#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৬
পর্ব ১৬: [ মুদ্রার দুই পীঠ ]
━━━━━━━━━━━━━━━━
প্রিন্সিপালের কেবিনের তার ডেস্কের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে দোহা, অনিক এবং আমারা, জারা। উভয় যুগুল দুই ভিন্ন ভিন্ন পাশে। অনিক এবং জারার মাঝে তীব্র দৃষ্টি বিনিময় হলেও দোহা আর আমারা যারপরনাই শান্ত। কেউই কারো দিকে তাকিয়ে নেই। নিজের চেয়ারে বসে আছেন সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রিন্সিপাল, তার পাশেই দাঁড়ানো ফাদার ফ্রেড্রিক, যিনি গোটা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে রয়েছেন। প্রিন্সিপাল স্বয়ং তাকে ভীষণ মান্য করেন। উভয়েই স্থির দৃষ্টিতে দেখছেন ছেলেমেয়েদের। ইনফারমারি থেকে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়েছে তাদের, সেই অবস্থায়ই দাঁড়িয়ে আছে।
প্রিন্সিপাল একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। অতঃপর নিজের চশমা খুলে নিয়ে রুমালে তা মুছতে মুছতে বললেন,
- জারা আমিন। তুমি যা করেছ তা একপ্রকার আইন লঙ্ঘন। কলেজের শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তোমাকে এক সপ্তাহের জন্য ক্লাস থেকে সাসপেন্ড করা হলো।
জারা শুধু তীর্যক হাসলো, যেন সাসপেনশনে খুশীই হয়েছে বেশ।
- ফার্স্ট অফেন্স হিসাবে তোমাকে এবং আমারা মীর চৌধুরী উভয়কে ফার্স্ট ওয়ার্নিং দেওয়া হলো।
আমারা একটি ঢোক গিললো, মৃদু আঁচে বললো,
- থ্যাংক ইউ এবং সরি স্যার, এমন আর কখনো হবেনা।
- হুম, মাথায় থাকে যেন। এটা পড়াশোনা করার জায়গা, একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ের নয়।
আমারা নিঃশব্দে শুনে গেলো। প্রিন্সিপাল এবার ছেলেদের দিকে ফিরলেন। বিড়বিড় করলেন,
- অনিক রহমান, এটা তোমার দ্বিতীয় অফেন্স।
- কিন্তু স্যার আমি তো কিছু করিনি! জারাই তো...
- তুমিও তাতে উৎসাহ দিয়েছ। এর প্রমাণ আছে, সাক্ষী আছে। তোমার উচিত ছিলো স্টুডেন্ট কাউন্সিলকে জানানো, তুমি সেটা না করে উল্টো জারার সঙ্গে মা*রামা*রি করেছ। তোমার বিরুদ্ধে আরো যেসব অভিযোগ আছে তা আর বললাম না।
গুঙিয়ে উঠে হতাশায় এক হাতে মুখ ঢেকে নিলো অনিক। ভ্রু কুঁচকে থাকলো তার ক্রোধ এবং আক্রোশে। সবশেষে প্রিন্সিপাল ফিরলেন দোহার দিকে।
- দোহা ইসলাম....
নিজের নামটি অত্যন্ত শীতলতায় উচ্চারিত হতে শুনে দোহার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হলো। মাথা তুলে তাকালো সে প্রিন্সিপালের দিকে, অপরাধীর ভঙ্গিতে। এক নজর দৃষ্টি বিনিময় হলো ফাদার ফ্রেড্রিকের সঙ্গে। যিনি মাথা দুলিয়ে বুঝিয়ে দিলেন দোহাকে তিনি সাহায্য করছেন না, রুষ্ট হয়েছেন তার কর্মকান্ডে। একটি ঢোক গিললো দোহা। প্রিন্সিপালের ঠান্ডা কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
- দিস ইয ইওর লাস্ট ওয়ার্নিং। তোমার নামের পাশে রেড স্টার আছে। একটুখানি ভুল, অ্যান্ড ইউ আর আউট অব দ্যা কলেজ। তোমার স্কলারশিপ ৫% ডিডাক্ট করা হলো।
দোহা কোনো উত্তর করলোনা। শুধু স্থির তাকিয়ে রইলো প্রিন্সিপালের দিকে।
- তোমার ভুলের আর কোনো অবকাশ নেই দোহা। ইটস ইওর লাস্ট চান্স। মাইন্ড ইট।
অধরে অধর চেপে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে এবার দোহা বিড়বিড় করলো,
- ইয়েস স্যার। আই উইল।
এবার এগোলেন ফাদার ফ্রেড্রিক। ছেলেমেয়েদের দিকে একনজর তাকিয়ে সুস্থির কন্ঠে বললেন,
- এই প্রতিষ্ঠান তোমাদের পড়াশোনা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে তোমরা কেউই প্রাপ্তবয়স্ক নও। নিজেদের বাস্তব জীবনে মনোযোগ দেয়াই শ্রেয়। প্রেম - ভালোবাসা ঈশ্বরের আশীর্বাদ, তাতে হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। কিন্তু তার জন্য হানাহানি অতীব ঘৃণ্য। ছেলেরা এবং মেয়েরা, আই হোপ গড ফরগিভস অ্যান্ড ব্লেসেস ইউ অল।
- জ্বি ফাদার।
অনেকটা সমস্বরে বললো সকলে। ফাদার ফ্রেড্রিক মাথা দুলিয়ে বললেন,
- শান্তি এবং সংযমকে অন্তরে লালন করো। পড়াশোনায় মনোযোগী হও। ইউ অল মে লিভ।
প্রিন্সিপাল এবং ফাদারের দিকে তাকিয়ে সম্মান জানিয়ে একে একে সবাই বেরিয়ে গেলো বাইরে। বুকে একঝাঁক নব্য অনুভূতি। কি অপেক্ষা করছে তাদের ভবিষ্যতে?
。
。
。
রুমে পৌঁছে চুপচাপ নিজের বিছানায় বসলো আমারা। অপরদিকে তখনো ফুঁসছে জারা। কপালে এবং গলায় ব্যান্ডেজ বাঁধা সত্ত্বেও এদিক সেদিক ভীষণ উদ্যমে পায়চারি করে চলেছে। সে যে রেগে আছে তা স্পষ্ট। শুধুমাত্র দোহা আর অনিকের সঙ্গে ঝামেলা করে তার খায়েশ মেটেনি। আরো কিছু প্রয়োজন। হুট করেই একদম নিশ্চুপ বসে থাকা আমারার দিকে ফিরলো সে। চড়চড়ে কন্ঠে বলে বসলো,
- সব তোর দোষ!
কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শুধু চোখ তুলে তাকালো আমারা। জারা ভ্রু কুঁচকে মুখে বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
- সাবধান করেছিলাম না আমি? কিন্তু তুই কি আর কথা শোনার মানুষ? চিটারটা একটু ভালোমানুষী দেখাতেই মোমের মতন গলে গেলি? তোর বোধবুদ্ধি কি গরু চড়াতে গিয়েছিল? নাকি তোর ব্রেইন ইদুরের সাইজের?
নিঃশব্দ আমারা। তাতে জারা দ্বিগুণ ক্রোধ অনুভব করলো। সে চায় মেয়েটা পাল্টা ঝগড়া করুক তার সঙ্গে। অন্তত কিছু না কিছু করে নিজের মনের ভেতর চেপে রাখা বিষাদটুকু উগড়ে দিক। তবে আমারা তেমন কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। নিজের মাঝে সবটা চেপে রাখতে রাখতে যদি কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে? এই ভয়টা জারা পাচ্ছে। তাই সে নিজের কায়দায় আমারাকে যেকোনোভাবে মন খুলে সবটা উজাড় করে দেয়ার উৎসাহ দিয়ে চলেছে। জারা এগিয়ে গেলো,
- আয়নায় সাইজ দেখেও ভাবলি কি করে ওই দোহার বাচ্চা দোহার মতন একটা আস্ত প্লেবয় তোর প্রেমে পড়বে? আরে ক্লাস সেভেনের মেয়েগুলোও জানে তোর সঙ্গে শুরু থেকেই সবটা ছল হচ্ছিলো। আর তুই...!
- জারা....
শান্ত কন্ঠে আমারা জানালো,
- বিশ্বাস কর, আমি কোনোদিন ভাবিনি যে আমার শারীরিক গঠন এবং ওজনের কারণে কেউ আমাকে ভালোবাসবে না। আমার মাথায় সেই চিন্তা আসেনি।
স্তব্ধ হয়ে গেলো জারা। মুষ্টিবদ্ধ হলো তার উভয় হাত। আমারার স্বীকারোক্তি তার হৃদয়ে কেমন উথাল পাথাল ঢেউ খেলিয়ে দিচ্ছে। গোটা জগৎ মেয়েটাকে তার শরীর দিয়েই বিচার করে চলেছে, অথচ সে নিজে! সে নিজে তার ধারও ধারেনা। কতটা চমৎকার মানসিকতা হলে নিজেকে নিয়ে অনিরাপদ বোধ করেনা মানুষ? এদিক দিয়ে হয়ত আমারা জারার সম্পূর্ণ বিপরীত।
যে মেয়ের চিন্তাশক্তি এতটা প্রখর হতে পারে সে কি আদও সরল? সে কি এতটাই তুচ্ছ অনুধাবনে? হুট করেই সন্দেহ দানা বাঁধলো জারার মনে। নিজের স্পষ্ট আগ্রহ এবং দ্বিধা চাপা দেয়ার চেষ্টায় সে জিজ্ঞেস করে বসলো,
- একটা সত্যি কথা বলবি?
আমারা মাথা কাত করে দেখলো তাকে। জারা এক মুহুর্ত বিরতি দিয়ে তারপর শুধালো,
- তুই কি সত্যিই বোকা?
তার কথার বিপরীতে মৃদু হাসলো আমারা। পাতলা অধরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অনুভবটুকু মন খারাপ করিয়ে দেয়। জারাকে নিজের পাশে বসতে ইঙ্গিত করে আমারা নিজের টেবিলের ড্রয়ার খুলে ডায়েরীটা বের করে আনলো। ধকধক হৃদপিন্ডে চেয়ে দেখলো জারা। আমারা ডায়েরীটি খুলে তার হাতে দিতেই তার নয়নজোড়া ভীষণ বিস্ময়ে প্রসারিত হলো।
একটি ফটোগ্রাফ। পৃষ্ঠায় আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে শহরের কোনো এক সড়কের ধারের দৃশ্য। ফুটপাথের উপর সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর, পরনে সেন্ট পিটার্সবার্গের স্কুল ইউনিফর্ম। হাতে এক টুকরো তরমুজ, সেটি খেতে খেতে কোনো এক অজানার পানে তাকিয়ে আছে। মুখটা চিনতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা জারাকে।
দোহা!
ফটোগ্রাফটির ঠিক নিচেই তারিখ লিখা:
৭ এপ্রিল ২০১০।
মনে হলো সমস্ত শরীর অনুভবে শিথিল হয়ে পড়েছে। দুই বছর আগেকার ছবি! অর্থাৎ আমারা দোহাকে অনেক আগে থেকেই.....!
জারা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমারার দিকে তাকালো। যার দৃষ্টি ওই ফটোগ্রাফে আবদ্ধ। আঁখিজোড়ায় ভাসমান আবেগের ভেলা, ভেসে ফিরছে যা স্মৃতির আঙিনায়। যেন তার চোখ দিয়েই জারা দেখতে পেলো সেইসব স্মৃতির দৃশ্যগুলি, যার সঙ্গে ভীষণ বেখাপ্পাভাবে মিলে যায় আমারার রচিত কবিতার পংক্তিমালা........
━━━━
শ্রাবণঘন মুষলধারে, অনাহারের হাহাকারে—
বিশ্ব ঘুরপাক খাচ্ছে ২০১০ এর বছরে। সভ্যতা হচ্ছে আরও আধুনিক, মানুষের জীবনযাত্রা আরও ব্যস্ত। শুধু একই রয়ে গিয়েছে রাজধানী ঢাকার যানজট। দীর্ঘ লাইন সামনে। সাইকেল, মোটরসাইকেলের হয়েছে সুবিধা। ফাঁকফোকর গলে চলে যায়। গাড়িওয়ালাদের পেরেশানি। বিশ মিনিট যাবৎ একই স্থানে বসে থেকে তাই ড্রাইভার হাঁপিয়ে উঠেছে। ক্ষণে ক্ষণে জানালা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখছে সামনের জ্যাম কতটুকু ছাড়লো। পিছনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসে থাকা আমারার অবশ্য যানজটে আগ্রহ নেই। স্কুল থেকে বাসায় ফিরছে সে। হাতে মামণির কাছে অনেক আবদারের পর পাওয়া ডিজিটাল ক্যামেরা। গতকাল হাতে পেয়েছে। তাই পুরোদমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। ড্রাইভার, গাড়ির ছাদ, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের হেলপার, পিছনের ভ্যানগাড়ি কোনকিছুই বাদ যায়নি তার সাব্জেক্ট থেকে। খুশিমনে ক্লিক ক্লিক করে চলেছে সে। যতক্ষণ বাইরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।
আজ সকাল থেকে আকাশ গুমোট হয়ে আছে। কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে যেকোনো সময়। সবাই তাই মহা বিরক্ত। ইতোমধ্যে ঠান্ডা হাওয়া বইতে আরম্ভ করেছে। ঘন কালো মেঘ ছেয়ে ফেলেছে আকাশকে। ছবি তোলার জন্য একেবারে পারফেক্ট মৌসুম। আশেপাশে নতুন সাব্জেক্ট খুঁজতে খুঁজতে আমারা অতর্কিতে থমকালো। তার ফ্রেমের ভেতর প্রবেশ করলো এক কিশোর ছেলে। ফুটপাথের উপরে সাইকেল নিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধের ব্যাগ থেকে ধারণা করা যায় ওটাতে গিটার রয়েছে।
থমকে গিয়ে ক্যামেরা সরিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলো আমারা। ছেলেটার চেহারা সুদর্শন, চিবুক এবং চোয়ালে তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং বেশ মানিয়েছে শারীরিক গাঁথুনির সঙ্গে। পোশাকও আটসাঁট নয়, বেশ ঢিলেঢালা। ইউনিফর্মের ব্যাজ দেখে থমকালো আমারা, সেন্ট পিটার্সবার্গের শিক্ষার্থী। অভিজাত তল্লাটে এই প্রতিষ্ঠানের নাম শুনেনি এমন কেউ নেই বললেই চলে। দেশের ভেতরের স্বপ্নের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে থাকলে সেন্ট পিটার্সবার্গ তাদের জন্য তাই। আমারা ইতোমধ্যেই টিউশন নিতে আরম্ভ করেছে কলেজে চান্স পাওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে ছেলেটার প্রতি আকর্ষণ ঠিক সেন্ট পিটার্সবার্গে পড়ে বলে হচ্ছে না, অন্য কারণ আছে। কি কারণ তা আমারা জানেনা।
ছেলেটা ফুটপাথে সাইকেল থামালো। নিজের গিটার এবং ব্যাগ ঝুড়িতে রেখে ফিরলো। একপাশে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে। ছেলেটা সেখান থেকে দশ টাকায় একটা লম্বা টুকরো কিনে নিলো। অতঃপর নিজের সাইকেলের গায়ে হেলান দিয়ে সেটা খেতে লাগলো। তার দৃষ্টি ঘোরাফেরা করতে থাকলো সামনের যানজট পেরিয়ে একেবারে দূর আকাশের মেঘপুঞ্জের মাঝে।
হাতঘড়ির দিকে তাকালো আমারা। দুইটা বেজে বিশ মিনিট। এখন দুপুরের খাবারের সময়। কি যেন মনে করে সে আবার ফিরে তাকালো ছেলেটার দিকে। তাকিয়েই রইলো। সেন্ট পিটার্সবার্গে পড়ে অথচ এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তরমুজ খাচ্ছে? তার কি উচিত নয় স্কুলে কিংবা রেস্টুরেন্টে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থেকে হরেক পদের লাঞ্চ সারা?
অথচ রাস্তার পাশে সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটা একমনে হাতের তরমুজের টুকরোটি খাচ্ছে। এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। গাড়ির ভেতর থেকে চেয়ে রইলো আমারা, হাতে তুললো ক্যামেরাটি। চিত্রটি বন্দী হয়ে গেলো তার ক্যামেরার রোলে, নাকি হৃদয়ের গহীনে?
সুখ খুঁজে নাও, হাসি বিলাও
প্রিয় আমার, খুশিতে কাঁদাও —
ছেলেটির খাওয়া প্রায় শেষের দিকে যখন, তখন হঠাৎ আশেপাশের কতক পথশিশুর দল তাকে ঘিরে ধরলো। কিছু করলোনা, শুধু ফুটপাথের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো এক শিশু। তার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো ছেলেটার। আমারা খুবই মৃদু আওয়াজে তাদের কথোপকথন শুনতে পেলো।
- খাবি?
- না, আফনে খান।
শুধুমাত্র একটা হাফ প্যান্ট পরনে তৈল চকচকে কালো বর্ণের শিশু ছেলে জবাব দিলো। তাতে ছেলেটা হেসে ফেললো, জিজ্ঞেস করলো,
- সকালে খেয়েছিস?
- না।
- ক্ষুধা লেগেছে?
- হ্যাঁ।
- তাহলে খা?
- না।
- কেনো?
- আমি একলা খাইলে ওগো কষ্ট লাগবো।
অদূরে বোতল কুড়াতে থাকা পথশিশুদের দেখিয়ে বললো সে। ছেলেটা মাথা ঘুরিয়ে তার সঙ্গী সাথীদের দেখলো। তারপর ঝুঁকে এলো, শিশুটির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো,
- যা, ওদেরও ডেকে আন।
এক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকলো শিশুটি, যেন ছেলেটাকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। তবে পরমুহুর্তে কি যেন ভেবে সত্যি সত্যি দৌঁড়ে গিয়ে বাকিদের ডেকে আনলো। ছেলেটা নিজের পকেট খুঁজেপেতে একটা একশো টাকার নোট বের করে তরমুজ বিক্রি করতে থাকা লোকটাকে দিয়ে বললো,
- আংকেল ওদেরকেও দিন, দুটো করে দিয়েন।
আমারা মন্ত্রমুগ্ধ চোখে দেখে গেলো গোটা দৃশ্যটি। পথশিশুর দলটি সামান্য তরমুজ হাতে পেয়েই খুশিতে লম্ফঝম্ফ দিয়ে উঠলো। ছেলেটাকে ঘিরে ধরলো সবাই। দুইজনকে নিজের সাইকেলের সিটে উঠিয়ে বসালো সে। অপর একজন তো তার ঝুড়ির মধ্যে বাচ্চাটি হয়ে খুঁটি গাড়লো। তাদের সঙ্গে গল্প এবং হাসিঠাট্টা করতে করতে ছেলেটা নিজের অবশিষ্ট তরমুজটুকু সাবার করলো। ততক্ষণে আমারার ক্যামেরার রোল ভর্তি হয়ে এসেছে প্রায় ছবিতে ছবিতে।
তোমার দুহাত সিক্ত শুদ্ধ , ভিজে অন্তর করেছে মুগ্ধ —
অতর্কিতে গর্জে উঠলো মেঘ, সঙ্গে প্রচন্ড এক বিদ্যুৎ চমক। দমকা হাওয়ায় চারপাশ লন্ডভন্ড প্রায় অবস্থা। তারপরই ঝমঝমিয়ে নামলো বর্ষণ। যানজটে আটকে রাখা গাড়িগুলোর হর্ণ বাজতে থাকলো তীব্রভাবে। সঙ্গে মানুষের বাড়ন্ত কোলাহল। তরমুজ বিক্রেতা নিজের ঝাঁপি গুটিয়ে ছুটলো আশেপাশের কোনো ছাউনির আশ্রয়ে। পথচারীরাও হেঁটে না গিয়ে দৌঁড়াতে থাকলো আর্দ্রতা এড়াতে। পথশিশুর দলও লাফিয়ে উঠলো, তবে ছেলেটার মাঝে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। গোটা শরীর তার ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে। হাফপ্যান্ট পড়া শিশুটি তার হাত ধরে টানলো,
- ভাইজান চলেন, ভিজা যাইতাসেন তো!
ছেলেটা নিজের সিক্ত চুলে আঙুল বুলিয়ে মাথা নেড়ে বললো,
- উহু, বৃষ্টি অনেক আনন্দের।
- অ্যাহ?
- গান শুনিসনি? ঝড় এলো এলো ঝড়, আম পড় আম পড়, কাঁচা আম পাকা আম, টসটসে মিষ্টি! এই যাহ, এলো বুঝি বৃষ্টি~
ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাওয়া ফুটপাথে দুহাত ছড়িয়ে বৃষ্টির মাঝে নিজেকে মেলে ধরলো ছেলেটা। যেন পেখম মেলে নেচে ওঠা কোনো ময়ূর। পথশিশুর দলও নির্দ্বিধায় যোগ দিলো। তাদের সঙ্গে তালে তালে নাচতে থাকলো ছেলেটা, সঙ্গে হাসির কলরোল। খিলখিল প্রফুল্ল হাসি, বৃষ্টির ঝমঝম ধ্বনি, মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের ঝিলিক এবং সঙ্গে সম্মিলিত সুর,
- ঝড় এলো এলো ঝড়, আম পড় আম পড়~
- আম না পড়লেও একটা বাজ ঠিকই পড়তে পারে মাথায়!
আবারো তীব্র হাসির ধ্বনি।
গাড়ির উইন্ডশিল্ড উঠে এলো বৃষ্টির ঝাঁপটা রুখতে। সঙ্গে আমারাকে সম্পূর্ণরূপে রুখে দিলো ওই দৃশ্যের সঙ্গে। আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছেনা। দৃশ্যটা এতই অবর্ণনীয় সুন্দর, যে আমারা নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল তার মাঝে। কখন যানজট ছেড়েছে সে টের অবধি পায়নি। বুঝতে পারলো যখন গাড়িটা চলতে শুরু করলো। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে সে জানালার কাঁচ আঁকড়ে ধরলো, মুখ চেপে দেখে গেলো দৃশ্যটি যতক্ষণ দেখা সম্ভব।
তীব্র মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে ছেলেটি ফুটপাথে পথশিশুর দলের সঙ্গে প্রফুল্লতায় মেতে উঠেছে। একজনকে কোলে তুলে ঘুরছে সে, অপর সবাই তার আশেপাশে লাফিয়ে চলেছে। বৃষ্টি তাদের ক্রমশ কয়েক পলকের নিগূঢ় খুশির আচ্ছাদনে ছেয়ে ফেলেছে। দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা আমারা, ধকধক হৃদস্পন্দন এবং টলটলে আঁখিতে তাকিয়ে রইলো। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে দৃশ্যটি, দূরে সরে যাচ্ছে সে, গাড়ি তাকে নিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। তবুও আমারা যেন স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে ওই কন্ঠস্বর,
“ ঝড় এলো এলো ঝড়, আম পড় আম পড়......”
মানুষ কত অল্পতেই খুশি!
━━━━
টপ করে আমারার নয়নের একফোঁটা অশ্রু পড়লো ডায়েরীর ফটোগ্রাফটির ঠিক এক কোণায়। স্থির তাকিয়ে থাকলো জারা, আনমনে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে সেটি মুছে নিলো। তারপর মুখ তুলে দেখলো। আমারার চেহারাজুড়ে বিধূরের বিচরণ। তীব্র এক হাহাকার মরুভূমি অন্তর, বিষাদবৃক্ষের প্রস্ফুটন। উপলব্ধি করলো জারা। এ নেহায়েত কোনো কৈশোরের প্রেম নয়, নয় আবেগের দোলাচল কিংবা শারীরিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ। আমারার তরফ থেকে এ নিখাদ ভালোবাসার কাব্য, যার সূচনা ঘটেছে বহুকাল আগেই।
সংকুচিত হয়ে এলো জারার অন্তর। আতঙ্কের শীতল স্রোত খেলে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে। আমারা যা দেখাচ্ছে, তার কষ্টের পরিমাণ সেই তুলনায় অগণিত গুণ অধিক, যার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। হাজার প্রশ্ন মনে দানা বাঁধলেও এই মুহূর্তে নিজেকে দমালো জারা। ধপ করে ডায়েরী বন্ধ করলো। কোনো কথা না বলেই টেবিল থেকে আমারার ফোনটা বাগড়ে ধরলো। ফোনের লক জারা জানে, অতি সহজ, লোকানোর কিছু নেই আমারার। কোনোকিছু জিজ্ঞেস না করে জারা মামণি নামে সেইভ করা নাম্বারে একটি মেসেজ লিখে পাঠালো,
“ বাসায় যাবো মামণি, ডরমে এসে নিয়ে যাও। ”
আমারা দেখলো, কিন্তু জারাকে কোনো বাঁধা দিলোনা। পরক্ষণেই ফোন রেখে উঠে আলমারি থেকে টেনেটুনে আমারার লাগেজ বের করে জারা তার প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় এবং কিছু বইখাতা - জিনিসপত্র ঠেসেঠুসে তাতে ভরতে থাকলো। নরম কন্ঠে বিড়বিড় করলো,
- রমজানের বন্ধ শুরু হবে, মাঝখানে একটা দুইটা ক্লাস না করলে কিছু হবেনা। তোকে আমি নোটস জোগাড় করে দেবো। তুই বাসায় যা। দোহাই লাগে, দূরে থাক!
আমারা কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা, ডায়েরীটা বুকে চেপে ধরে ঝাপসা দৃষ্টিতে জারার কাজ দেখে গেলো শুধু।
━━━━━━━━━━━━━
বরাবরের মতোই চারিপাশে ক্ষারের ঘ্রাণ। ঔষধের তিক্ত একপ্রকার গন্ধ বায়ুজুড়ে। নিশুত রাত, রোগীদের অধিকাংশ বিশ্রামে। সকালের মতন মানুষের তীব্র কোলাহল নেই। নার্স এবং ডাক্তারদের উপস্থিতিও নগণ্য। শুধু এদিক সেদিক একজন দুজন কর্মী মেঝে পরিষ্কার করছে। করিডোর ধরে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে দোহা। কালো জিন্স আর নীল কালো চেকের শার্ট পরনে। হুডির মতন একটা টুপি আছে শার্টে, যেটা মাথায় তুলে রেখেছে। নিজের হাত এবং চিবুকের ব্যান্ডেজ আড়ালের চেষ্টা। দুহাত পকেটে গুঁজে রেখেছে। কড়কড়ে পঁচিশ হাজার টাকার বান্ডিলে ভারী হয়ে আছে আস্তিন। অপর পকেটে গোটা দশ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভিন্নতা আছে। এই দশ হাজার তার মাসের পর মাসের পরিশ্রমের, রাতের পর রাত নির্ঘুম থাকার ফসল। আর পঁচিশ হাজার একটা হৃদয় ভেঙে খানখান করার মূল্য।
কেবিনটির সামনে থামলো দোহা। দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টেনে তারপর ভেতরে ঢুকলো। আবছায়া আলো আঁধারিতে বিছানায় শুয়ে থাকা রুগ্ন রমণীকে নজরে এলো, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন যে। এককালের ঘন কালো চুল কমে বর্তমানে রীতিমত নাই হয়ে গিয়েছে। চাইলে গুণে দেখা যেন কতটা চুল আছে মাথায়! হাসপাতালের সাদা মেক্সির মতন পোশাক গায়ে জড়ানো, তার উপর কাথা টেনে দেয়া। ন্যাসাল ক্যানোলা যুক্ত নাকে। জীর্ণ শীর্ণ অবয়বটির পাশেই একটি টুলের উপর বসা এক মধ্যবয়স্ক লোক। মলিন বাদামী শার্ট পরনে, কলারের কাছে ছেড়া ফাটা স্পষ্ট। শরীর ভেঙে এসেছে লোকটির। মুখজুড়ে ফ্যাকাশে ভাব, চোখের নিচে কালি, চুলগুলো পাখির বাসার মতন। রুগ্ন রমণীর একটি হাত আঁকড়ে ধরে সে চুপচাপ বসে আছে।
দোহা এগিয়ে গেলো, আলতো করে হাত রাখলো লোকটির কাঁধে। তবে তার অস্তিত্ব যেন অনুভবও করলেন না তিনি। দোহা তাতে খানিক ঝুঁকলো, নরম কন্ঠে ডাকলো,
- মাহবুব আংকেল?
সামান্য কাঁপলেন মাহবুব, ফিরে তাকিয়ে দেখলেন দোহাকে। মলিন এক হাসি ফুটলো তার শুষ্ক অধরে।
- দোহা তুমি? ভালো আছো?
- জ্বি।
- তোমার মুখে কি হয়েছে?
- পা ফসকে পরে গিয়েছিলাম।
নির্দ্বিধায় জবাব দিলো দোহা। আনমনে চোখ বুলিয়ে আনলো বিপ বিপ করতে থাকা মনিটরে। জিজ্ঞেস করলো,
- ডাক্তার কি বলেছে?
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাহবুব। হাতের মাঝে জীর্ণ রমণীর হাতটি আরো জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে জানালেন,
- ভালো না। থেরাপি দিতে হবে আবারো। সার্জারির ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। দেখা যাক, কি হয়। আশা রাখছি আল্লাহ সহায় হবেন।
দোহা কোনো জবাব দিলোনা। পকেটে হাত চালান করলো। পঁচিশ হাজার টাকার বান্ডিলটা চেপে ধরলো। মনে হলো তার হৃদয়টা কেমন যেন দপদপ করছে, বুকের ভেতর তীব্র অস্বস্তি। রুগ্ন রমণীর মুখের দিকে তাকালো সে। জেল্লা হারিয়ে সব ফিকে হয়ে গিয়েছে। এই মুখ দেখে কাঁপলো তার অন্তর। নিজের ভেতরের লড়াইয়ের সব শক্তি যেন এক নিমিষে হারিয়ে ফেললো সে। দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলো। আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে কাজ করতে হবে তাকে।
এমন বিবেককে লাথি মা*র যে বিবেক তোকে কোমল অন্তর নিয়ে খেলতে শেখায়—
থেমে গেলো দোহা। এই রুগ্ন ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে তার সামনে জগতের সবকিছু যেন মিথ্যা হয়ে গেলো। হাত মুঠো করে ফেললো সে। পকেট থেকে খালি হাতই বের করে আনলো সে। মাহবুব কিছুটা বিস্মিত হয়ে তাকে দেখছেন। দোহা একটি ঢোক গিলে অপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে দশ হাজার টাকার পাতলা বান্ডিলটা বের করে নিলো। মাহবুবের হাতে দিয়ে মুঠো বন্ধ করে দিয়ে বিড়বিড় করলো,
- এটা রাখুন আংকেল। আমি.... আমি আরো কিছু জোগাড়ের চেষ্টা করবো...
- তুমি এত কষ্ট....
মাহবুব এরপর আরো কিছু বললেন, তবে তা দোহা শুনতে পেলনা। সে চুপচাপ বিছানা ঘুরে অপর পাশে গিয়ে বসলো। রমণীর জীর্ণ ডান হাতটি বুকের উপর থেকে নিজের দুহাতে তুলে নিলো। ঝুঁকে তাতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে ফিসফিস কন্ঠে আপনমনে বললো,
- আম্মু.......আমাকে মাফ করে দাও।
—চলবে—