#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১১
[ ভায়ো*লেন্স অ্যান্ড ট*ক্সিক বিহেভিয়ার অ্যালার্ট ]
পর্ব ১১: [ আগ্রাসন ]- (প্রথমাংশ)
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
এসপি শাহেদ এবং দুজন কনস্টেবল পুলিশের গাড়িতে করে ফিরছেন থানায়। সন্ধ্যা নেমেছে বেশ খানিক আগে। ফিল্ড রিপোর্ট মাথায় সাজিয়ে নিচ্ছেন এসপি। ড্রাইভার তার হাউকাউ এর কারণে বেশ ধীরগতিতে যাচ্ছে। তার উপর সড়কের যে যানজট। মেজাজ খিঁচে আছে তাই এসপির। আপনমনে বেশ খানিক গালমন্দ করলেন নিজের শালাকে। অদ্ভুত হলেও সত্য বউয়ের ভাইটিকে তিনি একটুও সহ্য করতে পারেন না। তাই রনে বনে জনে জঙ্গলে যেকোনো পরিস্থিতিতে বিরক্ত হলেই তাকে গালমন্দ করে নিজের মনের জেদ মেটান তিনি। ব্যাপক তিরিক্ষি মেজাজে তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলেন, গুমোট বাঁধা আকাশের দিকে। ঠিক তখনি ঘটলো অদ্ভুত ঘটনাটি।
তার গাড়ির ঠিক পাশ দিয়েই বিদ্যুতের গতিতে কিছু চলে গেলো। প্রথমটায় এসপি শাহেদ নিজের চোখের ভুল ভাবলেন। হয়ত আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তাই দেখেছেন। তবে তার হিতাহিতজ্ঞানকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়ে তড়িৎ গতিতে একদম গাড়ির গা ঘেঁষে কিছু চলে গেলো। এবার উনি বুঝলেন, ওগুলো আসলে সাইকেল! কিন্তু সাইকেলের এত গতি? তাও আবার মূলসড়কে বিমান বাহিনীর জেট ফ্লাইটের গতিতে ছুটছে! কি আশ্চর্য!
- আরে, ধর ধর ওগুলোকে। এক্ষুণি ফাইন ঠেসে যদি না দিয়েছি!
ড্রাইভার তার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো। তার ঘাড়ে মোক্ষম এক চাপড় দিয়ে এসপি শাসালেন,
- আরে আহাম্মক! ফলো কর ওগুলোকে!
থতমত খেয়ে ড্রাইভার তাই করলো। তবে সড়কে থেমে থাকা যান এবং যত্রতত্র ব্রেক কষতে থাকা লোকাল বাসগুলোর চক্করে মনে হলো যেন গাড়ি নিয়ে গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে সে। সাইকেলগুলো দেখা যাচ্ছে, একটা দুটো নয়, চার চারটা! ফাঁক ফোঁকর বেয়ে তরঙ্গের ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
- আরে গরুর গাড়ি চালাস নাকি? সাইকেলের সঙ্গে পারিসনা?
এসপির ধমকে দ্বিতীয় দফায় কেঁপে উঠলো ড্রাইভার। এইবার বেপরোয়া ভাবেই এগিয়ে গেলো, বাজিয়ে দিলো পুলিশের গাড়ির উৎকট সাইরেন।
সাইকেলের দলের একেবারে সামনে থাকা দোহা সাইরেনের শব্দে পিছন ঘুরে তাকালো। পুলিশের গাড়ির বাতির বহর দেখেই তার চোখমুখ খিঁচে এলো।
- বাস্টার্ড’ স! আসল কাজের সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়না, এখন এসেছে বাগড়া দিতে! রেইস চাস তোরা? আয়, তোদের দেখাচ্ছি রেইস কত প্রকার ও কি কি!
হ্যান্ডেলে চেপে বসলো দোহার গ্লাভস পরিহিত হাত। শরীর হেলিয়ে গিয়ার ঘুরিয়ে সাইকেলকে রীতিমত সড়কে ঠেলে এঁকেবেঁকে এগোতে থাকলো সে। তীব্র গতিতে বাঁক কেটে যাচ্ছে সে। বাস এবং ট্রাকের মাঝখানের সরু অলিগলি বেয়ে। পা দুখানা টনটন করছে অমানুষিক গতিতে প্যাডেল চাপার কারণে। তবে ক্ষান্ত নেই সে। অন্তরে জ্বলছে দূর্বার আগুন। পৌঁছতে হবেই তাকে, যে করেই হোক! ওই রাশেদের শেষ আজকে সে দেখে ছাড়বে।
রাস্তা একটু ফাঁকা হতেই পুলিশের গাড়ি গতি বাড়ালো। তাতে দূরত্ব ক্রমশ কমতে শুরু করলো তাদের মধ্যকার। দোহা ঠোঁট কামড়ে পিছনে চেয়ে সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে হাত তুলে কিছু নির্দেশ করলো। তাতে সকলেই নিজেদের গতি বাড়ালো। সামনেই একটা লরি ছুটে আসছে। দোহা তীব্র গতিতে এগিয়ে গেলো লরিকে উদ্দেশ্য করে। পুলিশেরা ভড়কে গেলো।
- স্যার, অ্যাকসিডেন্ট করবে!
ড্রাইভারের চিৎকারে এসপি অপর হাতে স্টিয়ারিং চেপে বললেন,
- স্পিড কমা, কমা এক্ষুণি!
তাই হলো। আশেপাশের উপস্থিত বেশ কতক পথচারীকে হতবিহ্বল করে দিয়ে দোহার সাইকেল অতর্কিতে রাস্তার পাশের বেঞ্চের উপর লাফিয়ে উঠলো। যেন সিনেমার স্টান্ট শ্যুটিং চলছে। লরিচালক মহাবিস্ময় নিয়ে দেখলো তার দিকে ছুটে আসতে থাকা সাইকেলের দল একে একে পাশের বেঞ্চের উপর লাফিয়ে উঠে ওপাশের ঝোঁপঝাড়ের মাঝে ঢুকে পড়েছে! লরি এবং পুলিশের গাড়ি মুখোমুখি এসে তীব্র কর্কশ আর্তনাদ তুলে ব্রেক কষে থামলো। সবার দৃষ্টি ওপাশের ঝোঁপের দিকে। যেসব আগাছা মাড়িয়ে সাইকেলগুলো বর্তমানে লাফিয়ে নেমেছে পেঁচিয়ে যাওয়া সড়কের ভিন্নপাশে। শর্টকাট নিয়েছে তারা! বিহ্বল হয়ে দেখে গেলো সবাই। এসপি শাহেদ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠাস করে কিল বসালেন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পাশেই। গাড়ি ঘুরে যেতে যেতে সাইকেল পগারপার হয়ে যাবে, উহু! ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে।
- যত্তসব বড়লোকের উচ্ছন্নে যাওয়া পোলাপান। বাপের রাস্তা মনে করে নিজেদের! শুকনা মাটিতে অ্যারোপ্লেন চালায় মা*ঙ্গের নাতিরা!
কনস্টেবল এবং ড্রাইভার, কেউই কিছু বলার দুঃসাহস করলোনা। এসপি সিটে এলিয়ে বিড়বিড় করলেন,
- সবকিছু আমার ওই পুংটা শালার দোষ!
━━━━━━━━━━━━
খড় বিছানো মেঝেতে চুপচাপ বসে আছে আমারা। তার দুহাত সামনে, শক্ত দড়ি দিয়ে কব্জিদুটো বাঁধা। পা দুখানাও গিড়ায় গিড়ায় বেঁধে রাখা হয়েছে। মুখে কোনো বাঁধন নেই অবশ্য, কারণ স্থানটা এতটা নির্জন যে কেউ চিৎকার করে গলায় র*ক্ত উঠিয়ে ফেললেও কোনো কাকপক্ষীতেও সাড়া দেবেনা। আমারা স্থির বসে আছে। তার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। তখন থেকেই মৃদু আঁচে কেঁপে যাচ্ছে শরীর। ঠিক ভয় হচ্ছেনা, ভিন্ন এক আতঙ্কের অনুভূতি। জীবনে এর আগে এমন পরিস্থিতিতে সে কোনোদিন পড়েনি এবং পড়বে বলেও ভাবেনি। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাই চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সামনে। একটি টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে ক্যারাম খেলছে রাশেদ এবং তার দল। গুণলো আমারা, বারো জন উপস্থিত! সঙ্গে আছে লাঠিসোটা এবং দেশীয় অ*স্ত্র। এরা ঠিক কি করতে চাইছে তাতে কোনো সন্দেহই নেই। সিগারেট এবং অ্যালকোহলে মেতে থাকা প্রতিটা সত্তা যেন একেকটি দানবের প্রতিরূপ।
গলার মাঝে খুশখুশ করে উঠতেই কেশে ফেললো আমারা। তাতে সকলের মনোযোগ গিয়ে পড়লো তার উপর। ঢোক গিললো কিশোরী, পানির পিপাসায় কন্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। রাশেদ তার ফ্যাকাশে চেহারা এবং করুণ ভঙ্গিতে ভীষণ বিনোদন পেলো। বাকিদের খেলা চালু রাখার নির্দেশ দিয়ে মেঝের বাক্স থেকে একটা অ্যালকোহলের বোতল তুলে নিয়ে সে এগিয়ে গেলো আমারার উদ্দেশ্যে। উবু হয়ে বসে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
- পিপাসা পেয়েছে?
আমারা কোনো জবাব দিলোনা। স্থির তাকিয়ে থাকলো রাশেদের দিকে। এই ছেলের সঙ্গে কথা বলতেও তার অন্তরে বাঁধ সাঁধছে। রাশেদ বিস্তর হাসলো, আমারার দৃষ্টি তার মাঝে এক অদ্ভুত ঘৃণার তরঙ্গ খেলিয়ে দিলো। সহসাই হাতে জোরালোভাবে চেপে ধরলো সে শত্রুর প্রেমিকার চিবুক, গুঙিয়ে উঠলো কিশোরী। জোরপূর্বক তার পাতলা ঠোঁটে ঠুসে দিলো সে অ্যালকোহলের বোতলের মুখ,
- খাও ডার্লিং বার্ড, খাও! পিপাসা পেয়েছে খুব তাইনা? এর থেকে স্বাদের পানীয় পৃথিবীতে আর একটিও হয়না।
- উম...উমমমম!
ছটফট করে উঠলো আমারা। ঠোঁট চেপে নিলো। নিষিদ্ধ তরল তার চিবুক গড়িয়ে গলা বেয়ে ভিজিয়ে তুললো পরনের জামার কলার। দৃশ্যটি ভীষণ আনন্দ নিয়ে দেখলো সবাই। রাশেদ আরো ঠেসে ধরলো বোতলটা। আমারার চুল টেনে ঝটকা দিয়ে বিড়বিড় করলো,
- ডার্লিং! খুব মজা তাইনা? আরেকটু দেই?
গুঙিয়ে উঠলো আমারা। খিলখিল করে হেসে তাকে অবশেষে ছেড়ে দিলো রাশেদ। সঙ্গে সঙ্গে কেশে উঠে সবটুকু তরল মাটিতে থু করে ফেলে দিলো আমারা, শরীর গুলিয়ে উঠছে তার, বমি পাচ্ছে ভীষণ। ইচ্ছা হচ্ছে ঝামা দিয়ে নিজের জিভ ঘষে নিতে। রাশেদ শব্দ করে হেসে বললো,
- বা রে, তোর প্রেমিক খাওয়ালে দোষ নেই, আমি খাওয়ালেই ওয়াক থু?
- স্টপ ইট!
ভাঙা কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো আমারা। টলটলে দৃষ্টিতে ভীষণ ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে রইলো রাশেদের দিকে। আটকে রাখতে পারলোনা নিজেকে আর। আহত স্বরে গর্জন তুললো,
- তোর মতন কাপুরুষ জানোয়ার আমি দুইটা দেখিনি। দোহাকে হাত করতে চাস তো? তাহলে সামনাসামনি লড়াই করলিনা কেনো? হিম্মত থাকলে রুখে দাঁড়াতি। পিছন থেকে চোরের মতন ছু*রি মা*রতে চাস, নির্লজ্জ্ব কোথাকার!
ঠাস!
আমারার গালে মোক্ষম এক থাপ্পড় বসালো রাশেদ। ঝটকায় খড়ের বিছানায় আছড়ে পড়লো কিশোরী। উজ্জ্বল গাল তার ব্যথার তাড়নায় পাঁচ আঙুলের দগদগে দাগে মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। অসহনীয় এক দানবিক হাসি হাসলো রাশেদ। কর্কশ কন্ঠে বললো,
- আরে আমাদের ব্যাপারে তুই কি জানিস দুইদিনের খেলনা! তোর দোহাকে তোর হুজুর মনে হয় তাইনা? তবে শুনে রাখ....
আমারার জামার কলার আঁকড়ে নিজের মুখের সামনে তুলে ধরে রাশেদ হিসহিস করে উচ্চারণ করলো,
- ওর বাপ একটা গাদ্দার! গাদ্দারি করে নিজের সর্বস্ব খুঁইয়েছে! আর ওর মা এক নম্বরের বে***! টাকা দিলে আমার সাথেও শুয়ে পড়বে! কিংবা হয়ত পড়েছে, কে জানে? বিশ্বাস না হলে দোহা হুজুরকে জিজ্ঞেস করে দেখিস। ওর বড়লোকি ভাব সব ভাওতাবাজি! আসলে আস্ত একটা ফকিন্নির পোলা! তোর মতন একটা একটা করে বড়লোক বলদ গাভী ধরে, আর সব শুষে শুষে খায়।
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো আমারা। বুকের ভেতর যেন ভাংচুর হয়ে যাচ্ছে তার। টলে উঠছে সর্বাঙ্গ। রাশেদ তাকে আরো একটু কাছে টেনে নিলো, রীতিমত কপালে কপাল ছুঁইয়ে সর্পিল বিষাক্ত ভঙ্গিতে বললো,
- খুব ভালো মনে হচ্ছে এখন তাইনা? সবুজ বাগান মনে হচ্ছে ওই র*ক্তচোষাকে? জাস্ট ওয়েট ডার্লিং, তোর কাছ থেকে যা চায় সেটা পাওয়া হয়ে গেলেই আর ফিরেও তাকাবেনা তোর দিকে! যার বাপ - মা আর জন্মের ঠিক নেই সে আবার কিভাবে.....
আমারার মাঝে আক্রোশের তড়িৎ খেলে গেলো। হঠাৎ করে অবিশ্বাস্য গতিতে সজোরে সে কপালে ঠু*কে দিলো রাশেদের কপাল। তার শারীরিক ওজন বেশ কাজের। ধাক্কায় মাটিতে চিৎ হয়ে পড়লো রাশেদ। কপালে হাত দিলো। প্রগাঢ় নীরবতা কয়েক মুহূর্ত। আমারা হিসিয়ে উঠলো,
- সেইস দ্যা ওয়ান হু কি*ডন্যাপড আ গার্ল ফর হিয রিভেঞ্জ! তোর কথা বিশ্বাস কেনো করবো আমি? কোনো কারণ আছে তোকে বিশ্বাসের?
হাসতে হাসতে উঠে বসলো রাশেদ। প্রথমবারের মতন মুগ্ধতাঘেরা এক দৃষ্টিতে দেখলো আমারাকে। ওজনদার শরীর রাগ এবং উত্তেজনায় ফুঁসছে, ভ্রুজুড়ে তীব্র কুঞ্চন। ঘৃণার সর্বোচ্চ স্তর নয়নে ভাসিয়ে তাকিয়ে আছে রাশেদের দিকে। নিজের চুলে আঙুল চালিয়ে সে বিড়বিড় করলো,
- অত্যধিক সাহস বেড়েছে? তুই কি ভেবেছিস দোহা তোর কেয়ার করে?
স্থির তাকিয়ে রইলো আমারা। রাশেদ ঝুঁকে এলো, শক্ত হাতে তার গ্রীবা পাকড়াও করে জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- নিউজফ্ল্যাশ ডার্লিং বার্ড! তোকে এখানে কে*টে পুঁ*তে রেখে দিলে কোনো কুত্তাও শুঁকতে আসবেনা!
- কুত্তা হয়ত আসবেনা, কারণ কুত্তা তো বজ্জাতের দল। তবে নেকঁড়েকে কিভাবে মোকাবেলা করবি বলে ভাবছিস?
কণ্ঠটি রাশেদের শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ খেলিয়ে দিলো।হতবাক হয়ে সে দেখলো আমারা ঠিক তার পিছনে তাকিয়ে আছে, নয়নজোড়া প্রসারিত। ঝট করে ফিরে তাকালো সে। মহাঅশুভ দৃশ্যটি নজরে এলো অবশেষে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন গুদামটির প্রবেশপথে দন্ডায়মান দোহা।অতিরিক্ত শীতল অভিব্যক্তি, আঁধারমাঝে হিং*স্র নিশাচর জন্তুর ন্যায় জ্বলজ্বল করছে আঁখিজোড়া। একটি হাত জিন্সের পকেটে, অপর হাতে ঝুলছে এক লম্বাটে ধাতব দন্ড। সুস্থির তাকিয়ে আছে সে। বাইরের মৃদু চাঁদের আলো তার অবয়বে প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভুত এক অশরীরী উপাখ্যানের জন্ম দিয়েছে।
তীব্র দৃষ্টিতে সকলের উপর নজর বুলিয়ে দোহা থামলো রাশেদের উপর। আমারার গলায় জড়িয়ে থাকা তার হাত লক্ষ্য করেই যেন অগ্ন্যুৎপাত ঘটলো কিশোরের দৃষ্টিতে। রাশেদ তার প্রেমিকাকে ছেড়ে দিয়ে ফিরে দাঁড়ালো। নিজের অপ্রস্তুত ভঙ্গিমা ঝেড়ে ঠোঁটে হাসি মেখে শুধালো,
- অবশেষে এলি তাহলে!
বিপদজনক ভঙ্গিতে কয়েক পা এগোলো দোহা। মাথা কাত করে তীর্যক হেসে ঘোষণা করলো,
- অ্যান আলফা নেভার অ্যাবানডোন্স হিয মেইট!
প্রতিধ্বনিত হলো কন্ঠস্বরটি গুমোট স্থানজুড়ে। রাশেদের হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো। বাকিরা ততক্ষণে হা*মলে পড়ার জন্য তৈরি, কিন্তু সে হাত তুলে তাদের ঠেকিয়ে রাখলো। যেন উপভোগ করবে সর্বোচ্চ সীমায়, এমন ভঙ্গিতে রাশেদ সরে দাঁড়ালো। স্বাগতম ভঙ্গিতে দুবাহু তুলে বললো,
- ওয়েলকাম মিস্টার আলফা। ইউ মে টেইক ইওর মেইট রাইট নাউ!
দোহা স্পষ্টত বুঝলো এটা একটা ফাঁদ। তবুও সে এগিয়ে গেলো আমারার দিকে। তার দুর্বোধ্য দৃষ্টি ঘুরপাক খেলো কিশোরীর এলোমেলো অবয়বজুড়ে। টলটলে নয়নে নয়ন মিলতেই দোহা এক ভীষণ হাহাকার অনুভব করলো অন্তরে। চট করে বসে পড়লো সে আমারার সামনে। এক হাত বাড়িয়ে খানিকটা বেপরোয়া ভঙ্গিতে আমারার গাল স্পর্শ করে তাকে কাছে টেনে নিলো দোহা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ চালালো লালচে গাল এবং ভেজা গ্রীবাজুড়ে।
- দিস বাস্টার্ড টাচড ইউ, প্রিন্সেস?
আমারা মাথা ঝাঁকালো, ম্রিয়মাণ কন্ঠে জানালো,
- আম...আমি ঠিক আছি দোহা।
আরো জোরালোভাবে চাপলো দোহা নিজের স্পর্শ, আমারাকে একপ্রকার মিশিয়েই ফেললো নিজের সাথে। গভীর পর্যবেক্ষণ চালালো। বৃদ্ধাঙ্গুল তার বয়ে চললো প্রেমিকার সিক্ত পাতলা ঠোঁটজুড়ে। ঝুঁকে এসে প্রশ্বাস টানলো সে, বুঝতে একটুও বাকি রইলোনা তার।
অ্যালকোহল!
মনে হলো যেন মস্তিষ্কে শর্ট সার্কিট হয়ে গিয়েছে দোহার। আমারাকে ছেড়ে দিয়ে উঠলো সে। পাশের মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকা বোতলটা তুললো সে নিজের হাতে। প্রথমটায় কেউই বুঝলোনা সে কি করতে চাইছে। শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা পিছিয়ে সে সহসাই উল্টো ঘুরলো। কৌতূহলী পর্যবেক্ষণ করতে থাকা রাশেদকে মাটিতে আছড়ে ফেলে সজোরে হাতের বোতলটি ছুঁ*ড়ে মা*রলো একেবারে মুখ বরাবর। কাঁচ ভেঙে ছিটকে উঠলো। কাউকে কোনো প্রতিক্রিয়া করার সুযোগটুকু না দিয়ে দোহা পা তুলে বোতলটির অংশ ঠে*সে ধরলো রাশেদের মুখে, র*ক্তে*র উদগীরণে মুহূর্তেই গেঁথে গেলো তা নরম অঙ্গজুড়ে। আহ*ত গর্জন তুললো রাশেদ, একদম অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। তবে তা ছাপিয়ে গেলো দোহার আগ্রাসী চিৎকার,
- ইউ ডেয়ার টু ফোর্স মাই গার্ল? গেল! প্রত্যেকটা কাঁচের টুকরো গিলবি তুই! একটাও যদি আস্ত থাকে তাহলে তোকে এইখানেই জ্যা*ন্ত গেঁ*ড়ে ফে*লবো, কাফনের কাপড়টুকুও পাবিনা, মাদা*ফা*কিং বাস্টার্ড!
হতভম্ব হয়ে আমারা দেখে গেলো, র*ক্তপিপাসু এক নারকীয় সত্তাকে।
এ কোন দোহা?
#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১১
পর্ব ১১: [ সমাপ্তি? ]- ( শেষাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
রাশেদের অবস্থা উপস্থিত প্রত্যেকের অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দিলো। নিষ্ঠুর মানুষ তারা দেখেছে, তবে দোহার মতন বেপরোয়া উগ্র অস্তিত্ব খুব কমই আছে। এতদিন শুনলেও আজ বিশ্বাস হয়ে গেলো সবার....
কেনো দোহাকে সুনামি বলা হয়।
আর অপেক্ষা করা সমীচীন মনে হলোনা কারোরই। লাঠি এবং অ*স্ত্র হাতে তুলে ছুট লাগালো প্রত্যেকে। আতঙ্কিত হয়ে দেখে গেলো আমারা। দোহা অটল, ব্যস্ত রাশেদে। অন্য কারো প্রতি কোনো আগ্রহই নেই তার। কিছুক্ষণ পরেই আমারা বুঝলো কেনো। সকলে দোহাকে ঘিরে ধরতেই অতর্কিতে পিছন থেকে ছুটে এলো জিই - শু। নমনীয় শরীর হাওয়ার মাঝেই ভাসিয়ে তুলে সে আছড়ে পড়লো প্রথমজনের ঘাড়ে,তাকে সমেত গড়িয়ে গেলো মাটিতে। অপরদিকে রাজীব হাতের চেইন ঘোরাতে ঘোরাতে একজনের গলায় পেঁচিয়ে ছুঁড়ে ফেললো, হাঁটু তুলে মোক্ষম আঘা*ত করলো পিঠে। এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো আমারা। দোহা তাহলে একা নয়।
ততক্ষণে রাশেদের কলার টেনে ধরে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দোহা মোক্ষম এক ঘু*ষি হাঁকিয়ে দিলো র*ক্তা*ক্ত মুখ বরাবর। রাশেদ পাল্টা আগ্রাসী হাত তুলতেই সেটি পাকড়াও করে হাঁটুতে চেপে মুচড়ে ধরলো সে। ককিয়ে উঠলো রাশেদ,
- একটা হাতির বাচ্চার জন্য পাগলা কুত্তা বনে গিয়েছিস শালা! ওইটা তো জনগণের সম্প.....
সমাপ্ত করার আগেই দোহার অপর হাত গেঁড়ে বসলো রাশেদের চিবুক জুড়ে। ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত ঘষে ঘোষণা করলো,
- তোর জনগণের গুষ্টি কিলাই! শি ইয মাইন....ব্লাডি মাইন!
এতক্ষণে যেন রাশেদ ঘৃণার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালো। চিৎকার করে উঠে প্রচন্ড শক্তিতে দোহাকে ছুঁড়ে ফেললো একপাশের ড্রামের উপরে। ধাক্কা খেয়ে ভারসাম্য হারালো দোহা, তাতেই সে চড়াও হলো। হাতে উঠে এলো ধারালো এক চা*পা*তি, বাড়ি হাঁকাতেই দোহা এড়িয়ে গেলো। তবে অত্যন্ত ক্ষীণ ধার তার গালে লেগে সামান্য ছড়ে গেলো, তারপরই রাশেদের ঘু*ষিতে ছিটকে পড়লো সে মেঝেতে। বারো জনের বিপরীতে তিনজন নেহায়েত কমই। জিই - শু আর রাজীব কয়েকজনের সঙ্গে ব্যস্ত থাকতে থাকতে দোহাকে ঘিরে ধরলো রাশেদসহ পাঁচজন। আমারার মনে হলো তার হৃদপি*ন্ড বুঝি এবার লাফিয়েই বেরিয়ে আসবে।
- দোহা....
ক্ষীণ কন্ঠে উচ্চারণ করে সে নিজেকে ছাড়াতে চাইলো। শক্ত দড়ির বাঁধন শক্তি প্রয়োগে যেন আরো জোরালো হলো। তার চেষ্টার দিকে তাকিয়ে র*ক্তা*ক্ত ঠোঁটে তীর্যক হাসলো রাশেদ, দোহার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করলো,
- তোকে তোর প্রেমিকার সামনেই আজকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁ*ত*বো, শালা খবিশের বাচ্চা!
বিপদজনকভাবে রাশেদের হাতের চা*পা*তি উত্তোলিত হলো, বাকিরা জোরপূর্বক ধরে রাখলো তার হাত পা। ঠিক তখনি এক দৃপ্ত মেয়েলী কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো গোটা গুমোট গুদামজুড়ে।
- তাহলে কি আমার এটাকে টু*করো টু*করো করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়া উচিৎ?
স্তব্ধ হলো রাশেদ এবং তার দল। এক ঝটকায় ঘুরে তাকালো সবাই। গুদামের প্রবেশমুখের ভেতরে দাঁড়ানো জারা। এক হাতে একটি ছুরি, অপর হাতে লম্বাটে শিকল যা পেঁচানো তার পায়ের কাছে উবু হয়ে থাকা এক ছেলের গলায় এবং হাতে, যেন পালতু প্রাণী সে। তড়িৎ খেলে গেলো রাশেদের অন্তরাত্মায়। তার ভাই! যার জন্য এতকিছু! যাকে মে*রে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল দোহা শুধুমাত্র তার পরিবার নিয়ে খারাপ কথা বলার কারণে।সবার বাকরুদ্ধ চাহুনির মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠলো দোহা। দুই কনুই মেঝেতে রেখে ভর দিয়ে তুললো নিজেকে। অত্যন্ত আয়েশী ভঙ্গিতে তাকালো, একবার জারা এবং পরেরবার ভড়কে যাওয়া রাশেদের দিকে। থরথর করে কাঁপছে রাশেদ,
- তু...তুই....!
- তুই কি ভেবেছিলি? ওই কুলাঙ্গারটাকে খুঁজে পাবোনা আমি? পাতাল ফুঁড়ে হলেও ওটাকে ঠিকই তুলে আনতাম।
বাঁকা হাসলো দোহা, অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়ায় যা দেখালো ভীষণ অশরীরী। বরাবর রাশেদের নয়নে নয়ন মিলিয়ে দোহা গম্ভীর এক চাপা গর্জন তুললো,
- তুই আমার কলিজা ধরে টান দিয়েছিস, আমি তোর জীবন ধরে টান দিলাম। হিসাব বরাবর।
- কুত্তার বা****
চিৎকার করে উঠে দোহার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো রাশেদ। বাকিরা তখন দ্বিধায় ভুগছে। কি করবে তারা? এহেন আক্রোশের বিপরীতে দোহা শুধু হেসেই গেলো, অদ্ভুতুড়ে বিস্তর হাসি। তাকে রীতিমত উন্মাদের মতন দেখাচ্ছে, এত গুরুতর পরিস্থিতিতেও যে বেপরোয়াভাবে সবকিছু উপভোগ করে চলেছে। রাশেদ নিজের হিতাহিত জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছে, তাই সে জোরসে চেঁচিয়ে উঠলো,
- এই কাইল্যা অবলা মেয়ে আবার কি করবে আমার ভাইয়ের? অতিরিক্ত দেমাগ না তোর? এক্ষুণি ভাঙছি তোর দেমাগ শালা!
রাশেদের ইশারায় কয়েকজন সহসাই ছুট দিলো জারাকে লক্ষ্য করে। তবে একটুও বিচলিত হলোনা সে। স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো, অধরজুড়ে ফুটলো তার অতি ক্ষীণ এক হাসি। সামান্য মাথা কাত করে মাথায় থাকা ক্যাপটা ঝুঁকিয়ে সে বিড়বিড় করলো,
- কল মি ব্ল্যাক প্যান্থার সুইটি!
কচাৎ!
সম্পূর্ণ ক্রিয়াটি এতটা দ্রুতগতিতে ঘটলো যে কেউ ঠাওর করে উঠতে পারলোনা কি হয়েছে, কিভাবেই বা হয়েছে। শুধু দেখলো উবু হয়ে মেঝেতে কুঁকড়ে গিয়েছে ছেলেটা, তালু বরাবর গেঁ*থে গিয়েছে জারার হাতের ছু*রির ফলা। ছিটকে উঠলো র*ক্ত, তার সঙ্গে বিকট এক আর্তচিৎকার। জারা মোটেও অপেক্ষা করলোনা। একপাশের ড্রামের উপর লাফিয়ে উঠে জোরালো ঝাঁপে সামনের জনের উপর আছড়ে পড়লো, হাঁটু দিয়ে ঠে*সে ধরলো তার গলা মাটির সাথে। একজন মেয়ের এমন অতর্কিত আ*ক্রম*ণ কেউই প্রত্যাশা করেনি। একজন পিছন থেকে ব্যাট দিয়ে মাথায় আ*ঘা*ত করতে গেলেই জারা মাথা সরিয়ে পিছন ঘুরে ক্ষীপ্র গতিতে তার দুর্বলতম জায়গায় ঘু*ষি বসিয়ে দিলো। আর্তনাদে কেঁপে উঠলো চারিপাশ। সেটাকে ছাপিয়ে গেলো শিকল বাঁধা অবস্থায় ধূলোবালিতে মাখামাখি হয়ে কাতরাতে থাকা ছেলেটির কন্ঠ,
- ভাইয়া!
থামতে বাধ্য হলো রাশেদ। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ভাইয়ের দিকে ছুটতে নিলেই দোহার পায়ের ল্যাঙে ছিটকে মুখ থুবড়ে হয়ে পড়লো শক্ত মাটিতে। তার ঘাড় ধূলার মধ্যে ঠেসে ধরে দোহা রুক্ষ স্বরে বললো,
- ফ্রি মাই প্রিন্সেস বিফোর আই সেন্ড ইওর ব্রাদার টু হেল!
কাঁপা কাঁপা হাত তুলে নিজের দলকে কোনমতে ইশারা করলো রাশেদ। দুইজন এগিয়ে গেলো আমারার দিকে। অপরদিকে জারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো রাশেদের ভাইয়ের সামনে। আমারাকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সে একটাকেও বিশ্বাস করছেনা। জিই - শু আর রাজীবও দাঁড়ালো তার পাশে, তীক্ষ্ণ নজর রাখলো সামনে। আমারার হাত এবং পায়ের বাঁধন খুলে দিলো রাশেদের ছেলেপেলে। ছাড়া পেয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে থাকলো কিশোরী, বুঝতে পারলোনা কি করবে। তারপরই লাফিয়ে উঠলো, প্রথমটায় ধপাস করে পরে গেলো খড়ের উপর। এতক্ষণ যাবৎ আবদ্ধ থাকায় শরীর অবশ হয়ে গিয়েছে। ব্যাপারটা খেয়াল করলো দোহা। রাশেদকে জিই - শুর কব্জায় ছুঁড়ে দিয়ে পিছন ফিরে এগোলো আমারার উদ্দেশ্যে। ছেলে দুটোকে আক্রোশে ধাক্কা দিয়ে নিজের সামনে থেকে হটিয়ে দুহাত বাড়িয়ে ধরলো প্রেমিকার উদ্দেশ্যে। টলটলে নয়নে মাথা তুলে তাকালো আমারা, তিরতির করে কাঁপলো অধর আবেগের তাড়নায়। দোহার হাত দুটো ধরলো সে। সবাইকে ভীষণ রকম অবাক করে দিয়ে ঝুঁকে তার ভারী শরীরটা একপ্রকার শূন্যে তুলে নিলো দোহা, কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপরই নিজের বুকে ঠেসে ধরলো, জোরালো আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললো প্রেয়সীকে নিজের বাহুডোরে। কি হলো নিজের আমারা বলতে পারবেনা। এতক্ষণ যাবৎ অন্তরে চেপে রাখা সকল অনুভূতি তার অশ্রু হয়ে ঝরতে থাকলো। নিঃশব্দ ক্রন্দনের তাড়নায় থেকে থেকে কাঁপতে থাকলো তার আলুথালু শরীর, ভিজে উঠলো দোহার টি শার্টের বুক। পিঠে শান্তনার হাত বুলিয়ে তার মাথায় চিবুক ঠেকিয়ে দোহা ফিসফিস করলো,
- হুশ, আই অ্যাম হেয়ার প্রিন্সেস। সব ঠিক আছে। আমি আছি, তোমার কাছেই আছি।
উত্তরস্বরুপ তার কোমরজুড়ে আরো শক্তভাবে চেপে বসলো আমারার হাতজোড়া।
。
。
。
এক মহা কুরুক্ষেত্রের অবসান ঘটিয়ে যখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত এবং রীতিমত আ*হ*ত ছেলেমেয়েদের দল বাইরে বেরোলো, তখন উপস্থিত দুইটি মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে সকলেই স্থবির হলো। বিশেষ করে নিজের ভাইকে টেনে নিয়ে যেতে থাকা রাশেদ থমকালো আগে। মাইক্রোবাসের ড্রাইভারের পাশে বসা মধ্যবয়স্ক লোকটির চেহারা বুঝতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা তাকে।
- আব্বু!
আপনমনে বিড়বিড় করলো সে। তৎক্ষণাৎ তার সামনে উপস্থিত হলো এতক্ষণ যাবৎ উধাও থাকা অনিক। স্থির দাঁড়িয়ে আছে মাইক্রোবাসের পাশে পার্ক করে রাখা নিজের সাইকেলের গায়ে হেলান দিয়ে। তার উপস্থিতি বাকিদেরও বিস্মিত করলো ভীষণ। দোহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। অনিক সত্যিই আসবে সে ভাবেনি। জারা তাকে অনুসরণ করার পর রাজীব আর জিই - শুকে ডেকে নিয়েছিলো সে। অনিক সাইকেল ছেড়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো রাশেদের দিকে। তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে আনলো ছেলেটার চেহারায়। তারপর অতীব শীতল কন্ঠে বললো,
- তুই অতি আব্বু অবসেসড পাবলিক, নে, আজকে সত্যিই তোর আব্বুকে ধরে আনলাম।
একটি শক্ত ঢোক গিললো রাশেদ। অনিক স্মিত হেসে ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে জানালো,
- অতীতে যা হয়েছে এবং আজকে যা হলো, সব ভুলে যাবি তুই। দোহা কিংবা আমার গ্যাংয়ের কারো পিছনে যদি তোকে আর লাগতে দেখেছি তাহলে কি হবে সেটা তোর আব্বুকে জিজ্ঞেস করে নিস। প্রাণে বেঁচে ফিরছিস আজ, প্রতিদিন ফিরবি কিনা গ্যারান্টি নেই।
রাশেদের গাল চাপড়ে সরে দাঁড়ালো অনিক। তার দিকে ধারালো দৃষ্টি ফেলে মাইক্রোবাসে নিজের ভাইকে নিয়ে চেপে বসলো রাশেদ। তার ছেলেপেলেও নীরব আদেশ পালন করে উল্টো ঘুরে নিজেদের পথ ধরলো। তারা যত দ্রুত সম্ভব এই অদ্ভুতুড়ে দলটির হাত থেকে নিস্তার পেতে চায়। দীর্ঘক্ষণ বাদে নীরবতা ভাঙলো রাজীব। জিজ্ঞেস করলো,
- রাশেদের বাপকে কিভাবে হাত করলি?
ফিরে তাকালো অনিক। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে মৃদু হেসে জানালো,
- লেটস্ সে, বাপেরও বাপ থাকে!
অনিকের রহস্যময় হাসির অর্থ কেউই টের পেলনা একমাত্র দোহা বাদে। সে জানে, রাশেদের বাবার রহমান গ্রুপের সঙ্গে পুরাতন যোগসাজোস রয়েছে। তবে অনিক যে আজ সত্যিই এতটা দূরে পৌঁছে যাবে, সেটা দোহাও ভাবতে পারেনি।
━━━━━━━━━━━
সড়কপথজুড়ে পথচারীদের বিচরণ। অদূরে যানবাহন চলছে, দোকানপাটজুড়ে কেনাকাটার ব্যস্ততা। এর মাঝেই ফুটপাথের উপরের বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছে দোহা। দৃষ্টি অদূরে নিক্ষিপ্ত, যেখানে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে তার বন্ধুদের সাইকেলগুলো। একা থাকতে চেয়েছে সে, বাকিদের পাঠিয়েছে ডরমে। কিন্তু অবশ্যই, পুরোপুরি একা হয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা তার পূরণ হয়নি।
কিছুক্ষণ বাদেই তার পাশে বেঞ্চে উপস্থিত হলো আমারা। হাতে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ এবং অ্যান্টিসেপটিক। মাত্রই কিনে এনেছে পাশের এক ফার্মেসি থেকে। নীরবে দোহার দিকে এড়িয়ে তার হাত ধরলো সে, আঙুলের মাঝে ক্ষতগুলোতে অ্যান্টিসেপটিক ছিটিয়ে তুলো দিয়ে মুছে নিলো। দাঁতে দাঁত চেপে জ্বালাটুকু সহ্য করে গেলো দোহা। প্রসারিত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে গেলো আমারার কার্যক্রম। সুন্দর করে তার আঙুল এবং কব্জির ক্ষতে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে মুখের দিকে এগোলো কিশোরী। ঠোঁটের পাশের ক্ষতে তুলো ভিজিয়ে মুছে নিতেই হিসিয়ে উঠলো দোহা, আমারা থমকালো। পরমুহুর্তে ঝুঁকে এসে ফু দিলো জ্বালা কমাতে। অজান্তেই শিউরে উঠলো দোহা, উভয় হাত চেপে বসলো তার হাঁটুতে। আবেশিত এক দৃষ্টিতে সে দেখে গেলো আমারাকে, যে অতি যত্নে তার প্রতিটা ছোটখাটো ক্ষত যথাযথ পরীক্ষণ করে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে। কপালের পাশের অন্তিম ক্ষতে ব্যান্ডেজ সেটে অবশেষে আমারা একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। খানিকটা দুঃসাহস করেই দোহাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আলতোভাবে গালে গাল ঘষে বিড়বিড় করলো,
- তোমার এত বড় ঝুঁকি নেয়া উচিত হয়নি দোহা, একদম উচিত হয়নি। যদি পরিকল্পনা সামান্য এদিক সেদিক হতো?
দোহার কি হলো সে বলতে পারবেনা। আশেপাশের মানুষের কটূক্তির দৃষ্টি একপ্রকার উপেক্ষা করেই সে আমারাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললো প্রায়, যেন অনুভব করলো প্রেয়সীর অস্তিত্ব। তার ঘাড়ে মাথা গুঁজে দীর্ঘ প্রশ্বাসে সুবাস টেনে ফিসফিস করলো,
- তুমি রাশেদকে চেনোনা নোলক, আমি চিনি। ও যেকোনো কিছু করতে পারে, যেকোনো কিছু! যদি আজ তোমার কিছু হয়ে যেতো তাহলে আমি.....
বাকিটুকু আর উচ্চারণ করলো না দোহা। শক্তভাবে চোখ বুঁজে ফেললো। আমারা তার শরীরের ক্ষীণ কাঁপুনি টের পেলো। আলিঙ্গন ছেড়ে তাই সোজা হয়ে বসলো সে, নিজের কোলের উপর দোহার দুহাত রেখে তা হাতের মুঠোয় মুষ্টিবদ্ধ করলো।
- আমি একদম ঠিক আছি দোহা, আমার কিছুই হয়নি। এইযে দেখো, আমি সুস্থ আর স্বাভাবিক। হ্যাঁ, রাশেদ কিছুটা বেয়াদবি করেছে বটে। তবে তোমরা সবাই মিলে যে উচিত শিক্ষাটা ওকে আজকে দিয়েছ, আমার মনে হয়না আজকের পর থেকে আর কোনোদিন কিছু করার সাহস পাবে ও। চিন্তা করোনা একদম।
স্থির তাকিয়ে রইলো দোহা আমারার মুখপানে। মেয়েটাকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে, অতিরিক্ত স্বাভাবিক! এত বড় একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর কারোরই এতটা স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। কিন্তু আমারা আছে। এর অর্থ সে নিজেকে শক্ত দেখাচ্ছে দোহার সামনে, হয়ত বা ভেঙে পড়বে,যখন একলা হবে তখন। উপলব্ধিটি দোহাকে বিচলিত করলো।
ঘৃণা করে সে! ঘৃণা করে এমন অনুভূতিকে!
দুহাতের মাঝে আমারার হাতজোড়া চেপে ধরলো সে। দীর্ঘক্ষণ নীরবতা। আমারাও তাকে কোনো প্রশ্ন করলো না, কোনো কথাও বললোনা। সময় দিলো যেন ধাতস্থ হওয়ার। আশেপাশের গাড়ির হর্ন, মানুষের হাকডাক তাদের মধ্যকার নীরবতাকে টলাতে পারলোনা। ক্রমেই গভীর করে তুললো। বিনা কারণেই আমারার হৃদযন্ত্র জোরালোভাবে স্পন্দিত হতে থাকলো। কেমন যেন খচখচে অনুভূতি হচ্ছে অন্তরে। দোহার শীতল মুখচ্ছবি তাকে ভাবাচ্ছে। ঠিক যে মুহূর্তে সে অধৈর্য্য হয়ে মুখ খুলতে যাবে, সেই মুহূর্তেই দোহার অভাবনীয় শীতল কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো,
- প্রিন্সেস?
চোখ তুলে তাকালো আমারা, বরাবর দোহার নয়নে। আপন চিন্তায় ডুবে থাকা কিশোর অতি ধীরে তার সঙ্গে মেলালো নিজের জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। জিভ দিয়ে ভিজিয়ে আনলো শুষ্ক ঠোঁট। প্রশান্ত কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- লেটস ব্রেক আপ....
প্রতিক্রিয়াহীন তাকিয়ে রইলো আমারা, বারকয়েক ফেললো চোখের পাতা। তারপরই স্থির হয়ে গেলো, চেয়ে থাকলো, একদৃষ্টে, নিজের ভালোবাসার মানুষটার উদ্দেশ্যে যে মাত্রই নিজ মুখে তাদের সম্পর্ক শেষ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
—চলবে—