ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১৯তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১৯

পর্ব ১৯: [ এক্সপোজড ] - ( প্রথমাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

কলেজের কুখ্যাত বিখ্যাত হার্টথ্রব সুনামি দোহা ছেলেটা একজন ওয়েটার।

এর থেকে বড় কোনো “স্ক্যান্ডাল ” এবং “ জুসি গসিপ ” সেন্ট পিটার্সবার্গ সমাজে আর হতে পারেনা।

রেস্টুরেন্টের পিনপতন নীরবতা মুহূর্তেই পরিবর্তিত হলো তীব্র গুঞ্জনে। ফিসফিস কন্ঠস্বর এবং খিলখিল উপহাসের হাসিতে পরিস্থিতি হয়ে উঠলো মাতালপ্রায়। মাথা নুইয়ে এলো দোহার, উভয় হাত দুইপাশে শক্ত মুঠো পাকিয়ে ফেললো সে। ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এক ঝটকায় যেন এতদিনে তিল তিল করে গড়ে তোলা নামডাক এক লহমায় গুঁড়িয়ে গিয়েছে।

রুহানের হাত তার কাঁধে চেপে বসলো অনাবশ্যক জোরে।

- আরে দোহা, তুমি এখানে কি করছো?

- তুমি এই রেস্টুরেন্টের ওয়েটার? সিরিয়াসলি?

স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এক সদস্য শান্ত কন্ঠে বলতে চাইলেও মুখ টিপে হেসে ফেললো। তার অনুসরণে বাকিরাও হাতে মুখ ঢেকে হাসি গোপন করলো। রুহান মাথা কাত করে নিজের হাসি দমিয়ে বিড়বিড় করলো,

- শাট আপ গাইজ। কোনো কাজই ছোট নয়, ও করতেই পারে, ওর ব্যাপার সেটা।

- ঠিক ঠিক। অভাবে মানুষ কতকিছুই তো করে!

একটি শক্ত ঢোক গিললো দোহা। তিরতির করে কাঁপলো তার অধরজোড়া। শরীরের শিরা উপশিরাসমূহ জাগ্রত হলো দারুণ আক্রোশ এবং লজ্জাবোধে। নিজেকে নিয়ে হীনমন্য নয় সে। কিন্তু এই করুণার দৃষ্টি, এই সস্তা মানবিকতার ফাঁকা বুলি হজম করতে চায়নি বলেই তার এত রাখঢাক। কারো মুখাপেক্ষী হওয়াটাকে সে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। শরীরের শেষ র*ক্তবিন্দু অবধি সে লড়ে যাবে, তবুও ভিক্ষার দুহাত বাড়িয়ে কোনোদিন কারো সামনে মাথা নত করবেনা। দোহা জানতো, এই ধনীর দুলালীরা মুখে যতই শিক্ষা - সভ্যতার বুলি আওড়াক না কেনো, দিনশেষে তাদের সমাজে দরিদ্রদের চেয়ে বড় বিনোদনের বিষয় আর দুটো হয়না!তাই নিজের সত্যিকার অবস্থান সে কোনোদিন কাউকে বুঝতে দেয়নি। সকলের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলেছে, হাজার কষ্ট হলেও সয়ে নিয়েছে, শুধুমাত্র যেন কোনোদিন তার আর্থ সামাজিক অবস্থান নিয়ে কেউ উপহাস করতে না পারে সেই দরকারে। আজ দোহার সেই সফলতাটুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো।

হাসি পাচ্ছে দোহার। নিজের প্রতি নিজেরই করুণা হচ্ছে। মানুষ তাকে আবার কি করুণা করবে?

“ ইশ.... ছেলেটা খুবই কষ্টে আছে মনে হয়...”

“ আমি শুনেছি ওর পরিবারে নাকি কি একটা কাহিনী আছে! ”

“ হ্যাঁ, ও নাকি স্কলারশিপে কলেজে চান্স পেয়েছে! এখন বুঝতে পারছি কেনো! ”

“ মাই গড, হি ইয আ মিডল ক্লাস দ্যান? ইউউ....”

“ লো ক্লাসও হতে পারে। ফ্যামিলি মনে হয় খুবই গরীব!”

“ হুম, বামন হয়ে চাঁদে বসবাস....নাইস রিভিলেশন! ”

বুকটা ভার হয়ে এলো। কথার পর কথার বাণ জর্জরিত করে তুললো দোহাকে। এ তো সবে সূত্রপাত! কলেজে এর থেকেও বড় ধামাকা তার জন্য প্রতিনিয়ত অপেক্ষা করবে এখন থেকে। তার শত্রুর তো অভাব নেই! ইচ্ছা করছে অদৃশ্য হয়ে যেতে। এক ছুটে এখান থেকে বেরিয়ে দৌঁড়ে দৌঁড়ে হারিয়ে যেতে কোনো এক অজানার দেশে। যেখানে দোহাকে কেউ চেনে না, কেউ জানেনা। যেখানে কেউ তাকে শুধুমাত্র তার আর্থ সামাজিক অবস্থানের কারণে বিচার করবেনা।

আমারাও সেদিন এমনটাই অনুভব করেছিলো।

উপলব্ধিটি জলোচ্ছ্বাস হয়ে আছড়ে পড়লো দোহার হৃদয়ের তীরে। কেঁপে উঠলো শরীর তার কিঞ্চিৎ আলোড়নে। এই নিদারুণ যন্ত্রণা, প্রগাঢ় বিধূরকে কিভাবে সহ্য করেছিলো তার প্রাক্তন প্রেয়সীর কোমল অন্তর? প্রথমবারের মতন নিজেকে তার সঙ্গে একাত্ম অনুভূত হলো দোহার। প্রকৃতি সর্বদাই পরিবর্তনশীল। কর্মফল মানুষকে ইহকালের জীবনে গ্রাস করে অচিরেই। এ এক দারুণ পবিত্র সত্য।

- আরে দোহা, মন খারাপ করো না চিল, চিল।

হেসে উঠে দুইজন সিনিয়র তার কাঁধ আঁকড়ে ধরলো পিছন থেকে।

- এজন্যই বুঝি বারবার কলেজের সব প্ল্যান থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াও? এটা কোনো কথা হলো?

- আহারে, মুখটা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে। অনেক কষ্ট করেছ রোজা রেখে।

- প্লীজ প্লীজ, তোমাকে আর কাজ করতে হবেনা। আমাদের সাথে বসো।

- আর হ্যাঁ, টাকা পয়সা নিয়ে একদম চিন্তা করোনা। আমরা আছি কি করতে? কাম কাম...

দোহাকে রুহান এবং তার দল একপ্রকার ঠেলেঠুলেই নিয়ে গেলো নিজেদের টেবিলের দিকে। অন্যান্য শিক্ষার্থীর সকলেই করুণা কিংবা নব্য এক বিতৃষ্ণার চোখে তাকিয়ে রইলো দৃশ্যটির দিকে। রাহার পাশে দাঁড়ানো তার অতি আধুনিকা বান্ধবী হঠাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে কন্ঠ চড়িয়েই বলে বসলো,

- ইশশ, ছিঃ! তুই এই ওয়েটার বানরটাকে কিস করেছিলি? ইয়াক! ভাবলেই তো বমি পাচ্ছে আমার!

ঠাস!

টেবিলের উপর সশব্দে চাপড়ের আওয়াজে সবাই একসঙ্গে চমকে উঠলো। হতবিহ্বল হয়ে আবিষ্কার করলো নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো আমারাকে। ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিশোরী। থেমে পড়লো রুহান এবং তার দল, সঙ্গে ধরে রাখা দোহাও। আমারা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছে শুধুমাত্র উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে চাপড় দিয়েই। সবাই ভাবলো, হয়তবা প্রাক্তনের মজা নিয়ে সে কিছু বলবে, মোক্ষম এক সুযোগ! কিন্তু তাদের আশায় পানি ঢেলে দিয়ে আমারা একটি নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

- এটা ইফতার পার্টি কম থিয়েটার ড্রামা বেশি মনে হচ্ছে।

নীরবতা। রাহার বান্ধবীর দিকে তাকালো আমারা,

- তোমার মতন হাই ক্লাস মানুষজন ছাড়া বাকি সবাই বানর হয়ে থাকলে এই দেশের আশি শতাংশ জনসংখ্যাই বানর। আর এই বানরদের জঙ্গলে তোমার আমার মতন সো কল্ড হাই ক্লাস মানুষজনের জন্ম। হোয়াট আ পিটি!

দাঁতে দাঁত চেপে ফেললো মেয়েটি। তার বদলে রাহা ঠান্ডা কথায় বলে বসলো,

- এতে তোর এত জ্বলছে কেনো বুঝলাম না। তোর আনন্দ পাওয়া উচিত তাইনা?

- সরি। অপরকে অপমান করে আনন্দ পাওয়ার মতন বুকের পাটা আমার এখন অবধি হয়নি আর কোনোদিন না হোক।

চেয়ার ঠেলে বেরিয়ে এলো আমারা। নিজের হ্যান্ডব্যাগ তুলে নিলো। বিনা বাক্যে ইশারা বুঝে জারাও উঠে পড়লো। এমনকি সৌরভও। তিনজনের ছোট দলটা হেঁটে এলো সামনে। রুহান মুহূর্তের জন্য দোহাকে ছেড়ে ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

- কোথায় যাচ্ছো আমারা?

থামলো সবাই। মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে আমারা দৃপ্ত স্বরে বললো,

- ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তের মতন একটা পবিত্র সময়ে যেই স্থানে বসে মানুষকে তার নৈতিক কাজের জন্য জন্তুর সঙ্গে তুলনা করতে দেখতে হয়, সময় থাকতে সেই স্থান ত্যাগ করাই শ্রেয়।

চোখ খিঁচে এলো রুহানের। আমারার তরফ থেকে এমন কিছু আশা করেনি সে। সম্পূর্ণ পরিকল্পনায় এই মেয়েকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যই ছিলো দোহাকে দ্বিগুণ পরিমাণে কষ্ট দেয়া। আমারাকে দোহা ধোঁকা দিয়েছে, মেয়েটার উচিত ছিলো সুযোগ বুঝে তার শোধ তোলা। সে কি এতটাই বোকা? কিন্তু তার কঠোর পাথুরে চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছেনা সে অবুঝ!

- এমন স্টুডেন্ট কাউন্সিল হলে স্টুডেন্টদের ভবিষ্যতে লাল বাত্তি ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিনা।

জারার হঠাৎ মন্তব্যে ফিক করে হেসে উঠলো অনেকে, সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য সিনিয়রদের ভয়ে গুটিয়ে গেলো। একজন দোহাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে টেবিলের উপর ঠেলে দিয়ে হুমকিস্বরুপ এগিয়ে এসে বললো,

- যার বিয়ে তার হুশ নেই, এদিকে পাড়া পড়শীর ঘুম নেই! দেমাগ দেখাও মেয়ে?

রুহান তাকে থামালো। তীর্যক হেসে জানালো,

- ওহ ম্যান চিল। একজন দুইজন আনরিলেটেড মেয়ে কি বললো না বললো তাতে কি আসে যায়? ওরা ছোট মানুষ, অবুঝ। ছেড়ে দে। যার আসলেই কিছু বলার দরকার সে তো বোবাই আছে, থাকতে দে তাকে তার মতন।

- বোবাই তো থাকবে! চুরি করেছে তো!

খানিক উত্তেজিত কন্ঠে আমারা বলে উঠতেই ঝট করে দোহা ফিরে তাকালো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে আমারা তার দিকে ফিরলো। ভীষণ ক্রোধে তার গোলগাল চেহারা টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে।

- চুরি করেছে, ডাকাতি করেছে, খু*ন - খারাবি করেছে। রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ করা পাপ। মেধাবী হওয়ায় স্কলারশিপ পাওয়া তো গুনাহর কাজ। আর উপার্জন করে পরিবারকে সাহায্য করা তো আস্তাগফিরুল্লাহ, জাহান্নামে যাওয়ার লক্ষণ! ওর মতন পাপীষ্ঠ বোবা হয়ে থাকবে না তো আর কে থাকবে? ওর মুখ শুধু হুমকি দিতেই খোলে, হাত শুধু মা*রামারি করতেই ওঠে। মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ একটা!

বুকের ভেতর অতিকায় এক ঝড় উঠলো। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো দোহা, টলটলে অনুভব খচিত আঁখিজোড়ার মাঝে। আমারা দ্রুত উল্টো ঘুরলো, জারার হাত পাকড়াও করে বললো,

- চল এখান থেকে।

গুঞ্জনের মাত্রা ছাড়িয়ে উভয় বান্ধবী রেস্টুরেন্টের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো, অনুসরণে সৌরভ।

আমারার এমন দূর্বার রূপে গোটা রেস্টুরেন্টজুড়ে ক্ষণিকের নীরবতা বজায় থাকলো। কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য কর্মচারীরাও সবাই আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছে। এই এলিট ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কোনোপ্রকার ঝামেলা করলে ফল ভালো হবেনা তারা জানে। তার উপর পরিস্থিতির মাত্রা তাদেরও হতবাক করে দিয়েছে। তবে পৃথিবী তো তার আপন নিয়মেই আবর্তিত হয়, তাইনা? আমারা চলে যেতেই ক্ষণিকের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ বিবেক আবেগে গা ভাসিয়ে দিলো। সিনিয়র ভাই দুহাত তুলে তালি বাজিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললো,

- প্লীজ সিট ডাউন গাইজ। কিছু মানুষের জন্য আমাদের প্ল্যান মাটি হবেনা রাইট?

সবাই আদেশ পূরণ করলো। নিজেদের মাঝে ফিসফিস করতে করতে টেবিলে বসলো। দাঁড়িয়ে থাকলো শুধু অবাধ্য একদল ছেলে। অনিক, রাজীব এবং জিই - শু। নিজের দুহাত মুঠো পাকিয়ে অনিক ক্ষীণ কন্ঠে রাজীবকে বললো,

- আশেপাশে কোথাও লোহার কিছু দেখছিস? যেটা দিয়ে মা*থা ফা*টানো যায়?

রাজীব সত্যিই চারিপাশে খুঁজলো। জিই - শু টেবিল থেকে কাটাচামচ তুলে মৃদু জবাব দিলো,

- এটাতে ভালো কাজ হবে।

তাদের প্রস্তুতি চলমান থাকতে থাকতেই দোহাকে রুহান ঠেললো চেয়ারের দিকে।

- তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেনো? লজ্জা পেও না, বসো।

- হ্যাঁ আমার পাশে বসো, আসো আসো।

আরেকজন নিজের চেয়ার সরিয়ে জায়গা করে দিতেই দোহা নরম কন্ঠে হঠাৎ বলে উঠলো,

- আই অ্যাম অন ডিউটি।

- হ্যাঁ?

- আই সেইড আই অ্যাম অন ডিউটি স্যার!

কন্ঠ চড়িয়ে এবার রীতিমত হুংকার ছুঁড়লো সে। প্রতিধ্বনিত হলো তার শক্তিশালী কন্ঠস্বর, প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে। মুহূর্তের মাঝে গুঞ্জরণ চাপা পড়ে গেলো, ফিরে তাকালো প্রত্যেকে দোহার দিকে। উত্তেজিত ভঙ্গিমা সহসাই চাপা দিয়ে প্রত্যেকের হতভম্ব দৃষ্টি মোকাবেলা করলো দোহা, সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে পরক্ষণে একদম শান্ত কন্ঠে বললো,

- আমার এখনো সার্ভিং করা বাকি আছে। আপনারা এত বড় মন দেখিয়ে আমাকে নিজেদের সঙ্গে বসার জন্য অনুরোধ করেছেন এই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া হয়ে থাকলো। ধন্যবাদ। আপনারা কন্টিনিউ করুন, আমি আমার কাজ শেষ করি।

রুহান এবং বাকিরা একে অপরের মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো। দোহার এমন শান্ত জবাব কেউই হজম করতে পারছেনা। চেয়ারে হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে বসে রুহান শেষমেষ প্রশ্ন ছুঁড়লো,

- তুমি কি টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করছো? যদি তাই হয়ে থাকে তবে....

- স্যার, নিজের খরচ নিজে বহন করার মতন সামর্থ্য আমার আছে। আফটার অল, আমি নিজের বাবার টাকায় চলি না। আই আর্ন ফর মাইসেলফ, আই লিভ ফর মাইসেলফ। আমি আজ যা কিছু, হোক তা সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজের স্টুডেন্ট কিংবা এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েটার, তা সম্পূর্ণই আমার অবদান।

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেলো গোটা স্থানটি। কারো মুখে কোনো টু শব্দটিও নেই। সকলেই যেন ভাবনায় পরে গিয়েছে। এমনকি রুহান অবধি। টেবিলের নিচে মুঠো হয়ে এলো তার হাত, স্থির তাকিয়ে রইলো সে দোহার দিকে। অটল আত্মবিশ্বাসী এক অবয়বে যে দন্ডায়মান, শান্ত মুখজুড়ে নেই বিন্দুমাত্র খেদ, লজ্জা কিংবা ক্রোধ। জ্বলজ্বলে সুস্থির আঁখি, তাতে গর্বিত ঝিলিক। দোহা দুই পা পিছিয়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে অতি সাবধানে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো একটি প্লেটে তুলে নিতে নিতে বললো,

- স্যার, পরবর্তীতে কাউকে শুধুমাত্র তার কাজের জন্য বিচার করতে চাওয়ার আগে একশো চব্বিশবার ভেবে দেখবেন। এইযে আমার মতন একজন ওয়েটার, একজন ক্লিনার কিংবা একজন শ্রমিক দুনিয়ায় না থাকলে আপনার মতন আদরের দুলালদের কি পরিণতি হতো। আমি আমার দরকারে সৎ উপার্জন করছি, এতে খেদের কিছু নেই। যে পিটার্সবার্গে মিনিস্টারের আবেদনে চান্স পাওয়া যায়, সেই পিটার্সবার্গে আমি নিজ মেধায় ভর্তি হয়েছি, উইথ এইটি পার্সেন্ট স্কলারশিপ। আমার পিছন ঠেলে দিয়ে তরতর করে সফলতার মই চড়িয়ে উঠিয়ে দেয়ার কোনো মিনিস্টার আব্বু ছিলোনা।

মুখ তুললো দোহা, বরাবর রুহানের নয়নে তাকালো। তীর্যক হাসি ফুটলো অধরে। এক অসহনীয় শিহরণ জাগানিয়া অশুভ হাসি।

- আপনাদের সবাই বাপের নামে চেনে, আমার বাপের নাম কয়জন জানে? আমি দোহা ইসলাম, আ সেল্ফ মেইড প্রোডাক্ট! মাইন্ড ইট স্যার!

অস্তপ্রায় সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত দোহার জ্বলজ্বলে অবয়বে আর তাকিয়ে থাকার হিম্মত রইলোনা রুহানের। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে, গোপন করলো নিজের দ্রুততর হয়ে পড়া হৃদস্পন্দন। নিজেকে লুকানোর আর কোনো চেষ্টাই হলোনা দোহার তরফ থেকে। নির্দ্বিধায় সে উঠে দাঁড়ালো, কাঁচগুলো ফেলে এসে মপ দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করে নিয়ে নতুন জুসের গ্লাসও পরিবেশন করলো। এবার আর তার হাত কাঁপলোনা। চোখ তুলে গোপনে অনেকেই তার দিকে তাকালো ঠিকই, তবে এবার তাদের দৃষ্টিতে কোনো ঘৃণা দেখা গেলনা। নয়নজুড়ে ভাসলো শুধুই অদ্ভুত এক সমীহ।

。

。

。

পবিত্র আজানের ধ্বনিতে মুখরিত গোটা ধরিত্রী। রমজানের আরো একটি দিনের সমাপ্তি ঘোষণা। রেস্টুরেন্টের পিছনের সিঁড়ির উপর বসে আছে দোহা। হাতে একটি বাটারবন এবং পানির বোতল। অন্যান্য সহকর্মীরা তাকে তাদের সঙ্গে ভেতরে ইফতার করতে বললেও সে একাকী বাইরে এসে বসেছে। যে ঠান্ডা মন্থর হাওয়া বইছে তা বেশ উপভোগ্য। দোহা জানেনা কেন তার হৃদয়ে প্রশান্তি ভর করেছে। মনে হচ্ছে, যেন বহুদিনের এক শৃঙ্খল থেকে সে উন্মুক্ত হয়েছে। যে মিথ্যা আভিজাত্যের খোলসে সে নিজেকে ঢেকে রেখেছিল, সেই খোলস ছেড়ে সত্যিকারের দোহা বাইরের পৃথিবীতে পদার্পণ করেছে আজ। দুঃসাহসিক কাজটি কোনোদিনও সম্ভবপর হতো না, যদি না আমারা বরাবর তার বিবেকের দুয়ারে ভয়ং*করতম ঘা*ত হা*নতো। হৃদয় এবং বিবেক যখন একত্রিত হয়, তখন আর কি লাগে?

- সব শালা একা একা খাবি? আমাকে একটু দে!

ভাবনা থেকে বের হওয়ার সুযোগও পেলনা দোহা। এর আগেই দেখলো তার বাটারবনের রীতিমত অর্ধেক উধাও! ঝট করে ফিরে তাকাতেই দুগাল ভর্তি করে চিবুতে চিবুতে তার দিকে চেয়ে ফোকলা হাসলো অনিক। তারপরই নিজের মাথায় পিছন থেকে সজোরে এক চাটি অনুভব করলো সে।

- আউচ্!

- হা কর....

- আহ্হঃ!

মস্ত এক আমের টুকরো তার মুখে ঠেসে দিয়ে ধপাস করে পাশে বসে পড়লো রাজীব। কোনোমতে চিবিয়ে দোহা উদ্ভ্রান্ত হয়ে আশেপাশে তাকালো, জিই - শুর আক্র*মণটা কোনদিক থেকে আসতে পারে?

- মামুর ব্যাটা মুততে... অ্যাহেম, আই মিন বাথরুমে গিয়েছে।

- হ্যাঁ, ওই ফাটাফাটি করতে দুটো টয়লেটের ব্রাশ তুলে এনেছিলাম তো, ঐগুলোই রেখে আসতে গিয়েছে।

রাজীব এবং অনিকের পরপর কথায় দোহা হাসতে হাসতে কেশে উঠলো। তার পিঠ চাপড়ে দিলো দুজন একসাথে। তারপর নিজেরাও একসাথে হেসে উঠলো খিলখিল করে। অনিক নিজের হাতে থাকা টিস্যু দোহার দিকে এগিয়ে দিলো, নির্দ্বিধায় সেখান থেকে দুটো বেগুনী তুলে মুখে পুরলো দোহা। অপরদিকে রাজীবের কোল উপচে পড়ছে ফল। মহা মনোযোগে সে কমলার খোসা ছাড়াচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দোহার পিঠেই একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লো জিই - শু। উল্টি খেয়ে একেবারে তার কোলে এসে গাল টেনে দিয়ে মেয়েলী ভঙ্গিতে বলে বসলো,

- হেই হ্যান্ডসাম!

চটাশ করে মোক্ষম এক চড় খেয়ে গড়িয়ে গিয়ে হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে উচ্চশব্দে হাসতে থাকলো জিই - শু। অনিক দোহার দিকে পিঁয়াজু এগিয়ে দিতেই হামলে পড়লো জিই - শু হামলে পড়লো,

- এহহহহ! আমার আলুর চপ কোথায়?

- যাহ সর, তুই কি রোজা রেখেছিস? দুপুরে চিকেন মানচুরিয়ানের ছবি পাঠিয়ে জ্বালাতন করে এখন এসেছে আলুর চপ খুঁজতে। যা ভাগ!

- তোরা কেউ কমলা খাবি? নাকি আমি একাই সাবার করবো?

- সে কমলা জাহান্নামে যাক, আমার লাল আঙ্গুরের যদি কিছু হয়েছে!

উত্তেজিত এক বিশৃংখল হাউকাউ এর মাঝে বসে দোহা বুকের ভেতর নিবিড় এক আবেগ অনুভব করলো। অনিক, রাজীব, জিই - শু কেউই তাকে একটাও প্রশ্ন করেনি। সে এতদিন নিজের সত্যিকার পরিচয় তাদের থেকেও গোপন রেখেছিল। তবুও আজ যখন তাদের সবার অন্যদের সাথে ইফতার পার্টিতে থাকার কথা, তখন তারা এসে বসেছে দোহার কাছে। প্রত্যেকের এমন ব্যবহার যেন কিছুই হয়নি। তারা যেন আগেকার সেই হাসিখুশি বন্ধুদের দলটিই হয়ে রয়েছে। দোহাকে না কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে, না কিছু অনুভব করাচ্ছে।

এ তাদের নীরব সহযোগ।

অনিক, রাজীব এবং জিই - শু দোহার পাশে ছিল, আজীবন থাকবে বন্ধু হয়েই।

নয়নে জ্বলুনি হলো দোহার, তাতে সে মাথা নিচু করে ফেললো দ্রুত। তার হঠাৎ নিশ্চুপতায় অনিক থামলো, বাকিদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলো। সকলের সম্মতিতে অনিক অতর্কিতে দোহাকে টেনে নিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরলো। সামান্য হেসে বিড়বিড় করলো,

- কাঁদেনা পাগল।

- আমি কাঁদছি না! ছাড় আমাকে!

খেঁকিয়ে উঠলো দোহা। অনিক বিস্তর হেসে দ্বিগুণ জোরে তাকে চেপে ধরে বললো,

- ধুর শালা, সৌদি আরবের আতর লাগিয়ে এসেছি, একটু শুঁকে দেখ ভালো করে, সুন্দর না?

- ঘামের গন্ধ আসছে সর!

হাসতে হাসতে তাকে ধরে রাখলো অনিক, অপরদিকে রাজীব এবং জিই - শুও তার পিঠের উপর উঠে যোগ দিলো আলিঙ্গনে। সন্ধ্যার লগ্নে বন্ধুদের ছোট দলটাকে অদূর সড়ক থেকে কতক দেখে ভাবলো পাগল, আর কতক ভাবলো, কতই না মধুর তাদের বন্ধুত্ব।

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা১৯

পর্ব ১৯: [ ভাঙন ] - (শেষাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━

আস্তে করে স্টাডিরুমের দরজা খুলে উঁকি দিলো আমারা। টেবিলের অপরপ্রান্তে বসে আছেন মীর চৌধুরী। চেয়ারে এদিক সেদিক দুলছেন। টেবিলে ল্যাপটপ এবং গোটা কতক ফাইল পরে থাকলেও সমস্ত মনোযোগ তার হাতের ফোনে। ভ্রু কুঁচকে আছে যেন কোনোকিছু তার মেজাজ নষ্ট করেছে। আমারা ভেতরে ঢুকলো নিঃশব্দে। আলতো কন্ঠে শুধালো,

- আমায় ডেকেছ বাবাই?

মীর ফোন থেকে চোখ তুলে মেয়ের দিকে তাকালেন। তার নয়নের বিতৃষ্ণা রূপান্তরিত হলো হতাশায়।

- হুম। এদিকে আসো।

আমারা এগিয়ে গেলো, টেবিলের প্রান্তে দাঁড়ালো। তার চেহারা অতি শান্ত। এমনিতে শুভ্র বর্ণের অধিকারী হলেও মেয়েটার চেহারা খানিক ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। তবে আপাতত সেই চিন্তায় না পড়ে মীর হাতের ফোনটা টেবিলের উপর ছুঁড়ে দিলেন। শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

- এক্সপ্লেইন।

আমারা কলের পুতুলের মতন ফোনটা হাতে তুলে নিলো। সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মজুড়ে একটা ভিডিও চলছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে সেদিনের ধারণকৃত ফুটেজ। আমারা, দোহা এবং চারপাশ ঘিরে থাকা অনেককেই দেখা যাচ্ছে। তাদের কথোপকথন আবছায়া শোনাও যাচ্ছে। বিষয়টা স্পষ্ট, মন ভেঙেছে আমারার। মানুষের কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য ধেয়ে আসছে চারপাশ থেকে, হাসাহাসির এক রোল পড়ে গিয়েছে। তার হৃদয় ভাঙার কাহিনী এখন শুধুমাত্র সেন্ট পিটার্সবার্গই নয়, বরং সমাজেরও এক হাস্যকর খিল্লি উড়ানো কাহিনী। আমারার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটলো না। সে আস্তে করে ফোনটা নামিয়ে রাখলো। মীরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো।

- তুমি জানো আমার বিজনেস পার্টনাররা অবধি আমাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছে?

- না জানিনা।

- ডু ইউ ইভেন রিয়ালাইজ হোয়াট ইউ হ্যাভ ডান?

- আমি কিছু করিনি বাবাই। এই ভিডিও যে করেছে, এবং যে পোস্ট করে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার সম্মানহানি করতে চাইছে দায় সম্পূর্ণই তার।

- ড্যাম ইট!

টেবিলে চাপড় দিয়ে উঠলেন মীর। আক্রোশ নিয়ে তাকালেন তিনি কন্যার উদ্দেশ্যে। আমারা স্থির দন্ডায়মান, নজর মেঝের দিকে।

- আমারা মীর চৌধুরী! তুমি দুগ্ধপোষ্য শিশু নও। খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছো এই স্ক্যান্ডাল তোমার পাশাপাশি আমার সম্মানেও কতখানি ঘাত আনতে পারে। ইটস দ্যা ম্যাটার অব দ্যা ডিগনিটি অব চৌধুরী ফ্যামিলি! তোমাকে এইজন্য সেন্ট পিটার্সবার্গে পড়তে পাঠানো হয়নি।

টু শব্দও করলোনা আমারা। স্টাডিরুমে প্রবেশ করলেন আশফিকা। এক নজর স্বামী এবং পরক্ষণেই তাকালেন সন্তানের দিকে।

- কি হয়েছে মীর?

হাত তুলে স্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন মীর। তার দৃষ্টি যথারীতি আমারার দিকে।

- অ্যান্ড হু ইয দিস বয়? কখনো দেখেছি কিংবা নাম শুনেছি বলে তো মনে হচ্ছেনা। কোন ধরণের মামলায় নিজেকে জড়িয়েছ তুমি? একটাবারও আমাকে কিংবা তোমার মামণিকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করলেনা?

- আমার বিশ্বাস নিয়ে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে সেই দায় আমার নয় বাবাই।

একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন মীর। আশফিকা এখনো কিছুই অবগত নন। তিনি ভেতরে এসে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকলেন। অবিশ্বাস এবং ক্রোধে ক্রমেই তার সুদর্শনা মুখমন্ডল তপ্ত হয়ে উঠতে থাকলো। মীর আমারাকে দেখলেন, তারপর এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে ঝুঁকে এসে বিড়বিড় করলেন,

- প্রিন্সেস, তুমি বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই ভুলটা কোথায় হয়েছে? তোমার কাঁধে এই পরিবারের আভিজাত্য এবং সম্মান রক্ষার যে দায়িত্ব....

- ডোন্ট কল মি প্রিন্সেস বাবাই!

- তোমার নাটক বন্ধ করো! এমন একটা ঘটনা তুমি কিভাবে হতে দিতে পারলে? কি চিন্তা ভাবনা করছিলে? আমাকে নাহয় বাদ দিলাম, কিন্তু তোমার মামণিকেও কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করোনি কোনোদিন? আমরা কি কখনো তোমাকে কম আদর করেছি? নাকি তোমার কোনো শখ অপূর্ণ রেখেছি? একটামাত্র মেয়ে, অতি আদরে বাদর হতে ওই কলেজে পাঠাইনি! আর কলেজে তুমি পড়তে গিয়েছ নাকি প্রেম করে স্ক্যান্ডালে ফাঁসতে?তুমি জানোনা তুমি কোন বাড়ির সন্তান? কোথায় তোমার স্ট্যান্ডার্ড? আনসার মি প্রিন্সেস!

- আই সেইড.... ডোন্ট কল মি “প্রিন্সেস”!

হঠাৎ ভীষণ আবেগে চেঁচিয়ে উঠলো আমারা। মীর নিজের জায়গায় সম্পূর্ণ জমে গেলেন। এর আগে কোনোদিন আমারা তার কোনো ধমক বা শাসনের সময় পাল্টা চিৎকার করেনি। আশফিকাও হতভম্ব। টকটকে হয়ে উঠেছে আমারার চেহারা, নয়ন জোড়ায় ভাসছে টলটলে অশ্রুর ফোঁটা। পাতলা ঠোঁটজোড়া কামড়ে ধরেছে, যেন র*ক্ত বের করে ছাড়বে। মীর বেশ রেগে গেলেন। ভ্রু কুঁচকে কর্কশ কন্ঠে বললেন,

- এমন জন্তুর মতন আচরণ তোমাকে কে শিখিয়েছে? বাবাইয়ের উপর চিৎকার করছো তুমি?

আমারা দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরলো, হাঁপাচ্ছে সে, তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আশফিকা এগোলেন দ্রুত,

- মীর আমার কথা শোনো...

- তুমি চুপ থাকো আশফিকা, একদম চুপ! পিটার্সবার্গে পাঠানোর আইডিয়াটা তোমারই ছিলো,তাইনা? নাও, এবার ভোগো!

- যা হয়েছে তাতে আমারার কি দোষ? কি আশ্চর্য!

- ওর কোনো দোষ নেই, এটাই ওর সবচেয়ে বড় দোষ! ওকে কি শেখানো হয়নি কিছুই? প্রতিনিয়ত কিভাবে আমাদের টেনে নামানোর চেষ্টা চলতে থাকে? এই এলিট ক্লাসে পান থেকে চুন খসলেই ডাউনফল নেমে আসে। মানুষ ওর সম্পর্কে যা যা বলাবলি শুরু করেছে, সেই গুজব - অপমানের দাগ ও কিভাবে মুছবে জিজ্ঞেস করো ওকে!

- মীর, তুমি এবার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছো!

- হ্যাঁ করছি! কারণ কথার বাণ আমার দিকেই আসছে! আমার মেয়ে ও! আর কতবার ওর জন্য আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হবে? হেসে হেসে অপমান সহ্য করতে হবে? কখনো ওর শরীরের জন্য! আবার এখন...ফা*ক!

- মীর!

ধপাস!

আশফিকার জোরালো কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে ভারী একটা শব্দে গোটা কক্ষটি কেঁপে উঠলো। উভয়ে সম্পূর্ণ জমে গেলেন। মীর মাথা কাত করে তাকাতেই স্থবির হয়ে পড়লেন। টেবিলের ওপাশে এতক্ষণ যাবৎ স্থির দাঁড়িয়ে থাকা আমারা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে। তার আঁখিজোড়া বন্ধ, শরীর নিথর। অন্তরে ভয়ানক কাঁপুনি খেলে গেলো উভয় পিতামাতার। আশফিকা দৌঁড়ে এসে তৎক্ষণাৎ হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন, আমারার মুখ তুলে নিলেন নিজের কোলে। পাগলপ্রায় হয়ে ঝাঁকাতে থাকলেন,

- সোনা? আমারা সোনা? এই! কি হয়েছে তোমার? চোখ খোলো মামণি....! আমারা!

কোনো জবাব নেই। আশফিকার নয়ন উপচে মুহূর্তেই অশ্রু ঝরতে আরম্ভ করলো। সজোরে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলেন তিনি সন্তানকে। ভয়ংকর আতঙ্কে অবশ হয়ে এলো তার সমস্ত অস্তিত্ব। মীর নিজের ফোন তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ডায়াল করলেন, উদ্ভ্রান্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,

- ইয়েস, ডক্টর মল্লিক?

মিনিটখানেকের মাথায় মীর নিজের এবং আশফিকার ওভারকোট নিয়ে ছুটে এলেন, সঙ্গে তার গাড়ির চাবি। রুব্বান চাচাও এলেন। তিনি এবং মীর উভয়ে ধরাধরি করে আমারাকে গাড়ি অবধি নিয়ে গেলেন। ভেতরে মেয়েকে নিয়ে চেপে বসলেন আশফিকা। মীর ড্রাইভিং সিটে চেপে স্টিয়ারিং ধরলেন, দ্রুত গাড়ি চৌধুরীবাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটে চললো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

。

。

。

কেবিনের বিছানায় ঘুমে আচ্ছন্ন আমারা। তাকে নার্ভ শান্ত করার ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ডাক্তার মল্লিক বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের ক্লিপবোর্ডে খচখচ করে কিছু লিখে যাচ্ছেন। মীর একপাশের সোফায় নিঃশব্দে বসে কিঞ্চিৎ উদ্বেগ নিয়ে সবকিছু দেখছেন। আশফিকা বিছানার পাশে আমারার একটি হাত শক্ত করে ধরে বসে আছেন। ক্রন্দনের কারণে তার চেহারা ফুলেফেঁপে উঠেছে। তার কাঁধে হাত দিয়ে শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে একটি চাপা বর্ণের মেয়ে, ছেলেদের মতন টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। এর নাম জারা, আমারার বান্ধবী। কিছুক্ষণ আগেই পরিচিত হয়েছেন মীর।

ডক্টর মল্লিক নিজের চোখ থেকে চশমা খুলে একবার মীর এবং পরেরবার আশফিকাকে দেখলেন। তারপর বললেন,

- প্রেশার লো, ইনসুলিন লেভেল ডাউন।

এক মুহুর্ত বিরতি, তারপর তিনি যুক্ত করলেন,

- কিছুদিন যাবৎ খাওয়াদাওয়ায় ভীষণ অনিয়ম হয়েছে। এক্সারসাইজের মাত্রা বেড়েছে। শরীর এত ধকল নিতে পারেনি, সো শি কোলাপ্সড।

হতভম্ব হয়ে ডক্টর মল্লিকের দিকে তাকিয়ে রইলেন আশফিকা। বলে উঠলেন,

- আপনি এসব কি বলছেন ডক্টর? আপনার সাজেস্ট করা ডায়েট চার্টই আমারা সবসময় ফলো করে, এক্সারসাইজেও কখনো গড়িমসি কিংবা অতিরিক্ত করেনি। ও কিভাবে....

বলতে বলতে থেমে গেলেন আশফিকা। কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠলো বুকের ভেতর। সেদিন ট্রেডমিলের উপর বসে কাঁদতে থাকা আমারার প্রতিচ্ছবি স্মরণে এলো তার। মেয়েটি তার আকুল হয়ে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল,

“ মামণি? আমি কি খুব মোটা? আমি কি বিশ্রী? ”

সংকুচিত হয়ে এলো হৃদয়। ভীষণ এক বেদনায় আক্রান্ত হলো চিত্ত। ডক্টর মল্লিক ক্লিপবোর্ড সরিয়ে রেখে বিড়বিড় করলেন,

- আপনারা ওকে চোখের সামনে খেতে দেখেছেন?

- নো। ও বেশিরভাগ, নিজের রুমেই থাকে, ওখানেই খাবার দিয়ে আসা হয়। আর... আমরাও খুব একটা বাসায় থাকিনা।

স্বীকার করে নিলেন মীর। উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনিও। ডক্টর মল্লিক তাতে মাথা দোলালেন,

- দ্যাট এক্সপ্লেইনস। আমারা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে।

শক্ত হয়ে এলো আশফিকার হাতের মুঠো। এই প্রথম। এর আগে কোনোদিন আমারা ডাক্তারের কোনো আদেশ উপদেশ অমান্য করেনি। সে জানে, তার শারীরিক অবস্থা পরিবর্তনযোগ্য নয়। নিজেকে মেনে নিয়েই সে জীবনে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল। কিন্তু এক কালবৈশাখীর ঝড়ের মতন সবকিছু এক লহমায় উলোট পালট হয়ে যাওয়ার কারণ কি? একজন মাতৃহৃদয়ের উপলব্ধিতে কিছুই বাকি রইলনা।

ডক্টর মল্লিক ক্লিপবোর্ড সরিয়ে রেখে বললেন,

- আপাতত খুব চিন্তার কিছু নেই, ওর শরীর স্টেবল আছে। ঘুমিয়ে উঠুক, আমি ওর সাথে কথা বলবো। নতুন একটা ডায়েট চার্ট জরুরী, সঙ্গে এক্সারসাইজ মেথড। আপাতত একটা দিন ওকে হাসপাতালে রাখলেই ভালো। আমি একটু ব্যাপারটা বুঝতে চাই।

- ওকে ডক্টর। যেমনটা আপনি বলেন।

- জ্বি মিস্টার মীর, আপনি আমার সাথে আসুন।

মীর মাথা দুলিয়ে উঠলেন। উভয় পুরুষ কেবিনের বাইরে চলে যেতেই নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেলো কেবিন। মূর্তির মতন আমারার হাত মুঠোয় নিয়ে বসে থাকলেন আশফিকা। তার চেহারায় বিষাদ কিংবা আতঙ্কের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। সেই স্থানে রয়েছে ভয়ানক এক শীতল ক্রোধ। কয়েক মুহূর্তের থমথমে নীরবতা। তারপর আশফিকা শীতলতম কন্ঠে শুধালেন,

- ছেলেটা কে?

জারা জানে, প্রশ্নটা তাকেই করা হয়েছে। এমন সময়ে কিছু লুকানোর আর কোনো অর্থ হয়না। সে একটি নিঃশ্বাস ফেলে উত্তর করলো,

- দোহা ইসলাম।

- অ্যাড্রেস জানো? নাকি আমাকে বের করে নিতে হবে?

- মগবাজার, দুইশো তিন। রেশমী ভবন, মহল্লা দুই।

যান্ত্রিক জবাব জারার। একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো সে আমারার ফ্যাকাশে মুখে।

━━━━━━━━━━━━

রাত আটটা।

দোহা দ্রুত পায়ে মোজা গলিয়ে কেডসজোড়া পড়ে নিচ্ছে। কাঁধে গিটার ঝুলছে তার। প্রথমে প্র্যাকটিসে যাবে, সেখান থেকে ফ্যাক্টরিতে। তার আগে অবশ্য অনিকদের সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে। দিয়া টেবিলের উপর বসে চাল বাছছে। শবনম সেহরীর রান্নার জন্য চিংড়ি মাছ কুটছেন, পাশে উবু হয়ে বসে মহা মনোযোগে দেখছে ফায়াজ।

- আপু আমি আসলাম।

দোহা বলে উঠতেই শবনম ভ্রু উঁচু করে চড়া গলায় জানালেন,

- রাত বারোটার পর থেকে বাড়ির দরজা বন্ধ। এর পরে ফিরে আসার কোনো দরকার নেই।

দোহা মাথা কাত করে তাকালেও কোনো মন্তব্য করলোনা। দিয়ার সঙ্গে নীরব দৃষ্টি বিনিময় হলো তার, যে বুকে হাত দিয়ে বুঝালো,

“ আমি আছি, তুই যা। ”

দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই আরেক দফায় শবনমের কন্ঠ ভেসে এলো,

- আমি কিন্তু মজা করছিনা! দিয়া, তোমার ঘরের দরজা আমি আটকে রাখবো কিন্তু! এরপর দেখবো তোমার গুণধর ভাইয়ের জন্য রাত দুটোয় দরজা কে খোলে!

- ভাইয়া, চকলেট!

শবনমের কথা রীতিমত উপেক্ষা করে দোহা মৃদু হাসলো, ফায়াজের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বললো,

- ওকে, চকলেট আনবো।

- ইয়ে! ভাইয়া ভালো!

- এই চুপ! একদম চুপ! তোকে কি আমি কম চকলেট খাওয়াই? ওর কাছে চাইবি না আর কোনোদিন খবরদার!

মায়ের ধমকে ফায়াজ মুখ ভার করে ফেললো। দোহা অবশ্য সেসব দেখার জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকলোনা। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দ্রুতই। বাড়ির মালকিন রাজিয়া খন্দকার নিতান্তই ভালো মানুষ। নিঃসন্তান, স্বামী অসুস্থ। দোহার প্রতি আলাদা ধরণের এক স্নেহ লালন করেন মহিলা। তাই বারোটার মধ্যে গেট বন্ধ হয়ে গেলেও দোহার কাছে একটা অতিরিক্ত চাবি গুছিয়েছেন তিনি। সেটি পকেটে আছে নিশ্চিত করে নিজের সাইকেলে স্ট্যান্ড থেকে বের করে রাস্তায় নামলো দোহা। মহল্লার সরু অলিগলি বেয়ে ছুটে চললো তার বাহন।

দ্বিতীয় গলি পেরিয়ে আসতেই মুখে দাঁড়ানো এক আলিশান গাড়ির অস্তিত্ব দোহাকে সামান্য বিচলিত করলো। সাধারণত এই তল্লাটে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষদের বসবাসই অধিক। এই ধরণের আভিজাত্য দেখার সুযোগ হয় বেশ কম। তবে দোহা থমকালো গাড়িটির অবয়ব লক্ষ্য করে, চেনা চেনা লাগছে। অজান্তেই সাইকেলের গতি কমিয়ে থেমে গেলো সে। গাড়িটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার পথ অবশিষ্ট নেই।

গাড়ির দরজা খুলে গেলো হঠাৎ করেই। বাইরে পা রাখলেন এক রমণী। বিজনেস স্যুট পরিধানে, উপরে ওভারকোট। সুদর্শন চেহারা সুস্থির অথচ উদ্ভ্রান্ত। দীঘল চুল শক্তভাবে খোঁপা বাঁধা। দোহা অজান্তেই তার অবয়বে নজর বুলিয়ে আনলো। চিনতে খুব বেশি বেগ পোহাতে হলোনা।

আশফিকা চৌধুরী। আমারার মা।

সাইকেল থেকে নেমে পড়লো সে। ভালোমতই বুঝতে পারছে আশফিকার এই পাড়ায় উপস্থিতির কারণ। দুহাত পিছনে বেঁধে সে তাকিয়ে রইলো। বুকের ভেতর দ্রুততর হতে থাকা হৃদস্পন্দন চাপা দেয়ার চেষ্টায় ভ্রু কুঁচকে এলো তার।

আশফিকা ধীর পদক্ষেপে এগোলেন দোহার দিকে। হিল পরনে না থাকায় দোহা উচ্চতায় তার প্রায় সমানে সমান। তাকালেন তিনি, বরাবর কিশোরের নয়নমাঝে। দোহার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তিনি বুঝি ঠাটিয়ে তাকে চড় দেবে এখনি। তবে আশফিকা তেমন কিছুই করলেন না। সরে এলেন আরো কাছে। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন দোহাকে। দুবাহু বুকের উপর বেঁধে জ্বলজ্বলে নয়নে তিনি বললেন,

- শি হ্যায হাইপোথাইরয়েডিজম।

স্থির চেয়ে থাকলো দোহা। আশফিকা মাথা ঘুরিয়ে একপাশে তাকিয়ে জানালেন,

- ওর মেটাবোলিজম স্লো, শরীর ক্যালোরি বার্ন করতে পারেনা ঠিকমতো। যতই এক্সারসাইজ - মেইনটেইন - ডায়েট করুক না কেনো, ওর শরীর খুব একটা পরিবর্তন হবেনা। ডাক্তার বলেছে, চিকিৎসা দীর্ঘস্থায়ী। সম্পূর্ণ সুস্থতা বলে কিছু নেই, শুধু প্রপার ডায়েট এবং এক্সারসাইজ ফলো করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা সম্ভব।

- আপনি এসব আমাকে কেনো বলছেন?

দোহার ক্ষীণ স্বরের প্রশ্নে আশফিকা সামান্য হাসলেন। দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে বিড়বিড় করলেন,

- কারণ তোমরা ছেলেরা মেয়েদের মন নয়, শরীরকে পছন্দ করো।

দুহাত মুঠো হয়ে এলো দোহার, কিন্তু কোনো উত্তর সে করলোনা। তার নজর মাটির দিকে। আশফিকা দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টেনে বললেন,

- আমার মেয়েটা অনেক শক্ত মানসিকতার, জানো? মাঝে মাঝে আমি নিজেও ওকে দেখে অবাক হয়ে যাই, কিভাবে এত লড়াই করার শক্তি সে পায়? ছোটবেলা থেকেই ওর শরীর ভারী, ওজন বেশি। স্কুলের পর স্কুল বদলেছি, কাউন্সিলিং করিয়েছি। কত কটূক্তি, কত হাজার হাজার হাসি - ঠাট্টা অবজ্ঞার বাণী ও শুনেছে! কিন্তু কোনোদিন ভেঙে পড়েনি। থাইরয়েডের মেডিসিন, ট্রিটমেন্ট, এক্সারসাইজ, ডায়েট, একাকীত্ব, অবজ্ঞা কোনকিছুই ওর মনোবল ভাঙতে পারেনি। বরং আমি ভেঙে পড়তাম। ও আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলতো, কেঁদোনা মামণি, সব ঠিক হয়ে যাবে।

শো শো বাতাস বয়ে গেলো। দোহা ঠিক ঠান্ডায় শিউরে উঠলো নাকি কথার গাঢ়ত্বে টের পেলনা। আশফিকা আকাশের দিকে তাকালেন। একফালি চাঁদের দিকে চেয়ে বললেন,

- কিন্তু আজ, আজ সব মিথ্যা হয়ে গেলো। আমার মেয়েটাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙেছ তুমি। যে জিনিস তুমি গড়নি, সেই জিনিস ভাঙার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে?

দোহা নয়ন তুলে তাকালো। আশফিকা অগ্নিখচিত এক টলটলে দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন, কন্ঠ তার চড়া হয়েছে আক্রোশ এবং চাপা আর্তনাদে।

- প্রথম যখন গাড়ির বাইরে পা রেখেছি, বিশ্বাস করো ইচ্ছা হয়েছে ছুটে এসে তোমার দুই গালে ঠাটিয়ে দুটো থাপ্পড় দেই! পরে ভাবলাম, তুমিও তো কারো সন্তান! হোক সে কুলাঙ্গার সন্তান! তোমার মা নিশ্চয়ই তোমাকে খুব ভালোবাসে! আমি কিভাবে তার স্নেহের উপর আঘাত করি?

বুকের ভেতর ধড়ফড় করে উঠলো দোহার। তীব্র আলোড়নে কেঁপে উঠলো সমস্ত শরীর। অধরে অধর চেপে ফেললো সে। নিজেকে দমন করলো, অনুভূতিদের চাপা দিলো নিস্তব্ধ স্থিরতার আড়ালে।

- কিন্তু তুমি আমার স্নেহের উপর আঘাত করার আগে দুইবার ভাবোনি ছেলে! তুমি জানো আমারা কে? কেমন ওর অন্তর? কেমন ওর অভিলাষ? ও একটা কোমল মনের মেয়ে, কিন্তু ওর লক্ষ্য স্থির। ও তোমাকে পছন্দ করেছে এর অর্থ কি জানো?

একটি শক্ত ঢোক গিললো দোহা। দ্রুততর হয়ে ওঠা হৃদস্পন্দনে চেয়ে রইলো আশফিকার টলটলে নয়নে।

- তুমি আমার মেয়ের জীবনে প্রথম এবং শেষ। আর কাউকে না কোনোদিন ওর মনে ধরবে, না ও কোনোদিন কাউকে বিশ্বাস করবে। এটাই সত্য।

নয়ন বেয়ে গড়িয়ে পড়া অবাধ্য অশ্রুর ফোঁটাটি আশফিকা নিজের রুমালে মুছে নিলেন। সামান্য নাক টেনে আর্দ্র কন্ঠে বললেন,

- আফসোস শুধু ওর সূচনা এবং সমাপ্তি দুটোই তুমি। তুমি, এক ধোঁকাবাজ মরীচিকা।

হৃদয় খানখান হওয়ার শব্দ কি শোনা যায়? দোহার মনে হলো সে শুনতে পাচ্ছে। বুকের ভেতর কেউ একজন নিদারুণ ভাংচুর চালাচ্ছে। রুমাল পকেটে ভরে আশফিকা উল্টো ঘুরলেন। সিক্ত হয়ে ওঠা কন্ঠে অন্তিমবারের মতন বিড়বিড় করলেন,

- একজন মা হয়ে অন্য কোনো মায়ের সন্তানকে বদদোয়া দিতে চাইনা। কিন্তু খোদার কাছে খুব করে চাই, তুমি আফসোস করো! ভয়ানক আফসোস! জীবনে সবকিছু অর্জন করো, তোমার শখ - স্বপ্ন - উদ্দেশ্য সবকিছু পূরণ হোক। তবে পূর্ণতার শেষে তোমার বুকে এক টুকরো আক্ষেপ থেকে যাক। দিনশেষে হাজার হাজার পাওয়ার ভিড়েও তুমি ঐ এক বিন্দু না পাওয়ার আক্ষেপের দহনে দগ্ধ হও। আক্ষেপের চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি এই ইহজগতে আর দুটো হয়না।

এটুকুই। আশফিকা হনহন করে এগিয়ে গেলেন। চড়ে বসলেন গাড়িতে। একবারও পিছন ফিরে দেখলেন না। গাড়িটি ধীরে ধীরে ঘুরে গলির বাইরে বেরিয়ে গেলো। দোহা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো নিজের জায়গায়। প্রতিটি দেহকোষে তার দারুণ যন্ত্রণার বিচরণ। মুখ পাথরের মতন স্থির, আঁখিজোড়া পাষাণের মতন শুকনো। অথচ ভেতরে হচ্ছে র*ক্তক্ষরণ।

এক মায়ের অভিশাপ লাভের মতন দূর্ভাগ্য এই পৃথিবীতে কয়জনের হয়?

সবই তার কর্মফল। হোক সেই কর্ম বাধ্যতার জেরে।

দমকা হাওয়ার জোরে চুল এলোমেলো হলো, পরনের জ্যাকেট দূর্বার নড়েচড়ে উড়ল। শুকনো বালি ভেসে এসে চোখে জ্বালা সৃষ্টি করলো। কোনো মনোযোগ নেই।দোহা ঠাঁয় দাঁড়ানো। হাঁটু ভেঙেও আসছেনা। নিজেকে উজাড় করে দিতে পারছেনা সে। কিছু একটা ভেতর থেকে শক্তভাবে আটকে রেখেছে তাকে। ঠিক তখনি পকেটে থাকা তার ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। সেটা বের করতেই দেখা গেলো রাজীবের মেসেজ,

“ কোথায় তুই? জলদি আয়, আমরা রুবেল মামার দোকানের পাশেই বসে আছি। একটা মহা খুশির সংবাদ আছে! উই মাস্ট সেলিব্রেট! ”

মেসেজের সঙ্গেই সোশাল মিডিয়ার কিছু লিংক পাঠানো। দোহা দেখলো। ভিডিও এবং সদ্য বেরোনো প্রতিটা আর্টিকেল সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লো। তারপর চুপচাপ ফোনটা পকেটে ভরে সাইকেলে চড়লো।

মিনিট বিশেক বাদেই সে পৌঁছালো। সাইকেল পাশে থামিয়ে রেখে দ্রুত কদমে এগোতেই রুবেল মামার ফুচকার দোকানের পাশে সিঁড়িতে বসে পা দোলাতে থাকা অনিক, রাজীব এবং জিই - শুকে নজরে এলো। দোহাকে দেখেই হাত নাড়লো সকলে। দোহা জোর পদক্ষেপে এগোলো, দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হলো তার। অনিক সিঁড়ি ছেড়ে উঠে বিস্তর হেসে বলতে গেলো,

- আরে! আমাদের প্ল্যান তো পুরোই ফাটিয়ে.... আহ্হঃ!

দোহার মুষ্টিবদ্ধ হাত সটান আ*ছড়ে পড়লো অনিকের মুখ বরাবর। এতটা জোরের সঙ্গে যে সে আছড়ে পড়লো সিঁড়ির উপর। ধড়ফড় করে উঠলো রাজীব আর জিই - শু। হতবিহ্বল হয়ে তাকালো দোহার দিকে। পাথুরে মুখ, চোখজুড়ে হিং*স্রতা। অনিক মুখ তুললো, ঠোঁট কে*টে র*ক্ত গড়াতে আরম্ভ করেছে তার। হিসিয়ে উঠলো সে,

- ইউ ম্যাড অওর সামথিং!

- হাউ ডেয়ার ইউ পোস্ট দ্যা ফা*কিং ভিডিও!

দ্বিতীয় দফায় দোহার ঘু*ষি আছ*ড়ে পড়লো অনিকের বু*ক বরাবর। গলা চে*পে ধরে দোহা ঠেসে ধরলো তাকে সিঁড়ির সঙ্গে। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে রাজীব এবং জিই - শু উঠে দাঁড়ালো, শরীর কিংবা মস্তিষ্ক কোনোটাই আর কাজ করছেনা। দোহাকে থামাবে? অনিককে বাঁচাবে? কি করবে তারা?

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন