ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

৭ম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৭

পর্ব ৭: [ সত্যের ঝলক ]

━━━━━━━━━━━━━━

চৌধুরীদের বাংলো বাড়ির সামনে এসে থামলো দোহার সাইকেল। আমারা ঝটপট লাফিয়ে নেমে পড়লো। সে যেই মুহুর্তে ছুট দিতে যাবে ওই সময়েই দোহা তার একটি হাত চেপে জানালো,

- আমি এখানেই আছি, তুমি যাও।

পিছন ফিরে তাকালো আমারা, দৃষ্টিমাঝে খানিক বিহ্বলতা ফুটলো তার। কি যেন ভাবলো ক্ষণকাল। তারপর দোহার হাতটি সযত্নে নিজের মুঠোয় দিয়ে কোনো কথা ছাড়াই নিজের সঙ্গে নিয়ে চললো ভেতরে। দোহা ভীষণ বিস্মিত হলো, সামান্য কাঁপলো অন্তর তার। ফিসফিস কন্ঠে প্রশ্ন করলো সে,

- তোমার বাবা মা আমায় দেখে ফেললে....

- দেখলে দেখবে। সত্যটাই দেখবে।

- আমারা....

- তুমি আমার সত্য দোহা, এতে কোনো খাঁদ নেই।

আমারার হাতের মুঠোয় দোহার আঙুলসমূহ নড়ে উঠলো। বুকের ভেতর এক উত্তাল দমকা হাওয়া যেন ভাংচুর করে দিয়ে গেলো। সমস্ত অস্তিত্ব একযোগে আন্দোলিত হলো এক নব্য অনুভবে। তবে সেই অনুভব জোরালোভাবে দমন করলো দোহা। তার নয়নপটে ভেসে উঠলো বেশ কিছুদিন আগের এক তরতাজা

স্মৃতি—

━━━━━━━

চারিপাশে তামাকের গন্ধ। সিগারেটের ধোঁয়ায় গুমোট হাওয়া। ভারী হয়ে আছে অ্যালকোহলের মাদকীয় আস্ফালনে। উপরে খোলা আকাশ, নিচে পরিত্যাক্ত বিল্ডিংটির ছাদের আড্ডা। তবে আজ কেনো যেন স্থানটিতে বরাবরের মতন কোনো প্রাণ নেই। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তাসগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে। ভিডিওগেম সেট গড়াগড়ি খাচ্ছে। জিই - শু আর রাজীব চুপচাপ বসে আছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে ছাদের এক কোণায় ট্রাউজারের পকেটে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা অনিকের দিকে। বিস্তৃত নয়ন মেলে ছেলেটি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট।

- গাইয....

উৎফুল্ল কণ্ঠটি সবার মনোযোগ কেড়ে নিলেও একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলো অনিক। বাকিরা ফিরে তাকিয়ে দেখলো ছাদে উঠে আসতে থাকা দোহাকে। কাঁধে ঝোলানো গিটার, কালো ব্যাগে আবৃত। পা চালিয়ে এসে সবার মাঝখানে ধপাস করে বসে পড়লো সে। দুহাত ঘষে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললো,

- তাহলে কাহিনী কোথা থেকে শুরু করি বল? শোন তবে, আমি যখন রাস্তা দিয়ে আসছিলাম, তখন দেখলাম ওই কালোজিরাটা.....

বলতে বলতেও থেমে গেলো দোহা। অনিকের উদাসী হাবভাব তার দৃষ্টি এড়ায়নি। মুখ বন্ধ করে বাকিদের দিকে সে তাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো, জিই - শু মৃদু কন্ঠে শুধালো,

- নিউজ দেখিসনি?

- কিসের নিউজ?

রাজীব নিঃশব্দে নিজের ফোনটা বের করে কিছু একটা করলো। তারপর দোহার দিকে এগিয়ে দিলো। কোনো একটা নিউজ আর্টিকেল, যাতে উল্লিখিত,

“ রহমান ইন্ডাস্ট্রিজ লুজেয ইটস মিলিয়ন ডলার টেন্ডার টু চৌধুরী কর্পোরেশন’স ”

চোখ তুলে একনজর অনিকের অবয়ব দেখলো দোহা, চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। দৃষ্টি আবার আর্টিকেলের পর্দায় ফেললো সে,

“ বিজনেস গ্রুপের তথ্যমতে এর বিশালাকৃতির টেন্ডার হারানোর কারণ কর্ণধার অভিক রহমান। মাদক কারবারি এবং চোরাবাজারি স্ক্যান্ডালে জড়ানো নামকে দুষছেন অনেকে। এই সুযোগে চৌধুরী গ্রুপের নিজের ক্ষমতার বৃদ্ধিকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহসী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অভিক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহের সত্যতা না পাওয়া সত্ত্বেও ভোক্তাদের চোখে কোম্পানির নেতিবাচক দিকটি ফুটে উঠেছে ভীষণভাবে। যার কারণে......”

- বুলশিট!

হিসিয়ে উঠলো দোহা। ফোনটা আছাড় দিতে গিয়েও দিলোনা রাজীবের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে। যন্ত্রটা তার কোলে ছুঁড়ে দিয়ে দোহা উচ্চস্বরে বললো,

- আমরা সবাই জানি আংকেল কেমন মানুষ। তিনি এমন করবেন না, আই অ্যাম ড্যাম শিওর।

- রাইট। আমারও মনে হয় তিলকে তাল করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন রহমান গ্রুপের উপর নেতিবাচক প্রভাব পরে।

বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা দোলালো জিই - শু। রাজীব নিজের ফোন পকেটে ভরতে ভরতে জানালো,

- শেয়ার মার্কেট হারাচ্ছে রহমান গ্রুপ, ওইদিকে হুহু করে বাড়ছে চৌধুরী গ্রুপের মার্কেট। অতীব সন্দেহজনক।

- মীর চৌধুরী!

অনিকের মুখে সর্বপ্রথম এই নামটি শুনে সবাই মুখ তুলে তাকালো। ফিরে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা, মুখজুড়ে ভীষণ এক আক্রোশ। দাঁতে দাঁত ঘষে সে জানালো,

- দ্যাট বাস্টার্ড ফ্রেমড মাই ড্যাড ফর বিজনেস গেইন!

থমথমে হলো সবার চেহারা। প্রিয় বন্ধুর ক্রোধ তারা নিজেদের শরীরমাঝেও টের পাচ্ছে দারুণভাবে। অনিক নিজের মাথা চেপে ধরে এক গর্জন তুললো, আহত সিংহের ন্যায়,

- আহ্হঃ! ইচ্ছা হচ্ছে ওই চৌধুরীবাড়িতে গিয়ে ওটার ঘাড় ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রাস্তায় নিয়ে ফেলি। জানোয়ার একটা!

- চিন্তা করিস না অনিক। আমাদেরও দিন আসবে। হতাশ হলে চলবে না। শান্ত হ।

- পারছিনা শান্ত হতে! তোদের সাথে হলে তোরা বুঝতি কেমন লাগে!

জিই - শুর কথার উত্তরে কঠোর গলায় বললো অনিক। তারপর ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে দুই হাতে হাঁটু আঁকড়ে ধরলো। মুঠো হয়ে উঠলো তার হাত, চেহারা ধারণ করলো রক্তিম বর্ণ।

- না না না, আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। অসম্ভব। ড্যাড কিছু করতে পারছেনা ইমেজের খাতিরে, কিন্তু আমার তো হাত বাঁধা নেই। কিছু আমাকে করতেই হবে। নাহলে এই অন্তর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হতেই থাকবে।

- কিন্তু কি করবি? আমরা তো ছোট মানুষ। এসব তো বড়দের বিষয়। আমাদের মাঝে এমন কে আছে যে....

বলতে বলতে থেমে গেলো রাজীব। তারপরই নড়েচড়ে বসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে সে চেঁচিয়ে উঠলো,

- গাইয! আইডিয়া!

সবাই তার দিকে উৎসাহী ভঙ্গিতে তাকাতেই শয়তানি ভঙ্গিতে হেসে দুহাত ঘষে ঘষে সে বিড়বিড় করলো,

- টার্গেট লকড, আমারা মীর চৌধুরী, আমাদের কুখ্যাত ঢোলকুমারী!

চকচক করে উঠলো অনিকের নয়নজোড়া, যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গিয়েছে হঠাৎ করেই। রাজীবের পিঠ চাপড়ে শাবাশি দিলো সে।

- ব্রিলিয়ান্ট। চোখের সামনেই হৃষ্টপুষ্ট একটা চৌধুরী গাভী ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভুলেই গিয়েছিলাম চিন্তায় চিন্তায়।

- এক মিনিট এক মিনিট। আমি এটা বুঝতে পারছিনা ওই মেয়েটার সাথে তোরা কি করে কি হাসিল করবি?

জিই - শু প্রশ্ন করতেই অনিক ঘুরে তাকালো, চেহারায় গভীর শীতলতা ফুটিয়ে জানালো,

- আ ’ম গনা মেইক হার সাফার! এত পরিমাণে যে ওর বাবা - মা অবধি সেই যন্ত্রণায় মাথা খুঁটে ম*রবে। ওই মীর চৌধুরী মুক্তি চাইবে, নিজের, নিজের মেয়ের। কিন্তু পাবেনা। যন্ত্রণা এতটাই তীব্র হবে যে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেঁথে যাবে তার অন্তর অবধি। অপরের ঘরে আগুন লাগানোর শোধ আমি তার ঘরে আগুন লাগিয়ে যদি না তুলেছি তাহলে আমার নাম অনিক রহমান নয়!

স্থির তাকিয়ে রইলো সকলে অনিকের মুখের দিকে। তার আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব, টলানোর সাধ্য কিসের?

- কিন্তু, কাজটা হবে কিভাবে? উই কান্ট ফিজিকালি হার্ম হার, রাইট?

রাজীব জিজ্ঞেস করতেই এক দফা হাসলো অনিক, বিড়বিড় করলো,

- মনের কষ্ট বড় কষ্ট, এর উপরে কোনো যন্ত্রণা হয়না।

বলেই হুট করে দোহার দিকে তাকালো অনিক। এতক্ষণ যাবৎ একদম চুপ করে সকলের বক্তব্য শুনেছে দোহা, কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অনিকের দৃষ্টি তাকে বিচলিত করে তুললো। বন্ধুর চোখে লিখা অব্যক্ত ভাষা বুঝতে তার একটুও সময় লাগলো না।

- নো ওয়ে!

আঁতকে উঠলো দোহা। অনিক স্থির ভঙ্গিতে বললো,

- দোহা, আমাদের সকলের মধ্যে সবথেকে বড় প্লেয়ার আর হার্টব্রেকার তুই।

- একদম ঠিক কথা!

জিই - শু এবং রাজীব মাথা দুলিয়ে সায় জানালো তৎক্ষণাৎ। দোহা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,

- কাম অন গাইয। ওই মেয়েটাকে দেখলেই আমার কেমন ইরিটেটেড ফিল হয়। আমি ওর সঙ্গে, কিভাবে কি? হোয়াট অ্যাবাউট মাই রেপুটেশন?

- তুই পারবি, আমাদের বিশ্বাস আছে।

দোহার পিঠ চাপড়ে দিলো রাজীব। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দোহা তাকাতেই থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।

- মোরওভার, আই থিংক শি লাইকস ইউ।

অনিকের কথায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো। মহাবিস্মিত দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো বন্ধুর উদ্দেশ্যে। অনিক নিজের বিশ্বাসে অটল, সে বিশ্লেষণ করলো,

- তুই হয়ত খেয়াল করিসনি, আমি করেছি। ও প্রায় ক্লাসে তোর দিকে তাকিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে আমাদের দলের দিকেও ফিরে তাকায় যখন আমরা করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকি। ফুটবল ম্যাচ এবং পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে তোর গানের কথাটা আর বললাম না।

- তুই এতকিছু খেয়াল কখন করিস শালা?

জিই - শু বলতেই সামান্য হাসলো অনিক। দোহার দিকে তাকালো, যাকে দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ ভাবনায় পরে গিয়েছে। মাথা ঝেড়ে সে জিজ্ঞেস করলো,

- দোহা, ধরে নে এটা তোর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।

একটি ঢোক গিললো দোহা। মৃদু আঁচে বললো,

- দেখ অনিক, তোর জন্য জানও কুরবান কিন্তু.....

- এক মাস! দশ হাজার!

প্রসারিত হয়ে উঠলো দোহার নয়নজোড়া, স্থির তাকিয়ে দেখলো অনিককে। ঝুঁকে এলো ছেলেটা, চোখে চোখ রেখে বললো,

- শুধুমাত্র এক মাস। মেইক হার সাফার, ব্রেক হার হার্ট। তোকে আমি দশ হাজার দেবো।

নিঃশব্দে অনিককে দেখে গেলো দোহা। এতটা লম্বা সময়জুড়ে যে একটা সময়ে সকলের মনে হলো দোহা রাজী হবেনা। তাই নিঃশ্বাস ফেলে পিছিয়ে গেলো অনিক। ঠিক তখনি দোহার দৃঢ় কন্ঠ ধ্বনিত হলো,

- মেইক ইট টুয়েন্টি থাউযেন্ড।

কথাটা কানে যেতেই শব্দ করে হেসে ফেললো অনিক। তার সঙ্গে বাকি সকলেও। দোহার কাঁধ এবং পিঠ চাপড়ে হাসতে হাসতে রাজীব আর জিই - শু বললো,

- কি চালু মাল রে ভাই!

- এক্কেবারে বিজনেস মাইন্ডেড!

অনিক মেঝে থেকে দুটো ক্যান তুলে খুললো। একটা নিজের হাতে রেখে অপরটা দোহাকে দিলো। তারপর চিয়ার্স করে বিস্তর হেসে বললো,

- ডান।

অতঃপর হাসতে হাসতে উভয়েই ক্যানে চুমুক দিলো। ━━━━━━━

নিজের স্মৃতিটুকু জোরপূর্বক দমিয়ে রেখে দোহা নীরবে অনুসরণ করে গেলো আমারাকে। এত আবেগী হওয়ার কিছু নেই। প্রেম ভালোবাসা সবকিছুই দুইদিনের বৈরাগী অনুভব। তারপর সব খুল্লাম খুল্লা। আলালের ঘরের দুলালী আমারার বাস্তব জ্ঞান নেই। চোখে রঙিন চশমা পরনে, তাই বাস্তব জীবনের সবকিছুই রঙিন রঙিন দেখছে। তার সাহিত্যিক কথাবার্তা শুনতে মিষ্টি হলেও আদতে এর কোনো মূল্য নেই।

আমারা বাস্তবতা বোঝেনা।

দোহার বদ্ধমূল ধারণা এটি।

চৌধুরী বাংলোটা সুবিশাল। নামের মতই অভিজাত। আধুনিক ডুপ্লেক্স ভবন। গ্যারেজে গাড়ির বহর। তবে সেই তুলনায় লোকজনের উপস্থিতি নেহায়েত কম বা নেই বললেই চলে। হয়ত এখানের মানুষগুলো অতিরিক্ত চোখ পছন্দ করেনা। আমারা দোহাকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে গিয়েও কি মনে করে থামলো। কান পেতে শুনলো কিছু। দোহাও তার ক্রিয়া অনুকরণ করলো। কিছুক্ষণ বাদে সেও শুনতে পেলো। পানির কলকল শব্দ, সঙ্গে মৃদু কথোপকথনের গুঞ্জন। আমারা ইশারায় দোহাকে নিজেকে অনুসরণ করতে বলে দ্রুত হেঁটে পিছনের বাগানে চলে এলো। দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো ওপাশে, উপর থেকে দোহাও একই কাজ করলো।

বাগানের এদিকে কৃত্রিম ঝর্না। চারদিক ঘিরে মারবেল পাথরের আবরণ, যাতে বসে রোদ পোহানো কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য্য আহরণের সুব্যবস্থা রয়েছে। সেই পাথরের উপরেই বসে আছেন আশফিকা। কাঁধজোড়া ঝুলে আছে পরাজিত ভঙ্গিতে। তার পাশেই মীর চৌধুরী, স্ত্রীর কোমরে হাত জড়িয়ে কিছু একটা বিড়বিড় করে যাচ্ছেন। আমারা মুখ বাড়ালো ভালোমত শোনার জন্য।

- মাই কুইন, আই অ্যাম সরি ওকে? আর কখনো এমন হবেনা আই প্রমিস!

- তুমি প্রতিবার একই কথা বলো মীর। আর কত সহ্য করবো আমি? তোমাকে অনেকবার সুযোগ দিয়েছি আমি। নিজের কাছে নিজেকেই আজকাল ছোট মনে হয়।

অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বললেন আশফিকা। মীর তাতে খানিকটা জোরপূর্বকই তাকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। কপালে অধর ছুঁয়ে বললেন,

- তুমি জানো না তোমাকে আর আমারাকে আমি কতটা ভালোবাসি? আমি কখনো তোমাদের ছেড়ে যাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারিনা। তাহলে তুমি কিভাবে আমাকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছো বলো তো? তুমি এই চৌধুরী সাম্রাজ্যের মহারাণী, তুমি না থাকলে আমার কি হবে?

- তুমি আবার আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করছো মীর।

- একদম না। আমি আমারার কথা ভেবে বলছি।

নিঃশব্দে মীরের বুকে পরে থাকলেন আশফিকা। ওই একটা জায়গায় গিয়ে তার হৃদয় সম্পূর্ণ বাঁধা পরে আছে এই সম্পর্কে। তার যক্ষের ধন, আমারা। নাহলে হয়তো বা, দিনের পর দিন তিনি বেহায়ার মতন এই সম্পর্কের বোঝা বয়ে বেড়াতেন না। সত্যিকার অর্থে, আমারাও হয়ত তার একটা অজুহাতমাত্র। তিনি মীরকে ভালোবাসেন, পাগলের মতন ভালোবাসেন। এই বাঁধন ছিন্ন হওয়ার কথা ভাবলেও যেন তার ফুসফুসের সবটুকু বাতাস ফুরিয়ে আসে। তাই এতগুলো বছর পেরিয়েও তুমি অপেক্ষায় আছেন, মীর ফিরে আসবে, একদিন ফিরে আসবে তার ভালোবাসার বাহুডোরে।

- শ্বশুড় শাশুড়ির প্রেমকাহিনী দেখছি, গুনাহ হবেনা?

কানের কাছে দোহার ফিসফিস তপ্ত উচ্চারণে শিউরে উঠলো আমারা। পরক্ষণেই চোখ পাকিয়ে তাকালো। দোহা নীরবে তীর্যক হেসে কাঁধ তুলে দুঃখিত হওয়ার ভান ধরলো। আমারা পুনরায় দৃশ্যে ফিরে তাকালো। দেয়ালের প্রান্তে শক্ত হয়ে চেপে বসলো তার হাতের আঙুল।

আশফিকা ততক্ষণে নিজেকে সামলেছেন।

- মীর। আমি শেষবারের মতন বলছি, দিস ইয ইওর লাস্ট ওয়ার্নিং। যদি তোমার কারণে আমার ছোট্ট আমারার উপর কোনো প্রভাব পরে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না। তুমি ওর বাবা, সংযত হও।

- অফকোর্স ডার্লিং। আমি ওয়াদা করছি। আই লাভ ইউ টু মাচ!

আশফিকা উঠে দাঁড়াতে চাইলেও অতর্কিতে তাকে নিজের কাছে টেনে কোনো সুযোগ দেয়া ছাড়াই অধরে অধর ছুঁইয়ে দিলেন মীর। প্রথমটায় ধস্তাধস্তি করলেন আশফিকা, ভীষণ রকমের। স্বামীর শক্তির সঙ্গে পেরে উঠলেন না। ক্রমশ ছেড়ে এলো তার শরীর মোহিত আবেশে। মীর তাকে নিজের মাঝে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলেন, গভীর করলেন স্নেহের বিনিময়। শেষমেষ আশফিকাও সাড়া দিতে বাধ্য হলেন।

হুড়মুড় করে পিছিয়ে যেতে গিয়েই দোহার বুকে মোক্ষম এক ধাক্কা খেলো আমারা। সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী দুবাহু জড়িয়ে গেলো তার পিঠজুড়ে, সঙ্গে ক্ষীণ হাসির ধ্বনি। ভীষণ লজ্জাবোধ করলো কিশোরী, এতটাই যে দোহার বুক থেকে আর মুখ তোলার সাহসটুকুও রইলোনা।

- তোমার রোম্যান্টিক সিনেমা দেখার শখ হয়েছে আগে বললেই হতো প্রিন্সেস, হলে নিয়ে যেতাম।

- দোহা!

গুঙিয়ে উঠে আমারা ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুতই এগোতে থাকলো। বাগান পেরিয়ে এসে পড়লো গেটের কাছে। দোহা আপনমনে হাসতে হাসতে দৌঁড়ে এলো তার পিছনে। পাশে হাঁটতে হাঁটতে জানালো,

- তোমার বাবা কিন্তু খুব হ্যান্ডসাম বায় দ্যা ওয়ে, বুঝলাম কেনো এতো কিউট হয়েছ তুমি।

- আমি আমার মামণির মতন হয়েছি দোহা।

হঠাৎ করেই থমকে গেলো আমারা, মুখোমুখি হলো দোহার।

- গায়ে গতরে হয়ত না, তবে চেহারায়। আমার মাঝের সবকিছু শুধুমাত্র আমার মায়ের। তাতে বাবাইয়ের কোনো অবদান নেই।

- হাহা, নোলক আমি দুষ্টামি করছিলাম। তুমি এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছ কেনো?

- কারণ আমি আমার বাবাইয়ের মতন হতে চাইনা।

স্তব্ধ হলো দোহা, কয়েক মুহূর্তের জন্য। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমারার দিকে। যে ইতোমধ্যে তার সাইকেলের পিছনে চেপে বসার প্রয়াশে রয়েছে।

- আমার কেনো মনে হচ্ছে তুমি তোমার বাবাকে পছন্দ করোনা?

- কারণ সেটা সত্যি।

সাইকেলের পিছনের সিটে উঠে পা ঝুলিয়ে আমারা বরাবর দোহার চোখের দিকে তাকালো।

- হি ইয আ চিটার। অ্যান্ড আই হেইট চিটার্স।

নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো দোহা। আমারার সহজ স্বীকারোক্তি সে হজম করতে পারছেনা। মেয়েটা কি আসলেই সরল? নাকি অতিমাত্রায় চালাক? তাদের সম্পর্কের মাঝে এই প্রথম এমন একটা বিষয় নিয়ে দোহার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলো। আর কোনো প্রশ্ন সে করলোনা। সাইকেলে চেপে বসে চালিয়ে চললো পিটার্সবার্গের উদ্দেশ্যে।

—চলবে—

[ গতকালের পর্বের কমেন্টের উত্তর না করতে পারার জন্য দুঃখিত। নেটওয়ার্ক ছিলো না সকাল থেকে। আজকের পর্ব ও গতকালের পর্বের কমেন্টের একসাথে রিপ্লাই দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনারা আবার রাগ করে কমেন্ট বন্ধ করে দেবেন না কেমন? আপনাদের মন্তব্য আমার ভীষণ প্রিয়। না পড়লে শান্তি পাইনা। থ্যাংক ইউ। 🥺🤍 ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন