ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

৮ম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৮

পর্ব ৮: [ সতর্কবাণী ]

━━━━━━━━━━━━

আকাশ কমলাভ বর্ণ ধারণ করেছে সন্ধ্যার আলিঙ্গনে। তবে তা ঢেকে আছে গুমোট মেঘের অন্তরালে। ক্রমেই অন্ধকার হয়ে উঠছে পরিবেশ। শীতল হাওয়া বইছে প্রকৃতিজুড়ে। এর মাঝেই সড়কপথ ধরে ছুটে যাচ্ছে দোহার সাইকেল। আকাশের অবস্থা লক্ষ্য করে সে গতি বাড়ালেও লাভ হলোনা খুব বেশি। একদম অতর্কিতেই ঝমঝমিয়ে নামলো বারিধারা।

- শিট!

ফিসফিস করে আপনমনে বলেই দ্রুত একপাশে সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়লো দোহা। জোর বৃষ্টিতে তার পরনের টি শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা আমারারও। তার হাত ধরে দোহা সাইকেল থেকে নামতে সাহায্য করে টেনে নিলো সড়কের পাশে থাকা ছাউনীতে। ভেজা কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে বিড়বিড় করলো,

- ইশ, বৃষ্টিটাকে এখনি আসতে হলো?

আমারা কিছু বলছে না। নিজেকে গোছানোর চেষ্টাও নেই তার মাঝে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। ঝরঝর ঝরছে বৃষ্টি, সড়কপথে টলটলে স্রোত খেলে যাচ্ছে। প্রকৃতি মাতাল হয়েছে হওয়ার তোড়ে। কম্পিত হাত বাড়ালো সে আনমনে, ছাউনীর ছাদ গড়িয়ে পড়তে থাকা ফোঁটাগুলো নিজের হাতের তালু বেয়ে গড়াতে দিলো। দোহা নিজের মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে পাশ ফিরে তাকিয়ে থমকে গেলো ক্ষণিকের জন্য। আমারার অবয়বে অজান্তেই বুলিয়ে আনলো নিজের নজর। সমাজের মাপকাঠিতে সৌন্দর্য্যের বহু বাইরে ভারী একটি শরীর। উঁচু বাঁকানো কাঁধ, প্রশস্ত কোমর এবং গোলগাল ওজনদার অস্তিত্ব। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় উদরের ভুঁড়ির দিকটা খানিক বোঝা যাচ্ছে। কাঁধসমান চুল লম্বা হচ্ছে ধীরে ধীরে, কপালে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা ব্যাঙস্ কাট কেশগুচ্ছ থেকে টপটপ করে বৃষ্টির পানি ঝরছে। বৃত্তাকার চেহারা, ফোলা লালচে গালজুড়ে চিকচিক করছে পানির ফোঁটা। পাতলা ঠোঁটজুড়েও মুক্তোর দানার ন্যায় বিস্তৃতি তার। নিষ্পলক চেয়ে থাকলো দোহা। পুরুষমাত্রই আকর্ষণের ঠিক বিপরীত কাজটি করবে আমারার অস্তিত্ব। বারংবার উপেক্ষা করেছে দোহা, যতবার কলেজে, ক্লাসে আশেপাশে মেয়েটাকে দেখেছে ততবারই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে আজ, কিছু একটা বৈপরীত্য অনুভব করলো সে। আমারার হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরার ব্যাপারটা তার ভালো লেগেছে।

হুট করেই মুখ ফিরিয়ে দোহাকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে লক্ষ্য করে আমারার উজ্জ্বল ত্বকে লালচে লালিমা ফুটলো। গাল দুটো ফুলে উঠলো, সামান্য লাজুক হাসির তাড়নায়। দোহার রীতিমত নিঃশ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো যখন সে খেয়াল করলো হাসলে মেয়েটার গালের দুপাশে খুব গভীর টোল পড়ে। বিষয়টা এর আগে কেউ কি খেয়াল করেছে? উহু, করবে কিভাবে? কয়জনই বা আমারাকে হাসতে দেখেছে? অজান্তেই একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করে নিজের ডান হাতটি তুললো দোহা, তর্জনী দিয়ে আলতোভাবে ছুঁয়ে দিলো আমারার ডান গালের টোল। সামান্য কাঁপলো কিশোরী, অজান্তেই বুজে নিলো চোখের পাতা। তিরতির করে কম্পিত হলো তার পাতলা অধরজোড়া। সম্মোহিতের মতন দোহা তর্জনী টোল থেকে হটিয়ে নাকের নথ স্পর্শ করলো। চট করে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি মেলে তাকালো আমারা, ফিসফিস করলো,

- দোহা.....

- ওই হাসির টোলের বাঁধনে বেঁধেছ আমায়, নাকের নোলকের দোলনে করেছ অঙ্গার....

- কোন গানের লাইন?

আমারার সরল প্রশ্নে হেসে ফেললো দোহা, মাথা কাত করে জানালো,

- ধরে নাও তোমায় নিয়ে লিখা কোনো গান?

- তুমি গান লিখতে জানো?

এই প্রশ্নের জবাব দিলোনা দোহা। ঝুঁকে এলো আমারার মুখের সন্নিকটে। উচ্চতায় বিস্তর তফাৎ রয়েছে তার এবং মেয়েটির মাঝে। মাথা তুলে দুর্বোধ্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমারা, বরাবর দোহার নয়নে। কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলের গোছা ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে তার, তবে হাতকে সে আবদ্ধ রেখেছে জোরপূর্বক। ব্যাপারটা খেয়াল করলো দোহা, মৃদু হেসে তাই সে আমারার হাতটি তুলে ছুঁয়ে দিলো নিজের গালে। স্থবির হয়ে পড়লো কিশোরী, তবে নিজের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার কাছে হার মানলো দ্রুতই। আঙুলে ছুঁয়ে দিলো দোহার ভেজা কপাল, ছোট ছোট চুলগুলো নিয়ে নড়াচড়া করে পুনরায় স্পর্শ ফিরিয়ে আনলো গালে। যেন অনুভব করলো মায়াবী অস্তিত্বটিকে। আমারার কন্ঠ আবেগে ম্রিয়মাণ হয়ে এলো, বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে বিড়বিড় করলো,

- তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে দোহা।

সৎ স্বীকারোক্তি। দোহা মুচকি হাসলো, আমারার হাতে মুখ ঘষে উত্তর করলো,

- আই নো।

- কখনো ছেড়ে যেওনা, প্লীজ।

- কক্ষনো যাবনা।

শব্দরা বিলীন হলো। একে অপরের সন্নিকট উপস্থিতি এবং দৃষ্টির মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেললো যেন উভয়ে। আমারার পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে নিলো দোহা, তার নজর সিক্ত চেহারায় ঘুরঘুর করে থামলো আর্দ্র অধরে। ঝুঁকলো সে, ক্ষীণ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

- হ্যাভ ইউ এভার কিস’ড এনিওয়ান, প্রিন্সেস?

হতচকিত হলো আমারা, দৃশ্যমানভাবে লাজুক অনুভব ফুটে উঠলো তার চেহারাজুড়ে। দৃষ্টি একপাশে সরিয়ে দূর্বার হৃদযন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে সে জানালো,

- নো।

- গুড....ভেরি গুড....

ফিসফিস উচ্চারণ করে এগিয়ে এলো দোহা, তার তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেলো আমারার গাল। শিরদাঁড়াজুড়ে শিহরণ খেলে গেলো কিশোরীর, অজান্তেই চোখজোড়া বুজে নিলো। অন্তর আস্কারা দিলো বাসনাকে। কানে বাজতে থাকলো বৃষ্টির ঝমঝম ধ্বনি, যেন সঙ্গীতের কলতান। কেমন অনুভূত হবে শখের পুরুষটির অধরের স্পর্শ? তাতে কি আদতেই স্বর্গীয় সুখ রয়েছে যেমনটা কবি সাহিত্যিকরা বর্ণনা করে?

কিছুক্ষণ বাদেও শুধুমাত্র উত্তপ্ত অনুভব ছাড়া আর কিছু টের না পেয়ে চোখ মেলে তাকালো আমারা। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখা পেলো দোহার গ্রীবার অংশের, নিজের কপালে ছোঁয়া পেলো শীতল। ঝুঁকলো দোহা, আমারার কপালে বৃদ্ধাঙ্গুল রেখে তার উপর আলতোভাবে ছুঁয়ে দিলো নিজের ঠোঁট। স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো আমারা। ছোট্ট এক আবেদন, অথচ এর অনুভূতিটুকু অসামান্য। বৃষ্টি যেন বাইরে নয়, ঝরছে আমারার অন্তরে, অনুভূতিদের বৃষ্টি, একদম ঝমঝমিয়ে।

দোহা সামান্য সরে আমারার মুখাবয়ব দেখলো, পরক্ষণে নিজেকে কয়েক পা দূরে সরিয়ে নিলো। এক দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে স্মিত হাসলো। অজান্তেই নিজের কপাল ছুঁয়ে দিলো আমারা, হাজারো প্রজাপতির দল যেনো আষ্টেপৃষ্টে তাকে বেঁধে ফেলেছে চারিদিক থেকে। হৃদস্পন্দন আকাশচুম্বী, শরীরের প্রতিটি দেহকোষে প্রগাঢ় আবেগের বিচরণ।

- একদিন মাঝখানে আর কোনো আঙুলের বাঁধা থাকবেনা।

ধরে এলো ভেতরটা ভীষণ রকম। যেনো বিশাল এক জলোচ্ছ্বাস এসে ভাসিয়ে নিয়েছে সমস্তকিছুকে। চেয়ে রইলো আমারা, নিষ্পলক, দোহার দিকে। শখের পুরুষ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। দোহা সেটিকে দুমড়ে মুচড়ে পরিণত হয়েছে প্রিয় পুরুষে। প্রিয়তম অভ্যাসে।

বৃষ্টি পরে এলো। ততক্ষণে বাঁধনহারা হয়েছে অন্তর। পুনরায় সাইকেলে চাপলো দুজন। গোধূলীর রশ্মি এবং ঝিরঝির বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সেন্ট পিটার্সবার্গের সামনে এসে থামলো কপোত কপোতী। সাইকেল থেকে নামলো আমারা। একদম নিশ্চুপ সে। দোহা সিটে বসেই ঝুঁকে এসে তার নাকে আলতো করে নিজের নাক ছুঁয়ে দিয়ে বিড়বিড় করলো,

- গুডবাই প্রিন্সেস। সি ইউ টুমরো।

তবে আমারা গেলনা। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো। নয়ন তুলে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,

- তোমাকে একটা কথা বলি?

দোহা ততক্ষণে প্যাডেলে পা দিয়েছে। মাথা কাত করে হেসে সে বললো,

- অবশ্যই নোলক। বলো।

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। দিগন্তের দিকে উড়ে যাওয়া একঝাঁক বকের মৃদু কলরোল। আমারা নিজের দুহাত আবদ্ধ করে পরিমিত কন্ঠে ব্যক্ত করলো,

- কখনো আমার বাবাইয়ের মতন হয়োনা, দোহা। দেখতে মামণির মতন হলেও, আমি কিন্তু আমার মামণি নই।

স্তব্ধ হয়ে গেলো দোহা, অধরের হাসি তার ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। হঠাৎ করে আমারার এমন কথা বলার অর্থ কি?উদঘাটন করতে পারলোনা সে। আমারার অনুভূতিপূর্ণ দৃষ্টি নিদারুণ দোলা দিলো তার অস্তিত্বজুড়ে।

- যে হৃদয়ে একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছো, সেই হৃদয়ে ঘা দেয়ার আগে ভেবে দেখো, এ হৃদয় তোমারই ঘর। নিজের ঘর নিজ হাতে ভাঙার চেয়ে কষ্টের আর কিছু হয়না।

এটুকুই। উল্টো ঘুরলো আমারা, পায়ে পায়ে একপ্রকার ছুটেই চলে গেলো গেটের ভেতরে। সাইকেলের উপর বসে বাকরুদ্ধ চেয়ে থাকলো দোহা। আমারা ফিরে যাচ্ছে ডরমে, তার অবয়বে স্থির দৃষ্টি রেখে দোহা বিনা কারণেই নিজের অন্তরে এক শীতল আতঙ্ক অনুভব করলো।

এই আতঙ্ক কিসের? ধরা পরে যাওয়ার? নাকি ধোঁকা দেয়ার?

━━━━━━━━━━━━━━

ঘড়ির কাঁটা একটার ঘরে। সময় নির্দেশিত হচ্ছে একটা বত্রিশ হিসাবে। অথচ অন্ধকারাচ্ছন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাবটির মাঝে রাত দিনের কোনো হিসাব নেই। উন্মত্ত মিউজিকে থেকে থেকে কাঁপছে স্থানটি। অ্যালকোহল এবং ড্রা*গসে আসক্ত ধনীর দুলাল দুলালীগণ উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। স্টেজের উপর পারফর্ম করছে একটি রক ব্যান্ড, যার গিটারিস্ট মাতিয়ে রেখেছে গোটা আসর। গানের মাঝে যখনি ইলেকট্রিক গিটারের ধ্বনি ভেসে আসছে, তখনি চিৎকার চেঁচামেচি এবং উল্লাসে মেতে উঠছে গোটা জায়গা।

স্টেজের উপর একপাশে একটি টুলের উপর বসে আছে দোহা। হাতে বাদামী বর্ণের একটি সেকেন্ড হ্যান্ড ইলেকট্রিক গিটার। প্রায় ঘন্টা দেড়েক যাবৎ সে একটানা বাজিয়ে চলেছে, আঙুলের ডগা দাগে টকটকে হয়ে উঠেছে তবে কোনো ছাড় নেই। ঘেমে নেয়ে উঠেছে সে, পরনের শার্টটা গায়ের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গিয়েছে। মুখের মাস্কের কারণে অস্বস্তি বেশি হচ্ছে, তবে খোলার উপায় নেই। একমনে গিটারের সুর বাজিয়ে চলেছে সে, ইলেকট্রিক সুরেলা ধ্বনিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে উন্মত্ত ভিড়। মাইক্রোফোনে কর্কশ কন্ঠে একজন লাফিয়ে লাফিয়ে গেয়ে চলেছে,

“ পেয়ে হারানোর বেদনায়, উড়ে চলেছি সারাক্ষণ

কেনো তুমি মিছে মায়ায়, বেঁধেছিলে আমায় তখন

ফিরিয়ে দাও, আমারই প্রেম তুমি ফিরিয়ে দাও~”

তার কন্ঠে কন্ঠ জুড়েছে সকলে, মা*দকের প্রভাব ঢলে ঢলে পড়ছে একেকজন একেক পাশে। দোহার হাতের গিটার ক্রমশ চড়া হচ্ছে, ছাপিয়ে যাচ্ছে তা সবকিছুকে। ভিড়ের মাঝের বেশকিছু মেয়ে স্টেজের একেবারে কাছে গিয়ে তার পাশে ঘুরঘুর করতে থাকলো। অ্যালকোহলে বুঁদ হয়ে আছে সম্পূর্ণ, তাদের অদ্ভুত চেহারা এবং খিলখিল হাসিতেই স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। দোহা নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, তার নজর আবদ্ধ একজনের উপরেই। একদম কোণার একটি টেবিলে বসে আছে রাহা। একটি হুডি পরিধানে, মাথায় তুলে রেখে নিজেকে যেন আড়াল করে নিতে চায়। দুই আঙ্গুলের ফাঁকে ঝুলছে সিগারেট, যার প্রান্ত ঠোঁটে দিয়ে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে সে লক্ষ্য করে যাচ্ছে দোহাকে। সত্যিকার অর্থে, গান পরিবেশন করা গোটা দলটাকে।

আরো প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে রাত আড়াইটা নাগাদ শেষ হলো উত্তেজনাকর মাদকীয় পরিবেশনা। ছেলেমেয়ের দল ক্লাবের পিছনে রুমে রুমে আড়াল হয়েছে ততক্ষণে। সেদিকে অবশ্য ভ্রুক্ষেপ নেই কারোরই। স্থানটি কুখ্যাত লোকচক্ষুর আড়ালে উন্মাদনার বিনোদন লাভের জন্য।দোহা টিস্যুতে নিজের শরীরে জমা ঘাম মুছে নিতে নিতে নিজের গিটার প্যাকেটে ভরলো। কোনোমতে সুস্থির হয়ে বসতেই তার দিকে টাকা বাড়িয়ে দিয়ে দলের প্রধান ছেলেটা বিড়বিড় করলো,

- নে, তোর ভাগ।

দোহা ফিরে তাকালো, একটি পাঁচশো এবং একটি এক হাজার টাকার নোট। মোট দেড় হাজার টাকা। সেটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে দোহা জানতে চাইলো,

- আর পাঁচশো?

- খেয়ে ফেলেছি আমি!

একপ্রকার ধমক দিয়েই উঠলো ছেলেটা, দোহা তাতে বিরক্তভরে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সে নিজেকে সামলে নিলো।

- আরে ভাই আমাকে মোটে পাঁচ হাজার দিয়েছে ওরা, ঝন্টুকে এক, রবিকে এক আর তুই আমি দেড় করে।

- এত কমে তুই রাজী হয়েছিস কেনো?

- তো কি করতাম বল তুই? গত এক মাস যাবৎ কোনো শো পেয়েছি নাকি?

দোহা আর কিছু বললোনা, নোট দুটো ভাঁজ করে নিজের পকেটে ভরলো। এই ছেলের সঙ্গে তর্কে যেতে সে ইচ্ছুক নয়। দলটা তারই, সে নিজে ভোকালিস্ট। দোহার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে গিটারিস্টের বাইরের গন্ডি পেরোয়নি। আজও কিছুই বললোনা, ইদানিং সবকিছুই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে তার। চুপচাপ জ্যাকেট তুলে নিজের গায়ে জড়িয়ে গিটারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সে ধীরপায়ে এগোলো বাইরের উদ্দেশ্যে। কাউকে বিদায় জানানোরও প্রয়োজনবোধ করলোনা। ছেলেটা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তার স্পর্ধা লক্ষ্য করলো শুধু, দাঁত কিড়মিড় করলেও কিছুই বললোনা একটা কারণে।

দোহা সত্যিকারের প্রতিভা। তাকে হারিয়ে ফেলা আপাতত অনুচিত হবে।

সিঁড়ি বেয়ে ক্লাবের বাইরে উঠে এসেই সর্বপ্রথম মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে প্রশ্বাস টানলো দোহা। শিথিল করলো যেন নিজেকে। মনে মনে কিছু অংকের হিসাব কষলো। কতটুকু টাকা জমানো হয়েছে কলেজের ফি পরিশোধের জন্য? আর কতটুকু বাকি আছে? রমজানের বন্ধের আগেই সব করতে হবে। কেনোনা বাড়িতে গেলেই উপার্জনের সকল পথ ক্ষণিকের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে তার জন্য।

- কলেজের নববর্ষে দারুণ গেয়েছিলে, তবে এখানে কেনো নয়?

মেয়েলী কন্ঠস্বরটি শুনতেই দোহার শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল শিহরণ খেলে গেলো। চট করে ঘুরে তাকালো সে। যা ভেবেছিল তাই। দাঁড়িয়ে আছে রাহা। মৃদু হাসিমাখা ঠোঁটে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একনজর তাকে দেখলো দোহা, পরক্ষণে পাল্টা হেসে বিড়বিড় করলো,

- ইচ্ছা নেই।

- ইচ্ছা নেই নাকি সুযোগ নেই?

ধীরপায়ে এগিয়ে এলো রাহা, তার চাহুনি শিকারীতুল্য। দোহার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,

- আমার দলে চলে এসো। আই উইল গিভ ইউ দ্যা প্লেস ইউ ডিজার্ভ।

স্থির তাকিয়ে রইলো দোহা, প্রস্তাবের গভীরতা তাকে অভ্যন্তর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তার বর্তমান দলের প্রতিপক্ষ রাহার দল, সে যদি ঐ প্রান্তে যুক্ত হয় তবে ব্যাপারটা কেমন দেখাবে? সিদ্ধান্তটি কি আদও সঠিক হবে? সবথেকে বড় প্রশ্ন, একপ্রকার শত্রুভাবাপন্ন রাহা কেনোই বা হঠাৎ করে এমন প্রস্তাব রাখছে? সন্দেহজনক নয় কি? দোহা মাথা কাত করলো, তীর্যক হেসে জিজ্ঞেস করলো,

- আর ইউ দ্যাট জেলাস ওভার মাই নিউ গার্লফ্রেন্ড?

প্রথমটায় স্থির তাকিয়ে রইলো রাহা, পরমুহুর্তে তার অধরে ছেয়ে গেলো অদ্ভুতুড়ে হাসি। দুহাত হুডির পকেটে ভরে তাচ্ছিল্যের স্বরে জানালো,

- জেলাস? ওভার দ্যাট পিগ? হাহা....নাইস জোক!

দোহা এক পা এগোলো, তারপর রাহার উদ্দেশ্যে ঝুঁকে ক্ষীণ কন্ঠে বিড়বিড় করলো,

- দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ বোঝে না। তুমি দেখছি প্রবাদটির জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হতে চলেছ!

স্তব্ধ হয়ে গেলো রাহা। দোহা আরো একটু ঝুঁকে একেবারে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

- সময় থাকতে তুমি বুকে টেনে নেয়ার বদলে পায়ে ঠেলে দিয়েছ। নাউ....সাফার বেইবি!

কাঁপলো রাহার শরীর, দোহা মুচকি হেসে সরে দাঁড়ালো। দ্বিতীয় বাক্য বিনিময় ছাড়াই দুহাতে স্যালুট ঠুকে উল্টো ঘুরলো। আনমনে শীষ বাজাতে বাজাতে পাড়ি জমালো নির্জন সড়কের অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়ায়। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো রাহা, বুকে দুহাত বেঁধে আনমনে অদ্ভুত এক হাসি হাসলো। ছেলেটাকে যেমন ভেবেছিলো, সে মোটেও তেমন নয়।

দোহা কিংবা রাহা, দুইজনের কেউই যেটা উপলব্ধি করলোনা সেটা হলো তাদের সংগোপনের মাঝে এক তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি। ঠিক বিপরীত পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েলী ছায়ামূর্তিটি দেয়াল ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সমস্ত শরীর আবৃত ছেলেদের মতন কালো শার্ট এবং গাবার্ডিনে। গ্রীবায় ঝুলন্ত হেডফোন। মুখে চুইং গাম। মাথায় থাকা সানক্যাপটা সে টেনে নামিয়ে উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করলো। নির্জন সড়কে একমাত্র একলা কিশোরী মেয়ে হয়েও তার বিন্দুমাত্র ভয় নেই।

জারা আমিন সে! জীবিত প্রাণীতে তার ভয় কিসের?

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন