#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৩
পর্ব ১৩: [ পিকনিক ]
━━━━━━━━━━━━
জারার পদচারণ বিড়ালের মতন নিঃশব্দ। সে যখন রুমে ঢুকে তখন বোঝার কোনো উপায় থাকেনা। বরাবরের মতোই যখন সে চাপানো দরজা অতিমানবীয় নৈঃশব্দ্য প্রয়োগে খুলে ভেতরে এলো, তখন নিজের টেবিলে বসে আমারাকে ডুবে থাকতে দেখলো আপন জগতে। মেয়েটা বেশিরভাগ সময় পড়ালেখা করে, অন্য সময় রঙিন কাগজ দিয়ে ফুল - পাতা - নৌকা ইত্যাদি ইত্যাদি বানায়। সেসবে টেবিল, আলমারি এমনকি জারার ওয়্যারড্রোব অবধি ভরে উঠেছে। প্রথম প্রথম প্রতিবাদ করলেও ইদানিং আপত্তি জানানো ছেড়ে দিয়েছে সে। নিঃশব্দে আজ কি যেন ভেবে আমারার পিছন থেকে উঁকি দিলো জারা, দেখার জন্য যে মেয়েটা কি করছে।
একটা মোটা ডায়েরী। যার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভর্তি গোটা গোটা অক্ষরের লিখায়। কোনোটা কবিতা, কোনোটা অগোছালো লাইন। এই মুহূর্তে একটি পৃষ্ঠাজুড়ে কিছু একটা রচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছে আমারা,
“ শ্রাবণঘন মুষলধারে
অনাহারের হাহাকারে
সুখ খুঁজে নাও, হাসি বিলাও
প্রিয় আমার, খুশিতে কাঁদাও
তোমার দুহাত সিক্ত শুদ্ধ
ভিজে অন্তর করেছে মুগ্ধ —”
নিশ্বাসরুদ্ধ চেয়ে থাকলো জারা। এটা কবিতা? কিংবা গান? যাই হোক না কেনো, আমারার মাঝে এই দক্ষতাটি উপস্থিত সেই বিষয়টি এর আগে কোনোদিন উপলব্ধি করেনি সে। ভারী শরীরের অধিকারী কিশোরী নিজের আপন জগতে এতটাই মশগুল যে আশেপাশের কিছুই তার নজরে আসছেনা। লাইন কেটে নতুনভাবে লিখছে সে, নয়ত আবার ফিরে যাচ্ছে আগের লাইনে, খুঁজে ফিরছে ছন্দ।
- এটা গান? কবিতা? নাকি প্রেমপত্র?
জারার কন্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই রীতিমত লাফিয়ে উঠলো আমারা। দুহাতে জোরালোভাবে চেপে ধরলো ডায়েরীটা। তবে শেষরক্ষা হলোনা। ব্ল্যাক প্যান্থার কিশোরী অসম্ভব ক্ষীপ্রতায় সেটি ছো মেরে নিয়ে মুখের সামনে মেলে ধরলো। উল্টে গেলো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। যত দেখলো তত নয়ন প্রসারিত হলো তার।
- মাই গুডনেস! আমার রুমে এত বড় সাহিত্যিক বসবাস করে নাকি?
- জারা!
আমারা গুঙিয়ে উঠে পিছন থেকে জাপটে ধরে ডায়েরী কেড়ে নিতে চাইলো জারার থেকে। তার তুলনায় উঁচু জারা সেটি হাতে উপরে তুলে ধরে তীর্যক হাসলো,
- আরে দেখতে না দিলে লিখিস কেনো? সবই কি শুধু তোর ওই প্লেবয় বয়ফ্রেন্ডকে দেখাবি নাকি?
- দোহা প্লেবয় না। আর...আমার ডায়েরী ফেরত দে বলছি!
আমারা লজ্জা পেয়েছে বুঝতে পেরে জারা ডায়েরীটা তার বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো। তারপর হাত ঝেড়ে এমন ভান ধরলো যেন অপবিত্র কিছু ছুঁয়ে ফেলেছে। আমারা চোখ পাকিয়ে নিজের ডায়েরী বুকে চেপে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
- কি ক্রিঞ্জ, ছিঃ! তোমার দুহাত সিক্ত শুদ্ধ, করেছে মুগ্ধ....আরে ব্যাটা গরুর গোবরে হাত দিয়েছে গিয়ে দেখ!
জারার কথায় এবার খিলখিল করে হেসে উঠলো আমারা। তার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে জারা তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বললো,
- একটা পাবনার পাগলা গায়ক, আরেকটা লেজুড়ে লেখিকা, ভালোই জুটি বাঁধিয়েছিস তোরা। অন্যের জীবন ঝালাপালা করার দারুণ টেকনিক!
হাসি বিস্তৃত হলো আমারার, ডায়েরী নিজের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে ফিরে তাকিয়ে দেখলো জারাকে। বরাবরের মতই শার্ট প্যান্ট পরনে। কাঁধসমান চুল মাথার পিছনে দুভাগ করে একভাব বান করে বাকিটা ছেড়ে রেখেছে। যারপরনাই মা*স্তানের মতন দেখাচ্ছে তাকে!
- তুই পিকনিকে এভাবে যাবি?
আমারার অসংলগ্ন কথায় চমকে নিজের অবয়বে চোখ বুলিয়ে আনলো জারা। শার্টের ভেতরের টিশার্ট খানিক ঝেড়েঝুড়ে জবাব দিলো,
- কেনো কি সমস্যা? তুই কি চাস কাপড় ছাড়া যাই?
হাসিটুকু অতি কষ্টে দমিয়ে রেখে আমারা বিড়বিড় করলো,
- না মানে,আমি যে কামিজটা পড়তে বলেছিলাম...
- ওরে মাদারের ঘরের মাদার!
কোমরের দুপাশে দুহাত রেখে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জারা বললো,
- আমি? আর সালোয়ার কামিজ? ন্যাকাবতী মনে হয় কোনদিক দিয়ে?
- তুই ব্যাটাছেলে বুঝি?
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো জারা, মাথা ঘুরিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বললো,
- শোন,আমি যে তোর পিছন পিছন যাচ্ছি এই বেশি। তোর বয়ফ্রেন্ড আর ওর বন্ধু নামক কলংকগুলো একটা আস্ত ইবলিশের দল। তোকে না আবার খামচে দেয় সেইজন্য পাহারাদার নিযুক্ত করলাম নিজেকে,কারণ কেউ একজন বলেছিল আমি নাকি তোর বেবিসিটার! বুঝেছিস? নাহলে আমার কোনো শখ নেই আউলা বাতাসে বাউলা হওয়ার, হেহ!
আলনায় ঝোলানো নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উল্টো ঘুরে দ্বিতীয় কোনো কথা ছাড়াই জারা বেরিয়ে গেলো রুমের বাইরে। আমারা আপনমনে খানিক হাসলো। আদতে জারাকে ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক এবং নিষ্ঠুর মনে হলেও আদতে ভেতরের মানুষটা একদমই হিতে বিপরীত। তার প্রমাণস্বরুপ আমারার দেয়া ব্রুচটা এখনো মেয়েটার শার্টের সঙ্গে ঝুলছে, বেশ খেয়ালে এসেছে বিষয়টা। মাথা নেড়ে আপনমনে প্রফুল্লতা ধরে রেখে আমারা উঠলো। জামা পরনেই ছিলো, শুধু ডেনিম জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে বিছানায় প্রস্তুত রাখা বাস্কেট এবং ম্যাট তুলে নিয়ে সেও বাইরে এলো। দ্রুত এগোলো, ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে জারা।
━━━━━━━━━━
একপাশে লেক। লেকের পাড়জুড়ে বিস্তৃত এক প্রান্তর। অন্তর এবং মস্তিষ্ক উভয় শান্ত করার এক মোক্ষম স্থান। সার দেয়া গাছপালা, অদূরে লেকের ওপাড়ে দিগন্তে ঢলে পড়া সূর্য। গোধূলীর গুটিগুটি আগমন। একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গোটা চারেক সাইকেল। এপাশে ঘাসের নরম আস্তরণে বসে থাকা বন্ধুদের দল। চমৎকার পরিবেশটা ছাপিয়ে গেলো রাজীবের কর্কশ কন্ঠস্বর,
- চুলের পিকনিক আমার, চুলের সূর্যাস্ত। চুলের বন্ধু, চুলের সময়, চুলের বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড, চুল...
- আরে ব্যাটা তোর চুল শেষ হয়না কেনো?
অনিকের বিরক্ত কন্ঠস্বরে তীব্র দৃষ্টিতে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকালো রাজীব। আজ তার কলেজের পছন্দের এক মেয়ের সঙ্গে ডেটিংয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু পিকনিকের বাহানায় একপ্রকার জোরজবরদস্তি করে এখানে তুলে আনায় সে বেজায় ক্ষেপে আছে। দোহা একপাশে বসে নিজের গিটারের টিউনিং করছে। নয়ন তুলে চেয়ে সে বিড়বিড় করলো,
- আরে তোর ডেট তো আর পালিয়ে যাবে না। আরেকদিন যাবি আরকি, নাকি আজই পৃথিবীলোক ত্যাগ করার ইচ্ছা আছে? শি উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।
- আর তোর গার্লফ্রেন্ড শালা? ভুটকি একটা! চাইলো বলেই এখানে এসে আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম বলে বসে থাকতে হবে আমাদের?
দোহা থমকালো, তার অভিব্যক্তির পরিবর্তন স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো সকলের। মাথা কাত করে সে হিংস্র এক দৃষ্টিতে রাজীবকে দেখে বললো,
- মাইন্ড ইওর টাং!
তার এমন কথায় রাজীব এবং পাশে বসে থাকা জিই - শু খানিক অবাক হলো বটে। তবে অনিক শান্ত। সে স্থির তাকিয়ে আছে দোহার দিকে। একমনে কি যেন ভেবে চলেছে।
- হ্যালো গাইয!
পরিচিত উৎফুল্ল কন্ঠস্বরটি কানে যেতেই সবাই ফিরে তাকালো। অবশেষে দেখা পেলো প্রান্তরে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকা আমারা এবং জারার। উভয় কিশোরীকে গোধূলীর আভায় অন্যরকম দেখাচ্ছে। বিশেষ করে পাশাপাশি হেঁটে আসার কারণে। আমারা ভারী আলুথালু শরীরের অধিকারী, অপরদিকে জারা ফিনফিনে লম্বাটে, লাস্যময়ীতার ছিটেফোঁটাও নেই, তার উপর দৈহিক বর্ণও কালোর কাছাকাছি প্রায়। যেন সমাজের মাপকাঠিতে অসুন্দরের মূর্ত প্রতীক দুইজন একে অপরের ঐক্যে বাঁধন ছিঁড়ে পরিণত হয়েছে মুক্ত বিহঙ্গে। এমনি এক অদ্ভুতুড়ে মায়াবী আভা ঘিরে আছে যুগলকে।
আমারা কাছে এসে ঝুঁকে বললো,
- তোরা সবাই ঘাসে বসে আছিস কেনো? সর, আমি ম্যাট বিছিয়ে দেই।
বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠলো সবাই। সরে দাঁড়ালো। আজকের কার্যক্রমে সত্যিকার অর্থে কারোরই তেমন উৎসাহ নেই। আমারা নিজেই এসবকিছুর আয়োজন করেছে। কি কারণে তা অবশ্য জানা যায়নি, সে সবাইকে আমন্ত্রণ করেছিলো। একপ্রকার মুখ রক্ষার খাতিরেই তাই সকলের আসা। নাহলে মেয়েটাকে তারা কম জ্বালাতন করেনি দোহার প্রেমিকা হওয়ার আগ অবধি। পরেও করবে, নাটক শেষ হওয়ার পর! আপাতত সাময়িক বিরতি!
জারার নীরব সহযোগীতায় ম্যাট বিছিয়ে সবাইকে বসতে বলে নিজের বাক্স নামিয়ে রাখলো আমারা। ধীরে ধীরে ভেতর থেকে জিনিসগুলো বের করে নিলো, অন্যান্যরাও চিপস - চকলেটের মতন কেনা খাবার নিয়ে এসেছে পিকনিক উপলক্ষে। সেগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে অতর্কিতে নিজের কোমরজুড়ে একজোড়া হাতের উপস্থিতি টের পেলো আমারা। সামান্য কাঁপলো। পিছনে তাকানোর প্রয়োজন হলোনা বুঝে ওঠার জন্য, তাকে ধরে রেখেছে দোহা। নীরবে কাঁধে মাথা রেখে কাজ দেখে যাচ্ছে হাতের। লজ্জায় আমারার ফোলা গালজুড়ে লালিমা ফুটলো। ফিসফিস করে সে বললো,
- কি করছো? সবাই আছে!
- আমার গার্লফ্রেন্ডকে ধরেছি, তাতে কার বাপের কি?
- উফ্, দোহা...
- হিহি, ইউ স্মেল সো নাইস প্রিন্সেস! উম...
আমারার ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে মিনমিন করলো দোহা, একেবারে বিড়ালছানাটির ন্যায়। তাতে চোখের কোণে সব খেয়াল করতে থাকা জারা বেজায় তেঁতে উঠলো। হাতের কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল ধপাস করে মাটির উপর রাখতেই অগ্ন্যুৎপাতের মতন ফুঁসে উঠে পানীয় লাভার মতন হা*মলা চালালো বসে থাকা অনিকের প্যান্টে।
- কালোজিরা!
তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠলো অনিক। ভিজে উঠতে থাকা প্যান্ট ঝাড়তে শুরু করলো ক্রমাগত। নিদারুণ প্রচেষ্টায় লাভ তো হলোই না উল্টো কোমরের নিচে স্পষ্টতর হয়ে উঠলো ভেজা দাগ। তাতে মজা পেয়ে ঘাসে গড়াগড়ি দিয়ে জিই - শু বলে বসলো,
- হিহিহি... অনিক হিশু করে দিয়েছে!
- ওরে নাটকি! গিলবি তুই? হিশু গিলবি?
বোতলটা বাগড়ে ধরে জিই - শুর উপর ঢালার ষড়যন্ত্র সফল করার আগেই সেটা টেনে ধরলো জারা। তীব্র কন্ঠে বললো,
- এটা পান করার জিনিস।
- আজ্ঞে, যেটা আপনি আমার প্যান্টকে পান করতে দিয়েছেন!
পাল্টা কর্কশ জবাব অনিকের। উভয় বান্দার তীব্র বৈদ্যুতিক দৃষ্টি বিনিময় হলো। এতটাই শক্তিসম্পন্ন যে মাঝখানে কোনো দেয়াল থাকলে নিশ্চিত ভষ্ম হয়ে যেতো। জারা নজর সরিয়ে "কেয়ার করিনা " ভঙ্গিতে টিস্যু নিয়ে নিজের হাত মুছতে গেলেই সেটা সজোরে টেনে নিলো অনিক। কিশোরী আবার হাত বাড়াতেই সে আগ বাড়িয়ে একেবারে বক্সটাই ডাকাতি করে নিজের কোলে রাখলো। চুলায় বসানো হাড়ির মতন ফুঁসে উঠে জারা বলে উঠলো,
- ওসব কোথায় গুঁজবি শুনি?
- তোকে বলবো কেনো? কালোজিরা!
- আর তুই মনে হয় সরিষার তেল? একসাথে ভর্তা হতে ইচ্ছুক?
- হেহ! মুখজুড়ে অন্ধকার, এসেছে এই অনিকের সাথে ভর্তা হতে! যা ভাগ!
- ব্যাটা মানুষ আসলেই কুজাত।
- তুই কি বুঝবি ব্যাটা মানুষের প্রয়োজন? অবশ্য বুঝতেও পারিস, যেই না একখানা পাটকাঠির মতন শরীর, অর্ধেক ব্যাটা। অন্ধকারে লাইট দিয়েও তোকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। পাতিলের তলাও তোর থেকে পরিষ্কার।
এবার আর কোনো পাল্টা জবাব এলোনা। নিজের জিত হাসিল করে আপনমনে বিস্তর হাসতে গিয়েও থমকে গেলো অনিক। এতক্ষণ একপ্রকার পায়ে পা দিয়েই ঝগড়া করলেও বর্তমানে জারা আর তার দিকে তাকিয়ে নেই। বরং, সরে বসেছে বেশ খানিকটা দূরে। ব্যাস্ত হয়েছে অন্য কাজে। যদিও মেয়েটার ঠান্ডা এবং পাথুরে চেহারায় কিছু বুঝে ওঠা দায়, তবুও অনিকের কেনো যেন মনে হলো.... সে কোথাও একটা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
অনিক এবং জারার মধ্যকার বিনিময় অবশ্য অন্যদের তেমন একটা দৃষ্টিগোচর হলোনা। সবাই ততক্ষণে গোল হয়ে বসেছে। হরেক রকমের খাবারের পসরা। বিস্কিট, ক্র্যাকার, চিপস, পুডিং, ফলমূল ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় একটি ত্রিভুজাকৃতির কেক। দেখেই বুঝা যাচ্ছে হাতে বানানো। উপরে কিছুই লিখা নেই। শুধু ছোট্ট করে একটা ফুল আঁকা। দোহা পা এলিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো,
- এই কেক আবার কিসের জন্য?
- তেমন কিছুনা। আজকে বেকিং করেছি রেসিপি দেখে। তাই ভাবলাম নিয়ে আসি সাথে।
জারা আমারার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নেড়ে কথার পিঠে বললো,
- আজকে ওর জন্মদিন।
গ্লাসের পানীয়ে চুমুক দিয়েছিল ছেলের দল, কথাটা শোনামাত্র তারা সবাই একসাথে কেশে উঠলো। একে অপরের মাঝে ভীষণ অস্বস্তিকর দৃষ্টি বিনিময় করলো। পরক্ষণেই রাজীব খেঁকিয়ে উঠলো,
- তুই কিভাবে জানলি?
- যেভাবে তোদের দোহা জানলো না, সেভাবে।
জারার সরাসরি খোঁচায় দোহা বেশ বিব্রতবোধ করলো। সত্যিই আমারার জন্মদিন জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ সে করেনি। আজ হঠাৎ পিকনিকের প্রস্তাব দেয়ার পরও সন্দেহ হয়নি। খানিক অপরাধীর ভঙ্গিতে সে আমারার দিকে তাকালো,
- সরি প্রিন্সেস, আই ডিড নট...
- না না। আমি সরি। এটা এমনিতেও কারো জানার কথা ছিলোনা। আমি তো শুধু...
আনমনে জারার সঙ্গে বোঝাপড়ার দৃষ্টি মিলিয়ে আমারা দোহার দিকে ফিরলো আবার।
- আমি শুধু সবার সাথে মিলে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সময় কাটাতে চেয়েছিলাম। এইটুকুই।
- ভাবী আমাদের খুবই মহান।
জিই - শুর কথায় টকটকে হয়ে উঠলো আমারার চেহারা। দোহা দ্রুতই বন্ধুর ঘাড়ে সপাত সপাত দুটো চাটি দিয়ে আমারার দিকে ফিরলো। দ্রুতহাতে বাক্স থেকে ছু*রি বের করে প্রেমিকার হাতে ধরিয়ে দিলো।
- মোমবাতি তো নেই। দাঁড়াও আমি দেখছি অ্যারেঞ্জ করা যায় কিনা।
সে উঠতে নিলেই আমারা তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলো। মৃদু হেসে বললো,
- আরে তুমি এত বিচলিত হচ্ছো কেনো? মোমবাতি লাগবেনা। বসো, তোমরা তো আছো, জারা আছে, এই যথেষ্ট।
বসলো দোহা। সকলেই কাছে এগিয়ে এলো। ঘিরে ধরলো আমারাকে। প্রবল বাঁধা সত্ত্বেও জোরপূর্বক জারার হাত ধরে একসাথে কেকটা কাটলো আমারা। তার সঙ্গে সকলের সম্মিলিত কন্ঠস্বরে সুরেলা শুভেচ্ছা,
- হ্যাপি বার্থডে টু ইউ! হ্যাপি বার্থডে টু ইউ ডিয়ার আমারা, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
কিশোরীর মুখজুড়ে যে তীব্র খুশির উচ্ছলন দেখা গেলো, তা অতীব মনোমুগ্ধকর ঠেকলো সবার নিকট। এখানে সবাই সবার বন্ধু নয়। একে অপরের মধ্যে রয়েছে রেষারেষি, প্রতিযোগী মনোভাব, প্রতিশোধের বাসনা, রহস্য, গোপনীয়তা। তবুও ওই মুহূর্তে গিয়ে যেন এক সুরে বাঁধা একটি প্রাণে পরিণত হলো তারা। যদি না পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং ভাগ্য তাদের উপকূলে থাকতো, তাহলে হয়ত “বন্ধুত্ব ” নামক এক পবিত্র প্রগাঢ় অনুভব ঘিরে থাকতো সকলকে, আজীবনের আশ্বাসস্বরূপ।
ধীরে ধীরে গোধূলী পড়তে আরম্ভ করলো। দিগন্তে অস্তমিতপ্রায় সূর্য। খাওয়া দাওয়া এবং হাসিঠাট্টার পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। একে অপরের সঙ্গে কাটানো স্বর্গীয় মুহূর্ত অনুভবে ব্যাস্ত প্রত্যেকে। সোনালী কমলাভ আভায় ছেয়ে যাওয়া জগৎ। এর মাঝেই অনিক হঠাৎ বলে উঠলো,
- একটা গান ধর দোহা, প্লীজ!
- হ্যাঁ। তোর ভয়ং*কর গান না হলে আজকের সময়টাই বৃথা।
বন্ধুদের জোরালো অনুরোধে অবশেষে গিটারটা হাতে তুললো দোহা। মিটমিট করে হেসে কর্ডে আঙুল চেপে ফিরলো একপাশে বসে থাকা প্রেমিকার দিকে চেয়ে বললো,
- ফর ইউ প্রিন্সেস।
সবাই একসাথে এমন এক হুল্লোড় করে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে যে আমারা বেচারী দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে দাঁতে অধর কামড়ে ধরলো। মুচকি হাসলো দোহা। আঙুল তার গিটারের ফ্রেডবোর্ডের উপর খেলে চললো তরঙ্গের মতন। মনমাতানো সুরে মুহূর্তেই ছেয়ে গেলো গোটা প্রান্তর। সঙ্গে ঐন্দ্রজালিক এক দরাজ কন্ঠস্বর,
“ আমি তাহার কথা বলি
তাহার কথা বলতে বলতে নাও দৌঁড়াইয়া চলি ”
একে একে অনিক, রাজীব এমনকি বিদেশী জিই - শুও সঙ্গীতের কলতানে যোগদান করলো। হাতের তালিতে, থালার ঝংকারে এবং কাঠের উপর ঢোলের তালে গোটা পরিবেশ এক অপূর্ব সুন্দরিমা ধারণ করলো।
“ হাত খালি গলা খালি
কন্যার নাকে নাকফুল
সেই ফুল পানিতে ফেইলা
কন্যা করলো ভুল ”
আশেপাশে উপস্থিত অন্যান্যরা বারংবার ফিরে ফিরে দেখলো বন্ধুদের দলটিকে। মনোমুগ্ধকর গোধূলী। নিজের স্থানে বসে একদৃষ্টে দৃশ্যটি পর্যবেক্ষণ করে গেলো আমারা, হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো জারার হাত, যে নিজেও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। হাজার চাওয়া সত্ত্বেও মুহূর্তটি থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলোনা আমারা। হয়ত আজীবনের স্মৃতি হয়ে তার মণিকোঠায় রয়ে যাবে এই সুরেলা গোধূলী, এবং তার হৃদয়ের পুরুষটির কন্ঠস্বর..........
“ কন্যা ভুল করিস না, কন্যা ভুল করিস না
আমি ভুল করা কন্যার লগে কথা বলবো না ”
সে অনুধাবনও করতে পারলোনা গানটির কথাগুলোর মাঝে কত না অব্যক্ত আবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার প্রিয়তমের। সে শুধু দেখলো একদল বন্ধুকে, যে বন্ধু নামক সত্তাদের নিজের সদ্য এগোতে থাকা জীবনে কখনোই লাভ করেনি আমারা।
。
。
。
পিকনিকের কার্যক্রম শেষ। সন্ধ্যা প্রায়। সবকিছু গোছগাছ করে বাক্সে ভরতে ব্যাস্ত আমারা এবং জারা। রাজীব , জিই - শু ডাস্টবিনে ফেলে আসতে গিয়েছে খালি প্যাকেট। দোহা চাদর তুলে ভাঁজ করে নিতে নিতে হঠাৎ নিজের কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করে থমকালো। পিছন ফিরে দেখলো অনিককে। ছেলেটার চেহারা সুস্থির, খানিকটা শীতলও।
- গুড জব।
দোহা ভ্রু তুলে তাকালো। হঠাৎ করে এমন কথার অর্থ ধরতে পারেনি। অনিক সামান্য হাসলো। তারপর জানালো,
- আজকে ১৭ তারিখ।
দ্বিধান্বিত হয়ে কিছু উচ্চারণ করতে যাচ্ছিলো দোহা, তবে তার আগেই অনিকের ক্ষীণ কন্ঠে ধ্বনিত হলো,
- ওয়ান মান্থ এন্ডস টুডে দোহা! তোকে আর অভিনয় করতে হবেনা! ইটস টাইম টু ব্রেক হার!
সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়লো দোহা, নয়নজোড়ার মাঝে ফুটলো দূর্বোধ্য অনুভূতি। হাতের চাদর আধভাঁজ হয়েই রইলো। অবাধ্য হৃদস্পন্দনে সে ফিরে তাকালো সামনে, হাসিমুখে জারার সঙ্গে গোছগাছের কাজ করতে থাকা আমারার দিকে।
—চলবে—