#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৯
পর্ব ৯: [ ধোঁকা ]
━━━━━━━━━━━━
নিজের ডেস্কে বসে গণিতের কিছু অংক কষছে আমারা। একপাশে বই খুলে রাখা, নিজের নোটবুকে অনুশীলন করছে সে। আর মাত্র দুইদিন বাদেই ফুটবল টুর্নামেন্ট। তারপরই আবার সেন্ট পিটার্সবার্গের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সব মিলিয়ে ভীষণ রকমের ব্যস্ততা চারিদিকে। দুটো ক্লাসের পরেই তাই ছুটি হয়ে গিয়েছে। ছুটি বলতে কেউই ডরমে ফিরে যায়নি, যার যার নির্ধারিত কাজে এবং প্র্যাকটিসে গিয়েছে। বরাবরের মতোই আমারা কোনকিছুতেই অংশ নিচ্ছে না। প্রায় ফাঁকা ক্লাসে সে একাই বসে নিজের পড়া করছে। অন্যান্য কয়েকজন যারা আছে তারা ব্যস্ত গল্পগুজব এবং হাসিঠাট্টায়।
একটা অংক মেলাতে গিয়ে যখন আমারার রীতিমত চুল টানার অবস্থা, তখনি তার ডেস্কের উপর ঝুঁকে এলো কেউ। চট করে মাথা তুলে তাকিয়েই ক্লাসের আর্টিস্ট ছেলে সৌরভকে দেখলে পেলো সে। বিস্মিত হয়ে তাকালো তাই। সৌরভ নিজের হাতের আর্ট পেপার তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বিড়বিড় করলো,
- তোকে আঁকলাম, কেমন হয়েছে?
প্রথমটায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলো আমারা। সৌরভ ছেলেটার সঙ্গে কালেভদ্রে কিছু জরুরী কথা ছাড়া তেমন কোনো বন্ধুসুলভ কথোপকথন তার হয়নি। কিছুটা সন্দিগ্ধ হলো সে। কোনো ধোঁকাবাজি নয়ত? কাউকে বিশ্বাস করে উঠা কষ্টকর। সৌরভ যেন আমারার মনের ভাষা পড়তে পারলো। তাই দ্রুত বললো,
- আরে না না, আমি এমনিই চুপচাপ বসেছিলাম, কোনো কাজ নেই। হঠাৎ তোকে চোখে পড়লো, ভাবলাম ইনস্পিরেশন নিয়ে নতুন কিছু ট্রাই করি।
আমারা কিছুটা ইতস্তত করেই আর্টপেপারটি হাতে নিলো, তারপর তাতে দৃষ্টি ফেলতেই সে একদম স্থির হয়ে গেলো। মোটা খসখসে পৃষ্ঠার উপর স্কেচ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দারুণভাবে। ফাঁকা ক্লাসরুম, একপাশে জানালার কাছে ডেস্কে বসে নিজের নোটবুকে মনোযোগী এক মেয়ে। আমারা স্বয়ং! দুপাশে পর্দা দুলছে, তাতে আমারার চুলরাশি এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে কপালে। গোলগাল চেহারায় মনোযোগের কুঞ্চন, আলুথালু শরীরের গাঢ় ইউনিফর্ম। দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা আমারা নিজের, এতটাই অসাধারণ হয়েছে চিত্রকর্মটি।
বাকরুদ্ধ এক নজর সৌরভের দিকে চেয়ে পরক্ষণে আবার আর্টপেপারে নিজের প্রতিকৃতির স্কেচে দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে আমারা কিছু উচ্চারণ করতে চাইলেও পারলোনা, শুধু ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো তার, নয়ন সামান্য টলটলে হলো অনুভবে। সে মনে করতে পারলোনা অবহেলায় হলেও কেউ কোনোদিন তাকে এতটা দামী উপহার দিয়েছে কিনা। সৌরভ তার কে? কেউ না। এমনকি বন্ধুও না। ছেলেটা নিজের ড্রয়িং এর সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্যই তার মতন একজন মানুষের স্কেচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবুও, কৃতজ্ঞতায় আমারার অন্তর ভরপুর হয়ে উঠলো। আর্দ্র কন্ঠে সে কোনমতে বিড়বিড় করলো,
- থ্যাংক....ইউ।
সৌরভ একগাল হাসলো। আমারাকে শব্দ প্রয়োগ করতে হলোনা নিজের অনুভূতি প্রকাশে, তার চেহারার অভিব্যক্তিই চিত্রকরের কাছে সবকিছু ঘোষণা করে দিলো।
- এটা আমি আমার কাছে রাখি? প্লীজ?
আমারা হুট করেই পাশ ফিরে আর্জি জানালো। মাথা দুলিয়ে সৌরভ উত্তর করলো,
- অবশ্যই, আমি এমনিতেই এটা তোকে দেবো এমন পরিকল্পনাই করেছিলাম।
- এটা অসাধারণ হয়েছে, সত্যি বলছি, তুই দারুণ আঁকিস রে সৌরভ।
হাত বাড়িয়ে সৌরভের একটা হাত খপ করে ধরে আমারা ঝাঁকিয়ে দিতে দিতে দ্বিতীয় দফায় বললো,
- থ্যাংক ইউ সো মাচ, আমার খুব পছন্দ হয়েছে!
- কি পছন্দ হয়েছে, প্রিন্সেস?
সৌরভ কিছু বলতে যাচ্ছিলো তবে মধ্যখানে ভিন্ন একটি কন্ঠ বাঁধা দেয়ায় ঘুরে তাকালো। ক্লাসে ঢুকেছে দোহা এবং অনিক। উভয়ের পরনেই জার্সি এবং শর্টস, সঙ্গে কেডস। ফুটবল প্র্যাকটিসে ছিলো বোঝা যাচ্ছে ঘর্মাক্ত শরীর এবং কিঞ্চিৎ পরিশ্রান্ত অভিব্যক্তিতে। অনিক নিজের ডেস্কে এলিয়ে পরে পানির বোতলে চুমুক দিলেও দোহার মাঝে ভ্রুক্ষেপ নেই। সামনের সারির প্রথম ডেস্কে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বুকে দুবাহু বেঁধে সে তাকিয়ে আছে আমারা এবং সৌরভের দিকে। বিশেষ করে বলতে গেলে, সৌরভের হাত ধরে রাখা আমারার হাতের দিকে।
চট করে সৌরভকে ছেড়ে লাফিয়ে উঠলো আমারা। এক ছুটে দৌঁড়ে গেলো দোহার দিকে। সৌরভের উপর থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হটিয়ে কঠোর মুখে বিস্তর হাসি ফুটিয়ে দুবাহ বাড়িয়ে নিজের মাঝে আমারাকে আগলে নিলো দোহা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সযত্নে। প্রেমিকা তার উত্তেজিত হয়ে স্কেচ দেখিয়ে বললো,
- দেখো দেখো, সৌরভ আমাকে এঁকেছে। কি সুন্দর হয়েছে তাইনা?
দোহা আর্টপেপার টেনে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো, তার আঙ্গুলগুলো প্রান্তে চেপে বসলো খানিক। আমারা অবশ্য এত খেয়াল করলোনা। সে ব্যাস্ত নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পছন্দের জিনিসটা দেখাতে।
- হুম, সুন্দর হয়েছে।
মৃদু হেসে বিড়বিড় করলো দোহা। আমারা মাথা ঝাঁকিয়ে হাতে হাত ঘষে বললো,
- হ্যাঁ, হুবহু আমার মতন হয়েছে। সৌরভের হাতে জাদু আছে।
- হাহা, একদম। ওর আঁকার হাত যে ভালো কেই বা না জানে?
একনজর সৌরভের দিকে তাকালো দোহা। প্রশংসার করলেও দোহার কথায় সৌরভ ঠিক উষ্ণতা নয়, বরং বিদ্রূপ টের পেলো অধিক। তবে ব্যাপারটা নিয়ে অধিক মাথা ঘামালোনা সে। নিঃশব্দে আমারাকে বিদায় জানিয়ে চুপচাপ ফিরে গেলো নিজের ডেস্কে।
দোহা দ্রুতই স্কেচটা আমারার হাত থেকে নিয়ে তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে বললো,
- অনেক হয়েছে, এখন চলো আমার সাথে।
- আম....কোথায়?
- ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে, চলো তো।
দ্রুতই আমারার হাত ধরে টেনে ক্লাসের বাইরে নিয়ে গেলো দোহা। এতক্ষণ যাবৎ ক্লাসের প্রায় প্রত্যেকটা বান্দাই তাদের দিকে যে হারে তাকিয়েছিল তাতে একপ্রকার অস্বস্তিই বোধ হচ্ছিলো তার।
প্রথমে ক্যান্টিন থেকে দুটো বার্গার এবং জুস কিনে উভয়েই পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালো কলেজের প্লে গ্রাউন্ডে। ছেলেমেয়ের দল এখনো ব্যস্ত অনুশীলনে। তাই স্থানটির ভিড় এড়িয়ে দোহা আমারাকে নিয়ে চললো ডরমের কাছাকাছি লেকটায়। কলেজ চলাকালীন সময়ে এদিকে আসে খুব কম শিক্ষার্থীই। তাই এখানে কিছুটা প্রাইভেসি পাওয়া সম্ভব। লেকের পাশে সার দিয়ে থাকা কয়েকটা বেঞ্চের একটায় বসলো দোহা। তার পাশে আমারা। মৃদুমন্থর হাওয়া বইছে। আবহাওয়া কিছুটা গুমোট মাখা। তবে এখনো বৃষ্টিপাত হয়নি। দোহা বার্গারের প্যাকেট খুলে আমারার হাতে ধরিয়ে দিলো, জুসের ধাতব ক্যানটিও নিজের আঙুল চেপে খুলে তবে আমারার পাশে রাখলো। বার্গারে কামড় বসিয়ে কিশোরী হৃদয়খানি অতি আবেগে পর্যবেক্ষণ করলো দৃশ্য। এই ছোট ছোট আবেদন হয়ত তেমন কিছুই নয়, তবুও আমারার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে তা যথেষ্ট। দোহার যত্নশীল এই আচরণই তার ভীষণ পছন্দের, ভীষণ অনুভূতিপূর্ণ আবেগের। খেতে খেতে মুচকি হাসলো আমারা তাই।
দোহা অবশ্য এতদিকে খেয়াল করেনি। সে নিজের বার্গারে বিশাল এক কামড় বসিয়ে গাল ফুলিয়ে চিবুতে ব্যস্ত। নিজের উপর আমারার নিগূঢ় দৃষ্টিপাত লক্ষ্য করে সে সামান্য হেসে জিজ্ঞেস করলো,
- কি দেখছো?
- তোমাকে।
- আমাকে এত দেখার কি আছে?
- প্রিয়কে দেখার মাত্রা সীমাহীন।
দোহা থমকালো। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো তার হৃদয়ে ঝংকার খেলে গিয়েছে। পরমুহূর্তেই সে স্মিত হেসে খাবারে মনোযোগ দিলো আবার।
- তুমি খুব সুন্দর কথা বলতে জানো দেখছি। তোমার সঙ্গে প্রেম না করলে তো অনেক কিছু মিস করে যেতাম!
আমারা মুচকি হেসে নিজের বার্গার শেষ করলো দ্রুতই।হাত ঝেড়ে জুসের ক্যানে চুমুক দিয়ে খেয়াল করলো দোহা তার দিকে মাথা কাত করে তাকিয়ে আছে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে সে ভ্রু উঁচু করতেই দোহা তর্জনী তুলে বললো,
- তোমার ঠোঁটের কোণায়, সস লেগে আছে।
ব্যস্ত হয়ে নিজের ঠোঁট মুছে নিলো আমারা, তবে কাজ তো হলোই না বরং সসটুকু আরো ছড়িয়ে পড়লো, একেবারে তার চিবুক অবধি। খিলখিল করে হেসে ফেললো দোহা, আমারা তাতে ভারী লজ্জাবোধ করলো। দ্বিতীয় দফায় মোছার প্রচেষ্টায় ক্ষীণ কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- একটা আয়না থাকলে ভালো হতো।
- আমি থাকতে আয়নার দরকার আছে বলে মনে হয়না।
অতর্কিতে ঝুঁকে এলো দোহা। নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিলো। তৎক্ষণাৎ স্থবির হয়ে পড়লো আমারা। স্থির তাকিয়ে দেখলো। দোহার হাত ছুঁয়ে দিলো তার চিবুক, বৃদ্ধাঙ্গুলে বুলিয়ে আনলো আমারার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা সসটুকু। স্পর্শটি শীতল, শিহরণ জাগানিয়া। অজান্তেই নয়ন বুজে এলো কিশোরীর, অনুভব করলো ধীরে ধীরে দোহার বৃদ্ধাঙ্গুল তার ঠোঁট থেকে বয়ে নেমেছে চিবুকে। সন্নিকট উপস্থিতির কারণে প্রেমিকের অস্তিত্বে জড়ানো হিমশীতল এক সুবাস স্পষ্ট টের পাচ্ছে আমারা, জেসমিনের মতন সুঘ্রাণ, স্নিগ্ধ, মায়াবী অথচ শক্তিশালী। প্রাণভরে প্রশ্বাস টানলো সে, ইচ্ছা হলো দোহার বুকে নিজেকে বিলীন করবার। দুহাত মুষ্টি বেঁধে সেই ইচ্ছা দমন করে রাখলো আপাতত। দোহা দূরে সরে যেতেই নয়ন মেলে তাকালো। ভাবলো এই বুঝি সমাপ্ত হলো কাছে আসার মৌসুম। তবে তার সমস্ত হৃদয়জুড়ে তীব্র জলোচ্ছ্বাস খেলিয়ে দিলো দোহার পরবর্তী পদক্ষেপ।
যে বৃদ্ধাঙ্গুলে আমারার অধর মুছে এনেছে, সেটি টিস্যুতে পরিষ্কার করার বদলে নিজের ঠোঁটে স্পর্শ করে জিভ দিয়ে লেহন করে নিলো সে। মুষ্টির জোরে শক্ত সাদা হয়ে গেলো আমারার দুহাত, হৃদযন্ত্র হলো বাঁধনহারা। অন্তর অভিসম্পাত করলো নিজেকে, কি ক্ষতি হতো আর কিছুক্ষণ পর চোখ খুললে?! দোহার অবশ্য আমারার প্রতিক্রিয়ায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার অভিব্যক্তি এমন যেন জগতের সবথেকে স্বাভাবিক কাজটি করেছে। বৃদ্ধাঙ্গুলের সসটুকু লেহন করে নিয়ে সে যথারীতি নিজের অবশিষ্ট বার্গারে মনোযোগ দিলো। নিজেকে আহাম্মক ঠেকলো আমারার। কি অদ্ভুত! তার দেহকোষজুড়ে প্রজাপতিরা বাসা বেঁধেছে কেনো? মন্থর হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপতে থাকা গাছের পাতার ন্যায় আন্দোলিত হয়ে চলেছে তার অন্তর।
- উম, বার্গারটা মজা আছে, অন্যদিন....
বলতে বলতে আমারার টকটকে হয়ে আসা ফোলা ফোলা গাল লক্ষ্য করে দোহা থামলো, ভ্রু উঁচু করে শুধালো,
- প্রিন্সেস?
- হ্...হ্যাঁ?
সম্মোহনের ঘোর কাটলো আমারার, ঝটকা দিয়ে একপ্রকার লাফিয়েই উঠলো।
- এনিথিং রং?
- না...নাথিং।
বিব্রতবোধ লুকিয়ে দ্রুত নিজের জুসের ক্যানে চুমুক দিলো কিশোরী। তার বুক ধুকধুক করছে, এতটা জোরালোভাবে যে তা গোপনের উদ্দেশ্যে সে খানিকটা সরে বসলো বেঞ্চে। দোহার অবশ্য তার ভেতরে চলা অনুভূতির ঘূর্ণিপাকের প্রতি কোনো খেয়াল নেই। বান্দা নিজের বার্গার শেষ করে অতি আয়েশে শুয়ে পড়লো বেঞ্চে, মাথাটা রাখলো প্রেমিকার কোলে। প্রথমটায় ইতস্ততবোধ করলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে আমারা এলিয়ে বসলো, আগলে নিলো দোহাকে নিজের কোমল উষ্ণতামাঝে।
- একটু ঘুমাই, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
দোহার ক্ষীণ কন্ঠস্বরে আমারা ঝুঁকলো, নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো,
- ইদানিং তোমাকে অনেকটাই ক্লান্ত দেখায়, রাতে কি দেরী করে ঘুমাও বেশি?
- হুম....কাজ....অনেক কাজ....
আনমনে ফিসফিস করলো দোহা, নয়নজোড়া বুজেছে আগেই। আমারা তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে, আর কিছু জিজ্ঞেস করলোনা। মন্থর হাওয়ায় শিরশির করে উঠলো শরীর, এলোমেলো হলো চুলরাশি। আমারা সযত্নে নিজের মোটা মোটা আঙুলের কোমল স্পর্শে গুছিয়ে দিলো দোহার কপালে ছড়িয়ে পরা কেশগুচ্ছ। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের প্রশান্ত মুখচ্ছবির মাঝে একমনে চেয়ে নিজের স্নেহ বুলিয়ে গেলো কিশোরী। মৃদু হাসলো আপনমনে, অনুধাবন করলো, এ তার জীবনের প্রথম প্রেম, প্রথম আবেগ এবং প্রথম.......
ভালোবাসা।
যাকে সবটুকু দিয়ে রক্ষা করতে সে প্রস্তুত।
━━━━━━━━━━━━
কলেজের কার্যক্রম শেষ আরো আধ ঘন্টা আগে। তবে ডরমের উদ্দেশ্যে বেরোতে আজ খানিকটা দেরিই হয়ে গেলো সৌরভের। এর কোনো বিশেষ কারণ নেই। ছাদে বসে আকাশ দেখছিলো সে, একটা মডেল স্কেচ করে নিয়েছে, রুমে ফিরে জলরং ছোঁয়াবে। এক কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অপর হাত পকেটে ভরে সে ফাঁকা করিডোর ধরে নিঃশব্দে এগোচ্ছিল, তবে হঠাৎই থমকে গেলো সামনের দৃশ্য লক্ষ্য করে।
করিডোরের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোহা। পরনের ইউনিফর্মের কোট নেই, আছে শুধু সাদা শার্ট। তাও গলার উপরের বোতামগুলো খোলা, টাই ঢিলে হয়ে নেমেছে একেবারে বুক অবধি। দুহাত প্যান্টের পকেটে ভরে স্থির চেয়ে আছে, গভীর চোখজুড়ে হিমালয়ের অনুভব। সে একা নয়, বিপরীত পাশেই দাঁড়ানো অনিক। যথারীতি চুইংগাম ফোলাতে ব্যস্ত, অপর পাশেই দাঁড়ানো রাজীব, যে দ্বিধাগ্রস্থ, বোধ হয় জানেনা সে এখানে ঠিক কোন কারণে উপস্থিত হয়েছে।
কলেজের কুখ্যাত দলটাকে দেখে সৌরভ খানিক ঘাবড়ে গেল। এরা খুব কমই তার পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে। আজ কি উদ্দেশ্য? বেশি না ভেবে এড়িয়ে যেতে চাইলো সে। দ্রুত পা চালালো, তবে মুহূর্তেই দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়লো অনিক। বাঁকা হেসে বললো,
- কোথায় যাচ্ছেন, স্যার? আপনারই তো অপেক্ষা ছিলো।
- মানে?
বিচলিত হলেও সেটা চেহারায় ফুটে উঠতে দিলোনা সৌরভ। তখনি পিছন থেকে গম্ভীর কন্ঠস্বরটি ধ্বনিত হলো,
- হু গেইভ ইউ পারমিশন টু ড্র মাই গার্ল?
শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত খেলে গেলো সৌরভের। মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সে দ্রুত। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে দোহা, খানিক হিংস্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার উদ্দেশ্যে।
- দোহা দেখ...
- খুব আঁকার শখ তাইনা?
বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ক্রমশ পেছাতে শুরু করলো সৌরভ, এগিয়ে আসতে থাকলো দোহা। যেন শিকারী অনুসরণ করছে নিজের শিকারকে, ফাঁদে ফেলার তাড়নায়। অনিক এবং রাজীব দুপাশে দাঁড়িয়ে মজা নিতে থাকলো দৃশ্যটির। সৌরভ থামে ঠেকে গেলো একেবারে, এক ঝটকায় তার গলায় নিজের হাত জড়িয়ে চেপে ধরলো দোহা, দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
- তুই তাকিয়েছিলি ওর দিকে তাইনা? দশ মিনিট? বিশ মিনিট? এক ঘন্টা? পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এঁকেছিস, কোনো গড়মিল রাখিসনি।
- তুই যেমনটা ভাবছিস তেমনটা না। কয়েকদিন ধরে ওকে মনমরা দেখাচ্ছিল তাই...
- তাই ওকে স্কেচ উপহার দিতে হবে? শি ইজ মাইন ড্যাম ইট! অনলি আই হ্যাভ দ্যা রাইট টু লাভ অওর ব্রেক হার!
সৌরভের মাথা থামে ঠু*কে দিলো দোহা, ব্যথা পাওয়ার মতন জোরালোভাবে, র*ক্তপাত ঘটানোর মতন নয়। কুঁকড়ে গেলো সৌরভ, হিসিয়ে উঠল যন্ত্রণায়।
- ইউ আর আ কমপ্লিট ম্যাডম্যান!
সৌরভের চিৎকারের বিপরীতে তীর্যক হাসলো দোহা, সোনালী সূর্যরশ্মির প্রতিফলনে তা দেখালো ভীষণ অশুভ। ঝুঁকে এলো সে, সৌরভের কানে ফিসফিস করে বললো,
- ম্যাডনেস ইয মাই মিডল নেইম!
অতর্কিতে ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেলো দোহা। একপাশের রেলিংয়ের উপর লাফিয়ে উঠে বসলো। পকেট থেকে বের করলো সিগারেট এবং লাইটার। জ্বালিয়ে নিয়ে দীর্ঘ টানে তামাকের স্বাদ আস্বাদন করে সে তীক্ষ্ণ হুমকিস্বরূপ নজরে তাকালো সৌরভের দিকে।
- পেপার পেন্সিল বের কর, খুব আঁকার শখ তোর তাইনা? দেখি, আমাকে স্কেচ করে দেখা, আমিও দেখি তোর দম আছে কত!
তিরতির করে কাঁপলো সৌরভ, পিছিয়ে গেলো অজান্তেই। প্রথমটায় দ্বিধান্বিত হলো, তারপরই উল্টো ঘুরে গেলো। সজোরে দৌঁড় দিলো, ভাবলো তাকে বুঝি আটকানো হবে। তবে কেউই আটকালো না। ক্রমশ দৌঁড়ের গতি বাড়ালো সৌরভ প্রাণপণে, পিছনে শুনলো অট্টহাসি। দোহা এবং তার দল ব্যাঙ্গাত্মক হাসিতে মেতে উঠেছে, কানে লাগলো তা ভীষণ। চোখে এক ফোঁটা অশ্রু জমলো, যা হাতের উল্টোপিঠে মুছে দ্রুতই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়ে করিডোরের অপর প্রান্তে আড়াল হয়ে গেলো সৌরভ।
সে চলে যেতেই রাজীব কোমরে দুহাত চেপে হাসতে হাসতে জানালো,
- বাবারে বাবা, ভয়ের ঠেলায় একেবারে রেসিং কারের বেগে ছুটলো!
- ভেরি গুড পারফরম্যান্স দোহা।
অনিক বিস্তর হেসে চোখ টিপ দিতেই নিজের হাতের সিগারেটে দুটো টান দিয়ে দোহা বললো,
- আই ওয়ায নট পারফর্মিং।
থমকে গেলো অনিক এবং রাজীব, ম্রিয়মাণ হয়ে এলো উভয়ের হাসি, তাকালো একে অপরের দিকে। পরক্ষণে অনিক কন্ঠ পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করলো,
- মানে? তুই কি সত্যি সত্যি ওই মোটকুটাকে নিয়ে পজেজিভ? লাইক, হোয়াট দ্যা হেল?
- শি ইয মাইন....
মাথা কাত করলো দোহা, পরমুহূর্তেই ভারিক্কি কন্ঠ যুক্ত করলো,
- মাইন টু ডেস্ট্রয়!
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো অনিক। দোহার দিকে এগোতে নিলে হঠাৎই করিডোরের মেঝেতে হড়কে গেলো তার ডান পা। ভারসাম্য হারিয়ে মুহূর্তেই উল্টো হয়ে পড়তে নিলো সে, দোহা এবং রাজীব দুইজনই বেশ দূরত্বে আছে, বাঁচাতে আসা অসম্ভব। তবে এরপরও কোনো যন্ত্রণা অনুভব না করে অনিক টের পেলো তার কোমর এবং উদরে একজোড়া শক্তিশালী বাহু জড়িয়ে গিয়েছে। তার কোনো বন্ধুর নয় নিশ্চিত। ঝট করে চোখ মেলতেই বরফে পরিণত হলো অনিক। তার উপর ঝুঁকে আছে একটি চাপা বর্ণের মুখ।
জারা। ছেলেসুলভ বেশভূষার মেয়েটি নির্লিপ্ত চেয়ে আছে, দুবাহুর মাঝখানে অনিককে জড়িয়ে ঠেকিয়েছে পতন। অজান্তেই তার বাম বাহুখানি আঁকড়ে ধরে রেখেছে অনিক, ভারসাম্য পূরণে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো সে। ঝুঁকে থাকায় মেয়েটির কাঁধসমান চুলের গোছা গড়িয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে অনিকের গাল। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো কিশোর।
- হোয়াই দিস কলাভেড়ি কলাভেড়ি ডি~
- হুম, হোয়াই দিস কলাভেড়ি কলাভেড়ি ডি~
দোহা এবং রাজীবের সম্মিলিত কন্ঠস্বরে সহসাই কেঁপে উঠলো অনিক। তীব্র দৃষ্টিতে বন্ধুদের ভ্যাকভ্যাক করে হাসতে থাকা অবয়বে তাকিয়ে সে ঝটকা দিয়ে উঠলো,
- ডিযগাস্টিং টাচ্!
নির্বিকার জারা তৎক্ষণাৎ নিজের হাতের বাঁধন ছেড়ে দিলো, এক লহমায় অনিক ধপাস করে পড়লো মাটিতে। ঝনঝন করে উঠলো শরীর, কুঁকড়ে গেলো ব্যথায়। অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো দোহা আর রাজীব, তাদের গান গেলো গোল্লায়। যেন আবর্জনা স্পর্শ করেছে এমন ভঙ্গিতে নিজের দুহাত ঝেড়ে নিতে নিতে জারা বিড়বিড় করলো,
- সরি, ভুলে ডাস্টবিন ছুঁয়ে ফেলেছি।
অনিককে অতিমাত্রায় হতবিহ্বল করে দিয়ে জারা উল্টো ঘুরে গেলো, ঠিক যেমন করে হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিল, তেমন করেই অদৃশ্য হয়ে গেলো পাশের করিডোরে। পিছনে রেখে গেলো রাগ এবং লজ্জায় টুকটুকে হয়ে ওঠা অনিক এবং তার চিৎকারকে।
- কালোজিরা কোথাকার!
━━━━━━━━━━━━
পরদিন।
সময়টা পড়ন্ত বিকাল। ছেলেমেয়েরা সকলে ব্যস্ত ডরমের হলরুমে। আজ বিশেষ খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাতে তেমন আগ্রহ না পেয়ে আমারা বাইরে বেরিয়েছে। উহু, আগ্রহ পায়নি ঠিক তা নয়। বরং, খুঁজতে বেরিয়েছে। দোহাকে। আজ সকাল থেকে কলেজের ক্লাসে কিংবা এখন হলে, কোথাও ছেলেটাকে একনজরও দেখেনি। আনমনে তাই চিন্তা হচ্ছে তার। দোহা ঠিক আছে তো? ইতস্তত পদক্ষেপেই সে এগোলো মেইল ডরমের উদ্দেশ্যে, রিসিপশনে বললে দেখা করা সম্ভব কিছু সময়ের জন্য। দ্রুত এগিয়ে সে বারান্দা জুড়ে ফিমেইল জোন পেরিয়ে মেইল জোনে আসতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। মনে হলো যেন হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে হঠাৎ করেই।
নির্জন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে দোহা, তার বুকে মাথা রেখে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে কলেজের বিখ্যাত রমণী রাহা। এমন এক গভীর আলিঙ্গন যেন ছেড়ে দিলেই তলিয়ে যাবে উভয়ে শূন্যতায়। আমারা ডাগর ডাগর নয়ন মেলে দেখলো, কিভাবে ক্রমশ আঁকড়ে বসছে রাহার বাহু তার প্রিয়তমের অঙ্গজুড়ে।
- দোহা....
অনুভব করার আগেই আমারার অতীব ক্ষীণ কন্ঠ বেয়ে নির্গত হলো সম্বোধনটি। কেঁপে উঠলো যুগল, ঝট করে ফিরে তাকালো দোহা। আমারাকে দেখেই চেহারায় ফুটলো ভীষণ আতঙ্ক।
- নোলক....
উভয়ের দৃষ্টি মিলিত হলো এক অব্যক্ত অনুভবে......
ধোঁকার অনুভব।
—চলবে—