#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২২
পর্ব ২২: [ পর্দার অন্তরালে ] - ( প্রথমাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
দোহার ঠিক মনে নেই, তার কত বছর বয়স থেকে তাদের সাজানো গোছানো সংসারটা তছনছ হয়ে যেতে আরম্ভ করেছিলো।
ঠিক অভিজাত এলিট ক্লাসের অংশ না হলেও বাবুল ইসলামের প্রভাব প্রতিপত্তি নেহায়েত কম কিছু ছিলোনা। দেশের অন্যতম ধনাঢ্য এক ব্যক্তির অ্যাসিস্টেন্ট হওয়ার সুবাদে তার সম্পদ, অর্থ কিংবা সক্ষমতার কমতি হয়নি কোনোদিন। বেশি ভালো থাকলে বোধ হয় মানুষের নজর পড়ে। তার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা হয়েছিল অনেকটা তেমন। মা*রাত্মক এক নেশায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। জুয়ার নেশা। কুখ্যাত সব ক্যাসিনোতে ভদ্র পোশাকের আড়ালে থাকা অভিজাত কুলাঙ্গারদের দলে ভিড়ে জীবনের খেই হারিয়ে ফেলেন নিমিষেই। একে একে নিজের স্বাস্থ্য, সম্পত্তি সবকিছুই হারাতে শুরু করেন। স্ত্রী শায়লার সহস্র চেষ্টাও তাকে ফেরাতে পারেনি নিশ্চিত ধ্বংসের পথ থেকে।
অতঃপর যা হওয়ার তাই হয়। নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি থেকে দোহাদের ঠাঁই হয় ভাড়া বাড়িতে। বয়সে তখন সে বেশ ছোটই। অভাব কি বুঝতে না শিখলেও ততদিনে মধ্যবিত্তের কাতারে নেমে জীবনের কষ্টকর দিকগুলো শিশুসুলভ রঙিন দৃষ্টি মেলে আবিষ্কার করতে শুরু করে। বাবুল নিজের কাজ, অর্থ, প্রতিপত্তি, সম্পদের অধিকাংশ খুঁইয়ে তখন দিশাহারা পথিক। তবুও হয়তো বা স্ত্রী সন্তানের মুখ চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, পরিশ্রম করছিলেন আরো একবার সবকিছু হাসিলের। ঠিক এমন একটা সময়েই তার জীবনে আগমন শবনমের।
শবনম শায়লার ছোট বোন। জন্মগতভাবেই শায়লা ছিলেন অপেক্ষাকৃত দূর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী। প্রায়শই নানারকম অসুস্থতা বেঁধে থাকতো। সেই সুবাদে ছেলেমেয়েদের দেখভালের বাহানায় শবনমের বোনের বাড়িতে যাওয়া আসা ছিলো অবাধ। দোহা এবং দিয়ারও খুব প্রিয় খালামণি ছিলেন তিনি। কোনোদিনও একফোঁটা আঁচ আসেনি বোন - বোন, শালী - দুলাভাইয়ের সম্পর্কের মাঝে। নিজের বোনকে রীতিমত অন্ধের মতনই বিশ্বাস করতে শায়লা। এই বিশ্বাসই যেন একদিন তার কাল হয়ে দাঁড়ালো।
আর্থিক অবস্থা পড়ে আসার পর থেকেই সর্বদা দাম্পত্য কলহ লেগে থাকতো শায়লা এবং বাবুলের মাঝে। উভয়েই নিজেদের জীবনে ছিলেন ভীষণ অখুশি। বিলাসিতায় অভ্যস্থ শায়লা নতুন মধ্যবিত্তের জীবনে একপ্রকার সংগ্রামই করতেন। আরো নানা বিষয়ে তিনি ছিলেন অখুশি। তেমনটাই বাবুলও। স্ত্রীর চাহিদা তার সহ্য হতনা। সেই সময়টায় তাকে সান্ত্বনা জানাতো শবনম। মেয়েটার “ভাইজান ” ডাকের মাঝে যেন জাদু ছিলো। পুরুষ হৃদয় মুহূর্তেই মোহিত হয়ে পড়ে যাতে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। শায়লার সঙ্গে সংসার বর্তমান থাকাকালীনই তিনি অ*বৈধ সম্পর্কে জড়ান শবনমের সঙ্গে। দীর্ঘদিন গোপন থাকার পর কলহের তুঙ্গে তা বিদ্যুৎ ঝলকের মতনই সামনে আসে শায়লার।
অতঃপর, একটি সংসার ভেঙে দুই টুকরো হতে সময় লাগেনি। শায়লা এবং বাবুলের ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর শবনমকে বিয়ে করেন তিনি। অপরদিকে বছর দুয়েক বাদে শায়লাও জড়ান নতুন সম্পর্কে। বাবুলকে ছেড়ে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়েছিলেন। সেখানকারই এক সহকর্মী মাহিন উদ্দিনের সঙ্গে সংসার পাতেন নতুনভাবে।
দোহা এবং দিয়া?
কেউ তো তাদের জিজ্ঞেস করেও দেখেনি তারা কি চায়!
যেহেতু শায়লার ছেলেমেয়েদের ভরণ পোষণের ক্ষমতা ছিলো না, সেহেতু বাবুলের সঙ্গেই থাকতে শুরু করে তারা। বছর ঘুরতে শুরু করে একে একে। যে দোহা একটা সময় ছিল খালার চোখের মণি, সেই পরবর্তীতে কোনোভাবে হয়ে উঠে তার চোখের বিষ! বাবুলের এককালে সক্ষমতা ছিলো, ছেলেমেয়েদের তিনি সেটা উজাড় করে দিতেন। সেই সুবাদে দিয়া এবং দোহা উভয়ের পড়াশোনাই সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে। কিন্তু নতুন বিয়ের পর অতিরিক্ত খরচ অজুহাত দেখিয়ে বাবুল দোহাকে ছাঁটাই করে ফেলেন, শবনমের অনুপ্রেরণায়। দিয়াকে একপ্রকার ভালোবাসতেন তিনি, তাই শুধু মেয়ের আভিজাত্যের জীবনের দায়িত্ব যেকোনো প্রকারে নিতে তিনি রাজী ছিলেন। দোহাকে অবহেলার আরেকটা কারণ অবশ্য ছিলো। শায়লার পছন্দের সন্তান ছিল দোহা, মায়ের নেওটা যাকে বলে। তাকে দেখলেই শায়লার কথা মনে পড়ে যেত বাবুলের, অন্তর সহ্য করতে পারতোনা কিছুতেই।
দোহার প্রতি পারিবারিক অবহেলা দিয়া মেনে নিতে পারেনি। নিজে যা যা পেয়ে বড় হয়েছে, দোহাকেও তাই তাই দিতে বদ্ধপরিকর ছিলো সে। বেশ অনুনয় বিনয় করেই দোহার পড়াশোনা বর্তমান রাখে সে। এরপর একটা সময় শবনম বাবুলের সংসারে আসে ফায়াজ। এরপর আমূল পরিবর্তন ঘটে যায় সবকিছুর।
দোহার প্রতি চরম অবহেলা, অবজ্ঞা এবং অত্যাচারের পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রথমটায় হতবিহ্বল হলেও শবনমের আচরণের কারণ ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে দিয়া। বাবুলের সম্পত্তির ভাগীদার দোহা, প্রথম ছেলে সে, অপরদিকে ফায়াজ দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। সবদিক দিয়েই দোহা ছিলো শবনমের পারিবারিক সুখের পথে বাঁধা। তাই বাবুলের কানভারী করতে থাকেন তিনি একটু একটু করে সময় নিয়ে, স্থায়ীভাবে। দোহা নিজের বাবার দৃষ্টিতেও হয়ে উঠে অসহনীয়। তার উপর ছেলেটা প্রথম থেকেই শবনমকে একদমই সহ্য করতে পারতোনা। যে মুহূর্তে শবনম তার খালা থেকে মা হয়েছেন, সেই মুহূর্ত থেকেই দোহার ভীষণ ক্রোধ এবং আক্রোশের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শবনম। উভয়ের মাঝে সবসময়ই নানা বিষয়ক কলহ লেগেই থাকতো। সবটা মিলিয়ে সাংসারিক এক খলনায়কে রূপান্তরিত হয় দোহা, বাবুলের বখে যাওয়া এক মাস্তান ছেলে।
একটা সময় দোহার ভরণ পোষণের সবকিছুই বন্ধ করে দেন বাবুল। নিজের ভাইকে দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখা দিয়ার জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। কাজ জোগাড় করে সে, বাবাকে জানায় দোহার পড়ালেখা এবং অন্যান্য সংক্রান্ত সকল দায়িত্ব সে নেবে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কোনো জবাব দেননি বাবুল, তবে মানাও করেননি। সেই থেকে দোহার জীবনে এক নতুন পথচলা। সেন্ট পিটার্সবার্গ ছাড়তে ছাড়তেও বেঁচে যায় সে, শুধুমাত্র নিজের বোনের উৎসর্গের কারণে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, নিজের পড়াশোনা চালিয়ে, চাকরি করে, টিউশন করে দোহাকে অভিজাত ওই প্রতিষ্ঠানে পড়াতে থাকে দিয়া। যেহেতু শায়লা নেই, সে নিজেকেই দোহার মা মনে করতো। তার একটাই স্বপ্ন ছিলো, যে প্রতিষ্ঠান থেকে সে নিজে পড়ালেখা করেছে, দোহাও সেখান থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল নিয়ে পাশ করে বের হবে। তারপর একদিন না একদিন সুখ আসতে তো বাধ্যই, তাইনা?
দোহা নিজের স্বপ্ন, শখ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে অন্যের স্বপ্ন পূরণ শুরু করে। নিজের চোখে দেখত, বোনটা তার জন্য কোন পর্যায় অবধি যাচ্ছে। সহ্য হতো না তার। পড়ালেখার পাশাপাশি তাই অপরিণত বয়স থেকেই সে টুকটাক কাজ করতে শুরু করে। ডেলিভারি বয়, কখনো বা দোকানের সহযোগী, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালামাল বহনের মতন কাজও সে করেছে। এসবের কিছুই দিয়া জানতো না, সে ছিল দোহার কাজের ঘোর বিরোধী। দোহা শুধুই পড়াশোনাতে মনোযোগ দেবে, নিজের জীবন উপভোগ করবে এটাই ছিলো বোনের চাওয়া। কিন্তু দোহা পারেনি। ধীরে ধীরে বোনের কাছে মিথ্যা বলতে শুরু করে সে। টাকার প্রয়োজন পাঁচ হাজার হলে সে বলতো তিন হাজার। বাকিটা আসতো নিজের কাজ থেকে। এভাবে যতটুকু পারা যায়, নিজের জীবন চালাতে শুরু করে সে। সেন্ট পিটার্সবার্গের দুনিয়ায় মিথ্যা আভিজাত্যের আড়ালে ঢেকে নেয় সে নিজেকে, যেন কেউ কোনোদিন তার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাতে না পারে।
ভাগ্যের ক্লেশের কোনো শেষ নেই। এর মধ্যেই শায়লার শরীরে ধরা পড়ে ম*রণব্যাধি ক্যা*ন্সার। যদিও দোহা কিংবা দিয়ার কারোরই কোনোপ্রকার বাধ্য বাধকতা ছিলোনা, তবুও জন্মদাত্রীর প্রতি নাড়ির টান অগ্রাহ্য করার সাধ্য কার? শায়লার স্বামী মাহিনের উপার্জন খুব বেশি ছিলো না, তবুও নিজের স্ত্রীকে তিনি ছাড়েননি। সম্পত্তি বিক্রি করে, একপ্রকার নিঃস্ব হয়েই তিনি চিকিৎসা জারি রাখেন। দিয়াও টুকটাক সাহায্য করতো তাকে আড়ালে। দোহা তখন থেকে উপার্জন বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করতে শুরু করে। একটা দুটো পার্ট টাইম জব পরিণত হয় পাঁচ পাঁচটি কাজে। সারাটা দিন ক্লাস, পড়াশোনা। বিকাল থেকে এখানে ওখানে চাকরি। রাতের বেলায় ব্যান্ডদলের শো। গভীর রাতে ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে উঠে, ভোররাতে হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করে আবার ক্লাসে ছোটা। এভাবেই চলছিল দোহার জীবন।
অতঃপর তার সেই ভাঙাচোরা, জোড়াতালি দেয়া জীবনে এলো আমারা.....
বদলে গেলো সকল হিসাব।
বারান্দার প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুদূর দিগন্তের উদ্দেশ্যে চেয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে ভেবে শুধু এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব হলোনা দোহার পক্ষে।
প্রায় তিন মাস পেরিয়েছে চোখের পলকেই। বন্ধু বান্ধব, ভালোবাসা, মায়া, পরিবারহীন এক নিঃসঙ্গ একলা জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে দোহা। নিজেকে কাজ এবং পড়াশোনায় নিমজ্জিত করেই ভুলে থাকতে চেয়েছে সকল না পাওয়াদের। কলেজের সবাই তাকে হাঁটতে দেখে, খেলতে দেখে, হাসতেও দেখে। কিন্তু সে যে নিজের অস্তিত্বের একটা ফাঁকা খোলসমাত্র সেটা বোঝে এমন মানুষ হাতে গোণা। কিংবা রয়েছে কিনা সন্দেহ।
একাদশ শ্রেনীর ফাইনাল পরীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে গতকাল। গোটা কলেজ মেতে আছে উৎসবের আমেজে। সামনে এক সারিতে বহু অনুষ্ঠান। নবীন বরণ, সিনিয়রদের বিদায়। সবকিছু মিলিয়ে কলেজ থেকে ডরম অবধি জমজমাট। ছুটির সুযোগ থাকলেও কেউই নিজেদের বাড়িতে যাচ্ছেনা। শিক্ষার্থীরা সময় কাটাচ্ছে কাজেকর্মে, আয়োজনে। তারও আগে আজ একাদশের সবাই কলেজের হলে একটা পার্টি রেখেছে। পরীক্ষার শেষে আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্যে। বিস্তর ব্যস্ত সবাই সকাল থেকেই। হল সজ্জিত হয়েছে বেলুন আর ফুলে। মেয়েরা একে একে আসতে শুরু করেছে। তারা নিজেদের ড্রেসকোড রেখেছে শাড়ী। অভিজাত দুলালীরা ভীষণ উত্তেজিত তাই নিয়ে। ছেলেরাও ইতোমধ্যে দর্শকসারি এবং ব্যাকস্টেজে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের অবশ্য এত খেয়াল খুশি নেই। ড্রেসকোড স্যুট রাখা হলেও একেকজন এসেছে যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতার মতন সেজে।
দোহা রেলিংয়ে ঝুঁকে আশেপাশের সবার কাজকর্ম দেখতে থাকলো। পরনে একটা ঢোলা সাদা শার্ট এবং খাঁকি প্যান্ট। তাকে গান গাইতে অনুরোধ করা হয়েছিল, সাফ সাফ মানা করে দিয়েছে। জীবনের সকল কিছু থেকেই ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সে। বুকে দুবাহু ভাঁজ করে অদূরে দেখলো সে। হলের স্টেজের উপর শেষ মুহূর্তের প্র্যাকটিস করছে অনিক, জিই - শু সহ আরো কয়েকজন। তারা ড্যান্স পারফরমেন্স করছে। রাজীব স্টেজের নিচে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল চোখে বন্ধুদের দেখছে। একেকজন ভীষণ হাসাহাসি করে লুটিয়ে পড়ছে একে অপরের মাঝে। পরিহাসের এক নির্মম হাসি ফুটলো দোহার অধরজুড়ে। সে বর্তমানে ভিন্ন কেউ, অনিক - রাজীবদের জগতে যেন কোনোদিন তার অস্তিত্বও ছিলোনা।
হঠাৎ করেই ভীষণ গুঞ্জনে দোহার জ্বলজ্বলে দৃষ্টি এককালের প্রাণের বন্ধুদের উপর থেকে সরে করিডোরে ফিরে এলো। সকলে হতবাক হয়ে একদিকে তাকিয়ে আছে। বিস্মিত প্রত্যেকের চেহারা, যেন ভূত দেখেছে। তাদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই দোহাও হতবিহ্বল হয়ে গেলো। করিডোর ধরে এগিয়ে আসছে জারা। পরনে....
শাড়ি!
যে মেয়েকে কোনোদিন সালোয়ার কামিজে অবধি দেখা যায়নি তার ফিনফিনে অঙ্গে জড়ানো শুভ্র সাদা বর্ণের শাড়ী সকলকেই বিস্ময়ের চূড়ান্ত প্রান্তে নিয়ে ছাড়লো। জারা নিজেও যে বেশ বিব্রত তা তার মুখাবয়বে টের পাওয়া যাচ্ছে। চাপা বর্ণের ত্বকজুড়ে শ্যাম সৌন্দর্য, দুহাতে জড়ানো কালো কাঁচের চুড়ি। কাঁধসমান চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে একটা ডালিয়া গুঁজে দেয়া। শাড়ির কুচি চেপে ধরে হনহন করে এমন এক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে যেন এই বুঝি কারো উপর হামলে পড়ে! জারাকে দেখেই দোহার বুকের ভেতরটা ওই একটা অস্তিত্বকে দেখার বাসনায় হাহাকার করে উঠলো।
মেয়েদের ড্রেসকোড শাড়ি। জারা অবধি পড়েছে, আমারা কি পড়বে না? প্রথমবারের মতন তাকে ওই লাজুক বস্ত্রে দেখার সৌভাগ্য হবে কি দোহার?
জারা হলে ঢুকতেই কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরলো।
- আরে তুই...
- এই সামনে থেকে সর সর সর! একটা ঘুষি মেরে নাকটা ফা*টিয়ে দেবো! সর!
যেন তার পরিধানের বস্ত্র সম্পর্কে একটা শব্দও শুনতে নারাজ জারা। সবাইকে রীতিমত ঠেলেঠুলে বিতৃষ্ণ ভঙ্গিতে হলে প্রবেশ করলো সে। প্রচন্ড রকমের অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রফেসরের জোরাজোরিতে এবং খুব সম্ভবত আমারার তালে সে এক মঞ্চনাটকে দুই মিনিটের একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজী হয়েছে। সেই প্র্যাকটিস সারতেই দ্রুত সে ব্যাকস্টেজে ঢুকে গেলো।
দোহা কিছুক্ষণ একদৃষ্টে লক্ষ্য করলো গোটা দৃশ্যটি। তারপর পায়ে পায়ে সরে এলো। অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনো চল্লিশ মিনিটমতন বাকি আছে। কলেজের গ্রাউন্ড পেরিয়ে সে অজান্তেই একটুখানি শান্তির খোঁজে পৌঁছালো লেকের পাড়ে।
শনশনে হাওয়া, আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘেদের দল। টলটলে লেকের পানিতে সাঁতরে বেড়ানো এক যুগল রাজহাঁস, তাদের পাশেই প্রতিফলিত দিবাকরের স্বর্ণালী প্রতিচ্ছবি। দোহা ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো যেন স্বপ্নের মতন সুন্দর জগৎটায়। পায়ের তলায় শুকনো পাতা মাড়িয়ে এগোলো। তার পদক্ষেপ থমকালো একপাশের বেঞ্চিতে নজর পড়তেই।
মনে হলো যেন অন্তরজুড়ে শিরশিরে এক অনুভব ছড়িয়ে পড়েছে। তিরতির অজানা তরঙ্গ পরিপূর্ণ করে তুললো প্রতিটি দেহকোষকে। বেঞ্চিতে বসা আমারা। আলুথালু শরীরে জড়ানো ওই নীল শাড়ি। উজ্জ্বল ত্বকে আবৃত দুহাত ভর্তি গাঢ় নীল কাঁচের চুড়ি। দুই কানে ঝুলন্ত ঝুমকো, ব্যাঙসকাট চুলগুলো ছেড়ে রেখে পিছনে ঝুলিয়ে দেয়া বেলীর গাজরা। পাতলা অধরজুড়ে গোলাপ বর্ণের লিপস্টিক। ফোলা দুগালজুড়ে সহজাত উজ্জ্বল লালিমা। ক্ষণিকের জন্য দোহার গোটা জগৎ যেন ঘূর্ণন বন্ধ করে থমকে গেলো।
ঢিপঢিপ! ঢিপঢিপ!
হৃদস্পন্দন শোনা গেলো নিজের কানেই। স্তব্ধ দোহার বেহায়া নজর বয়ে চললো কিশোরীর অবয়বজুড়ে, গলার অলংকারে, কব্জির চুড়ির গোছায়। একটি নোটবুক কোলের উপর রেখে কি যেন টুকে চলেছে সে। মনোযোগে শিথিল আঁখিজোড়া।
দোহার নিগূঢ় নজরের ভার অনুভব করেই যেন আমারা অতর্কিতে মুখ তুলে তাকালো। মুখোমুখি হলো গভীর এক অমীমাংসিত দৃষ্টির। অনতিবিলম্বে নিজের চোখ সরিয়ে নিলো দোহা। তাকালো ভিন্নপাশে। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো। আমারা তাকে কিছুই বললোনা। মাথা নুইয়ে নিজের নোটবুকে তাকালো।
অত্যন্ত বাজেভাবে ব্রেক আপের পর আজ পর্যন্ত আমারা দোহার সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। আজও বলবে না।
দোহা এগোলো লেকের দিকে। রাজহাঁস দুটো তীরের দিকে ফিরে আসছে। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে সকালের আধখাওয়া পাউরুটির প্যাকেটটা পেলো দোহা। সেটি বের করে উবু হয়ে বসে পড়লো লেকের পাড়ে। নোটবুকে মুখ রেখেই আড়চোখে তাকে দেখে গেলো আমারা।
- রাজহাঁস জীবনে একবারই ভালোবাসে।
লেকের পানিতে ভেসে বেড়ানো দুই রাজহাঁস সঙ্গীর উদ্দেশ্যে পাউরুটির কিছু টুকরো ছিটিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে জানালো দোহা। অদূরে বেঞ্চিতে বসে থাকা আমারা নিঃশব্দে শুনে গেলো শুধু, তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে কোনো সন্দেহ নেই। সে নীরবে দেখে গেলো প্রাক্তনের কর্মকান্ড। রাজহাঁসদুটো এগিয়ে এসে পানিতে ভাসতে থাকা পাউরুটির টুকরোগুলো লম্বাটে ঘাড় বাড়িয়ে তুললো। নব্য এক খেলায় মেতে উঠল যেন। বিনা কারণেই একটি অপরটির দিকে ঝুঁকে এসে গলায় গলা মিলিয়ে দিলো। দৃশ্যটি অভূতপূর্ব। চোখ ফিরিয়ে নেয়া দায়।
দোহা হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পকেটে দুহাত পুরলো। মৃদু হাসলো। স্বচ্ছ পানিতে প্রতিফলিত হওয়া আমারার নীল আকাশরাঙা শাড়ি জড়ানো অবয়বে সম্মোহিত দৃষ্টি তার। পানির মাঝে যেন ভাসছে এক টুকরো আকাশ।
- তুমি সেই রাজহাঁস, কিশোরী।
দোহার নরম কণ্ঠের বিপরীতে আমারা অজান্তেই দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলো। এক অজানা কাঁপন খেলে গেলো অন্তরে। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে, তাকালো ভিন্নদিকে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মনোমুগ্ধকর হাসি ফুটলো দোহার। বুকের মাঝে ভেসে ওঠা বিষাদের ভার চেপে সে বললো,
- কিন্তু আফসোস, আমি সড়কের এক সাঁতার না জানা নোংরা নেড়ী কুকুর।
অজান্তেই নোটবুক বুকে চেপে ধরলো আমারা। আঙুলগুলো খামচে বসলো পৃষ্ঠার ভাঁজে। ভ্রু কুঁচকে এলো, ঠোঁটে চেপে এলো ঠোঁট। এ কেমন আবেদন? যাতনার করুণ গাঢ়ত্ব! স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো দোহা, বেঞ্চিতে বসে থাকলো আমারা। মন্থর হাওয়া উভয়ের অবয়বে শীতলতার ছোঁয়া দিয়ে গেলো। সঙ্গে এক নীরব অধিশ্বাস।
。
。
。
অনুষ্ঠান আরম্ভ হতে আর মাত্র মিনিট পনেরো বাকি। কিন্তু আমারার দেখা নেই। মেয়েটা কি এখনো লেকের ধারেই বসে আছে? এদিকে সে একলা হাজার হাজার কৌতূহলী দৃষ্টি মোকাবেলা করছে! জারা খানিক বিচলিত এবং বিব্রত হয়েই ব্যাকস্টেজ ছেড়ে বাইরে বেরোলো। এগিয়ে গেলো করিডোর ধরে। এই শাড়িটা একটা জ্বালাতন! যদি না আমারা কল করে জাইনকে শুদ্ধ নিজের দলে টেনে একপ্রকার তার কান ঝালাপালা না করতো, তবে জিন্দিগিতে এসবে নিজেকে জড়াতনা সে।
- আপদ!
আপনমনে বিড়বিড় করে এগোতে থাকলো জারা। শুধু কুচিটা না খুললেই হয় এবার! তার বিতৃষ্ণা খচিত চেহারা ফুলেফেঁপে আরো ক্রোধান্বিত হলো যখন সে খেয়াল করলো পাক্কা এক মিনিট যাবৎ অনিক নামক ওই চিটারের নিমকহারাম বদমাশ দোস্তটা তাকে পিছন থেকে অনুসরণ করছে! লোকানোর চেষ্টাও করছে না বান্দা। পায়ে পায়ে জারার পিছনে হাঁটছে। আশেপাশে একজন দুইজন উঁচু নজরে দেখছে তাদের। জারা থামলো, পিছনে থেমে গেলো অনিকও। কিশোরী আবার এগোতেই সেও এগোলো! কি অদ্ভুত!
“ ওটার মাথা আজকে না ফা*টালে আমি দুইদিন চুইংগাম চিবাবো না! ”
মনে মনে বদ্ধপরিকর জারা করিডোর পেরিয়ে ফাঁকা ফ্লোরে আসতেই সটান উল্টো ঘুরে মুখোমুখি হলো অনিকের। বেচারা আরেকটু হলেই তার সঙ্গে ধাক্কা লাগতে লাগতে থেমে গেলো, ঠিক ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া রেসিং কারের মতন। বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালো জারার উদ্দেশ্যে সে।
- যদি না চাস তোর পরিবার মা*র্ডার কেইস কোর্টে তুলুক, তবে এক্ষুণি আমার চোখের ত্রিসীমানা থেকে দূর হ!
জারার ক্ষিপ্ত হুমকির বিপরীতে অনিকের চেহারা টকটকে হয়ে উঠলো। ক্রোধে নয়, এক ভিন্ন অনুভূতিতে। তাতে জারা বেশ বিস্মিত হলো। ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো কারণে সে লজ্জিত, কিছু বলতে চাচ্ছে তবে মুখ ফুটে বলতে পারছেনা। জারা একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ক্রোধ দমিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- আমাকে ফলো করছিস কেনো?
অনিক ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো। মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো। কেউ নেই নিশ্চিত হওয়ার পরেই সে নিজের পরনের শার্টের উপরের ব্লেজারটা খুলে নিলো। কোনরকম কথা ছাড়াই জারার কাঁধের উপর সেটি ছড়িয়ে দিলো। ব্লেজারটি ঢেকে ফেললো একেবারে জারার হাঁটু অবধি। বি*স্ফারিত নয়নে অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো জারা। একটি শক্ত ঢোক গিলে ভীষণ বিব্রত এক মৃদু কন্ঠে অনিক জানালো,
- তো... তোর শাড়িতে...কিসের যেন দাগ লেগে আছে।
স্তব্ধ হয়ে রইলো জারা। বি*দ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে যেন! অনিক চোখ এদিক সেদিক সরিয়ে ঘাড় ডলতে ডলতে বললো,
- ব্যাকস্টেজের মেয়েগুলো হাসাহাসি করছিলো, তাই কোনো মেয়েকে বলিনি। তুই...
অনিক কথাটা শেষও করতে পারলোনা। জারা উল্টো ঘুরে দৌঁড় দিলো রীতিমত। বিহ্বল হয়ে থেকে অজান্তেই তার পিছু নিলো অনিক। জারা সোজা রেস্টরুমে ঢুকলো। আশেপাশে কোনো মেয়ে নেই নিশ্চিত হয়ে অনিক ভেতরে প্রবেশ করলো। বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়ালো। মিনিটখানেক নীরবতা। তারপর অনিক সামান্য নক করে জিজ্ঞেস করলো,
- তোর কি কিছু লাগবে?
প্রথম কয়েক সেকেন্ড কোনো জবাব এলোনা। তারপর জারার অপ্রত্যাশিত ক্ষীণ কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
- ব্যাকস্টেজে আমার হ্যান্ডব্যাগে প্যাকেট আছে ছোট। গোলাপী রঙের।
অনিকের কোনো জবাব পাওয়া গেলনা। জারা শুধু পদক্ষেপের আওয়াজ শুনলো। আমারা বা অন্য কোনো মেয়েকে ডেকে দিতে বলতে যাচ্ছিলো সে, কিন্তু অনিক তার অপেক্ষা করেনি। মিনিট কতক অস্বস্তিকর এক নীরবতা। নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে ঠাঁয় বসে রইলো জারা। তার সাইকেলের এখনো সময় হয়নি, তবে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়। প্রায়শই সাইকেল অনিয়মিত হয় তার। কিছুক্ষণ বাদে পায়ের আওয়াজ শুনে সতর্ক হলো সে। দরজার নিচ দিয়ে গোলাপী রঙের প্যাকেটটা ভেতরে ঠেলে দিলো কেউ। সেটি হাতে নিতেই ওপাশ থেকে অনিকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
- আমি আমারাকে খুঁজে দেখছি, আপাতত আমার ব্লেজারটা সাথে রাখ, যতক্ষণ না নতুন পোশাক আসে।
জারা প্রথমবারের মতন কেন যেন ভীষণ প্রকার লজ্জিত বোধ করলো। পরিস্থিতির জন্য নয়। অনিকের মতন একটা ছেলের কাছ থেকে এমন ব্যবহার সে আশা করেনি। তার ভাব যেন টের পেলো অনিক, তাই আস্তে করে বললো,
- চিন্তা করিস না, আমি এখানেই আছি।
এটুকুই। হাতের প্যাকেটটি শক্তভাবে ধরে বসে থাকলো জারা। বাক্যটা খুবই অপ্রয়োজনীয়ভাবে তার হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেলো কেনো?
#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২২
পর্ব ২২: [ একা ] - ( শেষাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━
দর্শকসারিতে বসে আছে দোহা। মাত্রই স্টুডেন্টদের অংশগ্রহণে নাটিকা সমাপ্ত হয়েছে। কমেডি জনরার বিশ মিনিটের উপস্থাপনাটি একেকজনের পেটে খিল ধরিয়ে দেয়ার মতন ছিলো। বিশেষ করে জারার উপস্থাপনাটুকু। সে নাটিকার মাঝে একজন উকিলের ভূমিকায় ছিলো। দুই মিনিটে যতটুকু মাত করার করে দিয়েছে সম্পূর্ণ। তার একেকটা তীক্ষ্ণ কথায় সবার রীতিমত মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়ার জোগাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বর্তমানে উপস্থাপিকা স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে ধাতস্থ হওয়ার সুযোগ দিয়ে সে মাইক্রোফোনে ঘোষণা করলো,
- এবার একটি স্বরচিত সঙ্গীত। পরিবেশনে আসছে, আমাদেরই প্রিয় বান্ধবী, আমারা!
প্রথম কয়েক মুহূর্ত সবাই স্তব্ধ হয়ে থাকলো। তারপরই ভীষণ এক গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। স্বরচিত সঙ্গীত? তাও আমারা? সকলকে দ্বিগুণ মাত্রায় হতবিহ্বল করে দিয়ে ধীরে ধীরে স্টেজে উঠে এলো আমারা। এক হাতে ছোট একটি উকুলেলে, অপর হাতে নোটবুক, যেটায় কিছুক্ষণ আগ অবধি সে কি যেন লিখছিলো। দর্শকসারিতে সবার একদম পিছনের চেয়ারে বসে থাকা দোহা অজ্ঞাতেই টানটান হলো, দীর্ঘ গভীর দৃষ্টিতে দেখলো। আমারা স্টেজের উপরের চেয়ারে বসলো, সামনের মাইক্রোফোনে নমনীয় কন্ঠে বললো,
- লিখালিখি আমার শখ, মাঝে মধ্যে টুকটাক কবিতা টবিতা লিখি। তবে তাকে সুরে রূপ দেয়া এই প্রথম। আশা রাখছি এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা ভালো লাগবে।
- ইউ গো গার্ল! ইয়েস!
গোটা হলরুমজুড়ে শুধুমাত্র জারার কন্ঠ এবং উৎসাহই প্রতিধ্বনিত হলো। আমারা মৃদু হাসলো। তারপর দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টেনে উকুলেলে জুড়ে আঙুল চালাতে শুরু করলো। মৃদু ঝংকারের মোহনীয় এক লয়, তারপরই নরম তুলতুলে একটি কন্ঠস্বর মাইক্রোফোনে প্রতিধ্বনিত হলো,
“ চাঁদের আলো আমি চাইনা
সুরুজের মতো পিছু ধাইনা
সমুদ্দুরের হাওয়া লাগেনা
দূর পাহাড়ে মন হারেনা ”
পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে গেলো গোটা হল। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলো সকলে। এমন নয় যে আমারা খুব ভালো গায়, তার কন্ঠে সুর আছে, কন্ঠও মেয়েলী নমনীয়। তবে তার উপস্থাপন, কথার ভাঁজ এবং দুর্দান্ত লেখনী সঙ্গীতটির আকর্ষণীয় দিক। আমারা চোখ বুঁজে রয়েছে, মাঝে মাঝে খুলে উকুলেলের দিকে তাকাচ্ছে। তার কাঁধ সমান চুলগুলো কাঁধের দুপাশে গড়িয়ে পড়ছে। দৃশ্যটির দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইলো দোহা। তার কানে যেন ক্ষণে ক্ষণে সুধা বর্ষিত হচ্ছে।
“ এই বেহায়া চাওয়ায় নাম শুধু তোমার
অনুভবের নক্ষত্র আমার
ছায়া হয়ে চলে যাও দূরে দূর্বার
ছোঁয়াহীন সেই নক্ষত্র আমার ”
গানটা কার উদ্দেশ্যে লিখা? কিংবা আদও কাউকে উদ্দেশ্য করে লিখিত কি? দোহা অনুভব করতে পারলোনা। শুধু টের পেলো কোলের উপর শক্তভাবে চেপে রাখা তার দুহাত কাঁপছে, বিনা কারণেই। অন্তর এতটা গভীরে চেপে আসছে যে যাতনা উপেক্ষা দায়। গানটা বিষাদের নয়, আনন্দের। এক কিশোরীর নিজের চাওয়াকে প্রকাশের, প্রিয় কারো সত্তাকে জাহিরের। তবে তাতে দোহা এতটা বিরহ বেদনা কেনো অনুভব করছে? কেনো নিঃস্ব - অসহায় লাগছে নিজেকে?
আমারার উপস্থাপনা শেষ হওয়ার পর আধ মিনিট অবধি সব নিস্তব্ধ। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপনমনে হাসলো কিশোরী। কিই বা ভেবেছিল সে? এই সমাজে সে কিংবা তার সৃজনশীল সৃষ্টি গৃহীত হবে? আনমনে মাথা ঝেড়ে সে উঠে পড়লো। এগোলো স্টেজের সিঁড়ির দিকে, নামার উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনি কান ফাটানো এক করতালিতে উদ্ভাসিত হলো গোটা হলরুম। আমারা বুঝতে পারলোনা, সূত্রপাতটা কে করেছে। মুহূর্তমাঝে যেন দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়লো উৎসাহ। একসাথে চিৎকার করে উঠলো সবাই।
- হোয়াট আ গ্রেট সং!
- আমাকে একটা রেকর্ডিং দিস! কলেজের বার্ষিক নিউজে দিবো প্লীজ!
- ভাই তোরা এই ট্যালেন্ট কোন জাদুর বাক্সে লুকিয়ে রাখিস বোন?
মুহুর্মুহু কন্ঠে আমারা এতটাই অভিভূত হলো যে তার নয়নে আবেগাশ্রু জমলো কয়েক ফোঁটা। হেসে ফেললো সে, তারপরই করতালির মধ্য দিয়ে স্টেজ থেকে নেমে আসতেই জারা পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো সবার আগে।
- দেখেছিস? বলেছিলাম না? নিজের মধ্যে এই প্রতিভা চেপে না রেখে সবাইকে দেখানো উচিৎ?
- আমিও বলেছিলাম না? অভিনয়টা ভালোই করবি?
দুই বান্ধবী একে অপরের দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে পরক্ষণেই অট্টহাসি হেসে একে অপরকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরলো। তাদের মিষ্টি - মধুর বন্ধুত্বের সাক্ষী হলো আশেপাশের সবাই।
অনুষ্ঠানের একদম শেষে অনিকদের ড্যান্স পারফরমেন্স হলো। শেষটায় দর্শকদের সবাইও নিজেদের চেয়ার ছেড়ে তাদের নাচে যোগদান করলো। হাসি - কলোরোলে ভরপুর একেকজন। অনিক, রাজীব , জিই - শু, ক্লাসের বাকিরা.... সঙ্গে একপাশে আমারা - জারা, রাহা, বাকি সব মেয়েরা, যেন ঐন্দ্রজালিক এক দৃশ্য। চেয়ারে একমাত্র একলা বসে রইলো দোহা। তাকে না কেউ ডাকলো, না কেউ ঠেললো, না কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলো। অবশ্য সে যে এখানে উপস্থিত তা বেশিরভাগের খেয়ালে আছে বলে মনে হয়না। অনিকদের চেহারায় বিস্তর হাসি দেখে দোহা আনমনে নিজেও সামান্য হাসলো। তার নজর ঘুরে ফিরলো প্রত্যেকের মাঝে, প্রাণভরে দেখলো উত্তেজিত আমারাকে। যেন প্রত্যেকে জীবনের সবথেকে মধুর এক সময়কে উপভোগ করছে।
এই মুহূর্ত নষ্ট করার অধিকার তার নেই।
সবার অলক্ষ্যে উঠে দাঁড়ালো দোহা, প্রচন্ড মিউজিকের দৌরাত্ম্য এবং উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের হাস্যোজ্জ্বল মোহকে ছাপিয়ে ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ পায়ে সে বেরিয়ে এলো হলের বাইরে। চুপচাপ এগোলো, হাতের হাতঘড়ির দিকে তাকালো। তার কাজে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। রুমে ফিরে পোশাক বদলে দ্রুতই বেরোতে হবে।
。
。
。
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বেশ খানিক আগেই। সবাই করিডোরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব এবং হাসিঠাট্টায় মেতে আছে। অনেকে ছবি তুলে রাখছে, সুন্দর মুহূর্তগুলোকে বাঁধাই করে রাখতে। আমারা আর জারা হল থেকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাঁটছে। উভয়ে বেশ খানিক ক্লান্ত। আমারা খানিক চিন্তিত দৃষ্টিতে জারাকে দেখে শুধালো,
- তুই ঠিক আছিস? পেট ব্যাথা করছে?
জারা ভ্রু তুলে আমারাকে দেখলো, তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে জানালো,
- আমি ঠিক আছি।
- অনিক ছেলেটা হয়ত পুরোপুরি খারাপ নয়।
আমারার কথায় ভ্রু কুঁচকে নিলো জারা। তার চেহারার বিতৃষ্ণা লক্ষ্য করে আমারা ভাবলো এই বুঝি কোনো তিক্ত মন্তব্য করে! তবে জারা মাথা ঝাঁকিয়ে আনমনে বিড়বিড় করলো,
- হুম।
কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলো আমারা, পরক্ষণেই এক চিলতে হাসির রেখা প্রকাশ পেলো তার ঠোঁটজুড়ে।
- আরে! আমাদের নতুন প্রফেসর নাকি?
- ভাইরে ভাই! কি হট অ্যান্ড হ্যান্ডসাম!
- ইয হি সিঙ্গেল?
- জাস্ট লুক অ্যাট হিয মাসেলস! কি লম্বা,কি সুন্দর!
- এই চুপ! তোদের দুলাভাই লাগে!
হঠাৎ চারপাশের গুঞ্জনে ভীষণ অবাক হয়ে আমারা এবং জারা একে অপরের দিকে তাকালো। এক মহা উপলব্ধির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়লো তাদের সর্বাঙ্গে। এক লহমায় ছুটে গিয়ে রিলিং বাগড়ে ধরলো জারা, ঝুঁকলো নিচে।
- হেই কোকো!
- ড্যাড!
গ্রাউন্ডফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছেন জাইন। দীর্ঘদেহী অঙ্গে জড়ানো রয়েল ব্লু ফরমাল শার্ট, গলায় টাই। কোটখানি আলগোছে ঝুলছে বাহুতে, চশমার অন্তরালে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রখচিত নয়নে তাকিয়ে আছেন দুই তলার রেলিং থেকে ঝুঁকে থাকা জারার দিকে। বিস্তৃত অধরজুড়ে দীঘল হাসি খেলা করছে। জারা “ড্যাড ” সম্বোধনের পর থেকেই তীব্র গুঞ্জরণে ছেয়ে গেলো চারপাশ। বিস্ময়ে চোখ মাথায় উঠার অবস্থা একেকজনের! তবে পরোয়াও করলোনা জারা। উল্টো ঘুরে সটান দৌঁড় দিলো করিডোর বেয়ে, তাকে অনুসরণ করলো আমারাও। যদিও শাড়ী পড়ে দৌঁড়াতে কষ্টই হচ্ছে, তবুও উভয়েই পৌঁছলো নিচে। প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছেন জাইন, উজ্জ্বল চেহারায়। তিনি একা নন। এক পাশের থামে হেলান দিয়ে দন্ডায়মান আশফিকাও। আমারার চেহারা আনন্দে উথলিত হয়ে উঠলো।
- মামণি!
- আম্মু!
আশফিকার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমারা, নিজেকে বিলিয়ে দিলো জন্মদাত্রীর উষ্ণতায়। অপরদিকে জারা মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জাইনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
- তুমি এখানে কি করছো? বলা নেই, কওয়া নেই কোথা থেকে চাঁদপানামুখ দেখাতে এলে?
আশেপাশে বেশ অনেক মেয়েই জড়ো হয়েছে যারা ফিরে ফিরে দেখছে। এমনকি কতক ছেলেরাও কৌতূহলী নজর ফেলছে। সবটাই জাইনের কামাল! তিনি তীর্যক হাসলেন, তারপর জারার দুই কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন,
- বা রে! আমার মেয়ে জীবনে প্রথমবার শাড়ী পড়েছে! আর আমি দেখতে আসবোনা? বিশেষ নবম আশ্চর্য্য মিস করে গেলে যে আমার জীবন ব্যর্থ!
চোখ উল্টালো জারা। তাতে হেসে ফেললো সবাই। আশফিকা আমারার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জারাকে জানালেন,
- ইউ নো? আজ জেডকো গ্রুপ আর চৌধুরী গ্রুপের মিটিং ছিলো। এর মাঝখানে মিস্টার জাইন হঠাৎ বললেন, আজকে আমাদের মেয়েরা শাড়ী পড়েছে!
- বাস! এরপর মিসেস চৌধুরীও গুটিগুটি পায়ে আমার পিছু পিছু চলে এলেন। সে উনি ওনার মেয়েকে দেখতে এসেছেন, আমার কি দোষ?
ঠোঁট ফুলিয়ে এমনভাবে জাইন বললেন যে জারা তার কাঁধে হালকা ঘুষি বসিয়ে বললো,
- ড্যাড প্লীজ, এটা আমার কলেজ! সবাই তোমাকে দেখছে!
- সে আমি যেখানে যাই সেখানেই সবাই আমাকে দেখে। সৃষ্টিকর্তা আমার উপরে রূপ - লাবণ্যের কৌটোটা পুরো ঢেলে দিয়েছেন, এটাও আমার দোষ?
- ড্যাড!
- হাহাহা.....ইউ আর লুকিং গর্জিয়াস মাই কোকো!
জারাকে আপাদমস্তক অবলোকন করে বুকে টেনে নিলেন জাইন। আবেগী নয়নে ভাসলো তার সুগভীর মুগ্ধতা। জারা নিজেকে বিলীন হতে দিলো পিতার বুকে। আনমনে লাজমাখা হাসলো।
- তোমার সুন্দরিমা অনন্য কোকো। এই শাড়ীর ভাঁজ, এই খোলা আঁচল আর হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ির তুলনা হয়না। সদ্য জন্মের পর ওই অনাবৃত ছোট্টদেহকে বুকে জড়িয়েছিলাম, আর আজ জড়ালাম শাড়ীতে মোড়ানো লাবণ্য কিশোরীকে। এই সুযোগ গোটা পৃথিবীর বিনিময়েও মিস করতাম না, কোকো।
- তুমি বড্ড ইমোশনাল।
অভিযোগটুকুও জারার কন্ঠে ঝরলো কোমলতা হয়ে। জাইন হাসলেন, ঝুঁকে তার কপালে স্নেহের চুমু এঁকে দিলেন। পরক্ষণেই তাকালেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমারার দিকে, তার হাসি দ্বিগুণ বিস্তৃত হলো।
- লিল বার্ড!
- ভালো আছেন আংকেল?
আমারাকে হাত বাড়িয়ে সামান্য জড়িয়ে পিঠ চাপড়ে দিলেন জাইন।
- আমি সবসময় ভালো থাকি, নীল শাড়ীতে হেঁটে চলা এক টুকরো আকাশগঙ্গা!
আমারার গাল টকটকে হয়ে উঠলো আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসে।
- বাব্বাহ, আপনি যে হারে বাচ্চাদের পটিয়ে যাচ্ছেন!
- জেলাস, মিসেস চৌধুরী?
আশফিকা থমকে গেলেন। ঠিক আমারার অনুকরণে লালিমা প্রকাশ পেলো তার গালজুড়ে, বিব্রতবোধে। খিলখিল করে হাসলেন জাইন। নিজের হাতের ফোন বের করে আমারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
- আমাদের সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দাও তো বার্ড, একেবারে আমিন ভিলার মেইন ডোরে টাঙিয়ে রাখবো। সবাই দেখবে, আমার মেয়ে শাড়ী পড়েছে!
- ড্যাড একবার বাসায় চলো তুমি....
- তোমার হুমকি আমার এক কান দিয়ে ঢুকতে গেলে ওই কানের প্রহরী তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।
বাবা মেয়ের খুনসুঁটিতে হেসে ফেললো আমারা। ছবি তুলতে আরম্ভ করলো। আশফিকাও এলেন, চারজনের ছোট্ট দুটি পরিবার একে অপরের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক পারিবারিক মুহূর্তে মেতে উঠলো।
অদূরে মেইল ডরম থেকে ব্যাগ কাঁধে বের হওয়া দোহার নজরে দৃশ্যটি আসতেই সে ক্ষণিকের জন্য থামলো। প্রশস্ত নয়নে চেয়ে দেখলো জারা, আমারা এবং উভয়ের বাবা মাকে। কি স্বর্ণালী এক মধুর সময়! অন্তরে একটা ঝাঁকুনি হলো, চোখের মাঝে কিছু দপদপ করতে শুরু করলো। অনুভূতি দমনে দোহা দ্রুতই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, সামান্য হাসলো আনমনে। তারপর ধীরপায়ে কলেজের গেইট বেয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো।
দুটি আড়ালকৃত গোপন দৃষ্টি দোহার নজরে এলোনা।
সবার মাঝখানে দাঁড়িয়েও হাসতে হাসতে তার পথে দৃষ্টি ফেলা আমারা.....
এবং নিচ তলার প্রাঙ্গণের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবিষ্ঠ নয়নে চেয়ে থাকা অনিক।
━━━━━━━━━━━━━━
এক সপ্তাহ পর।
আজ সকাল থেকেই দোহার মনটা ভালো নেই। অবশ্য তার মন কস্মিনকালে ভালো থাকে। সে যাই হোক, আজকের খারাপ লাগার বিশেষ দুইটি কারণ রয়েছে। এক, তার মা শায়লা বেশ অসুস্থ। সার্জারি অত্যাবশ্যক। প্রচুর টাকার দরকার। এজন্য দোহা আজ নিজের বাসায় গিয়েছিল, বাবার সঙ্গে কথা বলতে। তবে বাবুল সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শায়লার চিকিৎসা সম্পর্কিত কোনো সাহায্য তার কাছ থেকে পাওয়া যাবেনা। তাকে ভালো মন্দ দুটো কথা অবশ্যই শুনিয়েছে দোহা, তার প্রতিদানস্বরুপ বর্তমানে দগদগে একটি ঘায়ে তার গালের একপাশ জ্বলছে। দুটো বাটারফ্লাই ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রেখেছে সেই ছাপ। মন - মেজাজ, শরীর - স্বাস্থ্য কোনোকিছুর ঠিক নেই। অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং অবসাদের কারণে গতকাল আবারো নোয ব্লি*ডিং হয়েছে তার।
আজ দ্বাদশ শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের এইচ এস সি পরীক্ষার জন্য বিশেষ ক্লাস শুরু হয়েছে। নতুন একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরাও ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণ, ক্লাস, করিডোর, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের অফিস সবকিছুই জমজমাট। কোলাহলের মাঝে ধীরপায়ে হাঁটছে দোহা লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে। তাদের দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস এখনো শুরু হয়নি, আগামীকাল রেজাল্ট দেয়া হবে, তারপর। তবুও কিছু বইখাতা নিয়ে যাওয়া দরকার, আগেভাগে প্রস্তুতির জন্য। এমনিতেও সে ক্লাস শুরু হলে খুব একটা সময় পাবেনা।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে লাইব্রেরীর সামনে পৌঁছেই থমকে গেলো দোহা। প্রবেশমুখে দল পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ছেলেরা। যাদের সঙ্গে আছে রুহান। কি নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে বলে মনে হলো। দোহা ভ্রুক্ষেপ না করার কথাই ভাবলো। চুপচাপ এগোলো সে নিজের পথে। ঠিক তখনি,
- ওর বাপ একটা জুয়াখোর।
মনে হলো যেন শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গিয়েছে। থমকে গেলো দোহার পদক্ষেপ মুহূর্তেই। ছেলেদের মাঝে কি বিষয়ক আলোচনা হচ্ছে বুঝতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা তাকে। রুহানের কন্ঠস্বর ভেসে এলো পিছন থেকে, ভীষণ তিক্ত,
- আর মা একটা সংসার ভাঙা বেয়াদব মহিলা। নিজের বোনের সংসারে আগুন দিয়েছে। অবশ্য বোনটাও জাতের ছিলো না, সেটাও নতুন নাগর জুটিয়েছে।
- তুই এতকিছু জানিস কিভাবে রুহান?
- ভালোমত খোঁজখবর নিলে তথ্যের অভাব হয়না। ওর জুয়াখোর বাপ আমার দূরসম্পর্কের চাচার অ্যাসিস্টেন্ট ছিলো তো!
দোহার উভয় হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করতে চাইলো সে। সম্ভব হলোনা। এই প্রতিশোধ - প্রতিশোধ খেলায় বেশ বাজেভাবে তাকে আর তার পরিবারকে টেনে আনছে রুহান, বিষয়টা সহ্য করার মতো নয়। কিন্তু করতে হবে, এই সময়ে রিস্ক নেয়া যাবেনা, কিছুতেই না, কিছুতেই না! নিজেকে অনর্গল বোঝাতে থাকলো দোহা।
- এমনিতে কি আর ভিখিরির মতন ওয়েটারের কাজ করে? বোনটাও তো যাচ্ছেতাই, টাকার কুমির। কি এমন কাজ করে এত টাকা যোগায়? কোনো বড়লোক বাপের ছেলের বিছানা গরম করে নয়ত? এই যেমন আমি, তোরা? হাহাহা....!
- একদম ঠিক! ক্যান আই বুক হার?
সকলের হাসির তোড়ে উদ্ভাসিত হলো চারপাশ। দোহা চোখের সামনে সবকিছু শুধু টকটকে লাল দেখতে পেলো। মনে হলো মাথার মধ্যে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। এমন অনুভূতি তার তখনি হয় যখন তার অন্তর র*ক্তবাসনায় মেতে উঠে। আশেপাশে তাকালো দোহা, কিছুই নজরে আসছেনা। অতর্কিতে মনে পড়ল কিছু, হাত ভরলো পকেটে। গণিত প্র্যাকটিস করার জন্য কম্পাস বক্স সাথে রাখে, সেটার তীক্ষ্ণ প্রান্তসম্পন্ন কম্পাসটা সে মুঠোর মাঝে বাগড়ে ধরলো। উল্টো ঘুরলো। শান্ত পদক্ষেপে এগোলো রুহানের দলের দিকে।
- এইরে.... রেগে গেছে মনে হচ্ছে...
- আসতে দে। ওইদিন খুব হিরোগিরি দেখিয়েছে তো। দেখি আজকে আমার কি চুল ছিঁড়ে!
যা ঘটলো তা রীতিমত চোখের পলকেই। হাতের কম্পাসটা দোহা সজোরে গেঁ*থে দি*লো রুহানের বু*ক বরাবর! ছিটকে উঠলো কয়েক প্রস্থ র*ক্তের ফোঁটা, আছড়ে পড়লো দোহার গালে। তবুও ছাড় নেই, কম্পাস টেনে বের করে দ্বিতীয় দফায় গাঁথলো সে রুহানের কাঁধে! আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকারে ভরে উঠলো চারপাশ। তবুও অটল দোহা। প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে তিনজন তাকে জাপটে ধরলেও সে একচুল নড়লোনা। নয়নজুড়ে রক্তাভ ক্রোধ তার, কপালে জেগে ওঠা শিরা উপশিরা, আক্রোশে কাঁপা ঠোঁট।
- তোর বিছানা গরম হবে অবশ্যই। ওই বিছানাকে জ্বলন্ত চিতায় রূপান্তর করার দায়িত্ব এই দোহার!
রুহান পাল্টা প্রতিক্রিয়া করার সুযোগও পেলনা। তার শরীর ঝটকা দিতে দিতে মেঝেতে আছড়ে পড়লো। ভয়ানক দৃষ্টিতে তা দেখলো সবাই।
- ওকে মে*রে ফেললি?
ভয়ে চিৎকার করে উঠলো একজন ছেলে। সটান উল্টো ঘুরল দোহা। পাশের ছোট টবটা তুলে আছ*ড়ে ফেললো তার মুখে! মাথা ফে*টে ঝরতে থাকলো র*ক্ত। একজন আর্তনাদ করে উঠলো,
- ও পাগল হয়ে গিয়েছে!
- হ্যাঁ! পাগল হয়ে গিয়েছি! উন্মাদ বনে গিয়েছি আমি! তোরা আমাকে শান্তিতে বাঁচতে দিস না!
পাল্টা হুংকার দিয়ে উঠলো দোহা। ঘাড় ধরে তাকে ছুঁড়ে ফেললো দেয়ালে। নাছোড়বান্দা আরো দুইজন তাকে পিছন থেকে জাপটে ধরলো। স্টিলের পানির বোতলের মোক্ষম বা*ড়ি হাঁকালো দোহার চিবুকে। পরক্ষণেই ক্রমাগত লাথি ঘুষি বসাতে শুরু করলো উন্মাদের মতন। একটা টু শব্দও করলোনা দোহা, বেদনা প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। দাঁতে দাঁত চেপে নিলো। শরীরটা মিইয়ে এলো তার। আঘা*তে আঘা*তে জর্জরিত হতে থাকলো। তবে এত সহজে কি সে হার মানবে? পাশের আরেকটি ফুলের টব থেকে শুকনো মাটি মুঠো করে নিয়ে সে ছেলেগুলোর চোখেমুখে ছুঁড়ে দিলো। র*ক্তা*ক্ত মুখেই লাফিয়ে উঠলো। টলে পরে যেতে নিলেও সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার সাদা শার্ট র*ক্তে ভিজে উঠতে শুরু করেছে। ব্লি*ডিং কোথায় হচ্ছে এখনো বোঝা যাচ্ছেনা।ওসব যাক চুলোয়!
- আহ্হঃ!
প্রচন্ড এক যন্ত্রণার চিৎকার করে উঠে সে ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের উপর। আজ হয়ত মা*রবে নয়ত ম*রবে! এমনি প্রতিজ্ঞা তার।
হুলুস্থুল কান্ডের মাঝখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে ছুটে এলো সবাই। ক্লাস ফেলে প্রফেসররা বেরিয়ে এলেন, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের অন্যান্য মেম্বাররা দৌঁড়ে এলো ঝামেলা রুখতে। দোহাকে টান দিয়ে ধরলো একসঙ্গে সাতজন! প্রফেসরের দুটো তাজা থাপ্পড় হজম করতে হলো তাকে হট্টগোলের মাঝে। তবুও তার আগ্রাসনকে রুখতে প্রত্যেকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলার জোগাড় হয়ে দাঁড়ালো।
。
。
。
এক ঘণ্টা পর।
প্রিন্সিপালের অফিসে বসে আছে দোহা। পাশে মা*রামা*রি করা আরো তিনজন ছেলে। ইনফার্মারি থেকে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে দোহার হাতে, ঘাড়ে এবং চিবুকে ব্যান্ডেজ জড়ানো। রুহান তাদের মাঝে নেই। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে ইমার্জেন্সী। প্রিন্সিপাল মাথায় হাত দিয়ে নিজের চেয়ারে বসে আছেন। অপরদিকে ফাদার ফ্রেড্রিক ভীষণ অখুশি এবং হতাশার দৃষ্টিতে দেখছেন দোহাকে। দিয়া ফাদার ফ্রেড্রিকের প্রিয় একজন শিক্ষার্থী ছিলো সেন্ট পিটার্সবার্গে পড়াকালীন। সেই সুবাদে দোহাকেও আদরের নজরে দেখতেন তিনি। তবে বর্তমানে তার ছেলেটার উপর একঝাঁক দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু অনুভূত হচ্ছেনা।
আতঙ্কিত নীরবতার পর অবশেষে প্রিন্সিপালের কর্কশ কন্ঠস্বর ধেয়ে এলো,
- রুহান কুড হ্যাভ ডা*ইড!
বাকি তিন ছেলে কেঁপে উঠলেও দোহার ফুলে ওঠা ঠোঁটজুড়ে শুধু তীর্যক এক হাসি ফুটলো। ভাঙা কন্ঠে সে প্রিন্সিপালকে জানালো,
- না ম*রলে আমি হাসপাতালে গিয়ে নিজ হাতে ওটাকে জাহান্নামে পাঠাতে ইচ্ছুক!
- দোহা ইসলাম!
গর্জন তুললেন প্রিন্সিপাল। এতটা জোরালোভাবে যে তার কেবিনের বাইরে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসাহী, চিন্তিত শিক্ষার্থী এবং প্রফেসররা স্পষ্ট শুনতে পেলো। দাঁতে দাঁত চাপলেন পিটার্সবার্গের প্রিন্সিপাল, টেবিলে চাপড় দিয়ে গম্ভীর স্বরে জানালেন,
- ইউ আর রাস্ট্রিকেটেড ফ্রম সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ!
স্তব্ধ হয়ে রইলো সবাই। দোহা বাদে। সে ঠাঁয় বসে রইলো, যেন এখন আর কিছুতেই কিছু যায় আসেনা। তার প্রতিক্রিয়ার অভাব প্রিন্সিপালকে আরো রাগান্বিত করে তুললো।
- গেট আউট ফ্রম মাই কেবিন, রাইট নাউ! আগামীকাল সকাল নয়টার মধ্যে ডরম ছাড়বে তুমি! অন্যথায় তোমার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো দোহা। একনজর তাকালো, শুধু ফাদার ফ্রেডিকের দিকে। তারপরই উল্টো ঘুরে কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো।
বাইরে পা রাখতেই নজরে এলো সকলকে। করিডোরজুড়ে ছাত্র ছাত্রীদের ভিড়। আজকের ঘটনাটি বেশ প্রভাব ফেলেছে গোটা কলেজজুড়ে। রুহানকে যে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে সেই খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছে। দোহা স্তব্ধ হয়ে সকলের দিকে তাকালো। ঘৃণা, আক্রোশ, ভয়, ক্রোধ, বিতৃষ্ণা.... চারদিকে শুধু যাতনার ছড়াছড়ি। দোহা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। চুপচাপ সকলের মাঝ দিয়ে করিডোর ধরে এগোতে থাকলো। সবাই একসাথে চড়াও হওয়ার সময় বুকে, পাঁজরে আর পায়ে বেশ চাপ লেগেছে তার। ঝনঝন করছে। পা টা ঠিকমত ব্যবহারও করা যাচ্ছে না। ব্যথার তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে যতবার ফেলছে ততবার। তবুও এগিয়ে গেলো দোহা। এই দৃষ্টিপাত যে অসহনীয়! এই পরাজয় যে অবমাননাকর! এই মানুষগুলো জানেনা তার জীবনকাহিনী, কোনোদিন জানবেও না, কোনোদিন না।
পকেটের ভেতর ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠায় দোহা পকেটে হাত ভরলো। ফাটা স্ক্রিনজুড়ে মাহিনের নামটা ভেসে ওঠায় সে রিসিভ করলো। কানে ঠেকালো। অতঃপর যেন পৃথিবীর সমাপ্তি।
- তোমার আম্মু আর নেই দোহা......
কেমন অনুভূতি হলো? বোঝা দায়! হাতের আঙ্গুল বেয়ে পিছলে পড়ে গেলো ফোন। কমদামী স্মার্টফোনটি শক্ত মার্বেল পাথরের মেঝেতে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেলো চারপাশে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আছে শুধু একঝাঁক নিস্তব্ধতা।
পদক্ষেপ থামলো না, এগিয়ে গেলো দোহা। থামার কোনো সুযোগ নেই। করিডোরের আশেপাশে জড়ো হওয়া সকল শিক্ষার্থীরা হতবাক হয়ে তার অবয়বে তাকিয়ে রইলো। কি ঘটছে এই ছেলেটার সাথে? কি হলো এইমাত্র? কারো বোধগম্য নয়। তারা শুধু দেখছে ব্যান্ডেজ জড়ানো র*ক্তা*ক্ত এক ভগ্ন সত্তাকে। তাকে ঘিরে আছে যেন এক পর্বত সমান বিষাদ।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দোহা, অজানার উদ্দেশ্যে।
এগিয়ে যাচ্ছে এক বিধ্বস্ত জিন্দালা*শ।
- দোহা!
পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এলো। রাজীব। তাকালো না দোহা। একইভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পা টেনে টেনে। নিমজ্জিত সে আপন জগতে। তার বাহু খপাত করে চেপে ধরলো কেউ। ঝাঁকিয়ে শুধালো,
- দোহা.... কি হয়েছে?
জিই - শুর ছায়া নজরে এলো। উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। সম্ভব হলোনা নিজেকে রোখা। ঝটকা দিয়ে উঠলো দোহা। ছিটকে গেলো জিই - শু, রাজীবের বুকে আছড়ে পড়লো।
- ম*রতে দে আমাকে!!!
দোহার প্রকম্পিত হাহাকার করিডোরের প্রতি প্রান্তে প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হলো। জমিয়ে দিলো প্রত্যেকটি অন্তরকে। বুকের ভেতর মোচড় দেয়া এক বেদনায় জন্ম দিলো ওই গভীর কণ্ঠের আর্তনাদ। হতবাক চেয়ে রইলো প্রত্যেকে। জীবন্ত লা*শটির উদ্দেশ্যে।
উল্টো ঘুরলো দোহা। নিজের বিধূরের মায়াজাল বিলিয়ে মিলিয়ে গেলো অদূরে। ফেলে গেলো টেনে টেনে চলা পদচিহ্ন, দায়িত্ব - যাতনার ভারে যেন তা গেঁথে রয়েছে মেঝের প্রতিটি পরতে পরতে।
সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিচে নেমে এলো দোহা। গ্রাউন্ড ফ্লোরের শীতল প্রাঙ্গণে থামলো। ডান পাশ বেয়ে ছুটে আসছে কেউ। আচ্ছাদিত দৃষ্টি তুললো দোহা। আমারা এবং জারা। দোহার মুখোমুখি এসে থেমে গেলো আমারা, আলুথালু শরীরে হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ে রইলো। অজান্তেই দোহার অবয়বে বুলিয়ে আনলো নিজের দৃষ্টি, তারপরই সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়লো।
সম্ভব হলোনা আর। অভ্যন্তরের বরফের পাহাড়টুকু ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো অনুভূতির মুখোমুখি এসে। হাঁটু ভেঙে এলো দোহার, ধপাস করে বসে পড়লো মাটিতে। জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া এক বিধ্বস্ত সৈনিক। কেঁপে উঠলো সমস্ত শরীর, তারপরই প্রচন্ড এক দমক উঠলো।
কান্নার দমক।
প্রথমবারের মতন প্রাক্তনের উভয় ব্যথিত , ক্লান্ত নয়ন উপচে অশ্রুর অঝোর ধারা গড়াতে দেখলো আমারা। মুক্তোর দানা গড়িয়ে নামছে, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস যেনো।ভাসিয়ে নিলো সবকিছুকে।
- আহ্হঃহহহহ্!
কন্ঠনালী ছিঁ*ড়ে উদগিরিত হলো মরমধ্বনি। কাঁপিয়ে দিলো যেন গোটা জগৎকে। থমকে গেলো সময়, বিলীন হলো পৃথিবী।
দিনশেষে দোহারা হেরে যায়।
দিনশেষে জীবন দোহাদের দয়া দেখায় না।
দিনশেষে দোহাদের কেউ ভালোবাসে না।
দিনশেষে দোহারা একা।
দিনশেষে দোহারা...... মৃত।
—চলবে—