#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৬
পর্ব ৬: [ কাপুরুষ- এক কি দুই? ]
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
ডেস্কের সামনে ধপাস করে শব্দ হওয়ায় ধড়ফড় করে উঠে বসলো দোহা। নিদ্রাচ্ছন্ন দৃষ্টি মেলে চোখ পিটপিট করে তাকালো। ঘুমে ধরা মস্তিষ্ক পরিস্থিতি বুঝতে কিছুটা সময় নিলো। দন্ডায়মান ইংরেজী বিষয়ের ম্যাম, চশমার চিকন ফ্রেমের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বাম হাতে বুকে ঠেকানো গ্রামার বই, অপর হাতে ধরা কাঠের স্কেলটি দোহার ডেস্কের উপর, ওটাই শব্দ করেছে বুঝতে সমস্যা হলোনা।
- হোয়াট ইয দিস বিহেভিয়ার দোহা? হোয়াই আর ইউ স্লিপিং অন ক্লাসরুম?
একটি ছোট নিঃশ্বাস সংগোপনে ছেড়ে দোহা শিরদাঁড়া টানটান করে বসলো, ম্যামের কথার জবাব দিলোনা।
- আমি ইদানিং খেয়াল করেছি, তুমি ভীষণ বাড় বেড়েছ দোহা। আমার লেকচার কি এতটাই বোরিং মনে হয় তোমার কাছে যে ডেস্কের উপর ঘুমাচ্ছো?
- তা একটু বোরিং তো লাগেই। আই অ্যাম স্লিপিং ইন দ্যা ক্লাসরুম, নট অন ক্লাসরুম, এজন্যই বোরিং লাগে।
দোহার জবাবে পুরো ক্লাসজুড়ে হাসির কলরোল পড়ে গেলো। অনিক তো ডেস্কের উপর চাপড় দিয়ে সাধুবাদ জানালো বন্ধুকে, তার কার্যক্রম অনুসরণ করলো অনেকেই। ম্যাম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরক্ষণেই হুংকার দিয়ে উঠলেন,
- হোয়াট রাবিশ! কথার মাঝে কিছু ছোটখাটো ভুল হতেই পারে। গেট আউট রাইট নাউ, দোহা! আউট অব মাই ক্লাস!
স্বগর্ব চিত্তেই উঠে দাঁড়ালো দোহা। নিজের ইউনিফর্ম ঝেড়ে চুলে আঙুল বুলিয়ে ক্লাসের দরজার দিকে এগোলো। তার হাঁটাচলার ভঙ্গিতে মোটেই মনে হলোনা সে শাস্তি পেয়েছে, বরং যেন ফ্যাশন শো এর মডেলিংয়ে নেমেছে এমনটাই পরিদর্শন হলো। সকলে মিটিমিটি হাসতে হাসতে তাকে লক্ষ্য করলো, ম্যামকে আরো রাগিয়ে দেয়ার ইচ্ছা নেই কারোরই। দোহা তৃতীয় সারি পার করে আসতেই অতর্কিতে নিজের উপর কারো গভীর দৃষ্টিপাত অনুভব করে সামান্য থেমে মাথা কাত করে তাকালো। তৃতীয় সারির মাঝ বরাবর ডেস্কে বসে আছে আমারা। ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে আছে, চোখজুড়ে কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্নতা। দোহা তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে সামান্য হাসলো, যেন অভয় দিলো। তারপরই ক্লাস থেকে সোজা বেরিয়ে গেলো।
বাইরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দোহা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের চোখ কচলে নিয়ে ছোট একটা হাই তুললো। গতকাল রাতে সে হাতে গোণা দুইটি ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। বিশেষ কাজে প্রায় সারাটা রাতই কেটেছে বাইরে। ডরমের দারোয়ানকে সে এজন্য হাত করে রেখেছে, দেরী হলে হাতে একশো দুইশো করে টাকা গুঁজে দেয়। দারোয়ানও তার হাবভাব জানে, তাই হয়তো চাতক পাখির মতন অপেক্ষায় থাকে কোন রাতে দোহা দেরিতে ফিরবে! ব্যাপার না, আজকের রাতেও কাহিনী কিছুটা তেমনি হবে। দেয়ালে হেলান দিয়ে বুকে দুবাহু ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে দোহা আরেক দফায় চোখ বুঁজে নিচ্ছিল, তখনি মেয়েলী কন্ঠস্বরটি তার চিত্তে তরঙ্গ খেলিয়ে দিলো।
- দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘোড়াতে ঘুমায় শুনেছিলাম, আজ দেখছি মানুষও পারে।
দোহার চোখ খুলে গেলো, ঝট করে ফিরে তাকালো সে। করিডোরের অপর প্রান্তে দাঁড়ানো মেয়েটি। ছিপছিপে লাস্যময়ী গঠন, কোমরটা বেশ চাপা, চেহারার গাঁথুনিও অসাধারণ। সিল্কি চুলগুলো পিঠ ভাসিয়ে নেমে গিয়েছে একেবারে কোমরের নিচ অবধি। নেভী ব্লু ইউনিফর্ম কোট এবং ফ্রকে দারুণ দেখাচ্ছে তাকে। রাহা সওদাগর, স্কুলের ট্রাস্টি সওদাগর পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ে। নিজের সৌন্দর্য্য এবং কো কারিকুলাম অংশগ্রহণের জন্য কলেজবিখ্যাত।
দোহা স্থির তাকিয়ে থাকলো তার অবয়বে। রাহা ধীরপায়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। ওদিকটায় সেকশন তেরেসার ক্লাস, রাহাও যে কোনো কারণে শাস্তি পেয়েছে তা স্পষ্ট। সে অবশ্য শাস্তি নাও হতে পারে, তার মনে চাইলে সে হুটহাট ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে পারে নানান বাহানায়। দোহার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো রাহা, তারপর ফিসফিস কন্ঠে বললো,
- কাল রাতে একটু বেশিই পরিশ্রম হয়ে গিয়েছে, তাইনা?
স্তব্ধ হয়ে থাকলো দোহা কিছুক্ষণ, তারপর বাঁকা হাসলো,
- পরিশ্রমের ফল সুমধুর।
তার হাসি লক্ষ্য করে পাল্টা হাসলো রাহা, মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো,
- সামটাইম ’স আই রিয়েলী লাইক ইওর অ্যাটিচিউড ম্যান!
- অনলি অ্যাটিচিউড? নট মি?
এবার খিলখিল শব্দ তুলে হেসে উঠলো রাহা, তবে তা পরিমিত, যেন ভেতরের ক্লাস থেকে শোনা না যায়। দোহার পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকালো সে, লম্বা চুলের গোছা ছড়িয়ে পড়লো কপালের একপাশে। দোহা নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো।
- কিভাবে করবো? তুমি তো অন্য কারো।
অজান্তেই নিজের এক হাতে অপর বাহু চেপে ধরলো দোহা। রাহা তার অভিব্যক্তির পরিবর্তন খেয়াল করলো অতি মনোযোগ দিয়ে। তারপর নিজের হাসির পাল্লা বিস্তৃত করে শুধালো,
- বাট, সিরিয়াসলি? তোমার পিছনে ঘোরার মেয়ের অভাব নেই। সবকিছু ফেলে ওই ঢোলটাকে পাকড়াও করলে শেষমেষ? এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলে নাকি আমার রিজেকশনে? ট্রায়িং টু মেইক মি জেলাস?
- জেলাস? আর ইউ?
দোহার প্রশ্নের বিপরীতে রাহা নীরবতা ধারণ করলো। তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে ছেলেটার বিস্তৃত অধরমাঝে। দোহাও তাকিয়ে থাকলো তার নয়নজুড়ে, নিষ্পলক।
- রাহা?
ডাকটি ভেসে আসতেই মন্ত্রতুল্য মুহূর্তটির ইতি ঘটলো। ঝট করে ফিরে তাকালো রাহা, তার ক্লাস থেকে মুখ বাড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। দোহা এবং তাকে এক নজর দেখে সে আবার বললো,
- স্যার তোকে ক্লাসে আসতে বলেছে।
ঘুরলো রাহা, নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো নিজের ক্লাসের দিকে। তবে ভেতরে ঢুকবার আগে একটিবার ফিরে তাকালো পিছনে, অব্যক্ত নয়নে দেখলো দোহাকে, পরক্ষণেই আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার।
。
。
。
টিফিনের সময়।
আজ নিজে কিছু বানিয়ে নেয়ার সময় পায়নি বলে ক্যান্টিনে এসেছে আমারা। দুটো সমুচা এবং চকলেট মিল্কের প্যাকেট কিনে একদম এক কোণায় একাকী টেবিলে বসলো। সমুচায় এক কামড় দিতে না দিতেই ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে পাশের টেবিল থেকে একজন বলে উঠলো,
- কিরে মোটু? কম করে খা একটু, ফেটে যাবি তো।
ফিরেও তাকালোনা আমারা, চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের খাবারে মনোযোগ দিলো। ভীষণ হাস্য কলরোলের শব্দ উঠলো চারপাশ জুড়ে। যথারীতি নিঃশব্দ থেকে আমারা যেই না মিল্কশেকে চুমুক দিতে যাবে, অমনি তার হাত থেকে সেটা কেড়ে নিলো কেউ। ঝট করে ফিরে তাকিয়ে পাশের টেবিলের দুটো ছেলেকে দেখতে পেলো সে। বিষাক্ত একপ্রকার হাসি মেখে ভ্রু নাচাতে নাচাতে তাকিয়ে আছে, যেন ভীষণ বিনোদন পাচ্ছে।
- এটা তোর খেতে হবেনা মোটু। ডায়েট কর একটু। নাহলে তোকে কেউ বিয়ে করবেনা, হিহি।
আমারার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, গালে থাকা খাবারটুকু সে জোর করে চিবিয়ে গিলে নিলো। অপর একজন দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বললো,
- দোহাকে পটিয়েছিস ভেবে কুল সাজার কিছু নেই বুঝেছিস? ওই শালা কেমন সেটা গোটা কলেজের সবাই জানে। মেয়ে ওর হাতের টিস্যু, বুঝেছিস? পাঁচ মিনিট ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তখন তোকে কে বাঁচাবে বেবি?
- আমার মনে হয়না নিজেকে বাঁচানোর জন্য ওর কোনো ছেলের প্রয়োজন আছে।
কঠোর একটি মেয়েলী কন্ঠ শোনা গেলো, তারপরই জোরালো ধাক্কায় মেঝেতে চিৎপটাং হয়ে পড়লো ছেলেটা। হাতের মিল্কশেকের প্যাকেট উড়ে গেলো, তা চাপা বর্ণের উপশিরাপূর্ণ একটি হাত পাকড়াও করলো। ক্যান্টিনে উপস্থিত সবাই ফিরে তাকালো। স্তব্ধ হয়ে লক্ষ্য করলো দৃশ্যটি। ইউনিফর্ম এবং ছেলেদের মতন শার্ট প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে জারা। গ্রীবায় ঝুলছে হেডফোন, কাঁধসমান চুলগুলো ছড়িয়ে আছে মুখের দুপাশে। জ্বলজ্বলে দুটি শীতল রত্ন চেয়ে আছে।
আমারার স্তব্ধ অবয়ব উপেক্ষা করে মিল্কশেক তার টেবিলে ফিরিয়ে রেখে জারা দুহাত পকেটে গুঁজে এগিয়ে গেলো। ছেলেটা এখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি, অপর ছেলে বিপদ বোঝামাত্রই শটকে পড়েছে। সামান্য একটু উবু হলো জারা, মুখে আনমনে চিবুতে থাকা চুইংগাম ফুলিয়ে বিড়বিড় করলো,
- তোদের দোহাকে তোরা শোকেসে ভরে রাখ, ওটাকে পুরুষ গোনায় ধরিনা। ওটা অন্যকে কি বাঁচাবে? নিজে বেঁচেই কুল পায়না!
- শালী!
- বল.... শালা!
মুখ টিপে হেসে উঠলো অনেকে। বাকিরা মহাবিস্মিত। জারাকে এর আগে কোনোদিন কোথাও হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। সে সর্বদাই যেন নিশাচর প্রাণীর মতন একলা থাকে, নিজের দুনিয়ায়। ছেলেটা জারার অপ্রতিরোধ্য আচরণে ভীষণ বিব্রত হয়ে নিজেকে জামাকাপড় ঝেড়ে উঠলো, ক্রুব্ধ কন্ঠে বললো,
- চেহারায় নেই দুই টাকার মুরোদ, কাইল্লা কোথাকার! আবার আসে আমার সাথে লাগতে!
- তোর দুই টাকার মুরোদ তুই নিজের পিছনে ভরে রাখ, আমার লাগবেনা।
এবার কেউ মুখ টিপে হাসতে পারলোনা। ভীষণ এক গুঞ্জন উঠলো। লাল টকটকে মুখে ছেলেটা হনহন করে হেঁটে চলে গেলো। জারা বাঁকা হাসি নিয়ে তাকে চলে যেতে দেখলো। আরেক দফায় চুইংগাম ফুলিয়ে উল্টো ফিরে তাকালো আমারার দিকে। যে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। জারা এগিয়ে যেতেই আমারা ফিসফিস করলো,
- ধন্য...
- শাট আপ।
জারার কন্ঠ বেশ কঠোর শোনালো, কেঁপে উঠলো আমারা তাতে। ভ্রু কুঞ্চিত করে আক্রোশপূর্ণ স্বরে সে বললো,
- যেদিন নিজের জন্য নিজে রুখে দাঁড়াতে পারবি, সেদিন শব্দটা গ্রহণ করবো। এর আগে ওই শব্দ উচ্চারণ করার কথা ভাবলে একটা থাপ্পড়ে মাড়ির সবকটা দাঁত নাড়িয়ে দেবো।
হনহন করে হেঁটে এগিয়ে গেলো জারা, তার ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে আসা অবয়বে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো আমারা। বুকের ভেতর ব্যাখ্যাতীত এক অনুভূতি টের পাচ্ছে সে, যার বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।
━━━━━━━━━━━━━━━━━
আশফিকা চৌধুরী ঘণ্টাখানেক আগেই দেশে ফিরেছেন মালয়েশিয়া থেকে। যদিও আসার কথা ছিলো আগামীকাল, তবে কাজ দ্রুত গুছিয়ে নেয়ায় ফিরে এসেছেন। আমারাকে দেখতে যাবেন, মেয়েটা কেমন আছে সেই চিন্তায় তিনি একপ্রকার নাজেহালই বটে। চৌধুরী পরিবারের আলিশান বাংলোবাড়িতে যখন তার গাড়ি প্রবেশ করলো, তখন তিনি বহুদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার রুব্বান চাচার মুখ ভার দেখতে পেলেন। আধপাঁকা চুলদাড়িতে তার রুক্ষ অবয়ব দূর্বল দেখালো, একপ্রকার ফিসফিস করেই সালাম ঠুকলেন তিনি। আশফিকা গাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে সানগ্লাস খুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- কি হয়েছে চাচা? আপনি কি অসুস্থ?
- আমি ঠিক আছি আম্মা।
- তাহলে, আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?
রুব্বান চাচা ইতস্তত করলেন প্রচুর, শেষমেষ ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে বললেন,
- আপনি ভিতরে যান আম্মা। তাইলেই বুঝবেন। অন্য মতে, আপনি ভিতরে যাইয়েন না।
এটুকুই যথেষ্ট উপলব্ধিতে। আশফিকা হ্যান্ডব্যাগ গাড়িতে ছেড়েই দ্রুত পদক্ষেপে এগোলেন। পরনের হিলজোড়া অতীব দক্ষতায় তেমন শব্দ উৎপন্ন করলোনা। বাড়ির হলঘরে প্রবেশ করে তিনি সন্দেহজনক দুইটি জিনিস দেখলেন। একটি টেবিলে রাখা কাঁচের গ্লাস, যাতে ফ্রেশ লিপস্টিকের দাগ। অন্যটি মেঝেতে এলিয়ে থাকা চৌধুরী সাহেবের কোটখানি। একটি ঢোক গিললেন আশফিকা। দ্রুত দুইতলায় উঠে গেলেন। এগোলেন নিজেদের বেডরুমের দিকে। দরজা পেলেন চাপানোই, কেউ বন্ধ করার প্রয়োজনবোধ করেনি কিংবা উত্তেজনায় সময় হয়নি। সেটি নিঃশব্দে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই স্তব্ধ হয়ে রইলেন আশফিকা।
রাজকীয় ধাঁচের বিশাল বিছানার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন মীর চৌধুরী। কোমর অবধি অনাবৃত, অফহোয়াইট বর্ণের কভারশিট তুলে দেয়া বাকি অংশে। তার নিচে সেই খোলা বুকের উপর অতি আরামে রোদ পোহানোর ভঙ্গিতে শুয়ে আছে এক তরুণী গোছের মেয়ে। স্বল্পবসনা, তুলতুলে ত্বক ঢেকে আছে ঘন চুলের অন্তরালে। টকটকে কালো নেইলপলিশ দেয়া নখে মীরের বুকে আঁকিবুঁকি কেটে চলেছে সে। আধখোলা চোখে গভীর প্রশ্বাসে তা পর্যবেক্ষণ করছেন চৌধুরী কর্তা।
আশফিকা চৌধুরীর মধ্যে ভাঙার মতন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তাই তিনি বিরাট ফাঁপা শূন্যতা ছাড়া কিছুই টের পেলেন না। দরজার হাতল থেকে খসে পড়লো তার হাত। শীতল কন্ঠে বিড়বিড় করলেন,
- মীর.....
চকিত নয়নে ফিরে দেখলেন মীর চৌধুরী। বুকে আপত্তিকর অবস্থায় থাকা এক তরুণী, অপরদিকে দরজায় দাঁড়ানো স্ত্রী। দৃশ্যটি তাকে আতঙ্কিত নয়, বরং বিনোদিত করলো। হাসলেন মৃদু। তরুণী ভয় পেয়ে সরে যেতে চাইলেও তিনি বাহুর মাঝে আগলে নিয়ে তার মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,
- ইউ আর ব্যাক হানি! আর্লি!
একটি ঢোক গিললেন আশফিকা। দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলেন নিজেকে শান্ত রাখার উদ্দেশ্যে।
- তোমাকে বারণ করেছিলাম ওকে বাড়িতে আনতে।
তরুণী খানিকটা জোরপূর্বকই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মেঝেতে পরে থাকা নিজের শার্টটা দ্রুত গায়ে জড়াতে শুরু করলো। মীর সেদিকে একবার তাকিয়ে খিলখিল করে হাসলেন। বিছানায় উঠে বসে নিজের মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে বিড়বিড় করলো,
- দিস হাউযে ইয মাইন। হোয়াট টু ডু, অ্যান্ড হোয়াট নট টু ডু..... সেটা শিক্ষা দেয়ার শিক্ষক না তুমি। তুমি আমার স্ত্রী, আন্ডারস্ট্যান্ড?
এবার আর সহ্য করা সম্ভব হলোনা। পাশের কর্নারে রাখা একটি দামী কাঁচের ফুলদানি তুলে মেঝেতে আছড়ে ফেললেন আশফিকা। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো তা চারিদিকে। তরুণী তাতে ভীষণ আতঙ্কিত হলেও মীরের লিপস্টিক লেপ্টানো ঠোঁট থেকে হাসি মুছলোনা।
- তোমার জন্য মীর! তোমার জন্য আমি আমাদের মেয়েটাকে বোর্ডিং কলেজে পাঠিয়েছি! তুমি ওর বাবা নামের কলংক! তুমি একজন স্বামী নামের কলংক! দায়িত্বজ্ঞানহীন - চরিত্রহীন নাপুরুষ!
তিরতির করে কাঁপতে থাকলেন আশফিকা। ভাঙা কাঁচের টুকরো দেখেই তার মনে শত শত অশোভন চিন্তা আসতে আরম্ভ করেছে। একটা বাগড়ে ধরে যদি এক্ষুণি ঢুকিয়ে দেয়া যায় মীর কিংবা ওই মেয়ের বু*কে? নিজের মাথা চেপে ধরলেন তিনি, চোখ ভরে এলো অশ্রুতে। তার প্রতি বেমালুম উদাসীন মীর বিছানা ছেড়েছেন ততক্ষণে, স্ট্যান্ড থেকে বাথরোব তুলে গায়ে জড়িয়ে তিনি বিড়বিড় করলেন,
- ধারাবাহিক নাটক চলছে? এটা থিয়েটার নয়, বাড়ি।
ঝট করে রক্তিম চোখ তুলে তাকালেন আশফিকা, হাত নিশপিশ করছে তার, অন্তর চিৎকার করে বলছে একটা টুকরো জলদি তুলে নিয়ে.....
কিন্তু তিনি নিলেন না।
- অর্থবিত্ত থাকলেই যে কেউ পুরুষ হয়না, তার সবথেকে বড় অথর্ব প্রমাণ তুমি মীর!
তক্ষুণি উঠে দাঁড়ালেন আশফিকা, কোনোপ্রকার তোয়াক্কা না করে উল্টো ঘুরে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেলেন নিজের অশ্রু আড়াল করতে। মীর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলেন, পরক্ষণে নিজের কপালে আঙুল ছুঁয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
- ফা***!
তরুণী সেক্রেটারী তার কাচুমাচু ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
- এখন কি হবে মীর? আমি বারণ করেছিলাম যে বাড়িতে এসে.... তুমিই বলেছিলে ম্যাম বাড়িতে নেই তাই আমিও আর...
- হুশ।
আঙুল তুলে সাবধান করলেন যেন মীর, মেয়েটি চুপ করে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। এক মুহুর্ত ভেবে পরে স্ত্রীর চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে তিনি বিড়বিড় করলেন,
- কিছুটা সময় যাক, আই উইল ম্যানেজ হার, অ্যায অলওয়েয।
সামান্য হেসে টিস্যুবক্স থেকে টিস্যু নিয়ে মুখ ঠোঁট মুছে নিলেন মীর চৌধুরী।
。
。
。
বিকালের সময় ফুটবল গ্রাউন্ড একেবারে জমজমাট হয়ে উঠেছে। টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে কলেজের দল ব্যস্ত প্রশিক্ষণে। বাকিরা খেলাধুলা করছে আশেপাশে। কেউবা গল্পে মেতেছে। অনেকে আবার স্মার্টফোন এবং ভিডিওগেম নিয়ে বসেছে। পরিবেশটা মুখরিত ভীষণ। তবে এত প্রফুল্লতার মাঝেও আমারার অন্তরে শান্তি নেই। একপাশে কৃত্রিমভাবে তৈরী ছোট লেকের পাড়ে সে পায়চারি করে যাচ্ছে অনবরত। অস্থির লাগছে নিজেকে ভীষণ। দুই বাহুতে শরীর জড়িয়ে সে দাঁড়ালো একপাশে। লেকের পানিতে জুড়িয়ে শীতল বাতাস বইছে, শরীরে লাগছে প্রশান্তিদায়ক হয়ে। স্থির তাকিয়ে রইলো আমারা, এতটাই মগ্ন যে নিজের ভারী কোমরজুড়ে জড়িয়ে যাওয়া বাহুর উপস্থিতি সে টের পেলো একপ্রকার হঠাৎ করেই।
- কি এমন ভাবনায় মগ্ন আমার নোলক? হুম?
কানের কাছে তপ্ত নিঃশ্বাস এবং মোহিত স্বর টের পেয়ে শিউরে উঠলো আমারা। তবে নিজেকে সরিয়ে নিলোনা। চোখ নামিয়ে দেখলো কোমরজুড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়া বাহু, কব্জিতে ঝুলছে সিলভার ব্রেসলেট।
- সবাই দেখছে....
আমারা ক্ষীণ কন্ঠে বিড়বিড় করতেই বাঁধন আরো জোরালো,
- দেখুক, আমার গার্লফ্রেন্ডকে জড়িয়ে ধরেছি, তাতে কার বাপের কি আসে যায়?
- আম... আমার লজ্জা লাগছে।
আমারাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের দিকে ফেরালো দোহা।চিবুক ছুঁয়ে বললো,
- ওহ প্রিন্সেস, তোমায় নিয়ে কোথায় যাই আমি? এত কিউট আর ইনোসেন্ট কেনো তুমি?
প্রতিবারের মতন লজ্জায় ফোলা ফোলা গালদুটো টুকটুক করলেও আমারা জবাব দিলোনা। বরং দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো ভিন্নদিকে। দোহা তার অভিব্যক্তির অস্বাভাবিকতা টের পেলো। তারপর গাল স্পর্শ করে কাছে টেনে নিয়ে গভীর এক দৃষ্টিতে চেয়ে শুধালো,
- কি হয়েছে?
আমারা দ্রুত দৃষ্টি হটিয়ে নিলো।
- ক... কই? কি হয়েছে? কিছু...
- নোলক।
স্থির কন্ঠ দোহার, খানিকটা শীতলও। তাতে আমারা দৃষ্টি ফিরিয়ে মুখ নত করে বললো,
- মামণির ফোন বন্ধ পাচ্ছি। মেসেজেরও রিপ্লাই নেই। অ্যাসিস্ট্যান্টও কিছু জানেনা।
দোহা মাথা দুলিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বললো,
- হুম, বুঝেছি। হয়ত কোনো কাজে ব্যস্ত। সময় হলে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
- না দোহা, তুমি বুঝতে পারছোনা। আমার কেমন যেন লাগছে। আমি... আমি তোমাকে বোঝাতে পারবোনা। অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে।
চিন্তায় ভ্রুজোড়া কুঁচকে নিয়েছে আমারা, ভারী শরীরে সামান্য চিন্তার কম্পন। দোহা খেয়াল করলো, তারপর বললো,
- বাড়িতে যাবে?
চট করে মাথা তুলে তাকালো আমারা, চকচকে দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলো,
- বাড়িতে? এখন? কিভাবে?
- আমি নিয়ে যাবো।
বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো কিশোরী। দোহা দুহাতে আলতোভাবে তার মুখ ধরে আদুরে গলায় জানালো,
- তোমাকে দুশ্চিন্তায় দেখতে ভালো লাগেনা আমার একদমই। তার জন্য যা করার হয় আমি করবো।
অজানা কারণে আমারার চোখ খানিক ছলছলে হলো, পাতলা পাতলা ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটিয়ে সে বললো,
- কিন্তু এখন... এই সময়ে...
- আমি নিয়ে যাবো বললাম তো। বিশ্বাস করো তো আমায়?
দোহা নিজের ডান হাতটি বাড়িয়ে দিতেই কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই আমারা সেটি গ্রহণ করে নিলো। সম্মতিসূচক মাথা দোলালো। দোহা তার হাতটি শক্তভাবে মুঠোয় আগলে নিয়ে হাসলো,
- চলো তাহলে।
দুইজনই দ্রুত মাঠ পেরিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গের পিছনের গেটে পৌঁছলো। বাইসাইকেলে চেপে বসলো দোহা, পিছনে উঠতে সাহায্য করলো আমারাকে। দ্রুতই তাদের বাহনটি রাস্তায় নেমে এলো, ছুটে চললো হাওয়া কেটে। দোহা যত গতি বাড়ালো, আমারার বাহু তার শরীরে তত আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে গেলো। নিজের পিঠে মেয়েটির উন্মত্ত হৃদস্পন্দনের অনুভব স্পষ্ট টের পেলো দোহা। দাঁতে দাঁত চেপে সে হ্যান্ডেল ধরে গতি আরো বাড়ালো।
—চলবে—