ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

৪র্থ পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৪

পর্ব ৪: [ গ্যাম্বলিং অব ফিলিংস ]

━━━━━━━━━━━━━━━━━━

মিসেস চৌধুরী নিজের একমাত্র কন্যাসন্তানের চেহারায় বহুদিন বাদে এক উচ্ছলতার ঝলক দেখে ভীষণ আনন্দ অনুভব করলেন। ভিজিটেশন রুমে আমারার পাশাপাশি বসে আছেন তিনি। নিজের দুহাতের মাঝে সন্তানের হাত আবদ্ধ রেখে অতি স্নেহের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন। নিজের কর্মজীবনের ব্যস্ততার কারণে গত সপ্তাহে আসা হয়নি, তাই এই সপ্তাহে আসার সময়ে তিনি আমারার প্রিয় ম্যাকারন নিয়ে এসেছেন। চকলেট ফ্রেভারের ম্যাকারনটি তার সামনে বসেই সাগ্রহে খাচ্ছে আমারা, ভীষণ মিষ্টি দেখাচ্ছে তাকে। এক হাত তুলে আমারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি শুধালেন,

- ভালো আছো তো, তাইনা আমারামণি?

মাথা তুলে নিজের জননীর সুদর্শনা চেহারা পর্যবেক্ষণ করে বিস্তর হেসে সায় জানালো আমারা। তার হাসি সংক্রমিত হলো মায়ের ঠোঁটেও, স্থির চেয়ে সেই দৃশ্য লক্ষ্য করে আমারা অনুধাবন করলো তার জন্মদাত্রী আদতেই সুন্দর।

আশফিকা চৌধুরী, মীর জামান চৌধুরীর অর্ধাঙ্গিনী এবং আমারার মা। অভিজাত চৌধুরী পরিবারের বউ হলেও তার নিজের পরিচয়ে যথেষ্ট ভার রয়েছে। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও পুরোদস্তুর এক ব্যবসায়িক সত্তা। যদিও তার অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় আমারার বাবার সঙ্গে কাজ করেই। একজন নেত্রীর গুণাবলী রয়েছে তার মাঝে, যা বর্তমানে অপ্রয়োজন এবং সাংসারিক দায়িত্বের ভীড়ে চাপা পড়ে গিয়েছে। এক মধ্যবয়স্কা রমণী হিসাবেও তিনি যথেষ্ট চমৎকার গড়নের অধিকারী। সুগঠিত মেয়েলী শরীরে জড়ানো বিজনেস স্যুট তার অভিজাত সত্তায় এক ভিন্ন প্রলেপ দেয় যেন। উজ্জ্বল ফ্যাকাশে ত্বক এবং বিস্তৃত আঁখিযুগল, যাতে সবসময় খুব হালকা কাজলের রেখা টেনে দেয়া থাকে।লম্বাটে হাতের অনামিকায় একটি সবুজাভ পাথরের আংটি, তার এবং আমারার বাবার বন্ধনের প্রতীক।

- বাবাই আসবেনা?

আমারার শিশুসুলভ প্রশ্নে ক্ষণিকের জন্য আশফিকা থমকালেন। তারপরই মৃদু হেসে বললেন,

- পরেরবার আসবে অবশ্যই।

- তুমি প্রতিবার একই কথা বলো মামণি।

- ইউ নো বেবি? তোমার বাবাই কত্ত বিজি একজন মানুষ? দুইদিন আগেই সিঙ্গাপুর ট্রিপ থেকে ফিরেছে, এসে থেকে নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চের আয়োজনে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

- হুম, আমি ছাড়া বাবাইয়ের সবকিছু মনে থাকে!

আমারা মাথা নুইয়ে নিজের কোলের ম্যাকারনের বাক্সের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার ফোলা মুখ এবং হাতের আঙুলের ঘর্ষণ লক্ষ্য করে আশফিকা বুকের ভেতর কেমন যেন বিষাদ অনুভব করলেন। এই মেয়েটি তার জীবনের সব, বহু সাধনার পর লাভকৃত একটিমাত্র সুখের ফসল। তাই আমারার প্রতি তার স্নেহের পরিমাণ অত্যধিক। দ্রুতই নিজের স্যুটের পকেট থেকে ফোন বের করে স্বামীর নাম্বারে তৎক্ষণাৎ ডায়াল করলেন তিনি। রিসিভ হতেই বিড়বিড় করলেন,

- আমারামণির সঙ্গে কথা বলো।

ফোনটা তিনি আমারার হাতে দিতেই ঠোঁট ফুলিয়ে সেটি কানে চেপে সে বললো,

- আই হেইট ইউ বাবাই।

- অও... আই অ্যাম সরি প্রিন্সেস। বাবাইকে এভাবে বলতে নেই, কষ্ট হয় তো!

- তুমি আসলে না কেনো?

- একটু বিজি আছি বাবাই, আমি আসবো, এইতো পরের সপ্তাহের ভিজিটেশনে অবশ্যই আসবো।

- পাক্কা আসবে তো? প্রমিজ?

- প্রমিজ মাই প্রিন্সেস।

- আচ্ছা তাহলে ঠিক আছে।

- তোমার মামণির কাছে একটি গিফট পাঠিয়েছি। দেখো তো পছন্দ হয় কিনা।

- সত্যি! থ্যাংক ইউ বাবাই, লাভ ইউ!

- লাভ ইউ টু মাই প্রিন্সেস, উম্মাহ!

নিজের মেয়ে আর স্বামীর মাঝে উৎফুল্ল বাক্যের বিনিময় তৃপ্তিভরে দেখলেন আশফিকা। আমারা ফোন কেটেই তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো নিজের উপহার আদায়ে। মুচকি হেসে একটি ছোট্ট গিফট বক্স তিনি তুলে দিলেন মেয়ের হাতে। সেটি অতি উৎসাহে খুলতেই ভেতরে সরু এবং সূক্ষ্ম একটি বস্তু রূপালী আভায় চকচক করে উঠলো। সাবধানে সেটি তালুতে তুলে নিয়ে প্রসারিত দৃষ্টিতে ভীষণ মুগ্ধ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আমারা বিড়বিড় করলো,

- নোলক!

সেন্ট পিটার্সবার্গে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগেই এক প্রকার শখের বসে নিজের নাক ফোঁড়ানো হয়েছে তার। অতঃপর ব্যথায় এবং ইনফেকশনের কারণে তেমন কোনো অলংকার ব্যবহার করা হয়নি। তাই আজকের উপহার তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে, একেবারে হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মতন। আশফিকা মেয়ের চেহারায় অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করে হাসলেন, জিনিসটি তুলে নিয়ে বললেন,

- এটাকে নথ বলে। নোলক নাকের মাঝখানে পড়ে, দেখেছিলে না গ্রামের বাড়ির বড় মাকে?

সাগ্রহে শুনে মাথা দোলালো আমারা,

- আমি এটা পড়তে পারবো?

- অবশ্যই পারবে। তোমার ইনফেকশন আর সবকিছুর দিকে খেয়াল রেখেই এটা বিশেষভাবে অর্ডার করে বানানো হয়েছে। ডোন্ট ওয়ারি, এদিকে আসো আমি পরিয়ে দেই।

আশফিকা সযত্নে মেয়ের নাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নথটি পরিয়ে দিলেন। দুহাতে মুখ তুলে যত্নভরে অবলোকন করলেন। গোলগাল চেহারায় হালকা লালাভ নাকের প্রান্তে নথটি ভীষণ মানিয়েছে। ঝুঁকে আমারার কপালে চুমু খেলেন তিনি।

- থ্যাংক ইউ মামণি, আর বাবাইকেও থ্যাঙ্কস বলো। আমার খুব পছন্দ হয়েছে, এটা আমি কক্ষণো খুলবো না।

সায় জানালেন আশফিকা। সোজা হয়ে বসে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালেন, খুব বেশি সময় আর অবশিষ্ট নেই। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

- তোমার দিনকাল এখানে ভালো কাটছে তো? কেউ বিরক্ত করছে নাকি আবার? বন্ধু হয়েছে?

আমারার হাসি ম্রিয়মাণ হলো, তবে দ্রুতই সে তা ফিরিয়ে এনে জানালো,

- কেউ বিরক্ত করছেনা মামণি, আমি খুব ভালো আছি। বন্ধু অবশ্য হয়নি, তবে তুমি চিন্তা করোনা। স্যার ম্যামরা খুব ভালো, অনেক সাহায্য করে আমাকে।

তার কন্ঠে উৎসাহী মনোভাব টের পেয়ে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন আশফিকা। সাধারণত আমারা কখনো এতটা উৎসাহী থাকেনা কোনকিছু নিয়ে, মানুষের বেলায় তো নয়ই। গতবার ভিজিটেশনের সময়ও তাকে চুপচাপ দেখে গিয়েছিলেন আশফিকা, তবে এবার প্রফুল্লতা তাকে কিছুটা দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে।

- তুমি নিশ্চিত তো আমারামণি? কোনো সমস্যা হচ্ছেনা? তুমি এখানে পড়বে?

- হ্যাঁ মামণি, আমি একদম নিশ্চিত। আমি এখন বড় হয়ে গিয়েছি, আমি নিজেকে সামলাতে জানি। তুমি কিচ্ছু চিন্তা করোনা।

- তুমি মামণির কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছোনা তো?

থমকে গেলো আমারা, তার নয়নপটে ভেসে উঠলো দোহার চেহারা। তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে সে নিজের মাকে এখনো জানায়নি। জানালে ঠিক কেমন বোধ করবেন তিনি? আশফিকা তাকে নিয়ে বরাবরই অতিরিক্ত চিন্তায় থাকেন। সেই হিসাবে আপাতত তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলা উচিত হবেনা। ভেবে আমারা আপাতত বিষয়টি লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলো।

- একদম না মামণি, আমি তো শুধু....

আশফিকার ফোন ভাইব্রেট করে উঠায় কথা চাপা পরে গেলো। তিনি ফোন রিসিভ করে শুনলেন, বোধ হয় কেউ জরুরী দরকারে করেছে, অফিস থেকে, মনে মনে বুঝে নিলো আমারা। তার ধারণা সত্যি প্রমাণিত করে আশফিকা উঠে দাঁড়ালেন,

- আমাকে এখন যেতে হবে মামণি। একটা আর্জেন্ট ডিল সাইন করতে হবে।

- ওকে মামণি।

- টেইক কেয়ার মাই লি' ল সানশাইন।

আমারার কপালে এবং দুই গালে স্নেহের চুম্বন এঁকে আশফিকা বিদায় নিলেন। লম্বা পদক্ষেপে তার লাস্যময়ী অবয়ব দ্রুতই আড়াল হয়ে গেলো ভিজিটেশন রুমের বাইরে।

আমারা ধীরে ধীরে ডরমেটরিতে ফিরে এলো। শুক্রবারের সকাল হওয়ায় চারিদিক ফাঁকা। সকলেই নাস্তার পর ছুটেছে মাঠে। আগামী সপ্তাহে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট রয়েছে। সেটারই আয়োজন চলছে তোড়জোড় করে। চির প্রতিদ্বন্দ্বী সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং ডমিনিক লার্নারস কলেজের মধ্যে ম্যাচ রয়েছে। তাই নিয়ে উত্তেজিত গোটা ক্যাম্পাস।

নিজের রুমে ফিরে প্রতিবারের মতন দৃশ্যটি নজরে এলো আমারার। তার রুমমেট মেয়েটি বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে মগ্ন হয়ে আছে। গায়ের রংটা চাপা, তবে তার চেহারার গাঁথুনিতে রয়েছে অনন্য এক মায়া। কাঁধ সমান চুল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন ছড়িয়ে আছে। বিড়ালের ন্যায় চোখজোড়ার মনোযোগী দৃষ্টি আবদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনে। কানে হেডফোন গুঁজে রেখেছে। কি দেখছে সেই জানে। মেয়েটার নাম জারা, এটুকু বাদে তার সম্পর্কে আর কোনো তথ্য আমারার কাছে নেই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রায় দুই মাস একসাথে একই রুমে থাকলেও তাদের মাঝখানে হাতে গোণা দুই কি তিনবার বাদে একটুও কথা হয়নি। জারা ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক। দেয়াল ঠেললেও যেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়না, তাকে বিরক্ত করলেও কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সকলে নিজেরাই বিরক্ত হয়ে যায়। কখনো তার বাবা মাকেও কলেজে আসতে খেয়াল করেনি আমারা।

জারাকে নিজের আপন জগতে বিচরণ করতে দিয়ে সে চুপচাপ পড়ার টেবিলের কাছে এলো। জানালা লাগোয়া টেবিলটায় চেয়ার টেনে বসেই ড্রয়ার খুললো। বের করলো ছোট কেঁচি এবং রঙিন কাগজের পসরা।গতকাল সন্ধ্যা থেকে বহু খাটা খাটুনি করে সে একটা কার্ড বানিয়েছে, এখন একটা খাম বানিয়ে নিয়ে কেটে রাখা লাল কাগজের লাভগুলো জুড়ে দিলেই হবে।

তার প্রথম ডেটের উপহার।

নিজের কাজে ভীষণ মগ্ন হয়ে গেলো আমারা। এতটাই যে অপর পাশ থেকে ধেয়ে আসা জারার দৃষ্টি সে অনুভবই করলোনা। মেয়েটা বালিশে মাথা রেখে ঘাড় কাত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে গেলো তার কার্যক্রম, তিক্ততায় আবর্তিত হলো তার অধর। একটি নিঃশ্বাস ফেলে সে আপনমনে ফিসফিস করলো,

- চরম বোকা!

。

。

。

বিকাল ৪ টা বেজে পনেরো মিনিট।

কলেজের পিছনের গেটের পাশে সিমেন্টের তৈরী বেঞ্চে বসে আছে দোহা। হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে পা নাড়তে নাড়তে আশেপাশে তাকাচ্ছে। অদূরে কলেজের বেশ কতক যুগলকে দেখা যাচ্ছে, বন্ধু বান্ধবদের দলও। গল্প গুজবে মশগুল। রাস্তার একপাশে ভ্রাম্যমাণ ঝালমুড়িওয়ালার বিক্রি ইদানিং বেজায় বেড়েছে। অভিজাত কলেজের ধনীর দুলালীরাও সড়কের ধারের খাবার খাওয়া শিখতে শুরু করেছে। বোম্বাই মরিচের স্পেশাল ঝালমুড়ি কিছুদিনেই ভীষণ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে তল্লাটে।

দোহা জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চারদিক দেখছে। বেঞ্চের পাশেই নিজের বাইসাইকেলটি পার্ক করে রেখেছে। আজ অনিকদের সাথে চালাতে যায়নি, আমারার জন্য।একটি নিঃশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়ালো, পরনের বাদামী হুডির হাতা টেনে তুলে হাতঘড়ি দেখলো। সাড়ে চারটা। ফিরে তাকালো গেটের দিকে, তখনি দৃশ্যটি নজরে এলো।

আমারা হেঁটে আসছে। আলুথালু শরীর আবৃত ওভারসাইজড একটি টি শার্ট এবং ডেনিম স্কার্টে, একেবারে নেমে গিয়েছে পায়ের গি‌ঁড়া অবধি। সাদা মোজা এবং পায়ে ফিতাবাঁধা জুতো। এক কাঁধে ঝোলানো ছোট্ট একটি ব্যাগ। ব্যাঙ্স কাট দেয়া মসৃণ চুলের গুচ্ছ কাঁধের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। ছোট ছোট পায়ে অনেকটা পেঙ্গুইনের ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে, দেখেই দোহার ঠোঁটে মৃদুমন্থর হাসি ফুটলো।

কাছাকাছি এসেই আমারা মুখ তুলে তাকালো, অতি দ্রুত হেঁটে, উহু, রীতিমত দৌঁড়ে এসেছে সে, তাই হাঁপ ধরে গিয়েছে। দোহাকে দেখেই তার ধড়ফড় করতে থাকা বুক গতি বাড়ালো, দ্বিগুণ শক্তিতে স্পন্দিত হতে থাকলো হৃদযন্ত্র।

এগিয়ে গেলো দোহা, নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটি ছোট পানির বোতল বের করে নিয়ে কর্ক খুলে আমারার হাতে দিলো।

- এতটাও তাড়াহুড়ো করার দরকার ছিলোনা। দশ মিনিট দেরী করলে পৃথিবী হঠাৎ করে গুঁড়িয়ে যেতনা।

আমারা লজ্জা পেলো, দৃষ্টি লুকিয়ে আনমনে বোতলে চুমুক দিলো। হালকা গোলাপী লিপস্টিক দেয়া ঠোঁট তার চিকচিক করে উঠলো সিক্ত হওয়ায়। মুখের তুলনায় ঠোঁটের আকৃতি ছোটই, তাতে ভিন্ন ধরণের আদুরে দেখায় তাকে। দোহা একদৃষ্টে লক্ষ্য করলো। আর্দ্র ঠোঁট পেরিয়ে তার দৃষ্টি আটকালো নাকের প্রান্তে সংযুক্ত নথে। এতক্ষণ যাবৎ মেয়েটার মাঝে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে বুঝতে পারলেও ঠিক ধরতে পারছিলোনা সে। এবার কারণ আবিষ্কার করেই হাত তুললো, অজান্তেই বৃদ্ধাঙ্গুলে ছুঁয়ে নথ পরিহিত নাক। শিউরে উঠলো আমারা, স্পর্শ প্রত্যাশা করেনি। তবে দোহাকে সে সরিয়ে দিলোনা। মোহাবিষ্ট দৃষ্টিমাঝে চেয়ে রইলো। বিস্তৃত হাসি ফুটলো দোহার ঠোঁটে,

- সুইটহার্ট....

মোহিত কণ্ঠটি কানে গোত্তা খেলো, শিরশিরে এক অনুভূতি খেলে গেলো শিরদাঁড়া পেরিয়ে একেবারে অন্তরজুড়ে। দোহা দুই আঙ্গুলে আমারার চিবুক ছুঁয়ে বললো,

- ইউ লুক প্রিটি।

লাজমাখা নয়নে হাসলো আমারা, তার ফোলা গালে আঙুল বুলিয়ে আনলো দোহা। উৎসাহী কন্ঠে আমারা তাকে জানালো,

- বাবাই দিয়েছে। সুন্দর না?

- খুব সুন্দর। তোমাকে নোলকে ভীষণ মানিয়েছে, মনে হচ্ছে বড় হয়ে গিয়েছ।

- এটা নোলক নয়, নথ।

- ওই একই হলো। আজ থেকে তোমাকে নোলক বলে ডাকবো, কেমন?

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা চালালো আমারা। শরীরের কোষজুড়ে যেন প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে।

- কিউট!

তার গাল টেনে দিয়ে খিলখিল করে হাসলো দোহা। তারপর নিজের হাতের মুঠোয় আমারার হাতটি নিয়ে এগিয়ে গেলো। তাকে অনুসরণ করলো কিশোরী, উত্তেজিত এবং উৎফুল্ল হৃদয়ে। বাইসাইকেলের সামনে এসে থামলো দোহা, উবু হয়ে গিয়ার ঠিক করলো। দৃশ্য লক্ষ্য করেই আমারার লাজমিশ্রিত হাসি উধাও হয়ে গেলো। ব্যাপারটা খেয়াল করে দোহা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। আমারা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললো,

- সাইকেল? আমরা সাইকেলে যাবো?

- হুম। কেনো? সমস্যা আছে কোনো? স্পিড মোশন?

ইতস্তত করলো আমারা, এরপর বিব্রত কন্ঠে জানালো,

- যদি....টায়ার পাংচার হয়ে যায়?

থমকালো দোহা, ভ্রু তুলে তাকিয়ে থাকলো আমারার দিকে। রাস্তায় পরে থাকা একটা ইটের টুকরোকে পা দিয়ে নড়াচড়া করতে করতে আমারা বিড়বিড় করলো,

- আমার একটা বান্ধবী ছিলো, হাই স্কুলে। ওর সাইকেলে একদিন চড়েছিলাম, টায়ার ফেটে গিয়েছিল। এরপর থেকে আর আমার সঙ্গে কথা বলতো না, হিহি। তোমারটাও না.....নষ্ট হয়ে যায়। তার চেয়ে বরং, হেঁটে যাই, কিংবা রিকশা?

কথাটা মজার ছলে বললেও আমারার মুখজুড়ে যে তিক্ত বিষাদ ভেসে বেড়ালো, তা দোহার কাছে স্পষ্ট। স্থির তাকিয়ে রইলো সে, আমারার সঙ্গে হাসলোনা। বরং সাইকেল ঘুরে এপাশে এলো।

আমারা কৌতূহলী হয়ে তাকাতেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কোমরজুড়ে জড়িয়ে গেলো দোহার হাত। জোরালো এক টান, দোহার দুহাতের মাংসপেশীর তীব্র প্রসারণ হুডির অন্তরালেও স্পষ্ট টের পেলো আমারা, তারপরই নিজেকে আবিষ্কার করলো শূন্যে! সাইকেলের পিছনের সিটে আলতোভাবে তাকে বসিয়ে দিলো দোহা। দুবাহু দুইপাশে ঠেকিয়ে ঝুঁকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। ভ্রু কুঁচকে আছে ছেলেটার, বুক ওঠানামা করছে, বোঝা যাচ্ছে কষ্ট হয়েছে। তবুও ঠোঁটে বিস্তর হাসি ফুটিয়ে আমারার কপালের ছোট ছোট চুলগুলো ছুঁয়ে দিয়ে দোহা বললো,

- ওর সাইকেলের টায়ার আগে থেকেই দূর্বল ছিলো, বুঝেছ? তোমার বয়ফ্রেন্ড কিন্তু দূর্বল নয়।

বাকরুদ্ধ চেয়ে রইলো আমারা, দোহা আরো একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে জড়ানো স্বরে বিড়বিড় করলো,

- মনে রেখো, তোমাকে বহনের ক্ষমতা এই দুনিয়ায় অতি ভাগ্যবান কিছু মানুষকেই দিয়েছেন খোদা, তার মধ্যে আমি একজন। যার তার সাধ্য কি তোমায় বহন করে?

হতবিহ্বল আমারা। হালকা চোখ টিপ দিয়ে তৎক্ষণাৎ সাইকেলের উপর চেপে বসে মাথায় হুডির টুপি তুলে দিলো দোহা। কাঁধের ব্যাগ হ্যান্ডেলের পাশে ঝুলিয়ে দিয়ে প্যাডেলে পা ঠেকিয়ে আদেশ করলো,

- শক্তভাবে চেপে বসো, আ ’ম গনা মেইক ইউ ফ্লাই টুডে সুইটহার্ট।

দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে দোহার কোমরে ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেলো আমারার মাংসল কোমল হাতজোড়া। তার সন্নিকট উপস্থিতি অনুভব করে মৃদু হেসে দোহা প্যাডেল চাপলো। রাস্তা ধরে বায়ু কেটে মুহূর্তেই ছুটতে আরম্ভ করলো সাইকেল। গিয়ারের কারণে ক্রমেই বাড়লো গতি, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোরদার হলো আমারার আলিঙ্গন। বাতাসের ঝাঁপটায় চুল উড়তে থাকলো এদিক সেদিক, নিঃশ্বাস নেয়া দায় হলো। তবুও হাসলো আমারা, প্রাণখুলে। তার গোটা জীবনের না পাওয়া যেনো ওই একটিমাত্র অস্তিত্বের হাত ধরেই পূরণ হয়ে গিয়েছে। ভীষণ আপ্লুত মনে হলো নিজেকে, দোহার পিঠে আলতোভাবে মাথা ঠেকিয়ে তাকে অনুভব করে গেলো আমারা, প্রাণভরে। তার প্রশস্ত আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে দ্বিগুণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরলো সে দোহাকে। তার জীবনের প্রথম অনুভূতিকে।

কৈশোরকালের অবুঝ সত্তাটি জানতেও পারলোনা ঠিক একই সময়ে শহরের অপর প্রান্তে হাতিরঝিলের কাছে যার যার সাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট দলটি, নেতৃত্বে অনিক। নিজের সাইকেলের গায়ে হেলান দিয়ে অদূরে নদীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, হাতে একটি সিগারেট, যার ধোঁয়া ক্রমশ বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে জিই-শু নামের চাইনিজ - আমেরিকান বন্ধুটি জিজ্ঞেস করলো,

- কি ব্যাপার? আজকে দোহা এলোনা?

অট্টহাসি হেসে অপর বন্ধু রাজীব হাতের প্যাডের গেইম চলমান রেখে জানালো,

- ওর ভুটকি গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে গিয়েছে, জানিস না তুই?

আপনমনে হাসলো সকলে। অনিক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে সেই হাসির কলতানে যোগদান করে বললো,

- হি ইজ আ ম্যান অব হিজ ওয়ার্ড। ২০ হাজার টাকার দাও, এত সহজে ফস্কাবে না, জাস্ট চিল অ্যান্ড এনজয় দ্যা ড্রামা!

- ওহ গড, দিস ইজ গনা বি সো মাচ ফান!

- গ্যাম্বলিং ইজ অলয়েজ ফান!

জিই- শু আর অনিকের উৎফুল্ল কণ্ঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসলো সকলে।

—চলবে—

[ তরমুজ দোহা...... উপরে সবুজ ভেতরে লাল, রংবদল চমৎকার। 🤩🫶🏻 ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন