ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১২তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১২

পর্ব ১২: [ অনুভূতিদের দ্বন্দ্ব ]

━━━━━━━━━━━━━━━━

আমারা স্থির বসে আছে। দোহার কথার কোনো জবাব দিচ্ছেনা। বিষয়টা কিশোরকে বেশখানিক বিচলিত করে তুললো। শক্ত একটি ঢোক গিলে ব্যান্ডেজ পাকানো হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে বিড়বিড় করলো,

- আমার জগৎ আর তোমার জগৎ অনেক আলাদা নোলক। আমি তা নই যা তুমি আমাকে মনে করো। আমি একটা খারাপ ছেলে, আমার সঙ্গে অনেক খারাপ ছেলেদের উঠাবসা আছে। আজকে রাশেদ এসেছে, আগামীকাল অন্য একজন আসবে, কতবার ভাগ্যবান থাকবো?

আমারা নিঃশব্দে দোহার প্রত্যেকটা কথা শুনে যাচ্ছে। সামনের সড়কজুড়ে যানবাহন ছুটে যাচ্ছে। পথচারীগণ যাচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে। গুমোট মেঘে ঢাকা আকাশ। শীতল হাওয়ার প্রবাহ। থেকে থেকে গাছের শাখা প্রশাখা দোল খাচ্ছে। এ যেন ঝড়ের আগমুহূর্তের স্নিগ্ধতা। দোহা দূরে দিগন্তের দিকে তাকালো, ঘন কালো মেঘে আড়াল হয়ে গিয়েছে একফালি চাঁদ। দৃশ্যটা অন্তরে পীড়া জাগানিয়া। দোহা আনমনে বিড়বিড় করলো,

- আই অ্যাম নট আ জেন্টেলম্যান। আই অ্যাম অ্যাগ্রেসিভ, পজেজিভ, টু মাচ ইন্সিকিউর অ্যান্ড....

নিজেকে থামালো দোহা। নিজের কোলের দিকে তাকালো। ক্ষীণ কন্ঠ তার আমারার কানে প্রতিধ্বনিত হলো,

- আমি আঁধার। যে আঁধারকে যতই আলো দাওনা কেনো, সে সবটুকু আলো শুষে নিয়ে বিপরীতে তোমাকে প্রগাঢ় অন্ধকার বিলিয়ে যাবে।

মুখ তুলে একনজর আমারাকে দেখলো দোহা, তার সুস্থির অবয়বে দৃষ্টি বুলিয়ে নিজের কথা শেষ করলো।

- আমাদের একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকাটাই শ্রেয় হবে। সো, লেটস ব্রেক আপ হোয়েন ইটস স্টিল নট লেইট।

অবশেষে মাথা ঘুরিয়ে দোহার নজরে নজর মেলালো আমারা। কিশোরীর ডাগর ডাগর আঁখিজোড়ার মাঝে দোহা কোনো অস্বস্তিবোধ, ঘৃণা কিংবা বিস্ময় দেখতে পেলনা। উভয় টলটলে হ্রদজুড়ে যেন ভাসছে ভরসা এবং বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। নিগূঢ় এক পবিত্রতার উচ্ছ্বাস। জগতের সবথেকে পঙ্কিল সত্তার মাঝেও যেন এই দৃষ্টি খুঁজে নিতে সক্ষম একফালি আশার আলো।

- আচ্ছা।

আমারার কন্ঠে ছোট্ট একটিমাত্র শব্দে দোহা বেশ অবাক হলো। মেয়েটির আচরণ সন্দেহজনক লাগছে তার কাছে। ভীষণ ধরণের।

- তার মানে, তুমি রাজী? হ্যাভ উই ব্রোকেন আপ?

প্রশ্নটা করার সময় কেনো নিজের কন্ঠ কাঁপলো দোহা বুঝতে পারলোনা। প্রেমিকা তার বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। একটি হাত বাড়িয়ে তার কোলের উপর রাখা হাতটা ধরে সামান্য টেনে বললো,

- মনে হচ্ছে ঝড় আসবে। তার আগেই ডরমে ফিরতে হবে। তাছাড়া তোমার এখন বিশ্রাম নেয়া উচিত। চলো যাওয়া যাক।

দোহা কেন যেন এরপর আর কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। আমারা তাকে আদেশ করেনি, তবুও তার কথাগুলো অজান্তেই আজ্ঞাবহরূপে ধরা দেয় অন্তরে। চুপচাপ সাইকেলে চাপলো দোহা। সেন্ট পিটার্সবার্গের ফেরার পথ সম্পূর্ণ নীরবে কাটলো দুইজনেরই।

পেইনকিলার এবং রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর উপদেশ দিয়ে আমারা বিদায় নিতেই ধীর এবং পরিশ্রান্ত পদক্ষেপে নিজের রুমে পৌঁছালো দোহা। তার সমস্ত অস্তিত্ব দ্বিধান্বিত। বুকের ভেতর কোথাও একটা চাপা বিধূরের অনুভব। কেউ একজন ক্রমাগত নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে চলেছে অভ্যন্তর থেকে। কিসের জন্য? নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্তত সত্যিকার ভাবার সুযোগ দিলো দোহা।

আজকের ঘটনা আমারার উপর কেমন প্রভাব ফেলেছে সে জানেনা। তবে তাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিসের টানে সে ছুটে গিয়েছিল রাশেদের দোরগোড়ায়? নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতে? উহু, আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে! আজ থেকে দুই বছর আগে এই রাশেদ সিনিয়র এক আপুর সঙ্গে যা করেছিল, সেসবকিছু দোহা একদম কাছ থেকে দেখেছে, শুরু থেকে শেষ অবধি। তখন টু শব্দটিও করার দুঃসাহস কিংবা আক্রোশ হয়ে উঠেনি। তবে আজ যদি আমারাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হতো, তাহলে সে নিজেকে কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারতোনা। হৃদয় আর জীবন এক নয়, হৃদয় নিয়ে হয়ত খেলা যায় কিন্তু জীবন নিয়ে নয়। কেনোই বা সে আজ আমারাকে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিয়েছে? এই প্রশ্নের সঠিক ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেও নেই। কিন্তু ওই মুহূর্তে, ওই স্থানে মেয়েটির পাশে বসে তার শুধু এই একটা কথাই মনে হয়েছিল, আমারা তার থেকে যত দূরে থাকে, ততই মঙ্গল। আমারার জন্যও, তার নিজের জন্যও!

- সারারাত জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তাভাবনা করার শখ থাকলে ছাদে চলে যা। রুমের মাঝে একটা খাম্বা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ঘুম ভেঙে ভয় লাগে!

নিজের চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে ঝট করে পাশ ফিরে তাকালো দোহা। নিজের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে অনিক। মাথা কাত করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো দোহা। পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের পোশাক বদলে নিয়ে। বাথরুম থেকে শরীর ধুয়ে এসে নিজের বিছানায় বসতেই দেখলো পাশের টেবিলে খাবার এবং ঔষধ রাখা আছে। এসব যে অনিক রেখেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মৃদু হেসে দোহা খাবার তুলে নিয়ে খেতে শুরু করলো। চেয়ে দেখলো অনিক ইতোমধ্যেই ওপাশ ফিরে ঘুমের জগতে পাড়ি জমিয়েছে। হয়ত ক্লান্ত বেশ। ওষুধ খেয়ে কম্বল ঠিকঠাক করে ল্যাম্পশেড নেভালো দোহা। তারপর যেই না বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল, তখনি তার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে অনিকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

- একটা প্রশ্ন করবো। সঠিক জবাব দিবি।

স্থবির হয়ে গেলো দোহা। অনিক তখনো উল্টোপাশ ফিরে শুয়ে আছে, ফিরে তাকায়নি। দোহা উত্তর করার আগেই অনুমতিবিহীন প্রশ্ন করে বসলো অনিক।

- আজকের সবকিছুই কি নাটক ছিলো?

জবাব দিলোনা দোহা। মনে হলো বুকের ভেতর ভারী একটা চাপ জেঁকে বসেছে। মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করলো অনিক। অবশেষে দোহার অত্যন্ত ক্ষীণ এবং গভীর কণ্ঠের উত্তর ভেসে এলো,

- হ্যাঁ।

- হেহে...

চাপা হাসির ধ্বনি। তার সঙ্গে অনিকের শরীরের সামান্য নড়চড়। চিৎ হলো ছেলেটা। গায়ে কম্বল টেনে ফিসফিস করে বললো,

- তুই অনেক ভালো অভিনেতা দোহা। অনেক ভালো!

দোহা কেন যেন অনিকের দিকে তাকাতে পারলোনা। চটজলদি পাশ ফিরে অপর একটি বালিশ নিজের মাথায় চেপে চোখ বুজলো। হৃদস্পন্দন সীমা ছাড়িয়েছে তার অজানা এক আতঙ্কের জোয়ারে।

অনিক ঘুমিয়েই পড়েছিলো প্রায়। তবে দোহার বিছানার নড়চড় টের পেয়ে চোখ মেলে তাকালো। আবছায়া আঁধারে দেখলো বাইরের পোশাক পরে মুখে মাস্ক জড়িয়ে একদম নিঃশব্দে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেলো দোহা। চকিতে ঘড়ির দিকে চোখ পড়লো অনিকের। রাত এগারোটা প্রায়। একটি নিঃশ্বাস ফেললো রহমানপুত্র। কোনো সন্দেহ নেই।

দোহা কাজে গিয়েছে।

কি কাজ? তা একমাত্র সেই জানে।

━━━━━━━━━━━━

জারা এই মুহূর্তে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে নিজের ইউনিফর্মের বুকপকেটের দিকে। স্বর্ণালী বর্ণের একটা ছোট্ট মুকুটের আদলে তৈরী সেফটিপিনের মতন কিছু একটা সংযুক্ত সেখানে। সূর্যের আলো পড়লেই দারুণ দ্যুতি ছড়াচ্ছে। চোয়াল সামান্য ঝুলে আছে তার অদ্ভুত এক অনুভবে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি খানিক ভিন্ন ধাঁচের লাগছে। একপাশেই দাঁড়িয়ে আছে আমারা, যার ঠোঁটে এই মুহূর্তে বিস্তৃত হাসি খেলা করছে।

- এটা কি? খায় না মাথায় দেয়?

বুকপকেটের বস্তুটি স্পর্শ করে জারা বিড়বিড় করতেই আমারা শব্দ করে হেসে উঠলো।

- এটা ব্রুচ।

- ইস! নিজেকে মেয়ে মেয়ে লাগছে। ছিঃ!

ব্রুচ খুলতে উদ্যত হতেই জারার হাত চেপে ধরে ফেললো আমারা। ভ্রু উঁচু করে শাসানোর ভঙ্গিতে বললো,

- খবরদার। কত শখ করে কিনেছি তোর জন্য জানিস?

- আমাকে ঘুষ দিচ্ছিস নাকি?

- উহু, উপহার। ধন্যবাদস্বরূপ।

- ওই ঘুষই হলো।

জারার তীক্ষ্ণ চাহুনির বিপরীতে আমারা মিটিমিটি হাসলো।

- কালকে যে একখান ফাইট করেছিস না! একেবারে হলিউড সিনেমা! তোর দাদা নানা কি কোনোভাবে ব্রুস লি - র বংশধর?

চেহারায় গম্ভীর ভাব ধরে রাখতে চাইলেও জারা আর পারলোনা। মুখ টিপে হেসে ফেললো। আমারার হাসিও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিস্তৃত হলো। অবশেষে সে এই মেয়েটির চারপাশে ঘিরে থাকা অবরোধের দেয়াল ভেঙে দেয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে। জারা নিজে থেকে কাছে আসবে না, তাকে কাছের মানুষ বানাতে হলে আগ বাড়িয়ে প্রবেশ করতে হবে তার নিজস্ব জগতে। তবে যে কেউ তা পারবেনা। সেই পারবে যাকে নিজের জগতে প্রবেশের অধিকার জারা দেবে।

জারার হাত ধরে কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে যেতে বিস্তর গল্প সেরে ফেললো আমারা। তার ছোটবেলার মজার ঘটনা থেকে শুরু করে দুইদিন আগে দেখা ভূতের সিনেমা অবধি। জারা কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা, পাথরের মতন মুখ মেয়েটার। ক্ষণে ক্ষণে বিরক্তির আভাসে ভ্রু কুঁচকে এলো অবশ্য, সেসবকে বেমালুম বেপাত্তা ধরেই আমারা নিজের কথোপকথন জারি রাখলো। সে জানে, জারা বিরক্ত নয়, মোটেই বিরক্ত নয়। বহুদিন বাদে কারো সঙ্গ, কারো কন্ঠস্বর এভাবে কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে বলেই অভ্যন্তরীণ আবেগ মিছে বিরক্তির অভিব্যক্তি হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।

জারা সেকশন তেরেসার শিক্ষার্থী। নিজের ক্লাসের সামনে এসে তাই থমকে দাঁড়িয়ে কানে আঙুল চালালো সে। ভ্রু কুঁচকে আমারাকে একনজর দেখে বিড়বিড় করলো,

- বকবক করে কানটা ঝালাপালা করে দিলো! মেয়েমানুষ এত কথা বলতে পারে!

খিলখিল করে হাসলো আমারা। জারার পিঠ ঠেলে ক্লাসের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে হাত নাড়লো।

- তুই ডরমে তাড়াতাড়ি ফিরলে কামিজদুটো আয়রন করে রাখিস, কেমন?

- ইশ! আমি তোর দাসী লাগি তো! যা ভাগ! কোত্থেকে যে সব চলে আসে দোস্ত হতে!

গজগজ করতে করতে নিজের ডেস্কের দিকে এগোলো জারা। আমারা মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের ক্লাসের দিকে এগোলো। সেকশন তেরেসার অন্যান্যরা অতীব বিস্মিত হয়ে দেখলো আমারা চলে যাওয়ার পরপরই জারার অধরজুড়ে ফুটে ওঠা অতি পরিমিত এবং স্নিগ্ধ এক হাসি। এই প্রথমবার তার ঠোঁটে প্রফুল্লতা খেলা করছে, কোনো মানুষের কারণে। ক্ষণে ক্ষণে নিজের বুকপকেটের ব্রুচটা ছুঁয়ে দেখছে সে।

。

。

。

দুপুর তিনটা বেজে ছাব্বিশ মিনিট।

গোটা ক্যান্টিন ফাঁকা প্রায়। সকলের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ। প্র্যাকটিস শেষে দোহা যখন এসেছে তখন একটি স্যান্ডউইচ বাদে ক্ষুধা মেটানোর তেমন কোনো খাবার অবশিষ্ট নেই। নির্জন ক্লাসরুমে একাকী বসে দুই কামড়েই গোটা স্যান্ডউইচ সাবার করে পানি গিলে নিলো দোহা। তাতেও খুব একটা সুবিধা হলোনা। আজ সকালে কিছু খায়নি, তার উপর ফুটবল ম্যাচের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম। অনিক - রাজীবদের সাথে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার প্ল্যানটা এড়িয়ে গিয়েছে নিজের টেস্টের প্রস্তুতির বাহানায়। ওরা যেখানে যায়, সেখানে এক বসায় হাজার টাকা উগড়ে দেয়া ছাড়া উঠে আসা দায়। টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে রইলো দোহা। মন কিংবা শরীর, কোনোটাই আর ভালো লাগছেনা তার। ব্যাগের ভেতর ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতেই সেটা বের করে কানে ধরলো সে,

- ভালো আছিস ভাইয়া?

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সামান্য হাসলো দোহা,

- হ্যাঁ আপু। তুমি কেমন আছো?

- আমার দিনও অনেক ভালো যাচ্ছে। একটা টিউশন ছেড়ে দিয়েছি। এখন সময় মেইনটেইন করা সহজ হয়েছে কিছুটা।

- অনেক ভালো করেছ।

- তোর ক্রেডিট। যাই হোক, পড়াশোনা -খেলাধূলা কেমন চলছে? স্কলারশিপ ধরে রাখতে পারবি তো?

- খুব পারবো। এইতো একটু আগে ফুটবল টিমের প্র্যাকটিস শেষ হলো। তিনদিন বাদে ফাইনাল ম্যাচ।

- ওয়াও! ছবি ভিডিও তুলিস কেমন? তুই বাসায় এলে দেখবো।

- হাহা... আচ্ছা।

- দুপুরে কি খেয়েছিস?

এক মুহুর্ত থমকালো দোহা। তারপর বিড়বিড় করলো,

- ওই, বন্ধুদের সাথে খিচুড়ি খেয়েছি।

- খুব ভালো। কোনোকিছু প্রয়োজন হলে আমাকে জানাস কেমন?

- হুম। চিন্তা করোনা একদম। আমি খুব ভালো আছি। আর কিছুদিন, এরপরই বন্ধ পড়লে দেখা হবে।

- আমিও সেই অপেক্ষায় ভাইয়া। রাখি তাহলে। ভালো থাকিস। ভালোমত পড়াশোনা করিস।

ফোন কেটে গেলো। স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলো দোহা। পরিহাসের এক হাসি ফুটলো অধরে। সেই অনুভূতি গোপন করতে পুনরায় ডেস্কে মাথা ঠেকালো সে।

ঠাক!

কিছুক্ষণ বাদে আলতো একটা শব্দে চট করে মুখ তুলে তাকালো দোহা। তার ডেস্কের উপরে শোভা পাচ্ছে একটা ধাতব টিফিন বক্স, যার উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে আমারা। মেয়েটার চেহারা বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। তাতে যারপরনাই হতবাক হলো দোহা। সকালে সে প্রথম লেকচার ছাড়া কোনো ক্লাস করেনি, তাই আমারাকে লক্ষ্য করার খুব একটা সুযোগও হয়নি। গতকালের ব্রেক আপের পরও সে এতটা স্বাভাবিক কেনো?

- আজকে প্রথমবার মামণির স্পেশাল চিকেন কোরমা ট্রাই করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে।

আপনমনে টিফিন বক্স খুলে দোহার সামনে রাখলো কিশোরী। কোরমার সঙ্গে নরম নানরুটি দুটো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো দোহা। একবার খাবার, আরেকবার আমারার মুখের দিকে। শক্ত একটি ঢোক নেমে গেলো তার কন্ঠতালু বেয়ে। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে শান্ত কন্ঠে বিড়বিড় করলো,

- আমি ভেবেছিলাম আমাদের ব্রেক আপ হয়ে গিয়েছে।

- কে বলেছে?

ভ্রু তুলে প্রশ্ন ছুঁড়লো আমারা। স্থির তাকিয়ে রইলো দোহা। ঠান্ডা কন্ঠে বলতে নিলো,

- প্রিন্সেস, লিসেন টু মি.... উম্ফ!

- হুশশ!

সহসাই দোহার ঠোঁটে তর্জনী চেপে তাকে নীরবতায় ঠেলে দিলো আমারা। প্রসারিত হলো কিশোরের দৃষ্টি, যা অতি সত্ত্বর গিয়ে ঠেকলো নিজের অধর ছুঁয়ে থাকা আঙুলে। দূর্বোধ্য এক ইচ্ছা হলো অন্তরের, দাঁতের পাটির মাঝে কোমল প্রশস্ত আঙুলটি কামড়ে ধরার। দুই হাত শক্তভাবে মুঠো চেপে সেই তীব্র বাসনা দমিয়ে রাখলো সে, ভীষণভাবে। আমারা যেন তার মনের চিন্তা উপলব্ধি করতে পারলো। তাই দ্রুতই নিজের আঙ্গুল সরিয়ে নিলো। কিঞ্চিৎ লালিমা মাখা চেহারায় কন্ঠ পরিষ্কার করে বললো,

- আমাদের সম্পর্ক আগে যেমন ছিলো, এখনো তেমনি আছে, অটুট।

নিষ্পলক চেয়ে রইলো দোহা। আমারা ডেস্কের উপর ঝুঁকে এসে টিফিন বক্সের নানরুটি ডান হাতে ছিঁড়ে নিতে নিতে বিড়বিড় করলো,

- ইউ নো হোয়াট? ইউ ওয়্যার নট ইন ইওর রাইট মাইন্ড ইয়েস্টারডে। তাই আমি তোমার কথার কোনো উত্তর দেইনি। কারণ আমি জানতাম, উত্তেজিত মস্তিষ্কের বিপরীতে নীরব থাকাই শ্রেয়। সময় মহামূল্যবান ঔষধ। যা আমাদের চিন্তাভাবনাকে পরিণয় দান করে। সময় নিয়ে ভাবলে নিজের ঝোঁকের বশে নেয়া অনেক সিদ্ধান্তের মাঝেও ভুল খুঁজে পাওয়া যায়। যখন তুমি বললে চলো ব্রেক আপ করে ফেলি, তখনি আমি বুঝে গিয়েছিলাম.....ইউ নিডেড টাইম।

অপর হাতে দোহার চিবুক ছুঁয়ে তার ঠোঁটজোড়া সামান্য ফাঁক করে আমারা নানরুটিতে মাখানো কোরমাটুকু সযতনে মুখে পুরে দিলো, মুচকি হেসে বললো,

- আন্ডারস্ট্যান্ডিং। প্রেমের সম্পর্কের আরো একটি খুঁটি। উত্তেজনার বিপরীতে উত্তেজনা রেষারেষি সৃষ্টি করে। তোমার কথার প্রতিবাদে আমি রাগারাগি করলে ব্যাপারটা প্রকট আকার ধারণ করতো। সেখান থেকে অভিমান। তারপর বিচ্ছেদ। আমি চুপ থেকেছি, সময় দিয়েছি। তুমি নিজেকে বুঝেছ, ভুলটা ধরতে পেরেছ। ব্যাস, ঝগড়া - অভিমানের কোনো অবকাশ নেই।

খাবারটুকু যেন গলার মাঝে দলা পাকিয়ে গেলো। চোখের ভেতর জ্বালা অনুভব করলো দোহা, অদ্ভুত এক দহনজ্বালা! ঝাপসা হলো দৃষ্টি। সেই অনুভব লোকাতে চটজলদি আমারাকে কাছে টানলো। ঘুরে বসে প্রেয়সীর কোমর শক্তভাবে আলিঙ্গন করে নিলো। ভার এবং ভুঁড়ির কারণে তাতে কিছুটা সমস্যা হলো বৈকি, পরোয়া করলোনা। কোমল উদরে মুখ গুঁজে দিলো সে, নিজেকে হারালো ভীষণভাবে। আমারার দুহাত জড়িয়ে গেলো তার কাঁধে, মাথাটি আগলে নিলো নিজের মাঝে অতি যতনে। হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো চুলে এবং ঘাড়ে। দোহা মুখ ঘষে ফিসফিস করলো,

- ড্যাম ইউ!

আমারা ফিক করে হেসে ফেললো। দোহা তাকে আরো জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরলো, যেন মিশে যেতে চায় তার অস্তিত্বের সঙ্গে। ঝুঁকে কিশোরী ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইলো,

- ব্রেকআপ ক্যান্সেল?

- যেন এছাড়া কোনো উপায় ছেড়েছ তুমি!

- হেহে, অবশ্যই আছে। তুমি না চাইলে আমি অবশ্যই তোমাকে জোর করবো না, জানো তো?

দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে আমারার অস্তিত্বের মেশানো সুবাসটুকু গ্রহণ করে দোহা কিঞ্চিৎ কর্কশ কন্ঠে বললো,

- ইউ আর সো সুইট দ্যাট আই ফিয়ার ডায়াবেটিস!

নিঃশব্দে হাসলো আমারা, ঝুঁকে এসে আলতোভাবে নিজের অধর ছুঁয়ে দিলো দোহার মাথায়। যে পরিতৃপ্তি এবং ভালোবাসার অনুভূতি ছেয়েছে তার অন্তরজুড়ে, তা অতীব অতুলনীয়।

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন