ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

২০তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২০

[ স্ট্রং ল্যাংগুয়েজ অ্যালার্ট ]

পর্ব ২০: [ ছিন্ন সম্পর্ক ] - ( প্রথমাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

রাজীব এবং জিই - শু দোহাকে দুইপাশ থেকে আঁকড়ে ধরলো দ্রুতই। অনিক নিজের মুখ চেপে ধরে হাঁটু মুড়ে বসে বি*স্ফারিত দৃষ্টিতে দেখছে রুদ্রমূর্তি দোহাকে। হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিশোর, নয়নের মাঝে প্রজ্জ্বলিত ক্রোধাগ্নি।

- দোহা তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস?

- এসব কোন ধরণের বর্বরতা?

রাজীব এবং জিই - শুকে প্রচন্ড এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে পুনরায় অনিকের উপর চড়াও হলো দোহা। কলার টেনে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামিয়ে আনলো সিঁড়ির নিচে, পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপা কন্ঠে বললো,

- ডিলিট ইট! রাইট নাউ! ডিলিট দ্যা ভিডিও অওর এলস...!

- খু*ন করবি আমাকে?

অনিকের কন্ঠস্বর শান্ত। তীব্র উত্তেজনার মোকাবেলা সে করছে ধারালো প্রশান্ত দৃষ্টিতে। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো দোহা। কলারে তার মুঠো শক্তভাবে চেপে এলো, রীতিমত র*ক্ত উঠে এলো আঙুলের গোঁড়ায়। অনিক ঝুঁকে এলো, পাল্টা চেপে ধরলো দোহার চিবুক। ব্যথা লাগলেও মুখ সরিয়ে নিলোনা সে, চেয়ে রইলো বন্ধুর নিগূঢ় যাতনা এবং আক্রোশে ঘেরা দৃষ্টিতে।

- দোহা। তুই আর আমি বেস্ট ফ্রেন্ড রাইট? কত বছর ধরে একসাথে আছি আমরা?

দোহা জবাব দিলোনা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিলো।

- তুই শুরু থেকে সবটা জানতি। আমি কি করছি, কোন উদ্দেশ্যে করছি সবটা তোর জানা ছিল। জেনেবুঝেই তুই সব করেছিস। তাহলে আজ এ কিসের আক্রোশ তোর? কেনো তুই এতটা প্রতিক্রিয়া করছিস? ব্যাপারটা হাস্যকর নয়? ওই চৌধুরী গুষ্টি আর ভুটকিটার এটাই পাওনা.....

- মাদারফা****!

প্রচন্ড আরেক ঘু*ষি আছড়ে পড়লো অনিকের উপর, এবার বরাবর মুখে। নিঃশ্বাস আটকে এলো যেন। উবু হয়ে কেশে ফেলতেই গলা দিয়ে র*ক্ত উঠে এলো। থু দিয়ে সেটুকু ফেলে হাঁপাতে থাকলো অনিক। দোহাকে আটকে লাভ নেই। বুঝতে পেরে রাজীব আর জিই - শু ছুটলো অনিককে রক্ষায়। বুকের মাঝে জাপটে ধরে আড়াল করে নিলো দোহার কাছ থেকে। ভ্রু কুঁচকে তীব্র ঘৃণায় তাকালো দোহা। হাতের আঙুলের জোড়া ছি*লে গিয়েছে তার, লালচে হয়ে উঠেছে র*ক্তের ফোটায়। তবুও তর্জনী তুলে ভীষণ কর্কশ শক্তিশালী এক কন্ঠে গর্জন তুললো,

- আর একবার তুই ওকে ওই নামে ডাক, আমি ভুলে যাবো তুই কোনোদিন আমার বন্ধু ছিলি! তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে আমি কুত্তাকে খাওয়াবো!

তাকিয়ে রইলো অনিক, স্থির দৃষ্টিতে। চোখে নিদারুণ এক ক্ষোভ ভাসলো। পরক্ষণেই সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। রাজীব এবং জিই - শুর উদ্দেশ্যে হাত তুলে বিড়বিড় করলো,

- মাঝখানে আসলে তোদের সাথে আমার বন্ধুত্ব শেষ!

- অনিক... কথা শোন...

ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে তাদের চুপ থাকার হুমকি দিয়ে অনিক দোহার দিকে ফিরলো। হাতের উল্টোপিঠে মুখে লেপ্টে থাকা র*ক্তটুকু মুছে নিয়ে মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো। কয়েক সেকেন্ডের প্রা*ণঘাতী দৃষ্টি বিনিময়। পরক্ষণেই অনিকের মুষ্টিবদ্ধ আগ্রাসন আ*ছড়ে পড়লো দোহার পাঁজর বরাবর। চোখ ঝাপসা হলো, বুক চেপে মুহূর্তেই সে পিছিয়ে গেলো। উবু হয়ে পড়লো শরীর তীব্র যাতনায়। অনিকের রাগান্বিত কন্ঠ হুংকার দিয়ে উঠলো,

- মানবতা মা*রাও তুমি! শালা নর্দমার কীটের বাচ্চা! বন্ধু নামের কলংক কালসাপ তুই! একটা মেয়ের জন্য নিজের বছর বছরের সঙ্গী বন্ধুকে কাঁচকলা দেখাস? অকৃতজ্ঞ বেঈমানের জাত!

দোহা মুখ তুললো, জিভে ধাতব নোনতা স্বাদ টের পাচ্ছে। অনিক এগিয়ে এসে আরেক দফায় ঘু*ষি হাকালো তার ঘাড় বরাবর। সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠলো দোহার। আশেপাশে কতক লোকজন জড়ো হয়েছে। তবুও কেউই এগিয়ে আসছে না। মাস্তান ছেলেপেলেদের ঝামেলায় জড়াতে যেন কেউই ইচ্ছুক নয়। খানিক উৎসাহী এবং আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তারা দেখে যাচ্ছে সবকিছু।

- ভালো সাজতে এসেছিস এখন? শালা, মধু খেয়ে শেষ করে এখন দরদ দেখানো হচ্ছে? হারামজাদা তুই ধোঁয়া তুলসী পাতা? টাকার লোভে তো ঠিকই হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে গেলি এতদিন। টাকা খাওয়া শেষ হতেই বন্ধুত্ব ফুঁস? এখন আবার নারীর টান জেগে উঠেছে তোর? মা***বাজ বেঈমান....!

- ফা*ক ইওর মানি বাস্টার্ড!

অনিকের বিপরীতে গর্জে উঠলো দোহা। নিজের পকেটে হাত চালালো, এক ঝটকায় পঁচিশ হাজার টাকার বান্ডিল বের করে ছুঁড়ে মা*রলো অনিকের দিকে। সবগুলো নোট হাওয়ায় এদিক সেদিক উড়তে থাকলো। হতবিহ্বল হয়ে দেখলো সবাই। মেঝেতে পড়ে ধূলোয় মাখামাখি হলো সব অমুল্য কাগজ। তার উপরেই নিজের পা তুলে দিয়ে ঠেসে ধরে দোহা হিসহিস করে বললো,

- তোর বাপের পয়সা আমি চু*** না!

রাগ - অভিমান - হতাশা - বিশ্বাসঘাতকতা - যন্ত্রণার এক মিশ্র অনুভূতিতে দোহা এবং অনিক উভয়ের আঁখিজোড়া গভীর হয়ে উঠলো। তাদের থামানোর সাধ্য বর্তমানে কারো নেই। রাজীব আর জিই - শু জানে, এখন মাঝখানে যাওয়ার অর্থ তাদের অন্তরের আক্রোশকে আরো বাড়িয়ে দেয়া। তার থেকে উগড়ে দিক সবকিছু, শান্ত হোক। হাঁপালো দোহা। দিনের পর দিনের হতাশা, অপরাধবোধ, যাতনা, বিরহ তাকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আজ আর কোনকিছুতেই কিছু আসে যায়না। অনিক স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে যেন। মুখ ফুটে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না। শুধু তাকিয়েই আছে দোহার দিকে। দৃষ্টি ভীষণ ক্ষোভে টলটলে। দোহা দীর্ঘ একটা প্রশ্বাস টানলো, টাকার উপর থেকে পা সরিয়ে পিছিয়ে দাঁড়ালো দুই পা। নিজের চোখেও অশ্রু ভরে আসছে তার, জোরালো চাপে তা দমিয়ে সে বিড়বিড় করলো,

- হোয়াট ইয রং, ইয রং অনিক! আমি অনেক সহ্য করেছি, আর না! ভুল করেছি, মা*রাত্মক ভুল। সেই ভুল না আমি নিজে বাড়াবো আর না তোকে বাড়াতে দেবো।

অনিকের ঠোঁট কাঁপলো, তবুও কিছুই উচ্চারিত হলোনা। দোহা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে নিজের ব্যথায় টনটন করতে থাকা ঘাড়ে হাত বুলিয়ে বললো,

- দিস এন্ডস হেয়ার....

- রাইট!

অনিকের নয়নজোড়া জ্বলে উঠলো। বিপদজনক কয়েক পদক্ষেপ এগোলো সে দোহার দিকে। পায়ের নিচে টাকার নোট মাড়িয়ে এলো, পরোয়াও করলোনা। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্ষীপ্ত দৃষ্টিতে সে দেখলো দোহাকে। দাঁতে দাঁত পিষে ঘোষণা করলো,

- আমাদের বন্ধুত্ব এখানেই শেষ! আজ থেকে দোহা ইসলাম বলে আমি কাউকে না চিনি, আর না চিনতাম!

মুষ্টিবদ্ধ হলো দোহার উভয় হাত। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো সে। পরক্ষণেই পাল্টা জানালো,

- অনিক রহমান ইয ডে*ড টু মি!

তীর্যক হাসলো অনিক, এক পরিহাসের হাসি। হাতে মুখ ঘষে এনে ফিরে তাকালো। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব এবং জিই - শু। উভয়ের চোখে টলটলে পানি। জিই - শুর চেহারা লালচে হয়ে গিয়েছে। নাক টেনে সে বললো,

- প্লীজ গাইয.... এমনটা করিস না তোরা!

কিন্তু কেউই তার আহাজারি শুনলো না। উল্টোদিকে ঘুরলো অনিক আর দোহা উভয়ে। হনহন করে হেঁটে গেলো বিপরীত দিকে। ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে দোহা চুপচাপ নিজের সাইকেলে চড়লো। একবারও পিছন ফিরে তাকালোনা। রাত্রির অন্ধকারে নিস্তব্ধতা বিলিয়ে তার দূরন্ত অবয়ব আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার। অনিক নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হনহন করে হেঁটে রাস্তার উল্টোপাশ ঘুরে নিজের সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেলো। উৎসুক চোখের ভিড়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো রাজীব এবং জিই - শু। বিপন্ন, বিদ্ধস্ত।

আজ তাদের দলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। বন্ধুত্ব গুঁড়িয়ে গিয়েছে নিদারুণ বাস্তবতার কষাঘাতে। এর দায় কাদের? তাদের নিজেদের! এই পরিণতি তারা নিজ হাতে নিজেদের জন্য তৈরি করেছে। এর চেয়ে নিদারুণ কষ্টের উপলব্ধি আর দুটো হয়না।

。

。

。

মনিটরের বিপ বিপ শব্দই শুধুমাত্র নিস্তব্ধতা ভেদ করে চলেছে। হার্টবিট স্থির দেখা যাচ্ছে। সবুজ লাইনটি উঠানামা করছে স্ক্রীনে। কক্ষটি বরাবরের মতোই আবছায়া আঁধারে ছাওয়া। কড়া ওষুধের ঘ্রাণ বাতাসে। নিঃশব্দে বসে আছে দোহা। সরাসরি চেয়ে আছে রুগ্ন মুখটির দিকে। ছোট ছোট শ্বাস প্রশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কোটরের ভেতর ঢুকে যাওয়া নয়নজোড়া এক আকাশ সমান হাহাকার নিয়ে তাকিয়ে আছে দোহার মুখপানে। শুষ্ক ঠোঁটে ঝুলছে এক চিলতে মলিন হাসি।

- পাখি?

দূর্বল ডাকটি শুনতেই দোহার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। ঝুঁকে এলো সে। জীর্ণ হাতটি তুলে নিয়ে নিজের বুকে ঠেকালো, চেপে ধরলো সর্বশক্তিতে।

- বলো আম্মু।

কথা বলতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ সময় নিয়ে উচ্চারিত হলো,

- আমাকে.... ওই গানটা... শোনাবি?

- কোন গান আম্মু?

- ঐযে...ওইটা.... আমার বুকে শুয়ে রোজ শোনার বায়না ধরতি...

দোহা একটি ঢোক গিললো।

- গা না পাখি! কতদিন তোর গলা শুনিনা....আর শোনার সুযোগ খোদা কপালে রেখেছে কিনা...

- চুপ থাকো আম্মু। তোমার কিছুই হবেনা শুনেছ? তুমি একদম সুস্থ হয়ে যাবে। আমি একদিন অনেক বড় হবো। তখন তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাবো। আমার মনের মণিকোঠায় রাখবো। প্রতিদিন গান শোনাবো, প্রতিদিন....

দোহা কয়েক প্রস্থ প্রশ্বাস টানলো। মায়ের হাতটা বুকে চেপে রেখেই খানিক ভাঙা কন্ঠে মৃদু সুরে গাইতে আরম্ভ করলো,

~ একদিন মাটির ভিতরে হবে ঘর রে মন আমার

কেনো বান্ধ দালান ঘর ~

আবেশে চোখ বুঁজে এলো। জীবনের অন্তিম সম্বলের মতন হাতটি আঁকড়ে ধরে দোহা দরাজ কন্ঠে গাইতে থাকলো। কেবিনের আশেপাশে নার্স এবং দুজন ডাক্তারও দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো। সুরলহরী সম্মোহনী। তাতে জড়ানো বিষণ্নতা। মন খারাপ করা এক অবসাদ। হৃদয়জুড়ে চেপে বসে হাহাকার।

~ প্রাণও পাখি উড়ে যাবে পিঞ্জরও ছেড়ে

ধরাধামই সবই রবে তুমি যাবে চলে

বন্ধু বান্ধব যত, মাতা পিতা তাঁরা সূতো

সকলই ভবে তোমার পর - রে মন আমার

কেন বান্ধ দালান ঘর ~

কতটা মরম বেদনা মেশানো থাকলে সুরের টানে আঁখিতে অশ্রু জমে? কেউ ঠাওর করতে পারলোনা। রুগ্ন মুখটির মাঝে এক প্রস্থ হাসির দেখা পাওয়া গেলো। দোহার ভাঙা দরাজ কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে যা ক্রমশ বিস্তৃত হলো। তারপর একটা সময় সুর মিইয়ে এলো। হৃদস্পন্দন ধীরলয়ে চলতে থাকলো। দোহা নয়ন মেললো। শুষ্ক ঢোক গিলে সে তাকালো মায়ের দিকে। পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। কাঁপছে অধরজোড়া, ক্ষীণ সঞ্চারে। দোহা ঝুঁকে এলো, কান পেতে শুনলো মাতৃহৃদয়ের আবেদন,

- পাখি.... আমার পাখি....

মরুভূমির বুকের বালিঝড়ে যেন সব তোলপাড় হয়ে গেলো। নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে গেলো অজানায়। কপালে কপাল ছুঁইয়ে দোহা চোখ বুঁজে নিলো, কাঁপলো তার অন্তর। তীব্র আলোড়নে আঁকড়ে ধরে রাখলো সে জন্মদাত্রীকে, ফিসফিস করলো,

- আজ আমি সত্যিই একা হয়ে গেলাম আম্মু, একদম একা হয়ে গেলাম। তোমার পাখি একলা.... বড্ড একলা!

অবাধ্য একফোঁটা অশ্রু টপ করে গড়িয়ে পড়লো জননীর কপোলে। নিদ্রায় আচ্ছন্ন সে, পরম শান্তির নিদ্রায়।

ঘণ্টাখানেক বাদে ফোলা চোখ শার্টের হাতায় মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো দোহা। ঘুমন্ত মায়ের কপালে স্নেহের চুমু এঁকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলো কেবিনের বাইরে। পরিশ্রান্ত পদযুগল এবং ক্ষ*তবিক্ষ*ত অন্তর টেনে টেনে চললো।

থেমে থাকলে চলবে না। কাজে যেতে হবে। প্রচুর কাজ তার....প্রচুর কাজ....

কাজের বিনিময়ে অর্থ, অর্থের বিনিময়ে জীবন, জীবনের বিনিময়ে সুখ, সুখের বিনিময়ে কি?

জানেনা দোহা।

━━━━━━━━━━━━━━━

আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর।

আজ চাঁদরাত। আমারা দাঁড়িয়ে আছে একটি ডুপ্লেক্স ভবনের সামনে। বিশাল এক দরজা, কটকটে কালো রঙের। পাশের দেয়ালে সিলভার প্লেটে খচিত,

“ আমিন ভিলা—”

বেশখানিক ইতস্তত করে অবশেষে আমারা কলিংবেল চাপলো। তারপর দ্রুত নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলো। নজর বুলিয়ে দেখে নিলো পরনের সালোয়ার কামিজ ঠিকঠাক আছে কিনা। সঙ্গে আনা শপিং ব্যাগটাও চেপে ধরলো দুহাতে। আজ প্রথম জারার বাসায় এসেছে সে। চাঁদরাতের জন্য দুই বান্ধবীতে মিলে কি করবে সেই সিদ্ধান্তে ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে এই প্রোগ্রামে স্থির হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকে আমারা বেশকিছু কাউন্সিলিং নিয়েছে, সঙ্গে ডক্টর মল্লিকও তাকে বেশ উৎসাহ দিয়েছেন। জারা, আশফিকা উভয়ের সহযোগিতা তো ছিলই। সবটা মিলিয়ে আমারা আবার নতুনভাবে নিজেকে গ্রহণ করে নিতে শিখছে। হীনমন্যতা কাটেনি সম্পূর্ণ, কোনোদিন কাটবেও না। তবে... বরাবরের মতোই সে বাঁচতে শিখেছে।

খট করে দরজা খুলে যাওয়ায় আমারার চিন্তায় ছেদ পড়লো। দ্রুত মাথা তুলে সামনে তাকালো সে, অধরে ফোটালো বৃহৎ এক হাসি। তবে সেই হাসি দৃশ্য দেখে ম্রিয়মাণ হয়ে এলো বিনা কারণেই।

দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ। উচ্চতায় ছয় ফুটের কাছাকাছি কিছু একটা হবে। আমারাকে সর্বোচ্চ সীমায় ঘাড় বাঁকিয়ে তাকে দেখতে হচ্ছে। ফিনফিনে অবয়ব, অথচ শক্তিশালী মাংসপেশী। পরনের ঢোলা নীলাভ শার্টের বুকের কয়েকটা বোতাম খোলা, তাতে শ্যামলা প্রশস্ত বক্ষের খানিক অংশ নজরে আসছে। ধারালো চেহারা। ত্বকের বর্ণ, রোদে পোড়া। আধুনিক ভাষায় যাকে বলা হয় - ট্যানড স্কিন। ঘন কালো মসৃণ চুল মানিয়েছে দৈহিক বর্ণের সঙ্গে। এক বাক্যে বলতে গেলে, বান্দা বেশ সুদর্শন।

আমারা প্রথমটায় থতমত খেয়ে গেলো। অজান্তেই আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো পুরুষটিকে। ঠিক চিনতে পারলোনা। ঠাওর করার চেষ্টা করলো। তাকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি সামান্য হাসলেন, তর্জনী দিয়ে নিজের নয়নজুড়ে থাকা চশমার ফ্রেম ঠেলে তারপর বুকে দুবাহু বেঁধে মোলায়েম কন্ঠে বললেন,

- হ্যালো লিল বার্ড!

কন্ঠটা সুগভীর, কিঞ্চিৎ কর্কশ। অথচ শুনতে খারাপ লাগেনা। বরং এই কর্কশতাই যেন কণ্ঠটিকে করেছে এক প্রকার অনন্য। আমারা ঢোক গিললো, তারপর ঠোঁটে হাসি ফিরিয়ে এনে উত্তর করলো,

- আসসলামু আলাইকুম ভাইয়া।

ইনি নিশ্চয়ই জারার ভাই, তাইনা? যদিও জারা কখনো নিজের ভাইবোন সম্পর্কে কিছুই বলেনি। কিন্তু এই পুরুষটির চেহারা, শরীর, মোটামুটি সবকিছু দেখেই মনে হচ্ছে তার বয়সটাও কমের আশেপাশে কিছুই হবে।

আমারার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার হাসি দ্বিগুণ বিস্তৃত হলো। খিলখিল একটি মৃদু ধ্বনি। দরজা ঠেলে মাথা ঝাঁকিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন তিনি আমারাকে,

- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কাম ইন বার্ড।

আমারা দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলো। তার পিছনে দরজা আটকে তিনি হেঁটে এলেন। জারার বাড়িটি ভীষণ শৌখিন এবং আধুনিক। সাদা কালো ইন্টেরিয়রের মাঝে এক অনন্য শৈল্পিক আবেদন। লিভিং রুমের একপাশে সারি সারি বিদেশী গাছের ছোট্ট একটি বাগানমতন। সেখানে কার্পেটের উপর এলিয়ে আছে দুইটি বিড়াল। একটি সাদা - অপরটি কালো। নিদ্রায় আচ্ছন্ন। ভীষণ ভালো লাগলো আমারার। হেঁটে গিয়ে ডাইন ইন টেবিলের উপর শপিং ব্যাগ রাখতেই তার কন্ঠ ভেসে এলো,

- কফি?

ফিরে তাকালো আমারা। একপাশে লাগোয়া কিচেনের কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। উৎসাহী নজরে চেয়ে আছেন সামনে।

- জ্বি।

- সুগার কিউব?

- দুইটা।

- উমম...ইফতারের পরপর এক মগ ব্ল্যাক কফি আমার অভ্যাস। ওহ, ঈদ মোবারক!

- ঈদ মোবারক!

সামান্য হাসলো আমারা।

- তুমি চেয়ার টেনে বসো, কোকো উপরে আছে, শাওয়ারে। ওকে টেক্সট দিচ্ছি, বেরিয়ে নিচে চলে আসবে।

আমারা আজ্ঞা পালন করে চেয়ার টেনে বসলো। তিনি কফি বানাতে বানাতে সে আশেপাশে লক্ষ্য করলো। তারপর আঙুলে আঙুল গুঁজে জিজ্ঞেস করলো,

- জারা কখনো আপনার কথা বলেনি ভাইয়া। আপনি কি কোনোভাবে, বিদেশে ছিলেন এতদিন?

তিনি চশমার আড়ালে টানা টানা নয়ন তুলে তাকালেন। চেহারায় বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে বললেন,

- এমা! আমার কথা বলেনি? খুব খারাপ হয়েছে বিষয়টা। তোমার সাথে অতি অন্যায় করা হয়েছে। কোকোকে দুটো কানমলা দেবো, জাস্ট ওয়েট।

আমারা খিলখিল করে হেসে উঠলো। তিনিও পাল্টা হাসলেন।

- কোকো? জারার নিকনেইম?

- ইয়েস বার্ড। মাই কোকো ইয মাই কুইন।

ইনি প্রথম থেকেই আমারাকে ভীষণ আদুরে সম্বোধন করছেন। নাম ধরে ডাকেননি একবারও। বিষয়টা কেমন যেন বেশ উষ্ণ ঠেকলো হৃদয়ে। কোমল এক স্নেহের আবেদন যেন।

- আপনি জারাকে খুব ভালোবাসেন মনে হচ্ছে।

মুচকি হাসলেন তিনি।

- ক্ষমতায় থাকলে ও যে সড়কে হাঁটে সেই সড়কে ফুলের চাঁদর বিছিয়ে রাখতাম, ট্রাস্ট মি।

কফির দুটো মগ নিয়ে কিচেন ছেড়ে এগিয়ে এসে তিনি আমারাকে দিলেন একটা। তারপর পাশে অন্য একটা চেয়ার টেনে বসলেন। নিজের ব্ল্যাক কফিতে কয়েক চুমুক দিয়ে চশমা খুলে নিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতে বললেন,

- প্লীজ বার্ড, ড্রিঙ্ক। আমি কিন্তু কফি বানানোতে ওস্তাদ। চিন্তা নেই। জঘণ্য স্বাদ হলেও জোরপূর্বক খেয়ে তোমাকে প্রশংসা করার কষ্ট করতে হবেনা।

আবারো হাসলো আমারা, কফির মগ তুলে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে জানালো,

- ধ... ধন্যবাদ ভাইয়া।

আমারার ধন্যবাদের বিপরীতে মুচকি হাসলেন তিনি।

- ভাইয়া? হোয়াট দ্যা হেল?

কণ্ঠটি কানে যেতেই আমারা মাথা ঘুরিয়ে সিঁড়ির কাছে দাঁড়ানো জারাকে দেখলো। পরনে যথারীতি টি শার্ট আর ট্রাউজার। চুলগুলো এখনো খানিক ভেজা, লেপ্টে আছে কপালে। ভ্রু কুঁচকে ভীষণ এক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সে বান্ধবীর উদ্দেশ্যে। আমারা হাতের কফির মগ চেপে ধরে শান্ত কন্ঠে বললো,

- তোর ভাইয়াকে কফির জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম। ভুল কিছু করেছি নাকি? এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো?

তিনি আবারও হেসে উঠলেন, এবার খানিক শব্দ করেই। আমারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একবার তার দিকে আরেকবার জারার দিকে তাকালো। সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পদক্ষেপে নেমে এলো জারা। তার দিকে একদফা সরু দৃষ্টি বিলিয়ে পরক্ষণে আমারার দিকে ফিরলো। বুকে দুবাহু ভাঁজ করে জানালো,

- ব্রো! হি ইয মাই ড্যাড!

- খ... খক্!

কেশে উঠলো আমারা, ঠোঁট এবং মুখ বেয়ে কফি ছিটকে পড়লো টেবিলের উপর। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলোনা সে। হতবিহ্বল হয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে একবার দেখলো জারাকে, অতঃপর.... জারার বাবাকে? যার হাসি এই মুহূর্তে সীমাহীন। দ্রুতই টেবিলের উপর থেকে তিনি একগোছা টিস্যু বাগড়ে ধরলেন, কয়েকটা টেবিলে চেপে তারপর আমারার দিকে এগিয়ে গেলেন। মুখের কফিটুকু মুছতে মুছতে হাসতে হাসতে বললেন,

- কোকো! কি দরকার ছিলো এভাবে মজা নষ্ট করার? দারুণ লাগছিলো তো ভাইয়া ডাক শুনতে!

- শাট আপ পাপা! তুমি কি বাচ্চা? তুমিও ওকে তাল দেয়া শুরু করেছ! নট ফাইন!

আমারা ফ্যালফ্যাল করে তাকালো উভয়ের দিকে। কথাগুলো কেমন জড়িয়ে গিয়েছে। জারা এবং তার বাবাকে পাশাপাশি দেখে সে আসলেই ঠাওর করতে পারছেনা কিছুই। তার দ্বিধাদ্বন্দ্ব লক্ষ্য করে নিজের হাত বাড়িয়ে ধরলেন তিনি, হ্যান্ডশেক করার ভঙ্গিতে আমারার হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন,

- আই নো আই লুক কুল, রাইট বার্ড?

- উম... আমি... দুঃখিত ভাইয়া... না মানে... সরি... আংকেল...

- হাহা। ব্যাপার না। তোমার সঙ্গে অবশেষে দেখা করতে পেরে খুব ভালো লাগলো। বায় দ্যা ওয়ে, আমি জাইন আমিন, কোকোর সুইটহার্ট পাপা।

- পাপা!

- হাহাহা....

জারাকে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথার চুল হাত বুলিয়ে এলোমেলো করে দিলেন জাইন। আমারা স্থির তাকিয়ে রইলো দৃশ্যটির দিকে। অজান্তেই অধরে ফুটলো তার এক অতি সূক্ষ্ম হাসির রেখা।

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২০

পর্ব ২০: [ জারাকথন ]- ( শেষাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

বিড়াল দুটো আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। খেলে বেড়াচ্ছে নিজেদের মতন। ক্ষণে ক্ষণে এসে জাইনের হাঁটুতে মুখ ঘষছে। আবার একজন ফ্যালফ্যাল করে আমারার দিকে তাকিয়ে আছে। আদর করলেই গদগদ হয়ে লুটিয়ে পড়ছে। বেশকতক সুগন্ধি মোম প্রজ্জ্বলিত চারপাশে, তার ঘ্রাণে মোহিত গোটা কক্ষ। মেঝেতে ম্যাট বিছিয়ে বসেছে সবাই। মিউজিক সিস্টেমে হালকা ধাঁচে “ ও মন রমজানেরও রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ ” গানটির সুর বেজে চলেছে। এক কথায় পরিবেশ উৎসবমুখর।

আমারা কোলে একটি বালিশ রেখে বসে আছে। তার বাম হাতটি বর্তমানে জাইনের দখলে। মেহেদীর কোনের সুচারু অংশ অত্যন্ত দক্ষতায় তার প্রশস্ত হাতের তালুতে শৈল্পিক কারুকার্য ফুটিয়ে তুলছে। যখন জারা মুখ ফুটে বলেছিল যে তার বাবা আজকে তাদের মেহেদী পরিয়ে দেবে, আমারা একটুও বিশ্বাস করেনি। তবে বর্তমানে তার নয়ন এবং অন্তর উভয়ে বিস্মিত হয়ে আছে। জাইন চশমার অন্তরালে অত্যন্ত মনোযোগী ভঙ্গিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মেহেদীর ডিজাইন ফুটিয়ে তুলছেন আমারার হাতজুড়ে। চুলের অংশ কপালে ছড়িয়ে পড়েছে ঝুঁকে থাকায়, ভ্রুজোড়াও সামান্য কুঞ্চিত। জারা একপাশে চুপটি করে বসে নিজের বাবার কাজ দেখে যাচ্ছে। কোনের মুখ আটকে আসতেই সোজা হয়ে বসে জাইন সেটা ঘষতে ঘষতে জারার দিকে তাকালেন,

- কোকো, তুমি সত্যিই মেহেদী পরবেনা?

বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে মাথা দোলালো জারা,

- ইশ, আমার বয়েই গিয়েছে। কেমন মেয়ে মেয়ে লাগে!

- তুই কি ছেলে নাকি?

আমারার কথায় চোখ ঘুরিয়ে সটান লাফিয়ে উঠে পড়লো জারা।

- তোমরাই ঘণ্টা দুই ঘণ্টা বসে ওসব হাতে মেখে চাতক পাখির মতন বসে থাকো। আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই? সময় নষ্ট করার এর থেকে আরো ভালো উপায় আছে।আমি কিচেনে যাচ্ছি, তুমি এগ স্যান্ডউইচ নেবে নাকি চিকেন?

- এগ।

- উম, আমারা চিকেন জানি। গুডবাই।

স্যালুট ঠুকে জারা কক্ষের বাইরে চলে গেলো। তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন জাইন। আমারার দিকে ফিরে বললেন,

- মেয়েটা আর মেয়েদের মতন আচরণ করা শিখলো না।

- হাহা, তাতে কি? ও যেমন তেমনি ভালো লাগে। টমবয়।ও যদি বদলে যায় তাহলে একটুও ভালো লাগবেনা।

- ট্রু।

জাইন আবারো আমারার হাতে মনোযোগ দিলেন। শান্ত কন্ঠে বললেন,

- ইউ নো, ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মানুষ। নারী স্নেহ পায়নি, তাই স্বভাব চরিত্রও হয়েছে আমার মতন। দেখে শেখার মতন কেউ আশেপাশে না থাকলে ও জানবে কিংবা শিখবেই বা কোথা থেকে?

আমারা স্থবির হলো। বেশ অনেকটা সময় যাবৎ যে প্রশ্নটা তার মনে খচখচ করছে সেটা কি সে করবে? জাইন গুরুজন মানুষ, তাকে এভাবে জিজ্ঞেস করা উচিৎ হবে? কিন্তু যদি না করে, তাহলে জারার সম্পর্কে সে ভালো ভাবে জানবে কিভাবে? মেয়েটা এত চাপা স্বভাবের যে নিজের সম্পর্কে কোনো কথাই সে কখনো বলেনা। শেষমেষ আমারার কৌতূহল জয়ী হলো।

- আংকেল, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

জাইন মেহেদীর ডিজাইনে মনোযোগ রেখেই বললেন,

- অবশ্যই বার্ড, বলো।

- না মানে... জারার মা.....

প্রথমবারের মতন জাইনের সদা উজ্জ্বল চেহারায় মলিনতা প্রকাশ পেলো। বিস্তৃত অধরের স্মিত হাসিটুকু ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। মুখ তুলে তাকালেন তিনি, জ্বলজ্বলে এক দৃষ্টিতে দেখলেন আমারাকে। তাতে কিশোরী বেশ ভড়কে গেলো।

- আমি দুঃখিত আংকেল, খুব বেশি ব্যক্তিগত হয়ে থাকলে... আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি! আমার উচিত হয়নি...

- ইটস ফাইন, বার্ড।

মাথা ঝাঁকালেন জাইন। শিরদাঁড়া সোজা করে টানটান হয়ে বসলেন। আমারা খেয়াল করলো তার বাম হাতের ডিজাইন শেষ। ইশারায় তার ডান হাতটা এগিয়ে দিতে বলে জাইন বলতে শুরু করলেন,

- আমার যখন বিশ বছর বয়স,তখন কোকো আমার কোলে এসেছিলো....

তড়িৎ খেলে গেলো যেন অন্তরে। স্তব্ধ হয়ে থাকলো আমারা। নেহায়েত কম বয়সেই বাবা হয়েছেন জাইন, এখন সবটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আমারার ডান হাতে মেহেদী পরাতে পরাতে নিজের কথা জারি রাখলেন জাইন,

- কৈশোরের বয়স পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পা দেয়া দুরন্ত এক অস্তিত্ব ছিলাম আমি। অনেক কিছু এসেছে, গিয়েছে জীবনে। উত্তেজনাকর বয়সটা ভুলের, ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণের। আমিও তার বাইরে ছিলাম না কোনোদিন। বাবা, বাবার বিজনেস, দায়িত্বের বোঝা, অহেতুক কিছু ব্রেক আপ.... সবকিছু নিয়ে ভীষণ হতাশায় ডুবে ছিলাম। আমি তখন ড্রা*গস নিতাম বার্ড!

এতটা সহজভাবে জাইন স্বীকার করলেন যে আমারা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। জাইন মৃদু হাসলেন, বললেন,

- আসক্তি অভিশাপ। তোমাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। আমাকেও দিয়েছিল। রিহ্যাব করেছি। তারপরও সেই অবসন্নতা, হতাশা কাটাতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছিল। উপরন্তু বাবার চাপ, বংশের মান মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব, বিজনেস এম্পায়ারের বোঝা, সবকিছু আমাকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। আমি স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, নিজের মতন বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবার সোনার চামচ মুখে পরিয়ে আমার সেই স্বাধীনতা, স্বপ্ন, শখ ছিনিয়ে নিয়েছিল। আমি হতাশ হবো না তো কে হবে? এমনি একটা সময়ে কোকোর মা আমার জীবনে এসেছিল। খুব খারাপ সময় সে বেছে নিয়েছিল আমার জীবনে আসার জন্য।

ভ্রু কুঁচকে এলো জাইনের। যেন স্মৃতিগুলো স্মরণে আনতে চান না।

- উহু, ভালোবাসার কোনো কাহিনী নয় এটা। কোকোর মা ছিলো একজন কলগার্ল। আমার অ্যাসিসটেন্ট তাকে বুক করেছিল এক রাতের জন্য, আমার কথায়। তারপর যা হওয়ার তাই হয়। পরদিন সকাল থেকে আমাদের রাস্তা ভিন্ন। সে তার পথে, আমি আমার পথে। ঠিক ছয় মাস পর জানতে পারি.... শি ওয়ায প্রেগনেন্ট।

শিউরে উঠলো আমারা। কেমন অনুভব করবে বুঝতে পারলোনা। অজান্তেই তার নজর পড়ল দরজার উপর, জারা ফিরে এলো কিনা! না, একঝাঁক নিস্তব্ধতা ছাড়া যেন কক্ষজুড়ে আর কিছুই নেই। আমারা জাইনের দিকে দৃষ্টি ফেরালো,

- আপনি কি তারপর....

- হুম, অবশ্যই। ততদিনে নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছিলাম, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যাই হয়ে যাক না কেনো এবার আমি আমার জন্য বাঁচবো। কোকোর মা হয়ত সেই পুশ আপ ছিলো, যে আমাকে স্বাধীনতার পথে ঠেলে দিয়েছিলো। পরে ঘাঁটাঘাঁটি করে জেনেছিলাম ও আর্থিক নানা জটিলতায় ভুগছিল,তাই বাধ্য হয়ে ওই পথ বেছে নিয়েছিলো। আমি ওকে বিয়ে করি। যে কাজ আমি করেছি, তার দায়িত্ব নিতে বদ্ধপরিকর ছিলাম। এজন্য আমার বাবা আমাকে কোম্পানির শেয়ার থেকে বঞ্চিত করার ঘোষণা দেন। আই ডিড নট কেয়ার। আমার কাছে তখন আমার স্ত্রী এবং অনাগত সন্তানই সবকিছু ছিলো। ওদের জন্য আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জাইন। সোজা হয়ে বসে ব্যক্ত করলেন,

- কোকোকে জন্ম দেয়ার সময় ওর মা মা*রা যায়। ওর কমপ্লিকেশনস ছিলো, তবুও ও গর্ভের সন্তানকে নিজের সবকিছু মনে করতো। এরপর কোকোকে নিয়ে আমার একলা চলার পথ। ও সম্পূর্ণই ওর মায়ের মতন হয়েছে, চেহারা, শরীর সবকিছুই। তাই ওকে আমার পরিবারের কেউই সহ্য করতে পারতোনা। যখন শুধুমাত্র ওর জন্ম এবং গায়ের রং নিয়ে আমারই আপনজনগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করতো, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ব্যার্থ মানুষ মনে হতো। বয়স কম, অভিজ্ঞতা নেই, মা - হারা সন্তানের পিতা, কি করতাম আমি? ভয় ছিলো ভীষণ। তবুও যখন একদিন আমারই বাবা আমারই সামনে কোকোকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করেছিলো, আর পারিনি। সোজা কোকোকে কোলে তুলে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম বাড়ি থেকে।

চশমা খুলে নিলেন জাইন। আমারার মনে হলো, তার অশ্রু ঝরবে। তবে ঝরলোনা, শুধু টলটলে হলো আঁখি। একটি টিস্যু তুলে তিনি নাক ঘষে নিলেন, স্মিত হেসে জানালেন,

- দ্যাট ওয়ায ডু অওর ডা*ই ফর মি। অভিজাত পরিবারের সন্তান হিসাবে বেশকিছু সুযোগ সুবিধা এবং সম্পত্তি তো ছিলই। ভালোই সুযোগ নিয়েছি সবকিছুর। কোকোকে নিয়ে আমার বছর কাটতে শুরু করলো। তারপর একটা সময় খুঁজে পেলাম নিজের স্বপ্নকে, নিজের সফলতাকে। দেশের সনামধন্য ফ্যাশন ডিজাইনারদের নামের লিস্টে আমার নামটা প্রথম সারিতে উঠলো। নিজের কোম্পানি দাঁড় করালাম। আমার জীবনে আমি, আমার স্বপ্ন এবং আমার কোকো। বেশ আছি আমরা। কোকো আমার পৃথিবী, ওর জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। আজ আমি যা কিছু, আমার যতটুকু, সব কোকোর জন্য।

বিস্তৃত হাসলেন জাইন। দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলো আমারা। তার দুহাত অজান্তেই কাঁপতে শুরু করেছে। জারা আমিন - নামক তার বান্ধবীর নামটার পিছনে সুবৃহৎ এক ইতিহাস লিখিত আছে তা কোনোদিন তার ধারণায়ও আসেনি। কেনো জারা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে, কিংবা কেন সে এতটা রক্ষনশীল এবং শক্ত স্বভাবের তা আজ আমারার সামনে স্পষ্ট।

- তুমিই প্রথম যাকে কোকো সত্যিই নিজের বন্ধু মনে করে। কস্মিনকালেও আমি বাদে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক ছিলোনা। স্কুল থেকেই একদম চাপা, একাকী স্বভাবের। কিন্তু যখন ও তোমার সঙ্গে কথা বলে, কিংবা তোমার সম্পর্কে আমার সাথে কথা বলে, তখন ওর চেহারায় যে ঝিলিক থাকে তা আমি কোটি টাকা দিয়েও কোনোদিন কিনতে পারবো না। ইউ আর হার ট্রু ফ্রেন্ড বার্ড, অ্যান্ড ইউ ডিজার্ভড দিস ট্রুথ।

আমারা মুখ তুলে তাকালো জাইনের দিকে, এক নিগূঢ় টান অনুভব করলো হৃদয়ে। জাইন ঝুঁকে এসে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। মোলায়েম স্বরে বললেন,

- টেইক কেয়ার অব মাই কোকো, উইল ইউ?

মুগ্ধ টলটলে নয়নে আমারা তাকালো জাইনের উদ্দেশ্যে, কোমল কন্ঠে বললো,

- আই উইল। আংকেল... ইউ আর দ্যা বেস্ট ফাদার আই হ্যাভ এভার সিন!

শব্দ করে হাসলেন জাইন। মাথা দুলিয়ে বললেন,

- কাম অন। তোমার বাবা এই কথা শুনলে ভীষণ রাগ করবেন।

আমারার হাসি ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। বিষয়টা স্পষ্টত খেয়াল করলেন জাইন। তবে তিনি কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারলেন না। এর আগেই ট্রে হাতে কক্ষে ঢুকলো জারা। ধপাস করে বসে পড়লো দুইজনের পাশে।

- বাহ্ বাহ্, বেশ। একজন এখনো মেহেদী পরছে, আরেকজন পরাচ্ছে। খাবেন কিভাবে আপনারা শুনি?

- আ...

মুখ খুলে ঝুঁকে এলেন জাইন। জারা ভ্রু তুলে তাকালো, যেন বিরক্ত হয়েছে। তবে পরমুহূর্তেই হেসে ফেললো। স্যান্ডউইচ তুলে টুকরো ছিঁড়ে তার মুখে ঢুকিয়ে দিলো।

- থ্যাংক ইউ, ইওর হাইনেস, মাই প্রিন্সেস।

জাইন চিবুতে চিবুতে বলতেই জারা খিলখিল করে হেসে উঠলো।

- পাপা প্লীজ, তুমি দিনদিন বাচ্চা হয়ে যাচ্ছো।

- উম, আমার বাচ্চাদের সাথে আমি বাচ্চা থাকবো না তো কি পাশের বাড়ির কুদ্দুসের বাপ থাকবে?

- আমাদের বাড়ির পাশে কুদ্দুস নামের কেউ নেই।

- আহ, আমি মজা করছি। একটু হেসে তাল দিলে কি তোমার দুধের দাঁত পরে যাবে?

- পাপা আই অ্যাম সেভেনটিন। আমার দুধের দাঁত তুমি নিজেই ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিলে।

হাল ছেড়ে দিলেন জাইন। মাথা ঝাঁকিয়ে কি যেন আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে মেহেদীতে মনোযোগ দিলেন। জারা তীর্যক হাসলো। নিজের বাবার মজা নষ্ট করায় ওস্তাদ সে। উভয়ের খুনসুঁটি দেখে আমারা বিস্তর হাসলো। এক মনোমুগ্ধকর উষ্ণতা ছেয়ে গিয়েছে তার সমস্ত অস্তিত্ব। জারা স্যান্ডউইচ ছিঁড়ে তার মুখে ঠেসে দিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো,

- তুই আর দাঁত কেলাস না। তাড়াতাড়ি এই মেহেদী পুরাণ শেষ কর। কতগুলো বাজি আনিয়েছি জানিস? ফায়ারওয়ার্ক করে আকাশ না ফা*টালে কিসের চাঁদ রাত? গিল, জলদি গিল! তোর আর আমার ছবি পোস্ট করে আজকে আমি সোশাল মিডিয়া ভাসাবো, দেখিয়ে দেবো কতগুলো নিমকহারামকে!

- তোমাকে ক্যারাটে শেখানো একদম উচিত হয়নি আমার। উঠতে বসতে ছেলে পিটাও তুমি এখন।

- ওইটা তোমার নেয়া বেস্ট সিদ্ধান্ত ছিলো পাপা।

জাইনের বিপরীতে বলে সশব্দে হেসে উঠলো জারা। তার হাসিতে যোগদান করলো বাকিরাও।

。

。

。

রাত সাড়ে দশটা।

নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আসা চোখজোড়া মেলে কচলে নিলেন জাইন। সিলিং নজরে এলো। নড়েচড়ে উঠতে গিয়েই অনুভব করলেন তার দুইপাশে শুয়ে আছে জারা এবং আমারা। জারা তার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অপরদিকে আমারা তার উদরে মাথা ঠেকিয়ে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছে। দৃশ্যটি লক্ষ্য করে মৃদু হাসলেন তিনি। আশেপাশে তাকালেন। ছড়িয়ে আছে স্ন্যাক্সের প্যাকেট, শুকনো ফুলের গোছা, টুকরো কাগজ, মেহেদীর কয়েকটা কোন, টিস্যু, গোটা কতক গল্পের বই, আরো বহু কিছু। একটা দূর্দান্ত সময় কাটানোর সাক্ষী। ঘন্টাখানেক যাবৎ সবাই বাইরে একসাথে বাজি ফুটিয়ে এসে তারপর কক্ষে গল্প - গুজব - হাসিতে মশগুল হয়ে পড়েছিলো। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছিলো, জাইনও মাথা ঠেকিয়েছিলেন মেঝেতে। কখন চোখ লেগে এসেছিল টের পাননি।

অতি সাবধানে জারার মাথাটা ধরে পাশে কুশন টেনে শুইয়ে দিয়ে জাইন উঠলেন। তাকালেন আমারার দিকে। দ্বিতীয় আরেকটি কুশন রেখে তাতে তাকে সন্তপর্নে শুইয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। পোষা বিড়াল দুটোও মেয়েদের পাশে লুটিয়ে আছে। হাসলেন তিনি আপনমনে। প্রতিদিন ঘরটা প্রায় ফাঁকা লাগলেও আজ কেমন যেন পরিপূর্ণ ঠেকছে। যদিও বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি একমাত্র আমারার আগমন বাদে। বেশ কতক ওয়েট টিস্যু তুলে হাঁটু মুড়ে কিশোরীর মেহেদী পরনে হাত পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি। শুকিয়ে অনেকখানি উঠে এসেছে। টকটকে লাল বর্ণে রেঙে উঠেছে দুহাত। টিস্যু দিয়ে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে নিলেন তিনি, আমারা সামান্য নড়েচড়ে উঠলো বটে তবে ঘুম ভাঙলো না তার। সবশেষে ঝুঁকে জারার কপালে স্নেহের চুমু এঁকে তিনি উঠে পড়লেন।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সিংক থেকে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে মুছে কিচেনে এলেন। আগামীকাল ঈদ উপলক্ষে যদিও অনেক জায়গায় দাওয়াত রয়েছে তবুও পবিত্র দিনের শুরুর উদ্দেশ্যে কিছু করা উচিৎ। এমন ভাবনা থেকে তিনি পায়েসের জন্য চাল, দুধ, কিশমিশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে নিতে লাগলেন। জারার চিকেন বিরিয়ানী বেশ পছন্দ। তার জন্য পেঁয়াজ বেরেস্তা করে কৌটায় রাখলেন। বাকি মশলাগুলো ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলেন।

ডিং ডং।

কলিং বেলের মিষ্টি আওয়াজে মুখ তুলে তাকালেন জাইন। তোয়ালেতে হাত মুছে টেবিল থেকে চশমা তুলে চোখে পরে নিলেন। অতঃপর দরজা খুললেন।

দন্ডায়মান এক রমণী। সুদর্শনা মুখাবয়বজুড়ে ক্লান্তির ছাপ। দীঘল লম্বা চুল বিনুনী পাকানো, একেবারে কোমরের নিচ অবধি পৌঁছেছে যা। ফরমাল শার্ট এবং প্যান্ট পরনে, দুহাত গুঁজে রাখা পকেটে। আইলাইনার টানা জ্বলজ্বলে তারকা খচিত নয়নে তাকিয়ে আছেন। তাকে বিস্মিত মনে হচ্ছে। অজান্তেই আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি জাইনকে। জাইন তাতে এক মুহূর্তের জন্য থমকালেন। তবে রমণী কোনো মন্তব্য করলেন না। ক্ষীণ হেসে জানালেন,

- আমি আশফিকা চৌধুরী, আমারার মা।

জাইন ভ্রু তুললেন, পরক্ষণে দরজা মেলে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন। স্মিত হাসলেন,

- প্লীজ কাম ইন মিসেস চৌধুরী।

আশফিকা কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে অবশেষে ভেতরে ঢুকলেন। আশেপাশে দেখতে দেখতে ভেতরে এগোলেন।জাইন দরজা আটকে এসে বললেন,

- বাচ্চারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

- ওহ, আমি সরি। আসলে একটা মিটিং খুবই দেরীতে শেষ হয়েছে তাই আসতে আসতে দেরী হলো। আমিই আমারাকে বলেছিলাম আমি এসে ওকে নিয়ে যাবো।

- ইটস টোটালি ফাইন। আমার খুব ভালো লেগেছে ও আজকের সময়টা এখানে কাটিয়েছে। আমরা খুব এনজয় করেছি। প্লীজ বসুন, চা নাকি কফি?

- না না, আপনি শুধু আমারাকে ডেকে দিন। বাড়িতে ফিরবো, এমনিতেও রাত হয়ে যাচ্ছে।

- সরি মিসেস চৌধুরী, আমিন ভিলায় এসেছেন আর মেহমানদারী গ্রহণ না করে চলে যাবেন এমনটা হতে দেয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। প্লীজ সিট।

অবশেষে আশফিকা বসলেন। জাইন কিচেনে চলে গেলেন। খানিক বাদেই ফিরে এলেন ট্রেতে সাজানো ফ্রুটকেক এবং আপেলের জুস নিয়ে। সেসব আশফিকার সামনে সাজিয়ে রেখে পাশে চেয়ার টেনে তিনি বসলেন।

- সরি, এখন ডিনার সার্ভ করার সময় হলেও করছিনা কারণ খাবারটা অর্ডার করার চিন্তা ছিল। আর দ্বিতীয়ত, আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আমি ডিনার অফার করলে আপনি আমাকে ঠাটিয়ে দুটো চড় থাপ্পড়ও দিতে পারেন। সো আই প্লেইড সেইফ।

আশফিকা হেসে ফেললেন। প্রথম সাক্ষাতে কেউ এতটা মিশুকভাবে কথা বলতে পারে তা তিনি আগে ধারণা করেননি। জুসের গ্লাস তুলে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন,

- আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি ডিনার অফার করলেও আমি কিছু মনে করতাম না।

- রিয়েলি? শুড আই অর্ডার দ্যান? বিরিয়ানি নাকি তেহেরী?

জাইন সত্যি সত্যি পকেট থেকে ফোন বের করে টাইপ করতেই আশফিকা থতমত খেয়ে হাত তুলে তাকে থামালেন,

- আমি মজা করছিলাম! আপনি দেখছি ভীষণ সিরিয়াস মানুষ! সব কথা আমলে নেয়ার প্রয়োজন আছে?

- আ লেডি’স উইশ ইয কমান্ড।

আশফিকা থমকালেন, কেন যেন কথাটা তার হৃদয়ে দাগ কেটে গেলো। চেয়ে থাকলেন তিনি জাইনের মুখপানে, পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। জুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন,

- ওয়াও। এমন ধারণার কেউও এই দুনিয়ায় আছে?

জাইন চেয়ারে হেলান দিয়ে সামান্য হাসলেন,

- খুঁজলে তো কয়লার খনিতে হীরার দেখাও পাওয়া সম্ভব। শুধু খোঁজার মতন খুঁজতে হবে।

- আপনি বেশ চমৎকার করে কথা বলেন।

- উহু, আপনার চমৎকার লাগছে কারন আপনি আমার কথার অর্থ ধরতে পারছেন।

আশফিকা এক চুমুকে গোটা গ্লাস নিঃশেষ করে ফেললেন। তারপর তাকালেন জাইনের দিকে।

- আপনার নামটা এখনো জানা হলোনা।

- জাইন আমিন অ্যাট ইওর সার্ভিস।

ভ্রু তুললেন আশফিকা। তারপর মাথা কাত করলেন। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

- ইউ মিন আপনি জেডকো গ্রুপের চেয়ারম্যান?

- এতক্ষণে চিনলেন তাহলে।

আশফিকার হাসি বিস্তৃত হলো, মাথা ঝাঁকিয়ে জানালেন,

- না। আমি আপনার নাম শুনেছি কিন্তু কখনো সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি তাই আরকি। চৌধুরী গ্রুপের সঙ্গে আপনার ফিউচারে একটা ডিল হতে চলেছে রাইট?

জাইন স্মিত হাসির সঙ্গেই জানালেন,

- মনে হয় না। মিস্টার চৌধুরীর সঙ্গে মিটিং.... উম লেটস সে, খুব একটা সুবিধার হয়নি। আমার মনে হয়না উনি ডিলটায় ইচ্ছুক হবেন।

আশফিকা ঠোঁটে ঠোঁট চাপলেন। তারপর কি যেন ভেবে বললেন,

- ইউ নো হোয়াট মিস্টার আমিন? আমি বিষয়টা দেখছি। যদিও সেক্টর আমার আন্ডারে নয়, তবুও আমি ডিলের ব্যাপারটা দেখবো। তবে হ্যাঁ, চৌধুরী গ্রুপের জন্য যেটা সঠিক হবে আমার পক্ষ থেকেও সিদ্ধান্ত সেটাই হবে। তাতে ডিল আপনার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে দুইদিকেই যেতে পারে।

- আপনার স্বচ্ছতার বিষয়টা ভালো লাগলো।

জাইন সম্মতি জানালেন। তারপরই যুক্ত করলেন,

- তবে আপনি আবার ভাববেন না আমি আপনাকে আপেলের জুস পান করিয়ে ডিল হাতানোর চেষ্টায় আছি। ট্রাস্ট মি, ইটস পিওর কোইন্সিডেন্স!

খিলখিল করে হাসলেন আশফিকা। জাইন তাকিয়ে রইলেন, পরক্ষণে নিজেও সেই হাসিতে যোগদান করলেন।

- আপনি সত্যিকার অর্থেই অনন্য একজন মানুষ মিস্টার আমিন।

- আমি জানি আমি সেরা।

- হাহাহা...

চেয়ার টেনে উঠে পড়লেন আশফিকা। জাইনও উঠলেন, ভেতরে আড়াল হলেন। কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এলেন ঘুমঘুম চোখে হাঁটতে থাকা আমারাকে নিয়ে। পায়ে পায়ে হেঁটে এসে আশফিকার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো কিশোরী, সন্তানকে সযত্নে আগলে নিয়ে মাথায় চুমু খেলেন আশফিকা।

- ঘুম পেয়েছে সোনা?

- উম...

- মজা করেছ?

- খুব। ভাইয়া....উপস! আংকেল অনেক ভালো।

- হাহা, অবশ্যই। চলো, কিছুক্ষণ বাদেই বাসায় পৌঁছে যাবো। তারপর ঘুমাবে।

আমারাকে ধরে নিয়ে বাড়ির বাইরে এগোলেন আশফিকা। পিছন ঘুরে তাকালেন, জাইন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন হাসিমুখে।

- ঈদের দাওয়াত রইলো। জারাকে নিয়ে আসলে ভীষণ খুশি হবো।

- অবশ্যই চেষ্টা করবো। ভালো থাকবেন।

- আপনিও। ঈদ মোবারক।

- ঈদ মোবারক।

সামনে পার্ক করে রাখা গাড়িতে আমারাকে তুলে দিলেন আশফিকা। পরক্ষণে নিজেও চেপে বসলেন। জানালা দিয়ে একনজর জাইনকে লক্ষ্য করে হাত নাড়লেন। পাল্টা হাত নাড়লেন জাইনও। গাড়িটা ধীরে ধীরে মোড় ঘুরিয়ে আমিন ভিলার প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। জাইন তাকিয়ে রইলেন, যতক্ষণ না দৃশ্যটি আড়াল হয়। পরক্ষণে একটি নিঃশ্বাস ফেলে আপনমনে মুচকি হেসে দরজা আটকে দিলেন। ভেতরে এগোলেন। জারাকে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিতে হবে।

—চলবে—

[ উল্লু বানায়া, বারা মাজা আয়া💀👌🏻

বি দ্রঃ জাইন স্টিল আমাশস্বামী.....🥱]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন