ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

৩য় পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৩

পর্ব ৩: [ টুকরো দিনলিপি ]

━━━━━━━━━━━━━━━━

- রোল থার্টিন....রোল নাম্বার থার্টিন....

কোনো জবাব নেই। নীরবতা।

- থার্টিন....

ওই একই ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত।

- রোল নাম্বার থার্টিন.... আমারা মীর চৌধুরী!

- ইয়েস স্যার!

ধড়ফড় করে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আমারা। হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলো সামনের টিচার্স ডেস্কে দন্ডায়মান কোনো স্যার নয়, বরং ম্যাম। চশমার আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। একটি ঢোক গিললো আমারা। নিজের চিন্তায় এতই নিমজ্জিত ছিলো যে কোনদিকে খেয়ালই করে উঠেনি।

- আমাকে দেখে কি তোমার শাড়ি পড়া পুরুষমানুষ মনে হয়?

ম্যামের উচ্চারণে মুহূর্তমাঝে গোটা ক্লাসজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেলো। ভীষণ বিব্রতবোধ করলো আমারা। দৃষ্টি নামিয়ে নিজের ডেস্কের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আশপাশ থেকে ফিসফাস স্পষ্টত কানে গেলো তার।

- অত ওজনের শরীর নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাজিরা খাতা ক্লোজ হয়ে যায়!

বরাবরের মতোই শুনেও না শুনার ভান ধরে স্থির দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে থাকলো আমারা। এসব কানাঘুষো এখন একপ্রকার গা সওয়া হয়ে গিয়েছে তার। কোনো অনুভূতি হয়না। জন্ম থেকেই খানিকটা ভারী গড়নের শরীর তার, চেষ্টা করেছিলো প্রচুর নিয়ন্ত্রণের, কিন্তু শরীর যেমন তেমনি থেকে গিয়েছে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে পৌঁছালেও তার নিত্যসঙ্গী পাঁচকথা পিছু ছাড়েনি। এই অভিজাত কলেজের গন্ডির মাঝে যেন তা আরো হুহু করে বেড়েছে।

- এই, সবাই চুপ করো। এত হাসি কিসের? তুমি কোথায় তাকিয়েছিলে আমারা? কতবার বলেছি রোল কলিংয়ের সময় অন্যমষ্কতা আমার একদম পছন্দ নয়?

- সরি ম্যাম, আর হবেনা।

- ফাইন। সিট ডাউন।

আস্তে করে বসে পড়তেই ফশশ— ধ্বনিতে আঁতকে লাফিয়ে উঠলো আমারা। আরেক দফায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো গোটা ক্লাসরুম। নিজের চেয়ারে একটি ফাঁকা জুসের বাক্স পেয়ে সেটা হাতে নিয়ে মুঠো পাকালো আমারা, চোখ তুলে তাকালো ঠিক তার পিছনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে পা দোলাতে থাকা অনিকের দিকে। ঠোঁট ফুলিয়ে নিঃশব্দে শীষ বাজাচ্ছে যেন সে কিছু জানেই না। ম্যাম হনহন করে এগিয়ে আসলেন, আমারার হাত থেকে বাক্সটি নিয়ে অনিকের দিকে চেয়ে বললেন,

- তোমাদের মতন বেয়াদব ব্যাচ এই কলেজে আমি আর একটাও পাইনি বিশ্বাস করো। বিশেষভাবে এই সেকশন ম্যান্ডেলা ইজ ক্রেজি লাইক আ জু!

বাঁকা হাসলো অনিক,

- সেই কথা তো স্কুল জীবন থেকেই শুনে আসছি ম্যাম, নতুন কিছু বলুন।

এবার অনেকে হাসলেও তা ভীষণ চাপা এবং মৃদু শোনালো। ম্যাম ভ্রু কুঁচকে উল্টো ঘুরলেন, ডেস্কের দিকে এগোতে এগোতে বললেন,

- তোমাদের সেকশন যার নামে, নেলসন ম্যান্ডেলা, তিনি কে সেই সম্পর্কে কোনো আইডিয়া আছে? যদি থাকতো, তাহলে এমন বাঁদরামি করার আগে কয়েকবার ভাবতে।

আমারা চুপচাপ চেয়ারে বসতে বসতে একটি নিঃশ্বাস ফেললো। দুহাতে ডলে আনলো নিজের চোখমুখ। ম্যাম বোর্ডে চক ছুঁয়ে গজগজ করছেন,

- এই নেলসন ম্যান্ডেলা সম্পর্কেই আজ পড়বো আমরা, এনার উপর পরবর্তী সপ্তাহে আমার দশ পাতার অ্যাসাইনমেন্ট চাই!

এবার খানিকটা ক্রুব্ধ এবং বিরক্তিভর দৃষ্টিতে ক্লাসরুমের মোট পঁয়ত্রিশজন ছাত্র ছাত্রীর প্রায় সকলেই ফিরে তাকালো অনিকের দিকে। এতক্ষণ তার দুষ্টামিতে মজা নিলেও এখন শাস্তি হিসাবে ম্যামের কাছ থেকে দশ পাতা অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়টি কারো পছন্দ হয়নি। তবে তাতে পরোয়াহীন অনিক, দাঁত কেলিয়ে বিস্তর হেসে সে পা দোলাতে দোলাতে গরুর জাবর কাটার মতন চুইং গাম চিবিয়ে যাচ্ছে।

সত্যি সত্যি ম্যাম বাংলা ক্লাস হওয়া সত্ত্বেও নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনবৃত্তান্ত উপস্থাপন করতে আরম্ভ করলেন। কিভাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে কিভাবে সংগ্রাম করে গিয়েছেন আজীবন। কাহিনী সবই আমারার জানা। ছোটবেলা থেকে বিভিন্নরকম বই পড়ে পড়ে শিক্ষাজীবনের বাইরের অনেক জ্ঞানও অর্জিত হয়েছে তার, তবে তা সে আড়ালে রাখতেই ভালোবাসে। নেলসন ম্যান্ডেলা কে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিজেকে জাহির করার প্রতি আমারার কোনো আগ্রহ নেই। সে বরাবরই আত্মকেন্দ্রিক এবং অসামাজিক।

কিছুক্ষণ বাদেই ম্যামের কথার উপর থেকে সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেললো সে। ডেস্কের উপর দুহাত রেখে তাতে চিবুক ঠেকিয়ে আনমনে চারিপাশে তাকালো। একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি, মাস দুয়েক প্রায়। তবে এর মধ্যেই বাকি সকলকে বেশ চিনে ফেলেছে সে। তারা অবশ্য জানেনা যে আমারা তাদের চেনে কিংবা তাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অভ্যাস সম্পর্কেও জানে। সবই নীরব পর্যবেক্ষণের ফল।

অদূরে এক কোণায় চুপিচুপি খাতায় ক্রস গোল্লা খেলছে রুমা - ঝুমা, মাঝ বরাবর সারিতে খসখস করে নোটবুকে নতুন কোনো স্কেচ ফুটিয়ে তুলছে সৌরভ, একদম সামনের বেঞ্চে শিরদাঁড়া টানটান করে বসে ম্যামের প্রত্যেকটা বাণী হাভাতে গিলছে ক্লাস ক্যাপ্টেন মিম। সকলের উপর ঘুরপাক খেয়ে একজনের উপর স্থির হলো আমারার দৃষ্টি। একদম কোণায় সর্বশেষ ডেস্কে মাথা ঠেকিয়ে আছে উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের রগচটা চঞ্চল ছেলেটি।

দোহা।

সুনামি দোহা।

অনিক এবং তার নেতৃত্বে গোটা একটা অঘোষিত গ্যাং আছে কলেজে, যার প্রভাব গোটা কলেজ এমনকি এর আশেপাশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলজুড়েও বিস্তৃত। সুনামি নামটা সেই সূত্রেই পাওয়া, কাহিনীর খুব বেশি কিছু আমারা জানেনা। সেন্ট পিটার্সবার্গে সে ভর্তি হয়েছে একাদশ শ্রেণীতে, সেখানে দোহা এবং অনিক সবাই সেই স্কুল থেকেই পড়তো।

দোহা চোখজোড়া বুজে আছে, সাদা ইউনিফর্মের কলারের টাইটি আলগোছে ঝুলছে নিচের দিকে। ঘুমিয়ে আছে নাকি বোঝা যাচ্ছেনা। ঠোঁটজোড়া কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে, একটুখানি দাঁত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে তাতে। আমারা স্থির তাকিয়ে রইলো। ছেলেটার চঞ্চল সত্তা কতটা শান্ত দেখাচ্ছে! চুলগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে কপালের উপরে, দেখাচ্ছে শিশুটির ন্যায়। দৃশ্যটি দেখতে দেখতে আমারার চোখে সেদিনের স্মৃতি ভেসে উঠলো। কিভাবে হলরুমে সবার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে দোহা তাকে জানিয়েছিলো নিজের মনের কথা। ছেলেটার চেহারাজুড়ে যে ঝিলিক খেলা করছিলো, তা উপেক্ষা করা বড়ই অসাধ্য।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আমারা দোহার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সে নিজেও নিজেকে বিশ্বাস করে উঠতে পারেনা, ঠিক কোন আকর্ষণ কিংবা টানে সে তৎক্ষণাৎ ওমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছিলো। তার জীবনে এমনটা প্রথম হওয়ার কারণে? যে জিনিস কখনো পাবে কল্পনা না করার পরেও যখন মানুষ পেয়ে যায়, তখন বুঝি এমনি অনুভূতি হয়? কৈশোরের এই দুরন্ত অনুভবের পরিণয় কি হবে? কোনো ধারণা নেই আমারার। সে শুধু এটুকু জানে, জীবনে প্রথমবার নিজের মস্তিষ্কের বদলে সে নিজের হৃদয়ের কথা শুনেছে।

হঠাৎই সামান্য নড়েচড়ে উঠে চোখ খুললো দোহা। সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি মিলিত হলো আমারার সাথে। ভীষণ বিব্রতবোধ করলো কিশোরী, ফোলা ফোলা গালজুড়ে তীব্র লালিমা ফুটলো। তীর্যক হাসলো দোহা, দুহাতে চোখ কচলে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে এনে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে মুচকি হাসলো আমারার উদ্দেশ্যে, ভ্রু দুলিয়ে যেন নিঃশব্দে বলতে চাইলো,

“ ধরে ফেলেছি ”

দ্রুতই নিজের চোখ সরিয়ে ফেললো আমারা, বুকটা ধকধক করছে তার ভীষণভাবে। ফ্যাকাশে উজ্জ্বল চেহারা তার টকটকে হয়ে উঠলো গভীর এক অনুভবে।

。

。

。

তিন পিরিয়ডের পর টিফিনের সময়।

সাধারণত অধিকাংশই এসময় ক্যান্টিনে ব্যস্ত থাকে। তবে আজ ক্লাসে বেশকিছু ছেলেমেয়ে রয়ে গিয়েছে। সবটাই রকির কল্যাণে। রকি, ক্লাসের স্বঘোষিত সেলিব্রিটি, যে নিজের বাবার কোম্পানির প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনে কাজ করে বেজায় ভাবে রয়েছে বেশকিছুদিন ধরে। সপ্তাহে সপ্তাহে তার নিত্যনতুন শো অফের ধারাবাহিক পর্ব হিসাবে আজ সে বাবার টরেন্টোর বিজনেস ট্রিপ থেকে নিয়ে আসা সুগার ক্যান্ডির বিশাল প্যাকেটসমেত হাজীর হয়েছে। গতকাল ভিজিটেশনের সময় হাতে পেয়েছে। আজ তাকে সকলে মৌমাছির চাকের মতন ঘিরে ধরায় বেজায় খুশি সে।

সকলের হাতে দুটো দুটো ক্যান্ডি বিলিয়ে তার বাবা যে কত মহান আর তার বংশ যে কোনো এক মোঘল নবাবের প্রজন্ম তা ব্যক্ত করতে করতে রকির হাঁপ ধরে গিয়েছে। অদূরে ডেস্কে বসে সকালে ক্লাসে আসার আগে বানিয়ে নেয়া কিউকাম্বার স্যান্ডউইচের অংশ মুখে পুরে তাকে দেখছে আমারা, ইচ্ছা হচ্ছে বেচারাকে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিয়ে শান্ত হতে বলতে।

তার মনের কথা অনুভব করেই যেন ঝট করে রকি ফিরে তাকালো। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে অবশিষ্ট স্যান্ডউইচ দ্রুত মুখে দিয়ে পানির বোতলে চুমুক দিলো আমারা। রকি হেলেদুলে হাতের তর্জনীতে নিজের অতি প্রিয় বিদেশী সানগ্লাস ঘোরাতে ঘোরাতে তার ডেস্কের সামনে এসে থামলো। অন্যান্যরা ক্যান্ডি খেতে খেতে নতুন নাটক দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।

রকি ঝুঁকে এসে খরগোশের সামনে গাজর ঝোলানোর ভঙ্গিতে প্যাকেটটা আমারার সামনে দুলিয়ে দুলিয়ে বললো,

- এই সুগার ক্যান্ডিতে কত ক্যালোরি থাকে জানিস? তোর খেতে হবেনা। এমনিতেই যে অবস্থা, আরেকটু হলে আবার ফুট করে ফুটুশ হয়ে বেলুনের মতন আকাশে উড়ে যাবি।

সমস্বরে হেসে উঠলো সকলে। খানিক স্তব্ধ হয়ে একটি ঢোক গিলে আমারা বিড়বিড় করলো,

- কিন্তু আমি ক্যান্ডি চাইলাম কখন?

- চাসনি তো এখন চাবি।

- না, চাইনা।

ঢোক গিলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো আমারা, হাতের বোতলে চেপে বসলো তার চওড়া কোমল আঙ্গুলগুলো। তার ডেস্কে ঝুঁকে একেবারে মুখের সামনে গিয়ে রকি কলকলে কন্ঠে বললো,

- তোর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তোর লোভ লাগছে।

- লোভ যখন লাগছেই দিয়ে দে না!

কলারে জোরালো একটা টান, সটান সোজা হয়ে দাঁড়ালো রকি, তারপরই ঠাস করে একটা চাপড় খেলো ঘাড়ে। পিছনে ফিরে তাকানোর আগেই তার হাত থেকে গোটা ক্যান্ডির প্যাকেটটা উধাও হয়ে গেলো। যেন কাকে ছো মে*রে নিয়ে গিয়েছে! হতবাক হয়ে সে খেয়াল করলো দোহাকে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঘন কালো ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে নিদারুণ এক ক্রোধে। এই বান্দাকে ঘাটানোর দুঃসাহস কলেজে খুব কম ছেলেই করে থাকে। রকি অবশ্যই তার মধ্যে একজন নয়।

রকিকে কাঁধে ঠেলে রীতিমত পাশের ডেস্কে ফেলে দিলো দোহা, বেচারা ধপাস করে চেয়ারের উপর পরে রীতিমত উল্টে যাচ্ছিলো। শুধু দেয়াল কাছাকাছি থাকায় রক্ষা। তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে দোহা আমারার ডেস্কের সামনে চেয়ার পেতে বসে পড়লো। গোটা ক্যান্ডির প্যাকেটটা তার সামনে রাখলো। নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একে একে বের করলো এক প্যাকেট পটেটো ক্র্যাকার, ক্রীম বিস্কিট, চিকেন রোল এবং ম্যাংগো জুস। টিফিনের জন্য ক্যান্টিন থেকে কিনে এনেছে। সবগুলো সে আমারার সামনে ঠেলে দিলো। দৃশ্য পর্যবেক্ষণ চোয়াল ঝুলে পড়লো কিশোরীর, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো সে খাবারের বহরে। ক্লাসের অন্যান্যরাও বেশ উৎসাহ নিয়ে কান্ডকারখানা দেখে যাচ্ছে। দোহা নিঃসংকোচে রোলের প্যাকেট খুলে তাতে খানিকটা সস ঢেলে আমারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আশেপাশের সকলের হতবিহ্বল দৃষ্টি মোকাবেলা করে বললো,

- তুমি এই সবকিছু খাবে। আমিও দেখি তাতে কার বাপের কি আসে যায়!

সকলে বেশ বিব্রতবোধ করলো। দোহার চাহুনির ধারে সেখানে টিকতে না পেরে দ্রুতই নিজেদের কাজে এবং খাবারে মনোযোগ দিলো। ডেস্কের উপর ততক্ষণে হাচড়ে পাচড়ে উঠে বসে রকি, বুক ধরে হাঁপাচ্ছে।

- এটা কি ঠিক হলো? শালা!

- একদম সঠিক হলো, সম্বন্ধী!

- তোরে আমি সম্বন্ধী মানিনা শালা প্লেবয়!

লাফিয়ে উঠে গজগজ করতে করতে রকি সামনের দিকে চলে গেলো। সেই পথে বিস্মিত তাকিয়ে আমারা কৌতূহলী দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলো দোহার উপরে। জিজ্ঞেস করলো,

- সম্বন্ধী কি?

তার প্রশ্নে মৃদু হেসে পটেটো ক্র্যাকারের প্যাকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে দোহা জানালো,

- বউয়ের বড় ভাইকে সম্বন্ধী বলে।

- আচ্ছা? তাহলে তুমি রকির সম্বন্ধী হলে কিভাবে?

- তোমাকে ডেট করার আগে ওর ক্লাস নাইনের ছোট বোনকে করতাম তো, সেই হিসাবে।

কথাটা দোহা এতটা স্বাভাবিকভাবে বললো যেন নিত্যদিনের তিনবেলা নিয়ম করে ভাত খাওয়ার কথা বলছে। চোয়াল ঝুলে পড়লো আমারার, ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো দোহার দিকে। পটেটো ক্র্যাকার মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে কিশোরীর গোলগাল চেহারা দেখতে দেখতে দোহার হাসি আরো বিস্তৃত হলো। আমারার হাতের রোল সামান্য তুলে ধরে তার ফাঁকা অধরমাঝে স্পর্শ করে বললো,

- নো টেনশন সুইটহার্ট, শি ইজ জাস্ট অ্যান এক্স।

মাথা নুইয়ে দ্রুতই রোলে কামড় বসালো আমারা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। প্রতিক্রিয়াস্বরুপ দুই বিন্দু ঘাম জমেছে চওড়া ঘাড়ের কাছে। দোহা নিজের প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে তার ঘাড়ে আলতোভাবে চেপে দিলো, অতঃপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করলো,

- আসল কথা, আমার সম্বন্ধী একটুও পছন্দ হয়নি। তার উপর, ইউ আর মাই সুইট লি' ল রসগোল্লা ইউ নো?

থম মে*রে বসে থাকলো আমারা। খিলখিল করে হাসলো দোহা, তার চিবুক দুই আঙ্গুলে নিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে স্নেহ ছুঁইয়ে বললো,

- কালকে শুক্রবার। বিকালে ভিজিটেশন রেখোনা। বেরোবো তোমাকে নিয়ে, কেমন? তৈরি থেকো। আমি ফুটবল প্র্যাকটিসে যাচ্ছি।

এটুকুই। পটেটো ক্র্যাকারের অর্ধেক আমারার জন্য ছেড়ে দিয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে দোহা ডেস্ক ছেড়ে উঠলো। তার লম্বাটে ফিনফিনে অবয়ব ধীরে ধীরে ক্লাসরুমের বাইরে চলে গেলো। নিজের ডেস্কে ঠাঁয় বসে থাকলো আমারা, একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো দোহার চলে যাওয়া পথের উদ্দেশ্যে।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━

সন্ধ্যা সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট।

টিমটিমে আলোর বাতিতে কক্ষটি আলোকিত হওয়ার বদলে অন্ধকার দেখাচ্ছে। বিছানার উপর এলিয়ে পড়ে আছে অনিক। ঠিক তার পাশেই অন্য দুজন। সকলেই নিদ্রাচ্ছন্ন। মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে তিনটি কাঁচের বোতল, অ্যালকোহলের মাদকীয় ঘ্রাণ বইছে গুমোট বাতাসজুড়ে। তার সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া মিশ্রিত হয়েছে। ঘুমের ঘোরেই প্রশ্বাস টেনে সেটা অনুভব করলো অনিক। তারপরই নিজের কাঁধে একটা ধাক্কা টের পেলো।

- এই অনিক, ওঠ। নয়টার মধ্যে ডরমে ফিরতে হবে।

পিটপিট করে চোখ মেলে ঝাপসা দৃষ্টিতে একটা মুখাবয়ব লক্ষ্য করলো অনিক, জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করলো,

- দোহার বাচ্চা!

একটি নিঃশ্বাস ফেলে দোহা পাশের টেবিলের উপর এতক্ষণ যাবৎ নিজের হাতে ধরে রাখা জগ এবং গ্লাস রাখলো। ঠোঁটে ঝুলতে থাকা সিগারেটখানি বের করে সামান্য কর্কশ কন্ঠ বললো,

- তেঁতুলপানি করে রেখেছিস। খেয়ে নিস। এরপর জলদি যা, বেশি দেরী হলে রাব্বি আংকেল ঢুকতে দেবেনা।

- শালা তুই কি আমার ড্যাডি লাগিস? ড্যাডির মতন আচরণ করবি না খবরদার!

দোহা মাথা ঝাঁকালো,

- ভালো। থাক, আমি গেলাম।

- কই যাস?

বরাবরের মতোই এই প্রশ্নের জবাব এলোনা। দোহা অ্যাশট্রেতে সিগারেট ঘষে নিভিয়ে নিজের জ্যাকেট কাঁধে তুলে দ্রুত বেরিয়ে পড়লো।

সকলের অগোচরে রাস্তা পেরিয়ে লোকাল বাস ধরলো। এখান থেকে বিশ মিনিটের রাস্তা, ভাড়া নেবে পাঁচ টাকা। সিট না পেয়ে দাঁড়িয়েই গেলো দোহা। বাস থামতেই লাফিয়ে নেমে লম্বা পদক্ষেপে ছুটলো।

ডিনার ডাইন রেস্টুরেন্ট—

জ্বলজ্বলে সাইনবোর্ড পেরিয়ে হেঁটে গিয়ে পিছনের লন বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। করিডোর পেরিয়ে এপাশে এসে টেবিলের উপর নিজের কাঁধের ব্যাগ রাখলো। তাতে জ্যাকেট খুলে ঢুকিয়ে কালো অ্যাপ্রোন বের করে গায়ে জড়ালো। মুখে মাস্ক এবং মাথায় সানক্যাপ চেপে হাতে গ্লাভস পড়তে পড়তে হেঁটে এলো সুবিশাল এক কর্মব্যস্ত কিচেনে। তার মতই অ্যাপ্রোন পরিহিত বেশ কয়েকজন ছুটছে এদিক সেদিক, বিশাল চুলায় এবং ওভেনে রান্না হচ্ছে। সুঘ্রাণে পরিপূর্ণ গোটা স্থান। দোহা এগোতেই বাজখাঁই একটি কন্ঠ ডেকে উঠলো,

- দেরী করে ফেলেছিস। টেবিল সাতের কাস্টমার পাঁচ মিনিটের উপর বসে আছে। এক্ষুণি যা!

মাথা দুলিয়ে দোহা তৎক্ষণাৎ ছুটলো, রেস্টুরেন্টের ব্যস্ততম সিটিং এরিয়ায় প্রবেশ করে টেবিল সাতের দিকে এগিয়ে গেলো। একজোড়া কপোত কপোতী, বহু মুগ্ধতায় একে অপরের সঙ্গে প্রেমের আলাপে ডুবে আছে। দোহা সামনে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে পরিমিত কন্ঠে বললো,

- মে আই টেইক ইওর অর্ডার, স্যার?

- অফকোর্স, টু প্লেট স্পেশাল ডিনার কম্বো।

- এনিথিং টু ড্রিঙ্ক?

- টু পেপসি।

- ডেজার্ট?

- হুম, মাফিন।

শেষ অর্ডার রমণী সম্পন্ন করলো। দোহা দ্রুত তা নোটে টুকে নিয়ে জানালো,

- ধন্যবাদ, স্যার ম্যাম। খাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবেশন করা হবে।

এটুকুই, দ্রুত উল্টো ঘুরে দোহা কিচেনে ছুটলো অর্ডার পূরণের জন্য।

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন