ভ*য় লাগছিল।”
"এজন্যই তো মামা এসেছি। এসে পড়বে, তারা এসে পড়ব। আসো আমরা ভেতরে যাই।” 
অন্তু মামাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মামার সঙ্গে যে আরো একজন ছিলো এটা তার মাথাতেই ছিলো না। তাই আচমকা তুহিন ভাইকে দেখে সে ঘাবড়ে উঠল। তুহিন ভাই অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে। অন্তুকে আজ অনেকগুলো বছর পর দেখছে সে। বড় হয়ে গেছে। একটু লম্বা হয়েছে, তার ডাগর ডাগর চোখগুলো আরো স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনের আলোয় এর চেয়ে বেশি আর কিছুই দেখতে পেলো না সে। 
মামা ঘরে গেছেন ফ্রেশ হতে। তুহিন ভাই ততোক্ষণে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে এসেছে। এই বাড়িতে তারা তিনটি প্রাণি বাদে আর কেউ নেই। এদের তো খিদে মেটানো দরকার। তুহিন ভাত চড়িয়ে দিল। তখনি সেখানে গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির হলো অন্তিকা। তার এক ঝাঁক কোঁকড়া চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। পরনে লাল রঙের গোল জামা আর গলায় উড়না জড়ানো। দৃষ্টি মেঝের দিকে। কাঁচুমাচু মুখে বলল, “তুহিন ভাই সরে আসুন। আমি করছি।" 
তুহিন ভাই টিটকিরি কেটে বলল, “পারলে তো আগেই করতি। যা এখান থেকে, এখন এসে ঢং করা লাগবে না। 
অন্তুর মুখখানা রক্তিম হয়ে উঠল। সে এক পায়ের সঙ্গে আরেক পা ঘসতে লাগল। মনে মনে ঠিক করে নিল, এবার পরীক্ষা শেষ হলে বন্ধের মধ্যে সে সব রান্না শিখে ফেলবে। তখন রান্না করে খাওয়াবে তুহিন ভাইকে। 
অন্তু চলে যায়নি দেখে তুহিন জিজ্ঞেস করল, "তোর পরের পরীক্ষা কি?” 
"ইংরেজি ২য় পত্র।”
"কবে পরীক্ষা?” 
"শনিবার!” 
"ওহ, তিনদিন পর। আজ পরীক্ষা ছিল।” 
অন্তু মাথা নাড়ল। তুহিন জিজ্ঞেস করল, কেমন হয়েছে? 
"ভালো।”
"শুধুই কি ভালো। খুব ভালো হয়নি।”
"হয়েছে।”
"সিট কোথায় পড়েছে? খুব দূরে?”
"না এক ঘণ্টা লাগে যেতে। সামনেই একটা বয়েস স্কুলে পড়েছে।” 
"ওহ। যা এখন গিয়ে পড়তে বস। কোনো সমস্যা থাকলে জিজ্ঞেস করবি। তোর টিচার আসেনা পড়াতে?" 
“কাল আসবে!" 
“আচ্ছা। যা তুই এখন পড়তে যা। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আমায় বিরক্ত করিস না।" 
অন্তু চোখ মুখ কুঁচকে নিল। এতোক্ষণ যখন কথা বলছিলো তার ভীষণ ভালো লাগছিলো। চোখে মুখে আলাদা লাবণ্য এসে পড়েছিলো যেন। এখন সবই চলে গেল। সে কি এখানে বি*রক্ত করতে এসেছে। হুহ! বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। ডাইনিং টেবিলে এসে বসল বই খাতা নিয়ে। মামা ফ্রেশ হয়ে এসে বসলেন তার পাশে। অন্তু আগের পরীক্ষার প্রশ্নগুলো একে একে দেখাচ্ছে মামাকে। মামা খুশি মনে জিজ্ঞেস করছেন, সব দিয়েছো তো মামা।" 
অন্তু মাথা নেড়ে বলল, জি মামা।” 
"যাক। এ প্লাস আসবে তো।”
অন্তু মুখ টিপে হাসল। মামা হেসে বললেন, "যাক না আসলেও সমস্যা নেই। পাশ করলেই হলো। এবার প্রশ্ন অনেক কঠিন হয়েছে।” 
অন্তু আবারো হেসে উঠল। তুহিন রান্নাঘর থেকে বলে উঠলো, "মোটেও না। এবারের প্রশ্ন সহজ হয়েছে। এবার পরীক্ষা দিয়ে কেউ যদি এ প্লাস না পায় তাহলে তার পড়াশোনা করারই দরকার নেই।” 
কথাটা শুনে অন্তু মুখটা কালো করে ফেলল। মনে মনে আওড়ালো, তুহিন ভাই খুব খারা*প! 
#চলবে…..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন