#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৭
পর্ব ১৭: [ টুকরো সংসার ]
━━━━━━━━━━━━━━━━
রাত প্রায় দশটা। আমারা লাগেজ নিয়ে এগোচ্ছে। আশফিকা চৌধুরী কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকায় নিজে আসতে পারেননি, নিজের অ্যাসিস্টেন্টকে পাঠিয়েছেন আমারাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। জারা আসতে চেয়েছিল নিচ অবধি, তবে আমারা বারণ করেছে। মেয়েটার বিশ্রাম দরকার। আজকে একদিনে কি এক কাহিনী হয়ে গেলো!
লাগেজটা খানিক ভারী। বহন করতে অসুবিধা হলেও আমারা দুহাতে ঠেলেঠুলে গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছে। গাড়ি বাইরের রাস্তায় অপেক্ষা করার কথা।
- মে আই হেল্প ইউ?
নরম কণ্ঠের আবেদনে আমারা খানিক থমকালো। মুখ তুলে তাকাতেই দেখলো রুহান দাঁড়িয়ে আছে। ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন বান্দা একাধারে স্টুডেন্ট কাউন্সিলেরও একজন সদস্য। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র মোস্ট ক্লাসের শিক্ষার্থী হিসাবে তাকে অনেকেই সমীহ করে চলে। আমারা চোখ পিটপিট করলো,
- না, ঠিক আছে। ইটস ফাইন, আমি পারবো। অফারের জন্য ধন্যবাদ।
- জাস্ট... লেট মি।
এটুকুই। আমারা আর কোনো মতবিরোধ করলোনা।রুহান হাত বাড়িয়ে তার লাগেজটা নিজের হাতে নিলো, চুপচাপ পাশাপাশি চলতে আরম্ভ করলো। আমারা খানিক অস্বস্তিবোধ করলেও নিঃশব্দে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলো।
- বাসায় যাচ্ছো?
রুহানের প্রশ্নে মাথা দোলালো আমারা।
- জ্বি।
- এখনো ক্লাস বাকি আছে।
- উম, একটু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা আছে।
- আই সি।
রুহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,
- আই হোপ, প্রিন্সিপাল তোমাকে খুব বড় শাস্তি দেয়নি।
- শুধুমাত্র ওয়ার্নিং দিয়েছেন, আর কিছু নয়।
- হুম। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানিও, আমি স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সঙ্গে কথা বলে সাহায্য করতে পারবো।
- ধন্যবাদ ভাইয়া।
আমারার ভদ্রতাসূচক জবাবের বিপরীতে রুহান খানিক হাসলো। ছেলেটার হাসি ভীষণ সুন্দর, তার অবয়বের সবথেকে আকর্ষনীয় দিক।
- আমাকে তুমি নাম ধরে ডাকতে পারো। ভাইয়া বলার প্রয়োজন নেই।
- কিন্তু আপনি আমার সিনিয়র।
- তাতে কি? আমাকে আমার টিমমেটরা নাম ধরেই ডাকে, অনেকে তো তুই তুকারিও করে।
সামনের সড়কে এসে পড়লেও কোনো গাড়ির দেখা নেই। আমারার পাশাপাশি তাই রুহানও থেমে দাঁড়ালো। লাগেজটা মাটিতে রাখলো। আশেপাশে তেমন কোনো মানুষ নেই, তাই রুহান ফিরে গেলোনা। আমারার পাশে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো। উভয়েই মিনিট দুয়েক এক অস্বস্তিকর নীরবতায় দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর কন্ঠ পরিষ্কার করে রুহান নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলো,
- তুমি ঠিক আছো, আমারা?
অতর্কিত প্রশ্নে আমারা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। প্রথমবারের মতন সে সত্যিই রুহানকে ভালোমত পর্যবেক্ষণ করলো। এই ছেলের সঙ্গে এর আগে শুধুমাত্র একবারই আলাপ হয়েছিল তার স্টুডেন্ট কাউন্সিলের অফিসে। দরকারি কিছু কাজের কথা, ওইটুকুই। আমারার মুখে দ্বিধা লক্ষ্য করে রুহান থমকালো, মাথা নেড়ে জানালো,
- বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে থাকলে জবাব দেয়ার দরকার নেই।
- আমি ঠিক আছি।
আস্তে করে উত্তর করলো আমারা। তাকালো নিজের দুই পায়ের দিকে। একটি দীর্ঘ শ্বাস টানলো রুহান। নিজের বুকে দুবাহু বেঁধে অদূর কালো আকাশের দিকে চেয়ে থাকলো। আমারা কেমন যেন অদ্ভুত খচখচে অনুভূতি টের পেলো নিজের হৃদয়ে। একটি ঢোক গিলে সে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
- আপনি ঠিক আছেন?
এই প্রশ্নের বিপরীতে হেসে ফেললো রুহান। মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো,
- সরি টু সে বাট, আমি তোমার মতন মিথ্যা বলতে পারছিনা। আমি ঠিক নেই, আর কোনোদিন হবোও না।
রুহানের চকচকে নয়নজুড়ে যে অব্যক্ত অনুভব প্রকাশ পেলো তা আমারার দৃষ্টি এড়ালোনা। সে ভাবলো রুহান আর কিছু বলবেনা। তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে খানিক বাদেই সে ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
- তুমি জানো রাহা আমাকে কি বলেছে? ইট ওয়ায জাস্ট আ কিস, নাথিং মোর! এতে এত হাইপার হওয়ার কি আছে? হোয়াট আ বুলশিট!
আমারার বুকের দগদগে ঘা যেন আবারো তাজা হয়ে উঠলো। অজান্তেই বাহুর বাঁধনে নিজের অবয়ব আঁকড়ে ফেললো সে, দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো সুদূর রাস্তায়। বিড়বিড় করলো,
- আমরা এসব নিয়ে কথা না বলি, প্লীজ?
- রাইট, সরি।
আলতো করে জবাব দিলো রুহান। পকেটে দুহাত ভরে সশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সেও যে ব্যাপারটায় ভীষণ দূর্গত অবস্থায় আছে তা স্পষ্ট। আমারা দ্রুত নিজের ফোন বের করে আবারো ডায়াল করলো অ্যাসিস্টেন্টের নাম্বারে। এত সময় লাগাচ্ছে কেনো? ফোন রিং হলেও কেউ রিসিভ করলোনা। যারপরনাই বিরক্ত হয়ে আমারা আরেক দফায় ফোন করতেই হঠাৎ থমকে গেলো একটি দৃশ্য লক্ষ্য করে।
রাস্তার ধার ঘেঁষে হেঁটে আসছে দোহা। পরিশ্রান্ত অবয়ব, মাথাটি ঝুঁকিয়ে রেখেছে নিচের দিকে। মাথায় শার্টের টুপি তুলে রাখায় চেহারার অর্ধেক অংশ চোখেই পড়ছেনা। তবে আমারা তার অস্তিত্ব চিনতে কখনোই বেগ পোহায়না। অন্তর চেপে এলো দারুণভাবে। আমারা তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরিয়ে ফেললো। তার প্রতিক্রিয়া রুহানের দৃষ্টি এড়ালোনা। সে এক পা কাছে সরে এলো, খানিকটা আমারাকে রক্ষা করার ভঙ্গিতেই।
দোহা কাছাকাছি এসে থামলো। নির্জন রাস্তায় এই রাত্রিবেলা পাশাপাশি রুহান এবং আমারাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে যারপরনাই অবাক হলো। শুধু অবাক হলো নাকি ভিন্ন কিছু তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। মাথা থেকে টুপিটি ঘাড়ে নামিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে দোহা এগোলো। প্রথমটায় চুপচাপ তাদের এড়িয়ে ডরমে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেও তার পদযুগল তাকে ঠিক রুহানের পাশাপাশি থামতে বাধ্য করলো।
- আমি যতদূর জানি, মেইল ডরমের রাস্তা উল্টোদিকে।
দোহার ঠান্ডা এবং শুষ্ক কন্ঠস্বর রাত্রির নীরবতা ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হলো। শিউরে উঠলো আমারা, তবুও জোরপূর্বক নিজেকে ফিরে তাকানো থেকে বিরত রাখলো। রুহান তীর্যক হাসলো, ঘুরে দাঁড়ালো দোহার দিকে।
- গুড, রাস্তা চেনো তাহলে। গো অ্যাহেড।
- সে তো যেতেই পারি। তবে রাত বিরাতে মানুষকে দল পাকাতে দেখলে একটু আতঙ্ক হয় বৈকি।
আমারা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো, আরেকটু হলে সে ফিরে তাকাচ্ছিলো তবে রুহান সরে এসে তাকে দোহার থেকে একপ্রকার আড়াল করে ফেললো। খিলখিল করে হাসলো ছেলেটা।
- ওয়াও। তা তোমাকে একা একা রাত বিরাতে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে দেখলে কি আতঙ্কিত বোধ করা উচিৎ নয়? হয়ত দলটা পাকানোই হচ্ছে তোমার মতন কাউকে মোকাবেলা করার জন্য?
মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো দোহার হাত। রুহানের কলার চেপে ধরার তীব্র বাসনা সে দমন করলো দাঁতে ঠোঁট কামড়ে। দোহা জানে তার এক্ষুণি এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু পারছেনা। একটা অসহনীয় অনুভূতি হচ্ছে বুকের ভেতর। রুহান যদি সিনিয়র আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্য না হতো তাহলে এতক্ষণে হয়ত সে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলতো না। নিজের ক্রোধ দমনে রুহানকে উপেক্ষা করে সে মাথা হেলিয়ে তাই আমারার দিকে মনোযোগ দিলো। কিশোরী ভিন্নদিকে তাকিয়ে আছে, একপাশে লাগেজ। ভ্রু কুঁচকে এলো দোহার, বুঝে ওঠার আগেই অনিয়ন্ত্রিত প্রশ্ন করে বসলো,
- কোথায় যাচ্ছো?
পরক্ষণেই জিভে কামড় দিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সে। আমারার তরফ থেকে প্রতিক্রিয়া না এলেও রুহান খুকখুক করে কেশে উঠলো, পরক্ষণেই আবার হেসে ফেললো।
- হিপোক্রেসির সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ, একটু অন্তত সংকোচ করো?
- আমি তোমার সাথে কথা বলছি না রুহান। আর কথায় কথায় তুমি কেনো জবাব দিচ্ছ? এখানে আরেকজন আছে, সে কি বোবা?
গাড়ির হর্নের আওয়াজে দোহার প্রশ্নটি চাপা পড়ে গেলো। চকচকে কালো বর্ণের একটি প্রাইভেট কার এসে থামলো রাস্তার ধারে, ঠিক আমারার পাশে। প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে গেলো। এক স্যুট পরিহিত তরুণী বাইরে পা রাখলো।
- আসো, আমারা।
মাথা দুলিয়ে আমারা ফিরতেই রুহান বললো,
- তুমি সিটে বসো, আমি লাগেজ ডিকিতে তুলে দিচ্ছি।
- থ্যাংক ইউ।
আমারা মৃদু স্বরে জানালো। গাড়িতে চেপে বসতে গিয়ে তার একনজর দৃষ্টি বিনিময় হলো দোহার সঙ্গে। শীতলতম দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বান্দা, মুখজুড়ে কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব নেই। আমারা এবং সেই তরুণী উভয়ে চেপে বসতে বসতে রুহান লাগেজ পিছনে তুলে দিলো। গাড়ির দরজা আটকে গেলো। পরক্ষণেই যেভাবে এসেছিল, তেমন করেই গাড়িটি ধীরে ধীরে এগিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো রাত্রির আঁধারমাঝে। তাকিয়ে থাকলো দোহা যতক্ষণ দেখা সম্ভব। তারপরই তার কঠিন দৃষ্টি গিয়ে পড়লো রুহানের উপর। নির্দ্বিধায় এগিয়ে গেলো সে, বরাবর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
- ইউ আর বিইং টু মাচ ইন্টারেস্টেড!
বাঁকা হাসলো রুহান। দোহার গাল চাপড়ে দিয়ে বিড়বিড় করলো,
- বুদ্ধিমান। শুধু এই বুদ্ধিটুকু যদি ভালো কাজে খরচ হতো, তাহলে কতই না চমৎকার হতো!
- ভালো? অ্যান্ড ইউ? নাইস জোক!
পাল্টা হাসলো দোহাও। তাতে মাথা কাত করে রুহান তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে জানালো,
- প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। নিউটনস থার্ড ল, রিমেম্বার?
দোহার দৃষ্টি ক্রমশ সুচারু হয়ে উঠলো।
- ওকে এই খেলায় না জড়ালেই তোমার জন্য মঙ্গল! নাহলে যা হবে তার দায় সম্পূর্ণ তোমার! বাকিটা, নিজের ভালো কুকুরও বোঝে!
উল্টো ঘুরে গেলো দোহা। টুপিটা মাথায় তুলতে তুলতে হেঁটে ভেতরে চলে গেলো। রুহান ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো নিজের জায়গায়। স্মিত হাসিমাখা অধরে তাকিয়ে দেখলো আড়াল হতে থাকা অবয়বটিকে।
━━━━━━━━━━━
আজ পহেলা রমজান।
পিঁয়াজু, বেগুনী ভাঁজাপোড়ার সুবাসে ম ম করছে গোটা ঘর। টেবিলে শরবত গুলতে গুলতে বারবার দেয়ালের ঘড়ির দিকে নজর বুলাচ্ছে দিয়া। মেঝেতে তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে ছোটভাই ফায়াজ। সদ্য ভাঁজা আলুর চপে কামড় বসিয়ে মহাখুশি উদযাপন করছে। আজকে সে দুইটা রোজা রেখেছে! কত চমৎকার ব্যাপার! একটা দুপুরের খাবার খেয়ে ভেঙেছে, আরেকটা এখন ইফতারি করে ভাঙবে। মৃদু হেসে তার কান্ডকারখানা দেখে যাচ্ছে দিয়া।
- শবনম, বাঙ্গিটা ধুয়ে ছুরি সমেত দাও তো, কে*টে দেই।
লুঙ্গি এবং টি শার্ট পরিহিত বাবুল ইসলাম হাঁকলেন। ডাইনিং টেবিলে চেয়ার টেনে বসলেন। স্ত্রী শবনম শাড়ীর আঁচলে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বাঙ্গি এনে ধপাস করে টেবিলে রাখলেন। মহা উৎসাহে সেটিতে বাবুল মনোযোগ দিতেই শবনম কর্কশ কন্ঠে বললেন,
- উফ্! এই গরমে চুলার সামনে দাঁড়িয়ে কয়লা হয়ে গেলাম! বউকে দুটো সাহায্য করার মতলব নেই উনি আছে ওনার বাঙ্গি নিয়ে! প্রথম রোজা পরে পরে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়ার জন্য বুঝি? বাঙ্গি কাটলে আর শরবত গোলালেই সব হয়ে যায়?
থমকে গেলো দিয়া। বিব্রতবোধ করে দ্রুত শরবতের পাত্র টেবিলে ঠেলে দিয়ে ফিরলো,
- মা তুমি বসো ফ্যানের নিচে, বাকি ইফতারিটুকু আমি ভেঁজে আনছি।
শবনম কোনো প্রতিক্রিয়া করলেন না। দিয়া দ্রুতই রান্নাঘরে আড়াল হয়ে গেলো। চেয়ার টেনে স্বামীর পাশে আয়েশে বসে তার কাটাকুটি দেখতে দেখতে শবনম সুধালেন,
- বলছিলাম ফায়াজ আর আমার কেনাকাটাটা এই বছর একটু আগেভাগে করলে হয়না? রমজানের মাঝামাঝি তো হুহু করে সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে।
- দেবো দেবো, চিন্তা নেই। সবাইকেই ঈদের মার্কেট করে দেবো শীঘ্রই।
- সবার কি দরকার? তোমার ছেলেমেয়েদের তো নিজেদেরই ট্যাক আছে।
শবনমের কথা শেষ হতে না হতেই কলিং বেলের শব্দে গোটা ঘর মুখরিত হয়ে উঠলো। ফায়াজ ভীষণ আনন্দে লাফিয়ে দরজার দিকে ছুটলো। বাসায় যেই আসুক না কেন, তার কাজ কলিংবেল শোনা মাত্র দরজায় ছুটে ছিটকিনির নাগাল পেতে লম্ফঝম্ফ করা।
- দেখ তো দিয়া কে এসেছে!
বাবুলের ডাকে রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরোলো দিয়া। এর মধ্যেই ঘেমে গিয়েছে। ওড়নার খুঁটে ঘাম মুছে নিয়ে দ্রুত উত্তেজিত ফায়াজকে সরিয়ে সে দরজা খুললো। অপর প্রান্তের মুখটি নজরে আসতেই বিস্তর হাসিতে উদ্ভাসিত হলো তার মুখ।
- ভাইয়া!
- আপু!
দিয়ার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো দোহা। দুহাতে জাপটে ধরে তাকে আলিঙ্গন করে নিলো দিয়া। অবুঝ ফায়াজ তার একটি পা চেপে ধরে উত্তেজনায় লাফাতে লাফাতে বলতে থাকলো,
- দোহা ভাইয়া! দোহা ভাইয়া! চকলেট দাও, চকলেট দাও!
খিলখিল করে হাসলো দোহা। দিয়াকে ছেড়ে এক হাঁটু মুড়ে বসে ফায়াজকে কোলে তুলে নিলো। পকেট থেকে একটা চকলেটের বার বের করে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নাক টেনে বললো,
- ছিঃ ছিঃ ছিঃ! রোজা রাখোনি তুমি?
- ইশ! আমি দুইটা রোজা রেখেছি!
- সেহরী না করেই?
- ইশ! আমি সকালে সেহরী করেছি!
হাসলো দোহা, ফায়াজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতরে এলো। দিয়া দরজা আটকে দ্রুত রান্নাঘরে ছুটতে ছুটতে জানালো,
- হাতমুখ ধুয়ে তাড়াতাড়ি টেবিলে বস, ইফতারির খুব বেশি সময় বাকি নেই।
বোনের কথায় দোহা মাথা দুলিয়ে সায় দিলো। ফায়াজকে টেবিলের উপর বসিয়ে একনজর বাবুল আর শবনমের দিকে তাকালো।
- আসসালামু আলাইকুম আব্বু।
বাবুল বাঙ্গি কাটায় ক্ষান্ত নিয়ে মাথা তুলে দোহাকে দেখলেন, তারপর শান্ত কন্ঠে বললেন,
- হুম। যা, ওযু করে আয়।
দোহা নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে এগোলো। ঠিক তখনি বাবুলের কন্ঠস্বর তাকে থামতে বাধ্য করলো।
- তুই ওই জিনিস আবার ঘরে এনেছিস?
সামান্য কাঁপলো দোহা। অজান্তেই কাঁধে ঝুলন্ত গিটারের ব্যাগটায় তার হাত চেপে বসলো। শক্ত একটি ঢোক গিললো সে। তারপর ক্ষীণ কন্ঠে পরোয়াহীন উত্তর করলো।
- হ্যাঁ।
আড়াল হয়ে গেলো দোহা। তার চলার পথে একনজর তাকালেন শবনম, অত্যন্ত বিতৃষ্ণাভরে।
কিছুক্ষণ বাদেই টেবিলে বসলো সবাই। আজান পড়তে আর খুব বেশিক্ষণ সময় বাকি নেই। দিয়া এবং শবনম টেবিল সাজিয়ে ফেলেছেন। প্লেটে প্লেটে খেজুর, ফলমূল এবং শরবত দেয়া আছে। মুড়ি একসাথে গামলায় মাখানো হবে। চেয়ারজুড়ে বসে আছে সবাই। মাঝখানের চেয়ারে বাবুল। টুপি মাথায় দোয়া দুরূদ পাঠ করতে করতে সবাইকে দেখছেন। তার দৃষ্টি আবদ্ধ হলো একপাশে বসা দোহার উপর। তীক্ষ্ণ হলো চিবুকের ব্যান্ডেজে।
- তোর মুখে কি হয়েছে?
পাশের চেয়ারে বসে থাকা ফায়াজের সঙ্গে দুষ্টামি করতে করতে থমকালো দোহা। কন্ঠ পরিষ্কার করে নির্দ্বিধায় জবাব দিলো,
- বাথরুমে পা ফসকে পরে গিয়েছিলাম।
- সেকি! আমাকে একবার বললিও না! ইফতারের পরই দেখাবি আমাকে তুই, ভাইয়া।
দিয়া বলে উঠলো ভীষণ উদ্বিগ্ন স্বরে। সকলের মনোযোগ হটিয়ে উপহাসের হাসি হেসে শবনম বলে বসলেন,
- সে বলার মতন কিছু হলে আগেই বলতো। সত্যিই বাথরুমে পা ফসকেছে তার প্রমাণ কি? তোমার ভাইয়ার তো আবার সুনামের অভাব নেই, তাইনা দিয়া?
সরু হয়ে এলো দিয়ার আঁখিজোড়া। তবে নির্বিকার দোহা। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে প্লেটের দিকে। বাবুল ক্ষীণ আঁচে বললেন,
- আচ্ছা শবনম হয়েছে, বাদ দাও। ইফতারির সময়, পরে আলোচনা করা যাবে।
- না না, বাদ কেনো দেবো? এই কথা তো আজকের কালকের না তাইনা? বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। আমি না সত্যিই বুঝিনা। তোমরা সবাই কি চোখ থাকতে অন্ধ? আজকে থুতনিতে ব্যথা, কালকে দেখবে হাত পা ভাঙা। এরপর একদিন দেখবে মামলা খু*নখা*রাবি অবধি গড়িয়েছে। পুলিশ এসে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে তখন বোঝা যাবে সময় থাকতে কার কথার দাম দেয়ার দরকার ছিলো।
- আমাকে নিয়ে তোমার এত চিন্তাকে সাধুবাদ জানাই আন্টি। তবে তোমার লম্বা নাকটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে না গলিয়ে নিজের জীবনে গলালে এতদিনে তোমারও তল্লাটে কুনামের বদলে সুনাম রটতো!
- বেয়াদব ছেলে!
দোহার বক্তব্যের বিপরীতে টেবিল চাপড়ে উঠলেন শবনম।
- কুনাম? আমার নামে তল্লাটে কি কুনাম রটেছে শুনি? আর তুমিই বা দুইদিনের অতিথি জানলে কেমন করে তা?
- মা তুমি বসো, দোহা এমনিতেও একটু রগচটা তুমি কিছু মনে করোনা।
দিয়া ইশারায় দোহাকে শান্ত থাকতে বললেও লাভ হলোনা। শবনম খেঁকিয়ে উঠলেন,
- তুমি চুপ থাকো দিয়া। কিসের রগচটা? এটাকে বলে বখে যাওয়া, উচ্ছন্নে যাওয়া। সময় থাকতে লাগাম দিতে পারোনি। ওহ, তুমি আবার লাগাম দেবে কিভাবে? তুমিই তো ওকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তোলো। ওর বেলায় তোমার ভুঁড়ি ভুঁড়ি উপার্জন ঝরে পড়ে, আর সংসারের বেলায় লবডঙ্কা? আসো তো ঈদে কোরবানে মুখ দেখাতে। কখনো জিজ্ঞেস করে দেখো যে আমরা কেমন আছি?
- শাট আপ আন্টি!
দোহার অত্যন্ত শীতল কন্ঠস্বর কয়েক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে ফেললো চারপাশ। বহু কষ্টে ক্রোধ দমন করে তীব্র দৃষ্টিতে সে তাকালো রমণীর উদ্দেশ্যে।
- আমার আপুকে নিয়ে এই বাসায় কোনো কথা আমি শুনবো না। যদি শুনি, তার পরিণাম ভালো হবেনা।
- শুনলে? শুনলে তোমার গুণধর ছেলের কথা? হুমকি দিচ্ছে আমাকে! তোমার সামনে!
শবনম আকুলি বিকুলি হয়ে বলতেই বাবুল কঠোর নয়নে তাকালেন দোহার দিকে। কর্কশ গলায় ধমক দিলেন,
- খবরদার গুরুজনের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিস তো! একদম পায়ের গি*রা কে*টে রেখে দেবো! বড়লোকদের বড়লোকি কলেজে এই বস্তির শিক্ষা দেয় বুঝি তোদের? নাকি তোরই একমাত্র শিক্ষার অভাব? বিবেক বুদ্ধি বলে আছে কিছু, কার সামনে দাঁড়িয়ে কাকে গলা চড়িয়ে কি বলছিস? বেশি দেমাগ বেড়েছে?
- সেই বোধ ওর থাকলে তো? কোন গর্ভের সন্তান দেখতে হবেনা...?
শবনম কথাটা শেষ করামাত্রই সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে পূর্ণ হয়ে উঠলো চারিপাশ। মুহূর্তেই ভাটা পড়ে গেলো সকল উত্তেজনায়। চুপচাপ ইফতারে মনোযোগী হলো সবাই। দোহা একটি খেজুর মুখে দিয়ে দুই ঢোক শরবত পান করেই চেয়ার ঠেলে উঠে পড়লো। দিয়া নিজের শরবতটুকু দ্রুত গিলে শুধালো,
- একি একি, কোথায় যাচ্ছিস?
কোনো জবাব এলোনা। হনহন করে এগিয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো দোহা। আজান তখনো চলমান। দিয়ার বুক চেপে এলো, ঘুরে তাকালো সে বাবুল আর শবনমের দিকে।
- ছেলেটাকে শান্তিতে অন্তত ইফতারটা করতে দিলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো?
বাবুল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন, শবনম ফায়াজকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে ইফতারে মনোযোগ দিলেন। দিয়ার কথার কোনো জবাব এলোনা। নিজের প্লেটের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো দিয়ার, গলা দিয়ে আর নামতে চাইলোনা খাবারগুলো।
—চলবে—