#মন_আড়ালে
#পর্ব_১৭
#তানজিলা_আনিম
(প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য)
আবছা ঘুমে ডুবে থেকেই মেহু বোধ করলো তাকে জাপটে ধরে আছে কেউ।গলার ভাঁজে মুখচোখ ডুবিয়ে রেখে নাক ঘষছে ।ঘুম কাটিয়ে চোখ খুলতে চেয়েও পারলোনা মেহু।সেই জোরালো বাঁধন থেকে ছুটতে ঘুমন্ত, নিস্তেজ হাত দুটো দিয়ে মানব দেহটা ঠেলে দিয়ে আলতো গুঙিয়ে উঠল ।তবে সড়াতে পারলোনা এক ইঞ্চিও।ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় চোখমুখ কুঁচকে গেছে মেহুর।কাব্য গলার ভাঁজ থেকে মুখ তুলে তাকালো। ভাঁজ পড়া কপালে আঙুল রাখতেই শিথিল হলো সেটা।মেহু এবার নড়েচড়ে বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে কাব্যের দিকে ঘেষে শুলো।গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল মুহুর্তেই।কাব্য হাসলো মেহুর হাবভাবে।গভীর ঘুমে মত্ত মুখটা দেখে নিয়ে থুতনির তিলটায় ঠোঁট ছুইয়ে রেখে বললো,"যত পারিস ঘুমিয়ে নে ।আমার ঘুম হারাম করার জন্য একটা কঠিন শাস্তি তুলে রাখা হলো তোর জন্য ।"
______________
ভোর পাঁচটায় এখানে এসেছে পৌঁছেচে কাব্যরা।দুএক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে কাব্য বেরিয়ে গেছে আসাদের সাথে ক্যাটারিং এর ব্যাবস্থা করতে।
দিব্য নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।শিহাব কয়েকবার ডেকেও সাড়া না পেয়ে একাই বেরিয়ে এলো।এরমধ্যেই সকলে কাজে লেগে পড়েছে।বিকেলে গায়ে হলুদ,মেহেদী পড়ানোর সময় ঠিক হয়েছে।উঠানের একপাশে স্টেজ বানানো হচ্ছে।
কাছেরই একটা নার্সারি থেকে গাঁদা,গোলাপ ফুল ভর্তি ঝুড়ি সমেত ভ্যান গাড়ি এসে থেমেছে গেইটের বাইরে। বাকিদের সাথে শিহাবও এগিয়ে গেলো।বড় সাইজের একটা ঝুড়ি এনে রাখলো স্টেজের কাছে।একপাশে স্তুপকৃত চেয়ার গুলো খুলে সারি করে রেখে দাঁড়াতেই ট্যিসু দিয়ে ওর কপাল মুছিয়ে দিলো কেউ।চমকে গিয়ে মাথা সড়িয়ে নিলো শিহাব।পাশে ফিরতেই সদ্য ঘুম ভাঙা ফোলা ফোলা চোখে হেসে উঠলো অবনী।বললো," ঘেমে গিয়েছেন!"
আবার হাত বাড়াতেই শিহাব নিয়ে ফেললো টিস্যুটা।মুখ মুছতে মুছতে বললো,"এখানে এসে খুব অবাধ্য হচ্ছো। অথচ বলেছিলে গুডগার্ল হয়ে থাকবে।"
অবনী মাথা নিচু করে গাল কামড়ে ধরে থাকলো।কিছু বললোনা মুখে।
- আমার ফোন ধরোনি কেনো কাল?
এবার হাসি হাসি মুখ তুলে চাইলো অবনী।বললো," ইচ্ছে করে ধরিনি।"
- ইচ্ছে করে ধরোনি?
- হ্যাঁ
জেনেবুঝে ওকে এড়িয়ে গেছে সেটা আবার বড় মুখ করে বলছেও!শিহাব নাকের উপর চশমাটা ঠেলে দিয়ে বললো,"ইচ্ছে হয়নি কেনো?ফোন ধরলে তোমার নাচের ব্যাঘাত ঘটে যেতো?"
- নাচতো তখন শেষ।আমাকে না পেয়ে আপনি কয়টা কল দিতে পারেন ওটাই দেখতে চাইছিলাম।
ভ্রু কুঁচকে এলো শিহাবের," এখানে দেখার কি আছে?"
অবনী হতাশ শ্বাস ফেলে বললো," অনেক কিছু।মাত্র দুটো কল দিয়েই কিভাবে থেমে গেলেন আপনি?মনুষ্যত্ব বোধ বলেও তো কিছু থাকে নাকি?আপনার দেখছি সেটাও নেই।"
রোদে অবনীর মুখটা ঘেমে উঠেছে এরইমধ্যে।কিন্তু সেসবে খেয়াল নেই তার।শিহাবই ওর হাত টেনে ছায়ায় নিয়ে গেলো।বললো," দুটো কল দেয়াই ভদ্রতা।"
অবনী মানলোনা।নাখোশ হয়ে বললো," আপনার মাথা।প্রিয়জনকে ফোনে না পেলে হাজার বার কল করতে হয়।দূরের লোকের মতো ভদ্রতা আপনার কাছ থেকে কে চায়?আমিতো চাইনা।"
এই মেয়ের সাথে কথা বলে যে পারবেনা সেটা শিহাব জানে।তাই স্টেজের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,"তোমাকে ফোন না দেয়াই উচিত ছিলো।ভেতরে যাও।কাজের সময় এসে জ্বালাচ্ছো। "
অবনী গেলোনা।তুমুল উৎসাহ নিয়ে পাশে চলতে চলতে বললো," নাচের সময় কিন্তু আপনি আমার পার্টনার হবেন।আমি আপনার কথা মাথায় রেখে নাচের স্টেপ ঠিক করেছি।"
শিহাব না থেমেই এগিয়ে যাচ্ছিলো।কিন্তু এইবার হঠাৎ করে থেমে অবনীর দিকে ফিরে চোখে চোখ রাখলো।শীতল গলায় বলল," আমি কেনো তুমিও কোনো নাচটাচ করবেনা।না মানে না।আমি যেনো এ নিয়ে আর কিছু বলতে না শুনি, অবনী।"
____________
বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছিলো দিব্য।জানালা দিয়ে আসা রোদের তাপ পিঠে গাঢ় হতেই ঘুমটা পাতলা হয়ে এলো একটু।চোখ বুজা অবস্থায়ই কানে গেলো কেউ একটা সাকিব ভাই সাকিব ভাই বলে ডাকছে।ডাকটা শুনে সাথে সাথে চোখ মেলোলো দিব্য।ঘুম একেবারে কেটে গেছে। কিছুক্ষণ সেভাবে পড়ে থেকেই সটান উঠে বসলো।কোমড় থেকে প্রায় নেমে আসা ট্রাউজারটা টেনে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।সামনে তাকাতেই দেখলো সোফায় বাচ্চা কোলে বসে আছে তাদের থেকে সামান্য বড় দেখতে একটা ছেলে।দিব্য কেশে গলা পরিষ্কার করলো। তারপর আস্তে করে এগিয়ে গেলো ওদিকে।বাচ্চাটাকে লোকটা চামচে করে কিছু খাওয়াচ্ছে।দিব্য সোজা পাশে বসে বললো," আপনি সাকিব ভাই?ওইযে ম্যাজিক দেখান যে?"
হঠাৎ এমন প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে চাইলো ছেলেটা।দিব্যও সরু চোখে পরখ করছে ওর পা থেকে মাথা।বেশ লম্বা, চওড়া,এক কথায় সুদর্শন বলা যায়।দিব্যর এমন অনুসন্ধানী নজরের সামনে শব্দ করে হেসে উঠলো সাকিব।মাথা নেড়ে বললো," বাচ্চাদের সামনে একটু হাত সাফাই দেখিয়ে দেখছি ভালোই ম্যাজিশিয়ানের তকমা পেয়ে গেছি।বাহ!ফিলিং প্রাউড।"
সাকিব হাসলেও দাঁত কটমট করলো দিব্য।মনে মনে বললো,"ওরে চালাকের চালাক।এমন ভাব করছে যেনো কিছু বোঝেই না।বাচ্চাদের সাথে সাথে সুন্দরী রমনীদের মন গলাতেই যে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন সেটা স্বীকার করছেন না কেনো?"
দিব্য আরও অনুসন্ধানী চোখে চেয়ে থাকলো।শক্ত মুখে বললো," আপনি কি করেন?মানে পড়াশোনা করছেন নাকি জব?"
খাওয়া শেষ করিয়ে,বাচ্চাটাকে দেখিয়ে সাকিব বললো," পড়াশোনা শেষ ,জব নেয়া ডান।বিয়ে করে বাচ্চা নেয়াও ডান।ম্যাজিক ম্যানের মতো জীবন যুদ্ধেও আমি সফল।"
হেসে বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে চলে গেলো সাকিব। দিব্য হাঁ হয়ে গেলো।ছেলেটা বিবাহিত!গাধী নীলার বাচ্চা এই বিবাহিত ছেলেকে নিয়েই এতো আহ্লাদ করছিলো?
__________
মেয়েরা মালা গাঁথছে উঠোনে বসে।সেগুলো দিয়ে স্টেজ সাজানো হবে।নীলা নিজে মালা গাঁথছে আর অবনীসহ বাকি মেয়েগুলোকে দেখাচ্ছে কিভাবে করতে হয়।কাজের মাঝেই হঠাৎ নাফিসা ডাক ছুড়লেন রান্না ঘর থেকে,"নীলা,শিহাবকে চা টা দিয়ে আয়।"
অবনী মুখ খুলে বায়না করার আগেই নীলা ছুটে গেলো সেদিকে।চায়ের কাপ হাতে চটপট দরজা দিয়ে ঢুকতে নিতেই ওয়াশ থেকে আসা একটা শক্ত বুকের সাথে সজোরে ধাক্কা খেলো ।পেছনে হেলে পড়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই সামনে যা পেলো খিঁচে আঁকড়ে ধরলো নীলা। সাথে ছিটকে বেরিয়ে এলো চাপা আর্তনাদ।
চোখ বন্ধ হয়ে আছে নীলার।মিনিটের মাথায় ধাতস্থ হয়ে যখন বুঝলো পড়ে যায়নি তখন চোখ খুলতেই মুখের একেবারে সামনে দেখতে পেলো দিব্যকে।।জ্বলন্ত চোখ দুটো ওর দিকের তাক করা।নীলা চোখ খুলতেই দিব্য গর্জে উঠলো ," আছাড় খাওয়ার ইচ্ছা তো অন্য জায়গায় গিয়ে খা।তোর সাকিব ভাইয়ের সামনে গিয়ে খা।সবার সাথে লাফঝাপ করে বেড়ানোর সময় কিছু হয়না। আমার সামনেই খুকি সেজে বসে থাকিস।চা টাও ফেলেছিস একেবারে আমার প্রিয় টি-শার্ট টায়।দূরে যা।ছাড় আমাকে।"
দিব্যর কলারে থাকা হাতটা দ্রুত সড়িয়ে আনলো নীলা।কোমড় থেকে দিব্য হাত সড়াতেই দাঁড়িয়ে মিনমিনিয়ে বললো," নিজেও তো দেখে হাঁটোনি।আর্ধেক দোষ তোমারও।"
দিব্য তেড়ে এসে বললো,"বিড়বিড় করছিস কেনো?সাহিস থাকলে জোরে বল।"
নীলা পিছু হটে মুখ মুচড়ে বললো," কিছু বলিনি।যাকেতাকে নিয়ে কথা বলার সময় নেই আমার।"
- হ্যাঁ এখন তো ওই ম্যাজিশিয়ান,এক বাচ্চার বাপ সবচেয়ে স্পেশাল।বাকি সবাই যাতা।
নীলা চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে চাইলো।পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বললো," ছিহ!নিজের মতো সবাইকে ভাবা বন্ধ করো।সাকিব ভাই আমাকে ছোট বোনের মতো ট্রিট করে।"
নীলাকে এমন ভাবে চলে যেতে দেখে নিজের উপরই রাগ হলো দিব্যের। বেশি কনসার্ন দেখাতে কেনো যে যায় সে!ভেবেছিলো এই গাধির কোনো বিষয়ে ফিরেও দেখবেনা তবুও যে কেনো...!
_____________
রাত করে ঘুমাতে যাওয়ায় অনেকটা দেরি করে ঘুম ভাঙলো মেহুর।পিটপিট করে যখন চোখ খুললো তখনোও মিষ্টি স্বপ্নের রেশ লেগে আছে ওর চোখেমুখে।স্বপ্ন হলেও এমন মনে হচ্ছিলো যে কাব্যভাই তাকে সত্যি চুমু খাচ্ছে!দুহাতে মুখ ঢেকে লাজুক হেসলো মেহু। আড়মোড়া ভেঙে বসতে বসতে হুট করে সজাগ হলো মস্তিষ্ক।ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো সাড়ে দশটা বাজে।তড়িঘড়ি করে গোসল সেড়ে বেরিয়ে এলো কোনোরকম।ভেজা চুল গুলো পিঠে ছড়ানো।হাতে চুলের একটা ক্লো ক্লিপ।নীলাকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো," কাব্য ভাইরা এখোনো আসেনি, নীলাপু?"
দিব্যর জন্য মেজাজ গরম হয়ে আছে নীলার।তাই রুমের দিকে যেতে যেতে তিরিক্ষি মেজাজে বললো," জানিনা।"
মেহু আশাহত হয়ে দেখলো আশপাশটা।বাড়ির ভেতরে কাউকে চোখে পড়লোনা।উঠানে লোকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
মেহু ওদিকে এগোতেই পায়ের নুপুরটা খুলে গেলো হুট করে।মুখে বিরক্তিকর চ শব্দ করে সোজা থেকে কোমড় বাঁকিয়ে নিচু হলো মেহু। লাগাতে চাইলো কয়েকদিন যাবত ঢিলে হয়ে যাওয়া হুকটা।হাতের ক্লিপ টা ব্যাঘাত ঘটানোয় সেটা মুখে কামড়ে ধরলো।তারপর আবার চেষ্টা করলো লাগাতে।উবু হয়ে থাকায় চুল গুলোও সব সামনে চলে এসে চোখের দৃষ্টি ঢেকে দিচ্ছে বারবার।মুখে ক্লিপ নিয়ে,একহাতে নুপুর আর অন্য হাতে চুল সড়িয়ে নাজেহাল মেহুর অবস্থা।
একটু আগেই ফিরেছে কাব্য। গোসল সেড়ে আবার বের হতেই পুরো দরজা দখল করে উপুর হয়ে কিছু একটা করতে দেখলো মেহুকে।নিশ্চুপ কদমে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়ালো ওর। দেখার চেষ্টা করলো কি করছে মেহু।সেকেণ্ড কয়েক মেহুর কার্যকলাপ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো কাব্য।বলে উঠলো,
- যাই করার চেষ্টা করছিস সেটা বসে কর।মুখের ওটা কোথাও রাখ আগে,গবেট।
হঠাৎ কাব্যের গলা শুনে মুখ তুলে পেছনে তাকালো মেহু।আকাঙ্ক্ষিত মুখটা দেখে ভেতরে চেপে রাখা আনন্দ টুকু ছলকে বেরোতে চাইলো।তবে সামলে নিলো সহসা।তারপরেই আবার স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। সাথে সাথে ভারি হয়ে এলো গাল দুটো।
কাব্য সরু চোখে তাকাতেই এলোমেলো পলক ঝাপটে কানে চুল গুজলো মেহু।কাব্য ধমকে বললো," কি হলো?"
মেহু চমকে বেখেয়ালি মনে আচমকা হাত বাড়িয়ে মুখের ক্লিপ্টা কাব্যের শার্টের পকেটে আটকে দিলো।তারপর বসে হুক লাগিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো," নুপুরটা খুলে গিয়েছিলো।"
কাব্য যেতে যেতে বললো,"খুঁজে দেখ, তোর ব্রেন টাও নিশ্চিত খুলে পড়ে আছে কোথাও।"
মেহু সেসব গায়ে না মেখে বলে উঠলো, "বলেছিলেন আসবেন না।তবুও এলেন যে?"
কাব্য জবাব দিলোনা।দ্রুত বেরিয়ে গেলো।মেহু মুখ ভরে হাসলো কাব্যের যাওয়ার পানে তাকিয়ে।গোসল শেষে এলোমেলো, ভেজা চুলে মানুষটাকে কি ভীষণ চার্মিং লাগে দেখতে!
__________
স্টেজ সাজানো হয়ে গিয়েছে। বাকি ফুল দিয়ে হাতের গাজরা বানাচ্ছে মেয়েরা।মেহু সেদিকে গেলোনা।সে আজ গাঁদা ফুল পড়বেনা হাতে।বাড়ির পেছনের দেয়াল ঘেষে একটা বাগানবিলাস ফুলের গাছ দেখেছে কাল।যেটার রঙ ওর জামার সাথে মানাবে।দেখেই ভেবে ফেলেছিলো এই ফুলের গাজরাই হাতে পড়বে।গাছটার বেশ উঁচুতে ফুল গুলো থোকা বেঁধে আছে।মেহু চেষ্টা করেও নাগাল পেলোনা।আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলার মতো কাউকে পেলোওনা।
ওর আকুল হয়ে খোঁজার মাঝেই প্রান্ত এগিয়ে এলো।আগ বাড়িয়ে বললো," হেল্প লাগবে?"
কাল রাতে সাফিয়া আপুর কাজিন, প্রান্ত ভাইয়ের সাথে বেশ সখ্যতা হয়েছিল মেহুর।প্রথমে ঠিকঠাক থাকলেও কিছু সময় পেরোতেই ছেলেটাকে বেশ গায়ে পড়া লাগলো মেহুর।হুটহাট কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছিলো।তখন থেকেই মেহু ওকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।এবারেও তাই দ্রুত না বোধক মাথা নেড়ে বলে উঠলো, " না ভাইয়া।কোনো হেল্প লাগবেনা।থেংক্স।"
বলে একরকম পালিয়ে চলে এলো রান্নাঘরের সামনে।বাড়ির মহিলারা রান্নার যোগাঢ় করছে।ফুল না আনতে পেরে মন খারাপ হলো মেহুর। রাবেয়ার পাশে বসে বললো," খিদে পেয়েছে,বড় মা।"
নাফিসা ওপাশ থেকে রেগে বললেন," সকালের খাবার সবাই সেই কখন খেয়ে নিয়েছে।আর উনি মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন।বেড়াতে এসেও ঘুম যায়না চোখ থেকে?"
মেহু গুম মেরে থেকে বললো," বড় বাবা আসলে আমি বলবও তুমি এখানেও এসে বকছো আমাকে।"
নাফিসা রুষ্ট হয়ে কাজে মন দিলেন।রাবেয়া খাবারের প্লেট ওর হাতে দিয়ে বললেন,"অবনী,নীলা কোথায়?দেখছিনা যে।"
মেহু খেতে খেতে বলল," সাফিয়া আপুর রুমে বোধহয়।অবনী আপুর হাতে মেহেদি পড়িয়ে দেবে।"
___________
বরের বাড়ি থেকে পাঠানো মেহেদীর বক্স দেখে সাফিয়া চিন্তিত হয়ে বললো," এই রে, গত ইদে এই মেহেদিটা পড়ে আমার হাতে ফোসকা পড়েছিলো।চুলকিয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। "
নীলা গায়ে হলুদের শাড়ি, গয়না সাজিয়ে রাখছিলো সাফিয়ার।সেসব রেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো," এখন তবে? কাউকে বলবো অন্যটা নিয়ে আসতে?"
সাফিয়া চিন্তিত গলায় বললো," কি একটা মুসিবত হয়ে গেলো বলতো!"
অবনী বললো," কাকে বলতে হবে বলো।আমি বলে আসছি।সময়তো বেশি নেই। "
সব ছেলে -পুরুষরাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত।ওদের ভাবনার মাঝেই দরজা পেরিয়ে হেলেদুলে যেতে দেখলো দিব্যকে।অমনি সাফিয়া ডাক ছুড়লো," দিব্য একটু শুনে যাও ভাই।"
দিব্য দরজা থেকেই একে একে সবকটা মুখ দেখলো। বললো," বলো।"
সাফিয়া কারণ দর্শিয়ে বললো," তুমি ফ্রি থাকলে একটু গিয়ে নিয়ে আসবে এক ফাঁকে?আব্বাকে জানাতে চাইছিনা।মেহেদীর ব্যাপারটা আব্বা বুঝবেনা।খামোখা মাথা গরম করবে।"
দিব্য অবাক হয়ে বললো," আমি? এসব আমি চিনি নাকি?আমি পারবোনা।"
অবনী বললো," না করোনা দিব্য ভাই।মেহেদী ছাড়া সব পণ্ড হয়ে যাবে।আমি সাথে আসবো ?"
সাফিয়া বললো,"নীলা তুই বরং যা।তোরা আসতে আসতে আমি আর অবনী মিলে ডিজাইন দেখে রাখছি।"
নীলা সাথে সাথে মাথা নেড়ে উঠলো,"আমি কোথাও যাবোনা,সাফিয়াপু।এদিকে আমার অনেক কাজ।"
সাফিয়া অধীর হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে হার মানলো নীলা।।শ্বাস নিয়ে বিরস কদমে দিব্যের সামনে গিয়ে বললো," চলো।"
দিব্য এতোক্ষণ চুপ করে দেখছিলো শুধু।নীলা বলতেই একদম বাধ্য বাচ্চার ন্যায় গিয়ে বাইকে বসলো।নীলা বসলেও হাত গুটিয়ে রাখলো।ধরলো না দিব্যকে।বাইক স্টার্ট দিয়ে দিব্য অপেক্ষা করলো ।কিন্তু তখনও নীলা ধরছেনা দেখে খেঁকিয়ে উঠে বললো," এমন ভাব করছিস আমাকে ধরে বসিস নি কোনোদিন।ধরে বস।"
কথা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই নীলার।তাই হাত পেছনের স্ট্যান্ডে রাখলো।বাইক চালিয়ে দিয়ে দিব্য আওড়ালো," ঢংয়ের বাচ্চা।মন চায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিই।"
______________
খেয়েদেয়ে রুমে এসেই হতবাক হয়ে গেলো মেহু। বিছানায় দুটো ছোট ঝুটি ভর্তি বাগানবিলাস ফুল রাখা।খুশিতে ঝলমল করে উঠলো মেহু।কে এনে রেখেছে তা বুঝে এলোনা যদিও।।তবে অতশত ভাবলোওনা সে।মন মতো ফুল পেয়েছে তাতেই হলো।হাতের গাজড়া বানানোর জন্য দ্রুত বসে পড়লো প্রয়োজনীয় সব নিয়ে।
_____________
অজানা কোনো একটা কারণে ছোট বাজারের প্রায় দোকানই বন্ধ।নীলা নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কয়েকটা দোকানে তবে সেখানে মেহেদী পাওয়া গেলোনা।এমনিতেই মেজাজ গরম হয়ে আছে তারওপর এইসব মেয়েলি ঝামেলা সহ্য হচ্ছেনা দিব্যর।নীলা ভোঁতা মুখ করে এসে দাঁড়াতেই বললো," ওর গাধা বরটাকে আগে বলে রাখলোনা কেনো মেহেদিটেহেদির কথা?যথেষ্ট হয়েছে। চল।এই গরমের মধ্যে আমি আর এক সেকেণ্ডও এখানে থাকবোনা।"
নীলা তেজ দেখিয়ে বললো," কথায় কথায় সবাইকে গাধা বলা বন্ধ করো।না থাকতে চাইলে চলে যাও।আমি একাই বড় বাজারে যাবো।"
বলে নীলা হাঁটাও শুরু করে দিলো। কিছুক্ষণ আগুন চোখে তাকিয়ে থেকে দিব্য বলল," তেজ দেখাবিনা একদম।তোর এই ব্যাঙ্গের মতো পা দিয়ে হেঁটে গেলে কালকেও মেহেদী নিয়ে ফিরতে পারবিনা।উঠে বস।"
বড় বাজারে মেহেদি পাওয়া গেলো অনেকটা খোঁজাখুঁজির পর।ঘেমেনেয়ে দুজন বাইকের কাছে আসতেই দিব্য আবার একটা দোকানে ঢুকলো।একটুপরে বেরিয়ে এসে একটা ঠাণ্ডা পানির বোতল আর আইস্ক্রিম ধরলো নীলার সামনে।অন্যদিকে মুখ করে বললো," খেয়ে উদ্ধার কর। রাস্তায় বেঁহুশ হয়ে পড়ে গেলে সেইতো আমাকেই নিয়ে দৌঁড়াতে হবে।"
নীলা সত্যিই হাঁপিয়ে গেছে।পানি খেয়ে বোতল্টা সে দিব্যকে বাড়িয়ে দিলো।দিব্যও একনিঃশ্বাসে সেটা শেষ করে বাইক স্টার্ট দিলো।নীলা উঠে বসলো।সামনের মিররে ঘেমে থাকা দিব্যর মুখটা চোখে পড়তেই হুট করে একটা ভাবনা ঘিরে ধরলো নীলাকে- যতই সে এই অসহ্য মানবের থেকে দূরে থাকতে চায়,পরিস্থিতি ততই যেনো আরও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে ওদেরকে!
#চলবে,,