{
সতর্কীকরণ | Content Warning
এই গল্পে অশালীন ভাষা ও গালাগালির ব্যবহার রয়েছে, যা সকল পাঠকের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।পাঠকদের নিজ বিবেচনায় পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।}
তৃষ্ণার জ্ঞান ফিরেছে বেশ কয়েক ঘণ্টা হলো। কিন্তু ফিরে আসাটা কোনো স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসেনি। এ এক অনন্ত যন্ত্রণাগারের টিকিট। তার সারা শরীর নিখুঁতভাবে সাদা ব্যান্ডেজে আষ্টেপৃষ্ঠে মোড়ানো। মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই, যেখানে ক্ষতের কালচে দাগ অথবা সেলাইয়ের সুতো পড়েনি। সে এখন আর রক্তমাংসের নারী নয়, বরং সাদা কাপড়ে মোড়ানো এক জীবন্ত মমি, যার ভেতরে নিছক একটা ভাঙা হৃদয় ধুকপুক করছে। শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের খাঁচাটা এমনভাবে ভেঙে আসতে চাইছে, মনে হচ্ছে কেউ একটা আস্ত পাহাড় চাপা দিয়ে রেখেছে পাঁজরের ওপর। প্রতিটি শ্বাসের সাথে মনে হয় হাজারটা সুঁচ কেউ একবারে বিঁধিয়ে দিচ্ছে ফুসফুসে। গত আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে দুর্বল শরীরের ওপর দিয়ে যে প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে গেছে, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা অকল্পনীয়। অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, জরুরি ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশেষ সার্জন টিম উড়িয়ে আনতে হয়েছিল। তারা একটানা পনেরো ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই করে মেয়েটার ধুকপুক করা প্রাণটা কোনোমতে আটকে রেখেছে।
কিন্তু শারীরিক বীভৎস যন্ত্রণার চেয়েও তৃষ্ণার ভেতরের ক্ষতটা আজ অনেক বেশি মর্মান্তিক, অনেক বেশি দগদগে। চেতনানাশকের ভারী ঘোর কেটে যাওয়ার পর থেকেই মস্তিষ্কে অভিশপ্ত কালরাত্রির স্মৃতিগুলো দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে ফিরে আসছে। পৈশাচিক উল্লাস, নোংরা হাতের রুক্ষ স্পর্শ, নিজের অসহায়, আকাশ-ফাটানো আর্তনাদ, সবকিছু মিলে তাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। বেঁচে থাকাটা তার কাছে এখন স্রষ্টার দেওয়া সবচেয়ে বড় অভিশাপ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেন সে মরে গেল না? কেন অতীত রাতেই শ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল না? কেন কলঙ্কিত, ছিন্নভিন্ন শরীরটা নিয়ে তাকে আবার নিষ্ঠুর পৃথিবীর আলো দেখতে হলো?
বিছানার ঠিক পাশেই একটা হাতলওয়ালা কেদারায় বসে আছেন সিতুজা। গত দিনের বিনিদ্র রজনী আর একটানা কান্নায় চোখের জল পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। চোখের কোল গর্তে ঢুকে গেছে, মুখের চামড়ায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বয়সের বলিরেখা। এখন তার চোখ দিয়ে আর পানি পড়ছে না, শুধু ভেতর থেকে এক বোবা, শুষ্ক কান্না গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে। তিনি তৃষ্ণার পট্টি মোড়ানো কপালের একপাশে, যেখানে একটুখানি জায়গা খোলা আছে, সেখানে আলতো করে, অগাধ মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আর থেকে থেকে ডুকরে উঠছেন।
তৃষ্ণা উনার বুকের কাছে মুখ গুঁজে একটানা প্রলাপ বকে চলেছে। তার গলা দিয়ে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ এক একটা শাণিত ফলার টুকরো, যা সিতুজার কলিজা নির্দয়ভাবে কেটে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে।
তৃষ্ণা বারবার বলছে,
"আমি কেন বেঁচে আছি মা? বলো না, আমাকে কেন বাঁচালে তোমরা? আমার তো মরে যাওয়ার কথা ছিল... অতীত রাতেই তো আমার সব শেষ হয়ে গেছে মা। নোংরা, অপবিত্র শরীরটা নিয়ে আমি কী করব? আমি তো আর আগের মতো নেই। আমাকে কেন মরতে দিলে না তোমরা? কেন আমাকে জাহান্নামে আবার ফিরিয়ে আনলে?"
তৃষ্ণার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে ভয়ে, যন্ত্রণায় আর নিজের প্রতি তীব্র ঘেন্নায় নিজের ভেতরেই গুটিয়ে যাচ্ছে বারবার।
ইব্রাহিম সাহেব কেবিনের এক কোণে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন পাথরের মূর্তির মতো। এক রাতের মধ্যে হাসিখুশি, রাশভারী এই মানুষটার বয়স পনেরো বছর বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। চোখের নিচে গাঢ় কালি, উসকোখুসকো চুল, ইস্ত্রি করা পোশাকের বোতাম খোলা, সব মিলিয়ে তিনি এক পরাজিত সৈনিক। মেয়ের বীভৎস পরিণতি কোনো বাবার পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বুকের ভেতরটা রাগে, দুঃখে আর তীব্র অসহায়ত্বে ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে।
নিজের মেয়ে নয়, কিন্তু মেয়ে তো তৃষ্ণা, তো তাঁর মেয়ে। তিনি চাইলেও মেয়ের কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন না, কারণ মনে হচ্ছে তিনি একজন সম্পূর্ণ ব্যর্থ বাবা, যে বুক দিয়ে কলিজার টুকরোকে রক্ষা করতে পারেনি।
ঠিক এমন সময় কক্ষের ভারী দরজাটা মৃদু শব্দ করে খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করে তৌসির আর ইয়াদ। তাদের দুজনের অবস্থাও ভীষণ বিধ্বস্ত। সবকিছুর শারীরিক ধকল আর তার চেয়েও বড় তীব্র অপরাধবোধে দুজনেরই মেরুদণ্ড নুয়ে পড়েছে। চোখের দৃষ্টিতে এক পাহাড় সমান গ্লানি আর অনুশোচনা, যা প্রতিটা পদক্ষেপকে ভারী করে তুলেছে। তারা ধীর পায়ে, প্রায় পা টিপে টিপে তৃষ্ণার বিছানার দিকে এগিয়ে আসে।
পায়ের শব্দ পেয়ে তৃষ্ণা ধীরলয়ে ঘোলাটে, ক্লান্ত চোখ মেলে তাকায়। তৌসির আর ইয়াদকে দেখামাত্রই চোখের দৃষ্টিতে এক তীব্র আতঙ্ক আর বিভীষিকা ফুটে ওঠে। মনে হতে থাকে, এরা কেউ মানুষ নয়, সাক্ষাৎ কোনো শয়তান যারা তার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে।
তৃষ্ণা ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে সিতুজার বুকের আরও ভেতরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। সারা শরীর তীব্র জ্বরের রোগীর মতো থরথর করে কাঁপতে থাকে। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে,
"আ... আমি জানি না... আমি কিচ্ছু জানি না! আমাকে ছেড়ে দাও... আমাকে মেরো না... মা, ওদের যেতে বলো মা! আমি কিচ্ছু মানব না, আমাকে শুধু ছেড়ে দিতে বলো!"
তৃষ্ণার এমন ভীতি আর আতঙ্ক দেখে তৌসির আর ইয়াদের বুকটা মুচড়ে ওঠে। তারা থমকে দাঁড়ায়। নিজেদের বোনের মতো মেয়েটার চোখে নিজেদের জন্য ভয়ংকর আতঙ্ক দেখে তারা জীবন্মৃত হয়ে যায়।
তৌসির চোখের জল আটকে রেখে, ভীষণ স্নেহময় আর ভাঙা গলায় ডাক দেয়,
"তৃষ্ণা... আমার দিকে তাকাও বোন। আমরা তোমার ভাই, আমাদের ভয় পেয়ো না। কেউ তোমার কিচ্ছু করবে না। আমরা আছি তো। শুধু একটা বার বলো তৃষ্ণা... কারা ছিল ওরা? কারা করেছে আমার বোনের এই হাল?"
কথাটা শোনা মাত্রই তৃষ্ণার ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভ, সব কান্না বাঁধভাঙা জলোচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়ে। সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। শারীরিক সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে বুক ফাটিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে আসে মুখ।
চিৎকার করে বলতে থাকে,
"তোমরা আমার কেমন ভাই? বলো! তোমরা কেমন ভাই? তোমরা আসার পর থেকেই তো আমার সাজানো সংসারটা ছারখার হয়ে গেল! তোমরা বিয়ের নাটকের কথা বলেছিলে, তাই না? তোমাদের একটা জেদ, একটা হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য আজ আমার এই অবস্থা! কোনো ভাই কি নিজের বোনের সাথে এমনটা করতে পারে? কেন এলে তোমরা আমার জীবনে? কেন আমাকে নিয়ে নোংরা খেলায় মাতলে? তোমাদের নাটকের বলি কেন আমাকে হতে হলো?"
তৃষ্ণার প্রতিটি অভিযোগ তৌসির আর ইয়াদের বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধতে থাকে। তারা ঘুণাক্ষরেও জানত না সাজানো বিয়ের নাটক এমন এক ভয়ংকর আর বীভৎস রূপ নেবে। আজ মনে হচ্ছে, ওয়াসেম নয়, আসল অপরাধী তারা নিজেরাই।
তৌসির আর স্থির থাকতে পারে না। তার পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে তৃষ্ণার বিছানার পাশে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। দুই হাত জোড় করে ডুকরে কেঁদে ওঠে,
"আমাদের মাফ করে দাও বোন। ভাই হয়ে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে পারিনি আমরা। আমরা সত্যি জানতাম না নাটকের পরিণতি এত ভয়াবহ হবে। আমরা শুধু তোমার ভালো চেয়েছিলাম। আমরা বুঝতে পারিনি পরিস্থিতি এত জঘন্য রূপ নেবে। আমাদের শাস্তি দিও, তুমি যা শাস্তি দেবে আমরা মাথা পেতে নেব। কিন্তু তার আগে শুধু একবার বলো, কারা করেছিল এই কাজ? তাদের নামগুলো শুধু একবার বলো তৃষ্ণা!"
তৃষ্ণা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে, দীর্ঘশ্বাস টানতে টানতে বলে,
"ওরা... ওরা দুজন ছিল... আমি... আমি ওদের মুখ দেখেছি। ওরা বয়সে অনেক ছোট, কলেজ পড়ুয়া ছিল... ওদের বুকে... বুকে কলেজের প্রতীকচিহ্ন লাগানো ছিল... ওরা হাসছিল... আমাকে বিপন্ন অবস্থায় দেখে ওরা খুব হাসছিল..."
বলতে বলতেই তৃষ্ণা আবার শিউরে ওঠে, চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায় আতঙ্কে। চোখের সামনে আবার ভেসে ওঠে বীভৎস দুটো মুখ।
এইটুকু সূত্র পেয়েই তৌসির আর ইয়াদ একে অপরের দিকে তাকায়। চোখে এখন শোকের চেয়ে প্রতিহিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। অন্তত একটা পথের দিশা পাওয়া গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া আর প্রতীকচিহ্ন। এখন নরপশুগুলোকে পাতাল থেকে হলেও খুঁজে বের করা কঠিন হবে না। ওদের চামড়া গুটিয়ে নেওয়ার জন্য একটুকরো তথ্যই যথেষ্ট।
তারা আর কোনো প্রশ্ন করে না, কারণ তৃষ্ণার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এখন মোটেও এসব বিভীষিকাময় স্মৃতি মনে করার মতো নয়।
হঠাৎ কক্ষের বাইরের দীর্ঘ বারান্দায় একটা শোরগোল শোনা যায়। ভারী জুতোর শব্দ আর সেবিকাদের ছোটাছুটি। একজন কনিষ্ঠ চিকিৎসক হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে দরজার কাছে দাঁড়ান। চোখেমুখে তীব্র উৎকণ্ঠা।
"স্যার, পাশের কেবিনে আপনার ভাইয়ের অবস্থা খুব খারাপ! ওনার শ্বাসকষ্ট হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে, নাড়ির স্পন্দন দ্রুত নিচে নামছে। প্রাণবায়ুর মাত্রা একষট্টিতে নেমে এসেছে। আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, আপনারা তাড়াতাড়ি আসুন!"
খবরটা শুনেই তৌসির আর ইয়াদ তড়িঘড়ি করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
তৃষ্ণা এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে হাঁপাচ্ছিল। চিকিৎসকদের দৌড়াদৌড়ি আর তৌসিরদের তাড়াহুড়ো দেখে সে সিতুজার বুক থেকে মাথা তুলে ভীষণ দুর্বল, কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
"উনার... উনার কী হয়েছে?"
সিতুজা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
"ওয়াসেমের অবস্থা ভালো না রে মা। হঠাৎ করে ওর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে, চিকিৎসকেরা দৌড়াদৌড়ি করছে। ছেলেটা মনে হয় আর বাঁচবে না।"
কথাটা শোনা মাত্রই ইব্রাহিম সাহেব রাগে ফেটে পড়েন। এতদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ, মেয়ের এই অবস্থার জন্য ওয়াসেমের প্রতি তীব্র আক্রোশ আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে আসে।
তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,
"যাক! ও মরে যাক! ওর যা ইচ্ছে হোক! ওর জন্যই আজ আমার মেয়ের এই অবস্থা! অমানুষটার মুখ আমি আর দেখতে চাই না। ওর অহংকার, জেদের জন্যই আজ আমার মেয়েটা শেষ হয়ে গেল। নিজের পাপের শাস্তি আজ পাচ্ছে।"
উনার কথাগুলো তৃষ্ণার কানে যায়। সে শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ঘোলাটে চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে সাদা বালিশে।
অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,
"সব আমার কপালের দোষ... আমারই ভাগ্য খারাপ। সব আমারই প্রাপ্য ছিল।"
ঠিক একই মুহূর্তেই হাসপাতালের বারান্দায় একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ হয়, আর পরক্ষণেই কেবিনের দরজাটা সজোরে খুলে যায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসেম। পরনে হাসপাতালের নীল রঙের সাধারণ পোশাক, যা জায়গায় জায়গায় কুঁচকে আছে। বাঁ হাতের রগ থেকে জোর করে ওষুধ চলাচলের সুঁই টেনে খুলে ফেলায় সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে, তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সাদা মেঝেতে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
তার চুল উসকোখুসকো, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল আর মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে। তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্য জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে, বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা বাতাসের অভাবে নীল হয়ে আসছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি শুধু তৃষ্ণাকে খুঁজছে।
তৃষ্ণাকে বিছানায় জীবিত দেখতে পেয়ে ওয়াসেমের চোখে এক অভাবনীয় ঘোর নেমে আসে। তার ধড়ে প্রাণ ফেরে। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না, দুর্বল শরীরে পাগলের মতো টলতে টলতে ছুটে আসে সে তৃষ্ণার বিছানার দিকে।
তাকে বিকারগ্রস্ত অবস্থায় নিজের দিকে এগোতে দেখে তৃষ্ণার ভেতরে এক তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। চোখের সামনে আবার ভেসে ওঠে ভয়ংকর রাতের স্মৃতি, অমানবিক স্পর্শগুলোর কথা। কোনো পুরুষের উপস্থিতি, এমনকি সেটা ওয়াসেম হলেও, তার কাছে এখন বিভীষিকা।
আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে, গলা দিয়ে অমানুষিক স্বর বের হয়,
"মা! মা! উনাকে বলুন আমার কাছে না আসতে! উনাকে যেতে বলুন... আমি মরে যাব... আমাকে বাঁচাও মা! ওনাকে বের করে দাও!"
কিন্তু ওয়াসেম এখন কোনো বাস্তবতায় নেই। কারো বাধা শোনে না সে, কারো কথা কানে যায় না তার। সোজা এসে তৃষ্ণার পট্টি মোড়ানো, ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে নিজের দুই হাতে শক্ত করে জাপটে ধরে।
আলিঙ্গন এতই শক্ত যে তৃষ্ণার সেলাই করা জায়গাগুলোতে তীব্র টান পড়ে, রক্ত চুঁইয়ে সাদা কাপড় লাল হতে শুরু করে। ওয়াসেম তৃষ্ণার কপালে, গালে পাগলের মতো চুমু খেতে থাকে আর কলিজা ফাটিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে,
"তুই বেঁচে আছিস! তুই বেঁচে আছিস! এটাই আমার জন্য সব তৃষ্ণা! আমার আর কিচ্ছু চাই না। তৃষ্ণা... বিশ্বাস কর, আমি বিয়ে করিনি! আমি কাউকে বিয়ে করিনি! আমি শুধু তোর... তুই ঠিক হয়ে যাবি দেখিস, তুই একদম ঠিক হয়ে যাবি। আমি তোকে কিচ্ছু হতে দেব না!"
ওয়াসেমের শক্ত আলিঙ্গনে তৃষ্ণা ব্যথায় আর যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায়। তার শ্বাস আটকে আসতে থাকে। ইয়াদ আর ইব্রাহিম সাহেব ছুটে এসে ওয়াসেমকে টেনে সরানোর চেষ্টা করেন।
"সর তুই! ছাড় ওকে! তুই নিজেও তো অসুস্থ, কী করছিস এসব? মেয়েটাকে মেরে ফেলবি নাকি?"
ইব্রাহিম সাহেব গর্জে ওঠেন।
কিন্তু ওয়াসেমের গায়ে এখনও অনেক জোর। সে ছিটকে গিয়ে তৃষ্ণার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়ে। তৃষ্ণার পা দুটো নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। চোখের জলে তৃষ্ণার পায়ের ব্যান্ডেজ ভিজে যেতে থাকে।
"আমি শুধু ভেবেছিলাম... ভেবেছিলাম সব একসাথে বলে সব সংশয় দূর করব... আমি বুঝিনি এরকম কিছু হবে! আমি সত্যি বুঝিনি তৃষ্ণা! আমাকে একটা সুযোগ দে। আমি আর কোনোদিন এমন করব না। তোকে কখনো অবহেলা করব না। তুই সুস্থ হয়ে গেলে আমরা অনেক দূরে চলে যাব... যেখানে কেউ থাকবে না। শুধু তুই আর আমি। আমাদের একটা সুন্দর সংসার হবে তৃষ্ণা... আমাদের একটা সংসার হবে!"
ওয়াসেমের গলা দিয়ে অবিরত প্রলাপের মতো কথাগুলো বেরোতে থাকে। প্রতিটি কথায় মিশে আছে তীব্র গ্লানি, অনুশোচনা আর চিরতরে হারিয়ে ফেলার ভয়।
তৃষ্ণা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ওয়াসেমের এই প্রলাপ শুনছিল। চোখে এখন আর কোনো জল নেই, কোনো আতঙ্ক নেই। আছে শুধু এক বরফজমাট, প্রাণহীন শূন্যতা।
সে ধীরে ধীরে, অনেক কষ্টে নিজের পা দুটো ওয়াসেমের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। তারপর তার দিকে তাকিয়ে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। এমন হাসিতে কোনো প্রাণ নেই, আছে শুধু বিষ।
তৃষ্ণার কণ্ঠস্বর এখন একদম শান্ত, কিন্তু তলোয়ারের চেয়েও ধারালো,
"সংসার? আপনি আমার সাথে সংসার করবেন?"
ওয়াসেম চমকে মুখ তুলে তাকায়। তৃষ্ণার চোখের নিষ্প্রাণ দৃষ্টি দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে।
তৃষ্ণা দাঁতে দাঁত চেপে বলতে থাকে,
"একজন ধর্ষিতার সাথে সংসার করবেন আপনি? এই তো এতদিন আমাকে অযোগ্য কুকুর বলে গালি দিতেন। পদে পদে মনে করিয়ে দিতেন আমি কতটা মূল্যহীন, কতটা নিচু। আপনার মর্যাদার সাথে আমি যাই না, আমি একটা তুচ্ছ মেয়ে। আর আজ? আজ বলবেন, তোর মতো একটা ধর্ষিতা, নোংরা মেয়ের সাথে আবার সংসার হয় কী করে? তাই না? আজ আপনার এত উঁচু মর্যাদা কোথায় গেল?"
"তৃষ্ণা! এসব কী বলছিস তুই? দয়া করে চুপ কর!"
ওয়াসেম ডুকরে ওঠে, দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে।
"চুপ করব? কেন চুপ করব?"
তৃষ্ণা হিসহিস করে ওঠে। চোখ দিয়ে এবার আগুন ঝরতে থাকে।
"আমি আপনার মুখ দেখতে চাই না ওয়াসেম! আপনি আমায় এতদিন ধরে তিল তিল করে যে মানসিক কষ্ট দিয়েছেন, যে অবহেলা আর অপমান করেছেন... তার তুলনায় এই ধর্ষণ, শরীরের ক্ষত, অস্ত্রোপচার কিচ্ছু না! বিশ্বাস করুন, কিচ্ছু না! বাইরের লোকেরা আমার শরীরটা ছিঁড়ে খেয়েছে এক রাতে, কিন্তু আপনি? আপনি তো দিনের পর দিন আমার আত্মসম্মান, ভালোবাসা, অস্তিত্বকে ধর্ষণ করেছেন। শরীরটা আজ নষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মাটাকে আপনি অনেক আগেই খুন করে দিয়েছেন।"
তৃষ্ণা একটু থামে, জোরে একটা শ্বাস নেয়। যন্ত্রণায় মুখটা কুঁচকে যায়, কিন্তু দমে যায় না।
ভীষণ ধীর লয়ে, প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
"আমি আপনার সাথে আর থাকতে চাই না। এটা আমার কোনো রাগ অথবা অভিমান নয়, আমি কোনো মোহ কিংবা আবেগ থেকে এই কথা বলছি না। বলছি বুকভরা ঘৃণা থেকে। আপনার দেওয়া অবহেলা আর তাচ্ছিল্য আজ আমার ভেতরে শুধুই ঘৃণায় রূপ নিয়েছে... আজ নয়, অনেক আগেই। আপনি এখন আমার কাছে একটা মৃত মানুষ ছাড়া আর কিচ্ছু না। মৃত মানুষের সাথে কেউ সংসার করে না ওয়াসেম।"
কথাগুলো বলে তৃষ্ণা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। চোখ যায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তৌসির আর ইয়াদের দিকে।
সে ভীষণ ক্লান্ত স্বরে, নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বলে,
"তোমরা উনাকে নিয়ে যাও। আমি আর উনার এই সস্তা নাটক সহ্য করতে পারছি না। হয় আমায় মেরে ফেলো, নয়তো আমাকে একটু একা থাকতে দাও। দয়া করে, উনাকে বের করে দাও এখান থেকে। ওনার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? ওনাকে মরতে দাও!"
তৃষ্ণার অমোঘ প্রত্যাখ্যান ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা বিষাক্ত তীরের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। মনে হতে থাকে, শক্ত মেঝেটা যদি এখনই ফেটে দুভাগ হয়ে যেত, তবে ভেতরে ঢুকে নিজেকে চিরকালের জন্য লুকিয়ে ফেলতে পারত।
তৌসির আর ইয়াদ এগিয়ে এসে ওয়াসেমের দুই হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই টেনে তুলতে বাধ্য করে। ওয়াসেম কোনো বাধা দেয় না। শরীরের সব শক্তি নিমিষেই কেউ শুষে নিয়েছে। আজ নিজের অপরাধবোধে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, রিক্ত।
তাকে যখন টেনে হিঁচড়ে কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, চোখের সামনে শুধুই ভেসে উঠছে তৃষ্ণার সাথে করা সব অন্যায়, সব অবহেলা। সেদিনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, তৃষ্ণার চোখের জলকে তাচ্ছিল্য করা, ভালোবাসাকে পায়ের নিচে পিষে মারা, সবকিছু আজ নিজের দিকেই উল্টো আঘাত হয়ে ফিরে এসেছে।
কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আজ দুজনের মাঝখানে এমন এক দুর্ভেদ্য কাঁচের দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে, যা সে নিজেই নিজের হাতে তিল তিল করে গেঁথেছে। দেয়াল ভাঙার ক্ষমতা আজ আর কারো নেই।
কক্ষের দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে যায়।
তৃষ্ণা শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তৃষ্ণার শরীরটা হয়তো বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের মানুষটা, ওয়াসেমের চিরচেনা তৃষ্ণা আজ চিরকালের জন্য মরে গেছে।
{ মাফিয়া টাইপ গল্প একটা নতুন পেজে পড়তে পারেন : https://www.facebook.com/share/p/1ELUj7GMu8/}
ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা বাজে। হাসপাতালের লম্বা করিডোরগুলোতে ওষুধের উৎকট গন্ধ আর মানুষের চাপা আর্তনাদ মিলেমিশে এক গুমোট পরিবেশ তৈরি করেছে। চারপাশের সাদা দেয়ালগুলো না-দেখা যন্ত্রণার সাক্ষী হয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। অন্য একটি ভিআইপি কেবিনের ভেতর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে ইয়াদ আর তৌসির। তাদের দুজনের শরীর আর মনে রাজ্যের ক্লান্তি। এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো শারীরিক অথবা মানসিক কোনো অবস্থাই তাদের কারোর নেই। গত দুটো দিন তাদের ওপর দিয়ে এক প্রলয়ংকারী ঝড় বয়ে গেছে, যার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অনেকগুলো চেনা মানুষের স্বাভাবিক জীবন।
কেবিনের ভেতরের নিঝুম পরিবেশ এতটাই ভারী, সুই পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। এসির একটানা গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। তৌসিরের চোখদুটো রক্তবর্ণ, মুখটা ফ্যাকাশে আর চোয়ালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বহু যুগ ধরে সে ঘুমায়নি। দৃষ্টিহীন এক জোড়া চোখ নিয়ে সে শূন্যে তাকিয়ে থাকে, আর তার মস্তিষ্কের ভেতর চলতে থাকে হাজারো এলোমেলো চিন্তার ঝড়।
গত দুদিন ধরে নাজহা আস্ত এক যাতনাগার ভোগ করছে। তৌসিরের কোনো খোঁজ নেই, কোনো সাড়াশব্দ নেই। পাগলের মতো একের পর এক কল করে গেছে সে, কিন্তু তৌসির একবারও ফোন ধরেনি। বুক ফেটে কান্না আসছিল তার, কিন্তু নিজের এই দিশেহারা অবস্থা, এই অন্তর্দাহ কাউকে দেখাতেও পারছে না, কাউকে কিছু খুলেও বলতে পারছে না। শুধু একটা ছোট্ট মেসেজ এসেছিল তৌসিরের নম্বর থেকে, আমি বেঁচে আছি, চিন্তা করিস না।
এই একটিমাত্র লাইনে কি কোনো স্ত্রীর মন শান্ত হয়? নাজহা তো মনে করছিল তৌসির বোধহয় নিজের কথা মতো চিরতরে কোথাও নাই হয়ে গেছে! সে প্রায় পাগলপ্রায় হয়ে উঠছে। তার বুকের ভেতরটা প্রতি মুহূর্তে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। এর মধ্যে তিনটি ছোট ছোট বাচ্চা মিলে তার মাথা পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। চার মাস বয়সী তিনটি শিশু, যাদের সারাক্ষণের মনোযোগ প্রয়োজন, তাদের একা হাতে সামলাতে গিয়ে নাজহার নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসছে। রাতের পর রাত ঘুম নেই, চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত। তার মনে হচ্ছে সে এক অথৈ সাগরে ডুবে যাচ্ছে, যার কোনো কূলকিনারা নেই।
ঠিক এমন একটা দমবন্ধ করা মুহূর্তেই হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তৌসিরের নামটা ভাসতে দেখেই নাজহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। মুহূর্তের জন্য তার হাত-পা অবশ হয়ে আসে, নিশ্বাস আটকে যায়। তিন-চার বার রিং হওয়ার পর কাঁপাকাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করে নাজহা।
ভিডিও কল। কিন্তু নাজহা নিজের মুখটা ক্যামেরার সামনে আনে না। নিজের এই বিধ্বস্ত চেহারা, কান্নায় ফুলে ওঠা চোখ দুটো সে তৌসিরকে দেখাতে চায় না। অভিমান, কষ্ট আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটা মিশ্র অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে। সে অতিযত্নে ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে দেয় বিছানায় খেলতে থাকা বাচ্চাদের দিকে। গলাটা স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে, একটু খাদে নামানো স্বরে সে বলে,
"নিচে ছিলাম, তাই ফোন ধরতে পারিনি। তা আজ হঠাৎ কী মনে করে ফোন?"
ফোনের ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না। তৌসির একদম নিশ্চুপ। সে একদৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেখানে তার তিন টুকরো জান অবুঝের মতো খেলছে। কিন্তু তৌসিরের দৃষ্টিতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো প্রাণ নেই। তার মনটা আজ আর তার নিজের কাছে নেই, কোনো এক ভয়ানক দুঃসংবাদের ভারে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে, একেবারে কবর হয়ে গেছে। ক্যামেরার লেন্স বাচ্চাদের দিকে থাকলেও নাজহার কান সজাগ হয়ে থাকে ওপাশের মানুষটার নিঃশ্বাসের শব্দের দিকে।
তৌসিরের ছন্নছাড়া আর বিষণ্ণ অবস্থা স্ক্রিনের এক কোণায় দেখতে পেয়ে নাজহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। অভিমান আর অভিযোগের দেয়ালটা নিমিষেই ধসে পড়ে। সে বুঝতে পারে, ভয়ংকর কিছু একটা ঘটেছে। তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই বদলে যায়। কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় সে জিজ্ঞেস করে,
"কিছু হয়েছে তৌসির?"
তৌসির একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। শ্বাসে মিশে আছে একরাশ হতাশা, ক্লান্তি আর না-বলা যন্ত্রণার ভার। সে ভারী গলায় বলে ওঠে,
"কিছু না হওয়ার আর বাকি নাই, তোর মুখ দেখা।"
তৌসিরের কথায় একটা হুকুম আছে, আবার আছে এক তীব্র নির্ভরতার আর্জি। একটা মানুষের চূড়ান্ত অসহায়ত্বের প্রকাশ ছোট্ট বাক্যটি। নাজহা আর দ্বিরুক্তি না করে ধীরে ধীরে ক্যামেরাটা নিজের দিকে ঘুরায়। স্ক্রিনে নাজহার মুখটা ভেসে উঠতেই তৌসির শ্রান্ত চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কতক্ষণ তারা এভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার কোনো হিসেব নেই। দুজনের মাঝখানে শুধু এক ভারী শব্দহীনতা। কেউ কোনো কথা বলছে না, কিন্তু তাদের চোখ হাজারো কথা বলে যাচ্ছে।
নাজহার উসকোখুসকো চুল, ক্লান্ত মুখশ্রী আর উদ্বিগ্ন চোখ দেখে তৌসিরের ভেতরের পাথরটা একটু একটু করে গলতে শুরু করে।
অনেকক্ষণ পর জমাট বাঁধা নিশ্চুপ পরিবেশ ভেঙে নাজহা পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
"কিছু হয়েছে?"
তৌসিরের চোখ দুটো হঠাৎ করেই আরও ঘোলাটে হয়ে আসে। বুকের ভেতর জমে থাকা অসীম কষ্টকে সে আর আটকে রাখতে পারছে না। সে ব্যথাতুর গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলে,
"কেউ জানে না, এই বিষয় তোরে প্রথম বললাম। কেউ যাতে না জানে, তৃষ্ণারে ধর্ষণ করা হইছে।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই নাজহার মনে হয় তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। পুরো পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। তার হাত থেকে খসে পড়ে মোবাইলটা। মেঝেতে পড়ে যাওয়া স্ক্রিনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। কী শুনল সে! কানের ভেতর একটা তীক্ষ্ণ শব্দ একটানা বেজে চলেছে।
তৃষ্ণা আর ওয়াসেমের সম্পর্কের কথা নাজহা সবই জানে, কারণ তৌসিরই তাকে আগে সব খুলে বলেছিল। ওয়াসেম নামের মানুষটাকে নাজহা নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ঘৃণা করে। কারণ এই ওয়াসেমই তার চাচার খুনি। ওয়াসেমের প্রতি তার মনে আছে শুধুই ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুন। কিন্তু তৃষ্ণা? তৃষ্ণা তো কোনো অপরাধ করেনি! সে তো সম্পূর্ণ নির্দোষ একটা মেয়ে। একটা মেয়ের সাথে এত বড়, এত জঘন্য একটা ঘটনা ঘটে গেল কীভাবে?
মেঝে থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নেয় নাজহা। তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না। অতিকষ্টে ঢোক গিলে সে শুধু বলতে পারে,
"কীভাবে? এই এত বড় ঘটনা ঘটে গেল কীভাবে?"
তৌসির আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ধীর, ভগ্ন কণ্ঠে নাজহাকে সব খুলে বলতে শুরু করে। ঘটনার প্রতিটি শব্দ নাজহার বুকে একেকটা ধারালো ছুরির মতো বিদ্ধ হতে থাকে। সব শুনে নাজহার দুচোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়াচ্ছে। এই করুণ, বীভৎস অবস্থার কথা কোনো পাষাণ হৃদয়ের মানুষ শুনলেও তার চোখে জল আসবে, আর নাজহা তো একজন নারী। ওয়াসেমকে সে যতই ঘৃণা করুক না কেন, তৃষ্ণার নির্মম পরিণতির কথা ভেবে তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। একটা নিষ্পাপ মেয়ের পুরো জীবনটা এভাবে তছনছ হয়ে গেল! সে কোনোভাবেই নিজের কান্না চেপে রাখতে পারছে না। ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে।
নাজহাকে এভাবে ডুকরে কাঁদতে দেখে তৌসিরের নিজের ভেতরের কষ্টটা আরও বেড়ে যায়। সে নাজহাকে শান্ত করার চেষ্টায় খুব অনুচ্চ অথচ দৃঢ় গলায় বলে,
"কাঁদিস না, ওর জন্য দোয়া কর। আর কেঁদে নিজের মাথাট্যথা ধরাইস না, আমিও বাড়িতে নাই। একা হাতে বাচ্চাদের সামলাতে গিয়ে তুই যদি অসুস্থ হয়ে পড়িস, তবে কী হবে?"
নাজহা ওড়নার আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে,
"আপনি আসবেন কবে?"
এই তীব্র হতাশার মাঝেও, এই নিদারুণ অন্ধকারে ডুবে থাকার পরও তৌসিরের ঠোঁটের কোণে একটা বিবর্ণ, তেতো হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের ভেতরের সমস্ত ভাঙনকে আড়াল করে একটু হালকা চালে বলে,
"কেন? আমার অভাব অনুভব হচ্ছে নাকি?"
নাজহা তৎক্ষণাৎ নিজের আবেগটুকু লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। চোখের পানিটা দ্রুত মুছে নিয়ে সে কিছুটা অভিমানের সুরেই বলে,
"আপনি তেমন কেউ না যার জন্য আমার অনুভব হবে। আপনার মেয়ে আপনাকে ডাকে। ওরা বাবা কে খোঁজে সারারাত। যে বাচ্চাগুলো আপনার বুকে ঘুমাত, তারা এখন আমার বুকে ঘুমায় না। রাত জেগে শুধু এদিক ওদিক খোঁজে। সম্ভব হলে তাড়াতাড়ি চলে আসুন।"
এই কথাগুলো বলেই নাজহা ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে দেয় বিছানার দিকে, আর এক লহমায় হাসপাতালের হিমেল পরিবেশটা উধাও হয়ে যায়। স্ক্রিনের ওপারে ফুটে ওঠে এক ছোট্ট জান্নাত, যেখানে জীবনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ, সবচেয়ে সুন্দর রূপটা খেলা করছে। তিনটে চার মাস বয়সী ফুটফুটে প্রাণ, তিনটে ফুলের মতো মুখ, তিনজনের তিন রকম জাদুকরী পৃথিবী।
এই বয়সটা ভারী আকর্ষণীয় আর মোহময় এ সময়ে শিশুরা মায়ের নিরাপদ কোল পেরিয়ে চারপাশের প্রকাণ্ড চারপাশটাকে নতুন করে চিনতে শেখে। আধো আধো বোল ফোটাতে থাকে, চোখের দৃষ্টিতে জমা হয় হাজারো বিস্ময়, আর সামান্য কথা বলার চেষ্টায় তারা নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
ক্যামেরার লেন্স প্রথমে স্থির হয় তুরাবের ওপর। বিছানার একপাশে আপন মনে শুয়ে আছে সে। বর্তমান মুহূর্তে তার সমস্ত জগৎ সীমাবদ্ধ তার নিজের দুটো হাতের মাঝে। মনে হচ্ছে সে এক মহান আবিষ্কারক, যে এইমাত্র তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যটা উন্মোচন করেছে।
তুরাব তার নিজের দুই হাত চোখের সামনে তুলে ধরেছে, আর বড় বড় চোখ করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে এক তীব্র কৌতূহল, সে বোধহয় ভাবছে জিনিসগুলো কী! এগুলো কোথা থেকে আসে, আর কেনই প্রতিনিয়ত চোখের সামনে এভাবে ভেসে ওঠে! দীর্ঘক্ষণ হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর, সে তার ছোট্ট, তুলতুলে মুঠোটা কোনোমতে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। শুরু হয় অসীম তৃপ্তিতে চোষা। আর চোষার ফাঁকে ফাঁকে তার গলার ভেতর থেকে এক অজানা প্রশান্তির সুর বেরিয়ে আসে,
"আঊ... আঊ..."
মাঝে মাঝে সে হাতটা মুখ থেকে বের করে আবার চোখের সামনে মেলে ধরে। ঘোর তার কিছুতেই কাটে না। নিজের শরীরকে আবিষ্কার করার প্রথম ধাপ তুরাবের কাছে এক অপার আনন্দের উৎস।
তুরাবের পাশেই নাওয়াবের রাজত্ব, তবে তার মনোযোগ নিজের শরীরের দিকে নয়। তার জগৎ আবর্তিত হচ্ছে মাথার ওপর ঝুলতে থাকা রঙিন মিউজিক্যাল খেলনাটাকে ঘিরে। খেলনাটার লাল, নীল, হলুদ রংগুলো তার চোখে এক জাদুকরী ঘোর তৈরি করেছে। বাতাসে খেলনাটা একটু এদিক-সেদিক দুললেই নাওয়াবের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু উত্তেজনায় টানটান হয়ে ওঠে।
সে তার ছোট্ট হাত-পাগুলো শূন্যে অবিরাম ছুঁড়তে থাকে। সে ধরতে চায় রঙিন বস্তুগুলোকে, কিন্তু তার হাত পৌঁছায় না। তবু তার কোনো ক্লান্তি নেই। শূন্যে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়িতেই তার আনন্দের কোনো সীমা নেই। কখনো কখনো, একদমই ভাগ্যক্রমে, তার কোনো একটা হাত খেলনাটার গায়ে আলতো করে লেগে যায়। খেলনাটা দুলে ওঠে, ঝুমঝুম করে একটা মিষ্টি শব্দ হয়।
আর ঠিক এ সময়েই নাওয়াবের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নিজের ক্ষুদ্র জয়ে সে বিশ্বজয়ের আনন্দ পায়, গলা ফাটিয়ে কুকু ডাকা শব্দে হেসে ওঠে। আবিষ্কারের নেশায় সে এতটাই মেতে ওঠে যে উত্তেজনায় তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা গড়িয়ে থুতনি ভিজে যাচ্ছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই।
কিন্তু এদের দুজনের মাঝে তৌশির কাণ্ডকারখানা একদমই আলাদা। তাকে দেখলে মনে হয়, সে ছোট্ট বয়সেই কোনো এক ভাবনায় মগ্ন। সে তুরাবের মতো নিজের হাত নিয়ে ব্যস্ত নয়, আবার নাওয়াবের মতো খেলনার প্রতিও তার কোনো আকর্ষণ নেই। সে তার ছোট্ট, পেলব পা দুটো ওপরের দিকে তুলে বাতাসে অনবরত নাড়াচ্ছে।
তার দৃষ্টি শূন্যে, আর সে তার গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটো গোল করে ভেতর থেকে কিছু একটা আনকোরা শব্দ বের করে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। গত দুদিন ধরেই নাজহা খেয়াল করছে, তৌশি একনাগাড়ে একটাই কাজ করে চলেছে। মনে হচ্ছে, তার ছোট্ট বুকের ভেতর এমন কিছু একটা জমে আছে, যা সে ব্যাকুল হয়ে প্রকাশ করতে চাইছে।
বাকি দুজনের এখনো তেমন কোনো বুলি ফোটেনি তুরাব আর নাওয়াব শব্দের সঙ্গে খেলছে, শব্দ তৈরি করে আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু তৌশি শব্দের মাঝে একটা অর্থ খুঁজে পেতে চায়, সে যোগাযোগ করতে চায় পৃথিবীর সঙ্গে।
তৌসির হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে স্ক্রিনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার নিশ্বাস থমকে আছে। স্ক্রিনে তওশি পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে, ঠোঁট দুটোকে বারবার গোল আর চ্যাপ্টা করে এক অভাবনীয় কসরত চালিয়ে যাচ্ছে। আর তারপর, হঠাৎ করেই, কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা এসে ধরা দেয়।
তৌশির মুখ থেকে আধো আধো, অস্পষ্ট কিন্তু বুক কাঁপিয়ে দেওয়া একটা শব্দ বেরিয়ে আসে,
"ব, ব, বা, বা বা, বা বা..."
মেয়ের মুখের আধো আধো প্রথম শব্দ, 'বাবা' ডাক তৌসিরের কানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো ঐশ্বরিক সঙ্গীতের মতো আছড়ে পড়ে। তার বুকের ভেতরটা এক অনাবিল, অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। উত্তেজনায় আর আবেগে তার নিশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হয়।
গত কয়েকটা দিন ধরে সে যা বীভৎসতা দেখেছে, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট, মৃত্যুভয় আর হাহাকার তার মনের ভেতর এক প্রকাণ্ড কালো পাথরের মতো চেপে বসেছিল, মেয়ের একটা মাত্র ডাকে তা নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে যায়।
ডাকটা কোনো সাধারণ শব্দ নয়, এটা এক মৃতপ্রায় আত্মার জন্য সঞ্জীবনী সুধা। কষ্টদায়ক একটা সময়ে, এত জমাট অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ করে পাওয়া এতখানি খাঁটি আনন্দ সে কোথায় রাখবে, তা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। তার শূন্য, হাহাকার করতে থাকা বুকটা এক লহমায় আনন্দে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীর তাবৎ যন্ত্রণা, তাবৎ ক্ষত এক 'বাবা' ডাকের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ, অর্থহীন।
স্ক্রিনের ওপার থেকে নাজহাও তৌসিরের অব্যক্ত মনের অবস্থাটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। সে জানে, বর্তমান মুহূর্তে তৌসিরের দৃশ্যটা কতটা প্রয়োজন ছিল। সে খুব সাবধানে, ধীরে ধীরে ফোনটা তৌশির একদম মুখের সামনে নিয়ে যায়।
হঠাৎ চোখের সামনে একটা ছোট্ট বাক্সের ভেতর বাবার মুখটা দেখে তৌশি প্রথমে একটু চমকে যায়। সে তার টানাটানা, নীলচে চোখ দুটো বড় বড় করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শিশুমন বোঝার চেষ্টা করে, ছোট্ট বাক্সটার ভেতর তার সবচেয়ে চেনা মানুষটা এলো কী করে!
সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, যাচাই করে নিচ্ছে। আর যখনই তার ছোট্ট মস্তিষ্ক নিশ্চিত হয়, হ্যাঁ, এটাই তার নিজের বাবা, যার চওড়া বুকের ওমে সে প্রতিদিন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, যার গায়ের পরিচিত গন্ধটা তাকে শান্ত করে, সাথে সাথেই তার চেহারার অভিব্যক্তি বদলে যায়।
সে তার ছোট্ট হাত দুটো নেড়ে, চোখমুখ কুঁচকে খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসিতে কোনো খাদ নেই, আছে শুধুই এক বিশুদ্ধ নির্ভরতা আর অনাবিল আনন্দ।
তৌশির হাসির উৎসব পুরো ঘরটাতে একটা আনন্দের ঢেউ তুলে দেয়। ঢেউ গিয়ে লাগে বাকি দুজনের গায়েও। পাশ থেকে তুরাব তার মুখ থেকে লালায় ভেজা মুঠোটা সরিয়ে নিয়ে বোনের হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে "আগু-আগু" সুর তোলে।
আর নাওয়াব, যে এতক্ষণ তার খেলনার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল, সেও খেলনা দেখা ছেড়ে গলা ফাটিয়ে উচ্ছ্বসিত শব্দ ছাড়তে শুরু করে। তারা ঠিক বোঝে কি না বোঝে কেন আনন্দ, তা কে জানে! কিন্তু তিনটি নিষ্পাপ মুখ, তিন রকম কাকডাকা শব্দ, আর পর্দার ওপারে একজন বাবার গলে যাওয়া হৃদয়, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা এক মহাজাগতিক পবিত্রতায় রূপ নেয়।
নিষ্পাপ খিলখিল হাসির শব্দ আর নীলচে চোখের কাজলকালো চাহনির কাছে তৌসিরের মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত শোক, সমস্ত কাঠিন্য আর সমস্ত বিষাদ আজ হার মানতে বাধ্য। একটা হাসির জন্য, একটা ডাক শোনার জন্য সে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেতে পারে, যেকোনো গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করে আবার আলোয় ফিরে আসতে পারে।
কোলাহলমুক্ত হাসপাতালের নির্জন কেবিনে বসে থাকা ক্লান্ত, অবসন্ন তৌসিরের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জল কোনো শোকের নয়, কোনো যন্ত্রণার নয় জল হলো এক বাবার চূড়ান্ত প্রাপ্তির অশ্রু, এক অপার তৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ।
তার মনের অতলে জমে থাকা যত কালো মেঘ ছিল, তা একটা হাসিতেই কেটে গিয়ে ভোরের মিষ্টি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। তৌসির স্ক্রিনের ওপর হাত ছুঁইয়ে দেয়, সে তার সন্তানদের স্পর্শ করতে চাইছে। সে মনে মনে এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে, যাই হয়ে যাক না কেন, যত বাধাই আসুক না কেন, সে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, সে তার ছোট্ট পৃথিবীর কাছে, তার ফুটফুটে ফুলের বাগানের কাছে ফিরে যাবে। কারণ, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্য।