#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৫
পর্ব ১৫: [ দহন ]
━━━━━━━━━
মিথ্যা।
নৃশংস একটি শব্দ। মিথ্যা যেমন ভাঙতে পারে, তেমন জুড়তেও পারে।
ধোঁকা।
আরেকটি নিষ্ঠুর শব্দ। ভালোর প্রয়োজনে ধোঁকা জায়েজ। কিন্তু মন্দের ক্ষেত্রে তা হয়ে যায় ঘৃণিত।
মিথ্যা থেকে যে সম্পর্কের সূত্রপাত এবং ধোঁকাতে যার সমাপ্তি - তাকে কি বলা যায়?
উত্তরেরা নির্বাক।
ঠিক যেমনটা বর্তমানে আমারা।
তার প্রেমিক আজ চোখের সামনে আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে দিয়েছে তাদের প্রেম কতটা মিথ্যা! কথার বিষাক্ততায় প্রমাণ করেছে কত বড় একজন ধোঁকাবাজ সে। কেমন অনুভব করছে কিশোরী? নিজেরও জানা নেই। একটা অদ্ভুতুড়ে শোষণীয় অনুভূতি। বুকের ভেতর নিদারুণ ভাংচুরে চুরমার হয়ে গিয়েছে কিছু একটা। দোহা যদি তাকে কটু কথা বলতো, যদি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো, তবুও হয়তবা অনেকটা সময় বাদে আমারা নিজেকে প্রশ্ন করার দুঃসাহস করতো, কেনো করেছিল তার প্রিয় অমনটা? হয়ত জানতে চাইতো সে মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনী। বুঝতে চাইতো প্রিয়তমের অযৌক্তিক আচরণের কারণ। কিন্তু দোহা যা করেছে, তা যে উদ্দেশ্যেই করে থাকুক না কেনো, তার কোনো ক্ষমা হয়না। একজন নারীর সবচেয়ে বড় অহংকারের জায়গা যে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তাকে কিভাবে ক্ষমা করা সম্ভব? সে পৃথিবী বাঁচাতেও যদি এমনটা করে থাকে তবেও আমারা তাকে ক্ষমা করবেনা, কোনোদিন না!
মুষ্টিবদ্ধ হলো আমারার দুহাত, তীব্র আলোড়নে। দোহার আঙুলের বাঁধন থেকে ঝটকা দিয়ে সে সরিয়ে নিলো নিজেকে। টলটলে অশ্রু অজানা এক প্রতিরোধে এখনো গড়িয়ে নামছেনা। স্থির তাকালো সে প্রেমিক.... উঁহু! ধোঁকাবাজের উদ্দেশ্যে!
- শরীর দেখে মানুষের প্রেমে পড়ো বুঝি?
আমারার অতর্কিত প্রশ্নে দোহা থমকালো। পরক্ষণেই অবশ্য বিস্তৃত হাসলো।
- অবশ্যই। সন্দেহ আছে? যেখানে আকর্ষণ নেই সেখানে কিসের প্রেম? সি হার, অ্যান্ড সি ইওরসেল্ফ ইন দ্যা মিরর!
রাহাকে দেখিয়ে বললো দোহা। দুই দাঁতের পাটি একসাথে চেপে নিলো আমারা, দৃষ্টি তার তীব্রতর হলো ক্ষোভে। অধর ফুলিয়ে কোমরে দুহাত রেখে দোহা বিড়বিড় করলো,
- ওহ প্লীজ! এখন ন্যাকাকান্না কেঁদোনা। আমি তোমাকে আগেই সাবধান করেছিলাম, তুমি শোনোনি। চোখের সামনে লাল পতাকা দেখেও অন্ধের মতন আচরণ করলে তার দায় আমি নেবো কেনো?
আমারার ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলেও সে কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। অনেক কিছু বলতে চায় সে, উগড়ে দিতে চায় সকল অনুভূতি। কিন্তু কন্ঠ বেয়ে একটা শব্দও নির্গত হচ্ছেনা। সব কেমন যেন দলা পাকিয়ে গিয়েছে অভ্যন্তরে। বাইরে আসতে চাইছেনা। দোহা কয়েক পা এগোলো, একেবারে সন্নিকটে। নয়নে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো আমারাকে, ঠোঁটের তীর্যক হাসি দ্বিগুণ হলো তাতে।
- সবসময় পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ভিকটিম কার্ড প্লে করা বন্ধ করো। তোমার শরীর তোমার নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ। মোটা দেখিয়ে কি সবার থেকে সিমপ্যাথি অর্জন করতে চাও? এখন গিয়ে রটাবে নিশ্চয়ই, আমি মোটা বলে আমার সঙ্গে এমন হয়েছে? এইযে তোমাকে এত বুলি করা হয়, কেনো? ভেবে দেখেছ একবারও? চেষ্টা করেছ নিজেকে নিয়ন্ত্রণের? মানুষের কথায় নয়, অন্তত নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে?
অদ্ভুতভাবে দোহার কথাগুলো শুনে হেসে ফেললো আমারা। সে এক নিদারুণ বিষাদের হাসি। আশেপাশে কলেজের অনেকেই জড়ো হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। উৎসবের প্রাঙ্গণ ছেড়ে সবাই এসেছিল হাত মুখে পানি দিতে। এসেই মহা নাটক পেয়ে তো বেজায় খুশি! অনিক, রাজীব এবং জিই - শু, তিনজনই একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বিস্তর উপভোগ করে যাচ্ছে তামাশা। কয়েকজন তো মোবাইল ফোনে ছবিও তুলে রাখছে। ভীষণ কাজে দেবে ভবিষ্যতে!
আমারার হাসি দেখে থমকে গেলো দোহা। টলটলে নয়নে বিধুরের হাসিখানি ঠিক কেমন ঠেকলো বলতে পারবেনা সে। অজান্তেই তার হাতজোড়া মুঠো হলো, যা নিজেকেই বুঝতে দিলোনা সে।
- একবার বললেই হতো যে আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি। আমি নিজ দায়িত্বে সরে যেতাম। কিন্তু এইভাবে আমার অনুভূতি নিয়ে খেলাটা কি খুব প্রয়োজন ছিলো?
নিরুত্তর দোহা। আমারা নিজের পায়ের দিকে তাকালো, তারপর মাথা তুলে প্রিয় পুরুষটির দৃষ্টি খুঁজে ফিরে জানালো,
- আমি তোমাকে বুঝতে চাইতাম দোহা। এতকিছুর পরেও হয়ত বা আমি কারণ খুঁজতাম তোমার হঠাৎ এমন ব্যবহারের। কিন্তু বিশ্বাস করো, আর পারছিনা। আমি তোমার কাছে শুধু একটা জিনিসই চেয়েছিলাম, কখনো আমার বাবাইয়ের মতন হয়োনা। কিন্তু তুমি আমাকে গুঁড়িয়ে দিতে ওই একটা মানুষের ছায়াই অনুসরণ করলে!
নিঃশব্দে হাসলো দোহা। তার ভাব এমন যেন কোনকিছুতে কিছুই যায় আসেনা। ব্যাপারটা আমারাকে আঘাত করলো দ্বিগুণভাবে।
“ ঠিক হয়েছে! আমি আগেই বলেছিলাম, দোহা একটা চীজ! ”
“ কাকের ময়ূর হওয়ার শখ উঠেছিল। ভেবেছিলো সে বুঝি মহারাণী একখান! বেশ হয়েছে এখন! ”
“ ওয়েটিং ফর কান্নাকাটি, আমাকে ছেড়ে যেও না, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা টাইপ শিট! ”
ফিসফিস মন্তব্যগুলোর সবটাই তীরের মতন বিধলো অন্তরে। বহু দিন বাদে আমারা অপরের কথায় কষ্ট পেলো, ভীষণ কষ্ট। এতটা কষ্ট হয়ত হতো না তার, যদি না তাকে শুধুমাত্র তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে বিচার করা হতো। দোহার সঙ্গে সে মানানসই নয়, শুধুমাত্র দেখতে ভিন্ন হওয়ার কারণে। ব্যাপারটা কষ্টদায়ক নয় কি?
দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলো আমারা। জানে, কথায় কথা বাড়ে। যেহেতু অনেক মানুষ উপস্থিত হয়ে গিয়েছে, সেহেতু এখন ঝগড়ার কোনো অবকাশ নেই। মুখ তুলে দোহার দিকে তাকালো সে। এই মুহূর্তে ছেলেটার অধরে লেপ্টে থাকা হাসিটা সবথেকে ক্রুর ঠেকছে আমারার কাছে। তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে দোহা ঝুঁকে এলো, ফিসফিস কন্ঠে বললো,
- কান্না পাচ্ছে? আমার বুকে আসতে পারো, আই অ্যাম ওপেন ফর এভরিওয়ান। অওর ডু ইউ প্রেফার.... আই কিস ইউ টু, হার্ডার দ্যান এভার!
বিদ্যুৎ খেলে গেলো আমারার সমস্ত শরীরে। তীব্র ক্রোধে উত্তোলিত হলো তার হাত, সজোরে এগিয়ে গেলো দোহার গাল লক্ষ্য করে। তাকে থামালোনা কিশোর, বরং চোখ বুঁজে নিলো। হাসিটি দীর্ঘ হলো ক্রমশ। তবে অন্তিম লগ্নে থেমে গেলো আমারা, হাত কাঁপলো তার। প্রিয়তমকে আঘাত করার ভয়ে? উহু, উপস্থিত অপ্রয়োজনীয় মানুষগুলোকে ফ্রি তে বিনোদন না দেয়ার অঙ্গীকারে। সহসাই হাত নামিয়ে দূরে সরে গেলো আমারা। দোহা চোখ মেলে কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে তাকালো তার দিকে। এক পলক রাহাকে দেখে পরক্ষণেই দোহার মাঝে দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে আমারা বিড়বিড় করলো,
- আজ তুমি হৃদয় ভাঙোনি দোহা, ভেঙেছ নিজের ঘর!
এর চেয়ে বড় কোনো স্বীকারোক্তি কিংবা বেদনাদায়ক বাক্য দুটো হয়না। স্থির তাকিয়ে রইলো দোহা, কোনো উত্তর করলোনা। উল্টো ঘুরে গেলো আমারা তৎক্ষণাৎ। ভীড় ঠেলে হনহন করে এগোলো। কিছুক্ষণের জন্য থমকালো, ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন টুয়েলভথ গ্রেডের সিনিয়র ভাই রুহান দাঁড়িয়ে আছে, চোখমুখে এক বিস্ময়কর অনুভব। আমারা তার দিকে তাকালো, শীতল কন্ঠে বললো,
- আপনার আগেভাগেই সাবধান হওয়া উচিত। আমার মতন ভুল করবেন না।
এটুকুই। প্রচন্ড গুঞ্জন এবং ফিসফাস ভেদ করে আমারা গুটিগুটি পায়ে আলুথালু শরীরটা টেনে ক্রমশ আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার। রুহান ফিরে তাকালো নিজের নব্য প্রেমিকা রাহার দিকে। তারপরই দোহার উদ্দেশ্যে। আক্রোশ ফুটলো তার চোখেমুখে।
。
。
。
ডরমে নিজের রুমে ফিরে এসেই বিছানার উপর ধপাস করে বসে পড়লো আমারা। অপর পাশের বিছানায় নিদ্রাতে আচ্ছন্ন জারা। ফুটবল টুর্নামেন্ট, উৎসব কোনকিছুতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই মেয়েটার। নিজের রুমে ঘুমানো আর ল্যাপটপ দেখাকেই সে প্রাধান্য দিয়েছে। আমারা ঢোক গিললো, সমস্ত শরীর ভীষণ রকমের অস্থির লাগছে তার। বুকের ভেতর যেন বারংবার শাবল চালাচ্ছে কেউ। চোখের সামনে ভাসছে সেই দৃশ্যটি, দোহা এবং রাহা, একে অপরের মাঝে বিলীন। হুট করেই ভিন্ন একটি দৃশ্য সেই স্থান দখল করলো। বাবার অফিসে গিয়েছিল সে সারপ্রাইজ দিতে, তারপর যে দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে তা আজীবন তার স্মৃতিতে তাড়া করে বেরিয়েছে এবং বেরাবে। এই অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটার সঙ্গে তার বাবা, চেয়ারের উপর, অন্তরঙ্গ.... নাহ্! গা গুলিয়ে উঠল আমারার। আর ভাবা সম্ভবপর নয়। কিন্তু মনে পড়ছে ওই দগদগে স্মৃতি ভীষণভাবে। উপেক্ষা করবে কিভাবে? দোহা এবং রাহার ভয়ংকর অনুভবের মাঝে না চাইতেও নিজের বাবাইয়ের নিকৃষ্টতম আচরণের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরছে তার মস্তিষ্ক। ঘটনা এক, মানুষ ভিন্ন। আদতেই কি ভিন্ন? হৃদয়টা চেপে এলো আমারার। আঁকড়ে ধরলো বুক। তার মামণি, তার মামণি কেমন অনুভব করে সেই দৃশ্য বারবার নিজের চোখে দেখে? কিভাবে আছে সে? আমারার ভেতরে যে সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে!
টিকতে না পেরে বিছানা ছাড়লো আমারা। গুটিগুটি হেঁটে দাঁড়ালো ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে। নিজেকে পর্যবেক্ষণ করলো। গোলাকৃতির চেহারা, ফোলা ফোলা গাল, হালকা ঝুলে পড়া চিবুক। কাঁধ দুখানা বাঁকানো গড়নের, প্রশস্ত বুক এবং পেট। ঢোলা জামা চেপে ধরলে ভুঁড়িখানি স্পষ্ট বোঝা যায়। ভারী উরু এবং গোড়ালী। চ্যাপ্টা পায়ের পাতা। সে কি সত্যিই অসুন্দর? আসলেই কি এই শরীরই মূল সমস্যা? পাতলা পাতলা ঠোঁট দুখানা আমারা চেপে নিলো। যে অশ্রু তীব্র জ্বালায়ও গড়ায়নি এক ফোঁটা, তাই বিন্দু বিন্দু করে প্রবাহিত হতে থাকলো তার লালচে হয়ে উঠতে থাকা গাল বেয়ে। সিক্ত করে তুললো সমস্ত সত্তা যেন। ভেঙে পড়া এক ইমারত সে।
- ঐখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস?
কর্কশ মেয়েলী কণ্ঠটি আমারাকে স্থবির করলো। অতি দ্রুত চোখের পানি মুছে নিলেও গাল দুটো ভেজাই রইলো। আস্তে করে উল্টো ঘুরলো সে। তাকালো মাত্রই ঘুম থেকে জেগে ওঠা জারার দিকে। চোখ কচলাচ্ছে মেয়েটা, অপর হাতে টি শার্টের উপর ফ্লানেলের শার্টটা জড়িয়ে নিচ্ছে। কিছু না বলে আমারা চুপচাপ নিজের বিছানায় এসে বসলো, মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইলো পায়ের পাতার দিকে। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আমারার চেহারা দেখে থমকে গেলো জারা। ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে তাকালো। বিছানার বাইরে পা ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- কেউ টপকে গিয়েছে?
তার বেফাঁস প্রশ্নে অন্যান্য সময় আমারা খিলখিল করে হেসে উঠলেও আজ হাসলো না। বিষয়টা জারাকে ক্রমেই বিচলিত করে তুললো। তার হয়ত এখন মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরা উচিত, শান্তনা দেয়া উচিত। কিন্তু জারা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতন স্বাভাবিক কিছু করতে পারেনা। ভেতরে কেমন একটা সংকোচ। কারোর দুঃখে কিভাবে শান্তনা দিতে হয় সে জানেনা। কোনোদিন ইচ্ছাও করেনা অবশ্য। কিন্তু আমারার ব্যাপারটা ভিন্ন। এই মেয়ের আঁখিজোড়া সে টলটলে হতে দেখেছে, খুশিতে। তবে আজকের অনুভূতির সমস্তটাই বিষাদ।
দ্বিধান্বিত হলো জারা। কোমল স্বরের বদলে তার গলা দিয়ে বেরোলো কর্কশ ক্রোধান্বিত প্রশ্ন,
- আরে ইডিয়ট কান্নাকাটি বন্ধ করে বলবি আসলে হয়েছেটা কি? নাকি ভাবিস আমি ডাইনি? কালাজাদু করে তোর ভেতরের খবর জেনে যাবো?
নিশ্চুপ আমারা। তাতে বেজায় চটে গেলো জারা। এবার একপ্রকার চেঁচিয়েই উঠলো,
- আমার এত শখ নেই কারো গোপন কথা জানার। একদম ন্যাকাকান্না কাদবি না আমার সামনে, শরীর জ্বলে!
বলেই জারা উঠে পড়তে নিচ্ছিলো ঠিক ওই সময়েই আমারার ভাঙা ভাঙা কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
- হি কি.... কিস... ড...
স্তব্ধ হলো জারা, একটি ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো,
- ইউ?
চোখ বুঁজে মাথা নাড়লো আমারা। ক্ষীণ কন্ঠে জানালো,
- রাহা...
নৈঃশব্দ্য।
এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড.....
অতঃপর যা ঘটলো অত্যন্ত ক্ষীপ্র গতিতে। চোখের পলকে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলো জারা, সজোর টানে দেয়ালের কোণে রাখা বেসবল ব্যাটটি কাঁধে তুলে নিলো। অপর হাতে রীতিমত ছিঁড়ে আনলো আলমারির বক্সে ঝুলতে থাকা ব্যান্ডেজের একাংশ। হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বিন্দুমাত্র বাক্য ব্যয় ছাড়া হনহন করে সে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেলো, দরজাটা ধাম করে ধাক্কা খেলো তার জোরালো ধাক্কায়। পদশব্দ শোনা গেলো বাহির থেকেও, এগিয়ে যাচ্ছে কিশোরী, বিধ্বংসী এক সাইক্লোনের ভঙ্গিতে।
মাত্র কয়েক পলকের ব্যবধানে ঠিক কি হয়ে গেলো আমারা বুঝতেও পারলোনা। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলো জারার হেঁটে যাওয়ার পথে কিভাবে এদিক সেদিক তীব্র কাঁপুনিতে দুলছে দরজাটি।
━━━━━━━━
দোহা সবেমাত্র বাথরুম থেকে বেরিয়েছে ঠান্ডা একটা গোসল সেরে। অনিক নিজের বিছানায় বসে পা দোলাতে দোলাতে চুইং গাম চিবিয়ে যাচ্ছিল আর নিজের ফোন ঘাটছিল। আজকের ঘটনার বেশ কতক ছবি তাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছে। দোহা বের হতেই সে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
- তুই তো ব্যাটা মারাত্মক খিলাড়ি! চেয়েছিলাম চার, কিন্তু তুই একেবারে ছক্কা হাঁকিয়ে দিয়েছিস! সেরা দোস্ত, সেরা! একেবারে লা জওয়াব!
অনিকের বিস্তর উচ্ছ্বাসে অবশ্য দোহা কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। সে চুপচাপ নিজের বিছানায় বসলো। চুলগুলো ভিজে টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে, খেয়াল নেই সেদিকে। অনিকের হাসি সামান্য ম্রিয়মাণ হলো। দোহার দৃষ্টিজুড়ে যে প্রফুল্লতা থাকার কথা, সেটি নেই। কেমন যেন এক ফিকে অনুভব। আঁখিজোড়া তাকিয়ে আছে বরাবর বাইরে, অসীম আকাশে ভেসে চলা মেঘকুঞ্জের দিকে। দোহাকে ভীষণ রকমের ভাবুক দেখাচ্ছে। অনিক তাই গা ঝেড়ে উঠলো।
- তোকে আমি পঁচিশ হাজার দেবো! আর সেটা এক্ষুণি!
বলে সত্যি সত্যিই অনিক হামাগুড়ি দিয়ে বিছানার ওপাশের টেবিলের ড্রয়ার খুলতেই প্রচন্ড এক শব্দে কেঁপে উঠলো রীতিমত চারপাশ। উভয় কিশোরই চমকে উঠলো তাতে। ঝট করে ফিরে তাকালো একে অপরের দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার শব্দ, সঙ্গে তীব্র গুঞ্জন। বাইরের করিডোরে কিছু একটা হচ্ছে। টের পেয়েই অনিক লাফিয়ে উঠে রুমের দরজা খুললো। তবে বাইরে পা দেয়ার সৌভাগ্য তার হলোনা। দোহা হতভম্ব হয়ে দেখলো জোরালো এক ধাক্কায় অনিক সটান গিয়ে আছড়ে পড়লো মেঝের এক কোণায়। অদ্ভুতুড়ে এক আতঙ্কে কেঁপে উঠলো বুক। ধপাস করে পা রাখার শব্দ, রুমের ভেতরে কদম রাখলো জারা। দুহাতের কনুই অবধি ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো। হাতে তকতকে কালো রঙের বেসবল ব্যাট, বিপদজনক ভঙ্গিতে যা ঝুলছে কাঁধের উপর। চোখের মাঝে শীতলতম অগ্নির প্রজ্জ্বলন, তাকিয়ে আছে যেন এক হিং*স্র দানব।
এক নজর হতবিহ্বল দোহার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো জারার। তারপরই অতর্কিতে মেয়েটা ঘুরে গেলো। হাতের ব্যাট দিয়ে সজোরে বা*ড়ি দিয়ে আছড়ে ফেললো দোহার টেবিলের উপর রাখা বেশকিছু জিনিসপত্র। কাঁচের একটা ফুলদানি এবং মাটির ছোট্ট পুতুল টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। পরের বার ব্যাটটি আ*ঘাত হানলো ড্রেসিং টেবিলে। চুরমার হলো আয়না।নিস্তব্ধ হয়ে দেখলো দোহা। তার মস্তিষ্ক ঘটনাটি বুঝে উঠতে পারছেনা। জারা থেমে নেই, তার তান্ডবলীলায় ক্রমশ ধ্বং*সস্তূপে পরিণত হতে থাকলো গোটা রুম। অনিকের প্রিয় অ্যাকুরিয়াম, দেয়ালঘড়ি, শখের সাইকেলের হেলমেট — কিছুই অবশিষ্ট রইলোনা। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেলো। রুমের বাইরে ততক্ষণে ভিড় জমে গিয়েছে অন্যান্যদের। ভয়ে অনেকে চিৎকার করে উঠলেও কেউই সাহস করে সামনে এগোচ্ছেনা। জারার ধ্বংসাবতার সবার অন্তরে ভয়ের মোহর এঁটে দিয়েছে। যে আগ্রাসনে সে প্রত্যেকটা জড়বস্তুকে চুরমার করছে, সেই আগ্রাসনে মানুষ পড়লে কি হবে তা আর বলার অবকাশ রাখেনা।
জারা প্রায় অর্ধেক রুম গুঁড়িয়ে দিয়ে হাঁপালো। দাঁতে দাঁত ঘষে আশেপাশে তাকালো আরো কিছু টার্গেটের উদ্দেশ্যে। তার নজরে এলো দোহার গিটারটা। ভাবনা চিন্তা ছাড়াই হনহন করে এগোলো, তবে সেটাতে ঘা দেয়ার আগেই তার হাত চেপে ধরে ফেললো দোহা। প্রথমবারের মতন জারাকে ঠেকালো সে। ফিরে তাকালো কিশোরী দোহার দিকে। ছেলেটার উভয় নয়ন টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে, তীব্র ক্রোধে ঘাড়ের শিরা উপশিরা জাগ্রত হয়ে উঠেছে, যেন নিজের ভেতরের দানবকে আটকে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা।
- ইউ সাইকো গার্ল!
- ইউ ব্লাডি চিটার!
দোহার গর্জনের বিপরীতে পাল্টা হুংকার তুলে মোক্ষম এক ঘু*ষি হাঁকিয়ে দিলো জারা তার মুখ বরাবর। তৎক্ষণাৎ মুখে র*ক্তের স্বাদ পেলো দোহা, ঠোঁট কে*টে কয়েক বিন্দু গড়ালো তার চিবুক বেয়ে। আতঙ্কে সকলে চিৎকার করে উঠলো একত্রে। এমন নাজেহাল অবস্থা লক্ষ্য করে মেঝে থেকে নিজেকে টেনে তুললো অনিক, চেঁচিয়ে উঠলো,
- দালাল পাঠিয়েছে তোকে? দালাল?
- তোদের মতন কুলাঙ্গারদের শায়েস্তা করতে কারো দালাল হওয়ার প্রয়োজন নেই!
অনিক জারার কাঁধ চেপে ধরে তাকে বিছানায় ফেলে উপরে চেপে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে বালিশ হাতিয়ে তার মাথায় সপাসপ কয়েক ঘা হাঁকিয়ে দিতেই উত্তেজিত অনিক তার হাতটা মুচড়ে ধরলো। চেহারায় ব্যথার কুঞ্চন পড়লেও একটা টু শব্দও নির্গত হলোনা জারার অধর বেয়ে।
- ভীষণ বাড়াবাড়ি করছিস তুই! এটা তোর বাপের হোটেল? যে আসবি আর ভাংচুর করবি?
- আমার না, তোর বাপের হোটেল। সেই বাপের হোটেলে বসে খাস আর তামাশা করিস। মানুষকে মানুষ না কুত্তা লাগে তোদের কাছে হারামির দল!
গর্জন তুলে প্রচন্ড শক্তিতে অনিককে বিছানার গায়ে ঠেলে ফেলে উঠলো জারা। হাতের বেসবল ব্যাটটা আঁকড়ে ধরলো। হাতের উল্টোপিঠে নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে এগোলো দোহা। শীতল ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হাত মুঠো পাকিয়ে সজোর আ*ঘা*ত করলো জারার মাথা বরাবর। ক্ষণিকের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে গেলো মেয়েটার, শ্রবণ শক্তিও যেন উধাও হলো। তবে উত্তাল উন্মাদনায় হাতের ব্যাটটি সে আন্দাজেই ঘুরিয়ে আনলো, লাগলো একেবারে দোহার চোয়াল বরাবর।
- আহহ!
না পারতে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলো দোহা, চিবুক চেপে ধরে মেঝেতেই বসে পড়লো। বিছানায় থাকা অনিক উঠে বসে এক লাফে জারার গলা দুহাতে চেপে ঠেসে ধরলো টেবিলের উপর। ভাংচুরের পরও অবশিষ্ট জিনিসগুলোও আর আস্ত থাকলোনা। এ যেন বাঘ বাঘিনীর লড়াই। কেউ কারো থেকে কম যায়না। একে অপরকে ছাড় দিতে বিন্দুমাত্র নারাজ তারা।
অনিক এবং জারার ধস্তাধস্তির মাঝেই ভিড় ঠেলে রুমে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো আমারা। আশেপাশের বৃহৎ তাণ্ডব নজরে আসতেই মনে হলো তার হৃদস্পন্দন বুঝি বন্ধ হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। দ্বিতীয় ভাবনা ছাড়াই সে লাফিয়ে পড়লো, ঠেলে অনিক এবং জারাকে ছাড়ালো। দোহাও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমারাকে দেখেই তার নয়নজোড়া জ্বলে উঠলো,
- এত আস্পর্ধা তোমার? প্রথম সুযোগ পাওয়ামাত্র নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিলে.... থু!
একপাশে মুখে জমা র*ক্তটুকু ফেললো দোহা। হাঁপাতে হাঁপাতে তাকালো সামনে, অত্যন্ত বিতৃষ্ণায় নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আমারা জারার দিকে মনোযোগ দিলো। ধমকে উঠলো একপ্রকার,
- তোকে এখানে কে আসতে বলেছে হ্যাঁ? অবস্থা দেখেছিস নিজের? কুকুর কামড়ালে কি আমরাও কামড় দেবো? চল এখান থেকে!
- তুই কুকুর বলছিস কাকে শালী?
অনিক চেঁচিয়ে উঠতেই জারা আবারো ছুটে যেতে নিলো, কিন্তু আমারার জোর বাঁধন তাকে আটকালো। পাল্টা সে বলে উঠলো,
- তোদের চেয়ে বড় কুত্তার দল আর আছে এই কলেজে? একেকটা বাপ মায়ের অজাত সন্তান!
- বাপ মা তুলে কথা বলবিনা খবরদার!
দোহার শীতল বক্তব্যের বিপরীতে আমারাকে ঠেলে মাথা উঁচু করে এগিয়ে গেলো জারা, বললো,
- কেনো? কি করবি? কর! কি চুলটা ছিঁড়বি আমার তুই শালা চিটারের বাচ্চা?!
র*ক্ত উঠে গেলো দোহার মাথায়। সে আরেক দফায় হাত তুলছিলো কিন্তু আমারা অতর্কিতে মাঝখানে এসে তার বুকে হাত রেখে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিলো। পাশের টেবিল আঁকড়ে ধরে পতন ঠেকালো দোহা।
- স্টপ.....ইট!!!
এত জোরে আমারা চিৎকার ছুঁড়লো যে গোটা রুম কেঁপে উঠলো। এই চিৎকার ক্রোধের নয়, তীব্র এক চাপা আর্তনাদের। যার অন্তস্থলে রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার দহন। আমারার ত্বক উজ্জ্বল ফর্সা, তাই তার সমস্ত উদগীরণ ভাসলো টকটকে লাল অনুভব হয়ে। টলটলে নয়ন বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়াচ্ছে, সমস্ত শরীর কাঁপছে আবেগের তাড়নায়। তাকালো দোহা।
আমারা কেমন ছিল, এবং সে তাকে কেমন রূপে পরিবর্তন করেছে।
এক মুহূর্তের জন্য তার এবং আমারার দৃষ্টি বিনিময় হলো। ওটুকুই। পরক্ষণেই রুমে হুড়মুড় করে এসে ঢুকলো ডরমের বেশ কয়েকজন কর্মচারী এবং স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্যরা। মুহূর্তের মধ্যে চারজন ছেলেমেয়েকে আলাদা আলাদাভাবে ঘিরে ফেলা হলো। দরজায় দাঁড়ানো একজন সিনিয়র শিক্ষক। বাকি সবাই তার পিছনে ভিড় করে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। শিক্ষক অত্যন্ত কর্কশ এবং শীতল কন্ঠে বিড়বিড় করলেন,
- ইউ অল নিড টু সি দ্যা প্রিন্সিপাল, রাইট নাউ!
—চলবে—
[ Zara woke up and chose vio*lence 🥲🔪]