{
সতর্কীকরণ | Content Warning
এই গল্পে অশালীন ভাষা ও গালাগালির ব্যবহার রয়েছে, যা সকল পাঠকের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।পাঠকদের নিজ বিবেচনায় পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।}
মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে বেরিয়ে তৃষ্ণা এখনো প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সে বেঁচে আছে। এই সংবাদটুকু অন্ধকার চিরে বেরিয়ে আসা এক টুকরো ভোরের আলোর মতোই আশাব্যঞ্জক।
চারদিকের পরিবেশ রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার প্রহরে বন্দি। তাকে তড়িঘড়ি স্থানান্তরিত করা হয়েছে গুজরাটের সর্বাধুনিক এবং স্বনামধন্য হাসপাতালে। সে এখন আইসিইউ তে ভর্তি। তৃষ্ণা হিমজড়ানো প্রাণহীন সাদা বিছানায় মৃত্যুর সাথে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত। ভেতরে দীর্ঘক্ষণ ধরে সার্জারি চলছে। চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। নার্সদের দ্রুত পদচারণা এবং মনিটরে একটানা বেজে চলা বিপ বিপ শব্দ মিলিয়ে এক নারকীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি সেকেন্ড এক একটি শতাব্দীর সমান দীর্ঘ মনে হচ্ছে। তৃষ্ণার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসকরা নিজেদের সমস্ত বিদ্যা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন একটি নিভু নিভু প্রদীপকে জ্বালিয়ে রাখার। কিন্তু সলতে কতটা পুড়ে গেছে তা শুধুমাত্র বন্ধ দরজার ভেতরের মানুষগুলোই জানে।
অথচ এই সবকিছুর বাইরে দরজার ঠিক এপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ভেতরে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ওয়াসেমর অবস্থা আজ আর দশজন সুস্থস্বাভাবিক মানুষের মতো নেই। এক তীব্র পাশবিক যন্ত্রণায় তার বুকের ভেতরটা ধারালো করাত দিয়ে একটু একটু করে চিরে দুভাগ করে দিচ্ছে।
ওয়াসেমের গলা থেকে কোনো স্পষ্ট শব্দ বেরোচ্ছে না। তার গলা কাটা পশুর মতো এক অভাবনীয় হাহাকার মাখা গোঙানি বেরিয়ে আসছে তার কণ্ঠ চিরে। তার প্রকাণ্ড সুঠাম শরীরটি আজ একটি জীর্ণ পাতার মতো থরথর করে কাঁপছে। চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। সারারাত না ঘুমানো এবং অবিরত কান্নার কারণে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। উষ্কখুষ্ক চুল। রক্ত আর ধুলোয় মাখামাখি হওয়া শার্ট। শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় বইতে থাকা প্রগাঢ় অনুশোচনার বিষ তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। তার তৃষ্ণা আজ মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে শুধুমাত্র তার জন্য।
ওয়াসেমের মারাত্মক ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ মেয়েটিকে। কী করবে সে এখন? কোথায় যাবে? কার কাছে গিয়ে নিজের বুক চিরে দেখাবে তার ভেতরে কতটা দহন চলছে? তৃষ্ণার সর্বনাশের জন্য তো সে নিজেই দায়ী! ওয়াসেমের বারবার মনে পড়ছে তৃষ্ণার শেষ আর্তনাদ। অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে নিজের চুলগুলো মুঠো করে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। নিজের মাথাটি হাসপাতালের শক্ত দেওয়ালে ঠুকে ফাটিয়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু তাতে কি তৃষ্ণা ফিরে আসবে?
হাসপাতালের যান্ত্রিক কোলাহল, ওষুধের ঝাঁঝালো গন্ধ, নার্সদের দৌড়াদৌড়ি ওয়াসেমের মস্তিষ্ককে বিকল করে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কেউ তার গলাটি লোহার শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। এই বদ্ধ নরক থেকে বাঁচতে সে টলতে টলতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। হাসপাতালের ঠিক পেছনেই একটি ছিমছাম মসজিদ। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, যান্ত্রিকতা আর অহংকার পবিত্র চৌকাঠে সে এসে থমকে দাঁড়ায়।
ওয়াসেমের পা দুটো আর শরীরের ভার বইতে পারছে না। প্রতিটা কদমে মনে হচ্ছে কেউ তার পায়ে সীসা বেঁধে দিয়েছে। মসজিদের ঠান্ডা পাথুরে মেঝেতে পা রাখতেই তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ হুড়মুড় করে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। জীবনে যে মানুষটি কখনো ঠিকমতো স্রষ্টার কাছে মাথা নত করেনি আজ সে এক বুক হাহাকার আর শূন্যতা নিয়ে ছুটে এসেছে করুণাময়ের দরবারে। অহংকারে যে কখনো মাটিতে পা ফেলত না তার কাছে আজ নিজের ক্ষমতাই সব নয়।
অজুগোসলের কোনো তোয়াক্কা নেই। পার্থিব কোনো নিয়মের হিসাব নেই। রক্ত আর ধুলোমাখা শরীরেই সে বসে পড়ে মসজিদের এক কোণে। কাঁপতে থাকা দুটো হাত সে তুলে ধরে আকাশের দিকে। দুহাত তুলে মোনাজাতে বসার সাথে সাথেই তার দুই চোখ ছাপিয়ে নেমে আসে শ্রাবণের ঢল। কান্নার তোড়ে তার প্রশস্ত শরীরটি একটি অসহায় শিশুর মতো কাঁপতে থাকে। জীবনে কোনোদিনও এভাবে সে কাঁদেনি। এত অসহায়ত্ব সে কখনো অনুভব করেনি। আল্লাহর কাছে এভাবে ভিখারির মতো কখনো সে কিছু চায়নি। আজ সে নিঃস্ব। তার সমস্ত অহংকার আর দম্ভ আজ মসজিদের মেঝেতে ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে।
কেঁদে কেঁদে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে আল্লাহর কাছে তৃষ্ণার প্রাণ ভিক্ষা চাইছে! তার আর কিচ্ছু চাই না। পৃথিবীর কোনো সম্পদ কিংবা রাজত্ব তার দরকার নেই। তৃষ্ণা একবার চোখ মেলে তাকাক। একবার তাকে আগের মতো ওয়াসেম বলে ডাকুক। ওয়াসেমের দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। বুক ফেটে যাচ্ছে কান্নায়। মোনাজাতের হাত দুটো নামিয়ে সে সরাসরি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। ঠান্ডা পাথরের মেঝেতে কপাল ঠেকিয়ে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার গগনবিদারী কান্নায় মসজিদের দেয়ালগুলোও কেঁপে ওঠে। আকাশবাতাস ভারী হয়ে আসে।
সিজদাবনত অবস্থায় রুদ্ধশ্বাসে সে ফরিয়াদ করতে থাকে, "ইয়া রাহমান, ইয়া রাহিম, আমি তোমার এক নিকৃষ্ট পাপিষ্ঠ বান্দা। আমার পাপের কোনো হিসেব নেই মাবুদ। আমি আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে পাপ করেছি। এখনো করছি। আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। আমি জানি আমি নরকের কীট! কিন্তু ইয়া আল্লাহ তুমি রহমান তুমি দয়ালু! আমি আজ শূন্য মাবুদ। আমার বলতে আর কিচ্ছু নেই। আমার আর কোনো অহংকার নেই। আমার তৃষ্ণা আজ বেঁচে না থাকলে আমি শেষ হয়ে যাব। আমি মরে যাব আল্লাহ! ওর প্রাণটি তুমি আমাকে ভিক্ষা দাও। আমার সমস্ত জীবনের বিনিময়ে তুমি ওকে ফিরিয়ে দাও। ও তো কোনো পাপ করেনি! শাস্তি তো আমার প্রাপ্য। ওকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছ ইয়া মাবুদ? তুমি আমাকে শাস্তি দাও। আমাকে টুকরো টুকরো করে দাও। কিন্তু ওর প্রাণটি আমাকে ভিক্ষা দাও। দোহাই তোমার, ভিক্ষা দাও!"
সিজদারত অবস্থাতেই ওয়াসেমের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখের জলে মসজিদের মেঝে ভিজে একাকার। চোখ দুটো জ্বলছে প্রগাঢ় যন্ত্রণায়। বুকটি কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে। প্রতিটা শ্বাস নিতে তার মনে হচ্ছে বুকের পাজরগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ একটি সময় সে এভাবেই পড়ে থাকে। সময় এখানে থমকে গেছে। সে জানে না কতক্ষণ স্রষ্টার কাছে ভিখারির মতো পড়ে ছিল। তার মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে সে কাঁদছে। কিন্তু তার চোখের জল ফুরোচ্ছে না।
অবশেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে সে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসে। কোনো আশা নেই। বাঁচার কোনো গ্যারান্টি চিকিৎসকরা দিতে পারেনি। তবুও একটি ক্ষীণ অবাস্তব আশা বুকে নিয়ে সে আবার ফিরে আসে হাসপাতালের মৃত্যুপুরীতে। ভেতরে সার্জারি চলছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তৃষ্ণার শ্বাস কোনোমতে যন্ত্রের সাহায্যে চলছে। পালস রেট এত নিচে নেমে গেছে যেকোনো মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যেতে পারে।
টলমলে পায়ে ওয়াসেম ফিরে আসে তৃষ্ণার কেবিনের সামনে। সেখানে তৌসির আর ইয়াদ মাথা নিচু করে বসে আছে। তাদের দুজনের অবস্থাও শোচনীয়। ওয়াসেমের সামান্য একটি ভুলের এমন ভয়াবহ পরিণতি হবে তা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। গত কয়েকটা ঘণ্টা ওয়াসেম কীভাবে পাগলের মতো প্রলাপ বকেছে তা ইয়াদ আর তৌসির জানে। কীভাবে সে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছে তা শুধু তারাই দেখেছে। ভাইয়ের এই নরকযন্ত্রণা তারা দুচোখে দেখতে পারছে না। আবার তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষাও তাদের জানা নেই। তারা জানে এখন পৃথিবীর কোনো সান্ত্বনার বাণী ওয়াসেমের দগদগে ক্ষত শুকাতে পারবে না। তারা শুধু নিশ্চুপ দর্শকের মতো বসে আছে। আর প্রার্থনা করছে।
কিছুক্ষণ পরেই করিডোরের স্তব্ধতা ভেঙে দ্রুত ভারী পদশব্দ শোনা যায়। সিতুজা আর ইব্রাহিম সাহেব ছুটে আসছেন। খবর পেয়ে তারা এইমাত্র এসে পৌঁছেছেন। ইব্রাহিম সাহেবের মুখটি বিবর্ণ। চোখের দৃষ্টিতে আতঙ্ক। বাবা হিসেবে এই দৃশ্য দেখার চেয়ে তার মৃত্যু হওয়াও শ্রেয় ছিল।
ইব্রাহিম সাহেব এসেই সোজা ওয়াসেমের সামনে দাঁড়ান। তার শরীর কাঁপছে রাগে আর কষ্টে। কোনো কথা বলার আগেই তিনি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ওয়াসেমের গালে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় কষিয়ে দেন। চড়টি এতটাই জোরালো ছিল যে হাসপাতালের নিঝুম করিডোরে তা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে। ইব্রাহিম সাহেব কান্নায় ভেঙে পড়েন। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, "তোর জন্য! আজ তোর জন্য আমার মেয়েটার এই অবস্থা! তোর মতো একটি কুলাঙ্গারের হাতে আমি মেয়েটাকে তুলে দিয়েছিলাম! একটি অমানুষের হাতে ওকে তুলে দিয়েছিলাম! তুই শেষ করে দিলি আমার তৃষ্ণাকে! তুই আমার বুকটা খালি করে দিলি রে পাষাণ!"
ওয়াসেম কোনো প্রতিবাদ করে না। ইব্রাহিম সাহেবের এক থাপ্পড়েই তার টলমলে শরীরটি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। হাঁটু গেড়ে বসে সে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের গাল দুটো পাগলের মতো চাপড়াতে থাকে। নিজের প্রতি প্রখর ঘৃণায় সে নিজেই নিজেকে আঘাত করতে থাকে। ডুকরে কেঁদে বলে ওঠে, "মারো বাবা, আমাকে আরও মারো! আমাকে জুতো দিয়ে পেটাও! আজ আমার ভুলে আমিই ধ্বংস হয়ে গেছি। আমাকে শেষ করে দাও। আমাকে মেরে ফেলো। আমি বেঁচে থাকার যোগ্য নই! আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলো বাবা। আমি আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না!"
ছেলের এই মর্মান্তিক অবস্থা দেখে সিতুজার মাতৃহৃদয় আর স্থির থাকতে পারে না। একদিকে পুত্রবধূর মৃত্যুর সাথে লড়াই। অন্যদিকে নিজের ছেলের এই উন্মাদপ্রায় দশা। এসব তাকে ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে ওয়াসেমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন। ওয়াসেমের হাত দুটো টেনে ধরেন। তার উষ্কখুষ্ক মাথায় মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি কাঁপা গলায় বলেন, "কাঁদিস না বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই এভাবে ভেঙে পড়িস না। তোর পুরোনো ট্রমা আবার শুরু হয়ে যাবে! তুই শান্ত হ। আল্লাহর কাছে ভরসা রাখ। আমার মা ঠিক ফিরে আসবে। তুই কাঁদিস না।। "
মায়ের এই সান্ত্বনা ওয়াসেমের ভেতরের জমে থাকা বারুদে আরও তীব্র আগুন ধরিয়ে দেয়। সে সিতুজাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। একজন সুঠামদেহী ভয়ংকর রাগী মানুষ আজ ছোট একটি অসহায় শিশুর মতো মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে হু হু করে পশুর মতো কেঁদে ওঠে। কান্নার দমকে তার কথাগুলো জড়িয়ে যায়। বুক ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে গলা চিরে, "মা! আমার তৃষ্ণার এই অবস্থা কেন হলো মা? ওর তো কোনো দোষ ছিল না! ও তো নিষ্পাপ ছিল! ওর সাথে কেন এমন হলো? আমার ভুলের শাস্তি ও কেন পাচ্ছে মা? আমি ওকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব? আমি মরে যাব মা! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে! ওকে আমাকে ফিরিয়ে দিতে বলো মা। ওকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না!"
ছেলের এই হৃদয়বিদারক আহাজারিতে সিতুজার চোখ দিয়েও জলের ধারা নামে। তিনি ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। পুরো করিডোর তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। আশপাশের নার্স আর অন্য রোগীদের স্বজনরাও এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না।
ওদিকে ইব্রাহিম সাহেব রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। তৃষ্ণার এই দশার জন্য তিনি নিজেকেও সমানভাবে দোষী মনে করছেন। দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলেন, "ভুলটা আমার ছিল! আমারই ভুল ছিল! আমি নিজের হাতে ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটিকে এই আগুনের কুণ্ডলীতে তুলে দিয়েছি। আমিই আমার তৃষ্ণার কাল হয়েছি! আমি তো ওর বাবা হয়েছি তাহলে বাবা হয়ে আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছি! আমি কী জবাব দেব আল্লাহর কাছে?"
পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ইয়াদ আর তৌসির দ্রুত এগিয়ে আসে। তারা দুপাশ থেকে ধরে ইব্রাহিম সাহেবকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাশের বেঞ্চে বসায়।
ইব্রাহিম সাহেব বেঞ্চে বসে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে থাকেন। তার এই কান্না একজন অসহায় পিতার কান্না। যে চোখের সামনে নিজের সন্তানের মৃত্যু দেখতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু কিচ্ছু করার ক্ষমতা তার নেই। ইয়াদ আর তৌসিরের দিকে তাকিয়ে তিনি এক বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "দেখ বাবারা, এখন কী হবে? আমার মেয়েটার তো মরা আর বাঁচা সমান হয়ে গেছে! বেঁচে ফিরলেও কি আমার আগের তৃষ্ণাকে আমি পাব? আমার হাসিখুশি মেয়েটিকে কি আমি আর কোনোদিন দেখতে পাব? ওর তো সব শেষ হয়ে গেল রে বাবা!"
ইয়াদ আর তৌসির চুপ করে থাকে। তাদেরও কলিজা ফেটে যাচ্ছে। আজ তৃষ্ণার এই বীভৎস পরিণতি মেনে নেওয়ার মতো শক্তি তাদেরও নেই। ইব্রাহিম সাহেবকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো একটি শব্দও আজ তাদের ডিকশনারিতে অবশিষ্ট নেই। চারপাশের এই জমাট বাঁধা কষ্ট আর একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর হাসপাতালের এই করিডোরটিকে একটি জ্যান্ত নরকে পরিণত করেছে। প্রতিটা মুহূর্ত এক একটি শতাব্দীর মতো ভারী আর যন্ত্রণাদায়ক।
{ আমি চাইলেই গল্পটা এখানেই অফ করে দিয়ে দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে আসতে পারতাম, কিন্তু আনিনি। কারণ জানি, গল্পটা বন্ধ করে দিলে অনেকেরই মন খারাপ হবে। তাই এতদিন ধরে ফেসবুকেই গল্পটা দিয়ে যাচ্ছি। প্রায় দুই লাখ মানুষ গল্পটা পড়েন, অথচ রেসপন্স করেন হাতে গোনা কয়েকজন। একটা গল্প লিখতে কতটা সময়, শ্রম আর ভালোবাসা দিতে হয়, সেটা হয়তো পাঠকরা সবসময় বুঝতে পারেন না।
এভাবে চলতে থাকলে সত্যি বলতে ফেসবুকে গল্প পোস্ট করার কোনো মানে দেখি না। আপনারা যদি গল্পটা নিয়মিত পড়েন, তাহলে একটু রেসপন্সও করবেন। নাহলে আমি গল্পটা ফেসবুকে বন্ধ করে দিয়ে দ্বিতীয় খণ্ড বই আকারে নিয়ে আসব। যাদের ইচ্ছে হবে, বই কিনে পড়বেন, আর যাদের ইচ্ছে হবে না, পড়বেন না। অন্তত তখন মনে হবে, লেখাটা সেভাবেই মূল্য পাচ্ছে।
নতুন গল্প নাস্তিক এবং মুসলিম ক্যানা রিলেটিভ পড়তে পারেন : https://www.facebook.com/100095506747380/posts/1338282652698614/?app=fbl}
হাসপাতালের এই দীর্ঘ, সাদাটে আর গুমোট করিডোরটিতে আজ এক অস্বস্তিকর, দমবন্ধ করা নিঝুম পরিবেশ বিরাজ করছে। বাতাসের প্রতিটি কণা ভারী হয়ে আছে ওষুধের উৎকট গন্ধ আর এক অসীম হাহাকারে। ঠিক এই পরিবেশকে চিরে টুকরো করে দিচ্ছে একটি বন্য প্রাণীর মতো আর্তনাদ। ওয়াসেমের কান্না আর পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে চারপাশের মানুষ। চার-পাঁচজন সুঠাম দেহের ওয়ার্ড বয় আর নার্স মিলে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাকে সামলানোর, কিন্তু কোনো জাগতিক শক্তিই আজ ওয়াসেমকে আটকাতে পারছে না। তার গায়ের জোর আজ কোনো হিসেবের মধ্যে পড়ে না, এ হলো এক উন্মাদ মানুষের শক্তি, যে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা হারানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ধস্তাধস্তি, অনুনয় আর ওয়াসেমের আছড়ে পড়ে কান্নার পর, অবশেষে বহু কষ্টে তাকে তৃষ্ণার কাছে আনা হয়েছে।
আইসিইউর ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকানোর পর ওয়াসেমের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। যে মানুষটা একটু আগেও দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম করছিল, তার দুটো পা এখন আর শরীরের ভার নিতে পারছে না। মেশিনের একটানা 'বিপ বিপ' শব্দের ভেতর দিয়ে সে যখন সামনের শুভ্র বিছানাটার দিকে তাকাচ্ছে, তার চোখের দৃষ্টি পলকহীন হয়ে যাচ্ছে। ওয়াসেম টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে শয্যাটির দিকে। তার হাঁটু দুটো ভেঙে আসছে। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, উদ্ধত, অহংকারী মানুষটি আজ ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। সে তৃষ্ণার পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। এই কম্পন কোনো শীতের কারণে নয়, এটি এক তীব্র ভয়ের, এক সীমাহীন রিক্ততার আর এক ভয়াবহ অপরাধবোধের। শরীরের শিরা-উপশিরা দিয়ে রক্তের বদলে এক হিমেল আতঙ্ক বয়ে যাচ্ছে।
সামনের বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই সে জীবিত নাকি মৃত। তৃষ্ণার জ্ঞান নেই। সে এক অন্তহীন, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে তলিয়ে গেছে, যেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা হয়তো শুধু স্বয়ং স্রষ্টারও আছে। শুনশান কক্ষটিতে শুধু লাইফ সাপোর্টের মনিটরের সবুজ রেখাগুলো জানান দিচ্ছে মেয়েটার হৃদপিণ্ড এখনো ধুকপুক করছে। ওর সারা শরীরে ব্যান্ডেজ মোড়ানো। যে মুখটার দিকে তাকালে একসময় ওয়াসেমের পুরো পৃথিবী থমকে যেত, তা আজ চেনার কোনো উপায় নেই। অসংখ্য ক্ষত, আঘাত আর সাদা ব্যান্ডেজের আস্তরণে ঢাকা পড়ে গেছে তৃষ্ণার অস্তিত্ব।
ওয়াসেম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। তার বুক চিরে বেরিয়ে আসছে এক মর্মান্তিক হাহাকার। সে তৃষ্ণার পায়ের কাছে মুখ গুঁজে অবলা প্রাণীর মতো ফোঁপাচ্ছে। এই রোদন কোনো সাধারণ মানুষের নয়। এ ঠিক এক আহত, মৃত্যুপথযাত্রী বন্য প্রাণীর শেষ আর্তনাদ। তার বুকফাটা আওয়াজ কেবিনের চার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে এক বীভৎস প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করছে। ওয়াসেম ওর দুই পায়ে চুম্বন করছে। যে তৃষ্ণাকে সে অবহেলা করেছে, যাকে সে নিদারুণ আঘাত দিয়ে এই মৃত্যুশয্যায় ঠেলে দিয়েছে, আজ তারই নিষ্প্রাণ, ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা দুটোতে সে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। অশ্রুধারায় ধুইয়ে দিচ্ছে তৃষ্ণার পা।
তবে আজ একটা ভয়ংকর তফাত রয়েছে। ওয়াসেমের এই কান্নার ধরন সাধারণ কোনো বিলাপে আবদ্ধ নেই। চোখের জলের একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকে, দুঃখের একটা নির্দিষ্ট পরিমাপ থাকে, কিন্তু ওয়াসেম আজ সমস্ত গণ্ডি পার করে এমন এক জগতে চলে গেছে যেখানে শুধুই যন্ত্রণা আর হাহাকার রাজত্ব করে। ওয়াসেমের চোখ দিয়ে পানির বদলে রক্ত ঝরছে। এতটা কেঁদেছে সে! তার ভেতরের অনুশোচনার আগুন এতটাই তীব্র যে তা শুধু তার আত্মাকেই পোড়াচ্ছে না, শরীরের প্রতিটি কোষকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। অতিরিক্ত কান্নায়, সীমাহীন যন্ত্রণায় তার চোখের শিরাগুলো ছিঁড়ে গেছে। সেখান দিয়ে এখন গড়িয়ে পড়ছে টকটকে লাল রক্ত। হ্যাঁ, ওয়াসেম আজ রক্তাশ্রু ঝরাচ্ছে। অশ্রুর বদলে তার গাল বেয়ে নামছে রক্তের ধারা, যা তার অনুশোচনার, কৃতকর্মের এক জ্বলন্ত আর অভিশপ্ত প্রমাণ। রক্তের ফোঁটাগুলো টপটপ করে ঝরে পড়ছে তৃষ্ণার পায়ের সাদা ব্যান্ডেজের ওপর, আর শুভ্র কাপড়টা শুষে নিচ্ছে লালচে আভা।
কী ভয়ংকর এই পরিস্থিতি! ওয়াসেম আর আগের মানুষটি নেই। তার সমস্ত অহংকার, দম্ভ ও পরিচয় আজ এই হাসপাতালের মেঝেতে তৃষ্ণার পায়ের কাছে ধুলোয় মিশে গেছে। সে নিঃস্ব হয়ে গেছে, একেবারেই নিঃস্ব। তার অস্তিত্বের আর কোনো মূল্য অবশিষ্ট নেই। রিক্ত বুকের ভেতর থেকে একটি ভাঙা, বিকৃত স্বর বারবার বেরিয়ে আসছে। এই পরিস্থিতি এতটাই মর্মান্তিক, ওয়াসেমের আর্তচিৎকার শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বুক ফাটিয়ে কাঁদত। একসময়ের প্রতাপশালী একটা মানুষ আজ কীভাবে একটি মেয়ের পায়ের কাছে পড়ে ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে, তা দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে এই ব্যক্তিই ওয়াসেম।
ওয়াসেমের চোখ দিয়ে অঝোরে রক্ত পড়ছে, গাল বেয়ে পড়া লাল ধারা গলার কাছে এসে জামার কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে তার দুই হাত দিয়ে তৃষ্ণার বরফজমাট, নিথর পা দুটো জড়িয়ে ধরে আছে। গলা থেকে কথা বেরোচ্ছে না, মনে হচ্ছে কেউ তার কণ্ঠনালী শক্ত করে চেপে ধরেছে। তবুও সে রুদ্ধ কণ্ঠেই প্রলাপ বকে যাচ্ছে। সে শুধু বলছে, "তৃষ্ণা... তৃষ্ণা... একটাবার চোখ খোল... প্লিজ তৃষ্ণা..."
গলাটা ডুকরে উঠছে। বুকটা এমনভাবে ওঠানামা করছে, মনে হচ্ছে এখনই পাঁজর ভেঙে হৃৎপিণ্ডটা বাইরে বেরিয়ে আসবে। "তৃষ্ণা... চোখ খোল... আমার পাপের শাস্তি এতটা যন্ত্রণাদায়ক দিস না... আমার সাথে কথা বল..."
ওয়াসেম তৃষ্ণার পায়ের কাছে মাথা ঠুকছে। "আমি জানি আমি পাপী। আমি জানি তোর এই অবস্থার জন্য শুধু আমি, আমি একাই দায়ী। কিন্তু তুই তো এমন পাষাণ ছিলি না তৃষ্ণা! তুই তো আমাকে এভাবে শাস্তি দিতে পারিস না! তুই আমাকে গালাগাল কর, আমাকে মার, আমাকে ধ্বংস করে দে... কিন্তু এভাবে চুপ করে থাকিস না। তোর এই স্তব্ধতা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমি আমার সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজি আছি তৃষ্ণা, তুই যা বলবি আমি তাই করব... শুধু একবার... শুধু একটাবার চোখ মেলে তাকা আমার দিকে।"
ওয়াসেমের রক্তের দাগে তৃষ্ণার পায়ের ব্যান্ডেজ ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। রক্তের এই দাগ বস্তুত ওয়াসেমের ভেতরের নরক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। কেবিনের শান্ত পরিবেশে ওয়াসেমের ফোঁস ফোঁস করে কান্নার শব্দ আর মেশিনের আওয়াজ একাকার হয়ে এক অতিপ্রাকৃত, ভয়াবহ পরিমণ্ডল তৈরি করেছে। সে তৃষ্ণার অসাড় হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরছে। হাতটা বরফের মতো হিম। এই হিমেল স্পর্শ ওয়াসেমের আত্মাকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সে হাতটায় বারবার চুমু খাচ্ছে, চোখের রক্তে ভিজিয়ে দিচ্ছে তৃষ্ণার আঙুলগুলো।
"তুই ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই তৃষ্ণা," ওয়াসেমের গলা দিয়ে ঠিক রক্তের দলা বেরিয়ে আসছে, "তুই চলে গেলে আমি যে জ্যান্ত লাশ হয়ে যাব। ফিরে আয় তৃষ্ণা... আমার জন্য না হোক, অন্তত আমাকে আমার পাপের শাস্তি দেওয়ার জন্য হলেও ফিরে আয়। একবার উঠে দাঁড়িয়ে বল যে তুই আমাকে ঘৃণা করিস। আমি তোর তাচ্ছিল্যটুকু নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। কিন্তু এভাবে আমাকে একা ফেলে যাস না... আমাকে এই নরকের আগুনে একা পুড়তে দিস না।"
ওয়াসেমের অস্তিত্ব এখন আর এই জাগতিক পৃথিবীতে নেই। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার সত্তা, তার প্রাণ, সবকিছু সম্মুখের শয্যায় শুয়ে থাকা ব্যান্ডেজে মোড়ানো মানুষটার সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। সে শুধু জানে, তৃষ্ণা চোখ না খুললে এই মেঝেতেই নিজের মাথা ঠুকে প্রাণ দিয়ে দেবে। সে অবিরাম কাঁদছে, অবলা প্রাণীর মতো ফোঁপাচ্ছে। তার রক্তমাখা চোখ দুটো দিয়ে অনবরত লাল ধারা নামছে, আর গলার শিরাগুলো ফুলে উঠছে আর্তনাদের চোটে।
"তৃষ্ণা... তৃষ্ণা... কথা বল আমার সাথে... চোখ খোল... আমার পাপের শাস্তি এতটা যন্ত্রণাদায়ক দিস না তৃষ্ণা..."
ওয়াসেমের এই বুক চিরে আসা আর্তনাদ অনন্তকাল ধরে কেবিনের চার দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। নিয়তি নিজেও একপাশে দাঁড়িয়ে এই রিক্ত, ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানুষটার করুণ পরিণতি দেখে স্তব্ধ হয়ে আছে। ওয়াসেম অনবরত প্রলাপ বকছে, আর তার চোখের রক্তে তৃষ্ণার পায়ের কাছে তৈরি হচ্ছে এক ছোট্ট রক্তের নদী। সে কাঁদছে, শুধু কাঁদছে, এক অন্তহীন, রক্তক্ষয়ী কান্নায় সে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।