#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫
পর্ব ৫: [ হ্যাপি ফার্স্ট ডেট ] - (প্রথমাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
ক্যাফেটি ছোট, অতিরিক্ত অভিজাত নয়। তবুও কোথাও যেন একটা শান্তির ছোঁয়া আছে। হাতে গোণা ছয়খানা ছোট ছোট টেবিল। ছাউনীহীন পরিবেশ, আশেপাশে ফুলের গাছে প্রজাপতি খেলা করছে। মনোরম পুষ্পঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে, সঙ্গে কড়া কফির সুবাস। আমারা এবং দোহা একদম মাঝের একটি টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে। দোহার হাতে মেন্যুকার্ড, অপরদিকে আমারা ব্যস্ত চারিদিকে দৃষ্টি বিলাতে।
- চীজ বার্গার নাকি নান চিকেন? কোনটা খাবে?
দোহার দিকে তাকিয়ে আমারা আনমনে কি যেন ভেবে বিড়বিড় করলো,
- স... সালাদ।
স্থির চেয়ে রইলো দোহা,পরক্ষণে একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লো,
- মাই গট প্রিন্সেস, জাস্ট হোয়াই? কেউ কি তোমাকে তোমার খাবার নিয়ে খোটা দিয়েছে? ডায়েট করতে বলেছে?
আমারা নিঃশব্দে টেবিলের উপর রাখা নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। দোহা টেবিলের উপর ঝুঁকে এলো, দুই আঙ্গুলে তার চিবুক ছুঁয়ে মুখ তুলে দৃপ্ত কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- সত্যি করে বলো নোলক, কে বলেছে? নামটা বলো শুধু, বাকিটা আমি বুঝে নিচ্ছি।
- না... না মানে... কেউ কিছু বলেনি আমাকে। তুমি ভুল বুঝোনা। আসলে দুপুরের খাবারের পর পেট এখনো ভরা তো, তাই।
তবুও দোহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর চেয়ারে বসে পরে বললো,
- ঠিক আছে, ইফ ইউ সে সো। তাহলে আমি ডেজার্ট অর্ডার করছি।
দুই আঙ্গুল তুলে ওয়েটারকে ডেকে দোহা এক কাপ চা, এক কাপ কফি এবং চকলেট পেস্ট্রি অর্ডার করলো। আমারা মৃদু হাসিমাখা নজরে তাকে চেয়ে দেখলো। সে কফি পছন্দ করেনা, দোহাকে নিজে থেকেই ব্যাপারটা কোনো না কোনো সময়ে অনুধাবন করে নিয়েছে। ছোট্ট যত্নশীল বিষয়টি তার কিশোরী অন্তরজুড়ে ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে দিলো।
দোহা তার উপর আমারার দৃষ্টি অনুভব করে স্মিত হাসলো, মাথা কাত করে আঙ্গুল ঠেকিয়ে তাকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে বললো,
- আমাদের প্রথম ডেট তোমার ভালো লাগছে, নোলক?
“ নোলক ”— সম্বোধনটি প্রতিবার হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। ফোলা গালে লালিমা মেখে আমারা সায় জানালো,
- হুম। খুব ভালো।
- তুমি এর আগে কখনো ডেট করেছ?
- না। তুমিই প্রথম।
- আই অ্যাম লাকি দ্যান।
মুচকি হাসলো আমারা। অর্ডার চলে এলো তাদের দ্রুতই। ওয়েটার সবকিছু পরিবেশন করে প্রস্থান করতেই আমারা নিজের চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে দোহার দিকে তাকালো,
- তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
হঠাৎ করেই থমকে গেলো দোহা। হাতের কাঁটাচামচ দিয়ে সে সবেমাত্র কেকের টুকরো মুখে দিচ্ছিলো, কিন্তু মাঝপথেই স্তব্ধ হলো। তবে তার অভিব্যক্তি দ্রুতই প্রতিস্থাপিত হলো পরিমিত হাসিতে। কেক মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে জানালো,
- উম...আব্বু, আম্মু, আপু, ছোট একটা ভাই... এই তো।
- ওয়াও। তোমার ছোট ভাই আছে? নাম কি ওর? কোন ক্লাসে পড়ে?
দোহা কিছুক্ষণ চুপ থাকলো, কি যেন ভাবলো আপনমনে। তারপর কন্ঠ পরিষ্কার করে বললো,
- ফায়াজ। ও এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি।
- ও খুব কিউট তাইনা?
- তুমি কিভাবে জানলে?
- তোমাকে দেখে।
দোহা স্থবির হলো, চোখ তুলে তাকালো আমারার দিকে। ছোট পাতলা পাতলা ঠোঁটে বিস্তর হাসি মেখে তাকিয়ে আছে। ওই হাসি যেন অন্তরকে টেনে নেয় মায়ার গভীরতায়। আর ওই ডাগর ডাগর আঁখিজোড়া, তাতে জ্বলজ্বলে আবহ যেন এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের ছায়া। দোহা মৃদু হাসলো, কাটাচামচে পেস্ট্রি তুলে নিয়ে এগিয়ে দিলো, আমারার ঠোঁটে ছোঁয়াতেই সাগ্রহে সেটি খেয়ে নিলো প্রেমিকা।
- তুমি যা করছো, তাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয় ফ্লার্টিং।
আমারা খানিক লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো। দোহা তার প্রতিক্রিয়া উপভোগ করলো ভীষণ। চামচটি ফিরিয়ে নিয়ে সে আবারও পেস্ট্রি তুলে নিজের মুখে দিলো। একটি শক্ত ঢোক গিলে দৃশ্যটি দেখলো আমারা। দোহার ঠোঁট লক্ষ্য হতেই সে অন্তরে ঝিলিক অনুভব করে দ্রুতই আবার পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়ালো।
ওই মুহূর্তেই ক্যাফেতে থাকা অন্যান্য মানুষেরা ভীষণ অবাক হয়ে খেয়াল করলো, একদল ছেলে প্রবেশ করেছে জায়গাটিতে। বন্ধুর দলের যাতায়াত এখানে অহরহ, তবে বিস্মিত হওয়ার কারণ তাদের মধ্যে দুইজনের হাতে থাকা বেসবল ব্যাট। প্র্যাকটিস থেকে এসেছে? উহু, তা হলে অন্তত অন্যান্য সরঞ্জামও সাথে থাকতো। তারা এখানে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে।
জেল দিয়ে খাড়া করে রাখা চুলের একটা ছেলে নিজের হাঁটুছেড়া জিন্সের পকেটে দুহাত ভরে দোহা এবং আমারার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালো। তার অনুসরণে বাকি আরো চারজন। প্রত্যেকের চোখই কেমন যেন ধোঁয়াটে, সঙ্গে ধারালো এক অনুভব। তাদের চাহুনি এবং হুমকিস্বলুভ বেশভূষা আমারাকে বিচলিত করলেও দোহার মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। সে তাকায়নি অবধি। একমনে নিজের কফির মগে চুমুক দিয়ে চলেছে, যেন আশেপাশে অস্বাভাবিক কিছুই ঘটছেনা। দৃশ্যটি লক্ষ্য করে বাঁকা হাসি ফুটলো ছেলেটির ঠোঁটে, টেবিলে দুহাত রেখে ঝুঁকে এসে কর্কশ কন্ঠে সে বললো,
- নিজেকে সৌদি বাদশাহর নাতি মনে করিস? ভাব নিলেই বুঝি কাকের গায়ে ময়ূরের পালক গজায়?
কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই দোহার, হাঁটুর ওপর হাঁটু তুলে সে একই ভঙ্গিতে কফি পান করে যাচ্ছে। আশেপাশের সবাই ফিরে ফিরে দেখছে, ক্যাফের লোকজনও বেশ উদ্বিগ্ন। তবে ছেলেগুলোর হাতের ব্যাট দেখে এগোতে দ্বিধা করছে। টেবিলে হাত রাখা নেতাগোছের ছেলেটা আরো একটু ঝুঁকলো, দোহার মুখের সামনে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো,
- কি ভেবেছিস? এই রাশেদের হাত থেকে পার পেয়ে যাবি? এত সহজে? তোর অনিক আব্বাকে বলিস, ব্যাটা মানুষ হয়ে থাকলে....
- এক্সকিউজ মি।
মোলায়েম কণ্ঠটি রাশেদকে থামিয়ে দিলো। ঝট করে ফিরে চেয়ে সে লক্ষ্য করলো আমারাকে, যে উদ্বিগ্ন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। রাশেদ ধারালো দৃষ্টিতে চাইতেই গলা খাঁকারি দিয়ে আমারা বিড়বিড় করলো,
- তোমরা একটা পাবলিক প্লেসে কারো সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে পারোনা। প্রয়োজন হলে একান্তে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করা যায়।
- হাহাহা... ভুটকি বলে কি?
হেসে উঠলো রাশেদ, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গোটা দল। নিজের চুলে হাত বোলাতে গিয়েও থেমে গেলো সে, তারপর ভীষণ বিনোদন পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে তাকালো আমারার উদ্দেশ্য, যার চোখমুখজুড়ে বিব্রতবোধ স্পষ্ট।
- আমি কি করবো, কোন কায়দায় করবো সেটা কি এখন আমাকে তোর কাছ থেকে শিখতে হবে ভুটকি... আক্ব!
প্রচন্ড একটা ঝটকা, রাশেদ মুখ থুবড়ে পড়লো টেবিলের উপর। ঝনঝন করে উঠলো কাপ প্লেট। তীব্র গুঞ্জন। হতবিহ্বল হয়ে সকলে দেখলো দোহা রাশেদের ঘাড় চেপে ধরে আছড়ে ফেলেছে টেবিলে, ছটফট করতে থাকা ছেলেটাকে আরো দ্বিগুণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরে ক্রুব্ধ কন্ঠে সে হিসিয়ে উঠল,
- আরেকবার ওই শব্দটা উচ্চারণ করলে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে আমার দুই সেকেন্ডও লাগবেনা রাশেদ, মনে রাখিস!
রাশেদকে ছেড়ে দিতেই সরে দাঁড়ালো দোহা। ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে তার আক্রোশে, দুহাত মুষ্টিবদ্ধ। দলটিকে সে সামনে থেকে রীতিমত ঠেলে সরিয়ে আমারার একটি হাত চেপে ধরলো।
- চলো এখান থেকে।
বাধ্য হয়ে আমারা উঠলো, তবে ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময়টুকু তারা পেলনা। এর আগেই অতর্কিতে পিছন থেকে বেসবল ব্যাটের এক ঘা এসে পড়লো দোহার পিঠে, সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠলো তার ব্যথায়। হাতের বাঁধন থেকে আমারার হাত ছুটে গেলো মুহূর্তেই।
- দোহার বাচ্চা! তোর সাহস কি করে হয়....
জোরালো ধাক্কায় দোহাকে পাশের টেবিলে ঠেলে ফেললো একজন ছেলে। চিৎকার চেঁচামেচি আরম্ভ হলো আশেপাশে। ভীষণ এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। তার মাঝেই দোহাকে ঘিরে ফেললো সকলে। রাশেদ উঠে নিজের ঘাড় ডলতে ডলতে ঘু*ষি হাঁকালো দোহার মুখে, ঠোঁটের সাথে লেগে সামান্য একটু ছড়ে গেলো, দুফোঁটা র*ক্ত জমলো। খুকখুক কেশে উঠলো দোহা।
- শালা! কোন আব্বার জোর তোর? যদি ঐ জোর আজকে না ভেঙেছি তাহলে....
আবারও হাত তুললো রাশেদ, আ*ঘাত করার উদ্দেশ্যে।তবে সম্ভব হলোনা, তড়িৎ গতিতে মধ্যখানে এসে পড়লো আমারা। তার হাত শক্তভাবে চেপে ধরে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিলো, হাতে ধরা একটি গ্লাসের পানি ছুঁড়ে মারলো মুখে। হিসিয়ে উঠে পিছিয়ে গেলো রাশেদ, নিজের মুখ শার্টের কাপড়ে মুছলো দ্রুত। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সকলে। তীব্র ক্রোধে ভ্রু কুঁচকে আমারা বললো,
- দল পাকিয়ে একজনকে হেনস্তা করতে আসো, লজ্জা করেনা?
গোটা দলটি বিহ্বল চেয়ে থাকলো আমারার অবয়বে, যে অটল দন্ডায়মান নিজের প্রেমিককে রক্ষায়। এতগুলো ছেলের মাঝে ঢুকতে যেকোনো মেয়েই ভয় পাবে, তবে আমারার মধ্যে ভয় তো দূরে থাক, সংশয়ের ছিটেফোঁটাও নেই। দোহাকে দুহাতে আড়াল করে সে গম্ভীর চাহুনি নিক্ষেপ করে রেখেছে রাশেদের উদ্দেশ্যে।
- বা***!
অশ্রাব্য একটা শব্দ উচ্চারণ করে হঠাৎই আমারার কাঁধের চুলের গোছা টেনে ধরলো রাশেদ,
- তোর ডার্লিংকে জিজ্ঞেস কর, ও যখন আমার ভাইটাকে উত্তম মধ্যম দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে তখন ওর লজ্জা হয়নি?
কুঁকড়ে গেলো আমারা,তবে হাল ছাড়লোনা। রাশেদের হাত খামচে ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
- নিশ্চয়ই সেরকম কিছুই করেছিলো!
- শালী আস্ত একটা গরুর ডিম! ব্রেইন ওয়াশ ভালোই হয়েছে তোর না?
চকিতে নিজেকে সামলে লাফিয়ে উঠলো দোহা, রাশেদের হাত চেপে ধরে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে মুহূর্তেই মুচড়ে দিলো। আমারাকে অপর হাতে ঠেলে দিলো নিজের পিছনে। রাশেদ ভীষণ চিৎকারে উবু হয়ে পড়তেই আগ্রাসী স্বরে দোহা বললো,
- বারণ করেছিলাম, কার কলিজাতে হাত দিস তুই? এই হাত আমি....
- আহ্হঃ...
- দোহা!
- শালারে ধর....!
মিশ্রিত অনেক ধ্বনি একত্রে গুঞ্জরিত হলো। আমারা আতঙ্কিত নজরে শুধু দেখে গেলো, কুরুক্ষেত্র। দোহা এবং রাশেদের ভীষণ হাতাহাতির মাঝে তেড়ে গেলো বাকিরা, বেসবল ব্যাটে ঘাত হানলো দোহার কাঁধে, পায়ের উরুতে। তবে দোহা অটল, কুঁকড়ে এলেও রাশেদকে সে কোনোমতেই ছাড়ছে না, দৃষ্টিতে আগুন জ্বলছে তার। আমারা অসহায়ের মতন চারিদিকে তাকালো, সকলের স্থবির অবয়বে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
- আপনারা কি মানুষ? নাটক দেখছেন নাকি?
তার কথায় যেন হুশ হলো সকলের। অনেক লোকজন ছুটে গেলো, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়ষ্ক কতক পুরুষ। তারা জোরপূর্বক রাশেদ এবং দোহাকে ছাড়িয়ে বেশ কয়েক প্রস্থ ধমক দিলো। বেসবল ব্যাটগুলো কেড়ে নেয়া হলো তাদের কাছ থেকে। দীর্ঘ আধ ঘণ্টার মোক্ষম রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ এবং ধমক হজমের পর দোহার মুক্তি মিললো। রাশেদের দিকে ফিরেও তাকালোনা সে। হনহন করে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে গেলো। আমারা অদূর থেকে দ্রুতই দৌঁড়ে তার পিছু নিলো। রাশেদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দোহার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থু করে মুখে জমা সামান্য র*ক্ত ছুঁড়ে ফেললো মাটিতে।
。
。
。
সেন্ট পিটার্সবার্গের পিছনের গেটের সামনে এসে যখন দোহার সাইকেল থামলো তখন চারিপাশে সন্ধ্যা নেমেছে। আমারা আস্তে করে পিছনের সিট থেকে লাফিয়ে নেমে গুটিগুটি পায়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। দোহার চেহারা থমথমে হয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে, হাতের কব্জিতে ক্ষত দেখা যাচ্ছে। যা হাজার চাওয়া সত্ত্বেও স্পর্শ করার অনুমতি আমারা পায়নি। গোটা রাস্তা অশনি নীরব ছিলো দোহা। একবার চোখ তুলে দেখেওনি আমারাকে, এই যেমন এখনো দেখছে না। তাকে ঠিক কি বলবে বুঝতে পারছেনা আমারা। এই মুহূর্তে রাশেদকে নিয়ে প্রশ্ন করে দোহাকে চটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা নেই, ছেলেটার মনের অবস্থা বুঝতে পারছে সে। তাদের প্রথম ডেটেই এমন একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে আন্দাজ করাও কঠিন ছিলো। একটি নিঃশ্বাস ফেলে আমারা ক্ষীণ কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- মন খারাপ করোনা দোহা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কোনো উত্তর এলোনা। দোহার দৃষ্টি সুদূর আকাশে নিবদ্ধ। আমারা ইতস্তত করলো, তারপর বললো,
- ও...ওষুধ...
- চিন্তা করোনা। আমি লাগিয়ে নেবো।
গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলো দোহা। যদিও মন সায় দিচ্ছে না, ইচ্ছা হচ্ছে দোহাকে টেনে নিয়ে এক্ষুণি মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে, তবুও আমারা নিজেকে দমালো। একটি ঢোক গিলে সায় জানালো নিঃশব্দে।
- ডরমে যাও। আর কাউকে কিচ্ছু বলোনা।
তার শুষ্ক কন্ঠ পীড়াদায়ক ঠেকলো। আমারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে হাতে বানানো কার্ডটা বের করলো। দোহার সাইকেলের ঝুড়িতে রেখে দিয়ে বিড়বিড় করলো,
- এটা, তোমার জন্য বানিয়েছিলাম।
এটুকুই। আর কিছু বলতে পারলোনা আমারা সংকোচে।দ্রুতই উল্টো ঘুরে ছোট ছোট পায়ে রীতিমত ছুটতে ছুটতেই আড়াল হয়ে গেলো সে কলেজের প্রাঙ্গণের ভেতরে, ফিমেল ডরমের বিল্ডিংয়ের দিকে। দোহা নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখলো, যতক্ষণ না আমারার আলুথালু ভারী অবয়বটা চোখের আড়াল হয়ে যায়। তারপর সে ঝুঁকে ঝুড়ি থেকে কার্ডটা তুলে নিলো।
সাদা এবং লাল রঙের রঙিন কাগজ দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে কার্ড। উপরে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লিখা, “ হ্যাপি ফার্স্ট ডেট ”— নিচেই কার্টুনের আদলে আঁকা দোহার একটি অবয়ব। তার ভাঁজ খুলতেই অপর প্রান্তে রং বেরঙের কাগজে তৈরী গোটা একটা ফুলের বাগান। সঙ্গে ছোট ছোট কিছু চিরকুটের মতন গানের লাইন। অতি যত্নে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে বানানো হয়েছে স্পষ্ট। স্থির তাকিয়ে থাকলো দোহা, তার দৃষ্টি ক্রমশ তীক্ষ্ণ হলো, চেহারায় ফুটলো শীতলতা। হাতের আঙুলের জোরালো চাপে এক ঝটকায় সে মুচড়ে ফেললো কার্ডটি! টুকরো টুকরো করে ছিঁড়লো, ছুঁড়ে ফেললো রাস্তার উপর। বাঁকা হাসি ফুটলো ঠোঁটে, অবজ্ঞার স্বরে আপনমনে বিড়বিড় করলো,
- হ্যাপি ডেট... মাই ফুট!
সাইকেলের প্যাডেল চেপে নির্দ্বিধায় সামনে এগোলো দোহা, টায়ারে রাস্তার ধূলোবালিতে পিষে দিয়ে গেলো টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে থাকা উপহারটিকে।
#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫
পর্ব ৫: [ বন্ধুত্ব ] - ( শেষাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━
ডরমের করিডোর ধরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমারা। ধীর পদক্ষেপ, শরীরে অস্থিরতা। ক্যাফেতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সে কিছুতেই ভুলতে পারছেনা। দোহা আসলেই ঠিক আছে তো? অবশ্য, কলেজে ছেলেটা কিছুটা মাস্তানি ধরণের স্বভাবের জন্যই বিখ্যাত। তবুও, আজকে সরাসরি এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আমারা বেশ চিন্তিত।
অতর্কিতে সামনে কারো অবস্থান টের পেয়ে আমারা থমকে গেলো। মুখ তুলে তাকাতেই দৃষ্টিগোচর হলো। রুমমেট জারা। ধবধবে সাদা টি শার্ট পরনে, ঢোলা ট্রাউজারের পকেটে দুহাত ভরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। করিডোরের হলুদাভ আলোর প্রতিফলনে তার দেহের চাপা রং কেমন যেন জ্বলজ্বল করছে। শীতল উপস্থিতি একটা প্রাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়— ব্ল্যাক প্যান্থার। জারাকে দেখলে বিনা কারণেই জন্তুটার মুখচ্ছবি ভেসে উঠে আমারার নয়নে।
- বয়স কত তোর? ষোলো? এখনি প্রেম করছিস?
জারার গম্ভীর কন্ঠস্বরের বিপরীতে আমারা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলো। কয়েকবার চোখ পিটপিট করলো। এই মেয়ে তার সঙ্গে কথা বলছে? তাও এক প্রকার অপ্রয়োজনীয় কথাই? নিজেকে দ্রুতই সামলালো সে, অতিরিক্ত বিস্ময় প্রকাশ করলে হয়তো বা জারা আবারো চুপসে যাবে। তাই সে স্বাভাবিক উত্তর করলো।
- সবাই করে।
জারা কয়েক মুহূর্ত আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো তাকে। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেললো। তার কন্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো করিডোরে।
- সবাই বাঘের মুখে ঝাঁপ দিলে কি তুইও দিবি?
নীরবতা। দুহাত কোমরে ঠেকিয়ে তিক্ত এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো জারা। কন্ঠ চড়িয়ে বললো,
- প্রেম ভালোবাসা সবার জন্য নয়, বিশেষ করে তোর জন্য। সাইজ দেখেছিস নিজের?
তার কথায় আমারা নিজের শারীরিক অবয়বের দিকে চোখ বুলিয়ে আনলো। ছোটখাটো উচ্চতার আলুথালু এক নরম শরীর, হালকা ফোলা ফোলা গাল , ভুঁড়িখানি ওভারসাইজড টি শার্টের আড়ালে রয়েছে। স্কার্ট ঢেকে রেখেছে একেবারে পা অবধি। একটি ঢোক গিললো সে, মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো,
- সৌন্দর্য্য আপেক্ষিক।
জারা ভ্রু কপালে তুলে চেয়ে থাকলো। আমারা আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে এগোলো, নিজের বক্তব্যে যোগ করলো,
- সৌন্দর্য্যের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। সবই আমাদের তৈরি স্টেরিওটাইপ। সৌন্দর্য্য কি? তোর নজরে যা চমৎকার, তাই সুন্দর। সে হোক একটি তুলতুলে পদ্মফুল কিংবা বিরাট বটগাছের গুঁড়ি।
বাঁকা হাসলো জারা, মাথা ঝাঁকালো। দুহাত তুলে পিছিয়ে গিয়ে সমর্পণের ভঙ্গিতে বললো,
- দুইদিনেই এত বিশ্বাস?
- হুম। যে সম্পর্কে কোনো বিশ্বাস নেই, সে সম্পর্কে ভালোবাসা নেই।
নিঃশব্দ এক গভীর দৃষ্টির বিনিময় হলো জারা এবং আমারার মাঝে। তাদের মাঝে বন্ধুসুলভ কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও উভয়ের মধ্যখানে অদৃশ্য এক টানের অনুভব টের পাওয়া গেলো। কিছুই বললো না আমারা আর, জারাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো জারা, মাথা ঝুলে রইলো কিঞ্চিৎ পরাজিত ভঙ্গিতে। আমারা করিডোরের প্রান্তে রুমের ভেতর আড়াল হয়ে যেতেই ফিরে তাকালো সে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে,
- তুই এখনো পুরুষমানুষ চিনলি না রে মধু.... ওরা ভালোবাসে চল্লিশ কেজিকে, সত্তর কেজিকে না। তোর কপালে দুঃখ আছে, মহা দুঃখ।
আপনমনে মৃদু বিষাদের হাসি হাসলো জারা। গোটা কলেজে যে একটা মেয়েকে সে সবসময় আড়াল থেকে লক্ষ্য করে, সেটা হলো এই আমারা। মেয়েটাকে বিশ্লেষণ করে তার উপযোগী একটা ডাকনাম দাঁড় করিয়েছে সে।
—মধু।
মধুর মতন মিষ্টি, অপচনশীল এক অস্তিত্ব।
যার হৃদয় নিয়ে খেলাধূলা সমাজের পারফেক্ট মানুষগুলোর নিত্যদিনের অভ্যাস।
━━━━━━━━━━━━━━━
গ্যারেজের জ্বীপগাড়ির আড়ালে মেঝেতে বসে তাস খেলায় মগ্ন রাশেদ। হাতের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখা শক্তিশালী চালের কার্ডের বহর। ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট। ডানপাশে রাখা একটি কালো তকতকে বোতল। যেটি হাতিয়ে তার পাশের জন কয়েক চুমুক গিলে আবার নিচে রেখে নিজের দান ছুঁড়লো। সবাই অট্টহাসিতে মশগুল হলো মুহূর্তেই।
- আরে ব্যাটা, কি দান দিলি রে!
- হাহাহা....এইবারও পকেট পুরলো তোর।
রাশেদ খিলখিল করে হাসলো, তার পাশের জনকে দুটো হাজার টাকার নোট তুলে পকেটস্থ করতে দেখলো। জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- তোর তো রাজকীয় কপাল শালা!
- তোরও।
কঠিন কন্ঠস্বরটি কোথা থেকে ভেসে এসেছে বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিতে জোরালো লাথিতে তাস বিছানো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো রাশেদ। ইতোমধ্যে ব্যান্ডেজ করে নেয়া গাল চেপে ককিয়ে উঠলো। সবাই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা শরীর ঝেড়ে ঝট করে ফিরে তাকালো। মুহূর্তেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো।
- অনিক!
একজন অস্ফুট ভয়ার্ত শব্দ করে উঠলো। অনিকের ভারী কেডস পরনে পা খানি তখনো উঁচিয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে অদ্ভুতুড়ে এক হিংস্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। সে একা নয়, পিছনে রয়েছে জিই- শু আর রাজীব। একজনের হাতে গলফস্টিক, অপরজন সাইকেলের ভারী চেইন হাতের মুঠোয় পাকিয়ে চলেছে বিপদজনকভাবে।
হতবিহ্বল রাশেদ কোনোমতে মাথা তুলে পিছনে তাকিয়েই ভড়কে গেলো। একদম স্থবিরতা ধারণ করলো তার শরীর। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো অশুভ দৃশ্যটির মাঝে। অনিক চুইংগামে বাবল ফুলিয়ে নিয়ে সামান্য উবু হয়ে বসলো, রাশেদের আতঙ্কিত দৃষ্টিতে নিজের শীতল দৃষ্টি মিলিয়ে বললো,
- শুনলাম তুই নাকি তোর আব্বুকে খুঁজছিলি? নে, চলে এলাম, আব্বু ডাক এবার!
- শা.....
- হুশ! আব্বুকে গালি দেয়না।
বলেই সজোর এক চড়ে রাশেদকে দ্বিতীয়বার মাটিতে আছড়ে ফেললো অনিক। লাফিয়ে উঠলো সবাই। তেড়ে আসতে চাইলেও জিই - শুর গলফস্টিকের প্রতিচ্ছবি তাদের থামিয়ে দিলো। বাঁকা হেসে সেটি কাঁধে ঠেকিয়ে চাইনিজ - আমেরিকান খেঁকিয়ে উঠলো,
- সাহস থাকলে সামনে আয়, দুই তিনটাকে ধুমতানা করে দেই।
- চুড়ির দরকার হলে বলিস, পকেটে আছে। আসার সময় তোদের জন্য এক ডজন কিনে এনেছি।
সত্যি সত্যি নিজের ঢোলা জিন্সের পকেট টেনে লাল টকটকে চুরির অংশ দেখালো রাজীব। ঢোক গিললো সবাই। নিজের দলকে ভয় পেয়ে যেতে দেখে রাশেদ হুংকার দিয়ে উঠলো,
- বাই***! ওই চুড়ি আজকে তোদেরকেই পড়াবো, তারপর রাস্তায় শো ডাউন দেবো, এলাকার সবাই দেখবে এই মুল্লুক কার।
- গালি ছাড়া কথা বলতে পারিস না, বেত্তমিজ?
রাশেদের কলার চেপে ধরে অনিক আবারো হিসিয়ে উঠলো,
- তোর সাহস কি করে হয় দোহার গায়ে হাত দেয়ার? পার পেয়ে যাবি ভেবেছিস?
অনিকের হাত খামচে ধরে রাশেদ উঁচু হয়ে তাকালো। অদূরে জ্বীপগাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোহা, দুহাত বুকের উপর বাঁধা, ঠোঁটে ঝুলছে এক টুকরো দারুচিনি। নির্বিকার তাকিয়ে আছে, এখানে যা হচ্ছে তাতে বিন্দুমাত্র নজর নেই তার।
- ওই খবিশ আমার ভাইয়ের সাথে যা করেছে....
- যা করেছে বেশ করেছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে ওটাকে আরেক দফায় পেদাবো!
রাজীবের উস্কানিতে উন্মত্ত হয়ে পড়লো রাশেদ। সটান অনিকের মুখে ঘুষি হাঁকিয়ে আছড়ে ফেললো মাটিতে। চেপে বসলো বুকের উপর। তার আক্রমণে বাকিরাও আর স্থির থাকলো না। এগিয়ে এসে একজন জাপটে ধরলো জিই - শুকে। অপরজন রাজীবকে। মুহূর্তের মাঝে গ্যারেজটি উত্তাল হয়ে উঠলো, পরিণত হলো কুরুক্ষেত্রে।
দোহা নিশ্চল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো শুধু। জিই -শু ভীষণ পারদর্শী, কুংফুর কিছু টেকনিক তার নখদর্পণে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সে দুইজনকে মাটিতে শুইয়ে ফেললো। একেবারে র*ক্তার*ক্তি অবস্থা। গলফস্টিকের প্রান্ত চুঁইয়ে টপটপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়াচ্ছে তা। অনিক রাশেদকে পা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে আক্রোশে, অপরদিকে রাজীব হাতের চেইন গলায় পাকিয়ে জ্বীপের বনেটে আছড়ে ফেলেছে একজনকে।
দোহা দারুচিনি দুই আঙ্গুলে ছুঁয়ে দিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলো। হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রাশেদ গ্যাংয়ের অবস্থা হলো করুণ। মাটিতে এদিক সেদিক গড়িয়ে সকলে কুকিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে ক্ষান্ত দিলো অনিক। প্রায় নিথর রাশেদকে লাথি দিয়ে জ্বীপের টায়ারে ছুঁড়ে দিয়ে থু করে চুইং গাম একপাশে ফেলে দিয়ে অনিক হাসলো।
- এইটা তোর লাস্ট ওয়ার্নিং রাশেদ গাধা। তোর আব্বুদের সাথে লাগতে চাওয়ার পরিণাম মনে করে পরের বার পাখনা নাড়ানোর চেষ্টা করবি। হারামজাদা!
উল্টো ঘুরে গেলো অনিক, তার পিছু নিলো রাজীব এবং জিই - শুও। শুধু দোহা রয়ে গেলো। মুখ থেকে দারুচিনি বের করে পরিমিত পদক্ষেপে সে রাশেদের সামনে এসে থামলো। হঠাৎই পা তুলে একেবারে হাঁপাতে থাকা ছেলেটার মুখের পাশে গাড়ির গায়ে ঠেকালো। কেঁপে উঠলো রাশেদ। ভীতি এবং ক্রোধের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে তাকালো দোহার দিকে।
- তোর ভাই বাড়িতে ফিরলে বলিস, যদি আর একবার আমার পরিবার নিয়ে আজেবাজে কথা বলার দুঃসাহস করে, তাহলে পরের বার ওর ডান হাতটাও গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবো!
বিষাক্ত শোনালো দোহার কন্ঠস্বর, পা হটিয়ে সে সরে গেলো। রাশেদ স্থির তাকিয়ে রইলো ঝাপসা দৃষ্টিতে, বাইরের পথে আড়াল হয়ে যেতে দেখলো। ক্রমশ মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো তার দুহাত।
বাইরের পথে এসে অনিক, জিই - শু আর রাজীবকে নিজেদের সাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। অনিকের হাতে একটা চ্যাপ্টা বোতল, যাতে চুমুক দিয়ে ঢকঢক করে গিলে যাচ্ছে সে। অপরদিকে রাজীব সিগারেটে মনোনিবেশ করেছে। দোহা আসতেই অনিক নিজের হাতের বোতলটি তার দিকে বাড়িয়ে দিলো,
- খাবি?
দোহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, তারপর সেটি নিয়ে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়েই মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরিয়ে দিলো। অনিক সেটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করলো,
- ব্যাটার আজকে উচিত শিক্ষা হয়েছে।
- ওর ভাইটাকে তুলতে হলে বলিস। এমন কাজে হেব্বি মজা আছে।
নিজের আঙ্গুল মটকাতে মটকাতে বললো রাজীব। দোহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। জিই - শু প্রস্তাব দিলো,
- কেমন যেন পেটটা খালি খালি লাগছে। চলনা কাচ্চি খেয়ে আসি?
- গুড আইডিয়া। আমারও পেটের ভেতর কুমির সাঁতার কাটছে।
রাজীবের কথায় খিলখিল করে হেসে ফেললো সকলে।নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালো দোহা, বললো,
- তোরা যা, আমার একটা কাজ আছে।
- এই ব্যাটা, এই রাত বিরাতে তোর কাজ কিসের রে? ডরমে ফিরবি না?
অনিকের কথায় এক মুহূর্তের জন্য থমকালো দোহা। উত্তর করার বদলে ছেলেটার গায়ে জড়ানো লেদার জ্যাকেটটা খুলে নিয়ে নিজের শরীরে পরিধান করে বিড়বিড় করলো,
- আমার জন্য এক প্লেট পার্সেল নিস, রুমে ফিরে খাবো।
এটুকুই। কাউকে আর কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের সাইকেলে চেপে রাতের আঁধারমাঝে ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে গেলো দোহা।
- ও সবসময় এরকম করে কেনো?
জিই - শুর প্রশ্নের উত্তরে অনিক বিড়বিড় করলো,
- বাদ দে।
。
。
。
আটটার মধ্যেই আজকে সব কাজ শেষ। বক্সে বক্সে খাবার সাজানো হয়ে গিয়েছে। শুধু ব্যাগে ভরে নিচ্ছেন মাহমুদা। যথারীতি বরাবর আটটা পাঁচে তার ঘরের কাঠের দরজায় নক। আঁচলে মুখের ঘাম মুছে দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দিতেই কিশোর ছেলেটিকে দেখে হাসলেন তিনি।
- দোহা....
- আসসালামু আলাইকুম। সব রেডি?
হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো দোহা। মাহমুদা সায় জানিয়ে দ্রুত সরে গিয়ে তাকে ঢোকার জায়গা করে দিলেন। দোহা ভেতরে ঢুকে ছোট কাঠের টেবিলের উপরের ব্যাগগুলো নিজের হাতে তুলে নিলো। তারপর বাইরে বেরিয়ে সাইকেলের ঝুড়িতে রাখলো একে একে। অতিরিক্তগুলো পাশে ঝুলিয়ে নিলো। মাহমুদা স্যান্ডেলজোড়া পায়ে গলিয়ে এলেন। শাড়ির আঁচলে বাঁধা গিট খুলে দুটো পুরাতন এক হাজার টাকার নোট বের করে দোহার দিকে বাড়িয়ে দিলেন,
- তোমার এই মাসের টাকাটা।
দোহা নোট দুটো নিয়ে নিঃশব্দে নিজের পকেটে ভরে জানালো,
- আন্টি, আমার চেনাজানা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। করবা বিলের ওইদিকে দুটো নতুন মেস হয়েছে। ওদের এখনো রাঁধুনী রাখা হয়নি। আমি আপনার কথা বলেছি, তারা বললো আগামী মাস থেকে প্রতি রাতের খাবার নিতে ইচ্ছুক। আপনি পারবেন?
মাহমুদার উভয় নয়ন চকচক করে উঠলো, বিস্তর হাসলেন তিনি।
- অবশ্যই! কতজন?
- সাতজন।
- খুব পারবো। কিচ্ছু চিন্তা করোনা।
- আচ্ছা,তাহলে আমি কথা বলে ফাইনাল করে দেবো।
বলে সাইকেলে চেপে বসলো দোহা। মাহমুদা স্থির তাকিয়ে থাকলেন তার দিকে। যেই মুহুর্তে দোহা প্যাডেলে পা ছোঁয়ালো, তিনি ক্ষীণ কন্ঠে বললেন,
- তোমাকে ধন্যবাদ বাবা, তুমি আমার অনেক উপকার করছো। আগামী মাস থেকে তোমার টাকাটা আমি দুইশো টাকা বাড়িয়ে দেবো।
একগাল হাসলো দোহা, মাথা দুলিয়ে বললো,
- আমার চলে যায় আন্টি, আপনি চিন্তা করবেন না। টাকাটা বরং আংকেলের নতুন হুইলচেয়ার কিনতে ব্যবহার করবেন।
মাহমুদা নিজের বুকের ভেতর প্রগাঢ় এক অনুভূতি টের পেলেন। কন্ঠ রোধ হয়ে আসায় আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু দোহাকে সাইকেল নিয়ে চলে যেতে দেখলেন।
বেশ কয়েকটা মেসে খাবার পৌঁছে দিতে দিতে দোহার রাত দশটা বেজে গেলো। শেষ টিফিন পৌঁছে সে সেন্ট পিটার্সবার্গের ডরমের উদ্দেশ্যে এগোলো। তবে শরীর বেশিক্ষণ সায় দিলোনা। আজকে একটা অসহ্যকর দিন গিয়েছে। প্রথমে ওই মোটা মেয়েটার সাথে ডেট, তারপর আবার রাশেদের সঙ্গে ঝামেলা, রাতে অনিকদের সাথে ওদের আস্তানায় হামলা, এখন আবার ডেলিভারি। শরীর টনটন করছে। রাশেদের বিকালের আ*ঘাতগুলো এখনো জ্বালাচ্ছে। আর পারলোনা দোহা, সাইকেলটা থামিয়ে পাশের ছোট্ট পার্কে ঢুকলো। বিশাল এক কদম গাছের নিচের বেঞ্চিতে বসে পড়লো। হেলান দিয়ে দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলো। আশপাশ নির্জন। শহরবাসী ব্যাস্ত রাতের খাবারে, পারিবারিক সময়ে কিংবা টিভির পর্দায়। দোহা বসে রইলো, স্থির তাকিয়ে থাকলো সুদূর দিগন্তে। নিজের ব্যাগ টেনে পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে গিললো খানিকটা। সামান্য মাথায় ঢেলে ঠান্ডা করলো তপ্ত মস্তিষ্ককে। তারপর পুনরায় এলিয়ে পরে পকেট থেকে ছোট স্মার্টফোনটা বের করলো। লক খুলতেই সর্বপ্রথম একটা এস এম এস ভেসে উঠলো। সাড়ে সাতটা নাগাদ পাঠানো হয়েছে।
“ ওষুধ লাগিয়েছ দোহা? ব্যথা কমেছে? খারাপ লাগছে খুব বেশি? আমার কাছে ব্যথানাশক স্প্রে আছে, লাগলে বলো। ”
আটটা বাজে আরেকটা এস এম এস,
“ ব্যস্ত? ঠিক আছো কিনা ছোট্ট করে জানিও। ”
বিরক্তিতে দোহার ভ্রুজোড়া কুঁচকে এলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে সে দ্রুত একটা ফিরতি মেসেজ পাঠালো,
“ এভরিথিং ফাইন প্রিন্সেস, ডোন্ট ওয়ারি। গুডনাইট। ”
- অসহ্যকর!
বিড়বিড় করে গুঙিয়ে উঠলো সে। মাথায় হাত ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমারা তাকে কি মনে করে? নিজস্ব সম্পত্তি? করুক গে! আর তো কয়েকটা দিন মাত্র। এরপরই.....
ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই দোহার চেতনা ফিরলো যেন। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার সকল বিরক্তি এবং ক্লান্তি দূরীভূত হয়ে গেলো। রিসিভ করে কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে সে বললো,
- কেমন আছো আপু?
ওপাশ থেকে নমনীয় এক মেয়েলী কন্ঠ ভেসে এলো,
- এইতো, আল্লাহ রেখেছেন ভালোই। তুই কেমন আছিস? পড়াশোনা কেমন চলছে? বেশি দুষ্টামি করছিস নাকি আবার?
- কি যে বলো না আপু! আমার দিনকাল ভালোই যাচ্ছে।
পায়ের উপর পা তুলে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জবাব দিলো দোহা। ওপাশ থেকে খিলখিলে হাসি শব্দ শোনা গেলো।
- তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। টেস্টের জন্য মন দিয়ে পড়। আর কিচ্ছু চিন্তা করিস না। আমি তোর অ্যাকাউন্টে আগামীকাল টাকা জমা করে দেবো। নতুন কয়েকটা কাপড় কিনিস। আর....
- আপু। দরকার নেই।
দোহার নরম কন্ঠে ওপাশে নীরবতা নেমে এলো। তারপর আবার প্রশ্ন,
- মানে? কেনো?
- ওই মানে.... ইয়ে... গত টেস্টে ভালো করেছি তো, আর অ্যাথলেট ক্যাটাগরি বিবেচনায় স্কলারশিপ টেন পার্সেন্ট বেড়েছে। অত টাকার দরকার হবেনা। আমার কাছে আছে।
আবারও নীরবতা। দোহা রীতিমত নিঃশ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করলো।
- ঠিক আছে।
ছোট শব্দ দুটি শুনেছে নিশ্চিত হতেই দোহা নিঃশব্দে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
- ভালো পড়াশোনা করছিস তাহলে। গুড, কিপ ইট আপ।
- হুম, আর আপু, আগামী মাস থেকে তোমার অতগুলো টিউশনি করতে হবেনা ঠিক আছে? একটা দুটো বাদ দিয়ে দাও। ইউ নো, স্কলারশিপ বেড়েছে? আমার প্রয়োজন হবেনা, তুমি তোমার পড়াশোনায় মনোযোগ দাও প্লীজ।
- হাহা.... খুব বড় হয়ে গিয়েছিস দেখছি। কবে যে রমজানের বন্ধটা পড়বে! তোকে দেখতে বড্ড ইচ্ছা হচ্ছে ভাইয়া।
হাসলো দোহা, বুকের ভেতর উষ্ণতা অনুভব করলো।
- খুব জলদিই আপু, আর কিছুদিন মাত্র।
- ভালো থাকিস, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করিস, নিজের যত্ন নিস কেমন?
- হ্যাঁ, তুমিও।
- রাখছি তাহলে।
ফোন কেটে যেতেই দোহা কিছুক্ষণ একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপরই বেঞ্চে হেলান দিয়ে পুনরায় দিগন্তে তাকালো, যেখানে জ্বলজ্বল করছে অর্ধচন্দ্র। ফ্যাক্টরির যে কাজটা এতদিন নেয়নি, সেটা নিতে হবে আগামী মাস থেকে। মনে মনে ঠিক করলো, আজ ডরমে ফিরে যাওয়ার পথেই কথা বলে নেবে।
—চলবে—