ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্নিগ্ধবিষ

75

লেখক: সানজিদা আক্তার মুন্নি
সময় নামক বহমান নদীর প্রমত্ত স্রোত তৃষ্ণার জীবনের কাছে এসে ঠিক এক অচেনা, নিশ্চল জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। সময় আর এগোতে চায় না, থমকে দাঁড়িয়েছে এক অভিশপ্ত, অন্ধকার বিন্দুতে। কেটে গেছে তিনটি প্রলম্বিত মাস। অঙ্কের হিসেবে নব্বইটি দিন, কিন্তু তৃষ্ণার কাছে প্রতিটি দিন ছিল এক একটি যুগের সমান। নব্বইটি দীর্ঘ দিন আর তার চেয়েও দীর্ঘ, বিভীষিকাময় নব্বইটি রাত পার হয়েছে ইতিমধ্যে। বাইরের পৃথিবীতে প্রকৃতির নিয়ম মেনে ঋতু বদলেছে, রুক্ষ ডালে ডালে নতুন সবুজ পাতা গজিয়েছে, দখিনা বাতাস নিজের দিক পরিবর্তন করে উত্তরের হিমেল পরশ মেখে নিয়েছে। কিন্তু পাটায়ারি বাড়ির এই নির্দিষ্ট অন্ধকার ঘরটার ভেতরে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ঘরের চার দেয়ালের মাঝে জমাট বেঁধে আছে এক দমবন্ধ করা, হিমেল স্তব্ধতা, যেখানে আলো ঢুকতেও শিউরে ওঠে।
শারীরিকভাবে তৃষ্ণা আজ পুরোপুরি সুস্থ। হাসপাতালের কড়া ওষুধের গন্ধে, সযত্ন চিকিৎসায় তার শরীরের দৃশ্যমান ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু মনের অতল গহ্বরে যে বীভৎস, দগদগে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা থেকে প্রতিনিয়ত অলক্ষ্যে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। সে মানসিকভাবে পুরোপুরি বিকারগ্রস্ত, এক ঘোর ট্রমার অন্তহীন গোলকধাঁধায় বন্দি, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথের দিশা তার জানা নেই। তৃষ্ণাকে ওয়াসেম, ইয়াদ আর তৌসির, এই তিন ভাই নিজেদের অতীতের কথা বলেছে, খুলে বলেছে বিয়ের নাটক কেন করতে হয়েছিল তাদের। সব অভিমান, সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান তারা করতে চেয়েছে। কিন্তু আফসোস, তৃষ্ণা আর স্বাভাবিক হয়নি। তার মস্তিষ্কের কোনো এক অণুভূতি চিরতরে অসাড় হয়ে গেছে। তার কাছে এখন দিন আর রাতের কোনো পার্থক্য নেই, বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মাঝে কোনো তফাৎ নেই।
তার এই নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থার জন্য দায়ী উল্লিখিত দুই নরপশু, যারা নিজেদের সাময়িক পাশবিক লালসার আগুনে তার সাজানো জীবনটাকে এক জ্বলন্ত জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির বিচার বড়ই নিপুণ এবং তৌসির ও ওয়াসেমের ক্রোধ ছিল প্রলয়ংকরী। তাদের পাপের শাস্তি পেতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। তৌসির আর ওয়াসেমের ভেতরে কালরাতে যে প্রতিহিংসার দাবানল জ্বলে উঠেছিল, তা উল্লিখিত দুই অপরাধীকে একেবারে ভস্ম করে দিয়েছে। তারা তন্ন তন্ন করে, পৃথিবীর শেষ সীমানা থেকে হলেও খুঁজে বের করেছিল অপরাধীদের। আইনের হাতে তুলে দিয়ে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার পথে হাঁটেনি তারা। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানত, বিচারহীনতার এই নড়বড়ে যুগে হয়তো কোনো না কোনো ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে হায়েনারা। ওয়াসেমের ভেতরের ঘুমন্ত পশুটা কালরাতে জেগে উঠেছিল এক ভয়ংকর, রুদ্র রূপে। তৌসির আর ওয়াসেম মিলে তাদের ধরে টুকরো টুকরো করে কেটেছিল। তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছিল তীব্র, অন্ধ আক্রোশে, তারপর নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে তৃষ্ণার অপমানের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিয়েছিল। পাটায়ারিদের রক্ত কতটা গরম, তা সেদিন পিশাচরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।
কিন্তু প্রতিশোধ নিলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? ধর্ষকের বীভৎস মৃত্যু কি ধর্ষিতার হারানো আত্মসম্মান, তার বেঁচে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ, তার রাতের নিশ্চিন্ত ঘুম ফিরিয়ে দিতে পারে? রক্তের বদলে রক্ত নিলেই কি স্মৃতির ক্যানভাস থেকে দুঃস্বপ্নের রাতের আর্তনাদ মুছে যায়?
সবকিছুর একটা রক্তাক্ত সমাপ্তি হলেও, তৃষ্ণা ঠিক নেই। সে ঠিক এক জীবন্ত লাশ। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো ভাষা নেই, এক অসীম রিক্ততায় ভরা তার দুই চোখ, যা শুধু দূরের অজানা, শূন্যতার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে। ঘরের এক অন্ধকার কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে সারাদিন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে থাকে সে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, নিজের যত্ন নেওয়া, জীবনের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলোর প্রতি তার এখন তীব্র অনীহা। জোর করে মুখে খাবার তুলে দিলেও সে চিবোতে ভুলে যায়। এই তিন মাসে বেশ কয়েকবার সে মৃত্যুর চেষ্টাও করেছে। বেঁচে থাকার এই যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যুকে তার অনেক বেশি আপন মনে হয়েছে। কখনো বাথরুমের ব্লেড দিয়ে হাতের শিরা কাটার চেষ্টা করেছে, কিংবা মাঝরাতে সকলের অগোচরে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই ওয়াসেমের তীক্ষ্ণ, বাজপাখির মতো দৃষ্টি আর সিতুজার সতর্ক প্রহরার কারণে সে বেঁচে গেছে। মৃত্যুও তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে বারবার, তাকে বাধ্য করছে এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে।
ওয়াসেম এখন আর আগের মতো বেপরোয়া নেই। তার উদ্দাম জীবন তৃষ্ণার ঘরের দরজায় এসে থমকে গেছে। তার চোখের নিচে নির্ঘুম রাতের গাঢ় কালি, উসকোখুসকো চুল আর চেহারায় এক পাথুরে কাঠিন্য। সে তৃষ্ণার আজ্ঞাবহ এক অনুগামীতে পরিণত হয়েছে। নিজের সমস্ত কাজ, জীবনের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-উচ্ছ্বাস একপাশে সরিয়ে রেখে সে শুধু তৃষ্ণার একজন নিশ্চুপ, অতন্দ্র পাহারাদার হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনে কখনো কাজে বের হলেও তার মন পড়ে থাকে পাটায়ারি বাড়ির নির্দিষ্ট অন্ধকার ঘরে। কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসে সে। সারাদিন তৃষ্ণার আশেপাশে ঘোরে, একটা অদেখা দেয়াল হয়ে তাকে আগলে রাখে। তৃষ্ণা তাকে একটুও পাত্তা দেয় না। কখনো কখনো তার দিকে ছুড়ে মারে তীব্র ঘৃণা, তাকে দেখে বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু ওয়াসেমের কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। তৃষ্ণা নিশ্বাস নিচ্ছে, তার চোখের সামনে বেঁচে আছে, ওয়াসেমের কাছে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সে দূর থেকে তৃষ্ণার দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে বলে,
"তুই শুধু বেঁচে থাক তৃষ্ণা। তোর এই নিশ্চুপ থাকা, তোর এই অবজ্ঞা, তোর এই ঘৃণা, সবকিছু আমার কাছে হাজার কথার চেয়ে দামি। আমি আমার জীবনের সবটুকু আলো, সবটুকু পুণ্য দিয়ে তোর এই অন্ধকার ঘুচিয়ে দেব। তোকে আমি আবার বাঁচতে শেখাব, নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তুলব তোর পৃথিবী।"
অন্যদিকে, তৌসিরের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ভাইয়ের এই বিধ্বস্ত অবস্থায়, এমন এক বিপদের দিনে সে কিছুতেই দেশে ফিরে যেতে পারেনি। ভাই হিসেবে তার দায়িত্ববোধ তাকে আটকে রেখেছিল। কিন্তু তার ভেতরেও এক নিশ্চল, অলক্ষিত রক্তক্ষরণ চলছে অহর্নিশ। আজ তিন মাস হলো সে তার নাড়িছেঁড়া সন্তানদের মুখ দেখেনি। তার আদরের নাজহা একা হাতে সব সামলাচ্ছে সুদূর বাংলাদেশে। তৌসিরের বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে যখন সে ভিডিও কলে দেখে, তার সন্তানরা এতদিনে বসতে শিখেছে, আধো আধো ভাষায় অজানা কথা বলছে, আর সে বাবা হয়ে তাদের এই প্রথম বেড়ে ওঠার সোনালী মুহূর্তগুলো নিজ চোখে দেখতে পারছে না। এই আক্ষেপ তাকে কুরে কুরে খায়। কিন্তু এখন আর নয়, তার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এতদিন পর দেশে ফিরে সে তার সন্তানদের মুখ দেখবে, তাদের বুকে জড়িয়ে নেবে। তাছাড়া তার মেয়র হিসেবে রাজনৈতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজও পড়ে আছে, যা আর ফেলে রাখা সম্ভব নয়।
তৃষ্ণাকে এই ঘোর ট্রমা, এই অন্ধকার কূপ থেকে বের করে আনার একটাই উপায়, পরিবেশ বদলানো। চেনা গণ্ডি, চেনা মানুষগুলো থেকে তাকে দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া, যেখানে কেউ তাকে করুণার দৃষ্টিতে দেখবে ওর, যেখানে এই দেয়ালগুলো, এই বাতাস তাকে কালরাতের কথা মনে করিয়ে দেবে না। তাই তৌসির কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সাথে ওয়াসেমও তৃষ্ণাকে নিয়ে বাংলাদেশে যাবে। ইয়াদও যাবে নওরিকে নিয়ে। একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের কোলাহল হয়তো তৃষ্ণার জমে থাকা বরফ গলাতে সাহায্য করবে।
কিন্তু তৃষ্ণা কিছুতেই যেতে রাজি নয়। সে ঘর থেকেই বের হতে চায় না। এই চার দেয়ালই এখন তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। ওয়াসেম তৃষ্ণার হাতে-পায়ে ধরে তাকে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য রাজি করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। সিতুজা ইব্রাহিমও তাকে অনেকভাবে বোঝান।
ওয়াসেমের এই আকুল আবেদন, ইয়াদের ভাইসুলভ স্নেহমাখা বোঝানো এবং তৌসিরের অভিভাবকের মতো কড়া শাসনে অবশেষে তৃষ্ণা রাজি হয়। তার ভেতরে আর প্রতিবাদ করার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই। আজ রাতে তাদের ফ্লাইট। পুরো পাটায়ারি বাড়িতে গোছগাছ চলছে। তৌসির আগেই বাংলাদেশে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ফিরছে। ওয়াসেম তৃষ্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার নিষ্প্রাণ হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আকুল কণ্ঠে বলে সবসময় একটা কথা,
"তৃষ্ণা, আমি জানি তুই ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছিস। তুই বুঝতে পারছিস যে তুই ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছিস। কিন্তু তোর তো স্বাভাবিক হওয়া উচিত! যারা এই জঘন্য কাজ করেছে, নোংরামি করেছে, দোষ তো তাদের। তাদের আমরা শাস্তি দিয়েছি। ধর্ষিতা কেন কলঙ্কিনীর তকমা পাবে? তোর তো কোনো দোষ নেই! তুই কেন নিজেকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিস?”
দীর্ঘ বিমান যাত্রার পর তৌসিররা সবেমাত্র বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে। ঢাকা শহরের পরিচিত যানজটের কোলাহল, চিরচেনা আর্দ্র বাতাস তৌসিরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালো। বিমানের ভেতর সারাক্ষণ ওয়াসেম তৃষ্ণাকে একটা অদেখা আবরণের মতো আগলে রেখেছিল, যাতে বাইরের পৃথিবীর কোনো আঁচ তার গায়ে না লাগে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তাদের সবার চোখেমুখে, তবু ভেতরে এক বিচিত্র, চাপা উত্তেজনা। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে তারা সোজা শিকদার বাড়িতে এসে পৌঁছায়। শিকদার বাড়ি তার বিস্তৃত বক্ষ মেলে তাদের অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছিল। সদর দরজায় পা রাখতেই এক পরিচিত, মাটির সোঁদা গন্ধ আর পরিবারের মানুষের উষ্ণতা তাদের ছুঁয়ে যায়।
বাড়ির সবাই তৃষ্ণার মানসিক অবস্থার কথা জানে। তবে ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর এবং ভয়াবহ সত্যকে সযত্নে আড়াল করা হয়েছে তৃষ্ণার সম্মান বাঁচানোর স্বার্থে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের, বিশেষ করে বয়স্কদের জানানো হয়েছে, এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তৃষ্ণার এই অবস্থা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার মানসিক ট্রমা কাটাতে তাকে এখানে আনা হয়েছে।
বিবিজান অগাধ আদরে আর ভালোবাসায় তৃষ্ণা, নওরি আর বাকিদের বাড়িতে প্রবেশ করান। তার চোখেমুখে একরাশ মমতা। কিন্তু বিস্তৃত এই প্রকাণ্ড ড্রয়িংরুমে এত মানুষ, এত কোলাহল, বিশেষ করে এতগুলো অচেনা পুরুষ দেখে তৃষ্ণা হঠাৎ করেই ঘাবড়ে যায়। তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে বিপদের সাইরেন বেজে ওঠে। তার শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। পুরুষদের দেখলেই তার মনে অভিশপ্ত রাতের পৈশাচিক স্মৃতি হানা দেয়, তার মনে হয় এই বুঝি কেউ আবার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাকে ছিঁড়ে খাবে। ভয়ে সে গুটিয়ে গিয়ে পেছাতে থাকে, তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে।
ওয়াসেম, যার চোখ সারাক্ষণ শুধু তৃষ্ণার ওপরই নিবদ্ধ থাকে, সে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারে। সে একটুও দেরি না করে আলতো করে তৃষ্ণার পাশে বসে পড়ে। সবার সামনেই, কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তৃষ্ণার হিমেল হাতটা শক্ত করে নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় চেপে ধরে সে। ওয়াসেমের এই স্পর্শে জাদুর মতো কাজ হয়। যে স্পর্শকে তৃষ্ণা এতকাল অবজ্ঞা করে এসেছে, আজ ঠিক তা-ই তার কাছে মুক্তির মতো, এক টুকরো অক্সিজেনের মতো মনে হয়। তৃষ্ণা ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং সোফার এক কোণে আড়ষ্ট হয়ে বসে পড়ে।
নওরিও নিজের জড়তা কাটাতে ইয়াদের পাশে গিয়ে বসে। রুদ্র আর নূহমানরা সবাই তো মহাখুশি। অনেকদিন পর তারা তাদের তিন ভাই তৌসির, ওয়াসেম আর ইয়াদকে একসাথে পেয়েছে। বাড়িতে একটা উৎসবের আমেজ নেমে এসেছে। কাজের লোকরা রুপার বড় বড় ট্রে-তে করে বিভিন্ন স্বাদের ঠান্ডা শরবত, মিষ্টি আর ফলমূল নিয়ে আসে অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য।
তৌসির সোফায় গা এলিয়ে বসে। হাতে শরবতের গ্লাস। সে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখজোড়া অস্থিরভাবে পুরো বাড়ি স্ক্যান করে চলেছে। সে এখানে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও তার মন পড়ে আছে বাড়ির দোতলায়। মনে মনে সে অস্থির হয়ে ভাবে,
"আমার নাগিন আর আমার ছানাপোনাগুলো কই? ওরা কি জানে না আমি এসেছি? নাকি জেনেও ইচ্ছে করেই আমাকে রাগানোর জন্য নিচে আসছে না?”
অস্থিরতা আর নিজের ভেতরে ধরে রাখতে না পেরে তৌসির তার বোন সিমরানকে হাঁক ছাড়ে,
"এই সিমরান! তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমার বাচ্চাদের নিয়ে আয় তো তাড়াতাড়ি। আর তোর ভাবি কই? সে নিচে আসেনি কেন?"
সিমরান ভাইয়ের এই মাত্রাতিরিক্ত অস্থিরতা দেখে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলে,
"ভাইয়া, তুমি শান্ত হও। এত অস্থির হচ্ছ কেন? আমি এখনই ওদের নিয়ে আসছি।”
এরই মাঝে ইকরা এসে ড্রয়িংরুমে ঢোকে। সবার সাথে কুশল বিনিময় করে সে। তৃষ্ণা যথারীতি সোফার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে থাকে, কারও সাথে কোনো কথা বলে না, আদতে সে এই ঘরের কেউ নয়। ইকরাকে দেখে তৌসির স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কিরে বিজনেস ওম্যান, তোর বিজনেসম্যান সাহেব কই? বাড়িতে নাকি আজ কাজে গেছে?"
ইকরা একটু বিবর্ণ হেসে উত্তর দেয়,
"রুমে ঘুমাচ্ছে।"
তৌসির কপাল কুঁচকে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
"কেন? বেলা তো বাজে একটা! এখন কিসের এত ঘুম ঘুমায় ও?"
ইকরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
"সারারাত অফিসের অনেকগুলো প্রেজেন্টেশন আর পেন্ডিং কাজ করছিল তো, তাই ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে। এখন ঘুমাচ্ছে।"
তৌসির শরবত গিলতে গিলতে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
"ওহ হো! আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝছি রাতে কোন কাজ করছিল! ঠিক আছে, ঘুমাতে দে বেচারাকে। বেশি ডিস্টার্ব করিস না।"
তৌসিরের কথার রেশ কাটতে না কাটতেই ড্রয়িংরুমের ভারী পর্দা সরিয়ে সিমরান এবং দুজন কাজের মেয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে। তাদের কোলে শিকদার বাড়ির তিন টুকরো চাঁদ, তুরাব, নাওয়াব আর তৌশি। ঘরজুড়ে হঠাৎ করেই একরাশ প্রশান্ত আলো ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের সন্তানদের চোখের সামনে দেখেই তৌসিরের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। তার উপর তিন মাসের জমানো পিতৃস্নেহ, না-দেখার দীর্ঘ হাহাকার আছড়ে পড়তে চায় এক অপ্রতিরোধ্য জলোচ্ছ্বাসের মতো। সে আর সোফায় এক মুহূর্তও স্থির বসে থাকতে পারে না। হাতের শরবতের গ্লাসটা কাচের টেবিলে সশব্দে নামিয়ে রেখেই সে প্রায় পাগলের মতো ছুটে যায়।
একসাথে তিনজনকে কোলে তুলে নেওয়া বেশ কষ্টকর, কিন্তু তৌসিরের আজ গায়ে অনেক বল ভর করেছে। বিস্তৃত বুকের প্রশস্ততায় সে তিন সন্তানকেই একসাথে জড়িয়ে ধরে। মনে হচ্ছে তার তিন মাসের শূন্য বুকটা আজ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। তিনজনকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে সে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে এবং তাদের নিজের কোলের ওপর সুবিধামতো বসিয়ে নেয়।
মুগ্ধ, তৃষ্ণিত আর অপলক চোখে তৌসির দেখতে থাকে তার রক্তগুলোকে। কী চমৎকার সুন্দর হয়েছে ওরা! এই তিন মাসে ওরা কত বড় হয়ে গেছে, ওদের চেহারায় কত পরিবর্তন এসেছে। ওদের সৌন্দর্য পৃথিবীর কোনো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তিনজনেরই গোলগাল পেলব গাল, ঠিক সদ্য ফোটা ভোরের গোলাপের মতো মসৃণ আর লালচে।
তৌশি, তৌসিরের একমাত্র রাজকন্যা। পরনে একটা ছোট্ট গোলাপি রঙের ফ্রক, মাথায় ছোট্ট একটা ক্লিপ দিয়ে চুল আটকানো। ওর মায়াময়, নীলচে চোখদুটো অতল আর শান্ত। তৌশি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে, তার ছোট্ট মস্তিষ্ক দিয়ে চিনতে চেষ্টা করছে এই প্রকাণ্ড চেহারার মানুষটা কি তার বাবা? সত্যি বাবা এসে গেল?
তুরাব ঠিক একটা ছোট্ট তুলোর বল। গায়ের রঙ একেবারে দুধে-আলতায় মেশানো। ওকে দেখলেই মনে হয় কোনো হুর বুঝি পথ ভুলে মর্ত্যে চলে এসেছে। হাসলে ওর গালে সুন্দর টোল পড়ে। আর নাওয়াব, ওর চোখের দৃষ্টিতে এখনই একটা রাজকীয়, গম্ভীর ভাব। ওর সবুজ চোখদুটো সোজা তৌসিরের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধে যায়। তৌসিরের সন্তানগুলো এখন আর আগের মতো তুলতুলে মাংসপিণ্ড নেই, তারা বেশ শক্তপোক্ত হয়েছে। এখন তারা নিজেরাই সুন্দর করে বসতে পারে, চারপাশের পৃথিবীটাকে কৌতূহলী চোখে দেখে।
তৌসির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তিনজনকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে তাদের গালে, কপালে, রেশমি চুলে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে শুরু করে। চুমু খেতে খেতেই তার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে বাচ্চাদের গায়ে। ভাঙা, আবেগরুদ্ধ গলায় সে বলতে থাকে,
"বাবা এসে গেছে রে... তোদের বাবা এসে গেছে! আমাকে ছেড়ে তোরা এত সুন্দর কবে হলি বাপ? আমার তোদের খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে! তোদের ছাড়া এই তিন মাস আমি কীভাবে বেঁচে ছিলাম, সেটা শুধু আমার ওপরওয়ালাই জানেন!"
বাচ্চারাও তাদের জন্মদাতার স্পর্শ চিনতে পারে। রক্তের টান বড় বিচিত্র জিনিস, যা কোনো দূরত্বের সীমানা মানে না, কোনো ভাষা খোঁজে না। তওশি তার ছোট্ট, পেলব আঙুল দিয়ে তৌসিরের নাক চেপে ধরে আধো মিষ্টি বোলে ডেকে ওঠে,
"বা... বা... বা।"
তৌসিরের মনে হলো পৃথিবীতে এর চেয়ে সুমধুর কোনো সিম্ফনি আর হতে পারে না।
তুরাব তার ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে তৌসিরের মাথার চুল মুঠো করে টেনে ধরে খিলখিল করে হেসে ওঠে। ওর নিষ্পাপ হাসির শব্দে পুরো ঘরের থমথমে, গম্ভীর পরিবেশ নিমেষেই পাল্টে যায়। মনে হয় ঘরে একঝাঁক রিনিঝিনি ঘণ্টা বেজে উঠেছে। আর নাওয়াব অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে তৌসিরের শার্টের বোতাম ধরে টানতে থাকে, জিনিসটা তার কাছে কোনো নতুন, আকর্ষণীয় খেলনা। তিনজনের বা-বা, আধো আধো শব্দ আর খিলখিল হাসির এক আনন্দময়, সুমধুর কলকাকলিতে পুরো বাড়ি নিমেষেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ইয়াদ আর বসে থাকতে পারে না। বাচ্চাদের এই মোহময় রূপ দেখে সে গলে যায়। তার ভেতরের পিতৃসত্তা জেগে ওঠে। সে এগিয়ে এসে নাওয়াবকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তার মসৃণ গালে সশব্দে একটা চুমু খেয়ে বলে,
"মাশাআল্লাহ! আমার ভাতিজা যে এত সুন্দর হবে, তা তো আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি! তা, শুধু বাবাকে ডাকলেই হবে? আমরা যে চাচারা বসে আছি, আমাদেরও একটু ডাকো বাপ! দেখো, আমি তোমার ইয়াদ চাচু!"
নাওয়াব তার বড় বড় চোখ দিয়ে ইয়াদের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দেয়।
ওয়াসেম তুরাবকে কোলে তুলে নেয়। সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে সোফায় জড়সড় হয়ে বসে থাকা তৃষ্ণার পাশে দাঁড়ায়। আলতো করে তুরাবকে তৃষ্ণার কোলে বসিয়ে দিয়ে খুব মোলায়েম গলায় বলে,
"তৃষ্ণা, দেখ তো, বাচ্চাটাকে একদম পুতুলের মতো লাগছে না? আমার ভাই তো একেবারে ছক্কা মেরে দিছে রে! দেখ একটু ছুঁয়ে, কেমন তুলতুলে! ঠিক তুলোর তৈরি।"
তৃষ্ণা চমকে ওঠে। তার কোলের ওপর বসা ছোট্ট, ফুটফুটে এক দেবশিশু তুরাব। তুরাব তার বড় বড় দীঘল চোখ দিয়ে তৃষ্ণার অবিন্যস্ত, বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিশুমন হয়তো মানুষের ভেতরের কষ্টটা বুঝতে পারে। তুরাব হঠাৎ তার ছোট্ট, তুলতুলে হাতটা বাড়িয়ে তৃষ্ণার ফ্যাকাশে গালে স্পর্শ করে।
এই নিষ্পাপ শিশুর পবিত্র স্পর্শ, তার গা থেকে আসা জনসন বেবি পাউডার আর মায়ের দুধের মিষ্টি গন্ধে তৃষ্ণার ভেতরের জমে থাকা সব অন্ধকার এক লহমায় কেটে যায়। শিশুদের পবিত্রতার কাছে পৃথিবীর সব অন্ধকার, সব নোংরামি হার মানতে বাধ্য। তুরাবের একটি স্পর্শে তৃষ্ণার মনে হলো এক ঝলক তপ্ত রোদ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তিন মাসের জমাট বাঁধা তীব্র যন্ত্রণার মাঝে প্রথমবারের মতো তৃষ্ণার পাণ্ডুর, শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। মরুভূমিতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এক পশলা বৃষ্টির মতো এক দুর্লভ হাসি। তার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। সে আলতো করে, অগাধ মমতায় তুরাবের কপালে একটা চুমু খায়। তুরাবও খিলখিল করে হেসে তৃষ্ণার ওড়না খামচে ধরে।
ওয়াসেম মুগ্ধ, অপলক দৃষ্টিতে তৃষ্ণার হাসির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই একটা হাসির জন্যই সে নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে। এই এক চিলতে হাসি তাকে বলে দিচ্ছে, সব শেষ হয়ে যায়নি, এখনো আশা বাকি আছে। তৃষ্ণা আবার ফিরবে, আলোতে ফিরবে।
দৃশ্যটা দেখে নওরি ইয়াদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
"তৌশিকে একটু আমার কোলে এনে দিন না। আমার খুব ইচ্ছে করছে ওকে ছুঁয়ে দেখতে। মেয়েটা এত কিউট, ঠিক মনে হচ্ছে একটা বার্বি ডল!"
তৌসিরের কান খুব তীক্ষ্ণ। কথাটা শুনতে পেয়ে সে নিজেই উঠে এসে ছোট্ট তৌশিকে নওরির কোলে দিয়ে হাসিমুখে বলে,
"তোমার ভাইয়ের মেয়ে, তুমি কোলে নেবে, এতে এত দ্বিধা সংকোচ কিসের নওরি? নাও, ধরো।”
নওরির মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বুকভরা মমতায় তৌশিকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তৌশির মসৃণ তুলতুলে শরীরটা ছুঁতেই নওরির মাতৃত্বের সুপ্ত অনুভূতিগুলো নেচে ওঠে। তৌশিও আপন মনে নওরির গলার চেইনটা ধরে টানতে শুরু করে। ইয়াদ নাওয়াবের ছোট্ট পায়ের আঙুলে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে,
"এটা তো দেখি একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে! নাক, মুখ সব নাজহার মতো। বাপের তো কোনো অস্তিত্বই দেখছি না আমি এদের চেহারায়!"
এমন সময় বিবিজান সোফায় বসতে বসতে তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন,
"শুধু একটা না, তিনটাই! ভালো করে খেয়াল করে দেখিস না, চুল, চোখ, গায়ের রঙ, মুখের আদল, সব একেবারে মায়ের মতো পেয়েছে। তৌসিরের কিছুই পায়নি এরা!”
কথাটা শুনে নওরি মনে মনে ভাবে,
"বাচ্চারা এত নিখুঁত সুন্দর, তাহলে এদের মা না জানি কতটা সুন্দর হবে! আমি তো তাকে কখনো দেখিনি। সত্যিই কি সে অপ্সরী? যার রূপের প্রতিচ্ছবি এই তিনটে শিশুর মাঝে এতটা প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে, তাকে একনজর দেখার জন্য আমার ভেতরটাও তো অস্থির হয়ে উঠছে।"
তৌসির বিবিজানকে বলে,
“তুমি একটু ওদের দেখো। আমি নাজহার সাথে নওরি আর তৃষ্ণার পরিচয় করিয়ে নিয়ে আসি। ও তো আর এখন এখানে সবার সামনে আসবে না, তাই আমিই ওদের নিয়ে যাই।"
এই বলে তৌসির উঠে দাঁড়ায়। ভেতরের অস্থিরতা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। নওরি আর তৃষ্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
"কষ্ট করে একটু দোতলায় আমার সাথে আসতে পারবা তোমরা?"
নওরি তৌশিকে ইয়াদের কাছে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তৃষ্ণাও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে তুরাবকে ওয়াসেমের কোলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দুজনে তৌসিরের পিছু পিছু সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় তার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। নাজহা পর্দাশীল নারী, তাই ইয়াদ আর ওয়াসেমের মতো দেবরদের সামনে সে সচরাচর আসে না, এটাই এই বাড়ির নিয়ম আর তার স্বভাব।
দোতলার পরিবেশটা একদম শান্ত, কোলাহলমুক্ত। নিচের উৎসবের আমেজ এখানে নেই, বরং আছে এক প্রশান্ত, পবিত্র নিশ্চুপতা। চারদিকে এক আরামদায়ক পরিবেশ। তৌসিরের ঘরের দরজার সামনে এসে তৌসির একটু দাঁড়ায়। তার বুকের ভেতর হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে। নাজহা ঠিক সেমুহূর্তে ঘরে জোহরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। মাথা থেকে হিজাব সরিয়ে চুলগুলো খুলে দিয়েছে সে। বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার ঘন, কালো, রেশমি চুলে তেল দিচ্ছিল। ঠিক এমন সময় তৌসির, তৃষ্ণা আর নওরিকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে।
নাজহাকে দেখার জন্য তৌসিরের বুকের ভেতরটা উথালপাথাল করছিল। তিন মাসের প্রলম্বিত বিরহ, তিন মাসের না-দেখা মুখটা দেখার জন্য তার তৃষিত চোখ পাগল হয়ে ছিল। ঘরে ঢুকেই পেছন থেকে তার ভরাট, ভারী গলায় ডেকে ওঠে সে,
"নাজহা!"
নাজহা জানত তৌসির ফিরছে। সকাল থেকেই তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছিল। তবুও পরিচিত, কাঙ্ক্ষিত কণ্ঠস্বর শুনে তার পুরো শরীরটা বিদ্যুত্স্পৃষ্টের মতো কেঁপে ওঠে। হাতের তেলের বোতলটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকায়। আয়নার সামনে দাঁড়ানো নাজহাকে দেখা মাত্রই তৌসিরের হৃদয়ে এক প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। সে মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে তার কৈতরির দিকে তাকিয়ে থাকে।
নাজহার পরনে নিতান্তই এক সাধারণ সুতির থ্রি-পিস, অথচ তাতেই তাকে জান্নাতের কোনো অনিন্দ্যসুন্দর হুরের মতো লাগছে। তার ধবধবে ফর্সা, পেলব ত্বকে সদ্য নামাজ পড়ে ওঠার এক প্রশান্ত নূরানি আভা। তার হাঁটু অবধি লুটিয়ে পড়া লালচে আর কালোর মিশ্রিত কোঁকড়ানো, ঢেউখেলানো ঘন ভেজা চুলগুলো থেকে এক অবর্ণনীয় মোহময় সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে পুরো কামরায়। তার জাদুকরী কালচে সবুজ চোখের নিষ্পাপ দ্যুতি আর চেহারার অভাবনীয় কমনীয়তার দিকে তাকিয়ে তৌসির কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস নিতেই ভুলে যায়।
অন্যদিকে তৃষ্ণা আর নওরি একেবারে হতবাক! তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। এত নিখুঁত, এত লাবণ্যময়ী কোনো রক্তমাংসের মানবী যে বাস্তবে থাকতে পারে, তা তারা এর আগে কখনো সামনাসামনি দেখেনি। নাজহার অবয়বে এমন এক সম্মোহনী আকর্ষণ লুকিয়ে আছে, যা মুহূর্তেই যে কাউকে আটকে ফেলতে পারে। তৌসিরের স্ত্রী এতটা চিত্তাকর্ষক আর অপরূপা হতে পারে, ব্যাপারটা তাদের দূরতম কল্পনারও বাইরে ছিল। বিস্ময়ে দুজনে পাথর হয়ে যায়, মুগ্ধ ও পলকহীন দৃষ্টিতে সরাসরি নাজহার পানেই তাকিয়ে থাকে।
নাজহা এর আগে তৃষ্ণা আর নওরিকে কখনো দেখেনি। তবে তৌসিরের থেকে শোনা গল্পগুলো মিলিয়ে সে খুব সহজেই আন্দাজ করে নেয় এরাই তারা। চারপাশের শব্দহীন পরিমণ্ডল আর সবার অপলক দৃষ্টির মাঝখান দিয়ে নাজহা তার স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে, ধীর পায়ে তৌসিরের দিকে এগিয়ে আসে।
তৌসির আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরতে যাবে, তার হাত দুটো কিছুটা প্রসারিত হয়, তার আগেই নাজহা আলতো করে তৌসিরের বাহু ধরে তাকে একপাশে সরিয়ে দেয়। তৌসিরকে পাশ কাটিয়ে সে তৃষ্ণা আর নওরির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সুমধুর, রিনিঝিনি কণ্ঠে হেসে বলে,
"আমি যদি ভুল না হই, আপনারা তৃষ্ণা আর নওরি, তাই তো?"
ওরা এতটাই ঘোরে ছিল উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলে। তৌসির তার প্রসারিত হাত নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃষ্ণা আর নওরিকে দেখিয়ে বলে,
"হ্যাঁ, এটা তৃষ্ণা আর ওটা নওরি।"
এরপর তাদের দিকে তাকিয়ে, কণ্ঠে একরাশ গর্ব, অহংকার আর অধিকার নিয়ে নাজহাকে দেখিয়ে বলে,
"আর ও হলো নাজহা। নওরিন সিদ্দিয়া নাজহা, আমার অনেক শখের নারী।"
নাজহা অকৃত্রিম মমতায় তৃষ্ণা আর নওরির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে। তাদের টেনে বিছানার দিকে নিয়ে যায়।
"আসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এখানে বসুন। আপনাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম।"
ওরা দুজনে নাজহার পাশে বিছানায় বসতে বসতে জড়তা কাটিয়ে বলে,
"আমাদের আপনি করে বলবেন না প্লিজ। তুমি করেই বলো।"
নাজহা মাথা নেড়ে মিষ্টি হেসে বলে,
"আচ্ছা ঠিক আছে, তুমিই বলব। তা, কেমন আছো তোমরা? যাত্রাটা খুব ক্লান্তিকর ছিল নিশ্চয়ই?"
নওরি মাথা নেড়ে বলে,
"এই তো, আলহামদুলিল্লাহ। বেশ ভালো আছি।"
কিন্তু তৃষ্ণা কোনো কথা বলে না। সে আবার মুখটা অনুজ্জ্বল করে নিচের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। বর্তমান ঘরটা, চারদিকের নিশ্চুপতা আবার তাকে অতীত অন্ধকারে টেনে নিয়ে যেতে চায়। নাজহা নিবিড়ভাবে তৃষ্ণার দিকে তাকায়। সে জানে এই মেয়েটার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে। নাজহার বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে। সে তৃষ্ণার হাতটা নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে ধরে। অকৃত্রিম মমতায়, ছোট বোনের মতো নির্ভরতার কণ্ঠে বলে,
"কষ্ট পেয়ো না তৃষ্ণা-পু। যা হয়েছে, ভেবে নাও সব আল্লাহর ইচ্ছে ছিল। এতে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো দোষ নেই। পৃথিবীর কোনো নোংরামি, কোনো পিশাচের থাবা তোমার ভেতরের পবিত্রতাকে নষ্ট করতে পারবে না। তুমি শুধু নিজেকে শক্ত রাখো, ভেঙে পড়ো না। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ঠিক থাকো, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। বাড়িটা আজ থেকে তোমার, আমরা সবাই তোমার পরিবার।"
নাজহার এই আন্তরিকতা, এই অগাধ ভালোবাসামাখা কথায় তৃষ্ণার চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে। এতদিন পর কেউ তাকে এত মায়া নিয়ে ছুঁয়েছে, এত নির্ভরতা দিয়েছে। তার ভেতরের জমে থাকা বরফ একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে।
ওদের মেয়েলি কথোপকথন আর আবেগের মাঝে তৌসির একপাশে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে হেলান দিয়ে একদৃষ্টে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। এতদিন পর সে ফিরেছে, তার বউ ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে, তার বুকে মাথা রাখবে, অভিযোগ করবে, তা না, বউ কি না তাকে পাত্তাই না দিয়ে দুজনকেই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল! তৌসির মনে মনে খানিকটা অভিমান আর দুষ্টুমির সুরে বলে,
"ছিনাল একটা! ভাবখানা তো দেখো, আমার দিকে তাকালোও না ঠিকমতো! এই তিন মাসে আমার জন্য একটুও কি মন কাঁদেনি ওর? দাঁড়া, এখন কিছু বলছি না। রাতে দেখাচ্ছি মজা।”
নওরি আর তৃষ্ণার সাথে দীর্ঘক্ষণ টানা আড্ডার পর ওরা নিজেদের ঘরে ফ্রেশ হতে চলে গেলে নাজহা অবশেষে নিজের জমে থাকা কাজে হাত দেয়। খোলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ধীরেসুস্থে একটা একটা করে ভেজা কাপড় ক্লিপ আটকে মেলছে সে। বাতাসে ওর ওড়নার আঁচল আর অবাধ্য চুলগুলো হালকা উড়ছে। ঠিক এমন সময়ই নিঃশব্দ পায়ে ঘরে প্রবেশ করে তৌসির। দীর্ঘ একটা সময় পর আজ নিজের চেনা ডেরায় ফিরেছে সে। ঘরে ঢুকেই বেলকনিতে বউকে এমন নিরিবিলি একা পেয়ে সুযোগটা আর হাতছাড়া করতে চায় না। পা টিপে টিপে ঠিক নাজহার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় তৌসির। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর তৃষ্ণা মেশানো গলায় ভরাট স্বরে জিজ্ঞেস করে,
"কেমন আছো বউ?"
নাজহা নিজের কাজে এতটুকুও বিরতি দেয় না। তৌসিরের দিকে একবার ফিরেও তাকায় না সে। হাত চালিয়ে কাপড় মেলতে মেলতেই পুরোদস্তুর নির্লিপ্ত আর হিম কণ্ঠে ছোট করে বলে,
"ভালো।"
ওর এমন নির্বিকার জবাব শুনে তৌসির কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে। ওর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করে,
"দিনকাল কেমন কাটল?"
নাজহার কণ্ঠে অবিকল একই রকম জমাটবাঁধা বরফ, কোনো হেলদোল নেই। আগের মতোই ছোট আর ভাবলেশহীন উত্তর দেয়,
"ভালো।"
তৌসিরের ভেতরে এবার কিছুটা অধৈর্য আর রাগ কাজ করতে শুরু করে। কন্ঠস্বর কিছুটা ভারী করে সে বলে,
"আমাকে জিজ্ঞেস করবি না, আমি কেমন আছি?"
নাজহা এবারও না ঘুরে, নিজের দৃষ্টি কাপড়ের দিকেই নিবদ্ধ রেখে অবলীলায় বলে দেয়,
"না।"
নাজহার মুখে এমন অবজ্ঞা মেশানো কথা শুনে তৌসিরের মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে যায়। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এমন নিরুত্তাপ অভ্যর্থনা ওর মেজাজে আঘাত করে। সে এক ঝটকায় নাজহার একদিকের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে ওকে নিজের দিকে ঘুরায়। আচমকা টানে নাজহা কিছুটা কেঁপে ওঠে। তৌসির নাজহার শান্ত চোখের দিকে তীক্ষ্ণ, ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে রুক্ষ স্বরে বলে,
"কী হইছে? এমন ছিনালা করতাছস ক্যান? এতদিন পর আমি আসছি, তুই খুশ না?"
তৌসিরের এমন কথায় নাজহা ওর শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে খানিকটা কাঠখোট্টা গলাতেই বলে,
"না, আমি খুশি না। হাত ছাড়ুন, কাজ আছে আমার।"
তৌসির হাত তো ছাড়ে না, উল্টো প্রবল এক আক্রোশ আর অধিকারবোধে নাজহাকে এক টানে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে একেবারে মিশিয়ে নেয়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কর্তৃত্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে বলে,
"আমার সামনে কাজের বাহানা চু*দা*ইস না বলে দিলাম। কী বা*ল ফালাবি যে আমার থাইকা তোর কাজ জরুরি!"
তৌসিরের শক্তপোক্ত বুকে সজোরে আছড়ে পড়তেই নাজহার এতক্ষণের জমানো সব মান-অভিমান, রাগ আর কাঠিন্য নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে যায়। তৌসিরের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে চোখ জোড়া আপনাআপনিই বুজে আসে ওর। বুকভরে শ্বাস টেনে নেয় সে। পুরুষালি ঘামের সাথে মিশে থাকা তৌসিরের শরীরের অতি পরিচিত উগ্র ঘ্রাণটা ওর নাসারন্ধ্র দিয়ে সোজা মগজে গিয়ে আঘাত করে। মনে হয়, যুগ যুগ পেরিয়ে সে তার হারিয়ে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থলটা খুঁজে পেয়েছে। নাজহা তৌসিরের বুকেই মাথা গুঁজে রেখে নিজের গলতে শুরু করা সত্তাকে আড়াল করে শান্ত স্বরে বলে,
"আমার কাজ অনেক আছে। যান, গোসল করে নিন।"
কিন্তু তৌসিরের আজ কোনো তাড়া নেই, নেই কোনো বাধা মানার ইচ্ছে। সে নাজহার মাথাটা নিজের বুক থেকে আলতো করে তুলে ধরে। ওর দুই হাতের আজলায় নাজহার ছোট মুখশ্রীটা আটকে নিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেয় ওর কোমল গাল। তৌসিরের রক্তজবা চোখে এখন তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর দীর্ঘদিনের জমানো শূন্যতার হাহাকার। সে আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করে না। পাগলের মতো নাজহার কপালে, দুই গালে, বন্ধ চোখের পাতায় আর নাকের ডগায় একের পর এক এলোমেলো, উষ্ণ চুমু এঁকে দিতে থাকে। প্রতিটি চুমুতে মিশে আছে না-বলা তীব্র এক তৃষ্ণা, একবুক হাহাকার। এরপর তৌসির ওর অধৈর্য হয়ে ওঠা তপ্ত ঠোঁটজোড়া প্রবল বেগে ডুবিয়ে দেয় নাজহার পেলব, গোলাপি ঠোঁটে।
শুরু হয় এক বন্য, তীব্র অধিকার খাটানো চুম্বন। নিবিড় থেকে নিবিড়তর হতে থাকে তাদের ঠোঁটের যুদ্ধ, এই একটা মুহূর্তের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা করে ছিল সে। তৌসিরের চুম্বনের তীব্রতায় নাজহার শ্বাস আটকে আসার উপক্রম হয়, ওর শরীর কাঁপতে থাকে, তবু তৌসির ছাড়ে না। নাজহা নিজের অজান্তেই দুহাত তুলে তৌসিরের শার্টের কলারটা খামচে ধরেছে। দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর এক চুম্বনের পর পরিশ্রান্ত হয়ে তৌসির থামতেই দুজনের বুকের ওঠানামা বেড়ে যায়। তৌসির নাজহার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখেই হাঁপানো, নেশাজড়ানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
"এই চুমুটা খাওয়ার জন্য আমার ঠোঁটজোড়া কতটা তৃষ্ণার্ত ছিল, তুই জানস?"
নাজহা আচ্ছন্ন অবস্থায় তৌসিরের শার্টের কলারটা শক্ত করে খামচে ধরেই আধবোজা চোখে, ঘোরলাগা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
"গোসল করুন... গন্ধ করছে ঘামের।"
নাজহার মুখে এমন সময়েও এই কথা শুনে তৌসির মুচকি হাসে। ওকে আরও শক্ত করে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে, একদম পাঁজরের সাথে জড়িয়ে ধরে। বুকভরা শান্তিতে চোখ বুজে, নাজহার চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে,
"তোর কথা অনেক মনে পড়ত। কৈতরি গো আমাদের ছোট্ট ছানাপোনা তো বড় হয়ে গেছে।"
তৌসিরের কথার কোনো দীর্ঘ জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না নাজহা। সে তার অপেক্ষার প্রহর শেষে এই নিরাপদ বুকে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়ে, তৌসিরের চওড়া পিঠে আলতো করে হাত রেখে খুব ছোট্ট আর তৃপ্তিময় কণ্ঠে উত্তর দেয়,
"হুম..."
তৌসিরের ঠিক পাশের ঘরটিতেই তৃষ্ণা আর ওয়াসেমের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারা দিনের ক্লান্তি আর একরাশ নিশ্চুপতা নিয়ে তৃষ্ণাকে সঙ্গে করে রুমে এসে প্রবেশ করে ওয়াসেম। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা ভীষণ ছিমছাম আর শান্ত। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, নিষ্প্রভ আলোয় পুরো ঘরটাতে এক অচেনা গুমোট ভাব বিরাজ করছে। এই গুমোট পরিবেশটা অবিকল তাদের দুজনের মাঝখানে জমে থাকা দূরত্বেরই প্রতিচ্ছবি। তৃষ্ণা ঘরের ঠিক মাঝ বরাবর একটা পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি মেঝের কার্পেটে নিবদ্ধ, চোখে কোনো ভাষা নেই, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
ওয়াসেম আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা লাগেজের কাছে চলে যায়। সযত্নে চেইন টেনে লাগেজ খোলে সে। ভেতরে রাখা পরিপাটি পোশাকগুলো থেকে অতি সাবধানে একটা হালকা রঙের সুতির থ্রি-পিস বের করে আনে। তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে গিয়ে কোমল, মোলায়েম আর শান্ত গলায় সে বলে,
"যা, ফ্রেশ হয়ে এটা পড়ে নে।"
তৃষ্ণা কোনো উত্তর দেয় না। এমনকি ওয়াসেমের চোখের দিকে একবার তাকানোরও বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করে না সে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কোনো অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই, কিংবা থাকলেও তৃষ্ণার কাছে তার কোনো মূল্য নেই। সে শুধু যান্ত্রিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে থ্রি-পিসটা নিজের হাতে তুলে নেয়, আর ধীর, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।
ওয়াশরুমের দরজাটা হালকা শব্দ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, বদ্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয় ওয়াসেম। বুকের একেবারে অতল থেকে এক ভারী, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। আজ কতদিন হলো? দিন, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস পেরিয়ে গেছে, পুরো নব্বইটা দিন! কিন্তু তৃষ্ণা তার সাথে একটাও কথা বলে না। একটা টুঁ শব্দও না। অভিমান, ক্ষোভ আর না-বলা কষ্টের বরফ জমতে জমতে দুজনের মাঝে এক দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড় তৈরি হয়েছে। তবে এত হতাশার মাঝেও আজ দীর্ঘ সময়ের এই বদ্ধ জীবনে একটা সামান্য পরিবর্তন এসেছে। আজ তৃষ্ণা হেসেছে। হয়তো খুব সামান্য, হয়তো ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু একটু হলেও তো হেসেছে! সামান্য একচিলতে হাসিই ওয়াসেমের মৃতপ্রায় আশার প্রদীপে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। সে মনে মনে ভাবে, হয়তো কোনো একদিন এই বরফ গলবে, হয়তো কোনো একদিন তৃষ্ণা আবার তার দিকে তাকিয়ে আগের মতো কথা বলবে।
কিছুক্ষণ পর পানির শব্দ থেমে যায়। পোশাক বদলে, ভেজা চুল নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে তৃষ্ণা। তার মুখশ্রীতে পানির ফোঁটাগুলো চিকচিক করছে, আর ভেজা চুলের কারণে তাকে আরও বেশি ফ্যাকাশে আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। তাকে দেখতে পেয়ে ওয়াসেম ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। বিছানায় পড়ে থাকা ওড়নাটা নিজের হাতে তুলে নেয় সে। তারপর প্রগাঢ় মমতায়, বেশ সাবধানে তৃষ্ণার গায়ে ওড়না জড়িয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে,
"খাবার কি এখানেই নিয়ে আসব? নাকি নিচে যাবি সবার সাথে খেতে?"
তৃষ্ণা বরাবরের মতোই নিশ্চুপ রয়। ওয়াসেমের এই সুতীব্র যত্নের, এই ব্যাকুল প্রশ্নের কোনো জবাব সে দেয় না। তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা চুল মুছতে মুছতে সে ওয়াসেমকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ব্যালকনির দিকে চলে যায়। তার এই বাক্যহীন অবহেলা ওয়াসেমকে নতুন করে আহত করে না, বরং একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে বাধ্য করে। কিছু করার নেই, এটাই এখন তার নিয়তি। নিজের কৃতকর্ম অথবা ভাগ্যের লিখন যেটাই হোক না কেন, এই শাস্তি তাকে মাথা পেতে নিতেই হবে। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে ওয়াসেম গোসল দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই এক অস্বস্তিকর আর দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তৃষ্ণা। বাইরের হিমেল বাতাস তার ভেজা শরীর ছুঁয়ে গেলেও, মনের ভেতরের শূন্যতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করতে থাকে। নিঝুমতা ভেঙে হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে হাসির শব্দ। একটু ইতস্তত হয়ে পাশে তাকাতেই সে দেখতে পায়, ঠিক পাশের ব্যালকনিতেই ইয়াদ আর নওরি নিজেদের মতো করে ফাইজলামিতে মেতে আছে। ইয়াদের চোখে-মুখে উপচে পড়া প্রেম, সে বুকভরা আদরে নওরিকে পাঁজাকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে। আর নওরির গালে, গলায়, কপালে একের পর এক ভালোবাসার অসংখ্য চুম্বন এঁকে দিচ্ছে সে। নওরিও এই আদরের বন্যায় ভেসে গিয়ে খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। তাদের এই উচ্ছ্বাস, এই প্রাণবন্ত প্রেম আর দুজনের প্রতি দুজনের এই তীব্র অধিকারবোধ চারপাশের পরিবেশকে কতটা জীবন্ত করে তুলেছে!
এই দৃশ্যটা তৃষ্ণার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার বুকের ভেতরটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। একটা তীব্র হাহাকার তার শ্বাসনালী চেপে ধরে। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারে না। শব্দহীনভাবে ব্যালকনি ছেড়ে সে ঘরের ভেতর চলে আসে। সবার জীবন কত সুন্দর, কত স্বাভাবিকভাবেই না এগিয়ে যাচ্ছে! যাওয়ারই তো কথা। শুধু মাঝখান থেকে তার নিজের জীবনটাই তিলে তিলে শেষ হয়ে গেল। কোনো কারণ ছাড়াই তার সাজানো গোছানো পৃথিবীটা এক লহমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো।
বিছানায় এসে ধপ করে বসে পড়ে সে। তার মনের ভেতর উঁকি দিতে শুরু করে হাজারো নেতিবাচক আর যন্ত্রণাদায়ক ভাবনা। ওয়াসেম তো একজন স্বাভাবিক পুরুষ মানুষ। সে আর কতদিনই এই নিশ্চুপতা, এই দূরত্ব, এই প্রাণহীন সম্পর্কটা মেনে নেবে? দিনের পর দিন একটা লাশের সাথে তো আর সংসার করা যায় না! নিশ্চিত এক-দু মাস পর সেও হাঁপিয়ে উঠবে। নিজের মতো করে নতুন কাউকে বিয়ে করবে, নতুন করে সংসার সাজাবে। নতুন বউয়ের সাথে হাসবে, কথা বলবে, ভালোবাসবে। আর তৃষ্ণা? সে নিশ্চিতভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মরবে। চার দেয়ালের মাঝে নিজের অতীত আর কষ্টগুলোকে বুকে চেপে একাই শেষ হয়ে যাবে। পৃথিবীর আলো, বাতাস, ভালোবাসা সবকিছু থেকেই সে চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যাবে।
এইসব ভেবে তৃষ্ণার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। তার মনে হতে থাকে, পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চনা নিশ্চিতভাবে তার ভাগ্যেই লেখা। তার সাথেই সব জুলুম হলো, সব অবিচার শুধু তার সাথেই হলো! বিছানায় বসে দুই হাঁটুর মাঝে নিজের মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চোখের পানি ফেলতে থাকে সে। তার কান্নার কোনো শব্দ নেই, কিন্তু শরীরটা তীব্র আবেগে কাঁপতে থাকে। চোখের উষ্ণ জলে ভিজে যেতে থাকে তার পোশাক।
ঠিক এই লগ্নে গোসল শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ওয়াসেম। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে তার চোখ যায় বিছানার দিকে। তৃষ্ণাকে এভাবে দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়। তার মনে হয় তার বুকের বাম পাশটায় কেউ সজোরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে, কলিজাটা আক্ষরিক অর্থেই ব্যথায় মুচড়ে ওঠে তার। তৃষ্ণার এই বোবা কান্না তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
সে ভীষণ ধীর পায়ে, শব্দহীনভাবে তৃষ্ণার কাছে এগিয়ে যায়। বিছানায় তৃষ্ণার পাশে বসার সাহস তার হয় না। সে সোজা বিছানার নিচে, তৃষ্ণার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়ে। তারপর অসীম মমতায়, এক অভাবনীয় সতর্কতায় তৃষ্ণার একটা পা টেনে নিয়ে নিজের উরুর ওপর রাখে সে। তৃষ্ণার পায়ের পাতা নিজের দুই হাতে ঢাবোর মতো ধরে, তৃষ্ণার উরুতে মাথা নুইয়ে দেয় ওয়াসেম। তার নিজের চোখ দুটোও এই মুহূর্তে জলে টলমল করছে। নিদারুণ শান্ত, ভারী আর আর্দ্র গলায় সে বলতে শুরু করে,
"কাঁদিস না পৃথিবীর সবাই তোকে ছেড়ে গেলেও আমি যাব না। আমি ছিলাম, আমি আছি, আর আজীবন তোর পাশেই থাকব। তুই যেমন আছিস, ঠিক তেমনই থাকব। কাঁদিস না তোর চোখের পানি মুছার যোগ্যতাটুকুও যে আজ আমার নেই।"
তৃষ্ণা এবারও কোনো কথা বলে না, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সে আগের মতোই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ওয়াসেম শুধু তৃষ্ণার পা জড়িয়ে ধরে, মাথা নিচু করে নিশ্চল হয়ে মেঝেতে বসে থাকে। তাদের দুজনের মাঝখানে আবারও নেমে আসে এক ভারী, দমবন্ধ করা বাক্যহীনতা। এ কোনো নতুন দৃশ্য নয়, এভাবেই চলছে তাদের জীবন। বিগত তিনটি মাস ধরেই এই নিস্পন্দতার চাদর মুড়িয়েই তারা দুজন বেঁচে আছে পাশাপাশি, অথচ যোজন যোজন দূরে।
রাতের বেলা। চারপাশের পৃথিবী পুরোপুরি শব্দহীন, চারদিকে গাঢ় ঘুমের আবেশ। কিন্তু তৌসিরের ঘরের ভেতরের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। বড় বিছানার ঠিক মাঝখানে এখন চলছে এক তুমুল দস্যিপনা। সাড়ে সাত মাসের তিন জমজ ভাইবোনের একচ্ছত্র আধিপত্যে বিছানাটা আস্ত একটা খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।
তৌসির খালি গায়ে, দুই হাত দু'দিকে ছড়িয়ে একপ্রকার আত্মসমর্পণ করে বিছানায় শুয়ে আছে। তার চওড়া বুকের ডানপাশে রাজত্ব করছে দলের সবচেয়ে জেদি আর পেটুক সদস্য, তুরাব। তার সাড়ে সাত মাসের এই ছোট্ট শরীরে নধর চর্বির মেলা হাতের কবজিতে, মাংসাল উরুতে টায়ারের মতো খাঁজকাটা ভাঁজ। তার ছোট ছোট, পেলব আঙুলগুলো তৌসিরের বুকের কালো লোমগুলো শক্ত করে খামচে ধরে আছে। তুরাবের ছোট ভ্রু দুটো ভীষণ বিরক্তিতে কুঁচকানো। মায়ের বুকের উষ্ণতা আর দুধের স্বাদ সে অবুঝের মতো বাবার এই শক্ত বুকে খুঁজছে। নিজের গোলাপি, ছোট্ট ঠোঁট দুটো গোল করে তৌসিরের বুকে মুখ ঘষে কাঙ্ক্ষিত তরল বের করার এক আপ্রাণ, ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। ক্ষণে ক্ষণে হতাশ হয়ে ছোট ছোট পা ছুঁড়ে তৌসিরের পেটে লাথি মারে আর আধো আধো বোলে নালিশের সুরে বলে উঠছে,
"বু বু বুবু... বা বা বাবা!"
অন্যদিকে, নাওয়াব বেশ চঞ্চল আর ফন্দিবাজ। সে এতক্ষণ তুরাবের মতোই চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার ছোট্ট মস্তিষ্ক যখন বুঝতে পারে বাবার এই বুক থেকে এক ফোঁটাও দুধ জুটবে না, নিমিষেই সে কৌশল পালটে ফেলে। নাওয়াব এখন গুটিগুটি পায়ে, কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে তৌসিরের বাঁ ঘাড়ের কাছে উঠে এসেছে। তার গাল বেয়ে অনবরত লালা ঝরছে, যা দিয়ে তৌসিরের ঘাড় আর কলারবোন ভিজে একেবারে একাকার। তার সাড়ে সাত মাসের ফোকলা মাড়িতে এখন নতুন দাঁত ওঠার শিরশিরে অনুভূতি, তাই হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাতেই কামড় বসিয়ে শান্তি খুঁজছে সে। ফোকলা মাড়ি দিয়ে সে তৌসিরের কানে, গলায় আর থুতনিতে অবিরাম কামড় বসিয়ে চলেছে। তার দাঁতের মাড়ির চাপে আর গরম লালার ভেজা স্পর্শে তৌসিরের শরীরে অন্যরকম এক সুড়সুড়ি আর অস্বস্তির সৃষ্টি হচ্ছে। নাওয়াবের গোল গোল, ডাগর চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করছে, আর কামড়ের ফাঁকে ফাঁকেই সে খিলখিল করে হাসতে হাসতে আপন মনেই বকে চলেছে,
"তা তা তারা... বু বু বুবু!"
আর এসবের মাঝে, তৌসিরের চওড়া বুকের ঠিক মাঝখানটায় বসে থাকা তৌশির পৃথিবীর কোনো দিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই। তৌশির গায়ের রং টা তো কাঁচা দুধের মতো ফর্সা, আর টোল পড়া গাল দুটো ঠিক আপেলের মতো ফোলা ফোলা। ওর পরনে একটা ছোট, গোলাপি রঙের সুতির নিমা, যা ওকে দেখতে একদম একটা জীবন্ত পুতুলের মতো করে তুলেছে। তৌশি তার বাবার এই নাকাল অবস্থা দেখে মোটেও বিচলিত নয়। তার পুরো মনোযোগ এখন বাবার মুখের ওপর। সে তার তুলার মতো আঙুলগুলো তীব্র কৌতূহলে তৌসিরের নাকের ছিদ্রে ঢোকাচ্ছে, আবার বের করছে। এরপর আঙুলগুলো তৌসিরের ঠোঁট ফাঁক করে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তৌসির বাধ্য হয়ে মুখ হাঁ করে আছে ভয়ে, যদি আদরের মেয়ের কচি আঙুলে একটুও ব্যথা লাগে! তৌশি একটা নতুন, মজার খেলনা পেয়েছে। বাবার নাক-মুখ নিয়ে খেলতে খেলতে সেও নিজের মতো করে গল্প জুড়ে দেয়, মিষ্টি আর সুরেলা গলায় বলে ওঠে,
"বা বা বাবা... তা তা তারা!"
বাচ্চাদের এই ত্রিমুখী, মিষ্টি আক্রমণে তৌসির রীতিমতো দিশেহারা। অথচ, তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই বরং সেখানে উপচে পড়ছে সীমাহীন তৃপ্তি আর পিতৃত্বের এক অনবদ্য সুন্দর অহংকার। তার মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সমস্ত প্রশান্তি আজ এই বিছানাতেই এসে জড়ো হয়েছে। তৌসির বেশ সাবধানে তৌশির লালা-মাখা ছোট আঙুলগুলো নিজের মুখ থেকে বের করে আনে। তারপর আদুরে হাতের তালুতে বুকভরা ভালোবাসায় একটা দীর্ঘ চুমু খায়। তৌশির মায়াকাড়া বড় বড় নীলচে চোখের দিকে তাকিয়ে, গলাটা একদম খাদে নামিয়ে, আর্দ্র কণ্ঠে ডাকে,
"আমার পুতুলটা কই রে?"
বাবার এই আদুরে ডাক আর মুখের ভঙ্গি দেখে তৌশি বেশ মজা পায়। সে তার ভারী শরীরটা দুলিয়ে, ফোকলা মুখে প্রাণখুলে হেসে ওঠে। হাসির চোটে ওর মুখ থেকে একদলা থুতু ফসকে সোজা এসে পড়ে তৌসিরের বুকে। তৌসির স্নেহভরে থুতুটা হাত দিয়ে মুছে, ঘাড় ঘুরিয়ে ডানপাশে সংগ্রামরত তুরাবের দিকে তাকায়। তুরাব এখনও জেদের বশে বুকের লোম টানছে আর "বু বু বুবু" শব্দ করে নিজের রাগ জানান দিচ্ছে। তৌসির হাসতে হাসতে বলে,
"বৃথা চেষ্টা করিস না বাপ আমার! তুই যা খুঁজছিস, তা দেওয়ার সাধ্য একমাত্র তোর মায়ের আছে।"
কথাগুলো বলে তৌসির নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। সে তার প্রশস্ত হাত দিয়ে একপাশে অভিমানী তুরাব আর অন্যপাশে চঞ্চল নাওয়াবকে টেনে নিজের বুকের আরও কাছে নিয়ে আসে। তৌশি বুকের মাঝখানেই বসা। তিন সন্তানকে একসাথে জড়িয়ে ধরে তাদের পাউডার আর বেবি-লোশন মাখা সুবাসিত গালে, কপালে, রেশমি চুলে এলোপাতাড়ি চুমু খেতে শুরু করে তৌসির। বাচ্চারাও বাবার এই আকস্মিক আদরে উচ্ছ্বসিত হয়ে, "বা বা বাবা... তা তা তারা... বু বু বুবু" শব্দে পুরো ঘর মুখরিত করে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে। ভালোবাসায় মোড়ানো রাতের প্রহরগুলো এই চারজনের হাসিতে এক অনাবিল আনন্দে রূপ নেয়।
ঠিক এমন সময় ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা সামান্য ক্যাঁচ শব্দ করে খুলে যায়। নাজহা ঘরে ঢোকে। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। পরনে একটা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো এলোমেলোভাবে ক্লিপ দিয়ে আটকানো। তাকে আসতে দেখে তৌসির খেলা থামিয়ে দেয়। বিছানায় শুয়ে থেকেই সে একদৃষ্টিতে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘড়ির দিকে একঝলক তাকিয়ে তৌসির একটু রাশভারী গলায় বলে,
"এত দেরি হলো ক্যান? রাত তো বারোটা বাজতে চলল!"
নাজহা তৌসিরের কথার কোনো গুরুত্ব দেয় না। আলমারি থেকে একটা পাতলা সুতির টি-শার্ট আর বেশ ঢিলেঢালা একটা প্লাজো হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। দরজার কাছে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নির্লিপ্ত আর রূক্ষ কণ্ঠে বলে,
"তাতে আপনার কী? আপনি তো ফ্রি মানুষ। চুপচাপ ওদের ঘুম পাড়িয়ে নিজে ঘুমিয়ে যান। আমার কৈফিয়ত আপনার না নিলেও চলবে।"
বলেই সে ধড়াস করে ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। নাজহার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তৌসিরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তির সুরে সে বিড়বিড় করে ওঠে,
"ছিনাল কোনখানের! তেজ আর কমে না তোর সাউয়ার।"
প্রায় বিশ মিনিট পর নাজহা গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। তার ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরছে। বাতাসে একটা হালকা, মিষ্টি বডি ওয়াশের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শরীরে বডি লোশন মাখে, মুখে মস্টারাইজার লাগায়। এই সময়টুকুর মধ্যে বিছানায় একটা পরিবর্তন এসে গেছে। তৌসিরের উষ্ণতা আর আদরে ক্লান্ত হয়ে তৌশি আর তুরাব এতক্ষণে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় বাচ্চাদের জান্নাতের ফুল মনে হচ্ছে। তৌশি তৌসিরের বাঁ বাহুতে মাথা রেখে, তার ছোট্ট শরীরটা কুঁচকে, বাবার বুকের সাথে লেপ্টে ঘুমোচ্ছে। ওর ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক হয়ে আছে, আর সেখান দিয়ে নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আসছে। অন্যদিকে তুরাব তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দুই হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে, তৌসিরের বুকের ডান পাশে অনেকটা জায়গা দখল করে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওর ফোলা ফোলা গাল দুটো ঘুমের ঘোরে আরও তুলতুলে লাগছে।
কিন্তু নাওয়াবের চোখে ঘুমের কোনো নামগন্ধ নেই। সে তৌসিরের পেটের কাছে পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলছে আর মাঝে মাঝে নিজের পায়ের আঙুল মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নাজহা স্কিনকেয়ার শেষ করে বিছানায় আসে। খুব সাবধানে, যাতে বাকি দুটোর ঘুম না ভাঙে, সে তৌসিরের পাশে বসে। তারপর দুই হাত বাড়িয়ে ছটফট করতে থাকা নাওয়াবকে কোলে তুলে নেয়। নাওয়াব মাকে পেয়েই খাবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। নাজহা বিরক্তি আর ক্লান্তি মেশানো গলায় বলে,
"তুই ঘুমাবি না, তা আমি জানতাম। আজরাইলের বাচ্চা একটা! সারাদিন জ্বালিয়েও তোর শান্তি হয় না।"
তৌসির এতক্ষণ চুপচাপ নাজহার কাজগুলো দেখছিল। নাজহার মুখে 'আজরাইলের বাচ্চা' শুনে তার মেজাজটা একটু খারাপ হয়। সে হাত বাড়িয়ে নাজহার পেটের উন্মুক্ত অংশে আলতো করে একটা চিমটি কেটে বলে,
"আমার পোলা কী করছে লো ছিনাল, যে এমনে ধমকাইতেছস? ও তো অবুঝ বাচ্চা।"
নাজহা তৌসিরের স্পর্শে শিউরে ওঠে। সে দ্রুত তৌসিরের হাতটা খামচে ধরে সরিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলে,
"কী করছে মানে? ও তো সবচেয়ে বেশি জ্বালায় আমাকে। বাকি দুইটা মিলে সারাদিনে যতটা জ্বালায়, ও একাই ততটা জ্বালায়। এর মধ্যে আবার নতুন নমুনা শুরু করছে দু'দিন ধরে।"
তৌসির কপাল কুঁচকে, কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠে বসে। বাচ্চাদের ব্যাপারে সে সবসময়ই একটু বেশি সংবেদনশীল। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে,
"কেন, কী করছে আবার?"
নাজহা এতক্ষণে নিজের টি-শার্টটা একটু ওপরে তুলে নাওয়াবকে ডান বুকে দুধ খেতে দেয়। নাওয়াব ক্ষুধার্ত ছোট্ট বাঘের মতো তার ছোট্ট মুখ দিয়ে দুধ টানতে শুরু করে। সে দুধ টানার সাথে সাথে নাজহার মুখটা ব্যথায় কুঁচকে যায়। সে যন্ত্রণাকাতর গলায়, বাঁ বুকে হাত দিয়ে চেপে ধরে বলে,
"ওরা এখন শুধু ডান পাশেরটা খায়, বাঁ পাশেরটা একদম মুখে নিতে চায় না। জোর করলেও কান্না জুড়ে দেয়। বাধ্য হয়ে আমাকে পাম্প করে দুধ বের করতে হয়। কিন্তু একা হাতে তিনটাকে সামলে পাম্প করার সময় কোথায়? ব্যথায় বাঁ বুকে দুধ জমে পাথরের মতো শক্ত পাহাড় হয়ে গেছে আজ দু'দিন ধরে। মনে হচ্ছে বুকটা ছিঁড়ে যাবে ব্যথায়।"
তৌসির এটা শুনে সিরিয়াস হয়ে যায়। সে উঠে বসে নাজহার দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসে।
"কী বলস! এতটা সিরিয়াস অবস্থা, আর তুই আমাকে বলিসনি? ডাক্তারের কাছে যাবি? বিবিজানকে বললি না ক্যান? এটা তো অবহেলা করার মতো বিষয় না সাউয়া!"
নাজহা নাওয়াবের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ক্লান্ত স্বরে বলে,
"বলেছিলাম বিবিজানকে। উনি বলছেন পাম্প করে দুধ ফেলে দিলেই নাকি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই জমে থাকা দুধ বের করা যে কতটা কষ্টের, তা কেউ বুঝবে না। ব্যথায় আমি হাতই ছোঁয়াতে পারছি না, সেখানে পাম্প করব কীভাবে? আর ডাক্তার দেখালে হয়তো এমন কোনো কড়া ওষুধ দেবে যাতে দুধ শুকিয়ে যাবে। তাহলে এই তিনজনকে খাওয়াব কী? এটা তো আরেক সমস্যা।"
পুরো ব্যাপারটা শোনার পর তৌসিরের দুশ্চিন্তাটা নিমিষেই একটা দুষ্টু হাসিতে রূপান্তরিত হয়। সে বাঁকা হাসি হেসে বলে,
"দেখ, চিন্তা কইরা দেখ একটা বিষয়!"
"কী?"
নাজহা বিরক্ত হয়ে তাকায়। তৌসির গলাটা আরেকটু খাদে নামিয়ে, রসিকতার সুরে বলে,
"তুই আমাকে ভাগ না দিলেও, আমার পোলাপান কিন্তু ঠিকই আমার ভাগ রেখে দিয়েছে। দেখলি তো, বাঁ দিকেরটা ওরা আমার জন্যই অক্ষত রাইখা দিছে!"
কথাটা বলে তৌসির চোখ টিপে হাসে। নাজহা তৌসিরের দিকে পা গুটিয়ে বসেছিল। তৌসিরের এই কথা শুনে তার কান গরম হয়ে যায়। সে পা দিয়ে তৌসিরের বুকে একটা ধাক্কা মেরে তীব্র ভর্ৎসনার সুরে বলে,
"বন্ধ করুন এসব ফালতু কথা! মানুষের ব্যথায় জান যায়, আর উনার মাথায় ঘোরে শুধু নোংরামি।"
তৌসির ধাক্কা খেয়ে একটু পেছায় বটে, কিন্তু হাসে। এরপর সে খুব সাবধানে ঘুমন্ত তৌশিকে তুলে বিছানার একপাশে সুন্দর করে বালিশ দিয়ে জায়গা মতো শুইয়ে দেয়। তুরাবকেও ঠিকঠাক তার পাশে শুইয়ে দেয়। ওদের দিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। নাইটলাইটের আলোয় বাচ্চাদের পবিত্র মুখগুলো বেশ মনোহর লাগছে। আনন্দে ওর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। তার মনে হয় দুটো ফুটফুটে চাঁদ পাশাপাশি শুয়ে আছে। তৌসির ওদের দুজনের গালে দুটো চুমু খায়।
এতক্ষণে নাওয়াবের পেট ভরে গেছে। মায়ের উষ্ণতায় আর পেট ভরা তৃপ্তিতে সেও ঢুলুঢুলু চোখে ঘুমিয়ে পড়ে। ওর ছোট্ট ঠোঁটের কোণায় এক ফোঁটা সাদা দুধ লেগে আছে। নাজহা সাবধানে নাওয়াবকে বুক থেকে সরিয়ে নিজের টি-শার্ট ঠিক করে। তারপর নাওয়াবকে তৌসিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাই তুলে বলে,
"ওকে তৌশির পাশে শুইয়ে দিন। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। শরীরটা আর চলছে না ব্যথায়।"
তৌসির নাওয়াবকে কোলে নিয়ে ওর কপালে আর গালে চুমু খায়। তারপর ভীষণ সন্তর্পণে তাকে তৌশি আর তুরাবের পাশে শুইয়ে দেয়। তিন বাচ্চাকে বিছানার একপাশে পাশাপাশি শুইয়ে, তাদের চারপাশে কোলবালিশ আর সাধারণ বালিশ দিয়ে একটা সুরক্ষিত দুর্গের মতো তৈরি করে, যাতে ওরা গড়িয়ে পড়ে না যায়।
বাচ্চাদের নিরাপদ করার পর তৌসির ঘুরে নাজহার দিকে এগিয়ে আসে। নাজহা এখন ভেজা চুল থেকে ক্লিপ খুলে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার চোখ দুটো ঘুমে বুজে আসছে, কিন্তু বুকের ব্যথায় সে বারবার মুখ বিকৃত করে। তৌসির কাছে এসে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই নাজহার টি-শার্টের নিচের দিকটা ধরে খুলতে খুলতে বলে,
'দেখি, কী হয়েছে! কতটা ফুলেছে দেখি।'
নাজহা চমকে উঠে তৌসিরের হাতটা চেপে ধরে। বিরক্ত আর ক্লান্ত গলায় বলে ওঠে,
"আপনি দেখে কিছু করতে পারবেন না। আপনার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাকে ঘুমাতে দিন।"
কিন্তু তৌসির কি আর শোনার পাত্র? সে নাজহার হাত সরিয়ে দিয়ে জোর করেই টি-শার্টটা গলার ওপর দিয়ে খুলে ফেলে। যা দেখে, তাতে তৌসিরের নিজেরই বুক কেঁপে ওঠে। নাজহার বাঁ দিকের বুকটা অস্বাভাবিক রকমের ফুলে আছে। ভেতরে সঞ্চিত পুষ্টিতে পূর্ণ হয়ে ওঠা পাত্রের মতো টানটান। চামড়া লাল হয়ে গেছে, নীল শিরাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সাদা জলাধারার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে নীলিম নদীর শাখা। অবস্থা যে আসলেই খুব খারাপ, তা বুঝতে তৌসিরের এক সেকেন্ডও লাগে না। সে আলতো করে হাত বাড়ায় স্পর্শ করার জন্য।
নাজহা ভয়ে আর ব্যথার শঙ্কায় তৌসিরের হাতটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। তার চোখ দিয়ে পানি চলে আসার উপক্রম,
"না... না, প্লিজ... হাত দেবেন না। খুব ব্যথা ওখানে... থাক... প্রয়োজন নেই।"
তৌসির এবার আর নাজহার কোনো আপত্তি শোনে না। সে বেশ সতর্কভাবে অথচ দৃঢ়তার সাথে নাজহার দুই হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে নেয়। বেশ গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখা গলায় বলে ওঠে,
"প্রয়োজন নাই বললেই তো চলে না, নাজহা। সন্তানের জন্য সঞ্চিত এই মাতৃসুধা ভেতরে জমে পাথর হয়ে গেলে তা আর প্রাণদায়ী মাতৃসুধা থাকে না, বিষের মতো যন্ত্রণাদায়ক হইয়া ওঠে। আইজ রাতের মধ্যেই এই জমাট বাঁধা তরল বের না করলে কাল সকালে তোমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসব। এগুলো ভেতরে জমে থেকেই পরে মারাত্মক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তুই সামান্য সহ্য কর, আমি সাহায্য করছি।"
কথাগুলো বলেই তৌসির সন্তর্পণে নাজহার যন্ত্রণাকাতর বক্ষপটে হাত রাখে। শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে থাকা অংশে আঙুলের স্পর্শ পড়তেই নাজহা ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে।
"না... না, না... খুব ব্যথা লাগছে তৌসির! আমাকে ছেড়ে দিন!"
কিন্তু তৌসির জানে এখন থামা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নাজহার কষ্ট কমানোর জন্যই তাকে এই সাময়িক কঠোরতাটুকু পালন করতে হচ্ছে। সে উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে খুব সাবধানে জায়গাটা কোমল করার চেষ্টা করে।
তৌসির সতর্ক হাতে চারপাশটা অনুভব করে দেখে, কোথায় কতটা শক্ত হয়ে আছে। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় নাজহার শরীরে এক চিলতে শিহরণ জেগে ওঠে। অপেক্ষাকৃত শিথিল অংশগুলো পেরিয়ে সে যখন জমাট বাঁধা কঠিন গ্রন্থিগুলোর ওপর আলতো চাপ দেয়, নাজহার গোটা শরীরটা কুঁকড়ে যায়। তার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে এক চাপা গোঙানি,
"আআ... তৌসির, আমি মরে যাব... সত্যি বলছি, মরে যাব..."
তৌসির থামে না এগুলো শুনে। জমাট বাঁধা অংশগুলোতে সে চক্রাকারে আঙুল চালাতে থাকে, উদ্দেশ্য ভেতরের অবরুদ্ধ পথটা খুলে দেওয়া। প্রতিটা চাপে নাজহার শরীরটা একবার করে কেঁপে ওঠে। ব্যথার তীব্রতায় তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে থাকে, তার ভেজা চুলের সাথে মিশে যাওয়া ঘামের স্রোত গাল বেয়ে বালিশে গিয়ে পড়ে।
এরপর তৌসির আরও একটু শক্ত হাতে কিন্তু বেশ সযত্নে মালিশের গতি বাড়ায়, ভেতরে জমে থাকা স্রোতকে তার মুক্তির পথ দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টায়। প্রথম কিছুক্ষণ কিছুই হয় না, জমাট বাঁধ এতটাই শক্ত যে তৌসিরের নিজের আঙুলেই ক্লান্তি নেমে আসে। সে আবারও চাপ দেয়, সাবধানে।
নাজহা দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করে, মাথা এদিক-ওদিক ঘোরাতে থাকে। ব্যথার স্রোত তার প্রতিটি স্নায়ুতে সরাসরি আঘাত হানে,
"আআআহ! না... না... আর পারছি না... আমি পারছি না তৌসির! বুকটা ফেটে যাবে...ফেটে যাবে আমার কলিজা তৌসির!"
বেশ কিছুক্ষণ অবিরাম চেষ্টার পর হঠাৎ এক ফোঁটা শুভ্র নির্যাস বেরিয়ে আসে। আর ঠিক মুহূর্তেই নাজহার শরীরে প্রথমবারের মতো অভাবনীয় এক অনুভূতি নেমে আসে অবিরত যন্ত্রণার মাঝে এক চিলতে স্বস্তির বাতাস। এরপর দ্বিতীয় ফোঁটা, তারপর ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ স্রোত মুক্তি পেতে শুরু করে। প্রতিটি ফোঁটা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ভেতরের অবরুদ্ধ ভার একটু একটু করে কমতে থাকে, ঠিক বেলুনের মুখ খুলে দিলে বাতাস বেরিয়ে ভারমুক্ত হয়ে যাওয়ার মতো। তৌসিরের মুখে প্রথমবারের মতো স্বস্তির রেখা ফোটে, কিন্তু তার হাত থামে না।
ভেতরের তরল বেরিয়ে আসার সাথে সাথে নাজহার কষ্ট আর আরাম একসঙ্গে শরীরে ভর করে। শক্ত অংশটা গলতে শুরু করায় সাময়িক ব্যথা হয় ঠিকই, কিন্তু চোখ দিয়ে পড়া পানির সাথে মিশে থাকে মুক্তির স্বাদও। সে ঘন ঘন শ্বাস নেয়, গলা ভাঙা ভাঙা,
"থামুন... একটু থামুন... দুই মিনিট... প্লিজ দুই মিনিট থামুন নাহ... আমি শ্বাস নিতে পারছি না..."
তৌসির এক মুহূর্তের জন্যও হাত সরায় না। সে শুধু ঝুঁকে পড়ে নাজহার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
"থামলে আবার জমে যাবে... যে বাঁধটা ভেঙেছে, সেটা শেষ না করলে সব বৃথা। একটু সহ্য কর... শুধু আর একটু।"
নাজহা ব্যথায় কেঁদে উঠতে চায়। বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে তৌসির মুহূর্তের মধ্যে নাজহাকে নিজের প্রশস্ত বুকে জড়িয়ে ধরে। তার মাথায় ভীষণ আদরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তৌসিরের বুকের আড়ালে নাজহার সমস্ত আর্তনাদ চাপা পড়ে যায়। মুখ গোঁজা থাকায় তার চিৎকারগুলো এক কাঁপা কাঁপা গোঙানিতে রূপ নেয়।
তৌসিরের হাতের উষ্ণতায় জমে থাকা শক্ত অংশগুলো ভাঙতে শুরু করে। বরফ জমে যাওয়া পুকুরের গায়ে ফাটল ধরে জল বেরিয়ে আসার মতো, জমাট তরল গলে গিয়ে ঝরতে থাকে। আর এখানেই নাজহার শরীরে কষ্টের মানচিত্র বদলাতে শুরু করে। আগে ছিল এক অবিরত যন্ত্রণা এখন প্রতিটি কাঁপুনির পরে তৈরি হচ্ছে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা, আর সেখানে নেমে আসছে এক পশলা উষ্ণ স্বস্তি। শরীরের ভেতর থেকে একটা একটা করে পাথরের বোঝা বেরিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হচ্ছে তার। ব্যথার স্রোত এখন আরামের স্রোতে মিশে যায় বেরিয়ে যাওয়া শুভ্র নির্যাসের সাথে সাথে দূর হয়ে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমে থাকা সমস্ত ভার আর জ্বালা।
তৌসিরের নিজেরও কপালে ঘাম জমে ওঠে, আঙুলগুলো ক্লান্ত হয়ে আসে, তবু সে থামে না। বুকের জমাট কঠিন অংশটা যতক্ষণ না পুরোপুরি কোমল হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে, ততক্ষণ সে মনোযোগ দিয়ে শুশ্রূষা চালিয়ে যায়।
প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট পর তৌসির নাজহাকে ছেড়ে দেয়। ততক্ষণে নাজহার ভেতরের জমাট বাঁধা ভারী যন্ত্রণা অনেকটাই গলে গিয়ে বেরিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে যাওয়া নদীর মতো ভেতরের ভার নেমে যায়।
সমস্ত ভার সরে যাওয়ার পর যে আরাম নাজহার শরীরে নামে, তা পুরো রাতের কষ্টের ঠিক উল্টো চিত্র। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও পাথর জমে ছিল, সেখানে এখন প্রশান্তিকর এক উষ্ণতা। তার মনে হয় তার শরীরটা এখন সম্পূর্ণ ভারমুক্ত, মেঘহীন আকাশের মতো শান্ত। ব্যথার জায়গায় এখন এক প্রশান্তিদায়ক, নিস্তেজ স্বস্তি। নাজহা রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা আহত সৈনিকের মতো, ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়া লতার মতো বিছানায় শুয়ে থাকে। তার চোখ বন্ধ, ঘন ঘন শ্বাস পড়ে। তবে এবার শ্বাসের ছন্দ যায় বদলে এখন প্রতিটি শ্বাস বুকের ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে, আনন্দে ওঠানামা করে।
তৌসির উঠে দাঁড়ায়। ওয়াশরুম থেকে একটি সুতির তোয়ালে ঈষদুষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে এনে সযত্নে, খুব সাবধানে নাজহার শরীর মুছে দেয়। গরম ভেজা তোয়ালের ছোঁয়া লাগতেই নাজহার শরীরে আরেকটা স্বস্তির ঢেউ খেলে যায় ক্লান্ত ত্বকের ওপর এই উষ্ণতা ভালোবাসার মতোই আরামদায়ক। এরপর ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে নাজহার মাথার নিচে হাত দিয়ে তাকে সামান্য তুলে ধরে তৌসির শান্ত গলায় বলে,
"পানিটা খা!"
নাজহা কোনো কথা না বলে বাধ্য মেয়ের মতো কয়েক ঢোঁক পানি খায়। পানি খেয়ে তৌসিরের হাতে গ্লাসটা ফেরত দিতে দিতে সে দুর্বল, ভাঙা কণ্ঠে বলে,
"ব্যথাটা অনেকটা কমেছে। ধন্যবাদ। আমি এখন ঘুমাব। আলমারি থেকে একটা পরিষ্কার টি-শার্ট এনে দিন আমাকে।"
তৌসির গ্লাসটা টেবিলে রেখে ফিরে আসে। কিন্তু সে টি-শার্ট আনার বদলে নাজহাকে এক টানে নিজের কোলে তুলে নেয়। নাজহা চমকে উঠে কিছু বলার আগেই তৌসির তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে, এক নেশাজাতীয় মাদকতাপূর্ণ গলায় বলে,
"তোর ব্যথা তো আমি কমিয়ে দিলাম। কিন্তু আমার পাওনা কে মেটাবে?"
নাজহা তৌসিরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে শরীরটা শক্ত করে ফেলে। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে রুক্ষ গলায় বলে,
"কিসের পাওনা? ছাড়ুন আমাকে।"
"এই তিন মাসের পাওনা!"
এ শুনে নাজহা এবার সত্যিই রেগে যায়। তার ভেতরের জমে থাকা অভিমান আর ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
"আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম না, এসব নিয়ে আর কোনো নাটক করবেন না! আমাদের সম্পর্ক শুধু তিন বাচ্চার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমার তিনটে বাচ্চার বাবা আপনি, এটুকুই আপনার পরিচয়। এর বাইরে আপনার সাথে আমার স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক নেই, আর কোনোদিন হবেও না!"
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 75 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন