#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৩
পর্ব ২৩: [ মিলন ]
━━━━━━━━━━
আচ্ছা? বস্তুর ওজন মাপার যেমন দাঁড়িপাল্লা আছে তেমন কষ্ট মাপার কি কোনো দাঁড়িপাল্লা নেই?
যদি থাকতো, তাহলে দোহা হয়ত নিজের অন্তরটা ওজন করে দেখতো। কতটুকু কষ্ট ভরা আছে তাতে, আর কতটুকুই বা তার ধারণ ক্ষমতা।
পরিবার, বাবা, প্রেমিকা, বন্ধু — শব্দগুলো বড্ড আগেই অচেনা হয়েছে। আজ “মা ” শব্দটাও উবে গেলো, কর্পূরের মতন। ঠোঁট বেয়ে “আম্মু” ডাক আর কখনো বের হবেনা। আর কখনো হাজার পরিশ্রমের দিন শেষে হাসপাতালের কেবিনে রুগ্ন বুকটার মাঝে শান্তির খোঁজ করা হবেনা।
পাখি— বলে আর কেউ কোনোদিন ডাকবেনা দোহাকে।
সতেরো বছরের এই ছোট্ট জীবনটা যা দেখেছে, যা অনুভব করেছে তা পৃথিবীর কোনো গাণিতিক সূত্র কিংবা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে হিসাব অসম্ভব।
দোহার শরীরটা কাঁপতে থাকলো ক্রমাগত। কান্নার দমক খেলে গেলো তার গোটা অস্তিত্বে। হারানোর কান্না? বেদনার কান্না? না পাওয়ার কান্না? এই ক্রন্দনের নাম হয়না। স্তব্ধ হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো আমারা। কি হয়েছে, কেনো হয়েছে সে কিছুই জানেনা। কিন্তু সামনে ভেঙে পড়া বিদ্ধস্ত সত্তাটির অসহায় আর্তনাদ তার অন্তরটা খুবলে ধরলো। শক্তিশালী ভূমিকম্পে যেন ভেতরটা ধ্বসে পড়লো সম্পূর্ণ। তার প্রতিক্রিয়া গড়াতে আরম্ভ করলো দুই চোখের অশ্রু হয়ে।
অন্তরের নিগূঢ় টানে অজান্তেই আমারা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো দোহার কাছে। ছেলেটা দুহাতে মেঝে খামচে ধরে কাদঁছে। সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে গোটা গ্রাউন্ড ফ্লোরের প্রাঙ্গণজুড়ে। জ্বালাময়ী এক হাহাকার। অশ্রুদানা ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে মেঝের মাঝে অদ্ভুত এক বিধূরকর্ম ফুটিয়ে চলেছে। ঠোঁট কাঁপলো আমারার, ধরাশায়ী আবেগের তাড়নায়। আস্তে করে সে বসে পড়লো দোহার মুখোমুখি। কাঁপা কাঁপা দুহাত বাড়িয়ে আলতো করে স্পর্শ করলো দোহার মুখ। তুলে ধরলো, টলটলে দৃষ্টি মেলালো ওই জীবন্মৃত নয়নে।
- কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
আমারার কম্পিত নরম কণ্ঠের আবেদনে দোহার ভেতরের সবকিছু ধ্বসে পড়লো। কাঁপতে থাকা আঙুল কিশোরী ছুঁয়ে দিলো তার ব্যান্ডেজ জড়ানো চিবুকে, গড়িয়ে নামলো তা তার র*ক্তেভেজা বুকের পাঁজরে। নীরব আর্তনাদে ডাগর ডাগর আঁখিজোড়া ভরে উঠলো অশ্রুতে। আর্দ্র প্রশ্ন ছুঁড়লো,
- কাঁদছো কেনো?
- আম্মু....
ক্রন্দন মিশ্রিত সিক্ত জবাব দোহার। নিজেকে আর রোখা সম্ভব হলোনা। অতর্কিতে আমারার বুকের মাঝে নিজেকে লুটিয়ে দিলো সে, আশ্রয়ের প্রত্যাশায়। সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকলো থরথর করে, ফুঁপিয়ে উঠলো সজোরে।
- আমার আম্মু! আমার আম্মু!
আমারার বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা। প্রশস্ত কোমল দুহাত বাড়িয়ে সে আগলে নিলো দোহাকে, চেপে ফেললো নিজের সঙ্গে। অনুভব করলো পিঠজুড়ে খামচে বসেছে আহাজারিরত প্রাক্তনের আঙুল, পরোয়া করলোনা। নিজের উষ্ণতার বাহুডোরে চেপে শান্ত করতে চাইলো এক বাঁধনহারা যাতনাকে। আমারার অশ্রু টপটপ করে গড়ালো ফোলা দুগাল বেয়ে। ভাসিয়ে নিলো সকল মান - অভিমান, রাগ - দুঃখ, ক্লেশকে। আমারা শুধু এটুকু জানে, দোহার তাকে দরকার। খুব করে দরকার!
দোহার ফুঁপিয়ে চলার শব্দ আমারার বুকে ম্রিয়মাণ হয়ে এলো, ভাঙা কন্ঠে সে ফিসফিস আর্তনাদ তুললো,
- আমি একা। খুব একা। আর সহ্য হচ্ছে না। আর পারছিনা। আমাকে একটু মাফ করা যায়না? একটাবার শুধু আগলে নেয়া যায়না?
কেঁদে ফেললো আমারা, দোহাকে আরো শক্তভাবে নিজের মাঝে চেপে ঝুঁকে তার মাথায় নিজের অধর ছোঁয়ালো আলতো করে,
- তুমি একা না। আমি আছি।
- আমি কি এতই খারাপ? আম্মুও আমার সাথে অভিমান করলো?
- তুমি খারাপ না। আন্টি শান্তির দেশে গিয়েছেন। ওখানে শুধুই শান্তি, জাগতিক অশান্তি নেই।
দোহার প্রতিটা প্রশ্নের জবাবের সঙ্গে আমারা একবার তার কপাল আরেকবার মাথার পাশে অধর ছুঁয়ে দিলো। চোখ খিঁচে নিলো দোহা, দ্বিগুণ জোরে কেঁদে উঠলো।
- আমি এক ব্যর্থ সন্তান। আমি প্রচন্ড বাজে একজন ছেলে। আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।
- তুমি বাঁচবে, তোমাকে বাঁচতে হবে। তোমার আম্মুর জন্যই তুমি বাঁচবে দোহা।
তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করলো আমারা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে চেয়ে রইলো দোহা, পরক্ষণেই চোখ বুঁজে নিজেকে বিলিয়ে দিলো এক অদ্ভুত সুন্দর আশ্রয়ে। আমারা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। স্নেহের স্পর্শে যেন মোচন করতে চাইলো সকল দুঃখকে। তারপর তাকালো জারার দিকে, একটা ঢোক গিলে বললো,
- একটা রিকশা বা ট্যাক্সি যেকোনো কিছু পাস কিনা দেখ।
জারা এতক্ষণ যাবৎ এক প্রকার ভগ্ন হৃদয়েই দেখছিলো গোটা ঘটনা। আমারার কথায় সে দ্রুতই মাথা নেড়ে চলে গেলো। রীতিমত ছুটলো বাইরের সড়কে। অপরদিকে আমারা দোহাকে টেনে তুললো,
- চলো।
দোহা জোরে মাথা মাথা নাড়লো, দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। আমারা তার মাথা নিজের কাঁধে ঠেকিয়ে কানে অধর স্পর্শ করে কোমল স্বরে জানালো,
- আমি যাবো। আসো। আমার সাথে চলো।
ভগ্ন দোহাকে ধরে ধরে বাইরের সড়কে নিয়ে গেলো আমারা। জারা একটা রিকশা ঠিক করেছে। তাতেই চেপে বসলো দুজন। দোহা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো, তার কোলে মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে ফোঁপাতে থাকলো। আমারা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। জারা পাশ থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানালো,
- তোরা যা, আমি সাইকেলে ফলো করছি পিছনে।
আমারা দ্রুত মাথা নেড়ে সায় জানালো। তারপর দোহার দিকে ঝুঁকলো,
- কোথায় যাবো? কোন হাসপাতাল?
নাক টেনে দোহা জবাব দিলো,
- হেলথকেয়ার হসপিটাল।
আমারা মাথা দুলিয়ে রিকশাওয়ালার দিকে ইশারা করতেই তিনি দ্রুত চেপে বসলেন। প্যাডেল চেপে এগোতে শুরু করলো রিকশা। আমারা হাসপাতালের নাম জারাকে মেসেজ করে দিলো। অতঃপর হাত বাড়িয়ে রিকশার হুড নামিয়ে দিলো। তার কোলে চুপটি করে পরে থাকলো দোহা, ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠলো নিঃশব্দ কান্নার দমকে। নিজের অশ্রু আটকে তার মাথায় ক্রমাগত স্নেহ বুলিয়ে গেলো আমারা, একটুখানি শান্ত্বনা বিলানোর আশায়।
。
。
。
আমারা যখন দোহাকে ধরে ধরে নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করলো তখন আশেপাশের মানুষজন বেশ কৌতূহল নিয়ে তাকালো তাদের দিকে। দোহার চোখ মুখ ফুলে উঠেছে, এখানে সেখানে ব্যান্ডেজ। পরনের শার্টে ধূলো এবং র*ক্তের দাগ। তবে কোনো মাপজোখের দৃষ্টিতে আর কিছু আসে যায়না কারো। আমারার উপরে অনেকটা ভর দিয়েই দোহা পা টেনে টেনে চললো ভেতরে। হাসপাতালের মর্গের কাছাকাছি আসতেই মাহিনকে নজরে এলো। দুজন কর্মীর সঙ্গে নিচু স্বরে কিছু বলছেন। তার অস্তিত্ব কংকালসার। পিছনে থাকা দুহাত স্পষ্টত কাঁপছে। তার ঠিক পিছনে স্ট্রেচার। তাতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো.....
- আম্মু!!
দোহার ভাঙা আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো চারপাশ। ছুটে গেলো সে, বেপরোয়া গতিতে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্ট্রেচারের উপর থেকে চাঁদর সরিয়ে ঠান্ডা হয়ে আসা শক্ত শরীরটাকে ঝাঁকাতে শুরু করলে।
- আম্মু! কথা বলো আম্মু! এই দেখো, তোমার পাখি এসেছে আম্মু!
ঝুঁকে পড়লো সে, ঠান্ডা কপালে ঠেকালো নিজের কপাল। কন্ঠ ম্রিয়মাণ হয়ে এলো চাপা আর্তনাদে,
- আম্মু রে.... একটাবার পাখি বলে ডাকো, একটাবার শুধু বলো পাখি গান শোনা... আম্মু... আমার আম্মু...
- দোহা।
মাহিন দোহার কাঁধ চেপে দিলেন। কোনো লাভ হলোনা। স্ট্রেচারের পায়া চেপে ধরে ধপাস করে ফ্লোরে বসে পড়লো দোহা। মুষ্টিবদ্ধ হাত ফ্লোরে হাঁকিয়ে আহাজারি তুললো,
- আমি পারলাম না আম্মু, তোমার পাখি তোমাকে বাঁচাতে পারলোনা। তোমার পাখি একটা কুলাঙ্গার! আম্মু.....আমার আম্মুকে আমি বাঁচাতে পারলাম না।
আমারা নিজেকে রুখতে পারলোনা। তার ইচ্ছা হচ্ছে ছুটে গিয়ে দোহাকে জড়িয়ে ধরে। কান্নার সংক্রমণ তার মাঝেও ঘটলো দারুণভাবে। সদ্য মাহারা সন্তানের আর্তনাদের সঙ্গে কি কিছুর তুলনা চলে? দোহার প্রতিটা হাহাকারে যেন একেকটি রহস্যের উন্মোচন ঘটছে। ছেলেটা কোন পর্যায়ের সংগ্রাম করছিল এতটা দিন কিংবা বছর যাবৎ, তার সামান্য আঁচ টের পাচ্ছে আমারা।
কিছুক্ষণ বাদে হুটোপাটির শব্দ শোনা গেলো। ঝাপসা দৃষ্টিতে ফিরে তাকাতেই আমারা দেখলো জারাকে। দৌঁড়ে দৌঁড়ে আসছে। তবে সে একা নয়। সঙ্গে রয়েছে রাজীব, জিই - শু এবং অনিক! সকলে আমারার সামনে এসে থামলো। তারপর মাথা কাত করে দেখলো দোহাকে। সবাইকে পেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো অনিক, ধপাস করে আছড়ে পড়লো মেঝেতে ঠিক দোহার সামনে। ভগ্ন সত্তাটিকে সজোরে আঁকড়ে নিলো নিজের বুকের মাঝে। তার আলিঙ্গনে সজোরে কেঁদে উঠলো দোহা, অনিক দ্বিগুণ শক্তিতে জাপটে ধরলো তাকে। রাজীব এবং জিই - শু ছুটে গিয়ে দুপাশ থেকে আঁকড়ে ধরলো তাদের। একে অপরের মাঝে মিশে ক্রন্দনের মাত্রা যেন সীমা ছাড়ালো তাদের।
- আমি হেরে গিয়েছি অনিক, হেরে গিয়েছি।
- হুশ... আমি আছি, আমরা সবাই আছি। কিচ্ছু হারিসনি তুই, কিচ্ছু না।
অনিকের নয়ন বেয়ে ঝরলো অশ্রু। কারোর আঁখিজোড়াই আর শুকনো নেই। আমারা দৃশ্যটির আর্তনাদ সহ্য করতে পারলোনা, জারার বুকে মাথা গুঁজে নিলো। তাকে আগলে নিয়ে সামান্য একটু নাক টানলো জারা, এর বেশি অনুভূতি তার পাথর চেহারায় প্রকাশ পেলনা।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো দোহার মায়ের ম*রদেহ। তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। অতঃপর জানাযা বাদে দাফন। মাহিনের সাথে দোহাও অ্যাম্বুলেন্সে উঠলো। অনিক তার হাত ধরে ব্যস্ত কন্ঠে জানালো,
- তোরা যা, আমরা আসছি। ঠিক আছে? কাঁদিস না।
দোহা কিছু বলতে পারলোনা। বাইরে দাঁড়ানো বাকিদের দিকে চেয়ে শুধু একটু মাথা দোলালো। অ্যাম্বুলেন্স সড়কে বেরিয়ে যেতেই অনিক ফিরে তাকালো, জারা আর আমারাকে বললো,
- তোমরা ফিরে যাও। আমরা যাচ্ছি ওর বাসায়।
- না!
কাটকাট জবাব আমারার। দুহাত মুঠো করে সে জানালো,
- আমিও যাবো।
- শি ইয রাইট। হি নিডস অল অব আয।
জিই - শু সায় জানালো। অনিক কোনো প্রতিবাদ করলোনা। ছেলেমেয়েরা সকলে একসঙ্গে একটি সি এন জিতে চেপে বসলো। প্রায় মিনিট চল্লিশের যাত্রা বাদে রংচটা একটি দোতলা ভবনের সামনে এসে থামলো সি এন জি। সামনেই অ্যাম্বুলেন্স পার্ক করে রাখা। এখনো যায়নি। সবাই নেমে ভেতরে ঢুকলো। এক টুকরো প্রাঙ্গণের মাঝে স্টিলের খাটিয়ার মাঝে রাখা হয়েছে দোহার মা শায়লার মরদেহ। আশেপাশে ইতোমধ্যে মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছে। গুঞ্জন এবং চাপা ক্রন্দনে বায়ু ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। দোহা খাটিয়ার এক কোণায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। এখন আর কাদঁছে না। দৃষ্টিজুড়ে তার শুধুই শূন্যতা। অনিক, রাজীব এবং জিই - শু একে একে তার পাশে গিয়ে বসলো। অপরদিকে আমারা এবং জারা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলো।
- আম্মুর ক্যান্সার ছিলো।
দোহা ক্ষীণ স্বরে অবশেষে বন্ধুদের জানালো। অনিকের হাত চেপে বসলো তার কাঁধে।
- সার্জারি সাজেস্ট করেছিল ডক্টর, প্রচুর টাকা লাগতো।
- আমাদের একবারও বলিসনি কেনো?
রাজীবের চাপা কন্ঠে দোহার শুষ্ক ঠোঁটজুড়ে এক পরিহাসের হাসি ফুটলো। দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলো সে। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে রইলো। আরো একটি সি এন জি এসে থামলো দোরগোড়ায়। ভেতর থেকে লাফিয়ে বের হলো দিয়া। চোখমুখ ইতোমধ্যে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তবে সে একা নয়। বাবুল এবং শবনমও রয়েছেন। ফায়াজকে পাশের বাসায় রেখে আসা হয়েছে। দিয়া নেমেই এক দৌঁড়ে ছুটে গেলো খাটিয়ার দিকে, আছড়ে গড়াগড়ি খেলো মাটিতে।
- আম্মু! আম্মু কথা বলো!
আশেপাশের মহিলারা তাকে জাপটে ধরে ফেললো। মা - হারা কন্যার আর্তনাদে আরো একবার ভারী হয়ে উঠলো আকাশ বাতাস। দোহা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলো, দিয়াকে আগলে নিলো বুকে।
- ভাইয়া! আম্মু....ভাইয়া এখন আমাদের কি হবে? আমরা যে এতিম হয়ে গেলাম ভাইয়া?
কোনো কথাই উচ্চারণ করতে পারলোনা দোহা। শুধু শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো নিজের বোনকে। শবনম এবং বাবুল উভয়ে পাশাপাশি এগোলেন। সন্তপর্নে, ধীর পায়ে। তাদের আসতে লক্ষ্য করেই দোহা অতর্কিতে দিয়াকে ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনে এগিয়ে এসে হুংকার ছুঁড়লো,
- খবরদার!
থমকে গেলেন বাবুল এবং শবনম। হতবাক হয়ে দেখলে ক্রোধে ফুঁসতে থাকা দোহাকে। কর্কশ আওয়াজে দোহা খেঁকিয়ে উঠলো,
- আমার আম্মুর মরামুখ দেখার অধিকারও নেই তোমাদের! এক পা এগোলে ওই পা একদম কে*টে রেখে দেবো!
- দোহা! চুপ কর!
দিয়া তাকে জাপটে ধরলো, জোরপূর্বক নিজের বুকে চেপে শান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলো।
- গুন্ডা ছেলে হয়েছে একটা! আমার বোনকে আমি দেখব, তাতে তোর কি শুনি? কোন অধিকারে তুই আমাকে রুখিস?
শবনমের বাক্যের বিপরীতে দ্বিতীয় দফায় ফুঁসে উঠলো দোহা। তবে দিয়ার কারণে কিছুতেই এগোতে পারলোনা। একপাশে দাঁড়ানো মাহিন শান্ত কন্ঠে বললেন,
- প্লীজ, আমরা এখন এই পারিবারিক ঝামেলা না করি? এটা সময় কিংবা পরিস্থিতি কোনোটাই নয়। একটা মানুষ চলে গিয়েছে। জীবনে যে শান্তিটুকু পায়নি, সেই শান্তিটুকু দিয়ে অন্তত তাকে আমরা বিদায় দেই?
বাবুল শক্ত মুখে শুধু মাথা দোলালেন। শবনমের কাঁধ চেপে ইশারায় বোঝালেন, এই মুহূর্তে উত্তেজনার পরিণাম ভালো হবেনা।
ঘন্টাখানেকের মধ্যে গোসলের কাজ সারা হলো। এবার জানাযার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার পালা। সামনের কবরস্থান সংলগ্ন মাঠেই বাদ যোহরের আয়োজন করা হয়েছে। খাটিয়া তুলতে এগিয়ে গেলেন মাহিন, সঙ্গে আরও দুইজন পুরুষ। একপাশে বন্ধুদের বলয়ের মাঝে ঘিরে থাকা দোহাকে ডাকা হলো। শূণ্যতা মাখা নয়নে সে উঠে দাঁড়ালো, যান্ত্রিক রোবটের মতন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো। ঠিক তখনি সাইরেনের আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠলো অজানা আতঙ্কে। ঝট করে ফিরে তাকালো সবাই। দোরগোড়ায় দেখা মিললো, পুলিশের গাড়ির!
চারজন পুলিশের পোশাক পরিহিত লোক এসে ঢুকলো। একজনের হাতে ঝংকার তুললো হ্যান্ডকাফ। অপর একজন হাতের লম্বা লাঠিটা তালুর মাঝে ঘষতে ঘষতে গর্জন ছুঁড়ল,
- দোহা ইসলাম কে?
এহেন গুরুতর এক মুহূর্তে পুলিশের আগমন, তার উপর উদ্ধত্যপূর্ন আচরণে সবাই থমকে গেলো। মাহিন পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে গেলেন,
- কি অদ্ভুত, দেখুন একটা খারাপ পর্যায়ে আছি আমরা। একটি বিবেচনা করে পরবর্তীতে...
- আপনি দোহা ইসলাম?
- না মানে...
এক ধাক্কায় তাকে সামনে থেকে সরিয়ে দিলো পুলিশের লোকটা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো। অদূরে দাঁড়ানো জারা, আমারা এবং অনিক রাজীবরা একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করলো। ধীরপায়ে অত্যন্ত শান্তভাবে দোহা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো পুলিশের মুখোমুখি। জানালো,
- আমি দোহা ইসলাম।
লোকটা আপাদমস্তক দোহাকে দেখলো। তারপর পাথুরে মুখে আদেশ ছুঁড়লো,
- হ্যান্ডকাফ লাগা!
প্রচন্ড এক গুঞ্জন উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে অপরজন দোহার কব্জিতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলো।
- গাড়িতে তোল!
কোনো কথাবার্তা, বিশ্লেষণ ছাড়াই দোহাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে সামনে নিয়ে যাওয়া শুরু করলো তারা। মুহূর্তেই ছুটে গেলো বেশ কয়েকজন।
- স্যার স্যার, বাচ্চা ছেলে, ছেড়ে দেন।
- মা ম*রা, জানাযাটা অন্তত পড়তে দেন স্যার!
পুলিশকে থামানোর চেষ্টা হলেও লাভ হলোনা। প্রচন্ড ধমকে সবাই ভয় পেয়ে সরে যেতে বাধ্য হলো। অজান্তেই দৌঁড়ে গেলো অনিক, রাজীব এবং জিই - শু। জারা এবং আমারাও বুঝলোনা কখন তাদের সামনে গিয়ে রুখে দাঁড়ালো। পুলিশের লোক কিশোর কিশোরীর দলের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
- আপনি কোন অধিকারে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন ওকে? ওয়ারেন্ট কোথায়?
আমারার শক্ত প্রশ্নের বিপরীতে দাঁত কিড়মিড় করলো পুলিশের লোকটা। বিরক্তিভরে জানালো,
- অ্যাটেম্পট টু মা*র্ডারের জন্য ওয়ারেন্ট লাগেনা! সর!
তার বাক্য সত্য কি মিথ্যা বুঝে ওঠার আগেই তাদের ঠেলেঠুলে এগিয়ে গেলো পুলিশ। মাঝখানে অবরুদ্ধ দোহা। সবথেকে হৃদয়বিদারক ব্যাপার সে পুলিশকে কোনো বাঁধাই দিচ্ছেনা, আর না কোনো প্রতিবাদ করছে। ওই আঁখিজোড়া জুড়েই এক নিষ্প্রভ ফাঁপা শূন্যতা। দোহাকে গাড়ির ভেতরে তোলা হলো, তারপর সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই আড়াল হলো। পিছনে ফেলে গেলো এক স্তব্ধ মৃ*ত্যুপুরীকে।
শেষমেষ নিজের মায়ের বিদায়লগ্নটুকুও ভাগ্যে জুটলো না? এ কেমন পৈশাচিকতা? চেপে এলো সকলের অন্তর।
- লা*শ বেশিক্ষণ রাখা যাবেনা, জানাযার সময় হয়ে গেছে। আপনারা কি থানায় যাবেন?
- আগে দাফন, তারপর সব।
আরো একবার ব্যস্ততা নেমে এলো প্রাঙ্গণে। কিশোর কিশোরীর দল বিবর্ণ মুখে দেখলো বিদায় আয়োজন।
- শিট!
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো অনিক, তার শরীর কাঁপছে। জিই - শু মিনমিন করলো,
- কি হবে এখন? ওটা নিশ্চয়ই রুহানের ফ্যামিলির কাজ।
- শালাদের বুঝাতে হবে! রহমান ফ্যামিলির ক্ষমতা কতটুকু! একেকটা কুত্তার মতন পি*টিয়ে যদি দোহাকে ছাড়িয়ে না এনেছি আমার নাম অনিক রহমান না! শালা পুলিশ না....একেকটা মান্দারের বাচ্চা!
অনিক উল্টো ঘুরে নিজের ফোন পকেট থেকে বের করলো, ডায়াল করলো। কিছুক্ষণ বাদেই বলে উঠলো,
- হ্যাঁ ড্যাড...
কথা বলতে সে হেঁটে খানিকটা দূরে চলে গেলো, অনুসরণ করলো রাজীব আর জিই - শু। জারা মাথা দুলিয়ে প্রশান্ত কন্ঠে বললো,
- মেইবি পাপা অলসো ক্যান হেল্প। পাপার চেনাজানা উঁচু পদের অফিসার আছেন পুলিশে। শুড আই কল হিম?
আমারা ফিরে তাকালো, টলটলে নয়নে শুধু উচ্চারণ করলো,
- প্লীজ ডু।
জারা সায় জানিয়ে ফোন বের করে ডায়াল করতে আরম্ভ করলো। আমারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো বুকে হাত চেপে, দৃষ্টি তার অদূরে যেখানে কিছুক্ষণ আগে আড়াল হয়েছে পুলিশের গাড়ি। বুক কাঁপছে তার।
আর কতটুকু কষ্ট তোলা আছে দোহা ইসলাম নামক ছেলেটার ভাগ্যে?
—চলবে—