ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১৪তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১৪

পর্ব ১৪: [ সত্যের রং ]

━━━━━━━━━━━━━

ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে সড়কের রিকশার বেল। দূরে ভারী যানবাহনের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়েছে মানুষের কোলাহলে। সড়কের ধারে ধারে ছোট টং দোকান, হেঁটে চলা পথচারী কিংবা বিক্রিতে ব্যাস্ত ফেরিওয়ালা। এর মাঝখান দিয়েই পাশাপাশি হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দোহা এবং আমারা। বাকি সকলে ডরমে ফিরলেও তারা ফিরে যায়নি, উভয়ে কিছুটা নিভৃত সময় লাভের জন্য একাকী হাঁটতে বেরিয়েছে। প্রস্তাবটা দোহা নিজেই দিয়েছিলো। স্নিগ্ধ সময়টা বেশ উপভোগ্য লাগছে আমারার। দোহার হাতটা সে শক্ত করে মুঠোর মাঝে পাকড়াও করে রেখেছে। এক অদ্ভুতুড়ে ভালোলাগায় আচ্ছাদিত তার হৃদয়, ঠোঁটজুড়ে তাই মায়াবী হাসি।

- তুমি খুব ভালো গান গাও দোহা।

আমারার মৃদু কন্ঠে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো দোহা। কিছু না বলে সামান্য হাসলো।

- আমি সত্যি বলছি। তুমি কি গান শিখেছ?

- আগে শিখতাম। বেশ কয়েক বছর হলো ছেড়ে দিয়েছি।

- কেনো?

এই প্রশ্নের জবাব এলোনা। আমারা তার হাতের আঙুলগুলো নিয়ে নড়াচড়া করতে করতে বললো,

- তোমার আবার চর্চা করা উচিৎ। আমার মনে হয় তুমি এটাতে সময় দিলে অনেক ভালো করবে।

মুঠো হয়ে এলো দোহার হাত, এতটা শক্তভাবে যে উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বক ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করলো। আমারা নিজের অজান্তেই তার অন্তরের সবচেয়ে কোমল জায়গাটি ছুঁয়ে দিয়েছে। তার স্বপ্ন—

একজন গায়ক হওয়ার স্বপ্ন!

যে স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দিয়েছে সে আরো আগে, শক্ত করেছে হৃদয়কে, পাথর হয়েছে অনুভূতি। এখন যেন আর কিছুতেই কিছু আসে যায়না। তার চেহারার অভিব্যক্তির পরিবর্তন আমারার দৃষ্টি এড়ালোনা। থামলো কিশোরী। একটি হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো দোহার গাল। নমনীয় কন্ঠে শুধালো,

- দোহা? কি হয়েছে হুম?

- ক...কিছুনা।

- নিজের স্বপ্নের কথা ভাবছো?

স্তব্ধ হলো দোহা, দৃষ্টি প্রসারিত হলো তার। স্থির তাকিয়ে রইলো সে আমারার উদ্দেশ্যে। পাতলা অধরজুড়ে এক অকৃত্রিম ভরসার হাসি খেলা করছে।

- আমাদের জীবনে এমন অনেক প্রতিবন্ধকতা আসে। কিন্তু তাই বলে কি স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবো? আজ যা অবাস্তব লাগছে, কাল তাই বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। প্রয়োজন শুধু সাধনা এবং অধ্যাবসায়ের। তুমি পারবে দোহা, চেষ্টা করলেই পারবে।

আমারা কথাগুলো জেনে বলছে নাকি আন্দাজে সে সম্পর্কে দোহা জানেনা। তবে অদ্ভুত হলেও সত্য, নিজের হৃদয়ে সে আন্দোলন অনুভব করলো। স্বপ্নটাকে কি আদও সে চাপা দিয়ে দিয়েছে? উহু, এখনো এক টুকরো ক্ষীণ আশার শিখা হয়ে তা প্রজ্জ্বলিত। ব্যান্ডদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা শুধুমাত্র টাকার লেনদেনের জন্য নয়, ব্যাপারটা আত্মিক। সে চাইলে ওই সময় অন্য কিছুতে ব্যয় করে দ্বিগুণ উপার্জন করতে পারে, তবুও পায়ের তলার মাটিটুকু কাম*ড়ে পড়ে আছে দোহা। এক সুদিনের আশায়, নিজেকে প্রমাণ করার প্রয়োজনে। তার সংগ্রামে বিশ্বাস রাখেনি এমন মানুষের অভাব নেই। তবে আজকে তার মুখোমুখি দাঁড়ানো মেয়েটি, এ কোন মুখে তাকে এই ধরণের কথা অতি অবলীলায় বলতে পারছে?

নিজের আপনজনেরাই দোহাকে কোনোদিন বিশ্বাস করেনি। সেখানে এই পরের ঘরের মেয়ে, যাকে শুধুমাত্র নিজের অতিরিক্ত উপার্জনের হাতিয়ার হিসাবে খেলার গুটির মতন ব্যবহার করে যাচ্ছে সে, কিভাবে পারে তার উপর এতটা ভরসা স্থাপন করতে? যদি পৃথিবীর সমাপ্তিও হয়ে যায়, তবুও কি কোনোদিন এই মেয়েটির মতন কাউকে দোহা খুঁজে পাবে নিজের হাতটি ধরে পাশাপাশি পথ চলতে?

প্রথমবারের মতন বুক কাঁপলো দোহার, একটি স্বতঃস্ফূর্ত হৃদয়কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়ার আতঙ্কে।

দোহার মুখ থমথমে হয়ে যেতে দেখে আমারা তার দুহাত ঝাঁকিয়ে বললো,

- কি ভাবছো? আই হোপ, খারাপ কিছু নয়।

দ্রুত মাথা নেড়ে কন্ঠ পরিষ্কার করলো দোহা।

- না না। বাদ দাও। তুমি বলো...

- কি বলবো?

- এইযে আজকে তোমার জন্মদিন, আর আমি তোমাকে কিছুই দিলাম না। তোমার খারাপ লাগছেনা?

মিটিমিটি হাসলো আমারা।

- এতে খারাপ লাগার কি আছে? আমি যা চাই, তা তুমি আমাকে বহু আগেই দিয়ে দিয়েছ।

- কি দিয়েছি আমি?

- তোমাকে।

হৃদয়জুড়ে করুণ এক ঝংকার খেলে গেলো। শক্ত ঢোক গিললো দোহা। অজান্তেই আমারার দুহাতের মাঝে তার হাতজোড়া ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠলো। ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে কেনো সবটা এত কঠিনতর হয়ে উঠছে? দৃষ্টি লুকালো সে, সামান্য কাঁপা কন্ঠে বললো,

- আমাকে?

- হুম। তুমি আমাকে নিজেকে উপহার দিয়েছ। এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে বলো? আমার কোনোকিছুর অভাব নেই, শুধু একটা তুমির অভাব। সেই অভাব তুমি পূরণ করে দিয়েছ।

একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো দোহা। বিড়বিড় করলো,

- ইচ্ছা করছে তোমাকে মনের মণিকোঠায় লুকিয়ে রাখি। কেউ যেন কক্ষনো খুঁজে না পায়।

- হিহি, মজাদার হবে ব্যাপারটা। আমি রাজী।

দোহা মাথা ঝেড়ে তীর্যক হাসলো, ঝুঁকে এসে ফিসফিস করলো,

- বি কেয়ারফুল প্রিন্সেস, ইউ ডোন্ট নো হোয়াট আর ইউ সাইনিং আপ ফর!

সামান্য কম্পিত হলো আমারা, শিহরণ খেলে গেলো কোষজুড়ে। লালিমায় মুখর হলো ফোলা গাল। লক্ষ্য করে দুই আঙ্গুলে তা টেনে ধরে দোহা খিলখিল করে হেসে উঠলো,

- সো কিউট! ইচ্ছা করছে দুটোকে এক কামড়ে খেয়ে ফেলি।

- তুমিই শুধু আমার অপূর্ণতায় আনন্দ খুঁজে পাও।

মিনমিন করে উচ্চারণ করতেই আমারার দুগাল চেপে ধরলো দোহা, মুখ তুলে নিজের নয়নের সঙ্গে নয়ন মিলিয়ে বললো,

- তুমি অপূর্ণ নও নোলক। গু*লি মা*রো সমাজের মাপকাঠিকে। তুমি যেমন, তেমনি সুন্দর। তোমাকে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন। তার কোনো সৃষ্টি কি কখনো অপূর্ণ হতে পারে?

টলটলে অনুভব মাখা আঁখিজোড়া মেলে চেয়ে রইলো আমারা, প্রিয় প্রেমিকের উদ্দেশ্যে। দোহা আরো একটু ঝুঁকে এলো, তার নাকে নিজের নাক সামান্য ঘষে জানালো,

- অপরের চোখে সুন্দর হওয়ার আগে নিজের চোখে সুন্দর হও নোলক। আয়নায় চেয়ে দেখো, কত যতনে গড়া এই শরীর। কতই না মায়া, মোহ, ভালোবাসা জড়ানো অঙ্গে। নিখুঁত সৃষ্টিশৈলী। স্রষ্টার অমর কীর্তি।

গলা ধরে এলো আমারার। বছরের পর বছরের ধিক্কার, কটু কথা, উপহাস – সবকিছুই আজ ফিকে শুধুমাত্র ওই একটা মানুষের মধুর কথার জোরে।

- ইউ আর সো বিউটিফুলি ইম্পারফেক্ট, দ্যাট আই কান্ট হেল্প বাট লাভ ইউ। ডোন্ট চেইন্জ প্রিন্সেস, ডোন্ট চেইন্জ ফর এনিওয়ান, নট ইভেন ফর মি!

দ্রুততর হলো হৃদস্পন্দন। দোহার অন্তিম বাক্যে লুকায়িত অর্থটুকু অনুধাবনের সুযোগ আমারার হলোনা। এর আগেই পাশ দিয়ে যাওয়া এক ফেরিওয়ালার হাকডাকে উভয়ে সম্মোহিত সময় থেকে বেরিয়ে পড়লো। ছিটকে দাঁড়ালো খানিকটা দূরে। দোহা নজর ঘুরিয়ে দেখলো, মাথায় একটি টুকরিতে করে চুলের ক্লিপ নিয়ে যাচ্ছে ফেরিওয়ালা। কি যেন ভেবে সে হাত তুলে তাকে দাঁড় করালো। বিশাল এক পসরা। চুলে ব্যবহারের সামগ্রীর অভাব নেই। ছোট ক্লিপ, কাটা, কাকড়া থেকে আরম্ভ করে চিরুনী, আয়না অবধি। আমারা একপাশে দাঁড়িয়ে উদগ্রীব হয়ে দেখতে লাগলো।

দোহা বেছে বেছে একটি চুলের খোঁপা বাঁধার ক্লিপ তুলে নিলো। খানিকটা সূর্যমুখী ফুলের আদলে তৈরি।

- এটা কত আংকেল?

- তিরিশ টেকা ভাইয়া।

কোনো দরদামে না জড়িয়ে দোহা পকেট থেকে একটা বিশ এবং একটা দশ টাকার নোট বের করে ফেরিওয়ালাকে দিলো। সে সালাম দিয়ে নিজের পয়সা নিয়ে আবার হাঁটা ধরলো। আমারা বিড়বিড় করলো,

- এটা কার জন্য?

মুচকি হাসলো দোহা, আমারার দুই কাঁধে হাত রেখে তাকে পিছনে ঘুরালো। কিশোরীর চুল কাঁধের সামান্য নিচে, খুব বেশি লম্বা নয় তা। আঙুল বুলিয়ে তাই গুছিয়ে নিয়ে কোনোমতে একটা খোঁপার মতন তৈরি করলো দোহা, তারপর তাতে ক্লিপটা আটকে দিয়ে জানালো,

- আমার প্রিন্সেস বাদে আর কার জন্য?

হৃদমাঝারে উথাল পাথাল ঢেউ খেলে গেলো। ঝট করে ফিরে তাকালো আমারা। একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখলো দোহাকে। ঝুঁকে এলো প্রেমিক তার, নরম সুরে বললো,

- হ্যাপি বার্থডে প্রিন্সেস।

অবাধ্য একফোঁটা আবেগের অশ্রু আমারা দমন করলো দ্রুত মুখ লুকিয়ে। দোহা তার অপর হাতটি চেপে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলো। জনসমাগম এড়িয়ে তারা ক্রমেই এসে পৌঁছালো সেন্ট পিটার্সবার্গের নিকটবর্তী নির্জন পথে।

- আমার চুলে খোঁপা হয়না ঠিকমত।

আমারার কথার বিপরীতে দোহা জানালো,

- একদিন হবে।

- তোমার লম্বা চুল পছন্দ?

- হুম, খুব।

- কেনো?

- কারণ আমি তাতে বিনুনী করে দেবো প্রতিদিন, খোঁপায় গুঁজে দেবো গাঁজরা কিংবা রজনীগন্ধা।

নয়ন তুলে প্রিয়তমকে পর্যবেক্ষণ করলো আমারা একদৃষ্টে। কোনো মন্তব্য করলোনা। উভয়েই পৌঁছলো ডরমের সামনে। কেমন যেন মুষড়ে পড়লো হৃদয় তৎক্ষণাৎ। এই জাদুকরী মুহূর্তটির তবে এখানেই অবসান? দোহা আমারার মুখোমুখি দাঁড়ালো। অধরে এক চিলতে হাসি মাখানো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রেয়সী তার। অবলোকন করলো সে প্রাণভরে। অন্তিমবারের মতন কি?

- গুডবাই...

ক্ষীণ কন্ঠে দোহা উচ্চারণ করলো। বাঁধনহারা হলো হৃদয়। প্রচন্ড এক টান অন্তরজুড়ে। আমারার আলুথালু অবয়ব, কপালে ছড়িয়ে থাকা ব্যাঙস কাট চুলের গোছা, আর এলোমেলো খোঁপায় জড়িয়ে থাকা সূর্যমুখী সদৃশ চুলের ক্লিপ। অতুলনীয় এক দৃশ্য। অজান্তেই ঝুঁকে এলো দোহা, চিবুক ছুঁয়ে আমারার গালে ছোঁয়ালো নিজের গাল। শিউরে উঠে কিশোরী তার কাঁধ আঁকড়ে ধরলো। বাঁধায় নয়, আবেগের তাড়নায়। ঘাসের মাঝে কাঁপতে থাকা শিশিরের নরম ছোঁয়ার আদলে অতি আলতোভাবে আমারার গালে নিজের অধর স্পর্শ করলো দোহা। কেঁপে উঠলো আমারা, আবেশে বুঁজে এলো আঁখিজোড়া। স্পর্শটুকু ঠিকমত অনুভবও হলোনা, শিরশিরে এক শিহরণমাত্র, সঙ্গে উষ্ণতার আস্ফালন। এইটুকুই। লম্বা একটা মুহূর্ত ঐভাবেই থেকে অবশেষে নিজেকে সরিয়ে আনলো দোহা। দুই পা সরে দাঁড়ালো। তার অস্তিত্বের সুবাস এবং তাপটুকু হারিয়ে যেতেই আমারা দৃষ্টি মেললো, অতি আবেগঘন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

- কালকে দেখা হবে, তাইনা?

এক চিলতে হাসলো দোহা, তবে কোনো জবাব দিলোনা। নিঃশব্দে হাত নেড়ে উল্টো ঘুরলো, ক্রমশ আড়াল হয়ে গেলো অন্ধকারের মাঝে। তাকিয়ে রইলো আমারা একদৃষ্টে। বুকের ভেতর যে নিগূঢ় অনুভূতি হচ্ছে তা পৃথিবীর কোনো ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয় তার পক্ষে।

━━━━━━━━━

ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। চারিপাশে দর্শকের ভীড়, টানটান উত্তেজনা। ম্যাচ গড়িয়েছে পেনাল্টি অবধি। অতিরিক্ত সময়েও ড্র হয়ে থাকায় দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই গড়িয়েছে পেনাল্টি অবধি। বর্তমানে গোলকিপারের বিপরীতে দাঁড়ানো দোহা। এত এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও সকলেই বাকরুদ্ধ তাকিয়ে আছে। কারণ, এই শেষ দান। যদি দোহা গোল করতে পারে, তাহলে তারা ম্যাচ জিতে যাবে। অন্যথায়.... কেউই ভাবতে পারছেনা আর। একপাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে যাচ্ছে অনিক, সমস্ত শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার তার। রাজীব, জিই - শু দর্শকদের মধ্যে। আমারাও রয়েছে, দুহাত একত্রিত করে মোনাজাতে লিপ্ত হয়েছে সে। কি হবে?

বিশাল এক প্রশ্বাস টানলো দোহা। চোখ বন্ধ করে কি যেন ভাবলো। অজান্তেই পাশ ফিরে দর্শকদের দিকে তাকালো। আমারার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার। প্রেমিকা তাকে ভরসাসূচক ইঙ্গিত করলেও এর বিপরীতে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলনা। মাথা ঝাঁকিয়ে ফুটবলের দিকে তাকালো সে। পরক্ষণেই দ্রুত ছুটে গেলো, সজোরে আ*ঘা*ত হানলো বলে। নিঃশ্বাস আটকে গেলো যেন সবার। বল ছুটলো বু*লে*টের মতন। অতঃপর....

- গোল!!!

চিৎকারের বি*স্ফো*রণ ঘটলো গোটা মাঠে। একসঙ্গে উৎফুল্ল স্বরে গলা ফা*টিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সবাই। দোহা দূর্বল অনুভব করে হাঁটু ভেঙে বসেই পড়লো। তার দলের সবাই ছুটে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন মিলে হঠাৎ তাকে কাঁধে তুলে আনন্দে নাচতে শুরু করলো। ভারসাম্য রক্ষায় পাশে অনিকের হাত চেপে ধরে হেসে উঠলো দোহা। স্কুল কলেজের সব শিক্ষার্থী ঘিরে ধরলো তাদেরকে। মহা উৎসবমুখর এক পরিবেশ। অদূর থেকে দৃশ্যটি লক্ষ্য করে গেলো আমারা। তার গর্ববোধ হচ্ছে, সঙ্গে খুশি অনুভূত হচ্ছে অত্যধিক। বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে দূর থেকেই, বড্ড আশা নিয়ে ভাবলো দোহা তার দিকে তাকাবে।

কিন্তু ছেলেটা তাকালো না। একটিবারের জন্যও না।

গোটা সেন্ট পিটার্সবার্গ প্রাঙ্গণ বর্তমানে উত্তাল শিক্ষার্থীদের হইহুল্লোড় এবং প্রফুল্লতায়। মাঠ থেকে একপ্রকার নাচতে নাচতেই এসেছে সবাই। সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হয়েছে। আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা আতশবাজির খেলায় মেতে উঠেছে চারপাশ। শুধু একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট জয়ের উচ্ছ্বাস নয়, এটি যেন এক বিশাল উৎসবের মিলনমেলা। ট্রফি হাতে ভিড়ের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে লাফিয়ে চলেছে অনিক। সঙ্গে তাদের টিম ক্যাপ্টেন, রাজীব, জিই - শু এবং অনেকে। দোহাকেও ভীষণ জোরাজুরি করা হলো। দশ মিনিট পরেই অবশ্য হাঁপিয়ে উঠলো সে। সবার হুল্লোড় এড়িয়ে কলেজ ভবনের পিছনে চলে এলো। এখানে কল আছে। কিছুটা পানি দরকার, অত্যন্ত গরম লাগছে তার। শরীরেরও যাচ্ছেতাই অবস্থা। কল ছেড়ে সর্বপ্রথম মাথা ভিজিয়ে নিলো দোহা, চুল ঝেড়ে পরক্ষণে হাত এবং পা ধুয়ে নিতে থাকলো। ঠিক তখনি মেয়েলী কন্ঠস্বরটি কানে গেলো তার।

- কংগ্র্যাচুলেশন্স!

ঝট করে ফিরে তাকাতেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো সে রাহাকে। হাঁটু অবধি লম্বা একটি ফ্রক পরনে। সুদর্শনার দীঘল সিল্কি চুলগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কাঁধে, একেবারে কোমরের নিচ অবধি ঠেকেছে তা। জ্বলজ্বলে মুক্তোর মতন দুই চোখে গভীর এক দৃষ্টি, যা নিবেদিত দোহার উদ্দেশ্যে। নিজের জার্সির খানিকটা অংশ তুলে মুখ মুছতে মুছতে দোহা জবাব দিলো,

- থ্যাংক ইউ।

- আজকে দূর্দান্ত খেলেছ তুমি।

- জানি।

স্বীকারোক্তিতে খিলখিল করে হেসে ফেললো রাহা। এগিয়ে এলো দোহার দিকে আরো কয়েক পা। দূরত্ব কমিয়ে আনলো, মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলো,

- অস্বীকার করছো না তাহলে।

- কেনো করবো? আই নো আই প্লেইড ওয়েল। ইভেন বেটার দ্যান ইওর বয়ফ্রেন্ড!

ভ্রু কুঁচকে নিলো রাহা, তীর্যক হাসলো। ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সে সম্পর্কে গিয়েছে আজ গুণে গুণে এক সপ্তাহ হলো। গোটা কলেজের আরেক হট নিউজ এটি।

- আর ইউ বিইং জেলাস নাউ?

- শুড আই?

মাথা দোলালো রাহা।

- হুম। আফটার অল, তোমার গার্লফ্রেন্ড একটু... কি বলবো? ঢিলা? আই নো শি ক্যান নট স্যাটিসফাই আ ব্যাড বয় লাইক ইউ, এভার!

রাহার হাত ঠেকলো দোহার বুকে, তা ক্রমশ ধাবিত হলো নিম্নপানে। হাসলো দোহা সামান্য, প্রশ্ন ছুঁড়লো,

- ক্যান ইউ?

স্থির দৃষ্টিতে তাকালো রাহা, একেবারে দোহার নয়ন বরাবর। সরে এলো একেবারে সন্নিকটে, ফিসফিস করে বললো,

- আমার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছো? তোমাকে সত্যিই দেখানো উচিৎ আমি কি করতে পারি?

- আফসোস, তোমার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে।

জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে চুকচুক ধ্বনি তুলে দোহা সরে যেতে নিলো, তবে পারলোনা। রাহার দুহাত তার কোমরে জড়িয়ে গেলো, একেবারে মিশিয়ে ফেললো যেন নিজের সাথে।

- মিস্টার দোহা, আমি যা চাই তা পাই। আর যদি না পাই, তবে তা নিজের করে নেই। ইদানিং তোমার বহু নাটক মুখ বুঁজে সহ্য করেছি শুধু, বুঝেছ? ইউ আর প্লেয়িং উইথ এভরিওয়ানস হার্ট, বার্ট ইউ কান্ট প্লে উইথ মাইন!

- তোমার কথাই প্রমাণ করে দিচ্ছে আমি ইতোমধ্যে তোমার হৃদয় নিয়ে খেলে ফেলেছি।

- ওহ, রিয়েলি? তাহলে তোমার কি মনে হয়? তুমি আমাকে রেসিস্ট করতে পারবে? লেটস চেক ইট আউট!

দোহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অতর্কিতে ঝুঁকে এলো রাহা, নিজ অধরে ছুঁয়ে দিতে চাইলো তার অধর। তবে পারলোনা। দোহার হাত চেপে বসলো তার গলায়, আছড়ে ফেললো একপাশের দেয়ালে। তীব্র ক্রোধে ভ্রু কুঞ্চিত হলো কিশোরের, ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে সে বলতে গেলো,

- হাউ ডেয়ার......!

থমকে গেলো দোহা। চোখের কোণে ঘটনাস্থলে উপস্থিত তৃতীয় ব্যক্তিকে নজরে এলো তার দ্রুতই। দাঁড়িয়ে আছে আমারা, কোনো লোকানোর চেষ্টা করছেনা। সে যে মাত্র এসেছে বোঝাই যাচ্ছে। প্রসারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

এক সেকেন্ডও ভাবলোনা আর দোহা। তৎক্ষণাৎ রাহার ঠোঁটে মিশিয়ে দিলো নিজের ঠোঁট, তীব্র আলোড়নে। রাহা অবধি স্তব্ধ হয়ে গেলো, এমন বেখাপ্পা আচরণ সে প্রত্যাশা করেনি। তবে দোহাকে দূরে সরানোর বদলে দুই হাত বাড়িয়ে তার ঘাড় জড়িয়ে ধরলো সে, আবেগে বুজে নিলো চোখের পাতা। প্রগাঢ় বিনিময়। মায়া, অনুভূতি কিংবা ভালোবাসার ছিটেফোঁটা অবধি নেই। শুধু মোহ, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষুধা। যেন একে অপরের আকর্ষণে মিশে যেতে চায় তারা।

আমারা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। কেমন প্রতিক্রিয়া করা উচিৎ তার? ঠাওর হলোনা ওই মুহূর্তে। সে দেখলো, শুধু দেখে গেলো দোহার আগ্রাসন। অন্য এক নারীর প্রতি, অন্য এক অস্তিত্বের প্রতি। হৃদয়? জিনিসটাকে আর অনুভব করতে পারলোনা আমারা। ভাংচুর হয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে? হবে হয়তো। কি আশ্চর্য! কান্নাও তো পাচ্ছেনা! দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদের এক নিদারুণ সাগরে নিমজ্জিত হলো আমারায়। এক ঝটকায় ঘূর্ণিঝড় এসে তাণ্ডব চালিয়ে সবকিছু উলোট পালট করে দিয়েছে যেন।

রাহাকে ছেড়ে দিলো দোহা। হাতের উল্টোপিঠে নিজের ঠোঁট মুছে নিয়ে পাশ ফিরে তাকালো। আমারার সঙ্গে চোখাচুখি হলো তার। তাতে হাত সরিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো সে, জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করলো,

- প্রিন্সেস?

শক্ত ঢোক গিললো আমারা। বহু কষ্টে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় দুইহাত মুঠো পাকিয়ে রীতিমত ফিসফিস করলো,

- হাউ কুড ইউ.....

কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরের বিপরীতে বিস্তর হাসলো দোহা। সুগভীর স্বরে বিড়বিড় করলো,

- ইউ লাইক ইট? শুড আই ডু ইট অ্যাগেইন ফর ইউ টু ওয়াচ?

ধপ করে জ্বলে উঠলো আমারার দৃষ্টি। বুকের ভেতর ধকধক অনুভব। বাম হাতটি বুকে চেপে সে রাহার দিকে তাকালো। যে কোনো পরোয়াহীন। দেয়ালে হেলান দিয়ে নাটক দেখছে, আর ক্ষণে ক্ষণে নিজের অধর কামড়ে ধরে যেন আমারাকে মনে করিয়ে দিতে চাইছে মাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনাটি। একটা নিঃশ্বাস ফেললো আমারা, মাথা চেপে ধরলো,

- এক মিনিট এক মিনিট, আই নিড টু প্রোসেস।

শ্বাসকষ্ট উঠে গেলো তার রীতিমত। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে তাকালো সে দোহার দিকে,

- দোহা, তুমি সত্যিই....

- তুই দেখছি মহা বলদ। চোখের সামনে এত বড় কাহিনী দেখেও আবার জিজ্ঞেস করছিস? লাইক সিরিয়াসলি? প্যাথেটিক!

- স্টপ! আমি ওর সাথে কথা বলছি, তোর সাথে নয়।

হাত উঁচু করে রাহাকে থামালো আমারা। তাকালো দোহার দিকে। যে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যেন গোটা পরিস্থিতি তাকে ভীষণ বিরক্ত করছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো আমারা, মাথা উঁচু করে তাকালো প্রেমিকের উদ্দেশ্যে।

- দোহা। আমাদের মাঝে সবকিছু মিথ্যা ছিলো? গতকালও তুমি আমাকে....

- আমাদের মাঝে এক্সাটলি কি ছিলো?

কথার মাঝখানে দোহার কথায় থমকে গেলো আমারা। নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো। কি জবাব এই প্রশ্নের? তার নৈঃশব্দ্য দোহাকে প্রফুল্ল করলো, ঝুঁকে এসে আমারার চিবুক চেপে ধরলো সে। না, যত্নে নয়, আক্রোশে! ব্যথা পেলো আমারা, খানিক হিসিয়ে উঠল তাতে। বেপরোয়া দোহা তার গালে রুক্ষ আঙুল বুলিয়ে নিয়ে বিস্তর হাসলো, আবেশিত এক কন্ঠে বললো,

- প্রিন্সেস! ডিড ইউ রিয়েলি থিঙ্ক সামওয়ান লাইক মি উইল ফল ফর সামওয়ান লাইক ইউ? সেভেন্টি কেজি প্লাস?সিরিয়াসলি? মাই পুওর প্রিন্সেস!

হতভম্ব আমারা। অবিশ্বাস তার নয়নজুড়ে। নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছেনা যেন। সে হয়ত দুঃস্বপ্ন দেখছে। ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন!

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন