ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১৮তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১৮

পর্ব ১৮: [ওয়েস্টেড ]

━━━━━━━━━━━━━━━━

৭৪ কেজি।

ওয়েট মেশিনের রিডিং দেখে আমারার বুক চি*রে একঝাঁক হতাশার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চুপচাপ নেমে সে পাশের ট্রেডমিলের উপর বসে পড়লো। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ টানা শরীরচর্চার ফলে তার সমস্ত শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে। বুকে হাঁপ ধরেছে, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস টানতেও কষ্ট হচ্ছে। একপাশে রাখা পানির বোতলটা তুলে ঢকঢক করে গিলে নিলো আমারা। কন্ঠতালু বেয়ে বরফশীতল পানীয় নেমে গিয়ে যেন অন্তর অবধি জমিয়ে দিলো।

“ সবসময় পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ভিকটিম কার্ড প্লে করা বন্ধ করো। এখন গিয়ে রটাবে নিশ্চয়ই, আমি মোটা বলে আমার সঙ্গে এমন হয়েছে? ”

“ সি হার, অ্যান্ড সি ইওরসেল্ফ ইন দ্যা মিরর! ”

চারিপাশ থেকে কথাগুলো গোত্তা খেতে লাগলো হৃদয়ের দুয়ারে। আমারা কোনোদিনও কারো কথায় এতটা প্রভাবিত হয়নি, এতটা মুষড়ে পড়েনি। কিন্তু দোহা, তাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। নিজের শরীর, নিজের অবস্থা কিংবা সৌন্দর্য্য নিয়ে আমারার হৃদয়ে যে প্রশ্ন কোনোদিন উত্থাপিত হয়নি, আজ তাই হচ্ছে।

আসলেই কি সে এতটা অসুন্দর যে তাকে ভালোবাসা যায়না?

পানির বোতলটা হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে গেলো। অবশিষ্ট পানিটুকু ছড়িয়ে পড়লো এদিক সেদিক। আমারা ভ্রুক্ষেপ করলোনা। মাথা চেপে ধরলো সে, চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। অন্তর্দ্বন্দ্ব সামলানো কষ্টকর। সে নিজেও জানে সে ভুল করছে, নিজেকে নিয়ে সন্দিহান হওয়া উচিত নয়। তবুও তার হৃদয় প্রচন্ড পরিমাণে প্রভাবিত হয়ে আছে, যার বিরুদ্ধাচরণ অসম্ভব।

আজ দশই রমজান।

দেখতে দেখতে পবিত্র মাসের অনেকগুলো দিন কেটে গিয়েছে। আমারা নিজের বাড়িতে একাকী থাকছে। সব ঝক্কি ঝামেলা থেকে দূরে, বহু দূরে। তার এতদিনে নিজেকে সামলে নেয়া উচিত ছিলো। খানখান হয়ে যাওয়া হৃদয়কে গুছিয়ে আরো একবার নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি অর্জন করার দরকার ছিলো। পূর্বে বহুবার এমন করেছে আমারা। সেই প্রথম যেদিন গুটিগুটি পায়ে মামণি আর বাবাইয়ের হাত ধরে স্কুলে প্রবেশ করেছিলো, সেদিন থেকেই তার জীবনের এক মহা কালো অধ্যায় রচিত হতে আরম্ভ করেছিল।

“ হিহি.... ভুটকি! ”

“ আম্মু দেখো, ওই মেয়েটা কত মোটা! ”

“ এই ভুস্কি, তুই আমাদের নাচ নষ্ট করে দিবি সর এখান থেকে! ”

“ কোন গুদামের চাল খাও যদি একটু বলতে! আমার হাড্ডিসার অবস্থা দেখেছ? তোমার থেকে একটু পরামর্শ নিতে এসেছি তাই হিহি! ”

“ আস্ত একটা আলুর বস্তা! ওকে বিয়ে করবে কে? ”

“ বাবা মা দুইজনই মাশাআল্লাহ সুন্দর, কিন্তু মেয়ে হয়েছে একেবারে জলহস্তী....”

“ মোটা দেখিয়ে কি সবার থেকে সিমপ্যাথি অর্জন করতে চাও? ”

“ যেখানে আকর্ষণ নেই সেখানে কিসের প্রেম? ”

- চুপ করো!

প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠলো আমারা। অগণিত কটূক্তি তাকে যেন চারিপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। ছটফট করছে সে, জালে আটকে যাওয়া মাছের মতন। দুই হাতে কান চেপে কেঁদে উঠলো সে,

- আমি আর পারছিনা প্লীজ! বন্ধ করো এসব! বন্ধ করো!

সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকলো তার ভীষণভাবে। ক্রন্দনের দমকে দমকে আন্দোলিত হলো সে ক্ষণে ক্ষণে। বুকভাঙা এক আর্তনাদ। হৃদয় ভাঙার পরেও যে হাহাকার তার তরফ থেকে উঠেনি, আজ তাই সীমাহারা হয়েছে। শক্ত মানসিকতার মেয়ে সে। দহনে দহনে হৃদয় পাথর হয়ে গিয়েছিল দুঃখ, কষ্ট, কটূক্তির প্রতি। অবজ্ঞা, উপহাস সবকিছুকেই সে মোকাবেলা করতো সুস্থির মননে। কিন্তু একটা মানুষের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসা তার সেই ভয়ানক মানসিক শক্তিকে শুষে নিয়েছে। খালি করে দিয়েছে ভেতর থেকে। এই ছোট্ট জীবনজুড়ে পর্বতসম আক্ষেপের পথ পাড়ি দিয়ে যখন একটুখানি সুখের দেখা পেয়েছিল, তখন নিজের সবটা বিলিয়ে দিয়েছিল সে, দোহার মাঝে।

দোহা শুধুমাত্র আমারার প্রেমিক ছিলোনা। সে ছিল তার এক টুকরো আশ্রয়স্থল। জাগতিক সকল বিষাদকে হেসে মোকাবেলা করার শক্তি। সারাটি দিনের ক্লান্তির পর মাথায় আদুরে প্রশান্তি বিলিয়ে দেয়ার হাত। বুকের মাঝে উষ্ণতার আলিঙ্গনে আগলে নেয়া রক্ষক। দোহা ছিলো এই নির্মম সৌন্দর্যপ্রেমী পৃথিবীর বুকে আমারার এক টুকরো শান্তির নীড়। যে রূপ দিয়ে নয়, অন্তর দিয়ে বিচার করেছিল তাকে।

আসলেই কি তাই? উহু! সমাজের আর পাঁচজন মানুষের মতোই দোহা তার কোমল হৃদয়টাকে টুকরো টুকরো করে দিলো নিজ হাতে। অন্য কেউ যদি এমনটা করত, তাহলে আমারা আবারো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পেতো নিজের মাঝে। কিন্তু নিজের প্রেমকে কিভাবে মোকাবেলা করবে সে? আদও কি সম্ভব?

- আমাকে বাঁচতে দাও, আমি একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচতে দাও, আমার মত করে বাঁচতে দাও...

ক্রন্দনের মাঝে ভাঙা ভাঙা আর্তনাদ তুললো আমারা। হাঁটুর মাঝে গুঁজে ফেললো মুখ। কটু কথার বান তাকে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ থেকে। ঐন্দ্রজালিক অশুভ ছায়া গ্রাস করছে তাকে ক্রমে ক্রমে।

- আমারা সোনা!

আতঙ্কিত কণ্ঠটি শ্রবণে আসলেও আমারা কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। মুহূর্তেই সে অনুভব করলো তাকে শক্ত বাহুর আলিঙ্গনে আঁকড়ে নিয়েছে কেউ। আশফিকা, বুঝতে বেগ পোহাতে হলোনা। জননীর বুকে নিজেকে উজাড় করে দিলো আমারা। তাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ব্যস্ত কন্ঠে আশফিকা শুধালেন,

- কি হয়েছে বেইবি? তুমি কাঁদছো কেনো?

- মামণি? আমি কি খুব মোটা? আমি কি বিশ্রী?

আশফিকার বুকটা যেন ছারখার হয়ে গেলো সন্তানের অবুঝ কথায়। আলিঙ্গনের জোর বাড়ালেন তিনি। আমারার মাথায় চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন,

- একদম না। ইউ আর পারফেক্ট মাই অ্যাঞ্জেল!

- তাহলে ওরা কেনো আমাকে ভালোবাসে না মামণি?

আর্দ্র কণ্ঠের বিপরীতে আশফিকা থামলেন, তার নয়নজোড়া ভিজে উঠলো আবেগের ফোঁটায়। তবুও দৃপ্ত স্বরে জানালেন,

- কারণ ওরা ভালোবাসার মর্ম বোঝেনা।

আমারা আর কোনো কথা বললোনা। নীরবে নিজের জননীর মাঝে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজে নিলো। আশফিকাও তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। আমারাকে এইভাবে ভেঙে পড়তে তিনি এর আগে কোনোদিন দেখেননি, অন্তত তার সামনে নয়। তবে এই হঠাৎ দৈন্যতা তাকে ভীষণ ভাবালো। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে। গত কয়েকদিনে টের পেয়েছেন তিনি। তবে আমারাকে কোনোকালেই কোনোকিছুর জন্য তিনি জোর করেননি। এক্ষেত্রেও করবেন না। তিনি জানেন, তার মেয়ে প্রস্তুত হলে নিজে থেকেই সবটা তার সঙ্গে বিনিময় করবে। একটু সময় দিতে হবে শুধু। আমারার মন খারাপ হয় প্রায়শই, সে নিজেই আবার নিজেকে গুছিয়ে নেয় সেই খারাপলাগা থেকে।

প্রায় মিনিট দশেক পর ট্রেডমিলের পাশে রাখা ফোন বেজে উঠার কারণে মা মেয়ের নীরব অনুভূতি বিনিময়ের মুহূর্তের সমাপ্তি ঘটলো। আমারা মুখ মুছে ফোন হাতে তুলে নিলো। জারার নাম্বার দেখে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে রিসিভ করলো।

- ইনভাইটেশন পেয়েছিস?

কোনো হাই, হ্যালো ছাড়া সরাসরি কাজের কথায় চলে এলো জারা। মেয়েটা এমনি। না চাইতেও তার এমন বেখাপ্পা কথায় মৃদু হাসলো আমারা।

- হ্যাঁ পেয়েছি।

- যাবি?

থমকালো আমারা। দ্বিধায় ভুগছে। আশফিকা ভ্রু তুলে তাকালেন। বিড়বিড় করলেন,

- তোমাদের ইফতার পার্টি?

- হ্যাঁ, বলেছিলাম না সিনিয়ররা করেছে আয়োজন। আমাকেও ডেকেছে রুহান ভাইয়া, তাই...

- যাও তুমি।

সামান্য হাসলেন আশফিকা, ভরসার হাসি। আমারার চিবুক ধরে আদর বুলিয়ে বললেন,

- যাও, সবার সাথে দেখা করো, সময় কাটাও, ভালো লাগবে। আর, জারা তো আছেই। তাইনা?

এই কয়দিনে মামণির কাছে কলেজ জীবন আর প্রিয় মানুষদের নিয়ে বিস্তর আলাপ সেরে ফেলেছে আমারা। অবশ্যই দোহার অধ্যায় এবং সংশ্লিষ্ট সব ঘটনা বাদ দিয়ে। তিনি তাই মোটামুটি কয়েকজনকে নামে চিনে ফেলেছেন। বিশেষ করে জারাকে। আমারা তার কথা শুনে মাথা দোলালো। তারপর ফোনে বললো,

- হ্যাঁ জারা, আমি যাবো ভাবছি। তুইও চল না প্লীজ!

একটা অবোধ্য শব্দ করলো জারা, যেন বিরক্ত হয়েছে। পরমুহূর্তেই কর্কশ কন্ঠে জানালো,

- ঠিক আছে ঠিক আছে। হোয়াটএভার।

- তুই আর ভালো করে কথা বলতে পারবি না কোনোদিন।

- তুই ভালো হলেই হলো। আমাকে বেয়াদবই থাকতে দে। নাহলে দুইজন মিলে কোনদিন না আবার হিমালয়ের সাধু হয়ে যাই! একটা সাধু হলে আরেকটা শয়তান হওয়ার দরকার আছে!

হেসে ফেললো আমারা। তার হঠাৎ বিধুরের পর বন্ধুর সঙ্গে কথায় এভাবে হেসে ওঠাকে বেশ প্রফুল্ল নজরে দেখলেন আশফিকা। জারা মেয়েটা হয়ত আমারার জন্য ভালো সঙ্গ।

━━━━━━━━━━━

ডিনার ডাইন রেস্টুরেন্ট।

প্রতিদিনের মতোই একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলো দোহা। ইফতারের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেই সে ইফতারির টিফিন ডেলিভারি দিয়ে এসেছে। এখন রেস্টুরেন্টে কাজের শিফট। রমজান হওয়ায় সবকিছুই ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছে। সময়জ্ঞান পাওয়া যায়না। তাই কাজ বন্ধ রাখার কথা থাকলেও সে একপ্রকার জোর করেই পরিবারের কাছ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে সব করছে, কারণ তার সত্যিই টাকার দরকার, প্রচুর টাকা! বাসায় আজও আপুকে বলে এসেছে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ইফতার করতে যাচ্ছে। জানে, ফিরে যাওয়ার পর আরেক দফায় কেলেঙ্কারী বাঁধবে। সে পরে দেখা যাবে।

বুকটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকলেও পানি পানের উপায় নেই। দোহা দ্রুত পোশাকের উপর রেস্টুরেন্টের অ্যাপ্রোন শরীরে জড়িয়ে নিলো। কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো, শরীরজুড়ে অবসন্নতা। সেসব দ্রুত ঝেড়ে মাস্কে মুখ ঢেকে আশেপাশে কাজ করতে থাকা আরেক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলো,

- আজকে বেশি ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে।

- হ্যাঁ। ওই ইফতার পার্টির রিজার্ভেশন আছে তো, তাই।

ইফতার পার্টি? খানিক খটকা লাগলো দোহার। অনিকরাও কলেজের কোনো এক ইফতার পার্টির কথা বলছিলো কল করে, অজুহাতে মানা করে দিয়েছে দোহা। কিন্তু সে তো অন্য জায়গায় হওয়ার কথা। এখানে নয় নিশ্চয়ই। এমনটা বিশ্বাস রেখে দোহা হাতে গ্লাভস জড়িয়ে নিলো।

- দোহা, এসেছিস? যা, শরবতের গ্লাসগুলো সার্ভ করে দিয়ে আয় আগে।

তদারকীতে থাকা লোকের কথা শুনে সায় জানালো দোহা। গ্লাস রাখাই আছে। সেগুলো ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে সাবধানী পায়ে চললো সে। কয়েক কদম হাঁটার পরে রেস্টুরেন্টের সিটিং এরিয়ায় প্রবেশ করেই সে সম্পুর্ণ জমে গেলো।

গোটা রেস্টুরেন্ট জুড়ে যারা বসে আছে, তারা আর কেউ নয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজের শিক্ষার্থী!

নাহ্, কেউই ইউনিফর্ম পরে নেই। তবুও চেনা মুখগুলো চিনতে দোহার একটুও বেগ পোহাতে হলোনা। হাসি, ঠাট্টা এবং গল্পগুজবে মশগুল একেকজন। বন্ধু বান্ধবের দল টেবিলে টেবিলে বসে হাসিমুখে আলাপ ছাড়ছে। সিনিয়র জুনিয়রের অনেকেই উপস্থিত।

বুকটা হঠাৎ করেই ঠান্ডা হয়ে গেলো দোহার, মাস্কের অন্তরালে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। হাত কাঁপতে থাকলো অজান্তেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে উল্টো ঘুরে শাই করে দৌঁড়ে আবার কিচেনে ফিরে এলো। তাকে এভাবে ফিরে আসতে দেখে অপর কর্মী বলে বসলো,

- কি ব্যাপার? ভূত দেখেছিস নাকি? শরবত ফিরিয়ে আনলি কেনো? কমপ্লেইন এসেছে?

দোহা কোনো উত্তর করলো না। ট্রে রেখে দিয়ে ঝুঁকলো টেবিলে, এক টানে মাস্ক খুলে দীর্ঘ কতক প্রশ্বাস টানলো। সমস্ত শরীর তার কিঞ্চিৎ কাঁপছে। এই তল্লাটে সেন্ট পিটার্সবার্গের কারো আসার সংখ্যাটা নেহায়েত হাতে গোণা, দল বেঁধে আসার তো প্রশ্নই উঠেনা। এর আগে কোনোদিনও এমন পরিস্থিতি দোহাকে মোকাবেলা করতে হয়নি। আজকে এক ঝটকায় তার গোটা ক্লাস উপস্থিত! কিভাবে সামাল দেবে সে? নিজেকে ভীষণ দিশাহারা লাগছে। চলে যাবে কি? কিন্তু তাতে যে কাজ চলে যাওয়ার ভয় আছে! এমনিতেও অন্যান্য সব পার্ট টাইম কাজগুলো করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে সে অনিয়ম ঘটিয়ে ফেলে। মালিক নেহায়েত ভালো মানুষ, তাই হয়ত তেমন কিছু বলেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে ঝুঁকি নেয়াটা বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে। বাকি কর্মীরা আশেপাশে দাঁড়িয়ে তার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখলো। একজন বললো,

- তোর খারাপ লাগছে নাকি? রোজায় ধরেছে?

ঝট করে ঘুরল দোহা। অতর্কিতে হাত বাড়িয়ে তার চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে নিজের চোখে পরে বিড়বিড় করলো,

- তোর চশমাটা কিছুক্ষণের জন্য ধার দে।

তার উদ্ভ্রান্ত আচরণে অবাক হলেও কেউ কিছু বললোনা, সরু নজরে দেখে গেলো শুধু। চুলে সামান্য পানি ছিটিয়ে দোহা এলোমেলো করে নিলো। নিজেকে যতটা সম্ভব অন্যরকম দেখানোর চেষ্টা। তারপর সে ট্রে হাতে নিলো। দীর্ঘ প্রশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো। তাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে, কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়া যাবেনা।

অবশেষে সিটিং এরিয়ায় ফিরে এলো দোহা। একনজর তাকালো চারিদিকে। তার পিছন পিছন অন্যান্য কর্মীরাও এসেছে। একজন নিঃশব্দে ঠেলে তাকে এগোতে বললো। এগোলো সে, একদম মাপা মাপা পদক্ষেপে। নজর একেবারে পায়ের দিকে। ইচ্ছাকৃতভাবে খুব বেশি চেনা ছেলেমেয়েগুলোর টেবিল এড়িয়ে দোহা মোটামুটি অচেনাদের কাছে গেলো। যতটা নরম কন্ঠে সম্ভব সালাম জানিয়ে শরবতের গ্লাসগুলো রাখতে শুরু করলো। কোনোমতে ট্রেগুলো খালি করে সে উল্টো ঘুরে হন্তদন্ত করে এগোতে গিয়েই ঘটলো বিপত্তি। ওপাশ থেকে হেঁটে আসতে থাকা দুজন মেয়ের সঙ্গে একটু হলেই ধাক্কা লেগে যাচ্ছিল, বহু কষ্টে তা নিবারণ করলো দোহা। পদক্ষেপ থমকে গেলো তার।

- ওহ, স... সরি...

অতি পরিচিত কোমল কণ্ঠটি শুনে মাথা তুলে তাকাতেই ডাগর ডাগর নয়নাভিরাম আঁখিজোড়ার মুখোমুখি হলো দোহা। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমারা। একটা পা অবধি লম্বা ফ্লোরাল ফ্রক পরনে, কাঁধে জড়ানো স্কার্ফ। গোলগাল চেহারায় শুষ্ক অনুভব, ব্যাঙসকাট চুলের গোছা ছড়িয়ে আছে কপালজুড়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে। অনুভূতিহীন সেই দৃষ্টি দোহার নয়নে মিলিত হতেই তার মাঝে প্রচন্ড রকমের বিস্ময় ফুটে উঠলো।

আমারা দোহাকে চিনে ফেলেছে। কোনো সন্দেহ নেই।

তবুও শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে খালি ট্রেগুলো বুকে চেপে দোহা নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মাস্কটি অবাধ্য ভঙ্গিতে টেনে তুললো খানিকটা উপরে। শক্ত একটি ঢোক নেমে গেলো তার কন্ঠতালু বেয়ে, স্পষ্ট পরিলক্ষিত হলো তা।

- আপনি মিস্টার এত তাড়াহুড়ো করে কি অলিম্পিকে রেইস দিতে যাচ্ছিলেন?

আমারার অপর পাশে দাঁড়ানো জারার বিরক্তিসূচক কন্ঠস্বর কানে যেতেই দোহা খানিক ঘুরে দাঁড়ালো। সে বুঝতে পারছেনা জারা তাকে চিনতে পেরেছে কিনা, কিংবা আমারাই বা তাকে ধরিয়ে দেবে কিনা।

- উনি হয়ত কাজে ব্যস্ত, ইফতারের সময় তো প্রায় হয়ে এলো। ইটস ফাইন, চল আমরা বসি।

শুধু শুনতে পেলো দোহা, দেখতে পেলনা। আমারা জারার হাত ধরে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার পরই শুধুমাত্র সে মাথা কাত করে পিছনে তাকানোর সাহস করলো। একদম একপাশে কোনার দিকের একটি টেবিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। সেখানে ইতোমধ্যে চেয়ারে বসে আছে সৌরভ। আমারা এবং জারা উভয়ে গিয়ে সেখানে বসলো। ভ্রু কুঁচকে এলো দোহার। আমারা কি তাকে সত্যিই চিনতে পারেনি? আর তাদের মাঝে সৌরভই বা কি করছে? কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। ভেতর থেকে ইশারায় তাকে দ্রুতই ছুটতে হলো নতুন অর্ডার পূরণে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য পরের প্রায় মিনিট বিশেক অতিক্রান্ত হলো একদম নির্ঝঞ্ঝাটে। দোহা আড়ালে আবডালে কোনোরকমে নিজেকে গোপন রাখতে সক্ষম হলো। নিজের কাজে সে নিজেই অবাক। অনিক, রাজীব, জিই - শুরা অবধি তাকে খেয়াল করেনি। ইফতারের আগে আগে সবাই মশগুল নিজেদের সঙ্গে। কারোরই আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা ওয়েটারের উপর বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। দোহা প্রবেশ মুখের দেয়ালে হেলান দিয়ে অদূর থেকে চুপচাপ গোটা এরিয়া পর্যবেক্ষণ করে গেলো। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সবাই মাঝখানের টেবিলে বসেছে, রুহান আছে তাদের মাঝে যে হাসতে হাসতে বন্ধুদের সঙ্গে কিসের যেন আলাপ সারছে। তার ঠিক পিছনের টেবিলেই রাহা আর তার বান্ধবীরা। উল্টোদিকে অনিকরা। তাদের টেবিলে অন্যান্য সেকশনের কিছু ছেলেপেলেও আছে। সবার শেষে একদম জানালা ঘেঁষে টেবিলে আমারা, জারা এবং সৌরভ। দুটো মোটা স্কেচবুকের পাতায় তিনজনেই মুখ ডুবিয়ে আছে। সৌরভ অতি আগ্রহে নিজের চিত্রকর্ম তাদের দেখাচ্ছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হলো দোহার। কি স্নিগ্ধ আর উপভোগের একটা সময়! এখানে উপস্থিত বেশিরভাগের বাবা মাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অভিজাত পরিবারের সন্তান তারা। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হওয়া ছেলেমেয়েগুলোর জীবনের প্রধান চিন্তা হয়ত ক্যারিয়ার গড়া, ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া, বিশ্বভ্রমণ, শখ পূরণ, পোষা প্রাণী, শপিং, গেমিং ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের আলাপ আলোচনার বিষয়বস্তুও লন্ডন, প্যারিস, সামার ভ্যাকেশন, ঈদ সেলিব্রেশন টপিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। কে কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পছন্দ করে, এই ঈদে কোন দেশে পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে যাবে, কত লাখ টাকা সালামি পাওয়া যেতে পারে সেই বিষয়ক বিস্তর আলাপ। শুধু শুনে গেলো দোহা। জানেনা কেনো তার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে এলো।

- এই এটা নে, সুগারফ্রি ফলের রস, টেবিল এক এর অর্ডার, একটু দিয়ে আয় আমি কিচেন থেকে শেষ ব্যাচটা নিয়ে আসি।

দোহার হাতে একটা গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে একজন ছুটে গেলো ভেতরে। সামান্য চিন্তিত হলো দোহা, তবে পরমুহুর্তে সাহস সঞ্চয় করে যতটা সম্ভব মাথা নত করে এগিয়ে গেলো টেবিল এক এ। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের টেবিল!

দোহা চুপচাপ গ্লাসটা নামিয়ে রেখে উল্টো ঘুরতেই যাচ্ছিলো ঠিক তখনি পাশের চেয়ারে বসে থাকা একজন নড়েচড়ে উঠতেই তার কনুইয়ে লেগে গ্লাসটা উল্টে পড়লো। সশব্দে মেঝেতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো তা। জুসটুকু ছিটকে উঠলো দোহার অ্যাপ্রোনে। কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো সবাই। রুহান সর্বপ্রথম প্রতিক্রিয়া দেখালো। চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে একগোছা টিস্যু বাগড়ে ধরলো,

- এক্সট্রিমলি সরি!

দোহার অ্যাপ্রোনে হাত দিতেই সে ছিটকে গেলো,

- না না স্যার, ইটস ফাইন ইটস ফাইন! আমি কিচেন থেকে এনে দিচ্ছি আরেক গ্লাস...

- নো নো প্লীজ, লেট মি হেল্প।

- স্যার প্লীজ, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু...

দোহা জানে, তার এই স্থান এই মুহূর্তে ত্যাগ করা উচিৎ। আশেপাশের কয়েকজন তাকে একপ্রকার ঘিরে ধরেছে।

- দেখি দেখি আপনি ঠিক আছেন কিনা!

- কাঁচ ঢুকে গেছে কোথাও? দেখি...

ফাঁদ!

এটা একটা ফাঁদ!

উপলব্ধি হলো। তবে করার কিছুই রইলোনা। নিজের কানের কাছে একটা বেখেয়াল স্পর্শ টের পেলো দোহা, পরক্ষণেই বুঝলো তার মাস্কটি ঢিলে হয়ে খুলে গিয়েছে, ঝুলে পড়েছে অপর কানের সাথে। প্রতিক্রিয়া করার এক বিন্দু সময়ও পাওয়া গেলোনা। কোনো একজনের বিস্ময়কর কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো সহসাই,

- দোহা!

হৃদযন্ত্র ধক করে উঠল। তারপরই মহাশূন্যতা। দোহার দুই বাহু ঝুলে পড়লো দুপাশে, মাস্কটি ঠিক করার কোনো প্রচেষ্টাই করলোনা সে। দাঁড়িয়ে রইলো, মূর্তির মতন। ফ্যাকাশে হয়ে আসতে থাকা দৃষ্টিতে সে দেখে গেলো উপস্থিত প্রত্যেকের মহাবিস্মিত মুখচ্ছবি। একপাশে টেবিল ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ানো অনিক, রাজীব এবং জিই - শু; অপরদিকে স্থির নয়নে তাকিয়ে থাকা আমারা, ভ্রুজুড়ে কুঞ্চনে যার আতঙ্ক স্পষ্ট।

পিনপতন নীরবতার মাঝে নজর ঘুরিয়ে দোহা তাকালো রুহানের দিকে, যার চেহারা সবথেকে বেশি বিস্ময়কর ঠেকছে। অথচ অন্তরালে, কুটিল এক বিজয়ীর হাসি।

“ ইউ আর ওয়েস্টেড.... দোহা! ”

রুহানের উচ্চারণ করার প্রয়োজন হলোনা, বাক্যটির অনুভব স্পষ্ট টের পেলো দোহা।

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন