#স্নিগ্ধবিষ—৭৫(শেষাংশ)
তৌসির কথাটা শুনে এক মুহূর্ত থমকে থাকে। তারপর সে নাজহার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে খুব ধীর অথচ ভয়ংকর এক গলায় বলে,
"তোর এ সাউয়া বা*ই*নচুদ মার্কা কথাগুলো এখন বন্ধ কর মাঙ্গের নাতিন। অনেক সহ্য করছি তোর এই সাউয়ার কাহিনি। আর রাগ চু*দা*ইস না। এখন আমার তোরে লাগব মানে লাগবই, এটাই শেষ কথা। এত কথা শোনার মতো সময় আমার নাই। এতটা দিন পর, এত মাস পাগলের মতো থাকার পর, আজ একটু শান্তিতে আসছি, আর তুই এখনও পুরানো ক্যাচাল শুরু করছস! তুই কি ভুলে গেছস, তোর বাপ আমার চাচাতো ভাইকে খুন করছিল? ভুলে যাস না কথাগুলো!"
তৌসিরের কথাগুলো চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে নাজহার গায়ে। অতীতের ভয়ংকর স্মৃতি অপরাধের বোঝা সবকিছু মিলে নাজহাকে পাগল করে দেয়। সে তৌসিরের কোল থেকে নিজেকে তীব্র আক্রোশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ঝাঁঝালো, তীক্ষ্ণ গলায় নাজহা ফুঁসে ওঠে,
"আমি তো বললামই, আমার চাই না আপনাকে! বুঝতে পারছেন না আপনি কী বলছি? এখন কি আপনি গায়ের জোরে সব করবেন আমার সাথে? নিজের মতো চাহিদা মেটানোর জন্য আমাকে ব্যবহার করবেন? আমি আপনার চাহিদা মেটানোর কোনো সস্তা বস্তু নই যে এভাবে হুকুম করবেন। সারাদিন বাচ্চাদের সামলে আমার শরীর আর চলছে না, আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাব। আপনার যদি এতই প্রয়োজন হয়, তবে যান না, আরেকটা বিয়ে করুন! নাহয় আপনার বিবিজানের পতিতালয়ে যান। আমাকে ছাড়ুন!"
তৌসির বুঝতে পারে নাজহা ভীষণ বিগড়ে গেছে। অতীতের রাগ, অভিমান আর ঘৃণা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার ভেতরে। যার জন্য তার নাগিন এমন ফোঁসফোঁস করছে, ছোবল মারার জন্য উদ্যত হয়ে আছে। তৌসির কোনো কথা না বলে, নাজহার দুই কাঁধ শক্ত করে নিজের দুই প্রশস্ত হাতের মুঠোয় আটকে নেয়। তারপর তাকে নিজের বুকের সাথে একেবারে মিশিয়ে ধরে, শান্ত অথচ এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাজহার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের আলোয় তৌসিরের দৃষ্টিতে কী লুকিয়ে আছে তীব্র অধিকারবোধ, নাকি ভয়ংকর কোনো ঝড় তা এখনই বোঝা মুশকিল।
তৌসির নাজহা কে নিজে দিকে ঘুরিয়ে নিবিড় মমতায়, আলতোভাবে ওর মসৃণ গালে হাত রাখে। তার চোখে রাজ্যের উদ্বেগ, কণ্ঠস্বরে মধু আর স্নেহের প্রলেপ। সে অতি স্নেহমাখা আর আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, "কী হইছে তোর? এমন মুখ ফ্যাতফ্যাত করস ক্যান? খুলে বল তো আমাকে?"
কিন্তু পরমুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর অভিমানে নাজহা সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয় তৌসিরের গালে। চড়ের আকস্মিকতায় ওর নিজের হাতটাও আপন অজ্ঞাতেই কেঁপে ওঠে, কিন্তু পরক্ষণেই সে শক্ত হাতে তৌসিরের থুতনি চেপে ধরে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে হিসহিস করে বলে ওঠে, "তোর এত শখ আমাকে কষ্ট দেওয়ার? তুই আর তোর বিবিজান মিলে আমাকে আইসিইউতে নেওয়ার মিথ্যে অজুহাত দিয়ে আমার ভ্যাজাইনোপ্লাস্টি সার্জারি করিয়েছিস! আমি তো শুধু ভাবতাম, তিনটা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পরও আমার এত কষ্ট কেন হয়! কেন প্রথম বারের মতো এত অসহ্য ব্যথা লাগে আমার! আর তোরা তোরা আমার সাথে এত বড় একটা প্রতারণা করেছিস!"
নাজহার কণ্ঠ বেয়ে স্পষ্টতই ক্ষোভের আগুন ঝরতে থাকে। কথাগুলো শুনে তৌসির পাথরের মতো জমে যায়। নিজের গালের জ্বলুনি ভুলে সে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। সে তো এসবের বিন্দুবিসর্গও জানত না! চল্লিশ দিন পর যেদিন সে নাজহার কাছে প্রথম আসে, ঠিক একই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। পরে সে জানতে পারে, বিবিজান বিদেশি অভিজ্ঞ মহিলা ডাক্তার দিয়ে ডেলিভারির পর এই কাজ করিয়েছেন। এ নিয়ে বিবিজানের সাথে তার তুমুল কথা কাটাকাটিও হয়েছে। কিন্তু নাজহার তৎকালীন শারীরিক ও মানসিক ভঙ্গুর অবস্থার কথা ভেবে সে সেসময় কিছুই বলতে পারেনি। ভেবেছিল সময়মতো সব বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু পরিস্থিতি আজ এমন ভয়ংকর রূপ নেবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।
নিজেকে আর সামলাতে না পেরে তৌসির নাজহাকে টেনে নেয় নিজের চওড়া বুকের সুরক্ষিত আশ্রয়ে। নাজহার সব ছটফটানি, সব প্রতিরোধ নিমেষেই হারিয়ে যায় তৌসিরের পেশিবহুল দুই হাতের শক্ত বেষ্টনীতে। কাতর আর ভেজা কণ্ঠে তৌসির বলে ওঠে, "বিশ্বাস কর নাজহা, আমি সত্যিই জানতাম না বিবিজান এমন কিছু একটা করবেন। তোর ডেলিভারির সময় তো আমি এমনিতেই তোর চিন্তায় পাগলপ্রায় ছিলাম। বাচ্চা হওয়ার পর আমার নিজেরই হুঁশ ছিল না, আমি কীভাবে এসব জানব বল? পরে যেদিন লাল শাড়িতে তুই আমার কাছে আসিস, তোর চিৎকার আর কষ্ট দেখে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। আমি বুঝতে পারি কিছু একটা গড়বড় করা হইছে। ভালো করে দেখে বুঝতে পারি কি হইছে। এরপর বিবিজানকে গিয়ে চেপে ধরলে, উনি অবলীলায় বলেন এসব নাকি আমাদের ভালোর জন্যই করেছেন! বিশ্বাস কর আমার কথায়, আমার মাথায় এসব ঘুণাক্ষরেও ছিল না। তোকে কষ্ট দেওয়ার মতো এমন জঘন্য কাজ আমি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারি না।"
তৌসিরের বুকের চিরচেনা, নেশাধরা উষ্ণতা আর আকুল কণ্ঠের আর্তনাদে নাজহার ভেতরে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করে। এতদিন ধরে বুকে পাথরচাপা দিয়ে রাখা ক্ষোভ আর অভিমান মুহূর্তের মাঝেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সে তো মন থেকে জানতই এই মানুষটার কোনো দোষ নেই, শুধু ভালোবাসার মানুষের ওপরই তো সব অভিমান মানায়! বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির মানুষের করা যেকোনো অন্যায়ের ঝাল তো স্বামীর ওপর দিয়েই মেটাতে হয়! নাজহা তৌসিরের বুকে মুখ লুকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাগি স্বরে বলে, "বিবিজান সবকিছুতে এমন সমস্যা কেন করেন? কেন উনার মনমানসিকতা এমন?"
তৌসির কোনো কথা না বলে নাজহাকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নেয়। বিছানা থেকে নামতে নামতে সে বলে, "এসব অনেক বড় কাহিনি। সব বলব তোকে একদিন। এখন ওসব বাদ দে, শুধু আমার দিকে একটু তাকা।"
তৌসির নাজহাকে মেঝেতে নামিয়ে পাটি আনতে যায়। এ সময় নাজহা বলে ওঠে, "পাটির দরকার নেই, শুধু বালিশ নিয়ে আসুন। ফ্লোর মোছা আছে আর বেশ জুড়িয়ে আছে। এমনিতেই প্রচণ্ড গরম লাগছে, পাটিতে গা লাগলে আরও গরম লাগবে।"
তৌসির একটা বালিশ নিয়ে আসে। এরপর মেঝের আরামদায়ক হিমহিম পরশের বুকেই রচিত হয় অন্য এক উত্তপ্ত আখ্যান। দুজনের এই তিন মাস ধরে পুষে রাখা তৃষ্ণা, না বলা কথা আর আজ সব বাঁধ ভেঙে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়ে। চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অভাবনীয়, ঘোরলাগা মাদকতা। একদিকে ঘুমন্ত বাচ্চাদের মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ, অন্যদিকে তৌসিরের ভারী, তপ্ত নিঃশ্বাস আর নাজহার চাপা আর্তনাদ, সব মিলিয়ে নিঝুম রাতের শান্ত প্রহর এক প্রগাঢ়, বুনো ভালোবাসার শিহরণে একাকার হয়ে ওঠে।
ঘড়িতে রাত তিনটে বাজে।
নাজহার শরীর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ছে, কিন্তু তৌসিরের তৃষ্ণা মিটতেই চাইছে না। একটু পরপরই সে আরও বেপরোয়া, আরও অধিকারমত্ত হয়ে উঠছে। ঘামে ভেজা ক্লান্ত নাজহা তৌসিরের বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে, "আর কতক্ষণ বাল? এবার কিন্তু আমার মুখ দিয়ে আজেবাজে গালি বেরিয়ে যাবে বলে দিচ্ছি! ফাজলামোর একটা সীমা থাকে তৌসির!"
তৌসির হাসে। নাজহার ঘর্মাক্ত কপালে, চোখে মুখে গাঢ় আর এলোমেলো চুমু এঁকে দেয় সে। তারপর ভীষণ আদুরে, নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে, "আরে ব্যাঙ্গ, দিনের বেলা কি আর তোরে এভাবে নিজের করে কাছে পামু? রাত তো প্রায় শেষই হয়ে গেল, আর তুই ঘরে এলি!"
নাজহা তৌসিরের গলার ঘাম নিজের হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, "উঁহু, এখন আর না। অনেক হয়েছে, এবার সরুন তো।"
কথাটা বলে নাজহা পাশ ফিরে সরে যাওয়ার জন্য একটু নড়েচড়ে ওঠে। কিন্তু তৌসির কি আর এত সহজে ছাড়ার পাত্র? সে নাজহার কোমর শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে, ঠিক নিজের একান্ত নিজস্ব সম্পত্তির মতো। আদুরে অথচ এক ভিন্নরকম পুরুষালি কর্তৃত্বের সুরে ধমক দিয়ে বলে, "খালি কোমর নড়াইস না ছিনাল!"
নাজহা তৌসিরের চোখের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "আবার থাপ্পড় খাবেন কিন্তু আমার হাতে! এবার আর ছাড়ব না।"
তৌসির কোনো উত্তর দেয় না। নাজহার সব অভিযোগ, সব কথার জবাব সে দেয় ওর কাঁপতে থাকা ঠোঁটে নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে। প্রলম্বিত, নিবিড় এক চুম্বনের পর মুখ তুলে সে নাজহার টানা টানা কাজলকালো চোখের দিকে তাকায়। ঘোরলাগা, আবিষ্ট কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে, "রাগ করছিস ক্যান? এতদিন পর তোকে এতটা কাছে পেলাম, আরেকটু নাহয় এভাবেই থাকি আমরা। আমাকে একটু ছুঁয়ে থাকতে দে তোকে।"
নাজহা এরপরেও তৌসিরের চোখের দিকে কৃত্রিম রাগ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তৌসিরও ওর কালচে সবুজ চোখের অতল অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলে। মুগ্ধ আর নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেদিকে। দুজনে একে অপরের চোখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ ভাষাহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নিঝুম রাতের এই একান্ত শান্ত মুহূর্তে তৌসির হঠাৎ মুচকি হেসে ওঠে। তৌসিরের প্রাণখোলা, ভুবনভোলানো হাসি দেখে নাজহার সবটুকু মেকি রাগও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তৌসিরের বুকে আরও একটু গুটিসুটি মেরে মিশে যায় সে, আর ওর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক মিষ্টি, তৃপ্তির হাসি।
চলবে.......