ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১০ম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১০

[ অ্যালার্ট: পর্বের প্রয়োজনে কিছু স্ট্রং ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করা হয়েছে। ]

পর্ব ১০: [ অপহরণ ]

━━━━━━━━━━━━

বারান্দা ধরে ডরমেটরির হলরুমের দিকে এগোচ্ছে দোহা। আজ সকালে কলেজে যায়নি, ব্যান্ডদলের প্র্যাকটিস ছিলো জরূরী। সেখানেই যেতে হয়েছে। গতকাল রাতে ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছে প্রায় দুটো অবধি। তার আগে আবার টিফিন ডেলিভারির দায়িত্বও ছিলো। সব মিলিয়ে তার শরীরের অবস্থা নাজেহাল। সপ্তাহ দুয়েক ধরে হাড়খাটুনির কারণে চেহারা জেল্লা হারিয়েছে, চোখের নিচে কালচে দাগ পড়তে আরম্ভ করেছে। কোনোমতে দশটা মিনিট চোখ বুজেই সে ভালোমত গোসল সেরে ক্রিম লাগিয়ে তবে বেরিয়েছে। থেকে থেকে চোখ বুঁজে আসছে, আঙুলের ডগায় কচলে নিয়ে আটকে রেখেছে ক্লান্তিকে। হঠাৎই তার পদক্ষেপ থমকে গেলো সামনে উপস্থিত মেয়েটিকে লক্ষ্য করে। দুহাত পিছনে বেঁধে স্থির তাকিয়ে আছে রাহা, দৃষ্টি ঘুরপাক খাচ্ছে দোহার লম্বাটে অবয়বজুড়ে। কোনো সাধারণ দৃষ্টিপাত নয়, বরং এক গভীর আকাঙ্ক্ষা মাখানো অনুভব তা। তীর্যক হাসলো দোহা, দুবাহু বুকের উপর বেঁধে মাথা কাত করে সেই অদ্ভুতুড়ে দৃষ্টির মোকাবেলা করে শুধালো,

- মেইল ডরমে আসমানের পরীর আগমন? ব্যাপার কি? স্বর্গের টিকিট কি ইতোমধ্যে কেটে ফেললাম?

রাহা হাসলো বিস্তর, নিঃশব্দে। ছিপছিপে লাস্যময়ী শরীর তার এগিয়ে এলো, দোহার নিকটে, যেন হুমকিতে ফেলতে চাইছে। তবে পিছপা হলোনা কিশোর, ভ্রু উঁচু করে স্থির তাকিয়ে রইলো। রাহা বিড়বিড় করলো,

- স্বর্গে না পারি, চাইলে নরকে টেনে নিয়ে যেতে পারি। চাও কি অনুসরণ করতে?

শব্দ করে হেসে উঠলো দোহা, হাতের উল্টোপিঠে অধরজোড়া আড়াল করে জানালো,

- নারীজাতি বেহায়া শুনেছিলাম, আজ নিজের চোখে দেখেও নিলাম। পায়ে ঠেলে অবহেলা করা না অবধি তারা অন্তরের চাহিদা বোঝেনা। দে লাইক ব্যাড বয়ে' য!

- আমিও শুনেছিলাম পুরুষজাতি ঘাড়ত্যাড়া, অত্যধিক ইগোয়েস্টিক। ব্যাড বয় হলে তো কথাই নেই!

দোহা এক পা দূরে সরে দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো রাহাকে, স্কিন টাইট জিন্স এবং টপ পরিধানে, রানওয়ে মডেলের মতন দেখাচ্ছে কিশোরীকে। আপনমনে স্মিত হেসে দোহা বিড়বিড় করলো,

- হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম মি প্রিটি?

রাহা মুখ খুলে কিছু বলতেই যাচ্ছিলো ঠিক তখনি বারান্দার এক কোণা থেকে বেরিয়ে আসা একটা কীট নজরে এলো তার। গাঢ় খয়েরী বর্ণের পতঙ্গটি দেখেই ঘৃণা এবং ভয়ে সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো রাহার।

- তে.... তেলাপোকা!

দোহা তাকানোর সময়টুকু অবধি পেলোনা, এর আগেই লাফিয়ে উঠে তাকে জাপটে ধরলো রাহা, মুখ গুঁজে দিলো শক্ত বুকে। হঠাৎ ক্রিয়ায় দোহার সমস্ত শরীর স্থবির হয়ে পড়লো, তার মস্তিষ্ক বিশ্লেষণে অক্ষম। চকিতে মাথা কাত করে একপাশে পিলপিল করে যেতে থাকা তেলাপোকাটাকে এক পা উঁচিয়ে পিষ্ট করে ফেললো সে। তাকে দ্বিগুণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরলো রাহা, থরথর করে কাঁপতে থাকলো। ইনসেক্ট ফোবিয়া আছে মেয়েটির। হাস্যকর শোনালেও ছোটখাটো কীটপতঙ্গ তার ভীষণ ভয়ের কারণ। ব্যাপারটা অনুধাবন করলো দোহা, স্থির থাকলো।

- ইটস ফাইন, আর কোনো তেলাপোকা নেই।

- না না না.... সো ডিযগাস্টিং!

সজোরে দোহাকে চেপে ধরে নিজের মুখ তার বুকে গুঁজে চোখ বুঁজে কাঁপতে থাকলো রাহা। ইতস্তত করলো দোহা, সরিয়ে দেবে নাকি আগলে নেবে এই অন্তর্দ্বন্দ্ব চললো অভ্যন্তরে। কম্পিত একটি হাত তুললো সে রাহার কাঁধের উদ্দেশ্যে, ঠিক তখনি....

- দোহা!

শিরদাঁড়া বেয়ে যেন তড়িৎ খেলে গেলো দোহার। এক ঝটকায় মুখ তুলে তাকালো। বারান্দার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আমারা। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো গোটা পৃথিবী বুঝে ঘূর্ণন বন্ধ করে থমকে গিয়েছে। নীরব দৃষ্টি বিনিময় হলো উভয়ের মাঝে। আমারার গোলগাল চেহারায় ফুটে উঠলো মহাবিস্ময়, কৌতূহল, যাতনা এবং আশঙ্কার এক মিশ্র অনুভূতি। ডাগর ডাগর আঁখিজোড়া প্রসারিত হলো অব্যক্ত আবেগে।

আর সহ্য করতে পারলোনা দোহা। এক ধাক্কায় নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো রাহাকে। মেয়েটি ভড়কে গিয়ে দোহার উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে এবং আমারার উপস্থিতি টের পেয়ে থমকে গেলো। টানটান শিরদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে আছে আলুথালু কিশোরী, দুহাত মুষ্টিবদ্ধ অজানা তাড়নায়। ছুটে গেলো দোহা, আমারার একটি হাত পাকড়াও করলো তৎক্ষণাৎ,

- আই... আই ক্যান এক্সপ্লেইন!

একনজর রাহা এবং পরক্ষণে দোহার দিকে তাকালো আমারা। উভয়ের মনে হলো দৃশ্যটি ঘটবে সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের মতন। নিজের হাত ছাড়িয়ে আমারা হয় ঠাটিয়ে দোহাকে চড় দেবে, নাহলে হনহন করে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু উভয়কে হতবিহ্বল করে দিয়ে আমারা তেমন কিছুই করলোনা, সুস্থির নজরে দোহাকে দেখলো, বিড়বিড় করলো,

- বলো, আমি শুনছি।

বিস্মিত নয়নে চেয়ে থাকলো দোহা। হুট করেই তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে তার ভেতরের সবকিছু। যদিও হিসাব মতে সে একপ্রকার নির্দোষ, তবুও আমারার নির্ভার আচরণ তাকে অবাক করেছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে মেয়েরা অধিক ভুল বুঝে থাকে, এক দৃশ্য কিংবা শোনা কথার বদৌলতে প্রেমিককে বিচার করে থাকে। তবে আমারা ব্যাতিক্রম। দোহাকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমারা কৌতূহলী হয়ে মাথা কাত করলো, তাতে দোহার হুশ ফিরলো। নিজের আতঙ্কিত হৃদস্পন্দন দমিয়ে সে দ্রুতকন্ঠে বলতে থাকলো,

- ট্রাস্ট মি, ওখানে একটা তেলাপোকা ছিল, সেটা দেখে রাহা ভয় পেয়ে যায় আর.... আই সোয়্যার আই ডিড নট ইভেন হাগ হার ব্যাক প্রিন্সেস। ও ভয় পেয়েছিল তাই আমি... আই ওয়ায কনফিউযড!

আমারার হাত ধরে টেনে নিয়ে দোহা মাটিতে পিষ্ট হয়ে থাকা তেলাপোকাকে দেখালো প্রমাণস্বরূপ। তর্জনী উঁচিয়ে বললো,

- আমি একটুও মিথ্যা বলছিনা, বানিয়েও বলছিনা বিশ্বাস করো, প্রিন্সেস।

আমারা মাথা তুলে একপাশে দাঁড়ানো রাহাকে দেখলো। যার অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে সে ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছে। আমারার দৃষ্টি লক্ষ্য করে সে মৃদু হাসলো। আঙুলের ডগায় লম্বাটে চুল গুছিয়ে নিয়ে খানিক উপহাসি কন্ঠে জানালো,

- ও সত্যি বলছে। আমার এত ঠেকা পড়েনি কারো সেকেন্ড হ্যান্ডকে ব্যবহার করবো।

- আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

ঠান্ডা কন্ঠে জবাব দিলো আমারা,তাতে থতমত খেয়ে চুপ করে গেলো রাহা। তার সঙ্গে এমন স্বরে কথা বলার কেউ নেই বললেই চলে। ব্যাপারটা তাই তাকে বেশ বিব্রত করলো।

- হেল!

মিনমিন করে উল্টোপথে চললো সে, গটগট করে হেঁটে মুহূর্তেই আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমানার। রীতিমত নিঃশ্বাসরুদ্ধ হয়ে থাকা দোহার দিকে ফিরলো আমারা। তার শান্ত মুখচ্ছবি নজরে পড়তেই দোহা ক্ষীণ কন্ঠে শুধালো,

- তুম...তুমি কিছু মনে করনি?

মৃদু হাসলো আমারা, দুহাতের মাঝে দোহার হাত দুখানা তুলে নিয়ে স্পর্শ বুলিয়ে জানালো,

- একটা সম্পর্কের মূল ভিত্তি কি জানো? বিশ্বাস। যেদিন বিশ্বাস ম*রে যায়, সেদিন সম্পর্কের আর কোনো অস্তিত্ব থাকেনা।

নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো দোহা, স্থবির হলো তার হৃদযন্ত্র। মাথা তুলে তার দৃষ্টিতে প্রগাঢ় আবেগ মিলিয়ে আমারা নিজের বক্তব্যে যুক্ত করলো,

- প্রেমের অনেকগুলো পর্যায় থাকে। থাকে বেশ কয়েকটি খুঁটি যা সম্পর্ককে হাজারো ঝড় ঝাঁপটায় আগলে রাখে। তার মধ্যে একটি হলো সৎ কথপোকথন। আমি যদি তোমাকে কথা বলার সুযোগ না দেই, নিজেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ না দেই তবে আমি কিসের প্রেমিকা বলো? আমি সুযোগ দিলাম এবং বিশ্বাস করলাম। দ্যা এন্ড অব ক্রাইসিস।

এতক্ষণে নিজের অভ্যন্তরে আটকে রাখা নিঃশ্বাসটুকু ফেললো দোহা, স্বস্তির নিঃশ্বাস। অজান্তেই দুবাহু বাড়িয়ে আমারার কাঁধ ছুঁয়ে তাকে টেনে নিলো নিজের বুকের মাঝে। প্রথমটায় অবাক হলেও পরমুহুর্তে প্রেমিকা তার ভারী কোমল দুহাতে আঁকড়ে ধরলো তাকে, বুকে মুখ গুঁজে প্রাণভরে গ্রহণ করলো অস্তিত্বে জড়ানো জেসমিনের সুবাস। দোহা আমারার কাঁধসমান চুলের মাঝে আঙুল বুলিয়ে তাকে নিজের বুকে আরেকটু জোরে চেপে ধরলো, ঝুঁকে নাক ছুঁয়ে দিলো তার মাথার পাশে, প্রশ্বাস টানলো। উভয়ে একে অপরের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারছে দারুণভাবে।

- ইউ আর আ ম্যাড ওয়ান, আ ক্রেজি ওয়ান প্রিন্সেস....

কানের কাছে দোহার তপ্ত ফিসফিসে আমারা খানিক শিউরে উঠলো, পরক্ষণে ক্ষীণ হেসে দোহার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিলো, যেন হারিয়ে ফেললো আপন অস্তিত্বকে। দোহা তার মাথায় চিবুক ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলো অদূরে, বিকালের আকাশ বেয়ে ডানা মেলে ঘরে ফিরতে থাকা শালিকের জোড়ার দিকে।

যেদিন সত্যিই ধোঁকা দেবে, সেদিনও কি এই এক কথাই বলবে আমারা?

আর ভাবতে পারলোনা দোহা,মুখ নামিয়ে আমারার চুলে ডুবিয়ে দিলো নিজের নাক। বুঁজে নিলো নয়ন।

。

。

。

আজকে ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ। তাই হাতের টুকটাক কাজ সারতে আমারা আগেভাগেই বেরিয়েছে। সে এসেছে সেন্ট পিটার্সবার্গের থেকে মিনিট বিশেক হেঁটে যাওয়া দূরত্বের পথে। এখানে গলির ভেতর একটি ছোট লাইব্রেরি আছে। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। কলেজ জীবনের প্রথম প্রথম সে নিজের অধিকাংশ সময় এখানেই কাটিয়েছে, এখনো কাটায় পড়াশোনা এবং দোহার সঙ্গে অতিবাহিত করা সময় বাদে। আজ সে এসেছে নতুন কিছু বই নিতে। গত সপ্তাহে যেগুলো নিয়েছিলো, সেগুলো পড়া শেষ ইতোমধ্যেই। লাইব্রেরিয়ান তাকে চিনে গিয়েছে। তাকে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমারা আগের বই ফেরত দিয়ে সারে সারে সাজিয়ে রাখা তাক থেকে নতুন কিছু খুঁজতে থাকলো। এই চাপা স্থান, বাতাসজুড়ে নতুন পুরাতন কাগজের ঘ্রাণ, গুমোটমাখা সাহিত্য এবং সৃষ্টিশীল পরিবেশ তার খুব পছন্দের। নিরালায় নিভৃতে কল্পনার জগতে কাটানো এক টুকরো দূর্লভ সময়।

মোটা মোটা মলাটের বইগুলোতে আঙুল বুলিয়ে নিলো আমারা, সামান্য ধূলো পড়েছে অযত্নে। দুটো ইংরেজী নভেলের বই টেনে ফু দিয়ে ধূলো ঝেড়ে ফ্ল্যাপ পড়লো সে, একটি পছন্দ হলো, অপরটি হলোনা। পছন্দের বইটি নিয়ে ফিরে এলো, আরো দুইটি বই সংগ্রহ করে আধ ঘণ্টা বাদে সে লাইব্রেরিয়ানের কাছে ফিরলো। বইগুলো কাগজের প্যাকেটে নিয়ে সে যখন বাইরে বেরোলো তখন টুর্নামেন্টের ম্যাচের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। তাই তাড়াহুড়ো করেই রাস্তা ধরে এগোলো। গলিটি ততক্ষণে নির্জনপ্রায়। এমনিতেই লাইব্রেরিপাড়ায় মানুষের আগমন ঘটে নেহায়েত কমই। আমারা দ্রুত এগোলো, আজকে দোহার খেলা দেখতে সে ভীষণ উৎসুক হয়ে আছে। টিম ক্যাপ্টেন না হলেও দলের স্ট্রাইকার সে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। বন্ধু অনিক মিডফিল্ডার। উভয়েই নিজেদের কৌশল এবং দক্ষতার জন্য জনপ্রিয়।

- এক্সকিউজ মি?

আনমনে ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলো আমারা, অচেনা কন্ঠস্বরটি তাকে থমকাতে বাধ্য করলো। চট করে ফিরে তাকালো। দেখতে পেলো একজন ছেলেকে। হুডির অন্তরালে থাকা তার চেহারা আমারাকে হতভম্ব করে দিলো।

রাশেদ!

এই ছেলে এখানে কি করছে?

প্রশ্নের উত্তর আমারা পেলো সহসাই। পিছন থেকে কেউ তার মুখে একটি রুমাল চেপে ধরলো। আর যাই হোক, এতটাও ঔদ্ধত্য কিশোরী আশা করেনি। ছটফট করতে থাকলো সে, হাতের বই ধপাস করে পড়লো মাটিতে। রুমালে ক্লোরোফর্ম মেশানো আছে, বুঝতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা। তার ভারী শরীর একসঙ্গে দুজন চেপে ধরায় নিজেকে রক্ষায় ব্যর্থতা বরণ করতে হলো। প্রসারিত নয়ন মেলে রাশেদকে দেখলো আমারা, ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি ক্রমশ। ছেলেটা দাঁড়িয়ে তীর্যক হাসছে, উপভোগ করছে আমারার অবস্থা। এগিয়ে এসে হঠাৎ ম্রিয়মাণ হয়ে আসতে থাকা কিশোরীর গাল ছুঁয়ে দিলো সে, ফিসফিস করলো,

- স্লিপ ওয়েল, ডার্লিং বার্ড.....

কন্ঠটা মিইয়ে এলো, সঙ্গে আমারার দৃষ্টিও। কয়েক মুহূর্তের মাঝে তার শরীর এলিয়ে গেলো। দুজন জাপটে ধরেও পারলোনা,ধপাস করে বসে পড়লো রাস্তার উপরেই। অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণ করলো একজন, অপরজন হিসিয়ে উঠে বললো,

- শালী আস্ত একটা আটার বস্তা!

- আমি এই জলহস্তীকে টেনে তুলতে পারবো না, মাফ চাই দোয়াও চাই!

সঙ্গীদের কথায় খিলখিল করে হাসলো রাশেদ। উবু হয়ে বসে দৃষ্টি ফেললো মাটিতে উপুড় হয়ে থাকা আমারার নিস্তেজ অবয়বে, বিস্তর হেসে বিড়বিড় করলো,

- কে কার আব্বু, এবার এই রাশেদ তোদের বুঝিয়ে ছাড়বে বাই*** দের দল!

━━━━━━━━━━

সন্ধ্যা ছয়টা বেজে ত্রিশ মিনিট। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ শেষে সবেমাত্র ডরমে ফিরেছে দোহা এবং অনিক। নিজেদের রুমে ঢুকেই বিছানায় ধপাস করে পড়লো দোহা। অপরদিকে অনিক তোয়ালে তুলে শরীরের ঘাম মুছতে থাকলো, ঠান্ডা ঠান্ডা গোসল দিতে হবে একটা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ম্যাচ ড্র হয়েছে, তাই নিয়ে বেজায় নারাজ সবাই। পরবর্তী ম্যাচ না জিতলে সেমিফাইনালের আশায় পানি। তাই টিম কিছুটা চিন্তিত বটে। কালকেই প্র্যাকটিস সেশন রেখেছে ক্যাপ্টেন আর স্পোর্টস ট্রেনার। সব মিলিয়ে মেজাজ চড়ে আছে সবার।

- বেয়াদব লম্বুটা যদি মাঝখানে বাঁধ না সাধতো, গোল তো প্রায় হয়েই গিয়েছিল! শিট!

- মনে করাস না। মনে পড়লেই রাগে হাত পা কাঁপছে আমার!

অনিকের কথার উত্তরে বালিশে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করলো দোহা। রহমানপুত্র নিজের পরনের জার্সি একটানে খুলে নিয়ে উদাম শরীরে তোয়ালে ছুঁয়ে দিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,

- বাই দ্যা ওয়ে, তোর গার্লফ্রেন্ডকে তো দেখলাম না। গ্যালারির সামনের সারিতে বসে চিৎকার করার দরকার ছিলো। তাহলে হয়তো তুই গোল দিতে পারতি!

জ্বালাতনে দ্বিতীয় দফায় গুঙিয়ে উঠলো দোহা, পা তার টনটন করছে ভীষণ।

- কোন চুলোয় গেছে তা আমি কি জানি? ছাইয়ের তলে খুঁজে দেখ! আর হোয়াট ইয মাই গার্লফ্রেন্ড? ইটস ইওর টার্গেট!

- হাহাহা, আরে আরে রাগ করিস কেনো আমাদের আদর্শ প্রেমিক মজনু?

- তোর পাওয়ার পয়েন্টে কিক মে*রে বংশের বাত্তি নিভিয়ে দিতে পারলে আত্মায় শান্তি পেতাম!

- ওরে শালা! মেরি বিল্লি, মুঝিকো মেয়াও? দাঁড়া তোকে আমি উ....আহহহহহ!

অনিকের হঠাৎ চিৎকারে দোহা বালিশ থেকে মুখ তুলে লাফিয়ে উঠলো। সত্যি সত্যি কেউ পয়েন্টে হিট করে দিলো নাকি? তবে সামনের দৃশ্য তাকে বিনোদিত করার বদলে ভীষণ অবাক করলো। তাদের রুমের দরজাটা হাট করে খোলা, নিশ্চিত ব্যাটা অনিক ঢোকার সময় আটকায়নি বরাবরের মতন। রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জারা। একটা ফ্লানেলের শার্ট আর রিপ' ড জিন্স পরনে। তবে আজ বরাবরের মতন ঘাড়ে ঝুলতে থাকা হেডফোন নেই। অনিক বেচারা উদাম শরীরে তোয়ালে চেপে সম্ভ্রম হারানোর ভঙ্গিতে দেয়ালের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গিয়েছে, শর্টস পরিবর্তন করে ট্রাউজারে এক পা গলিয়েছিল, সেটি সেভাবেই ঝুলছে। বিব্রতকর এক অবস্থা। অনিকের চেহারা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে, ক্রোধ এবং লজ্জায়। তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই জারার। সে নির্বিকার, নির্লিপ্ত, অটল পর্বত।

- নির্লজ্জ্ব কালোজিরার ঘরের কালোজিরা! বাপ মা শেখায়নি রুমে নক করে ঢুকতে হয়? আরে নক তো বাদ দিলাম, তুই আমাদের রুমে আসবিই বা কেনো? সাইকো গার্ল!

অনিকের চেঁচামেচিতে নিজের কানে আঙুল চালিয়ে জারা বলে বসলো,

- আমারও শখ উঠেনি ময়লার ভাগাড়ে হাত ভরার। প্যান্ট খুলে যাচ্ছে....

- ইয়া!

অনিক তোয়ালেটা নামিয়ে এবার নিজের কোমরে বেঁধে নিলো, ধুকপুক করতে থাকা বুকে হাত বেঁধে কর্কশ ক্রোধান্বিত কন্ঠে আরেক দফায় ধমক ছুঁড়লো,

- এক্ষণ বের হ তুই বেশরম!

- আমার ডাস্টবিনের গঠন দেখার কোনো শখ নেই। শুঁটকিমাছের শরীরে আর কি আসে যায়?

দোহা ফিক করে হেসে ফেললো। অনিকের তীব্র ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে সে শব্দটুকু জোরপূর্বক গিলে ফেললো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হেড়ে গলায় সে কিছু বলতে যাচ্ছিলো তবে তার আগেই তার উপর সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে জারা ফিরে তাকালো দোহার দিকে। শীতল কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,

- মধু... অ্যাহেম! আমারা কোথায়?

দোহার হাসি ফিকে হয়ে এলো। মাথা কাত করে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বললো,

- আমি কি আদম ব্যবসায়ী?

- নো, বাট হার বয়ফ্রেন্ড।

স্থির তাকিয়ে রইলো সে, জারার নির্লিপ্ত অথচ কঠোর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে। তারপরই একটি নিঃশ্বাস ফেলে কপালে আঙুল ঘষে নজর ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করলো,

- আমি জানিনা। আমাদের সকালের পর থেকে আর কথা হয়নি।

- ওয়েল ডান। তোর গার্লফ্রেন্ড তোর ম্যাচ দেখতে যায়নি এতেও তোর একটুও সন্দেহ হয়নি। বেশ তো।

জারার কথায় তেঁতে উঠলো দোহা, সহসাই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অশুভ ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো,

- আর তুই কি? ওর বেবিসিটার? পাগলা কুত্তার মতন ছেলেদের ডরমে ছুটে এসেছিস নালিশ জানাতে? আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার তুই কে? হু দ্যা হেল আর ইউ?

দোহাকে পাল্টা তীব্র দৃষ্টিতে মোকাবেলা করলো জারা। একই উত্তাপ জড়ানো কন্ঠে জবাব দিলো,

- অ্যান্ড হু দ্যা হেল আর ইউ টু জাজ মি? আ ড্যাম উইমেনাইজার!

- তুই তোর লিমিট ক্রস করে যাচ্ছিস জারা! মেয়ে বলে আমি কিন্তু ছেড়ে দেবোনা!

উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঝুঁকে এলো দোহা, জারা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বললো,

- সেই বিকাল ৩ টায় বেরিয়েছে লাইব্রেরিতে যাওয়ার জন্য। এখন বাজে সাড়ে ছয়টা। সাড়ে তিনটা ঘণ্টা পেরিয়ে গেলো। সত্যিকার পুরুষ হলে ঠিকই খোঁজ নিতি মেয়েটা গিয়েছে কোথায়!

শরীর স্থবির হয়ে গেলো দোহার। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো জারার দিকে। মেয়েটা কখনোই তাদের সঙ্গে খুব বেশি বিতর্কে জড়ায়নি, বলতে গেলে এড়িয়ে গিয়েছে সবার মতন। তবে আজ সে যখন ডরমের রুম অবধি ছুটে এসেছে, তখন ব্যাপারটা গুরুতরই। একটু নরম হলো দোহা,

- ও এখনো ফেরেনি?

- না।

কাটকাট জবাব জারার। অনিক বেচারা ততক্ষণে বাথরুম থেকে পোশাক বদলে এসেছে কোনোমতে। বর্তমানে বিস্মিত হয়ে দৃশ্য দেখছে। দোহা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,

- হয়ত বাসায় গিয়েছে।

- যায়নি।

- তুই কিভাবে জানলি?

- ওর মামণি ফোন করেছিল একটু আগে, ফোনটা রুমেই ফেলে গিয়েছে।

এবার দোহা কিছুটা চিন্তিত হলো। অনিকের দিকে ফিরে কিছু উচ্চারণ করতে যাচ্ছিলো ঠিক তখনি টেবিলের উপর রেখে যাওয়া তার স্মার্টফোনটা বেজে উঠলো। তৎক্ষণাৎ সেটি পাকড়াও করে অচেনা নাম্বার দেখতেই ভ্রু কুঁচকে এলো দোহার। রিসিভ করলো,

- হ্যালো?

- ভালো আছেন....আব্বু?

কণ্ঠটি দোহার শিরদাঁড়ায় এক শীতল শিহরণ খেলিয়ে দিলো। ফোনে চেপে বসলো তার আঙুল। অজান্তেই দাঁতে দাঁত ঘষে সে বিড়বিড় করলো,

- রাশেদের বাচ্চা!

বিস্তর এক হাসির শব্দ ভেসে এলো। দোহার শরীর রাগে রিরি করে উঠলো। খেঁকিয়ে উঠলো সে,

- মেজাজের গোঁড়ায় আগুন! শালা মাথা নষ্ট করবিনা নাহলে এসে যেখানে আছিস সেখানে পুঁ*তে দেবো!

- আয়, প্লীজ আয়। সাথে তোর ভোটকা প্রেমিকাকেও পুঁ*তে দিস, জলদি আয়!

বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো দোহা, মনে হলো বুকের ভেতর বুঝি এক তড়িৎ খেলে গিয়েছে। তীব্র এক টান, বিধূরের বিচরণ। তারপরই অগ্ন্যুৎপাত হলো আগ্রাসনের।

- ইউ সন অব আ বিচ! টাচ্ হার.... অ্যান্ড আই উইল রি*প ইওর হা*র্ট আউট!

ফোনটা আছাড়ই দিচ্ছিলো দোহা এক প্রকার, তবে অনিক তাকে ঠেকালো। দ্রুত লাউডস্পিকার অন করলো সেটি নিজের হাতে কেড়ে নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হাসির ঝংকার খেলে গেলো রুমজুড়ে।

- অনিক আব্বাকে বলিস, হিম্মত থাকলে যেন নাটপাড়ায় এসে আমার গ্যাংয়ের সামনে থেকে শো ডাউন দিয়ে ওই ভুটকিটাকে নিয়ে যায়! বেচারী ছটফট করছে, তেলভরা শরীরে কি আর ভয় সয়? নাহলে ছেড়েও দিতে পারিস, আমার পালতুগুলো ভীষণ মজেছে ভুটকিতে, তুলতুলে শরীর, জড়িয়ে ধরলে নাকি হেবি আরাম! তুই একা একা মজা নিলে হবে শুধু? আমরাও নাহয় একটু ভাগ বসালাম?

- ফা*কিং বাস্টার্ড! তোর আব্বাকে আসসালামু আলাইকুম দিয়ে যদি তোকে জানাজা ছাড়া ক*বরে না পুঁ*তেছি তাহলে আমার নামও দোহা ইসলাম নয়! ওর গায়ে একটা আঙুলের ছোঁয়া লাগলে আমি তোর দশটা আঙুল ভে*ঙে রাস্তার কুত্তাকে খাওয়াবো মাদা*ফা*কার!

দোহার সমস্ত চেহারা টকটকে হয়ে উঠেছে, এর আগে তাকে এতটা রেগে যেতে এবং এমন অশ্রাব্য শব্দের ব্যবহার করতে কেউই দেখেনি। এমনকি অনিকও নয়। রাশেদের হাসির সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে গিয়েছে ঠিকই, তবে দোহার মাঝে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই। এক হাতে মাথার চুল টেনে ধরেছে সে, একনাগাড়ে জপে যাচ্ছে উদ্ভ্রান্ত স্বরে,

- শিট শিট শিট শিট.....

অনিক নিজেকে স্থির রাখলো। অন্যান্য সময় উল্টোটা ঘটে। দোহা শান্ত থাকে, সে রেগে যায়। তবে আজ যখন দোহাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, তখন তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। ফোন রেখে দিয়ে সে বললো,

- আমি নিশ্চিত ওই বাস্টার্ড একদম প্ল্যান করে মাঠে নেমেছে। নাটপাড়ায় যাওয়া হবে আ*ত্মাহু*তি দেয়ার সামিল।

তীব্র দৃষ্টিতে অনিককে দেখলো দোহা, তারপর হঠাৎই তার কলার চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো,

- হাতে চুড়ি পরে বসে থাক আহাম্মক! তুই জানিস না ওই জানোয়ারটা মরিয়ম আপুর সাথে কি করেছিলো? থাক তুই তোর সু*ইসা*ইডের ভয় নিয়ে, আমি গেলাম!

এক টানে জার্সি খুলে দোহা কোনোমতে জিন্স এবং টি শার্ট গায়ে জড়ালো। আলমারি থেকে গ্লাভস এবং নাকেলস সেট পকেটে গুঁজে সে হনহন করে বাইরে বেরিয়ে গেলো। স্থির চেয়ে রইলো অনিক, হাত চেপে বসলো নিজের পোশাকে। রুমের এক কোণায় তখনো দাঁড়িয়ে আছে জারা, একনজর দৃষ্টি বিনিময় হলো উভয়ের। তারপরই জারাও নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো। অনিক হলফ করে বলতে পারবে, জারা দোহাকে অনুসরণ করেছে।

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন