আলগোছে_ভালোবাসি সিজন 1
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি
আনাফের তোমার জামাই শুনে সকলে হেসে দিল। তখন আদিয়ান চৌধুরী বললেন,,,
"আহিয়ানা তাহলে এই তোমার জান ।"
"জি শশুর আব্বা আমিই আপনার মেয়ের জান!"
আনাফের কথায় আদিয়ান চৌধুরী বিস্মিত হলেন।সাথে বাড়ির সকলে,, তারপর বললেন,,
"তুমি আমাকে চেনো?"
"হুম আমি তোমাদের সবাইকে চিনি। জান তার পরিবারের প্রত্যেকের ছবি দেখিয়েছে। "
তখন আয়াত বলল,,
"হয়েছে জান অনেক জার্নি করে এসেছো চলো ফ্রেশ হয়ে নেবে। তোমার লাগেজ কোথায়?
"বাইরে রাখা আছে।"
"সে কোথায় যার সাথে তুমি এসেছো?"
"আংকেল আমাকে বাড়িতে ছেড়েই চলে গেছে।"
"ওহ আচ্ছা! এখন চলো ওপরে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নেবে।"
"আরে দাঁড়াও আমি সবাইকে চিনলে কি হবে সবাই তো আমাকে চেনে না। ভালোভাবে সবার সাথে পরিচয় হয়ে নিই।"
"ওকে!"
তারপর আয়েশা চৌধুরীর কাছে গিয়ে বলল,,
"আসসালামু আলাইকুম আমি আনাফ চৌধুরী। তুমি হচ্ছো আমার জানের মা মানে আমার আন্টি ঠিক তো।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। একদম ঠিক বলেছো আর আহির বাবাকে শুশুর আব্বা বললে তাহলে আমি তো তোমার শাশুড়ি আম্মু হই তাইনা।"
"হুম আবার পরে কথা হবে সকলের সাথে পরিচয় হয়ে নেই।"
"আচ্ছা ঠিক আছে।"
আনাফ গিয়ে সকলকে সালাম দিয়ে সকলের সাথে পরিচিত হলো এবার পালা আঁখি চৌধুরীর। আঁখি চৌধুরীর চোখে পানি চিকচিক করছে। আনাফ ওর ডান হাত টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
"আসসালামু আলাইকুম! আমি আনাফ। আমি হলাম জানের জান ওরফে জামাই। তুমি আমাকে তোমার ছেলে হিসেবে ভাবতে পারো। জান তোমার সাথে এভাবেই পরিচিত হয়েছিল তাই না।"
আঁখি চৌধুরী মাথা নাড়ালো আর হ্যান্ডশেক করলো।উনি খুশিতে কিছু বলতে পারছে না। রেদওয়ান চৌধুরী আঁখি চৌধুরীর মনের অবস্থা বুঝতে পারল। তাই উনি গিয়ে উনার স্ত্রীর কাছে দাঁড়ালেন আর তার কাঁধে হাত রাখলো।। শুধু তিনিই বুঝেন নি বাড়ির সকলেই বুঝতে পেরেছে। মুহুর্তেই চৌধুরী বাড়িতে নিস্তব্ধতা বিরাজ করলো। আঁখি চৌধুরী হাটু গেড়ে বসে আনাফের হাত ধরে বলল,,,
"তুমি তো বললে তোমাকে ছেলে ভাবতে তুমি কি আমার ছেলে হবে। আমাকে মা বলে ডাকবে। তুমি যদি মা বলে ডাকো তাহলে আমি খুব খুশি হবো।"
"ছেলে হবে কি আমি তো তোমার ছেলেই। তবে আমি তোমায় মা বলে ডাকবো না।"
একথা শুনে আঁখি চৌধুরীর মুখের হাসিটা গায়েব হয়ে গেল। সাথে বাকি সবার ও । সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো আঁখি কারো থেকে মা ডাক শুনতে পাবে। আয়েশা চৌধুরী ভালভাবে বুঝতে পারে আঁখি চৌধুরীর কষ্ট টা । আয়াত মুচকি হেসে দাঁড়িয়ে আছে। সে তো তার জানকে চেনে। তখন আয়েশা চৌধুরী বললেন,,,
"ডাকো না বাবা ওকে মা।"
"আরে মা ডাকবো কেন? আমি তো ভেবে রেখেছিলাম মামনি ডাকবো। আমার মা আর জানের কাকিমনি থেকে মনি নিয়ে মামনি ডাকবো। জান যেভাবে কাকিমনি ডাকে ।"
তখন আঁখি চৌধুরী বলল,,
"তুমি কি একবার আমাকে জরিয়ে ধরবে?"
"হুম ধরবো তো মামনি!'
বলেই আনাফ আঁখি চৌধুরী কে জরিয়ে ধরলো। আঁখি চৌধুরীর মনপ্রান একদম জুড়িয়ে গেল। তিনি অনেক বছর ধরে এই জিনিসটার ই অপেক্ষা করছিল। আঁখি চৌধুরী চোখ বন্ধ করে অনুভূতি টা উপভোগ করছিলেন। কিছুক্ষন পর তিনি আনাফ কে ছেড়ে দিলেন। তারপর আনাফ রোজার সামনে গেল। তা দেখে রোজা বলল,,
"কি হলো দুলাভাই আমাকে আপনি নিশ্চয়ই আপনি চিনেন না তাইনা।"
"তোমাকে কেন চিনবো না তুমি তো আমার ভা,,, না মানে আমার জানের বান্ধবী রোজ তাইনা।"
"তুমি আমাকেও চেনো। আচ্ছা ঠিক আছে আমি কিন্তু তোমাকে দুলাভাই বলেই ডাকবো। বান্ধবীর জামাইকে সবাই দুলাভাই বলেই ডাকে।
"বললাম তো জানের সাথে সম্পর্কিত সব মানুষ কে আমি চিনি। তবে তুমি কিন্তু সবার সামনে খেকো না আমার লজ্জা করবে ঠিক আছে!"
"আচ্ছা ঠিক আছে ভাই লিটল দুলাভাই।"
তখন আয়াজ বলল,,
"সবাইকে তখন চেনো তাহলে তো আমাকেও চিনো?'
"হ্যা চিনি তো তুমি তো আয়াজ ভাইয়া জানের ফুফাতো ভাই। সাথে আরো একটা পরিচয় আছে কাছে আসো বলছি।"
আনাফের কথা শুনে আয়াজ ওর কাছে এলো তখন আনাফ কানে কানে ফিসফিস করে বলল,,
"তুমি নিশ্চয়ই আমার সতিন হওয়ায় চেষ্টা করছো তাই না।"
আয়াজ ও ফিসফিস করে বলল,,
"আমি তোমার সতিন হওয়ায় চেষ্টা কেন করবো আর এটা কি কথা!"
"তুমি যে ছোটবেলায় জানকে অন্য ছেলেদের সাথে খেলতে দিতে না। সবসময় জানের খেয়াল রাখতে। আমি সব শুনেছি তুমি নিশ্চয়ই জানকে বিয়ে করতে চাও তাইনা। কিন্তু জান শুধু আমার ঠিক আছে।"
"উঁহু জানপাখি শুধু আমার।"
"কি!! তুমি আমার জানকে জানপাখি বলছো তোমার এতবড় সাহস।"
"আমার সাহসের কি দেখোছো তুমি ! তুমি দেখবে তোমার জানকে তোমার সামনে আমি বিয়ে করে নিয়ে যাবো তুমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে।"
"সেটা সময় বলে দেবে মিস্টার আয়াজ। আই উইল সি ইউ।" হাত দিয়ে ইশারা করে।
তখন ইশরাত বলল,,
"এই তোমরা দুজন এতো কি ফুসুরফুসুর করছো?"
তখন আনাফ বলল,,
"তেমন কিছু না ইশরাত আপু আয়াজ ভাইয়া বলছিল তার গার্লফ্রেন্ড নাকি জানের থেকে অনেক সুন্দর। পরে আমি বললাম আমার জানের থেকে কেউ সুন্দর হতেই পারে না।"
আনাফের কথা শুনে আয়াজ হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কি ছেলেরে বাবা মান ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে দিল পুরো। না এর থেকে সাবধানে থাকতে হবে। নাহলে কখন আবার কি কেস খায়িয়ে দেয়।
তখন আশিয়ান বলল,,
"আয়াজ তোর গার্লফ্রেন্ড আছে কই আমাদের তো কখনো বলিস নি।"
"আরে আমার যে গার্লফ্রেন্ড আছে সেটাই তো আমি আজ জানলাম। আরে ও মজা করছে আমি তেমন কিছুই বলিনি আর আমার গার্লফ্রেন্ড ও নেই।"
তখন আয়াত বলল,,,
"জান এখন চলো সবার সাথে পরিচয় হয়ে গেছে। আমার ক্ষুদা লাগছে। তোমার জন্য না খেয়ে বসে আছি।"
"তোমার ক্ষুদা লাগছে আগে বলবা না। তাহলে আমি আগেই ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিতাম পরে না হয় পরিচিত হতাম। আচ্ছা এখন চলো ফ্রেশ হতে।"
আয়াত আনাফের লাগেজ নিয়ে এলো আর আনাফ কে নিয়ে ওপরে চলে গেল। এতকিছুর মাঝেও আজ জুনায়েদ চৌধুরী বাড়িতে ছিল না। আয়াত যখন কাঁদছিল তখনি উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেসে কি একটা কাজে। আয়াতরা ওপরে যেতেই আশিয়ান বলল,,
"তাহলে এটাই আহির জান আর আমরা না জানি কত কি ভাবছিলাম।"
তখন আদিয়ান চৌধুরী বললেন,,,
"আহির থেকে এত বছরের ছোট না হয়ে যদি দুবছরের ও ছোট হতো তাহলে আমার মেয়ের জামাই আমি একেই করতাম।"
তখন আয়েশা চৌধুরী বললেন,,,
"হুম আমিও !এরকম মেয়ের জামাই পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এই টুকু বয়সে একা একাই চলে এসেছে কতোটা ভালোবাসে ছেলেটা আমার মেয়েকে।"
উনাদের এসব কথা শুনে আয়াজের ভেতর একটা জেলাসি কাজ করছে। ইশরাত ভাইয়ের কাছে এসে বলল,,,
"কি ভাইয়া জেলাস হচ্ছো নাকি?"
তখন আয়াজ বলল,,
"জেলাস তাও আবার এটুকু ছেলের জন্য হাউ ফানি।"
"জেলাস তো তুমি হচ্ছোই তোমার চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে। তুমি এতদিনেও আপু ভালোবাসি কথা বলতে পারো নি। কিন্তু ছোট পিচ্চি টা সবার সামনেই বউ বলছে।"
"আমিও খুব তাড়াতাড়ি জানপাখিকে মনের কথা বলবো প্রমিস।"
"এই না হলে খান বাড়ির ছেলে!"
"হুম!"
তখন নাফিজা বলল,,
"তোমরা সবাই যাই বলো না কেন ছেলেটা কিন্তু ভিশন কিউট আর কি সুন্দর করে কথা বলে। ও সবার সাথে এমন ভাবে কথা বলছিল মনে হচ্ছিল ও এবাড়ির ছেলে আর আমাদেরকে ও জন্ম থেকেই দেখছে।"
তখন রেদওয়ান চৌধুরী বললেন,,
"একদম ঠিক বলেছো নাফিজা।"
তখন আঁখি চৌধুরী মনে মনে বলল,,,
"ও তো এবাড়ির ই ছেলে সময় আর পরিস্থিতির শিকার হয়ে আজ এই অবস্থা। তবে খুব বেশী দেরি হবে না। আর তো কয়েকটা মাস।"
ওরা নিজেদের মতো কথা বলতে লাগলো।
___________________
আয়াত আর আনাফ ওপরে আসল। আনাফ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো। পরনে থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর গেঞ্জি তার ওপরে শার্ট। শার্টের বোতাম খোলা। ও এসেই বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। তা দেখে আয়াত বলল,,
"কি হলো না খেয়ে শুয়ে পরলে কেন? সব এনার্জি শেষ!"
"আরে জান তুমি ভুলে গেছো কোথাও থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে এভাবে না শুলে আমার ভালো লাগে না।"
"জান তোমার হাতের ঘড়ি কোথায় যেটা আমি আসার আগে তোমাকে দিয়ে এসেছিলাম।"
"তুমি কি মনে করো তুমি একাই চালাক। আমি কিছু বুঝিনা আমি ঠিক জানতাম তুমি আমার ঘড়িতে দেখার জন্য হিডেন ক্যামেরা আর শোনার জন্য ভয়েস রেকোর্ডার লাগিয়েছিলে। যদিও কেউ দেখে বুঝতে পারবে না। তুমি এমন ভাবেই অর্ডার করে বানিয়েছিলে। আমি যখন লিওনের বাবার সাথে কথা বলতাম তখন ঘড়িটাকে রুমে রেখে যেতাম। কাল ওটা আমি এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছি যেখান থেকে তুমি কিছুই শুনতে বা দেখতে পাওনি।
"ওরে আমার সবজান্তা!"
"তুমিই তো আমাকে এভাবে তৈরি করেছো।"
"এবার উঠো নিচে চলো খেয়ে দেয়ে একটা ঘুম দেবে দেখবে সব ক্লান্তি গায়েব।
"হুম আচ্ছা জান তোমার ফুল নাম আহিয়ানা আয়াত চৌধুরী আমার নাম আনাফ আজান চৌধুরী। তাহলে তুমি আমাকে ফুল নাম বলতে দিলে না কেন?"
"আচ্ছা তুমি বলো আমাদের তিন ভাইবোনের নামের শর্ট ফ্রম কি? আর আমাদের কম্পানির নাম কি?
" আমাদের তিন ভাইবোনের শর্ট ফ্রম এ.এ.সি! আর আমাদের কম্পানির নাম এ.এ.সি ইন্ড্রাস্ট্রিজ। আর তোমাকে তো সবাই ডক্টর এ.এ.সি বলে চেনে।
"আমাদের তিন ভাইবোনের নামের শর্ট ফ্রম ই কিন্তু এ.এ.সি। যদি আমাদের শত্রু কখনো আমাদের কাজের জায়াগায় আমাদের দেখে তাহলে আমাদের সন্দেহ করতে পারে হয়তো আমরাই সেই মানুষ টা হতে পারি তাই আমাদের সেখান থেকে সেফ ভাবে চলতে হবে। বুঝতে পেরোছো।"
"হুম বুঝতে পেরেছি সেই জন্যই তো জান ভাইয়া তার আইজান বাদ দেয় যেভাবে তুমি আয়াত আর আমি আজান বাদ দিয়ে বললাম।"
"হুম গুড বয়। আর এখানে যখন এসেছো তখন সবসময় সামধানে থাকবে কোন ভুল যেনো না হয়।"
"ইয়েস ম্যাম।তবে বাবাকে জরিয়ে ধরা হলো না শুধু মা কে হলো! মা খুব কষ্টে ছিল তাই না জান"
আনাফের কথা শুনে আয়াতের মুখের হাসিটা গায়েব হয়ে গেল । তখন আয়াত বলল,,
"হুম একটু কষ্টে হয়তো ছিল তবে এটা ভেবে খুশি ছিল তার ছেলে বেঁচে আছে। আর আজ তো সে ভিশন খুশি তার ছেলে তার কাছে ফিরে এসেছে।"
"দেখবে মামনি কে আর কোন কষ্ট পেতে দেব না।"
"আচ্ছা ঠিক আছে চলো এখন নিচে যাই।"
"হুম চলো।"
ওরা দুজন নিচে চলে এলো । আঁখি চৌধুরী ওদের খাবার বেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াত ওর চেয়ারে বসলো আর আনাফ কে পাশের চেয়ারে বসিয়ে খায়িয়ে দিতে লাগলো আর নিজের খেতে লাগল। আনাফ ও চুপচাপ খেতে লাগলো। সকলে ওদের দেখতে লাগলো। ওদের খাওয়া শেষ হলে আয়াত ওকে নিয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে উপরে যেতে নিল। তখন পেছন থেকে একটা আওয়াজ আসলো,,
"এই পিচ্চি টা কে? আর আমাদের বাড়িতে কি করছে?
আয়াত আর আনাফ পেছনে ঘুরে দেখতে পেল জুনায়েদ চৌধুরী। আয়াত মুচকি হেসে বলল,,,
"ও হচ্ছে আমার জান যাকে সকাল বেলা পাওয়া যাচ্ছিল না।"
"কিন্তু ও এখানে কি করছে ওর সাথে তোমার কি সম্পর্ক।"
তখন আনাফ এগিয়ে এসে বলল,,
"আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। আমি আনাাফ। ক্লাস টু তে পরি । জান এতদিন আমাদের সাথেই ছিল। আমি জানের খুব নেওটা ছিলাম তাই থাকতে পারছিলাম না তাই চলে এসেছি জানের জন্মদিন এর পর চলে যাবো।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কিন্তু তুমি কি জান বলতে আহিয়ানাকে বোঝাতে চাইছো!"
"জি আঙ্কেল।"
"আহিয়ানার জন্মদিন তো কয়েকমাস পর তুমি এতদিন আমাদের এখানে থাকবে।"
"হ্যা থাকবো তো!"
"তোমার পরিবার কিছু বলবে না। তোমার মা কিছু বলবে না।"
"কেউ কিছু বলবে না।"
"তোমার পরিবারের কে কে আছে?"
"জান থাকতে আমরা পাঁচজন ছিলাম এখন চারজন আছি। আমি আমার ফুপিমা আমার দাদুভাই আর আমার জান ভাইয়া।"
"তার মানে তোমার বাবা মা নেই এই জন্যই তো বলি এত উশৃঙ্খল কেন বড়দের মুখে মুখে তর্ক করে!"
আয়াত এতক্ষন নিজেকে সামলাতে পারলেও এখন আর পারলো না।তখন আয়াত বলল,,
"কি সব বলছো কাকাই ও ছোট মানুষ। ওর সাথে এভাবে কথা বলছো কেন? ওর মা বাবাকে একটা এক্সিডেন্ট এ হাড়িয়ে ফেলেছে ও তারপর থেকে ওর দাদুভাই আর ফুপিমা আর আমি ওকে দেখে রাখতাম। আশা করি সকল উত্তর পেয়ে গেছো।"
"আহিয়ানা আমি ওভাবে বলতে চাই নি!"
"তো কিভাবে বলতে চাইছো ও একটা বাচ্চা ছেলে আমার সাথে থাকবে বলে এসেছে আর তুমি ও কতোদিন থাকবে ওর পরিবারের কে কে আছে মা বাবা নেই তাইতো এতো উশৃঙ্খল এসব কি বলছো। আমাকে বাঁচিয়েছে উনারা। উনাদের কাছে তোমাদের সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকার কথা অথচ তোমরা কি করছো তাদের বাড়ির ছেলেকেই অপমান করছো।"
এতক্ষনে সকলে জানতে পারলো আসলে আনাফের পরিবার ই আহিয়ানাকে বাঁচিয়েছিল। আদিয়ান চৌধুরী বললেন,,,
"আহি তুমি আনাফকে নিয়ে রুমে যাও। আমি জুনায়েদের সাথে কথা বলছি।"
বাবার কথা শুনে আয়াত আনাফ কে নিয়ে রুমে চলে গেল। ওরা যেতেই আদিয়ান চৌধুরী বললেন,,,
"জুনায়েদ আজ যা বলার বলে নিয়েছো এরপর থেকে যেনো তোমাকে এসব কথা বলতে আর না শুনি। কয়েকমাস কেন আনাফ যদি সারাবছর এবাড়িতে থাকে তাহলেও কোন প্রব্লেম নেই। ওর পরিবার আহিকে বাঁচিয়েছে বলেই আমরা আহিকে ফেরত পেয়েছি। উনাদের কাছে আমরা ঋনী। আশা করি বুঝতে পেরেছো এখন তুমি তোমার রুমে যাও।"
জুনায়েদ চৌধুরী রেগে মেগে নিজের রুমে চলে গেল। পেছন পেছন মোনা চৌধুরী ও গেলেন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে তাই রোজা আয়াজ ইশরাত বাড়ি চলে গেল। আশিয়ান সকল কে থাকতে বলেছে কিন্তু তারা থাকবে না। আয়াত আর আনাফ ওপরে এসে হাসতে লাগলো। জুনায়েদ চৌধুরীর কথা আনাফের গায়ে লাগে নি সেটা ভালোভাবেই বোঝা গেল। আনাফ বলল,,,
"মানুষ কে এভাবে ঘোল খাওয়াতে কিন্তু দারুণ লাগে।"
তখন আয়াত মুচকি হেসে বলল,,,
"তোমার কি মনে হয় না তুমি বয়সের তুলনায় একটু বেশি পাকা না। এত এনার্জি পাও কোথা থেকে শুনি।"
"তোমার থেকে আচ্ছা এখন তুমি ফুপিমাকে বলো আমি এসে পরেছি। আমি এখন ঘুমাবো সব এনার্জি শেষ।"
"আমি, তুমি আসার পরেই মেসেজ এ জানিয়ে দিয়েছি তুমি এখন ঘুমাও।"
আনাফ একটা বালিশে শুয়ে পরলো আয়াত মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অনেক টায়ার্ড থাকায় আনাফ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরল। সন্ধ্যায় মাগরিব এর আজানের ধ্বনি কানে আসতেই আয়াত ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এসে নামাজ পরে নিল। তারপর ল্যাপটপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসলো আনাফের ঘুমে ডিস্টার্ভ হবে বলে ও নিচে এলো। নিচে আসতেই ও দেখলো বাড়ির সকলে নিচে ড্রয়িংরুমে চলে এসেছে। আর আয়াজরাও চলে গেছে। ও নিচে আসতেই আয়েশা চৌধুরী বললেন,,
"কি রে আনাফ কোথায়?"
"অনেক টায়ার্ড ছিল ঘুমিয়ে পরেছে।"
"ওহ আচ্ছা!"
"মা আমাকে এককাপ কফি দাও তো।"
তখন আঁখি চৌধুরী বলল,,
"এই নাও কফি আমি সকলের জন্য বানিয়েছি।"
"ধন্যবাদ কাকিমনি।"
তখন আদিয়ান চৌধুরী বললেন,,
"তুমি বলো নি তো জান ঐ পরিবারেরই একজন। আর ঐ পরিবার সম্পর্কেও তো কোনদিন বলো নি।"
"ও পরিবার নিয়ে কখনো কথাই উঠেনি বলব কিভাবে।"
"উনারা কোথায় থাকে উনাদের আসতে বলো আমাদের বাড়িতে।"
"আমাদের শহরে থাকে না। উনারা এখন আসবে না। তবে জান ভাইয়া বলেছে আসবে ।"
"কোথায় থাকে তারা?আর নামটি উনাদের?
তখন জুনায়েদ চৌধুরী বললেন,,,
"উনারা সম্পর্কে আর কোথায় থাকে শুনে আমাদের কি লাভ আমরা কি উনাদের বাড়িতে যাবো কখনো।"
উনার কথা শুনে আয়াত মুচকি হাসলো। উনার জন্য এখন আর কিছু বলতে হলো না । আয়াত কথা ঘোড়ানোর মুচকি হেসে বলল,,
"সত্যি তো তোমরা কখনো যাবে নাকি। আচ্ছা বাদ দাও আমার কিছু কাজ আছে আমি সেগুলো করি। আনাফ ঘুমাচ্ছে দেখে রুমে করলাম না ডিস্টার্ভ হবে ভেবে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে!"
আয়াতের কথা শুনে আদিয়ান চৌধুরী ও কিছু বললো না।আয়াত ওর মতো কাজ করতে লাগলো বাকিরা চা কফি খেয়ে নিজেদের কাজে চলে গেল। অহনা ওর রুমে চলে গেল পরতে। আশিয়ানের কিছু অফিসের কাজ ছিল ওগুলো করতে হবে। সবাই সবার কাজে ব্যস্ত শুধু আঁখি চৌধুরী আর নাফিজা আর নিশান বাদে। ওরা তিনজন ড্রয়িংরুমেই ছিল। কিছুক্ষণ পর নিশান এসে আয়াতের হাত ধরে বলল,,
"ফুপি ,ফুপি!
আয়াত ল্যাপটপ পাশে রেখে নিশান কে কোলে নিল। আর ওর সাথে খেলতে লাগলো আঁখি চৌধুরী আর নাফিজা এসে তিনজন আড্ডা দিল। আড্ডা দিয়েই কাটিয়ে দিল সন্ধ্যা টা। আয়াত কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে রুমে গেল। কিছুক্ষণ পরেই আবার খাওয়ার সময় হবে। আয়াত গিয়ে আনাফ কে দেখে বুকসেল্ফ থেকে একটা উপন্যাসের বই নিয়ে বিছানায় বসলো। কিছুক্ষনপর আশিয়ান নাফিজা আর অহনা ঢুকলো। আশিয়ান ঢুকেই বলল,,,
"কিরে আনাফ উঠেছে ঘুম থেকে?"
আশিয়ানের কথা শুনে আয়াত মুখে আঙুল দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,,,
"ভাইয়া আস্তে কথা বলো জান ঘুম থেকে উঠে পরবে।"
কথা শেষ করতে না করতে আনাফ উঠে আয়াত কে পেছন থেকে জরিয়ে ধরে মুখটা আয়াতের ঘাড়ে রাখলো।আয়াত একহাত দিয়ে আনাফের গালে হাত রেখে বলল,,,
"ঘুম হয়েছে জান?"
"হুম কিন্তু তোমার ঘাড়টাকে মিস করছিলাম। তোমাকে ঘুম থেকে উঠে এভাবে জরিয়ে ধরতে পারিনি।"
"হুম এখন চোখ খুলো। দেখো কারা এসেছে?"
আনাফ চোখ খুলে বলল,,
"ও আশি ভাইয়া, নাফি ভাবি আর অহনা আপু।"
তখন আশিয়ান বলল,,,
"আমাদের অর্ধেক নাম বললে অথচ অহনার পুরো নাম বলে কেন?"
"ওহ হো আশি ভাইয়া তোমার আর ভাবির নামটা আমার খুব বড় লাগে তাই।"
"ওহ আচ্ছা। এখন ফ্রেশ হয়ে নাও নিচে সবাই খেতে ডাকছে।"
"তোমরা এক মিনিট দাঁড়াও আমি পাঁচ মিনিট এ আসছি।"
বলেই আনাফ ওয়াশরুমে গেল। সকলে আনাফের কথা শুনে হাসলো। ও ওয়াশরুমে ঢুকতেই আশিয়ান বলল,,,
"আনাফ বোধহয় তোকে অনেক ভালোবাসে তাইনা।"
তা শুনে আয়াত বলল,,
"হুম ও যে আমাকে কি পরিমান ভালোবাসে সেটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না। ওর কাহিনী শুনলে তোমারা হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাবে।"
তখন নাফিজা বলল,,,
"ওকে আমরা খেয়ে আবার আড্ডা দেব। আর আনাফের গল্প শুনবো।"
"নিশান কোথায় ভাবি?"
"তাকে খায়িয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছি।"
"ওহ আচ্ছা"
আনাফ ফ্রেশ হয়ে আসতেই ওরা নিচে গেল। আয়াত আনাফকে খায়িয়ে দিয়ে নিজে খেলো। তারপর সবার সাথে কথা বলে আনাফকে নিয়ে রুমে এলো। আনাফ ওর সাথেই থাকবে।
___________________
এদিকে আয়াজ ভাবছে কি করে ওর মনের কথা আয়াত কে জানাবে। ও ভাবলো একবার ওর বন্ধুদের বলবে আবার ভাবলো না কাউকে আগেই জানানো যাবে না। যদি আয়াত রিজেক্ট করে ওর ভাবভঙ্গি কিছুই বুঝতে পারছে না আয়াজ। ও বেস্ট প্রপোজাল লিখে ইউটিউব এ সার্চ করলো হাজার হাজার ভিডিও এলো। ও কয়েকটা ভিডিও দেখলো কিন্তু ওর সেগুলো ভালো লাগলো না। ও ইউনিক কিছু করতে চাচ্ছে। ও অনেক ভাবলো তারপর মাথায় একটা আইডিয়া এলো। ও ইয়াহু বলে চিৎকার দিল তারপর আস্তে আস্তে বলল,,,
"জান পাখি তোমাকে আমি আমার মনের মতো করেই আমার ভালোবাসার কথা বলবো। তুমি ভাবতেও পারবে না।বেশী কিছু চাইনা আমি শুধু চাই তোমাকে। খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে বলবো আমার মনের কথা আর আমার হতে। তোমাকে পেয়ে গেলে আমার জীবনে অপ্রাপ্তি বলে কিছু থাকবে না। আল্লাহর রহমতে সব আছে শুধু তুমিই আছো অপ্রাপ্তির খাতায়। তুমি এতদিন আমার থেকে দূরে ছিলে। তখন আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতাম।
"জান পাখি তুমি শুনছো তুমি আমার দুরে থাকা ভিশন কাছের কেউ। সবকিছুর মায়া কাটাতে পারলেও আমি তোমার মায়া কাটাতে পারিনি। আমি যে তোমাকে ভালোবাসি তোমার অজান্তেই আমি তোমাকে #আলগোছে_ভালোবাসি জানপাখি!"
চলবে.....