#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২১
পর্ব ২১: [ ব্যাক টু কলেজ ]
━━━━━━━━━━━━━━━
ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজের আজ প্রথম ক্লাস।
নিজের ডরম রুমের আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে অন্তিমবারের মতন আয়নায় দেখে নিলো দোহা। চোখের নিচের কালিগুলো বেশ বোঝা যাচ্ছে। দ্রুতহাতে টেবিল থেকে ফাউন্ডেশন ক্রিমের খানিকটা তুলে ত্বকে লাগিয়ে নিলো, তার উপর ফেইস পাউডার ড্যাব করে নিলো আঙুল দিয়েই। এখন খানিকটা জাতের দেখতে লাগছে। আয়নায় হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে সোজা হলো। বিছানা থেকে ব্যাগ কাঁধে নিতেই অপর পাশের ফাঁকা বিছানা নজরে এলো।
অনিক নিজের রুম পরিবর্তন করেছে। এখনো নতুন কোনো ছেলে দোহার রুমে শিফট হয়নি, বিধায় সে আপাতত কিছুদিনের জন্য একাই আছে। পরিপাটি বিছানা, শূন্য ক্লজেট এবং বইখাতাহীন একলা টেবিলটি দেখে দোহার বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে উঠলো। তবে নিজেকে সে দমিয়ে নিলো। মাথা ঝাঁকিয়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
করিডোর ধরে চুপচাপ ক্লাসের দিকে এগোতে এগোতে আশেপাশের সকলের ফিসফাস কানে এলো দোহার। পাত্তা না দেয়ার চিন্তা থাকলেও নাছোড়বান্দা যেন সবাই। কয়েকজন তো পথিমধ্যে মহাবিস্ময়ে বলেই বসলো,
- আরে দোহা? অনিকের সাথে নাকি তোর ফ্রেন্ডশিপ শেষ?
দোহা কারোর কথার কোনো উত্তর করলোনা। তীব্র গুঞ্জন এবং ফিসফাস এড়িয়ে সে ক্লাসে এলো। চুপটি করে একদম শেষে এক কোণায় একটি ডেস্ক দখল করে বসে পড়লো। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই সে ডেস্কে ঠেকালো সেটি। ক্লাসের অন্যান্যরা তাকে ফিরে ফিরে দেখলো। অনিকের কাহিনীর কারণে নাকি সেদিন রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের কাজ করার কারণে সেই বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছুক নয় দোহা। কিছুক্ষণ বাদেই পরিচিত খিলখিল হাসির ধ্বনি শুনে সে মুখ তুলে তাকালো। ক্লাসের ভেতরে প্রবেশ করেছে অনিক, সঙ্গী রাজীব , জিই - শু এবং আরো দুজন। দোহা একটি ঢোক গিললো। তবে অনিক তার দিকে একটিবারের জন্যও ফিরে তাকালোনা। রাজীব, জিই - শুই একমাত্র এমন এক করুণ নয়নে চাইলো যেন তারা বড় অসহায়। তাতে তীর্যক এক পরিহাসের হাসি হাসলো দোহা।
তাদের এই গ্রুপটা মূলত গঠন করেছিল অনিক, দোহা এবং তার বন্ধুত্বের মাঝে রাজীব আর জিই - শু এসেছিল অনেক পরে। তাদের এনেছিল অনিক নিজেই। সেই পক্ষপাতিত্বস্বরুপ হয়ত দোহা একদমই একলা হয়ে গিয়েছে। ব্যাপার না। সে দোকলাই বা ছিলো কবে? চেয়ারে হেলান দিয়ে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো দোহা।
আশেপাশে সবাই উত্তেজিত কন্ঠে ঈদের দিনের গল্প করছে। কে কত হাজার হাজার টাকা সালামি পেলো, কোথায় কোথায় দাওয়াত খেতে গেলো, কার বাবা কাকে ঈদের ছুটিতে কোন দেশে নিয়ে গিয়েছে তাই নিয়ে বিস্তর আলোচনা। দোহা আনমনে শুনে গেলো। তার বলার মতন কিছু আছে কি? ওহ হ্যাঁ, ঈদের দিন সকালে এক প্রস্থ ঝগড়া লেগেছিল তার আর শবনমের মাঝে। খুবই তুচ্ছ একটা কারণ। ঘুম থেকে উঠে গোসলে গিয়েছিল সে। বাবুল তাতে ধমকা ধমকি করছিলেন নিজের ঈদের জামাতে যেতে দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে। শবনমও তাতে যোগদান করলে দোহা শুধু “চুপ করো তো আন্টি!” উচ্চারণ করায় মারাত্মক আগ্রাসন চালিয়েছেন বাবুল। জামাত আদায় করে ফেরার পর দিয়া তাকে গরম গরম হালিম খেতে দেয়ার পর শবনম আড়দৃষ্টিতে চেয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “ গেলো, বাপের অন্ন ধ্বংস কর শুধু! যেন তোর মা কত কি গছিয়ে দিয়ে গিয়েছে এই সংসারে? ” এরপর আর খাবার গলা দিয়ে নামেনি দোহার। চুপচাপ নিজের রুমে দরজা আটকে বসে গিটার নিয়ে টুংটাং করছিলো তাও বাবুলের সহ্য হয়নি। দরজা ধাক্কা দিয়ে হেঁড়ে গলায় ডাক ছেড়েছিলেন, “তোর মাকে নাকি তুই সালাম করিস নি? ঈদের মতন দিনেও অসভ্যতা করিস? ” রাগান্বিত কন্ঠ দোহা ঠাস করে জবাব দিয়েছিল, “ উনি আমার মা না, তোমার রক্ষিতা!” ব্যাস। তারপর যা হয়েছে তা আর বলার অবকাশ রাখেনা। দোহার পিঠে এখনো বেল্টের দুটো কড়া দাগ আছে, বিছানায় চিৎ হয়ে শুতে পারেনা সে ব্যথায়। গতবছরের পুরাতন ঈদের পাঞ্জাবীটা পরনে অবস্থায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। একলা একলা রাস্তায় ঘুরেছে, অভুক্ত। চোখ মেলে দেখেছে বন্ধুর দল, পরিবার এবং কপোত কপোতীকে নিজেদের আনন্দময় ঈদ উদযাপন করতে। বিকালে রেস্টুরেন্টের বায়না সে আগেই নিয়ে রেখেছিল। ঈদের দিনে কাজ করার বিনিময়ে দ্বিগুণ টাকা পেয়েছে সে দিনের। রাতে হাসপাতালে মাকে দেখতে গিয়েছিলো, মাহিন আংকেলের কাছে আরো হাজার পাঁচেক টাকা দিয়ে এসেছে।
এইতো, বেশ কেটেছে তার ঈদ!
এই কাহিনী কোনোদিন কোনো কাকপক্ষীতেও জানবেনা। একমাত্র দোহা জানে, আর মাথার উপরে সৃষ্টিকর্তা।
- রোল নাম্বার থ্রি, দোহা ইসলাম?
নিজের নামটা শুনে ঝট করে বাস্তবতায় ফিরলো দোহা, সটান উঠে দাঁড়িয়ে ভাঙা কন্ঠে জবাব দিলো,
- প্রেজেন্ট ম্যাম।
চশমার আড়ালে তার দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকালেন ম্যাম, ইশারায় বসতে বললেন। দোহা বসে পড়লো। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চুলে হাত চালিয়ে আনলো। ক্লাস শুরু হয়েছে টেরও পায়নি। আনমনে নোটবুক আর বই খুলতে খুলতে সে রোলকল শুনলো। অতঃপর হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলো, আমারার নাম নেয়া হয়নি। বেশ বিহ্বল হয়েই সমস্ত ক্লাসে নজর বুলিয়ে আনলো সে। নাহ্, কোথাও আমারা নেই। জানেনা কেন যেন বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল দোহার। মেয়েটা কি এখনো ডরমে ফেরেনি? দুহাত মুঠো চেপে খানিক অসহায় দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকাতেই সামনের ডেস্কে বসা সৌরভকে নজরে এলো। নোটবুকের উপর অবসরে আঁকা কোনো স্কেচ ইরেজার ঘষে তুলছে ছেলেটা। একটা ঢোক গিলে শেষমেষ নিজের কৌতূহলের কাছে পরাজিত হয়ে দোহা হাত বাড়ালো। সৌরভের কোমরে খোঁচা দিতেই ভীষণ ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে ছেলেটা পিছন ফিরে তাকালো। দোহাকে দেখে সামান্য নমনীয় হলেও বিতৃষ্ণা মুছলো না।
- আমারা কোথায়?
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো দোহা। সৌরভ খানিক বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে অতঃপর মাথা ঝাঁকিয়ে কর্কশ স্বরে পাল্টা বলে উঠলো,
- তোকে কেনো বলবো?
তীর্যক হাসলো দোহা। ঝুঁকে এসে গভীর নয়নে চেয়ে কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে বললো,
- দল নেই বলে কি তুইও ভেবে বসেছিস আমার শক্তি উবে গিয়েছে? ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, বাঘের শিকার করতে দলের প্রয়োজন হয়না।
স্পষ্টত বিব্রত দেখালো সৌরভকে। মাথা ঝাঁকালো ছেলেটা। শেষমেষ জবাব দিলো,
- ও সেকশন তেরেসায় ট্রান্সফার হয়েছে, আর আমাদের সাথে ক্লাস করবেনা।
এটুকুই। দোহা আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সৌরভ সামনে ফিরলো। দ্রুত বই বের করে মনোযোগ দেয়ার ভান ধরলো। দোহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো নিজের জায়গায়। সেকশন বদলেছে? সেটা সম্ভব? অসম্ভব অবশ্য নয় যদি কর্তৃপক্ষকে যথাযথ কারণ দর্শিয়ে অনুরোধ করা হয়। তবে কি... দোহা আর ভাবতে পারলোনা। টের পেলো বুকের ভেতর কেমন যেন ভার জেঁকে বসেছে। ম্যাম পড়ানো শুরু করলেও একটা শব্দও আর তার কানে ঢুকলো না। ডেস্কে মাথা ঠেকিয়ে চুপটি করে পরে রইলো সে, ঠোঁটে এক পরিহাসের হাসি।
“শেষমেষ তবে তুমিও আমায় একলা করে দিলে নোলক? ”
“ অভিমান করছিস? বড্ড বেত্তমিজ তো তুই! তোর কি সেই অধিকার আছে বেঈমান? ”
নিজের অন্তরের উত্তরে নিজেই নির্বাক হয়ে পড়ে রইলো দোহা।
。
。
。
টিফিনের সময়।
ক্যান্টিনজুড়ে ভীষণ ব্যস্ততা। ছেলেমেয়েদের কোলাহলে ছুটির অনেকগুলো দিন বাদে আজ পরিপূর্ণ ক্যাম্পাস। খাবারের সুস্বাদু ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। বন্ধুদের দল টেবিলে টেবিলে বসে হাসি ঠাট্টায় মেতে আছে। আর কতক নিজেদের মতন টিফিন সারছে। কেউ বা ফোন ঘাটছে, আবার কেউ মুখ গুঁজেছে কমিক বইয়ের পাতায়।
একপাশের একটি টেবিলে বসে আছে আমারা। নোটবুকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূত্র তুলতে তুলতে হাতের কিউকাম্বার স্যান্ডউইচে কামড় বসাচ্ছে। তার ঠিক পাশেই জারা। টেবিলের উপর দুপা তুলে দিয়ে মহারানীর ভঙ্গিতে হেডফোনের তালে তালে মাথা ঝাঁকিয়ে কোল্ড ড্রিংকসের বোতলে চুমুক দিয়ে চলেছে। তাকে ক্ষণে ক্ষণে লক্ষ্য করে আপনমনে হাসছে আমারা। জারার অবশ্য কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাতে। সে নিমজ্জিত আপন জগতে।
- সুইটি!
হঠাৎ টেবিলের উপর একটি হাত আছড়ে পড়ায় আমারা হতচকিত হয়ে মুখ তুলে তাকালো। দুজন ছেলেকে দেখতে পেলো। যমজ। রনি - বনি। সেকশন তেরেসায় আজ প্রথম ক্লাসেই আমারা এদের দৌরাত্ম্য টের পেয়েছে। তবে তারা তার কাছে কি চায়? আমারার নয়নে প্রশ্ন লক্ষ্য করে ঝুঁকে এলো বনি। একদম অনিয়ন্ত্রিতভাবে দুই আঙ্গুলে কিশোরীর চিবুক ছুঁয়ে টেনে টেনে সুরেলা আবেদনে বললো,
- ডেট মি, প্রিন্সেস!
এরা কার অনুকরণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বুঝতে মোটেও বেগ পোহাতে হলোনা কাউকে। মুহূর্তেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো চারপাশ। মাথা কাত করে সবাই ফিরে ফিরে দেখলো। আমারার চেহারা টকটকে হয়ে উঠলো।ঠিক ক্রোধে নাকি অপমানে নিজেও টের পেলনা। রনি পিছন থেকে তার চুলের ঝুঁটি টেনে আবেশিত কন্ঠে বলে উঠলো,
- তুই তো এসব করিস, তাইনা? সুন্দর ছেলে দেখলেই হুশ থাকেনা। আমরা কিন্তু ডাবল কম্বো! কনসিডার ইট প্রিন্সেস....
- উম হুম। উই লাইক ইউ সো মাচ!
বনি যুক্ত করতেই পাশে বসে থাকা জারা তেঁতে উঠলো। তবে সে কিছুই করতে পারলোনা। টেবিলের নিচে আমারার জোর হাতের চাপে সে নিজের জায়গায় থিতু হতে বাধ্য হলো। সকলে আশেপাশে ভিড় করে নাটক দেখছে। আমারা মুখ তুলে বনিকে দেখলো, তীর্যক হেসে শুধালো,
- ইউ লাইক মি? রিয়েলি?
বনি খানিক থতমত খেয়ে রনির দিকে ফিরলো। ভ্রু তুলে ঝুঁকে এসে আমারার কাঁধে দুহাত রেখে খানিকটা চেপে রনি ফিসফিস করলো,
- সন্দেহ আছে? ব্যাপার নয়। কিছুদিনেরই তো ব্যাপার বলো প্রিন্সেস? আমরা একসঙ্গে খুব মজা করবো, খুব!
- তোর মজা তোর পাওয়ার পয়েন্টে ঢুকিয়ে....
জারা দ্বিতীয় দফায় বি*স্ফোরিত হতে যাচ্ছিলো তবে আমারা হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোয় সে মাঝপথে থমকে গেলো। কিশোরী আলুথালু শরীরে টেবিল ঘুরে এসে রনি এবং বনির মুখোমুখি দাঁড়ালো। দুবাহু বুকে বেঁধে দুজনের দিকে জ্বলজ্বলে নয়নে তাকিয়ে বললো,
- বাহ্, আমি এতটা জনপ্রিয় আগে বুঝতে পারিনি। কলেজের একদম তাগড়া তাগড়া সুন্দর ছেলেগুলো আমাকে ডেট করতে চায়। কি সোনার কপাল নিয়ে জন্মেছি!
ভ্রু কুঁচকে এলো সকলের। আমারা সাধারণত শান্ত স্বভাবের। তার এমন বিপরীত কথা বলাটা বেখাপ্পা লাগলো অনেকেই কাছেই। বিশেষ করে জারার কাছে। আমারা ধীরপায়ে এগোলো রনি এবং বনির দিকে, যারা বিনা কারণেই পিছিয়ে চলেছে। কিশোরী দুহাত বাড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
- একি একি! পিছিয়ে যাচ্ছো কেনো তোমরা? গার্লফ্রেন্ডকে দেখে কেউ এভাবে ভয় পায়? চলো, আমরা আজকে, এই মুহূর্ত থেকেই ডেটিং শুরু করি। আমি রাজী!
একে অপরের দিকে চেয়ে ঢোক গিললো রনি এবং বনি। যেন অভিসম্পাত করলো নিজেদের। পরক্ষণেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো,
- সর ভুটকি!
উভয়ে দৌঁড় দিতে যাচ্ছিলো কিন্তু আমারা সটান নিজের ডান পা বাড়িয়ে মেঝেতে উল্টে ফেললো রনিকে। তারপরই সময় ক্ষেপল ছাড়াই ধপাস করে একেবারে রনির পিঠের উপর বসে পড়লো।
- আম্মুউহহহহহ!
- জাআআন! আমাদের মাঝে আবার শ্বাশুড়ি আম্মুকে ডাকছো কেনো? যাহ! কি লজ্জার ব্যাপার!
প্রচন্ড হাসিতে গোটা ক্যান্টিন রীতিমত ফে*টে পড়লো। একেকজন টেবিলে গড়াগড়ি দিয়ে পড়ছে দৃশ্যটি লক্ষ্য করে। পেটে খিল ধরে গিয়েছে অনেকের। আমারার ভারে মেঝেতে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছে রনি, কই মাছের মতন কাতরাচ্ছে। বনি একপাশের টেবিলের আড়ালে লুকিয়ে ভাইয়ের অবস্থা দেখে থরথর করে কাঁপছে। মধ্যখানে আমারা হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে মহারাণীর ভঙ্গিতে নিজের মানব আসনে আসীন হয়ে স্যান্ডউইচ চিবিয়ে চলেছে। অদূরে দাঁড়ানো জারা অজান্তেই নিজের বুকে অসামান্য এক উষ্ণতা অনুভব করলো। তার ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়লো বিস্তৃত এক হাসির ধারা।
মেঝেতে ক্রমাগত কিল ঘুষি হাঁকাতে হাঁকাতে রনি হেঁড়ে গলায় চিৎকার ছুঁড়লো,
- সর মা আমার, তোর দুটো পায়ে পড়ি বোন! আজকে থেকে তোকে আম্মু ডাকবো তাও তুই আমাকে ছেড়ে দে মা!
হাত ঝেড়ে মৃদু হাসলো আমারা, ঝুঁকে এসে রনির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো,
- ইউ নো হোয়াট রনি? একজন আমাকে বলেছিলো যে আমাকে বহনের ক্ষমতা এই দুনিয়ায় অতি ভাগ্যবান কিছু মানুষকেই দিয়েছেন খোদা। যার তার সাধ্য কি আমায় বহন করে?
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো রনি। নিঃশ্বাস আটকে এলেও কোনরকম প্রতিক্রিয়া করলোনা। আমারার কন্ঠ নমনীয় হলো, ক্ষীণ স্বরে কিশোরী জানালো,
- জীবনে আর যাই করো না কেনো, কারো অনুভূতি নিয়ে খেলার চেষ্টা করোনা। দিনশেষে হার তোমারই হবে।
উঠে পড়লো আমারা। দৃশ্যমানভাবে নিস্তেজ হয়ে রইলো রনি। কোনো জবাব দিলোনা। একপাশে লুকিয়ে থাকা বনি দ্রুত ছুটে এসে ভাইকে টেনে দাঁড় করালো। বেচারার মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তার ইউনিফর্ম ঝেড়ে মুছে একনজর তিক্ত নজরে আমারাকে দেখে বনি খেঁকিয়ে উঠলো,
- এর পরিণাম ভালো হবেনা!
- আয়, তোর উপরেও একবার বসি!
আমারার কথায় ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে মুহূর্তে হতবিহ্বল রনিকে টানতে টানতে নিয়ে বনি সকলের দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেলো। সবার হাসাহাসি তাতে আরো তুঙ্গে উঠলো, প্রচন্ড গুঞ্জনে গুঞ্জরিত হতে থাকলো সমগ্র স্থান। আমারা নিজের ইউনিফর্ম ঝাড়তে ঝাড়তে নিজের টেবিলে ফিরে এলো। জারার দিকে নজর পড়তেই দেখলো মেয়েটা একদৃষ্টে তার উদ্দেশ্যে চেয়ে আছে। মুচকি হাসলো আমারা,
- কি হয়েছে?
জারা কোনো উত্তর করলোনা। দুপা এগিয়ে দুবাহুর মাঝে আমারাকে একপ্রকার জাপটে ধরলো সজোরে। খিলখিল করে হেসে ফেললো কিশোরী, বান্ধবীকে পাল্টা জড়িয়ে ধরে শুধালো,
- ডব্লিউ ডব্লিউ ই চ্যাম্পিয়নশিপ কেমন লাগলো?
- প্রাউড অব ইউ গার্ল!
জারার কণ্ঠের বিপরীতে আরেক দফায় কোমল হাসলো আমারা।
━━━━━━━━━━━━━
কলেজ ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। এর মধ্যেই চারপাশ প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। রনি এবং বনি এগিয়ে যাচ্ছে বারান্দা বেয়ে। দুইজনের একই গাঁথুনির চেহারায় ক্রোধের কুঞ্চন। ক্যান্টিনের ঘটনার পর থেকে আমারার বদলে তারাই হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। সেই নিয়ে উভয়ে বেশ ক্ষেপে আছে। রনির এখনো পেট, পিঠ, বুক সবই ব্যথা করছে। বনি খানিক বাদে বাদে তার পিঠ ডলে দিচ্ছে।
- এর শোধ না তুলে আমি ছাড়ছি না!
দাঁতে দাঁত পিষে আপনমনে বিড়বিড় করলো রনি। বনি সম্মতিসূচক সায় জানালো। তারপর উভয়ের পথই অতর্কিতে থমকে গেলো। স্থবির হয়ে তাকালো তারা সামনে।
বারান্দার একদম শেষ প্রান্তে থামের সঙ্গে হেলান দিয়ে দন্ডায়মান এক অস্তিত্ব। ইউনিফর্ম আলগোছে ঝুলছে কাঁধের দুপাশে, টাই ঢিলে হয়ে নেমে এসেছে বুক অবধি। চুল উস্কখুস্ক, গালের উপরে ছোট্ট একটি বাটারফ্লাই ব্যান্ডেজ। নিজের হাতে কয়েকটি নুড়ি পাথর নিয়ে খেলছে। হাওয়ায় ছুঁড়ে দিচ্ছে, আবার মুঠো পাকিয়ে ধরছে। অজান্তেই শিউরে উঠলো উভয় যমজ।
কলেজের কুখ্যাত, সুনামি দোহা!
মাথা কাত করে অসম্ভব শীতল এক দৃষ্টিতে তাদের দেখলো দোহা। ঘুরে দাঁড়ালো। হাতের নুড়িগুলো মুঠো পাকিয়ে তীর্যক হাসলো। মধ্যাহ্নের সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে যা দেখালো একইসঙ্গে স্নিগ্ধ এবং অপূর্ব। একে অপরের দিকে তাকালো রনি এবং বনি। নয়নজুড়ে শঙ্কা। দোহা নিঃশব্দে একটি নুড়িপাথর তুলে ধরলো। তারপর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটি তীক্ষ্ণ আস্ফালনে ছুঁড়ে দিলো সামনে। তীব্র বেগে ছুটে গেলো সেটি, ভেদ করলো মোক্ষম নিশানা, আছড়ে পড়লো বনির কপাল বরাবর।
- আহ্হঃ!
মাথা চেপে ধরে মুহূর্তেই মেঝেতে উবু হয়ে বসে পড়লো বনি। আতঙ্কিত রনি নিজের ভাইকে জাপটে ধরলো। কাঁপতে কাঁপতে লক্ষ্য করলো কপাল ফে*টে জেগে ওঠা র*ক্তাভ ক্ষ*ত।
- কু*ত্তার বাচ্চা!
রনি প্রচন্ড হুংকারে খেঁকিয়ে উঠলেও লাভ হলোনা। আরো একটি নুড়ি ছুটে এলো, রীতিমত বু*লেটের গতিতে। আ*ঘাত হা*নলো বরাবর তার তলপেটে। শরীর গুলিয়ে উঠল যেন। উবু হয়ে পড়লো সে পেট চেপে ধরে। দুই ভাই একে অপরকে কি সামলাবে, তারা আপন আপন যন্ত্রণায় কাহিল। দোহা ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। তার হাতে এখনো দুটি নুড়িপাথর অবশিষ্ট আছে, যা বিপদজনক গতিতে সে শূন্যে ছুঁড়ে আবার ক্যাচ ধরছে। দুই যমজের মুখোমুখি এসে থামলো সে। উবু হয়ে বসলো। উভয়ে ভীষণ শীতল ক্রোধ এবং ভয় মিশ্রিত জ্বলজ্বলে চোখে দেখলো তাকে। দোহার অধরজুড়ে দ্বিগুণ বিস্তৃত এক হাসির উৎপত্তি ঘটলো। রনির কলার মুঠো করে ধরে এক টানে নিজের মুখের সামনে ধরে সে হিসহিস করে উচ্চারণ করলো,
- শি ইয অনলি মাই প্রিন্সেস, গট ইট?
- শালা...
সহসাই রনির চিবুক চেপে ধরলো দোহা। এতটা শক্তিতে যে ব্যথায় চোয়াল ঝনঝন করে উঠলো বেচারার। গুঙিয়ে উঠলো সে। বেপরোয়া দোহা হিংস্র দৃষ্টিতে চেয়ে রীতিমত হুমকি দিলো,
- ওর দিকে দ্বিতীয়বার চোখ তুলে তাকালে তৃতীয়বার তাকানোর জন্য তোর আর কোনো চোখ অবশিষ্ট থাকবে না!
প্রচন্ড ঝটকায় রনিকে ঠেলে দিলো, হুড়মুড় করে বনির গায়ে আছড়ে পড়লো সে। হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো দোহা, তীব্র নয়নে অন্তিম বারের মতন বললো,
- আমার প্রিন্সেসকে আর একটাবার ছুঁয়ে দেখ, জেনে যাবি মৃত্যুর স্বাদ কেমন হয়!
সটান রনি বনির গায়ে পা দিয়ে মোক্ষম এক ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেললো দোহা। তারপর তাদের অতি অবহেলায় টপকে নির্দ্বিধায় হেঁটে হেঁটে সে আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার। পিছনে হতবিহ্বল পরে রইলো রনি এবং বনি।
দোহা দ্রুতই বারান্দা পেরিয়ে ক্লাসের দিকে ছুটলো। ব্যাগটা সে রেখেই এসেছে। তবে ফাঁকা গ্রাউন্ড ফ্লোরে থামলো তার পদক্ষেপ। নাকের ভেতর কেমন জ্বালাতন করছে। অসহনীয় লাগছে। একপাশের দেয়ালে লাগোয়া সিংকের দিকে এগোলো সে। পানি ছাড়তে ছাড়তে অনুভব করলো নাক বেয়ে উষ্ণ কিছু গড়িয়ে নামছে। হাত দিতেই চটচটে তরলের উপস্থিতি টের পেলো। মুখের সামনে ধরতেই যেন বি*দ্যুৎস্পৃষ্ট হলো সে।
তার দুই আঙ্গুলে লেপ্টে আছে র*ক্ত।
ঝট করে আয়নায় চোখ পড়লো। নাক বেয়ে ঠোঁটের উপর গড়িয়ে নামছে ক্ষীণ র*ক্তধারা। কোনো অনুভূতি হলোনা দোহার। একটি ঢোক গিললো শুধু। হাতটা ধুয়ে নিয়ে পানি ছিটালো মুখে। নাকের র*ক্তটুকু পরিষ্কার করে পাশের বাক্স থেকে টিস্যু টেনে নিয়ে ভালোমত মুছলো। তারপর সিংকে দুহাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ কতক নিঃশ্বাস ফেললো। শরীর কাঁপলো তার সামান্য। সংক্ষিপ্ত মেডিটেশনে নিজেকে স্থির করলো সে। তারপর যথারীতি উষ্কখুষ্ক চুলে হাত বুলিয়ে, ইউনিফর্ম এবং শার্ট ঠিকঠাক করে উল্টো ঘুরে হেঁটে চললো ক্লাসের দিকে। যেন কিছুই হয়নি।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোহা দুইতলায় আড়াল হয়ে যাওয়ার পর দেয়ালের অপর পাশ থেকে বেরিয়ে এলো আমারা। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ তার। নয়নের স্থির দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত সিঁড়ির উপরে, যেখানে মাত্রই আড়াল হয়ে গিয়েছে দোহার অবয়ব।
—চলবে—